
যেসব বিষয় মানুষের জন্য উপকারী তা করতে কোরআন-হাদিসে নানাভাবে উৎসাহিত করেছে; যেমন হাঁটা।
সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন লাভে চিকিৎসকরা প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটার পরামর্শ দেন। কোরআন ও হাদিসে মানুষকে নানাভাবে হাঁটতে উৎসাহিত করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বললেন যে তোমরা দ্রুত বেগে হাঁটবে। সাহাবায়ে কেরাম বলেন, রাসূলুল্লাহ বলার পর আমরা দ্রুত হেঁটে দেখলাম এটি আমাদের জন্য অতি সহজ এবং উপকারী।
-ইবনে খুযাইমা-২৫৩৭, হাদিসের মান সহি ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে অত্যন্ত সাবলীল, দৃঢ় এবং কিছুটা দ্রুত গতিতে হাঁটতেন। সাহাবিদের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর হাঁটার গতি সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি ছিল এবং মনে হতো যেন তিনি কোনো উঁচু জায়গা থেকে নিচের দিকে নামছেন।
এটি অত্যন্ত অবাক করা বিষয় যে, বর্তমান যুগে প্রতিটি দেশের আর্মির জেনারেল ও বড় বড় অফিসাররা যেভাবে দৃঢ় পদক্ষেপে হার্টেন এবং প্যারেড অবজারভেশন করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর হাটার ধরন ছিল ঠিক তেমন। মোটকথা একজন সেনাপতি যেভাবে সর্বক্ষণ হাঁটেন রাসূলুল্লাহ সেভাবেই হাঁটতেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাঁটার ধরণ ছিল:
১// রাসূলুল্লাহ সা. কখনো অলসভাবে বা পা টেনে টেনে হাঁটতেন না। তার হাঁটা ছিল উদ্যমী এবং দৃঢ় প্রদাচারণা।
আলী রা. বলেন, “রাসূলুল্লাহ সা. যখন হাঁটতেন, তখন কিছুটা ঝুঁকে চলতেন, দেখে মনে হতো তিনি যেন কোনো ঢালু পাহাড় থেকে নিচে নামছেন”।
হাঁটার গতি ছিল সহজ স্বাভাবিক । আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, “আমি আল্লাহর রাসূল সাঃ এর চেয়ে দ্রুত গতিতে আর কাউকে হাঁটতে দেখিনি; যেন পথ তাঁর জন্য সংকুচিত বা গুটিয়ে দেওয়া হতো। আমরা তাঁর সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খেতাম, অথচ তিনি স্বাভাবিকভাবেই হাঁটতেন”।
২// নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দ্রুত হাঁটার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। হজ্জ বা ওমরাহর সময় তাওয়াফে প্রথম তিন চক্করে পুরুষদের জন্য কিছুটা বীরদর্পে দ্রুত হাঁটার বিধান রয়েছে হাদিসে; যাকে রমল বলা হয়।
রাসূল সা. নিজেই সাহাবিদের এ নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এছাড়া সাধারণ চলাফেরায় অলসতা পরিহার করে চটপটে ও সজীব থাকার বিস্তারিত বিবরণ হাদিসে পাওয়া যায়।
৩// তিনি বিনয় বজায় রাখে দ্রুত হাঁটলেও তাঁর মধ্যে কোনো অহংকার বা কৃত্রিমতা ছিল না। পবিত্র কোরআনে গর্বভরে বা বুক ফুলিয়ে মাটিতে অহংকারের সাথে হাঁটতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
✅✅ খালি পায়ে হাঁটার ব্যাপারে ও রাসূলুল্লাহর সাঃ উৎসাহ দিয়েছেনঃ
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে খালি পায়ে হাঁটলে প্রাকৃতিকভাবে অকুপ্রেসার হয়, ফলে মানসিক চাপ কমে। মন ভালো থাকে। শারীরিক কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে বিশেষ কার্যকর ভূমিকা রাখে। ক্যালোরি ও মেদ কমাতে তাই হাঁটার কোনো বিকল্প নেই।
খালি পায়ে হাঁটা নবী সা. এর সুন্নত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আবিষ্কারের আগেই প্রায় ১৫ শত বছর আগে খালি পায়ে হাঁটার জন্য আদেশ করেছেন তিনি সা. । হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ সুনানে নাসায়ির এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘রাসুল সা. মাঝেমধ্যে খালি পায়ে হাঁটার নির্দেশ করেছেন’।
আবদুল্লাহ ইবনে বুরাইদাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. এর এক সাহাবী মিসরে অবস্থানরত ফাদালাহ ইবনে উবাইদ রা. -এর কাছে পৌঁছেন। অতঃপর তিনি বলেন, ‘আমি শুধু আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসিনি, বরং আমি ও আপনি যে হাদিসটি রাসুল সাঃ এর কাছে শুনেছি, আশা করি এ সম্পর্কে আপনার আরো কিছু জানা আছে।’
ইবনে উবাইদ রা. বলেন, ‘তা কোন বিষয়ে?’ তিনি বলেন, ‘এরূপ আপনি একটি স্থানের নেতা, অথচ আপনার মাথায় চুল এলোমেলো দেখছি?’ ফাদালাহ বলেন, ‘রাসুল (সা.) আমাদের মাত্রাতিরিক্ত জাঁকজমক দেখাতে নিষেধ করেছেন। এরপর তিনি (ফাদালাহ) জিজ্ঞেস করেন , ‘আপনার পায়ে জুতা দেখছি না কেন?’ সাহাবি বলেন, ‘নবী সা. আমাদের মাঝে মাঝে খালি পায়ে চলার আদেশ দিতেন ।
-আবু দাউদ : ৪১৬০।’
হাদিসের ব্যাখ্যা গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘মাঝে মাঝে খালি পায়ে হাঁটলে বিনয় আসে, অহমিকা দূর হয় এবং এটি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।’
উল্লিখিত হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, রাসুল সা. এর নির্দেশনা পালনের উদ্দেশ্যে মাঝে মাঝে খালি পায়ে হাঁটা সুন্নত।
এতে মানুষের আত্ম-অহমিকা কিছুটা সংবরণ হয়। হাঁটাহাঁটি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বর্ণনা রয়েছে এবং বলা হয়েছে, “পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন করো এবং কণ্ঠস্বর নিচু করো। নিশ্চয় গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।” -সুরা লুকমান- ১৮-১৯।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ নিচু এবং সমান জুতা পড়ার নির্দেশ দিয়ে থাকেন। এবং ভারসাম্য রক্ষা করে এমন জুতা পরার নির্দেশ দিয়ে থাকেন।
এই কথা রাসূলুল্লাহ দেড় হাজার বছর পূর্বেই বলে গেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন- তোমরা এক পায়ে জুতা পরিধান করে অন্য পা খালি রেখে হাঁটবেনা।
রাসুল সা. বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন এক পায়ে জুতা পরে না হাঁটে। হয়তো উভয় পায়ে জুতা পরে হাঁটবে নয়তো উভয় পায়ের জুতা খুলে হাঁটবে’
-বুখারি ও মুসলিম।
✅✅ ইসলাম বিভিন্ন ভাবে হাঁটতে উৎসাহিত করেছে। এখানে তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো-
১/বেশি পথ অতিক্রম করে মসজিদে আসার উৎসাহ:
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, বনু সালিমা গোত্রের লোকজন মসজিদ-ই-নববীর কাছে এসে ওই খালি স্থানে বসতি স্থাপনের ইচ্ছা করল। মসজিদ-ই-নববীর পাশে কিছু খালি জায়গা ছিল। বিষয়টি নবী সা. অবগত হলে তিনি তাদের বললেন, হে বনু সালিমা গোত্রের লোকেরা! তোমরা তোমাদের বর্তমান ঘরবাড়িতেই থাকো। নামাজের জন্য মসজিদে আসতে তোমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ লিখিত হয়।
-সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৬৫।
২/আল্লাহর পথে হেঁটে পায়ে ধুলা মাখা একটি বিরাট নেকীর কাজ।
আবু আবস রা. বলেন, ‘যে ব্যক্তির দুই পা আল্লাহর পথে ধূলি-ধূসরিত হয়, তা জাহান্নামের জন্য হারাম হয়ে যায়।’
-সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৩১১৬।
৩/পায়ে হেঁটে জুমায় অংশগ্রহণ করার জন্য রাসুলুল্লাহ উৎসাহিত করেছেন:
আউস বিন আউস সাকাফি রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সা. কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি জুমার জন্য বাহনে চড়ে নয়, বরং হেঁটে মাসজিদে যাবে এবং কোনোরূপ অনর্থক কথা না বলে ইমামের কাছে বসে খুতবা শুনবে, তার প্রতিটি পদক্ষেপ সুন্নত হিসেবে গণ্য হবে এবং প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে সে দীর্ঘদিন রোজা পালন ও রাতভর নামাজ আদায়ের সওয়াব পাবে।’ (কোন হাদিসে এক বছরের কোথায় এসেছে)
-সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৩৪৫।
৪/ ইসলামী শরিয়ত হেঁটে তাওয়াফ করার নির্দেশ দিয়েছে। কোন সমস্যা এবং অসুস্থতা না থাকলে হেঁটে তাওয়াফ করা সুন্নত।
হাদিসে এসেছে, ‘রাসুলুল্লাহ সা. যখন মক্কায় আগমন করলেন, তখন তিনি প্রথমে মসজিদে হারামে প্রবেশ করে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন। এরপর এর ডান দিকে গেলেন এবং তিনবার রমল করলেন বা দ্রুত হাঁটলেন এবং চতুর্থবার স্বাভাবিকভাবে হেঁটে তাওয়াফ করলেন।’
-সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২৯৪৯!
এই হাদিস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে যতক্ষণ শক্তি সামর্থ্য থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত দ্রুত হাঁটতে হবে এবং এটাই স্বাস্থ্যকর।
৫/ হজ্জের গুরুত্বপূর্ণ বিধান সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সায়ি করা তথা হাঁটা।
হাদিসে এসেছে, ‘রাসুলুল্লাহ সা. যখন সাফা থেকে অবতরণ করতেন তখন (স্বাভাবিক) হাঁটতেন, এমনকি তাঁর পদদ্বয় উপত্যকার নিম্নভূমিতে অবতরিত হলে তিনি সায়ি করে তা পার হতেন।’
সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২৯৮১।
৬/ একাধিক হাদিসে রাসুলুল্লাহ লাশের সাথে হাঁটার নির্দেশ দিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ সা. এর সাহাবিরা লাশের সঙ্গে হেঁটে কবরস্থানে যেতেন। রাসুলুল্লাহ সা. তাঁদের লাশের সাথে মধ্যম গতিতে পথচলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
-সুনানে আবি দাউদ, ৩১৮০-৩১৮২।








