
কেননা যিনি এক স্থান থেকেই সবকিছু কন্ট্রোল করতে পারেন তাঁর সর্বত্র চলে আসার দরকার নেই। “আল্লাহ ‘আরশে’ আছেন। এবং তার চেয়ার বা কুরসি সমস্ত আসমান ও জমিনকে বেস্টন করে আছে।” – বাকারা। এবং সেখানে “তিনি সারাক্ষণ কোন না কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে রত আছেন এবং তার বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন হয় না”।
– আর রহমান।
আল্লাহ আরশের ওপর সমাসীনঃ
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের অর্থাৎ সালফে সালেহীন বা সালাফদের আকীদা অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা তাঁর মহিমার উপযুক্তভাবে সাত আসমানের উপরে আরশের ওপর সমুন্নত বা সমাসীন আছেন -সুরা ত্বা-হা, আয়াত ৫।
সশরীরে সর্বত্র বিরাজমান ননঃ
আল্লাহর সত্তা (ফিজিক্যালি বা শরীরিকভাবে) তিনি পৃথিবীর সব জায়গায় বিরাজমান নন।
(পৃথিবীর বহু জায়গায় ময়লা আবর্জনা বা নিচ স্থান খারাপ আসলেই পরিবেশ বিদ্যমান। আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান এই কথা যারা বিশ্বাস করে তারা কি আল্লাহকে এই নোংরা স্থানেও নিয়ে যেতে চায়?)
আল্লাহ তাআলা সময় ও স্থানের সীমার ঊর্ধ্বে, তিনি কোনো নির্দিষ্ট সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নন।
জ্ঞান ও কুদরত সর্বত্র পরিব্যাপ্তঃ
আল্লাহ তাআলা সশরীরে সর্বত্র না থাকলেও, তাঁর অসীম জ্ঞান বা ইলম, ক্ষমতা বা কুদরত, দৃষ্টি ও শ্রবণ দিয়ে তিনি পুরো সৃষ্টিজগৎকে বেষ্টন করে আছেন। কোনো কিছুই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়
-বাকারা- ২৫৫!
আল্লাহ বান্দার নিকটবর্তীঃ
তিনি আরশে থাকলেও পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত যেমন—সুরা আল-কাফ ১৬ বা সুরা আল-মুজাদালা ৭ অনুসারে তাঁর ইলম ও কুদরতের মাধ্যমে তিনি বান্দার অতি নিকটবর্তী।
নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক হলেন আল্লাহ যিনি আকাশমন্ডলী আর পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশে সমুন্নত হয়েছেন বা আরোহণ করেছেন। তিনি যাবতীয় বিষয়াদি পরিচালনা করেন। তাঁর ছাড়া ছাড়া সাফায়াত বা সুপারিশ করার কেউ নেই। ইনিই হলেন আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক। কাজেই তোমরা তাঁরই ‘ইবাদাত কর, তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না?
– ইউনুস- ০৩!
নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি আরশের উপর উঠেছেন। তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে দেন, তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। আর সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তারই হুকুমের অনুগত, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন।জেনে রাখ, সৃজন ও আদেশ তারই। সৃষ্টিকুলের পালনকর্তা আল্লাহ কত বরকতময়।
-আরাফ- ৫৪!
আল্লাহই উর্ধ্বদেশে আকাশমন্ডলী স্থাপন করেছেন স্তম্ভ ব্যতীত, তোমরা এটা দেখছ। অতঃপর তিনি “”আরশে সমাসীন”” হলেন এবং সূর্য ও চাঁদকে নিয়মাধীন করলেন; প্রত্যেকে নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত আবর্তন করে, তিনি সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন এবং নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন যাতে তোমরা তোমাদের রবের সাথে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে নিশ্চিত বিশ্বাস করতে পার।
– আর রাদ-০৩!
তারা ভয় করে তাদের “”উপরস্থ আসমানে থাকা”” তাদের রবকে এবং তাদেরকে যা আদেশ করা হয় তারা তা করে।
– নাহল- ৫০!
দয়াময় আল্লাহ্ তা’আলা আরশের উপর উঠেছেন ।
– ত্বহা-০৫।
আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করেছেন তিনি আরশে উঠেছেন । এর উপর বিশ্বাস রাখা ফরয। তিনি কিভাবে আরশে উঠেছেন সেটার ধরণ আমাদের জানা নেই। এটা ঈমান বিল গায়েবের অংশ।
তিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেন; তারপর তিনি “”আরশের উপর উঠলেন””। তিনিই রাহমান, সুতরাং তাঁর সম্বন্ধে যে অবহিত তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।
– সূরা আল ফোরকান- ৫৯।
. আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু’য়ের অন্তর্বর্তী সব কিছু সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে। তারপর তিনি “আরশের উপর উঠেছেন””। তিনি ছাড়া তোমাদের কোন অভিভাবক নেই এবং সুপারিশকারীও নেই; তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্ৰহণ করবে না?
– সুরা আস্ সাজদাহ- ০৪।
তিনি ছয় দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি “আরশের উপর উঠেছেন”। তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়।(/
আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন- তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা।
সূরা হাদীদ- ০৪।
অন্য কথায় তিনি শুধু সামগ্রিক জ্ঞানের অধিকারী নন, খুঁটি-নাটি বিষয়েও জ্ঞানের অধিকারী। এক একটি শস্যদানা ও বীজ যা মাটির গভীরে প্রবিষ্ট হয়, এক একটি ছোট পাতা ও অংকুর যা মাটি ফুড়ে বের হয়, বৃষ্টির এক একটি বিন্দু যা আসমান থেকে পতিত হয় এবং সমুদ্র ও খাল-বিল থেকে যে বাষ্পরাশি আকাশের দিকে উত্থিত হয়, তার প্রতিটি মাত্ৰা তার জানা আছে। – ইবন কাসীর
তোমরা কি এ থেকে নিৰ্ভয় হয়েছ যে, যিনি আসমানে রয়েছেন(১) তিনি তোমাদেরকে সহ যমীনকে ধ্বসিয়ে দেবেন, অতঃপর তা হঠাৎ করেই থর থর করে কাপতে থাকবে?
-সূরা মূলক- ১৬।
এর দ্বারা একথা বুঝায় যে, আল্লাহ উপরে থাকেন। এর সপক্ষে হাজারেরও বেশী দলীল-প্রমাণাদি রয়েছে। মু’আবিয়া ইবন হাকাম আস-সুলামী বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এক দাসীকে খুব জোরে চড় মেরেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাজটাকে নেহায়েত বড় অন্যায় হয়েছে বলে প্ৰকাশ করলেন, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি তাকে স্বাধীন করে দেব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে এস। আমি দাসীটিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে আসলে তিনি দাসীকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ কোথায়? সে বলল, আসমানে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার জিজ্ঞেস করলেন, আমি কে? সে বলল, আপনি আল্লাহর রাসূল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, একে মুক্ত করে দাও, এ ঈমানদার। -আবু দাউদ: ৩২৮২।
অতঃপর তিনি আরশের উপর ক্ষমতাশীল হোন। সূরা হাদীদ-৩।
মূলত আল্লাহ আরশে বসেই সবকিছু দেখেন এবং শোনেন এবং সবকিছু কন্ট্রোল করতে পারেন। আর এটাই মহান সৃষ্টিকর্তার অসীম ক্ষমতার একটি বড় প্রমাণ।
আল্লাহ তার ইলম বা জ্ঞান ও কুদরত বা ক্ষমতা দিয়ে সকল সৃষ্টির নিকটেই থাকেন।
যেমন আল্লাহ বলেন-
১/ “আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে।
-সূরা বাকারা-১৮৬।
২/ আর আমি বান্দার গলদেশের শিরার চেয়েও বেশি নিকটবর্তী।
-সূরা কাফ-১৬।
৩/ অতঃপর এমন কেন হয়না যে, যখন প্রাণ উষ্ঠাগত হয়। এবং তোমরা তাকিয়ে থাক। এবং তোমাদের চেয়ে আমিই তার বেশি কাছে থাকি। কিন্তু তোমরা দেখতে পাওনা”
“সূরা ওয়াকিয়া-৮৩,৮৪,৮৫”।
৪/ “আর পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। সুতরাং তোমরা যে দিকেই মুখ ফেরাও, সে দিকেই আল্লাহর চেহারা (দিশাহ বা সম্মুখভাগ )। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞ।”)
-সূরা বাকারা-১১৫।
৫/ আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন- তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা।
সূরা হাদীদ-০৪।
দেখুন, আল্লাহ যে আরশে থেকেই সবকিছু দেখেন শুনেন এবং সবার নিকটে অবস্থান করেন সূরা হাদীদের এই চার নাম্বার আয়াত এই দলিলের জন্য যথেষ্ট।
কেননা এই আয়াতের প্রথম অংশে বলা হয়েছে তিনি আরশে আরোহন করেছেন এবং নারীদের শেষে বলেছেন তিনি অবস্থানের সবার সাথে থাকেন। অর্থাৎ আল্লাহর কুদরত বা ক্ষমতা এত সর্ববৃত্তিতে তিনি আরশে থেকেই সবকিছু শুনেন দেখেন এবং সবার কাছে অবস্থান করেন।
আমাদের দেশে সাধারণ একটি অফিসের ম্যানেজার যদি মাত্র অল্প ক্ষমতা পেয়ে কিছু সংখ্যক সিসিটিভি লাগিয়ে উনার অফিসে বসেই সবকিছু প্রত্যক্ষ করতে পারেন এবং সবাইকে দেখতে পারেন, তাহলে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা এত বিশাল ক্ষমতা নিয়ে এবং ফেরেশতাদের এত বিশাল বাহিনী তৈরি করে কেন আরশে বসে সবকিছু দেখতে শুনতে ও কন্ট্রোল করতে পারবেন না??
৬/ যখন তিনি তার সাথীকে বললেন-ভয় পেয়োনা, নিশ্চয় আমাদের সাথে আল্লাহ আছেন
– সূরা হাদীদ-৪০।
৭/কখনো তিন জনের মাঝে এমন কোন কথা হয়না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন, এবং কখনও পাঁচ জনের মধ্যে এমন কোনও গোপন কথা হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন। এমনিভাবে তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি, তারা যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাদের সঙ্গে থাকেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে অবহিত করবেন তারা যা কিছু করত। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু জানেন। -সূরা মুজাদালা-৭।
৮/ আল্লাহ তায়ালার কুরসী আসমান জমিন ব্যাপৃত ।
সূরা বাকারা-২৫৫।
যার চেহারা বা কোর সিটি সমস্ত আসমান জমিনকে বেষ্টন করে আছে তাঁর জন্য সবকিছু দেখা এবং আর সকলের কাছে অবস্থান করা খুব সহজ ব্যাপার।








