
৪ নভেম্বর ১৯৭২ সালে গণপরিষদে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব বলেছিলেন:
“ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কেউ তাদের বাধা দেওয়ার অধিকার রাখে না… আমাদের শুধু আপত্তি হলো এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।”
কিন্তু মুখে এই সাম্য ও ধর্মীয় স্বাধীনতার বুলি আউড়ানো হলেও, শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশনায় তৎকালীন সরকারের কর্মকাণ্ডে দেখা গিয়েছিল সম্পূর্ণ বিপরীত এক রূপ। শুধু রাষ্ট্র বা সংবিধান নয়, নিজের রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ইসলাম ও মুসলিম স্বকীয়তা একে একে উপড়ে ফেলা হয়েছিল।
প্রথমত,
ইসলামি স্বকীয়তা বর্জনের এই মানসিকতা কেবল স্বাধীনতার পরেই নয়, বরং তার বীজ রোপণ করা হয়েছিল পাকিস্তান আমলেই। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার সময় মূল দলটির নাম ছিল “পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ” এবং ১৯৪৮ সালে গঠিত ছাত্র সংগঠনটির নাম ছিল “পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ”। কিন্তু ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে অসাম্প্রদায়িকতার দোহাই দিয়ে মূল দল থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি ছেঁটে ফেলে করা হয় “পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ” এবং ছাত্র সংগঠনটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ বাদ দিয়ে করা হয় “পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ”। শেখ মুজিবুর রহমান তখন মূল দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এই মুসলিম নাম বর্জনের সিদ্ধান্তের প্রধান কারিগরদের একজন ছিলেন।
এরপর,
১০ জানুয়ারি ১৯৭২। শেখ মুজিব পশ্চিম পাকিস্তানের যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা থেকে দেশে ফেরার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায়, ২৪ জানুয়ারি তাঁর সরকার জারি করে বিতর্কিত “দালাল আইন”। তৎকালীন প্রেক্ষাপটে অভিযোগ ওঠে, এই আইনের আড়ালে দেশের শীর্ষস্থানীয় বহু আলেম, বরেণ্য ইসলামি চিন্তাবিদ এবং মাদ্রাসার শিক্ষকদের ঢালাওভাবে “দালাল” তকমা দিয়ে বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করা হয়। সমসাময়িক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদ বদরুদ্দীন উমর তাঁর লেখায় তৎকালীন পরিস্থিতি সম্পর্কে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন-
“দালাল আইনের নামে যেভাবে বেছে বেছে আলেম সম্প্রদায় ও ইসলামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা কোনো অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের লক্ষণ ছিল না; বরং তা ছিল একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।”
স্বাধীনতার পরপরই শেখ মুজিব সরকারের অধীনে বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের শুরুতে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতসহ সব ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রচার সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ বা সংকুচিত করা হয়। একই সাথে এ দেশের চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতে এক বিষাক্ত অপসংস্কৃতির বীজ বুনে দেওয়া হয়। সিনেমা বা নাটকে রাজাকার, খলনায়ক, শোষক, চোর কিংবা খুনি চরিত্রগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে দাড়ি, টুপি এবং ইসলামি লেবাস পরিয়ে উপস্থাপন করা শুরু হয়, যা সাধারণ মানুষের মনে ইসলামি সংস্কৃতির প্রতি এক ধরনের তীব্র অবমাননাকর মনস্তত্ত্ব তৈরি করে।
৪ নভেম্বর ১৯৭২। শেখ মুজিবের হাত ধরে গণপরিষদে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান গৃহীত হয়। এই সংবিধানের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ দিয়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’-কে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি করা হয় এবং ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে ধর্মীয় নামের সমস্ত রাজনৈতিক দল ও সংগঠন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর মাধ্যমে মুসলিমদের ধর্মীয় রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হয়।
সংবিধান কার্যকরের পরপরই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঐতিহাসিক পরিচয় ও লোগো থেকে ইসলামি আধ্যাত্মিক বাণীগুলো সম্পূর্ণ তুলে দেওয়ার এক রাষ্ট্রীয় তৎপরতা শুরু হয়। ঢাকা বোর্ডের মূল মনোগ্রাম থেকে পবিত্র কুরআনের আয়াত “ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক” মুছে ফেলা হয়।
শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে ১৯৭২ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো থেকে ঐতিহ্যবাহী ইসলামি জ্ঞানবৃদ্ধির দোয়া “রাব্বি জিদনী ইলমা”। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকেও পবিত্র কুরআনের আয়াত “ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক” সরিয়ে ফেলা হয়।
মুসলিমদের ঐতিহাসিক অবদান এবং নামগুলোকে মুছে দিতে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় জোরপূর্বক বদলে দেওয়া হয়েছিল। জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুসলিম শব্দটি মুছে করা হয় “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়”। শেখ মুজিব সরকারের ১৯৭৩ সালের সংশোধিত বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ‘মুসলিম’ শব্দটি সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়ে কেবল “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়” রাখা হয়।
সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও ফজলুল হক মুসলিম হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঐতিহাসিক আবাসিক হল দুটির প্রাতিষ্ঠানিক নাম ও সাইনবোর্ড থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে কেবল “সলিমুল্লাহ হল” এবং “ফজলুল হক হল” করা হয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামের এই কলেজটি থেকে ‘ইসলাম’ শব্দ বাদ দিয়ে “নজরুল কলেজ” নাম দেওয়া হয়।
অথচ অবাক করা বিষয় হলো, প্রতিবেশী ভারতের মতো কট্টর হিন্দুত্ববাদী দেশেও প্রায় ২০০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক ‘আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’-এর নামের সাথে আজও ‘মুসলিম’ শব্দটি রাষ্ট্রীয়ভাবে টিকে রয়েছে, অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলাম ও মুসলিম শব্দগুলো মুছে দেওয়া হয়েছিল!
১৯৭৩-৭৪ সালে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের দীর্ঘদিনের ইসলামি ঐতিহ্য ভেঙে শেখ মুজিব সরকারের আমলে দেশের সমস্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং অফিস-আদালতের সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবারের পরিবর্তে রবিবার ঘোষণা করা হয়। তৎকালীন প্রেক্ষাপটে সাধারণ মুসলমানদের মাঝে এই ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে যে, প্রতিবেশী ভারতের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে এবং মুসলমানদের জুমার নামাজের ঐতিহ্যকে ধ্বংস করতেই এই ছুটির দিন পরিবর্তন করা হয়েছিল।
১৯৭৪ সালে শেখ মুজিব সরকারের গঠিত ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট পেশ করা হয়। সেখানে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির আওতায় প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষাকে সংকুচিত, নিয়ন্ত্রিত ও একপ্রকার বিলুপ্ত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল, যা আলেম সমাজ ও ধর্মপ্রাণ জনগণের মাঝে তীব্র গণ-অসন্তোষের জন্ম দেয়।
তৎকালীন শেখ মুজিব সরকারের এই চরম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এবং ইসলাম-বিদ্বেষী নীতিমালার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন সমসাময়িক প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর” এবং বিভিন্ন প্রবন্ধে তৎকালীন বুদ্ধিজীবী ও সরকারের এই দেউলিয়াত্ব উন্মোচন করে লিখেছেন:
“ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ এই নয় যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের ধর্মীয় স্বকীয়তা ও ঐতিহ্যকে রাষ্ট্র থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ছাত্র সংগঠন আর হলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেওয়া প্রগতিশীলতা নয়, বরং এটি ছিল এক ধরণের হীনম্মন্যতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মনস্তত্ত্বকে অস্বীকার করার শামিল।”
একইভাবে তৎকালীন সময়ের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও বামপন্থী নেতারাও স্বীকার করেছিলেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান ব্যক্তিগত জীবনে টুকটাক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান মেনে চললেও এবং পরবর্তীকালে তীব্র জনরোষ ও রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করলেও, তাঁর শাসনামলের প্রথম তিন বছরে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে ইসলামকে কোণঠাসা করার যে তীব্র প্রয়াস চালানো হয়েছিল, তা ছিল আত্মঘাতী।
ইতিহাসবিদদের মতে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশের জনগণের ধর্মীয় চেতনা ও ঐতিহ্যের পরিপন্থী এই চরম পদক্ষেপগুলোই পরবর্তীতে তৎকালীন প্রশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ, ঘৃণা ও তীব্র দূরত্বের জন্ম দিয়েছিল। ১৫ই আগস্ট রাষ্ট্রের শাসকের মৃত্যুতে জনগণের মিষ্টি বিতরণ বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছিল।
পরবর্তী লেখায়, শেখ মুজিবের মৃত্যুর পরে ঢাকাসহ সারাদেশের অবস্থা কেমন ছিল এবং কেন ছিলো? তা নিয়ে আলোচনা করা হবে।








