আল্লাহ কি সর্বত্র বিরাজমান? উত্তর হল আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান নন।

কেননা যিনি এক স্থান থেকেই সবকিছু কন্ট্রোল করতে পারেন তাঁর সর্বত্র চলে আসার দরকার নেই। “আল্লাহ ‘আরশে’ আছেন। এবং তার চেয়ার বা কুরসি সমস্ত আসমান ও জমিনকে বেস্টন করে আছে।” – বাকারা। এবং সেখানে “তিনি সারাক্ষণ কোন না কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে রত আছেন এবং তার বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন হয় না”।
– আর রহমান।
 আল্লাহ আরশের ওপর সমাসীনঃ
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের অর্থাৎ সালফে সালেহীন  বা সালাফদের আকীদা অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা তাঁর মহিমার উপযুক্তভাবে সাত আসমানের উপরে আরশের ওপর সমুন্নত বা সমাসীন আছেন -সুরা ত্বা-হা, আয়াত ৫।
 সশরীরে সর্বত্র বিরাজমান ননঃ
আল্লাহর সত্তা (ফিজিক্যালি বা শরীরিকভাবে) তিনি পৃথিবীর সব জায়গায়  বিরাজমান নন।
(পৃথিবীর বহু জায়গায় ময়লা আবর্জনা বা নিচ স্থান খারাপ আসলেই পরিবেশ বিদ্যমান। আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান এই কথা যারা বিশ্বাস করে তারা কি আল্লাহকে এই নোংরা স্থানেও নিয়ে যেতে চায়?)
আল্লাহ তাআলা সময় ও স্থানের সীমার ঊর্ধ্বে, তিনি কোনো নির্দিষ্ট সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নন।
 জ্ঞান ও কুদরত সর্বত্র পরিব্যাপ্তঃ
আল্লাহ তাআলা সশরীরে সর্বত্র না থাকলেও, তাঁর অসীম জ্ঞান  বা ইলম, ক্ষমতা বা কুদরত, দৃষ্টি ও শ্রবণ দিয়ে তিনি পুরো সৃষ্টিজগৎকে বেষ্টন করে আছেন। কোনো কিছুই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়
-বাকারা- ২৫৫!

 আল্লাহ বান্দার নিকটবর্তীঃ
তিনি আরশে থাকলেও পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত যেমন—সুরা আল-কাফ ১৬ বা সুরা আল-মুজাদালা ৭  অনুসারে তাঁর ইলম ও কুদরতের মাধ্যমে তিনি বান্দার অতি নিকটবর্তী।

 নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক হলেন আল্লাহ যিনি আকাশমন্ডলী আর পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশে সমুন্নত হয়েছেন বা আরোহণ করেছেন। তিনি যাবতীয় বিষয়াদি পরিচালনা করেন। তাঁর ছাড়া ছাড়া সাফায়াত বা সুপারিশ করার কেউ নেই। ইনিই হলেন আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক। কাজেই তোমরা তাঁরই ‘ইবাদাত কর, তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না?
– ইউনুস- ০৩!
 নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি আরশের উপর উঠেছেন। তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে দেন, তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। আর সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তারই হুকুমের অনুগত, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন।জেনে রাখ, সৃজন ও আদেশ তারই। সৃষ্টিকুলের পালনকর্তা আল্লাহ কত বরকতময়।
-আরাফ- ৫৪!
  আল্লাহই উর্ধ্বদেশে আকাশমন্ডলী স্থাপন করেছেন স্তম্ভ ব্যতীত, তোমরা এটা দেখছ। অতঃপর তিনি “”আরশে সমাসীন”” হলেন এবং সূর্য ও চাঁদকে নিয়মাধীন করলেন; প্রত্যেকে নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত আবর্তন করে, তিনি সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন এবং নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন যাতে তোমরা তোমাদের রবের সাথে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে নিশ্চিত বিশ্বাস করতে পার।
– আর রাদ-০৩!
 তারা ভয় করে তাদের “”উপরস্থ আসমানে থাকা””  তাদের রবকে এবং তাদেরকে যা আদেশ করা হয় তারা তা করে।
– নাহল- ৫০!

দয়াময় আল্লাহ্ তা’আলা আরশের উপর উঠেছেন ।
– ত্বহা-০৫।
আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করেছেন তিনি আরশে উঠেছেন । এর উপর বিশ্বাস রাখা ফরয। তিনি কিভাবে আরশে উঠেছেন সেটার ধরণ আমাদের জানা নেই। এটা ঈমান বিল গায়েবের অংশ।
 তিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেন; তারপর তিনি “”আরশের উপর উঠলেন””। তিনিই রাহমান, সুতরাং তাঁর সম্বন্ধে যে অবহিত তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।
– সূরা আল ফোরকান- ৫৯।
 . আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু’য়ের অন্তর্বর্তী সব কিছু সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে। তারপর তিনি “আরশের উপর উঠেছেন””। তিনি ছাড়া তোমাদের কোন অভিভাবক নেই এবং সুপারিশকারীও নেই; তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্ৰহণ করবে না?
– সুরা আস্ সাজদাহ- ০৪।

 তিনি ছয় দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি “আরশের উপর উঠেছেন”। তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়।(/
আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন- তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা।
সূরা হাদীদ- ০৪।
অন্য কথায় তিনি শুধু সামগ্রিক জ্ঞানের অধিকারী নন, খুঁটি-নাটি বিষয়েও জ্ঞানের অধিকারী। এক একটি শস্যদানা ও বীজ যা মাটির গভীরে প্রবিষ্ট হয়, এক একটি ছোট পাতা ও অংকুর যা মাটি ফুড়ে বের হয়, বৃষ্টির এক একটি বিন্দু যা আসমান থেকে পতিত হয় এবং সমুদ্র ও খাল-বিল থেকে যে বাষ্পরাশি আকাশের দিকে উত্থিত হয়, তার প্রতিটি মাত্ৰা তার জানা আছে। – ইবন কাসীর
 তোমরা কি এ থেকে নিৰ্ভয় হয়েছ যে, যিনি আসমানে রয়েছেন(১) তিনি তোমাদেরকে সহ যমীনকে ধ্বসিয়ে দেবেন, অতঃপর তা হঠাৎ করেই থর থর করে কাপতে থাকবে?
-সূরা মূলক- ১৬।
এর দ্বারা একথা বুঝায় যে, আল্লাহ উপরে থাকেন। এর সপক্ষে হাজারেরও বেশী দলীল-প্রমাণাদি রয়েছে। মু’আবিয়া ইবন হাকাম আস-সুলামী বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এক দাসীকে খুব জোরে চড় মেরেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাজটাকে নেহায়েত বড় অন্যায় হয়েছে বলে প্ৰকাশ করলেন, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি তাকে স্বাধীন করে দেব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে এস। আমি দাসীটিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে আসলে তিনি দাসীকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ কোথায়? সে বলল, আসমানে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার জিজ্ঞেস করলেন, আমি কে? সে বলল, আপনি আল্লাহর রাসূল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, একে মুক্ত করে দাও, এ ঈমানদার। -আবু দাউদ: ৩২৮২।

 অতঃপর তিনি আরশের উপর ক্ষমতাশীল হোন। সূরা হাদীদ-৩।
মূলত আল্লাহ আরশে বসেই সবকিছু দেখেন এবং শোনেন এবং সবকিছু কন্ট্রোল করতে পারেন। আর এটাই মহান সৃষ্টিকর্তার অসীম ক্ষমতার একটি বড় প্রমাণ।
আল্লাহ তার ইলম বা জ্ঞান ও কুদরত বা ক্ষমতা দিয়ে সকল সৃষ্টির নিকটেই থাকেন।
যেমন আল্লাহ বলেন-

১/ “আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে।
-সূরা বাকারা-১৮৬।

২/ আর আমি বান্দার গলদেশের শিরার চেয়েও বেশি নিকটবর্তী।
-সূরা কাফ-১৬।

৩/ অতঃপর এমন কেন হয়না যে, যখন প্রাণ উষ্ঠাগত হয়। এবং তোমরা তাকিয়ে থাক। এবং তোমাদের চেয়ে আমিই তার বেশি কাছে থাকি। কিন্তু তোমরা দেখতে পাওনা”
“সূরা ওয়াকিয়া-৮৩,৮৪,৮৫”।

৪/ “আর পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। সুতরাং তোমরা যে দিকেই মুখ ফেরাও, সে দিকেই আল্লাহর চেহারা (দিশাহ বা সম্মুখভাগ )। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞ।”)
-সূরা বাকারা-১১৫।

৫/ আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন- তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা।
সূরা হাদীদ-০৪।
দেখুন, আল্লাহ যে আরশে থেকেই সবকিছু দেখেন শুনেন এবং সবার নিকটে অবস্থান করেন সূরা হাদীদের এই চার নাম্বার আয়াত এই দলিলের জন্য যথেষ্ট।
কেননা এই আয়াতের প্রথম অংশে বলা হয়েছে তিনি আরশে আরোহন করেছেন এবং নারীদের শেষে বলেছেন তিনি অবস্থানের সবার সাথে থাকেন। অর্থাৎ আল্লাহর কুদরত বা ক্ষমতা এত সর্ববৃত্তিতে তিনি আরশে থেকেই সবকিছু শুনেন দেখেন এবং সবার কাছে অবস্থান করেন।
আমাদের দেশে সাধারণ একটি অফিসের ম্যানেজার যদি মাত্র অল্প ক্ষমতা পেয়ে কিছু সংখ্যক সিসিটিভি লাগিয়ে উনার অফিসে বসেই সবকিছু প্রত্যক্ষ করতে পারেন এবং সবাইকে দেখতে পারেন, তাহলে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা এত বিশাল ক্ষমতা নিয়ে এবং ফেরেশতাদের এত বিশাল বাহিনী তৈরি করে কেন আরশে বসে সবকিছু দেখতে শুনতে ও কন্ট্রোল করতে পারবেন না??

৬/ যখন তিনি তার সাথীকে বললেন-ভয় পেয়োনা, নিশ্চয় আমাদের সাথে আল্লাহ আছেন
– সূরা হাদীদ-৪০।

৭/কখনো তিন জনের মাঝে এমন কোন কথা হয়না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন, এবং কখনও পাঁচ জনের মধ্যে এমন কোনও গোপন কথা হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন। এমনিভাবে তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি, তারা যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাদের সঙ্গে থাকেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে অবহিত করবেন তারা যা কিছু করত। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু জানেন। -সূরা মুজাদালা-৭।

৮/ আল্লাহ তায়ালার কুরসী আসমান জমিন ব্যাপৃত ।
সূরা বাকারা-২৫৫।
যার চেহারা বা কোর সিটি সমস্ত আসমান জমিনকে বেষ্টন করে আছে তাঁর জন্য সবকিছু দেখা এবং আর সকলের কাছে অবস্থান করা খুব সহজ ব্যাপার।

সফরের নামাজ বা ‘সালাতুত কসর’  এর পরিপূর্ণ মৌলিক বিধান। কসরের নামাজের দূরত্ব কত কিলোমিটার, কতদিন নাজ কসর করা যায় ইত্যাদি..

✅✅ “সফরের নামাজ” “সালাতুল কসর” এর পূর্ণ বিবরণঃ
“আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না।” -বাকারা ১৮৫ !
এটি পবিত্র কুরআনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সান্ত্বনাদায়ক ঘোষণা।
যেকোন সফর একটি কষ্টকর ও টেনশনের বিষয়। তাই আল্লাহ সফরে নামাজকে ও সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ।
👉👉কতটুকু দূরত্বে সফর করলে সালাতুল কসর শুরু করতে হবে? সফরের নামাজে কেন সুন্নত পড়া যাবে না। সকল ভ্রমণেই কি নামাজ কসর বা সংক্ষিপ্ত করতে হবে? ইত্যাদি সকল প্রশ্নের জবাব তথা সফরের নামাজের সকল মৌলিক বিষয় এখানে তুলে ধরা হলো-
{বিঃদ্রঃ যেহেতু সফরের নামাজ এর বিষয়ে এখানে সবিস্তারে বিশুদ্ধ দলিল সহ তুলে ধরা হবে, সেহেতু আর্টিকেলটা লম্বা হবে। জানার জন্য অবশ্যই ধৈর্য ধরে পড়ুন।}
✅✅ আধুনিক যুগের এই দৈনন্দিন ব্যস্ততায় প্রতিনিয়ত চাকরি/ব্যবসা ইত্যাদি প্রয়োজনে আমাদের সফর করতে হয়। তাই সফর এবং কসরের শরীয়া বিধিবিধান জেনে রাখা ফরজ ইবাদতের মতই ফরজ।
👉👉ভ্রমণ বা সফর অবস্থায় ৪ রাকাত বিশিষ্ট ফরজ নামাজগুলোকে যেমন যোহর, আসর ও এশাকে ২ রাকাত পরে পড়াই হলো সালাতুল কসর বা সংক্ষিপ্ত নামাজ।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এর সকল স্কলার আলেমগণ একমত যে, সফরে মুসাফির অবস্থায় ইচ্ছাকৃত ৪ রাকাত পড়লে আল্লাহর হুকুম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর সুন্নত অবজ্ঞা করার জন্য গুনাহ হবে এবং নামাজ পুনরায় পড়তে হবে।
ফজর ২ রাকাত, মাগরিব ৩ রাকাত এবং বিতরের নামাজে (এক রাকাআত থেকে সর্বোচ্চ ১১ রাকাত পর্যন্ত পড়া যায়) কোনো কসর নেই এগুলো যথারীতি পূর্ণ পড়তে হবে।
উল্লেখ্য যে, ভিতরের নামাজ একটি নফল নামাজ এবং এটি সফরের না পড়লেও ইনশাল্লাহ কোন গুনাহ হবে না। (শুধুমাত্র হানাফি মাজহাবের একটা অংশ বিতরের নামাজকে ওয়াজিব বলেছেন আর বাকি সকল মাযহাবে এটি নফল)
চার রাকাতবিশিষ্ট ফরজ নামাজ দুই রাকাত কসর বা সংক্ষিপ্ত পড়তে হবে। আর এইভাবে সংক্ষেপে নামাজ পড়ার ভেতর আল্লাহ তাআলা কল্যাণ রেখেছেন। আর কসর নামাজ সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে নেকি কম হবে, এই সন্দেহ পোষণ করা শয়তানের বিরাট বড় ধোঁকা। কেননা সফরে নামাজকে বছর বা সংক্ষিপ্ত করার কথা আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম জীবনে কোনদিন সফরে পূর্ণ নামাজ পড়েননি। অর্থাৎ ভ্রমনে নামাজ সংক্ষিপ্ত করে দুই রাকাত পড়া এবং সুন্নত না পড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যখন জমিনে সফর করবে, তখন তোমাদের জন্য নামাজের কসর করায় কোনো আপত্তি নেই। -সুরা নিসা, আয়াত: ১০১।
উল্লেখ্য যে, কসরের নামাজ মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য সদকা এবং এই সদকা অস্বীকার করলে আল্লাহর শানে বেয়াদবি করার শাস্তি হবে।
✅✅ সফর অবস্থায় কসর বা সংক্ষিপ্ত নামাজ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সদকা। প্রকৃত ঈমানদার আল্লাহ প্রদত্ত সদকা গ্রহণ করে তার সন্দেহবাদী সেই সদকা বর্জন করে । সফরে গিয়ে নামাজ গোসল করা ঐচ্ছিক কোন বিষয় নয় বরং এটি অবধারিত বিষয়। অর্থাৎ কসর করতেই হবে।
এ ব্যাপারে হাদিস হলো-
👉ইয়ালা ইবনে উমাইয়াহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব রা. কে কোরআনের কসর সংক্রান্ত আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “এটি আল্লাহর একটি সাদাকা বা দান, যা তিনি তোমাদের দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর সাদাকা কবুল করো।”
–সহিহ মুসলিম -১৪৪৬।
👉ইয়া’লা ইবনু উমাইয়্যাহ রা. সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ’উমার উবনুল খাত্তাব রা. কে জিজ্ঞেস করলাম, আজকাল লোকেরা যে সালাত ক্বসর অর্থাৎ নামাজকে সংক্ষিপ্ত করে এ বিষয়ে আপনার অভিমত কি?
কেননা মহাপরাক্রশালী আল্লাহ বলেছেন, ‘যদি তোমরা কাফিরদের হামলার আশংকা করো তাহলে সালাত ক্বসর হিসেবে আদায় করতে পারো’ (৪: ১০১)।
কিন্তু বর্তমানে আশংকা দূরীভূত হয়ে গেছে। ’উমার রা. বললেন, তুমি যে ব্যাপারে আশ্চর্যবোধ করছো, আমিও তাতে আশ্চর্যবোধ করেছিলাম। অতঃপর আমি এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাঃ -কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছেনঃ এটি একটি সাদাকা, যা মহান আল্লাহ তোমাদেরকে দান করেছেন। সুতরাং তোমরা তাঁর অনুদান গ্রহণ করো। -আবু দাউদ ১১৯৯!
এখন চিন্তা করে দেখুন, আপনি যদি কোন অভাবী ব্যক্তি কে কোন কিছু সদকা করেন আর সে যদি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে আপনি তাকে কেমন চোখে দেখবেন? বরং আপনি পরবর্তী সময়কার বিরাট সমস্যা ও সাহায্য করবেন না।
আল্লাহ আপনাকে এবাদত সহজ করার জন্য সাদকা হিসাবে সালাতুল কসর দান করেছেন আর আপনি তা অস্বীকার করলে বা সন্দেহ করলে অবশ্যই আল্লাহ রাগান্বিত হবেন।
✅✅ রাসুলুল্লাহ সা. সফরে সবসময় চার রাকাত বিশিষ্ট ফরজ নামাজগুলো দুই রাকাত করে পড়েছেন। আবু বকর, উমর ও উসমান রা. -ও তাঁদের খেলাফতকালে সফরে দুই রাকাতই পড়েছেন। সফর অবস্থায় নবী সাঃ ৪ রাকাত নামাজ পড়েছেন এমন কোন দলিল নেই ; সব সময় চার রাকাত নামাজকে দুই রাকাত পড়তেন এবং সুন্নত পড়তেন না।
তাই সফরে কোনভাবেই পূর্ণ নামাজ পড়া জায়েজ নেই এবং সুন্নত নফল নামাজ পড়ার কোন দলিল নেই।
(তবে হ্যাঁ ফজরের দুই রাকাত সুন্নত এবং তাহাজ্জুদের নামাজ অর্থাৎ বিতরের নামাজ তিনি সফর অবস্থায় পড়েছেন।)
👉👉 ঈসা ইবনু হাফস রহ. হতে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক পথে ইবনু উমার রা. এর সাথে ছিলাম। তিনি আমাদেরকে নিয়ে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেন।
অতঃপর মুখ ফিরিয়ে কিছু লোককে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করেন, এরা কি করছে?
আমি বললাম, নফল অর্থাৎ সুন্নত সালাত আদায় করছে। তিনি বললেন, সফরে নফল/সুন্নত সালাত আদায় প্রয়োজন মনে করলে আমি ফারয সালাত পুরো চার রাক’আতই আদায় করতাম। হে ভাতিজা! আমি রাসূলুল্লাহ সাঃ এর সাথে সফর করেছি। তিনি মহা মহীয়ান আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়া পর্যন্ত দু’ রাক’আতের বেশি আদায় করেননি। আর আমি আবূ বকর রা. এর সফরসঙ্গী হয়েছি। তিনিও মহা মহীয়ান আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়া পর্যন্ত দু’ রাক’আতের অধিক আদায় করেননি। আমি উমার রা. এর সফরসঙ্গী হয়েছি। তিনিও মহামহিম আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়া পর্যন্ত দু’ রাক’আতের অধিক আদায় করেননি। পরে আমি উসমান রা. এরও সফরসঙ্গী হয়েছি। তিনিও মহা মহীয়ান আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়া পর্যন্ত দু’ রাক’আতের অধিক আদায় করেননি। কেননা মহা মহীয়ান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ নিহিত আছে’
–আল-আহযাব : ২১।
-আবু দাউদ ১২২৩; বুখারী ১১০১, ১১০২; নাসাঈ ১৪৫৭; ইবনে মাজাহ ১০৭১।
✅✅ কতদিন পর্যন্ত সালাতুল কসর বা সফরের নামাজ কসর করা যাবে?
এই ব্যাপারে আমরা কোন মানুষের বা আলেমের ফতোয়া বা মত না নিয়ে সরাসরি হাদিসের দিকে লক্ষ্য করি। বিশুদ্ধ হাদিসের সর্বোচ্চ ২২ দিন পর্যন্ত সালাত কসর করার প্রমাণ পাওয়া যায়।
কোন কোন আলেম ৪ দিন কে নিরাপদ বলেছেন, আবার ৩০/৪০ দিন ও কেউ কেউ বলেছেন। এসব দলীল নয়, বরং মত।
👉👉 আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সা. এক সফরে ১৯ দিন পর্যন্ত অবস্থানকালে নামাজকে কসর বা সংক্ষিপ্ত করেছেন। তাই সাহাবিগণও কোনো সফরে ১৯ দিন পর্যন্ত অবস্থান করলে কসর করতেন, এর বেশি হলে পূর্ণ নামাজ আদায় করতেন
–সহিহ বুখারী।
👉👉ইবনু আব্বাস রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাঃ মক্কায় ১৭ দিন অবস্থানকালে সালাতকে ক্বসর করেছেন। ইবনু আব্বাস রাযি: বলেন, কোন ব্যক্তি কোথাও সতের দিন অবস্থান করলে তাঁকে সালাত ক্বসর করতে হবে। এর চেয়ে বেশি দিন অবস্থান করলে, সে সালাত পুরো আদায় করবে।
-আবু দাউদ ১২৩০/ বুখারী ১০৮০।
👉👉জাবির ইবনু আবদুল্লাহ রাঃ সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবূকে ২২ দিন অবস্থানকালে সালাত ক্বসর করেছেন।
–আবু দাউদ ১২৩৫।
✅✅ প্রথম যখন নামাজ ফরজ করা হয়েছিল তখন সকল নামাজ দুই রাকাত ছিল। আর সফরে সেই প্রাথমিক অবস্থা কি অনুসরণ করা হয়।
👉👉সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, ইসলামের শুরুতে মুকিম (স্থানীয়) ও মুসাফির উভয় অবস্থায়ই নামাজ ২ রাকাত ফরজ ছিল। পরবর্তীতে মুকিম অবস্থায় নামাজ বাড়িয়ে ৪ রাকাত করা হয় এবং সফরের নামাজ ২ রাকাতই বহাল রাখা হয়।
✅✅ সফরের নামাজের দূরত্বঃ অর্থাৎ কতটুকু দূরত্বে গেলে নামাজ সংক্ষিপ্ত বা কসর করতে হবে?
এখানে সর্বপ্রথম উল্লেখ্য যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম দূরত্বকে প্রাধান্য দিয়ে সালাতে কছর করেননি বরং সফরকে প্রাধান্য দিয়ে সালাতে বছর করেছেন।
উল্লেখ্য যে মানুষ যখন মনে করবে আমি সফরে বের হচ্ছি, তখন বাড়ি থেকে বের হলে যেখানেই নামাজের সময় হবে সেখানেই সে কসর করবে। তা বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে হোক কিংবা দৃষ্টি সীমার মধ্যেই হোক।
এক্ষেত্রে সফর অবশ্যই নিজের স্থায়ী বা অস্থায়ী আবাসস্থল যেমন কর্মক্ষেত্র, ছাত্রাবাস ইত্যাদি ছাড়া অন্য কোথাও হতে পারে এবং যেকোনো উদ্দেশ্যে হতে পারে। সেই সফর হতে পারে আনন্দ ভ্রমন, পরিবার পরিজন নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়া, চাকরী/ব্যবসা বা যুদ্ধে/ জিহাদ যাওয়া; অর্থাৎ বৈধ যে কোন সফরে সালাতুল কসর করবে।
স্থলপথ, নৌপথ, আকাশপথ ও উঁচু-নিচু পথ সব ক্ষেত্রেই একই বিধান সমভাবে প্রযোজ্য।
বর্তমানের কিলোমিটার বা মাইলের বিষয়টি কোরআন ও হাদিস দ্বারা বা সাহাবিদের সুনির্দিষ্ট কোনো রেওয়াতের মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়নি। দূরত্বটা মুসতাহিদ (গবেষক) আলেমদের গবেষণা বা ইজতিহাদের মাধ্যমে ওলামে কেরাম বলেছেন। এটা কেউ কেউ ৪৮ কিলোমিটার, ৫৩ কিলোমিটার, ১৫ কিলোমিটার,কেউ ৩ মাইলের কথা বলেছেন।
দূরত্বের বিষয় এখানে অনেক বক্তব্য রয়েছে। যে মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে মূলত কসরের বিধান প্রযোজ্য হবে, সেটা হলো- এক এলাকা থেকে আরেক এলাকা যাবেন, যেটা মূলত মানুষের কাছে সফর বলা হয়ে থাকে। সফরের জায়গায় অতিক্রম করলেই মুসাফির হবে আর তখনই নামাজ কসর করবে! সফর যেখানে পাওয়া যাবে, কসর সেখানে জায়েজ।
হতে পারে আপনি ঢাকা থেকে গাজীপুর বা টাঙ্গাইল চলে গেলেন, এটা সফরের অন্তর্ভুক্ত হবে। এমনটি যদি হয়, তাহলে তিনি মুসাফির হবেন এবং তার জন্য কসর জায়েজ।
মোটকথা বোখারীর হাদিস অনুসারে মদিনা থেকে জুল হুজাইফা অর্থাৎ ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার অতিক্রম করলেই আপনি মুসাফির।
নিচে সফরের গুরুত্ব সংক্রান্ত বিশুদ্ধ হাদিস গুলো উল্লেখ করা হলো–
👉👉আনাস ইবনু মালিক রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লা সাঃ এর সঙ্গে মদিনায় যুহরের সালাত নামাজ ৪ রাকা’আত আদায় করেছি এবং যুল-হুলাইফায় আসরের সালাত দু’রাকা’আত আদায় করেছি। মদিনার কেন্দ্রস্থল থেকে জুল হুলাইফার কেন্দ্রস্থল পর্যন্ত দূরত্ব সর্বোচ্চ ১৫ কিলোমিটার এবং মদিনার সীমান্ত থেকে জুল হুলাইফা’র সীমান্তের দূরত্ব ৭-৯ কিলোমিটার।
এই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে কেউ ১৫ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করলেই নামাজ কছর বা সংক্ষিপ্ত করবেন।
-বোখারী,হাদীস নং-১০৪৮, মুসলিম -১৪৫৪.ইফা (প্রকাশনীর জন্য যে কোন হাদিসের নাম্বার এদিক সেদিক হতে পারে)।
👉👉 ইয়াহিয়া ইবনু ইযায়ীদ আল হুনাঈ রহঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক রাঃ এর নিকট সালাত কসর করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, রাসুলূল্লাহ সাঃ যখন সফরের উদ্দেশ্যে তিন মাইল অথবা (রাবী শুবার সন্দেহ) তিনি ৩ ফারসাখ পথ অতিক্রম করতেন, তখন দু’রাকআত পড়তেন।
মুসলিম-১৪৫৬।আবু দাউদ- ১২০১
{ ১ ফারসাখ = ৩ মাইল}
👉👉 ইবনে ওমর রা. এবং ইবনে আব্বাস রা. চার ‘বারীদ’ অর্থাৎ ১৬ ফারসাখ তথা ৪৮ মাইল/৮১ কিলোমিটার দূরত্বের সফরে নামাজ কসর করতেন এবং রোজা ভাঙতেন।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাকসীরিস সালাত, পরিচ্ছেদ-৪।
এটি নবীঃ সাঃ এর আমল নয়;এটি ইবনে ওমর রা. এবং ইবনে আব্বাস রা.এর আমল।
এবং আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেনঃ “নিশ্চই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।
–সূরা আহযাবঃ ২১১।
👉👉 আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আমরা কি মক্কা থেকে আরাফাত বা মিনা যাওয়ার সময় কসর করব?” তিনি উত্তরে বলেছিলেন:
“না, বরং তোমরা যখন মক্কা থেকে উসফান, জেদ্দা অথবা তায়েফের সমপরিমাণ দূরত্বে সফর করবে তখন কসর করবে। আর ইমাম মালিক রহ. বলেন, এই দূরত্ব হলো চার বারীদ বা ৪৮ মাইল।”
সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হাদীস নম্বর: ৫৩৯৫। হাদিসটি দূর্বল।
{ইসলামী যুগের প্রাচীন আরোহণের গতি ও দূরত্বের একককে বর্তমানে কিলোমিটারে রূপান্তর করলে এই হিসাবটি দাঁড়ায়:
১ বারীদ = ৪ ফারসাখ
১ ফারসাখ = ৩ মাইল
সুতরাং, ৪ বারীদ = (৪ × ৪) = ১৬ ফারসাখ, যা (১৬ × ৩) = ৪৮ মাইলের সমতুল্য।}
✅✅ সফরে নামাজ জমা করা সুন্নত।
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাঃ কে দেখেছি, সফরে যখনই তাঁর ব্যস্ততার কারণ ঘটেছে, তখন তিনি মাগরিবের সালাত বিলম্বিত করেছেন, এমন কি মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাঃ সফরের ব্যস্ততার সময় অনুরূপ করতেন। অপর এক সূ্ত্রে সালিম রহঃ বলেন, ইবনু উমর রাঃ মুযদালিফায় মাগরিব ও ইশা একত্রে আদায় করতেন। সালিম রহঃ আরও বলেন, ইবনু উমর রাঃ তাঁর স্ত্রী সাফীয়্যা বিনত আবূ উবাইদ এর দুঃসংবাদ পেয়ে মদিনা প্রত্যাবর্তনকালে মাগরিবের সালাত বিলম্বিত করেন। আমি তাঁকে বললাম, সালাতের সময় হয়ে গেছে। তিনি বললেন, চলতে থাক। আমি আবার বললাম, সালাত? তিনি বললেন, চলতে থাক। এমন কি এ ভাবে দু’ বা তিন মাইল অগ্রসর হলেন।
এরপর নেমে সালাত আদায় করলেন। পরে বললেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সফরের ব্যস্ততার সময় এরূপভাবে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে দেখেছি। আবদুল্লাহ (রাঃ) আরো বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছি, সফরে যখনই তাঁর ব্যস্ততার কারণ ঘটেছে, তখন তিনি মাগরিবের সালাত (দেরী করে) আদায় করেছেন এবং তা তিন রাকা’আতই আদায় করেছেন। মাগরিবের সালাম ফিরিয়ে কিছু বিলম্ব করেই ইশার ইকামাত দেওয়া হত এবং দু’ রাকা’আত আদায় করে সালাম ফিরাতেন। কিন্তু ইশার পরে গভীর রাত না হওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করতেন না।
-বোখারী- বাব/ পরিচ্ছেদ-৭০০!
✅✅ সফরকালে ফরয সালাতের আগে ও পরে সুন্নত/নফল সালাত আদায় করবে না।
ইবনু উমর রাঃ একবার সফর করেন এবং বলেন, আমি নবী সাঃ এর সাহচর্যে থেকেছি, সফরে তাঁকে সুন্নত/নফল সালাত আদায় করতে দেখিনি এবং আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেনঃ “নিশ্চই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।
–সূরা আহযাবঃ ২১১
–বোখারী- বাব/পরিচ্ছেদঃ ৭০৫।।
✅✅ আয়িশা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুকিম ও মুসাফির অবস্থায় সালাত দু’দু রাক’আত ফরজ করা হয়েছিল। পরে সফরের সালাত ঠিক রাখা হল কিন্তু মুকিমের সালাতে বৃদ্ধি করা হল।
—মুসলিম- ১৪৪৩।
✅✅ মুকিম অবস্থার ৪ রাকাত নামাজ চার রাকাত এবং মুসাফির বা সফর অবস্থায় চার রাকাত নামাজকে দুই রাকাত এবং ভয়ের অবস্থায় সেই চার রাকাত নামাজকে মাত্র
১ রাকাত নামাজ পড়বে।
👉👉 ইবনু আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের নবীর ভাষায় মুকীমের জন্য চার রাকআত মুসাফিরের জন্য দু’রাকআত এবং শংকিত অবস্থায় এক রাক’আত সালাত ফরয করেছেন।
— মুসলিম- ১৪৪৮।
✅✅ ইবনু আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের নবীর ভাষায় মুসাফিরের উপর দু-রাক’আত, মুকীমের উপর চার রাকআত এবং ভয়ের অবস্থায় এক রাকআত সালাত ফরয করেছেন।
মুসলিম- ১৪৪৯!
✅✅ সফর অবস্থায় চার রাকাত নামাজ কে দুই রাকাত পড়বে এবং সুন্নত/ নফল কিছুই করবে না। সুন্নত/ নফল সহ সকল প্রকার নামাজ পড়া নিষিদ্ধ এবং সুন্নত বহির্ভূত একটি কাজ।
ইবনু উমর ইবনুল খাত্তাব তাঁর পিতা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কার রাস্তায় আমি ইবনু উমরের সহচর হলাম। তিনি আমাদের যুহরের সালাত দু’ রাক’আত পড়ালেন। এরপর তিনি সামনে অগ্রসর হলেন, আমরাও তাঁর সঙ্গে অগ্রসর হলাম। তারপর তিনি তাঁর মনযিলে এসে বসলেন এবং আমরাও তাঁর সঙ্গে বসলাম। এরপর যে স্থানে তিনি সালাত আদায় করেছিলেন, সে স্থানের প্রতি দৃষ্টি পড়লে তিনি দেখলেন, কিছু লোক দাঁড়ানো। তিনি বললেন, তারা সেখানে কি করছে? আমি বললাম, তারা নফল সালাত আদায় করছে তিনি বললেন, আমি যদি নফল আদায় করতাম তাহলে আমি আমার সালাত (ফরয)-কেই পূর্ণ করতাম।
হে ভ্রাতুষ্পুত্র! আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে সফরে থেকেছি। কিন্তু ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত আদায় করেননি। আমি আবূ বকর (রাঃ) এর সঙ্গেও থেকেছি, তিনিও তাঁর ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত আদায় করেননি। আমি উমর (রা) এর সঙ্গেও ছিলাম। তিনিও ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত পড়েননি। আমি উসমান (রাঃ) এরও সঙ্গে ছিলাম। তিনিও ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত আদায় করেননি। আর আল্লাহ তাআ’লা বলেছেন, “নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ।”
মুসলিম- ১৪৫২!
✅✅ ইবনু আসিম রহঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ি। ইবনু উমর রাঃ আমাকে দেখতে আসেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর কাছে সফরে সুন্নাত সালাত পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, আমি তো রাসুলুল্লাহ সাঃ এর সঙ্গে সফরে ছিলাম, কিন্তু তাকে কখনো সুন্নাত আদায় করতে দেখি নি।
যদি আমি সুন্নাত পড়তাম তাহলে আমি ফরয সালাতকেই পূর্ণভাবে আদায় করতাম। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে রয়েছে তোম্যদের জন্য উত্তম আদর্শ।”
মুসলিম- ১৪৫৩।
✅✅ সকল অবস্থায় নামাজ জমা করে ওয়াক্তের নামাজ এক ওয়াক্ত পড়ে পড়া সুন্নত।
👉👉আবুত-তুফাইল ’আমির ইবনু ওয়াসিলাহ (রহ.) সূত্রে বর্ণিত, মু’আয ইবনু জাবাল (রা.) তাদেরকে অবহিত করেন যে, তাবুক যুদ্ধে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে বের হন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহর ও ’আসর সালাত একত্রে এবং মাগরিব ও ইশা সালাত একত্রে আদায় করেন। এদিন তিনি সালাত বিলম্বে আদায় করেন। (যুহর বিলম্ব করে) যুহর ও আসর একত্রে আদায় করেন। অতঃপর তিনি আবার (তাঁবুতে) প্রবেশ করেন। তারপর বেরিয়ে মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করেন।
–আবু দাউদ ১২০৬; তিরমিজি ৫৫৩; নাসাঈ ৫৮৬।
👉👉 ঘরে থাকা অবস্থায়ও প্রয়োজনে ২ ওয়াক্ত নামাজ জমা করে পড়া যায়–।
ইবনু আবূ উমার (রহঃ) ….. ’আবদুল্লাহ ইবনু শাকীক আল উকায়লী (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) কে বলল-সালাতের সময় হয়েছে, সালাত আদায় করুন। কিন্তু তিনি চুপ করে রইলেন। সে আবার বলল- সালাত আদায় করুন। তিনি এবারও চুপ করে থাকলেন। লোকটি পুনরায় বলল- সালাতের সময় হয়েছে, সালাত আদায় করুন। এবার আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেনঃ তুমি আমাকে সালাত সম্পর্কিত ব্যাপারে শিখাচ্ছ? আমরা তো রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময়ে দু’ ওয়াক্ত সালাত একসাথে আদায় করতাম। ।
–ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৫০৭, ইসলামীক সেন্টার. ১৫১৬!!
✅✅ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ঃ
সফর অবস্থায় অবশ্যই ব্যাগের কোনায় এক টুকরা পবিত্র মাটি রাখুন ; যাতে পানির অভাব হলে তায়ামুম করা যায়।
সফর অবস্থায় আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসয়ালা হলো- অজু অবস্থায় মোজা পরিধান করলে ওযু ভঙ্গ হওয়ার পর থেকে বাড়িতে থাকা অবস্থায় একদিন এবং সফরে তিন দিন বা 72 ঘন্টা পর্যন্ত মজার উপর মাসেহ করা যায়।
✅✅ এখানে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুরুষ এবং মহিলাদের সফরে কসরের নামাজের নিয়ম একই। তবে –
আবূ হুরায়রা রাঃ বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু সাঃ বলেছেনঃ কোন মুসলিম মহিলার জন্য সাথে তার কোন মাহরাম পুরুষ ব্যতীত এক রাতের পথও সফর করা বৈধ নয়। –
-সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৩৩৯, ইফাবা-৩১৩৬!
✅✅ সফরে হোক কিংবা মুকিম অবস্থায় হোক ভীতির নামাজ বা ভয়ের নামাজ সব সময় এক রাকাত। অর্থাৎ শত্রু বা জীবজন্তুর কিংবা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভয় থাকলে সর্ব অবস্থায় ফরজ নামাজ এক রাকাত পড়বে।
✅✅ মুকিমের ইমামতিতে মুসাফির নামাজ পড়লে চার রাকাতই পড়বে এই মর্মে হাদীস পাওয়া যায়-
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মুসাফির যদি মুকিমদের সাথে নামাযে শরিক হয় তবে সে তাদের মত চার রাকাত নামাজ পড়বে।
মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ৩৮৪৯।
উক্ত হাদীস থেকে পাওয়া যায়-
মসজিদের জামাতে বা মুকিমদের জামাতে অংশগ্রহণ করে মুসাফির ব্যক্তি মাসবুক হলে অর্থাৎ এক, দুই বা তিন রাকাত পেলে তাকে চার রাকাতই পড়তে হবে।
🤔🤔 সফরের দূরত্ব নিয়ে একটা এনালাইসিসঃ
কতটুকু পথ সফর করলে কসর নামাজ আদায় করতে হবে? এই বিষয়ে কোরআন হাদিসে কোন দূরত্ব উল্লেখ নেই।
এ সম্পর্কিত ড. ইয়াসির ক্বাদি’র একটি ছোট্ট এনালাইসিস নিচে তুলে ধরা হলো-
“বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দৈনন্দিন ব্যস্ততায় আমাদের প্রতিনিয়ত সফর করতে হয়। তাই সফর এবং কসরের শরীয়া বিধিবিধান আলোচনার দাবী রাখে।
কুরআন এবং হাদীসে সফরের সময় নামাজ কসর বা সংক্ষিপ্ত করার কথা স্পষ্ট উল্লেখ থাকলে কতটুকু দূরত্বে কসর আদায় করতে হবে এব্যাপারে কোন স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ইসলামি চিন্তাবিদরা বিভিন্ন এনালাইসের মাধ্যমে একটি দূরত্ব নির্ধারনের চেষ্টা করেছেন। বেশিরভাগের মতামত হচ্ছে ৪৮ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করলে কসর নামাজ আদায় করতে হবে। এছাড়া আরো কিছু মতামত আছে। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যা নির্ধারনী এনালাইসিসেই বড় একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়েছে।
কোরআন এবং হাদীসে সফর এবং কসরের কোন স্পেসিফিক বর্ননা না থাকায় স্কলাররা কয়েক ধাপে দুরত্ব নির্ধারনের চেষ্টা করেন। প্রথমে তারা সফর এবং সময়ের বর্ননাসংক্রান্ত হাদীস অনুসন্ধান করেন।সেখান থেকে তারা প্রাচীন আরবের সেই দুরত্বকে ধাপে ধাপে আধুনিক দুরত্বে পরিবর্তন করেন। আর সমস্যা হচ্ছে এই রুপান্তরের প্রতিটা ধাপেই রয়েছে বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
হাদীসে উল্লেখ আছে, মহিলারা যেন কোন মাহরাম পুরুষ ব্যতীত ৩ দিনের বেশি সফর না করে। আবার ২ দিন, ১ দিনের বর্ননাও সহিহ হাদিসে আছে। এই হাদিসে কি কসরের কোন উল্লেখ আছে? নেই। শুধুমাত্র সফর এবং দূরত্ব উল্লেখ আছে। স্কলারটা এই হাদিসটিকেই কসরের দুরত্বের জন্য এনালাইসিস করে।
এখন বিভিন্ন স্কলার বা মাজহাব বিভিন্ন বর্ননাকে মূল ধরে তাদের গবেষনা চালায়। কেউ ১ দিন, কেউ ২ দিন আবার কেউ ৩ দিন। এখন ১ দিন মানে কতটুকু দূরত্ব? দুরত্ব পরিমাপের এই পদ্ধতি প্রাচীন আরবদের। সেখান থেকে এখন আধুনিক দুরত্ব পরিমাপক ইউনিটে রুপান্তর করতে হবে।
সাহাবীরা ১ দিনের দুরত্ব বলতে কি বুঝতো? ইসলামপূর্ব আরবে দূরত্ব পরিমাপক ইউনিটকে বলা হতো “বারিদ”। বারিদ বলতে বুঝায়,একজন ঘোড় আরোহী কোন বিশ্রাম ছাড়া গড়ে যতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। এখন ১ দিনের সফর কত বারিদ? এখানেও প্রায় ১৫ টি বিভিন্ন মত রয়েছে। কোন কোন সাহাবী এবং তাবিউন ৪ বা ৮ বারিদকে ১ দিনের সফর বলেছেন।
ফিকহ বইসমূহ যখন লেখা হয়, তখন কেউই বারিদ ব্যবহার করেনা। তখন দূরত্ব পরিমাপক হিসেবে “ফারসাখ” প্রচলিত। ফারসাখ হলো পার্সীয়ান শব্দ। এখন আবার বারিদকে ফারসাখে রুপান্তর করতে হবে। এখানেও প্রায় ৫ টি মত। বেশিরভাগের মতে ১ বারিদ সমান ৪ ফারসাখ।
এরপরে যখন পরবর্তী স্কলাররা আসলো, তখন ফারসাখও বিলুপ্ত। দুরত্ব পরিমাপক হিসেবে তখন ব্যবহার করে “মিল”। রোমানদের মাধ্যমে মিল দুরত্বের প্রচলন হয়। মিল এসেছে মিলিয়া থেকে যার অর্থ হচ্ছে হাজার। রোমান সৈন্যদের ১ হাজার পদ দূরত্বকে বলা হতো মিল। আরবরা রোমানদের মিল বা মাইল ব্যাবহার করলেও একই দুরত্ব বুঝাতো না। তাদের মাইল কিছুটা ছোট। কারন আরবদের পদ দুরত্ব রোমানদের পদ দূরত্ব থেকে কম। আবার তখন এক এক দেশে এক এক ধরনের মাইল। আধুনিক যুগেও জলপথের নটিক্যাল মাইল আর ভূমিপথের মাইল ভিন্ন।
এখন ১ আরব মাইল কতটুকু দূরত্ব? এখানেও বিভিন্ন মত। অনেকের মতে মিল হচ্ছে ১২০০০ আরব পদ দূরত্ব। কারো মতে মিল হচ্ছে খালি চোখে যতদুর দেখা যায়। আবার কারো মতে যত দূর থেকে মানুষকে দেখলে পুরুষ নাকি মহিলা সেটি বুঝা যায়না। এই রুপান্তরে কেউই নিশ্চিত না। এটি সায়েন্টিফিক কিছু না, অনুমান মাত্র।
নিউটন পরবর্তী জ্ঞান-বিজ্ঞান বিপ্লবের সময় যখন প্রথম রানী এলিজাবেথ আসলেন, তখন সংবিধানে দুরত্ব পরিমাপক নির্ধারক আইন পাশ করা হয়। সেখানে ১ মাইল সমান ৫২৮০ ফুট নির্ধারন করা হয় এবং ফুট বা অন্যান্য ইউনিট নির্ধারন করা হয়।
এখন পেছন ফিরে অধিকাংশ মতামত দেখি। ১ দিনের সফর (২,৩ দিনের হাদিসও আছে) সমান ৪ বারিদ (আরো অনেক মত আছে)। ৪ বারিদ সমান ১৬ ফারসাখ ( আরো মত আছে)। অনুমান করা হয়, ১ ফারসাখ সমান ৩ মাইল। তাহলে ১৬ ফারসাখ সমান ৪৮ মাইল। এই সেই ম্যাজিক্যাল ৪৮ মাইল!! ৪৮ মাইল সমান ৭২ কিলোমিটার।
এখন মহিলাদের সফর সংক্রান্ত একটি হাদিসকে কয়েকটি অনুমাননির্ভর ধাপে পরিবর্তন করে আধুনিক দুরত্বে রুপান্তর করে কসরের দূরত্ব নির্ধারন করা হলো। আর কসরের ফতোয়াতে সাধারনত এই দুরত্বকেই বর্ননা করা হয়।
সকল স্কলারদের প্রতি সম্মান রেখে বলছি, এর কোন ধাপই আল্লাহ ও রাসুলের থেকে নাজিলকৃত না। আবার এক এক মাজহাবে এক এক দুরত্ব। তবে আশার বিষয় হচ্ছে সব স্কলার এই বেশিরভাগ মতে একমত না। তাই এই ইস্যুতে আরো এনালাইসের সুযোগ আছে।
যারা এই ৪৮ মাইল বা নির্ধারিত দুরত্বের মতের বিরুদ্ধে, তাদের মধ্যে অন্যতম ইবনে তাইমিয়া। তার মতে সফর বা কসর কোন নির্দিষ্ট দুরত্ব দিয়ে নির্ধারিত না। এটি মানুষের ফ্রেম অব মাইন্ড। মানুষের নিজের বিবেকই নির্ধারন করবে সে সফরে আছে কি না।স্বাভাবিকভাবেই আমরা সফরের জন্য কিছু প্রস্তুতি নেই। আমাদের ব্যাগ গুছানো, আমাদের সফরের প্রস্তুতি আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি। এজন্য কোন মুফতিকে জিজ্ঞাসার প্রয়োজন নেই। যার যার সফর তার নিজের অবস্থা দিয়ে নিজেই নির্ধারন করবে। আর সেই অবস্থানুযায়ী কসর নামাজ আদায় করবে।
ইসলামে কসরের বিধান রাখা হয়েছে নামাজকে সহজ করার জন্য। সেখানে অনেক কিন্তুর মধ্য দিয়ে আসা নির্দিষ্ট দুরত্ব সেই উদ্যেশ্যকে ব্যাহত করে। তাহলে একজন মানুষকে সবসময় দুরত্ব পরিমাপক যন্ত্র নিয়ে ঘুরতে হবে যে তার ৪৮ মাইল হলো কি না। এতে যে সহজের জন্য কসরের বিধান রাখা হয়েছে, সেটি আরো জটিলতর হবে। আবার উটে বা প্রানীতে ৪৮ মাইলের সফর বিমানে ৪৮ মাইলের সফর থেকে ভিন্ন। জলে সফর স্থলে সফর থেকে ভিন্ন।
তাই অনেক স্কলারের মতো আমার মত হচ্ছে সফর এবং কসর কোন নির্ধারিত দুরত্ব না। আল্লাহ ও তার রাসুল কোন দুরত্ব নির্ধারন করেননি। সফর হচ্ছে ফ্রেম অব মাইন্ড। মানুষের মানষিক অবস্থা। আর সেই অবস্থার ভিত্তিতেই যে যার মতো কসর নামাজ আদায় করবে। আল্লাহু আলাম।””
✅✅ উপরের বিস্তারিত আলোচনা থেকে আমরা জানলাম-
১/ সফরে নামাজ কসর বা সংক্ষিপ্ত করা কোরআনের বিধান অর্থাৎ ওয়াজিব।
২/ রাসুলুল্লাহ সাঃ কখনোই সফরে পূর্ণ নামাজ পড়েননি বরং কসর করেছেন।
৩/ স্থায়ী বাড়ি-ঘরের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে যেকোন বৈধ সফরে থাকলেই সে “সাফের” বা মুসাফির বলে গন্য হবে।
৪/মুসাফিরের জন্য ৪ রাকাত বিশিষ্ট সকল নামাজ ২ রাকাত এবং কোন সুন্নত/ নফল নেই।
৫/ মুসাফিরের জন্য ফরজ রোজা ঐচ্ছিক।
৬/ সর্বোচ্চ ১৫ কিলোমিটার ভ্রমণ বা সফরের উদ্দেশ্য বাড়ি থেকে বের হলেই সে ব্যক্তি মুসাফির হিসাবে গণ্য হবে এবং নামাজ কসর করবে।
৭/সফরে যুহর-আসর ও মাগরিব- ঈশা এই ৪ ওয়াক্ত ২-২ করে জামা করে পড়া সুন্নত।
৮/সফরে ৩ দিন পর্যন্ত মোজার উপর মাসের করা সুন্নত। মোজা উল/সুতা/পশম/চামড়া, প্লাষ্টিক বা রেকজিন যে কোন ধরনের হোক।
৯/পুরুষ- মহিলার বিধান একই, তবে মহিলা দীর্ঘ সফর একা করবেন না।
১০/আল্লাহ মানুষের জন্য তার বিধান সহজ করেন!
🤲🤲 আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর বিধান পরিপূর্ণভাবে জানার ও মানার সুযোগ দান করুন। তৌফিক দানের জন্য এটাই আল্লাহর নিকট দোয়া ও প্রত্যাশা।আমীন।
Mahabubur Rahman
mahabuburrahman1720@gmail.com

হাঁটার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাঃ দ্রুত হাঁটার এবং খালিপায়ে হাঁটার নির্দেশ দিয়েছেন।

✅✅ রাসুলুল্লাহ সাঃ দ্রুত হাঁটার নির্দেশ দিয়েছেন এবং মাঝেমধ্যে খালি পায়ে হাঁটার বিষয়ে উৎসাহিত করেছে। তিনি নিজেও তাই করতেন।
যেসব বিষয় মানুষের জন্য উপকারী তা করতে কোরআন-হাদিসে নানাভাবে উৎসাহিত করেছে; যেমন হাঁটা।
সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন লাভে চিকিৎসকরা প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটার পরামর্শ দেন। কোরআন ও হাদিসে মানুষকে নানাভাবে হাঁটতে উৎসাহিত করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বললেন যে তোমরা দ্রুত বেগে হাঁটবে। সাহাবায়ে কেরাম বলেন, রাসূলুল্লাহ বলার পর আমরা দ্রুত হেঁটে দেখলাম এটি আমাদের জন্য অতি সহজ এবং উপকারী।
-ইবনে খুযাইমা-২৫৩৭, হাদিসের মান সহি ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে অত্যন্ত সাবলীল, দৃঢ় এবং কিছুটা দ্রুত গতিতে হাঁটতেন। সাহাবিদের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর হাঁটার গতি সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি ছিল এবং মনে হতো যেন তিনি কোনো উঁচু জায়গা থেকে নিচের দিকে নামছেন।
এটি অত্যন্ত অবাক করা বিষয় যে, বর্তমান যুগে প্রতিটি দেশের আর্মির জেনারেল ও বড় বড় অফিসাররা যেভাবে দৃঢ় পদক্ষেপে হার্টেন এবং প্যারেড অবজারভেশন করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর হাটার ধরন ছিল ঠিক তেমন। মোটকথা একজন সেনাপতি যেভাবে সর্বক্ষণ হাঁটেন রাসূলুল্লাহ সেভাবেই হাঁটতেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাঁটার ধরণ ছিল:
১// রাসূলুল্লাহ সা. কখনো অলসভাবে বা পা টেনে টেনে হাঁটতেন না। তার হাঁটা ছিল উদ্যমী এবং দৃঢ় প্রদাচারণা।
আলী রা. বলেন, “রাসূলুল্লাহ সা. যখন হাঁটতেন, তখন কিছুটা ঝুঁকে চলতেন, দেখে মনে হতো তিনি যেন কোনো ঢালু পাহাড় থেকে নিচে নামছেন”।
হাঁটার গতি ছিল সহজ স্বাভাবিক । আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, “আমি আল্লাহর রাসূল সাঃ এর চেয়ে দ্রুত গতিতে আর কাউকে হাঁটতে দেখিনি; যেন পথ তাঁর জন্য সংকুচিত বা গুটিয়ে দেওয়া হতো। আমরা তাঁর সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খেতাম, অথচ তিনি স্বাভাবিকভাবেই হাঁটতেন”।
২// নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দ্রুত হাঁটার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। হজ্জ বা ওমরাহর সময় তাওয়াফে প্রথম তিন চক্করে পুরুষদের জন্য কিছুটা বীরদর্পে দ্রুত হাঁটার বিধান রয়েছে হাদিসে; যাকে রমল বলা হয়।
রাসূল সা. নিজেই সাহাবিদের এ নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এছাড়া সাধারণ চলাফেরায় অলসতা পরিহার করে চটপটে ও সজীব থাকার বিস্তারিত বিবরণ হাদিসে পাওয়া যায়।
৩// তিনি বিনয় বজায় রাখে দ্রুত হাঁটলেও তাঁর মধ্যে কোনো অহংকার বা কৃত্রিমতা ছিল না। পবিত্র কোরআনে গর্বভরে বা বুক ফুলিয়ে মাটিতে অহংকারের সাথে হাঁটতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
✅✅ খালি পায়ে হাঁটার ব্যাপারে ও রাসূলুল্লাহর সাঃ উৎসাহ দিয়েছেনঃ
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে খালি পায়ে হাঁটলে প্রাকৃতিকভাবে অকুপ্রেসার হয়, ফলে মানসিক চাপ কমে। মন ভালো থাকে। শারীরিক কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে বিশেষ কার্যকর ভূমিকা রাখে। ক্যালোরি ও মেদ কমাতে তাই হাঁটার কোনো বিকল্প নেই।
খালি পায়ে হাঁটা নবী সা. এর সুন্নত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আবিষ্কারের আগেই প্রায় ১৫ শত বছর আগে খালি পায়ে হাঁটার জন্য আদেশ করেছেন তিনি সা. । হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ সুনানে নাসায়ির এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘রাসুল সা. মাঝেমধ্যে খালি পায়ে হাঁটার নির্দেশ করেছেন’।
আবদুল্লাহ ইবনে বুরাইদাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. এর এক সাহাবী মিসরে অবস্থানরত ফাদালাহ ইবনে উবাইদ রা. -এর কাছে পৌঁছেন। অতঃপর তিনি বলেন, ‘আমি শুধু আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসিনি, বরং আমি ও আপনি যে হাদিসটি রাসুল সাঃ এর কাছে শুনেছি, আশা করি এ সম্পর্কে আপনার আরো কিছু জানা আছে।’
ইবনে উবাইদ রা. বলেন, ‘তা কোন বিষয়ে?’ তিনি বলেন, ‘এরূপ আপনি একটি স্থানের নেতা, অথচ আপনার মাথায় চুল এলোমেলো দেখছি?’ ফাদালাহ বলেন, ‘রাসুল (সা.) আমাদের মাত্রাতিরিক্ত জাঁকজমক দেখাতে নিষেধ করেছেন। এরপর তিনি (ফাদালাহ) জিজ্ঞেস করেন , ‘আপনার পায়ে জুতা দেখছি না কেন?’ সাহাবি বলেন, ‘নবী সা. আমাদের মাঝে মাঝে খালি পায়ে চলার আদেশ দিতেন ।
-আবু দাউদ : ৪১৬০।’
হাদিসের ব্যাখ্যা গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘মাঝে মাঝে খালি পায়ে হাঁটলে বিনয় আসে, অহমিকা দূর হয় এবং এটি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।’
উল্লিখিত হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, রাসুল সা. এর নির্দেশনা পালনের উদ্দেশ্যে মাঝে মাঝে খালি পায়ে হাঁটা সুন্নত।
এতে মানুষের আত্ম-অহমিকা কিছুটা সংবরণ হয়। হাঁটাহাঁটি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বর্ণনা রয়েছে এবং বলা হয়েছে, “পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন করো এবং কণ্ঠস্বর নিচু করো। নিশ্চয় গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।” -সুরা লুকমান- ১৮-১৯।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ নিচু এবং সমান জুতা পড়ার নির্দেশ দিয়ে থাকেন। এবং ভারসাম্য রক্ষা করে এমন জুতা পরার নির্দেশ দিয়ে থাকেন।
এই কথা রাসূলুল্লাহ দেড় হাজার বছর পূর্বেই বলে গেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন- তোমরা এক পায়ে জুতা পরিধান করে অন্য পা খালি রেখে হাঁটবেনা।
রাসুল সা. বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন এক পায়ে জুতা পরে না হাঁটে। হয়তো উভয় পায়ে জুতা পরে হাঁটবে নয়তো উভয় পায়ের জুতা খুলে হাঁটবে’
-বুখারি ও মুসলিম।
✅✅ ইসলাম বিভিন্ন ভাবে হাঁটতে উৎসাহিত করেছে। এখানে তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো-
১/বেশি পথ অতিক্রম করে মসজিদে আসার উৎসাহ:
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, বনু সালিমা গোত্রের লোকজন মসজিদ-ই-নববীর কাছে এসে ওই খালি স্থানে বসতি স্থাপনের ইচ্ছা করল। মসজিদ-ই-নববীর পাশে কিছু খালি জায়গা ছিল। বিষয়টি নবী সা. অবগত হলে তিনি তাদের বললেন, হে বনু সালিমা গোত্রের লোকেরা! তোমরা তোমাদের বর্তমান ঘরবাড়িতেই থাকো। নামাজের জন্য মসজিদে আসতে তোমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ লিখিত হয়।
-সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৬৫।
২/আল্লাহর পথে হেঁটে পায়ে ধুলা মাখা একটি বিরাট নেকীর কাজ।
আবু আবস রা. বলেন, ‘যে ব্যক্তির দুই পা আল্লাহর পথে ধূলি-ধূসরিত হয়, তা জাহান্নামের জন্য হারাম হয়ে যায়।’
-সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৩১১৬।
৩/পায়ে হেঁটে জুমায় অংশগ্রহণ করার জন্য রাসুলুল্লাহ উৎসাহিত করেছেন:
আউস বিন আউস সাকাফি রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সা. কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি জুমার জন্য বাহনে চড়ে নয়, বরং হেঁটে মাসজিদে যাবে এবং কোনোরূপ অনর্থক কথা না বলে ইমামের কাছে বসে খুতবা শুনবে, তার প্রতিটি পদক্ষেপ সুন্নত হিসেবে গণ্য হবে এবং প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে সে দীর্ঘদিন রোজা পালন ও রাতভর নামাজ আদায়ের সওয়াব পাবে।’ (কোন হাদিসে এক বছরের কোথায় এসেছে)
-সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৩৪৫।
৪/ ইসলামী শরিয়ত হেঁটে তাওয়াফ করার নির্দেশ দিয়েছে। কোন সমস্যা এবং অসুস্থতা না থাকলে হেঁটে তাওয়াফ করা সুন্নত।
হাদিসে এসেছে, ‘রাসুলুল্লাহ সা. যখন মক্কায় আগমন করলেন, তখন তিনি প্রথমে মসজিদে হারামে প্রবেশ করে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন। এরপর এর ডান দিকে গেলেন এবং তিনবার রমল করলেন বা দ্রুত হাঁটলেন এবং চতুর্থবার স্বাভাবিকভাবে হেঁটে তাওয়াফ করলেন।’
-সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২৯৪৯!
এই হাদিস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে যতক্ষণ শক্তি সামর্থ্য থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত দ্রুত হাঁটতে হবে এবং এটাই স্বাস্থ্যকর।
৫/ হজ্জের গুরুত্বপূর্ণ বিধান সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সায়ি করা তথা হাঁটা।
হাদিসে এসেছে, ‘রাসুলুল্লাহ সা. যখন সাফা থেকে অবতরণ করতেন তখন (স্বাভাবিক) হাঁটতেন, এমনকি তাঁর পদদ্বয় উপত্যকার নিম্নভূমিতে অবতরিত হলে তিনি সায়ি করে তা পার হতেন।’
সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২৯৮১।
৬/ একাধিক হাদিসে রাসুলুল্লাহ লাশের সাথে হাঁটার নির্দেশ দিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ সা. এর সাহাবিরা লাশের সঙ্গে হেঁটে কবরস্থানে যেতেন। রাসুলুল্লাহ সা. তাঁদের লাশের সাথে মধ্যম গতিতে পথচলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
-সুনানে আবি দাউদ, ৩১৮০-৩১৮২।

“ব্যবহার বংশের পরিচয়” !? ব্যবহার বংশের পরিচয় নয়; ব্যবহার হলো মূলত ব্যক্তির নিজস্ব পরিচয়।” এবং ভাষা’র ব্যবহারে রুচির পরিচয়। আর, অপরের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেওয়া কদর্য ভাষা ছোটলোকে’দের পরিচয়।

ঐতিহ্যগতভাবে একটি প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে যে “ব্যবহারে বংশের পরিচয়”, তবে আধুনিক চিন্তাভাবনা ও সামাজিক বিশ্লেষণে এটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
জনপ্রিয় এই ভুল প্রবাদটি ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তবতার আলোকে সঠিক নয়।

আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান ইসলামে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার ব্যক্তিগত চরিত্র, তাকওয়া বা আল্লাহভীতি, মানুষের ব্যক্তিগত আচরণ তথা কর্মের মাধ্যমে।
বংশের বা গোত্রের মাধ্যমে নয়।

ব্যবহারে বংশের পরিচয়” বাক্যটির মূল উৎস হলো সংস্কৃত ভাষা। মূলতঃ এটি একটি সংস্কৃত শ্লোক যার সংস্কৃত উচ্চারণ হল- “কুলমাখ্যাতি দেশমাখ্যাতি ভাষণম্”।
অর্থ: আচার বা ব্যবহার দিয়ে বংশের পরিচয় পাওয়া যায় এবং ভাষা বা কথা বলার ভঙ্গি দিয়ে অঞ্চলের পরিচয় পাওয়া যায়।
এই নীতিবাক্যটি প্রাচীন ভারতীয় বা সংস্কৃত সাহিত্য যেমন চাণক্য নীতি বা বিভিন্ন সুভাষিত থেকে প্রচলিত হয়ে পরবর্তীকালে বাংলাসহ অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় প্রবাদ হিসেবে রূপ লাভ করেছে।
সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলায় রূপান্তরিত এই প্রবাদ বাক্যটির সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ইংরেজি হল- Manners make the man.
তবে আমাদের ভুল বুঝতে লেখা থাকলেও ইংরেজরা এই কথাটা বিশ্বাস করে না।

✅✅এ ব্যপারে ইসলাম কী বলে আসুন তা জেনে নেয়া যাক:
ব্যক্তিগত দায়ভার ও পরিচয়ের ক্ষেত্রে ইসলামে প্রত্যেক মানুষ তার নিজের কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে।
সূরা ইসরা ও সূরা ফাতির এ আল্লাহ বলেন-
“কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।” । অর্থাৎ একজনের পাপের ভার অন্যজন গ্রহণ করবে না।
ভালো বংশে জন্ম নিলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো হয়ে যায় না, আবার খারাপ বংশে জন্ম নিলেও সে খারাপ হবে এমন নয়।
তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়ে খারাপ থাকাই কাজ থেকে বিরত থাকাই হলো শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি। ইসলামে বংশ, বর্ণ বা আভিজাত্যের চেয়ে আল্লাহর কাছে তাকওয়া বা উত্তম চরিত্রই গ্রহণ যোগ্যতা রয়েছে।

আবুল হাশেম রচিত “বিদায় হজ্জ” কবিতার জনপ্রিয় দুটি পংক্তি হলো-
“নহে আশরাফ যার আছে শুধু
বংশের পরিচয়,
সেই আশরাফ জীবন যাহার
পুণ্য কর্মময়।”
আরবী ‘আশরাফ’ শব্দের বাংলা অর্থ হলো কুলীন, সম্ভ্রান্ত বা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি।
কবি এখানে তার কবিতার মাধ্যমে বুঝাতে চেয়েছেন- কেবল উচ্চবংশ বা পরিবারে জন্ম নিলেই কেউ প্রকৃত কুলীন বা মহৎ হতে পারে না। মানুষের আসল পরিচয় তার বংশে নয়, বরং তার সৎকর্ম, চরিত্র ও কল্যাণকর কাজের মধ্যে নিহিত। যিনি ভালো ও পুণ্যময় কর্ম করেন, সমাজে তিনিই প্রকৃত ‘আশরাফ’ বা শ্রেষ্ঠ মানুষ।
রাসুলুল্লাহ সা. বিদায় হজের ভাষণে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, আরব-অনারব কিংবা সাদা-কালো চামড়ার মাঝে কোনো ভেদাভেদ নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া।
পরিচিতির জন্য বংশের গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু বংশ চরিত্র বা আচরণের মাপকাঠি নয়।
ইসলামে বংশ পরিচয় জানা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার গুরুত্ব দেয়,তবে তা বাধ্যতামূলক নয়।
নুহ আ.-এর পুত্র কিংবা লুত আ.-এর স্ত্রীর মতো উত্তম বংশে বা পরিবারেও অবাধ্য ও মন্দ চরিত্রের মানুষ জন্ম নিয়েছে।
আবার অনেক সাধারণ বা ভিন্ন বংশ থেকেও ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মহামানব তৈরি হয়েছেন।
আলী রাঃ, সালমান ফারসি রাঃ এর বংশ বা গোত্র পরিচয় কি? কিন্তু তাদের অবস্থান এবং মর্যাদা আজ কোথায়!

ভালো বা মন্দ আচরণ মূলত ব্যক্তির নিজস্ব শিক্ষা, রুচি ও চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ, কোনো বংশের সিলমোহর নয়।
👉👉 “ব্যবহারে বংশের পরিচয়” প্রবাদ বাক্যটি কোনো নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির বলা সুনির্দিষ্ট বা মৌলিক কোনো উক্তি নয়; এটি বাংলা ভাষার একটি প্রচলিত প্রবাদ বা লোকজ বচন, যা বহু প্রাচীনকাল থেকেই সমাজে মুখে মুখে চলে আসছে।
এই প্রবাদটির মাধ্যমে বোঝানো হতো যে, ভালো পরিবারের সন্তানরা সাধারণত ভালো ও মার্জিত ব্যবহার করে থাকে।
তবে আধুনিককালে এই প্রবাদটি নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনা রয়েছে। এবং এই কথাটি যে ভুল তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্যবহারে মূলত ব্যক্তির নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, শিক্ষা ও চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়; কারণ ভালো বংশেও অনেক সময় খারাপ চরিত্রের মানুষ বা কুলাঙ্গার জন্ম নিয়েছে।

ব্যবহারে বংশের পরিচয়” প্রবাদটি সর্বপ্রথম সংস্কৃত ভাষায় প্রচলিত হয়।
সংস্কৃত সাহিত্যের প্রাচীন নীতিশ্লোক।
সংস্কৃত ভাষায় এই বিষয়টি নিয়ে বিখ্যাত একটি শ্লোক রয়েছে:
“মানুষের আচার-ব্যবহার বা আচরণ দেখে তার বংশ বা কুল সম্পর্কে পরিচয় পাওয়া যায়।” এই কথাটি আধুনিক গবেষণায় সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কেননা ব্যবহার বংশের পরিচয় নয় বরং
“ব্যবহার হল ব্যক্তির পরিচয়।”
আরবী ভাষায় একটি প্রবাদ আছে-
মানুষের ” মানুষের ভাষা বা কথা বলার ধরন থেকে তার অঞ্চলের পরিচয় মেলে।” এই কথাটা তো আমরা সবাই জানি। চট্টগ্রাম, সিলেট বা নোয়াখালীর মানুষের কথা শুনেই বোঝা যায় তারা কোন এলাকা থেকে আগত।

সংস্কৃত নীতিশাস্ত্র, চাণক্য নীতি বা বিভিন্ন পুরাণে এই শিক্ষাগুলো বহুকাল ধরে প্রচলিত ছিল। যে “ব্যবহারে বংশের পরিচয়”! বিশেষ করে প্রাচীন হিন্দু বিভিন্ন নীতিবাক্য থেকে এই ভুল কথাটি প্রচলিত হয়ে আসছে। আর এই বংশগুলো বা বংশের classification যেমন উচ্চ বংশ – নিম্ন বংশ ইত্যাদি এসেছে হিন্দুদের ধর্মীয় আচার-আচরণ থেকে। যেমন ব্রাহ্মণরা তাদের সন্তানদের শিক্ষা দেয়- “ব্রাহ্মণ হল ভগবানের মোচ থেকে তৈরি। অতএব তোমার আচরণ যেন বংশের পরিচয় বহন করে। সেখান থেকেই মূলত “ব্যবহারে বংশের পরিচয়” কথাটার প্রচলন।

✅ ‘ব্যবহার ব্যক্তির পরিচয়’, বংশের নয়! তুর্কি ভাষায় একটি প্রবাদ আছে-
“খড়ের আগুন দিয়ে যেমন সোনা চেনা বা পরীক্ষা করা যায়, তেমনি মানুষের আচরণের বা ব্যবহারের মাধ্যমে তার আসল পরিচয় বা আভিজাত্য জানা যায়।”

১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন সরকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশের শাসন কাঠামো, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় থেকে ধর্মীয় স্বকীয়তা ও প্রতীকগুলো একে একে অপসারণের এক নজিরবিহীন নীতি গ্রহণ করেছিল। শেখ মুজিবুর রহমান নিজে বিভিন্ন বক্তৃতায় বারবার আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন যে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। তবে তা শুধু বক্তৃতাতাই ছিলো।

৪ নভেম্বর ১৯৭২ সালে গণপরিষদে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব বলেছিলেন:

“ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কেউ তাদের বাধা দেওয়ার অধিকার রাখে না… আমাদের শুধু আপত্তি হলো এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।”

কিন্তু মুখে এই সাম্য ও ধর্মীয় স্বাধীনতার বুলি আউড়ানো হলেও, শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশনায় তৎকালীন সরকারের কর্মকাণ্ডে দেখা গিয়েছিল সম্পূর্ণ বিপরীত এক রূপ। শুধু রাষ্ট্র বা সংবিধান নয়, নিজের রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ইসলাম ও মুসলিম স্বকীয়তা একে একে উপড়ে ফেলা হয়েছিল।

প্রথমত,
ইসলামি স্বকীয়তা বর্জনের এই মানসিকতা কেবল স্বাধীনতার পরেই নয়, বরং তার বীজ রোপণ করা হয়েছিল পাকিস্তান আমলেই। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার সময় মূল দলটির নাম ছিল “পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ” এবং ১৯৪৮ সালে গঠিত ছাত্র সংগঠনটির নাম ছিল “পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ”। কিন্তু ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে অসাম্প্রদায়িকতার দোহাই দিয়ে মূল দল থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি ছেঁটে ফেলে করা হয় “পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ” এবং ছাত্র সংগঠনটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ বাদ দিয়ে করা হয় “পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ”। শেখ মুজিবুর রহমান তখন মূল দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এই মুসলিম নাম বর্জনের সিদ্ধান্তের প্রধান কারিগরদের একজন ছিলেন।

এরপর,
১০ জানুয়ারি ১৯৭২। শেখ মুজিব পশ্চিম পাকিস্তানের যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা থেকে দেশে ফেরার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায়, ২৪ জানুয়ারি তাঁর সরকার জারি করে বিতর্কিত “দালাল আইন”। তৎকালীন প্রেক্ষাপটে অভিযোগ ওঠে, এই আইনের আড়ালে দেশের শীর্ষস্থানীয় বহু আলেম, বরেণ্য ইসলামি চিন্তাবিদ এবং মাদ্রাসার শিক্ষকদের ঢালাওভাবে “দালাল” তকমা দিয়ে বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করা হয়। সমসাময়িক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদ বদরুদ্দীন উমর তাঁর লেখায় তৎকালীন পরিস্থিতি সম্পর্কে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন-

“দালাল আইনের নামে যেভাবে বেছে বেছে আলেম সম্প্রদায় ও ইসলামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা কোনো অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের লক্ষণ ছিল না; বরং তা ছিল একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।”

স্বাধীনতার পরপরই শেখ মুজিব সরকারের অধীনে বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের শুরুতে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতসহ সব ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রচার সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ বা সংকুচিত করা হয়। একই সাথে এ দেশের চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতে এক বিষাক্ত অপসংস্কৃতির বীজ বুনে দেওয়া হয়। সিনেমা বা নাটকে রাজাকার, খলনায়ক, শোষক, চোর কিংবা খুনি চরিত্রগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে দাড়ি, টুপি এবং ইসলামি লেবাস পরিয়ে উপস্থাপন করা শুরু হয়, যা সাধারণ মানুষের মনে ইসলামি সংস্কৃতির প্রতি এক ধরনের তীব্র অবমাননাকর মনস্তত্ত্ব তৈরি করে।

৪ নভেম্বর ১৯৭২। শেখ মুজিবের হাত ধরে গণপরিষদে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান গৃহীত হয়। এই সংবিধানের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ দিয়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’-কে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি করা হয় এবং ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে ধর্মীয় নামের সমস্ত রাজনৈতিক দল ও সংগঠন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর মাধ্যমে মুসলিমদের ধর্মীয় রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হয়।

সংবিধান কার্যকরের পরপরই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঐতিহাসিক পরিচয় ও লোগো থেকে ইসলামি আধ্যাত্মিক বাণীগুলো সম্পূর্ণ তুলে দেওয়ার এক রাষ্ট্রীয় তৎপরতা শুরু হয়। ঢাকা বোর্ডের মূল মনোগ্রাম থেকে পবিত্র কুরআনের আয়াত “ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক” মুছে ফেলা হয়।

শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে ১৯৭২ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো থেকে ঐতিহ্যবাহী ইসলামি জ্ঞানবৃদ্ধির দোয়া “রাব্বি জিদনী ইলমা”। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকেও পবিত্র কুরআনের আয়াত “ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক” সরিয়ে ফেলা হয়।

মুসলিমদের ঐতিহাসিক অবদান এবং নামগুলোকে মুছে দিতে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় জোরপূর্বক বদলে দেওয়া হয়েছিল। জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুসলিম শব্দটি মুছে করা হয় “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়”। শেখ মুজিব সরকারের ১৯৭৩ সালের সংশোধিত বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ‘মুসলিম’ শব্দটি সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়ে কেবল “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়” রাখা হয়।

সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও ফজলুল হক মুসলিম হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঐতিহাসিক আবাসিক হল দুটির প্রাতিষ্ঠানিক নাম ও সাইনবোর্ড থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে কেবল “সলিমুল্লাহ হল” এবং “ফজলুল হক হল” করা হয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামের এই কলেজটি থেকে ‘ইসলাম’ শব্দ বাদ দিয়ে “নজরুল কলেজ” নাম দেওয়া হয়।

অথচ অবাক করা বিষয় হলো, প্রতিবেশী ভারতের মতো কট্টর হিন্দুত্ববাদী দেশেও প্রায় ২০০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক ‘আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’-এর নামের সাথে আজও ‘মুসলিম’ শব্দটি রাষ্ট্রীয়ভাবে টিকে রয়েছে, অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলাম ও মুসলিম শব্দগুলো মুছে দেওয়া হয়েছিল!

১৯৭৩-৭৪ সালে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের দীর্ঘদিনের ইসলামি ঐতিহ্য ভেঙে শেখ মুজিব সরকারের আমলে দেশের সমস্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং অফিস-আদালতের সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবারের পরিবর্তে রবিবার ঘোষণা করা হয়। তৎকালীন প্রেক্ষাপটে সাধারণ মুসলমানদের মাঝে এই ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে যে, প্রতিবেশী ভারতের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে এবং মুসলমানদের জুমার নামাজের ঐতিহ্যকে ধ্বংস করতেই এই ছুটির দিন পরিবর্তন করা হয়েছিল।

১৯৭৪ সালে শেখ মুজিব সরকারের গঠিত ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট পেশ করা হয়। সেখানে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির আওতায় প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষাকে সংকুচিত, নিয়ন্ত্রিত ও একপ্রকার বিলুপ্ত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল, যা আলেম সমাজ ও ধর্মপ্রাণ জনগণের মাঝে তীব্র গণ-অসন্তোষের জন্ম দেয়।

তৎকালীন শেখ মুজিব সরকারের এই চরম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এবং ইসলাম-বিদ্বেষী নীতিমালার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন সমসাময়িক প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর” এবং বিভিন্ন প্রবন্ধে তৎকালীন বুদ্ধিজীবী ও সরকারের এই দেউলিয়াত্ব উন্মোচন করে লিখেছেন:

“ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ এই নয় যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের ধর্মীয় স্বকীয়তা ও ঐতিহ্যকে রাষ্ট্র থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ছাত্র সংগঠন আর হলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেওয়া প্রগতিশীলতা নয়, বরং এটি ছিল এক ধরণের হীনম্মন্যতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মনস্তত্ত্বকে অস্বীকার করার শামিল।”

একইভাবে তৎকালীন সময়ের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও বামপন্থী নেতারাও স্বীকার করেছিলেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান ব্যক্তিগত জীবনে টুকটাক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান মেনে চললেও এবং পরবর্তীকালে তীব্র জনরোষ ও রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করলেও, তাঁর শাসনামলের প্রথম তিন বছরে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে ইসলামকে কোণঠাসা করার যে তীব্র প্রয়াস চালানো হয়েছিল, তা ছিল আত্মঘাতী।

ইতিহাসবিদদের মতে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশের জনগণের ধর্মীয় চেতনা ও ঐতিহ্যের পরিপন্থী এই চরম পদক্ষেপগুলোই পরবর্তীতে তৎকালীন প্রশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ, ঘৃণা ও তীব্র দূরত্বের জন্ম দিয়েছিল। ১৫ই আগস্ট রাষ্ট্রের শাসকের মৃত্যুতে জনগণের মিষ্টি বিতরণ বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছিল।

পরবর্তী লেখায়, শেখ মুজিবের মৃত্যুর পরে ঢাকাসহ সারাদেশের অবস্থা কেমন ছিল এবং কেন ছিলো? তা নিয়ে আলোচনা করা হবে।

ভুট্টোর প্রতি বাদশা ফয়সালের একটি সুন্দর নসিহত

ছবিতে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ভুট্টোকে সৌদির বাদশা ফায়সালের সাথে দেখা যাচ্ছে।

✅✅ ভুট্টুর প্রতি বাদশা ফয়সালের একটি সুন্দর নসিহা বা ইসলামিক উপদেশ সকল ঈমানদার নয় বরং সকল মানুষের জন্য সমহারে প্রযোজ্য , যা তিনি পাকিস্তান সফরে গিয়ে করেছিলেন।

সালটা ছিল ১৯৭৪ ইচ্ছাই সালের ২২ ফেব্রুয়ারি!রাষ্ট্রীয় সফরে সৌদি বাদশাহ ফয়সাল পাকিস্তান এলেন!
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভূট্টো সরকারী সফরসুচী অনুযায়ী বাদশাহকে নিয়ে-
পাকিস্তানের জাতির পিতা কয়েদ এ আজম মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর কবরের কাছে গেলেন।
শ্বেতপাথরে বাঁধানো উঁচু জাঁকজমকপূর্ন কবর।ভূট্টো নিজে জিন্নাহর কবরকে স্যালুট করলেন ও বাদশাহ ফয়সালকেও অনুরূপ সম্মান জানাতে অনুরোধ করলেন!

উল্লেখ্য যে, বাদশাহ ফয়সাল ছিলেন শিরক ও বিদআতের বিরুদ্ধে কঠোর‌‌ সাহসী এক মহান পুরুষ।
অবাক হয়ে বাদশাহ ফয়সাল বললেন-একটি কবরকে আমি কেনো স্যালুট করবো?
ভূট্টো বললেন- এটি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর কবর!এখানে সম্মান প্রদর্শন করতে হয়। এবং এটাই নিয়ম।
বাদশাহ বললেন- মিঃ ভূট্টো,তোমার কাছে আছে জিন্নাহ’র কবর,আর আমার কাছে আছে নবী মুহাম্মাদ সঃ এর কবর!
অবশ্যই মিস্টার জিন্দা একজন ভালো ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং সম্মানিত লোক ছিলেন আমরা অবশ্যই তার জন্য দোয়া করব কিন্তু কুফুরি কায়দায় সেলুট নয়।
যদি তা জায়েজই থাকতো,তবে আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এবং সাহাবাগণের কবরকে স্বর্ণ দিয়ে মুড়িয়ে দৈনিক পাঁচবার সিজদাহ করতাম!

কিন্তু আফসোস,ইসলামে এটা নিষিদ্ধ!
তুমি কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাকে স্মরণ করবে।
মৃত ব্যাক্তিকে নয়। বরং তোমার জন্য উত্তম হলো এই কবর থেকে উপদেশ গ্রহণ করা আর কবরের ব্যক্তির জন্য দোয়া করা।

হে মুহাম্মদ সাঃ, আপনাকে অভিনন্দন। আলজেরিয়া আবার আপনার কাছে ফিরে এসেছে।

আলজেরিয়ার পতাকায় মোড়ানো যে কফিনগুলো দেখছেন সেগুলো গতানুগতিক কোনো কফিন নয়। বরং এগুলো আফ্রিকার বুকে ফ্রান্স যে ঔপনিবেশিক বর্বরতা চালিয়েছিল তার নিদর্শন, আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মাথার খুলি।

এই খুলিগুলো তৎকালীন ফরাসিরা তাদের বিজয়ের ট্রফি হিসেবে প্যারিসে পাঠিয়েছিল। আর সেগুলোকে তারা স্বযত্নে রেখেছিল প্যারিসের মুজে দে লোম বা মিউজিয়াম অব ম্যানকাইন্ডে। ২০২০ সালে আলজেরিয়ার সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ২৪টি মাথার খুলি ফেরত পাঠায় ফ্রান্স।

আইফেল টাওয়ারের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা ঝলমলে এই জাদুঘরে কমপক্ষে ১৮ হাজার মানব খুলি আছে, যার মধ্যে অসংখ্য মানবখুলির উৎস আফ্রিকা। যেখান থেকে ফরাসিরা সম্পদ লুট করেছে, লাখ লাখ মানুষকে নির্মমভাবে হ*ত্যা করেছে এবং আজ অবধি তারা তাদের নব্য ঔপনিবেশিকতা অব্যাহত রেখেছে নানা ফরম্যাটে।

আলজেরিয়ার প্রতিরোধ যোদ্ধারা ফরাসিদের নৃশংস দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। সেসব প্রতিরোধকে দমন করার জন্য এমন কোনো বর্বরতা ছিল না যা ফরাসিরা করেনি। এমনকি তারা প্রতিরোধ যু দ্ধে শহীদ সেনারা মর্যাদাপূর্ণ দাফনেরও সুযোগ দেয়নি। শহীদ যোদ্ধাদের শিরচ্ছেদ করে আলজেরিয়ার সাধারণ জনগণের সামনে প্রদর্শন করা হতো, যাতে তারা আর বিদ্রোহ করার সাহস না পায়।

পাশাপাশি তারা এসব ছিন্ন মস্তক বাক্স বন্দী করে প্যারিসে পাঠাতো, যার মাধ্যমে শাসকদের বার্তা দেওয়া হতো আফ্রিকায় ফরাসিদের প্রকৃত বিজয় অর্জিত হচ্ছে, লুণ্ঠন আর দখল দারিত্ব ঠিকঠাকই চলছে। সেই সব প্রতিরোধ যোদ্ধাদের মাথার খুলি ফরাসিরা প্যারিসের মিউজিয়াম অব ম্যানকাইন্ডে রেখে দিয়েছিল।

এবং সেখানে যে ১৮ হাজার মানব খুলি আছে তার অসংখ্যের উৎস অস্পষ্ট এবং হাজার হাজার খুলি বেজমেন্টে লুকিয়ে রাখা ছিল। ধারণা করা হয় এসবের মধ্যে আলজেরিয়ার আরো অনেক মানুষের মাথার খুলি রয়ে গেছে। যাদের মধ্যে প্রতিরোধ যোদ্ধা থেকে শুরু করে অনেক আলেমও আছেন।
.

১৮৩০ সালে আলেজেরিয়া দখল করে ফ্রান্স। এরপর তারা সাধারণ আলজেরীয় নাগরিকদের থেকে উর্বর জমিগুলো কেড়ে নেয়। ফলে হাজার হাজার পরিবার ভূমিহীন ও নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সামাজিক কাঠামো ভেঙে যায়। সেখানকার প্রশাসন, শিক্ষা ও ব্যবসাতে ফরাসিদের আধিপত্য বাড়তে থাকে এবং এক সময় ফ্রান্স আলজেরিয়াকে তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা শুরু করে।

ফরাসিদের এই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আলজেরীয়রা যখন প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করতো তখন তাদের উপর নেমে আসতো ভয়াবহ নির্যাতন। কালেকটিভ পানিশমেন্ট হিসেবে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। এমনকি শত শত আলজেরীয়কে গুহার ভেতরে বন্দী করে ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ করে হ ত্যা করার নজিরও আছে।

১৯৪৫ সালে ৮ মে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হয়, তখন অনেক আলজেরীয় ভেবেছিলেন এবার হয়তো তারাও মুক্ত। দেশটির সেতিফ শহরে হাজার হাজার মানুষ বিজয় মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামে এবং নিজেদের পতাকা উত্তোলন করে। কিন্তু সেসব মিছিলে গুলি চালিয়ে একদিনে ৪৫ হাজার মানুষকে হ ত্যা করে ফরাসিরা। এর মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয় স্বাধীনতা শুধু ইউরোপের জন্য, তোমাদের জন্য নয়।

এরপর ১৯৫৪ সালে শুরু হয় আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম। আট বছরব্যাপী চলা সেই যুদ্ধে ১৫ লক্ষ মানুষকে হ ত্যা করে ফরাসিরা। শুধু সেখানেই থেমে থাকেনি, আলজেরিয়ার স্বাধীনতার আগে পরে মিলিয়ে সেখানে প্রায় ১৭টি পারমাণবিক পরীক্ষা চালায় ফ্রান্স। যার ফলে আজও স্থানীয় আলজেরীয়দের স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে।

১৮৩০ সালে ফরাসিরা আলজেরিয়া দখল করার পর থেকে দেশটির মুসলিম আইডেন্টি মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ থেকে শুরু করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তারা ধ্বংস করে দেয়।

সেই সময় আলজেরিয়ানরা এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করতো। ঔপনিবেশিক সরকার এসব প্রতিষ্ঠানে অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করে দেয়। যার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।

এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ফলে আলজেরিয়ার সিংহভাগ জনগণ নিরক্ষর হয়ে পড়ে৷ যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টিকেছিল সেসব থেকে আরবিকে সরিয়ে ফ্রেঞ্চ কারিকুলাম চালু করা হয়। সবমিলিয়ে ফরাসিরা আলজেরিয়া থেকে ইসলামকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু আলজেরিয়ানদের হৃদয় ছিল ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত।

যে কারণে ১৯৬২ সালে ফরাসিদের হাত থেকে আলজেরিয়ানরা যখন স্বাধীনতা পায় তখন দেশটির সাধারণ জনগণ স্লোগান দিয়েছিল-

“ইয়া মুহাম্মাদ মাবরুক আলাইক, আল জাজা আ রাজআ তিব “

“হে মুহাম্মদ (সাঃ), আপনাকে অভিনন্দন। আলজেরিয়া আবার আপনার কাছে ফিরে এসেছে।”

বাংলাদেশের সরকার অনুমোদিত পতিতালয় গুলোর ব্যাপারে আলেম সমাজের ভূমিকা কি?

👉👉 প্রেসিডেন্ট এরশাদ (বাংলাদেশের অন্যতম চরিত্রহীন প্রেসিডেন্ট)১৯৮৮ সালে সর্বপ্রথম বাংলাদেশে পতিতাদেরকে যৌন ব্যবসা করার জন্য পতিতালয়ের লাইসেন্স প্রদান করে।
দৌলতদিয়া যৌনপল্লী রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দে অবস্থিত, যা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় যৌনপল্লী। এটি ১৯৮৮ সালে সরকারি অনুমোদন দান করে এরশাদ সরকার। । তবে কয়েক দশক আগে থেকেই সেখানে অনানুষ্ঠানিক এবং অনুমোদনহীন যৌনবৃত্তি চালু ছিল । এরশাদ সরকার সর্বপ্রথম বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তি কে ব্যবসা হিসাবে উল্লেখ করেন এবং এই অশ্লীল জেনা বেবিচার কে সার্বজনীন করে দেন। তার জন্য অবশ্যই আল্লাহর লানত তার উপর কেয়ামত পর্যন্ত বর্ষিত হতে থাকবে যতদিন যৌনপল্লী থাকে। কত নিকৃষ্ট চরিত্রের হলে এরশাদ দরিদ্র মহিলাদেরকে জেনা ব্যভিচার এর মতো জঘন্য এবং মানবতা বিরোধী কাজে লাইসেন্স প্রদান করতে পারেন চিন্তা করুন। এরশাদ শুধু স্বৈরশাসক ছিল না বরং সে ছিল বড় রকমের একজন চরিত্রহীন অসভ্য ইতর প্রকৃতির লোক।
অতঃপর ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশে 14টির মত প্রদীপ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয় এবং বর্তমানে তা অব্যাহত আছে। এরমধ্যে ৭টি ঢাকা বিভাগের মধ্যে ! ছয়টি খুলনা বিভাগে এবং একটি চরমোনাই পীরের বাড়ির কাছে বরিশালে।

কল্পনা করুন,
আপনার দেশে এমন একটা স্থান আছে যেখানে চার হাজার নারী যৌন পেশায় জড়িত।
একই পরিবারের সকল নারী সদস্য একই সাথে সামনা সামনি পরপুরুষের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হচ্ছে। হাতে সিগারেট, টেবিলে ইয়াবা, মদের বোতল। মা মেয়ে একই ঘরে একজন পুরুষের সাথে যৌনতা করছে বিনা সংকোচে।
হ্যাঁ, এটা বৈধ। আপনার দেশেই হচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই হচ্ছে। আপনার আশেপাশেই হচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পীরের বাড়ির কাছেও হচ্ছে। অর্থাৎ বড় বড় লম্বা লম্বা ওয়াজ করা সেই চরমোনাই পীরের বাড়ির কাছেই বাংলাদেশের অন্যতম একটি বড় পতিতালয় অবস্থিত অথচ কোনদিন এই ব্যাপারে সে মুখ খুলতে দেখেছেন?

তবে এখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পতিতালয় এর কথা বলছি , বলছি গোয়ালন্দ, রাজবাড়ির দৌলতদিয়া পতিতা পল্লীর কথা। বাংলাদেশে সরকারিভাবে অনুমোদিত পতিতালয়ের মধ্যে দৌলতদিয়া সবচেয়ে বড় যৌন পল্লী। এশিয়ার সবচেয় বড় পতিতালয়ের অন্যতম এই পল্লীতে প্রতিদিন ৩ হাজারের বেশি পুরুষ যেনা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য আসে। যাদের অধিকাংশই মুসলিম ধর্মাবলম্বী।
মরণব্যাধি এইডস, ক্যান্সার , সিফিলিস গনোরিয়া এবং ভয়াবহ সব ছোঁয়াছে এবং ভাইরাস জনিত চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে এসব নোংরা পল্লী থেকেই।

১৯৮৮ সালে চরিত্রহীন প্রেসিডেন্ট এরশাদ ও তার জঘন্য চরিত্রের অর্থাৎ প্রতিটা চরিত্রের মন্ত্রিসভার লোকদের দ্বারা সরকারিভাবে অনুমোদনের পর থেকে আজ অব্দি নিরলসভাবে এখানে পতিতাবৃত্তি হচ্ছে অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মে। অধিকাংশ যৌন কর্মীর বয়স ১৫ এর নিচে।
যৌনতার পাশাপাশি প্রত্যেক আড্ডাখানায় আছে জুয়া, মদের আসর, ইয়াবা, গাঁজা অর্থাৎ ইসলামী শরিয়ায় নিষিদ্ধ সকল কার্যক্রম চলছে কোনোপ্রকার বাধা বিপত্তি ছাড়াই।

১৪টি অনুমোদিত পতিতালয়সহ দেশের আনাচে-কানাচে সহস্রাধিক অনুমোদনহীন পতিতালয় আছে বাংলাদেশে। একটি বেসরকারি হিসেবে দেখা গেছে, বাংলা দেশে অনুমোদনহীন পতিতালয়ের সংখ্যা ১২০০ এর অধিক। বিভিন্ন জেলা সদরের ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকার হোটেলগুলোতে চলে এই অবৈধ যৌন ব্যবসা।
১৯৮৮ এর এরশাদ কর্তিক যৌনপল্লী অনুমোদনের পর থেকে গত ৩৮ বছর যাবত বাংলাদেশে কয়েক কোটি ওয়াজ মাহফিল হয়েছে।
এখনও প্রতিদিন হচ্ছে বিভিন্ন জেলায়।
দু এক পার্সেন্ট ওয়াজ মাহফিল ছাড়া আজ অব্দি কোনো ওয়াজ মাহফিলে এসব পতিতালয়ের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। ইসলামী শরিয়া আইনে পরপুরুষ পরনারী সঙ্গমে লিপ্ত হলে এটাকে ‘জেনা’ বলা হয়। যার শাস্তি হল যদি সে বিবাহিত হয় তবে পাথর মেরে হত্যা করা। আর যদি অবিবাহিত হয় তবে একশত বেত মারা।
ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে যেহেতু বন্ধ করা যায়নি, এর অর্থ দাঁড়ায় ৩৮ বছরের ৯৮% ওয়াজ মাহফিল সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

অত্যন্ত হাস্যকর এবং অবাক ঘটনা হলো, আমাদের বাংলাদেশে পবিত্র হজের পরেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসলিম জামায়েত অনুষ্ঠিত হয় যা তাবলীগ জামায়াতের ইজতেমা নামে পরিচিত।
এই এস্তেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে হাজার ১৯৫৮সাল থেকে ৬৬ সাল পর্যন্ত লালবাগ এবং ১৯৬৬ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত গাজীপুর জেলার টঙ্গীতে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন তাবলীগের বয়ানে দেশের এই এক হাজারের উপর পতিতালয় এবং ১৪ টি সরকার অনুমোদিত পতিতালয় বন্ধ করার বা সেখানে গমন না করার কোন নসীয়ত শুনেছেন কেউ?
অথচ ইসলামের মূল মন্ত্র হলো “সৎ কাজের আদেশ করা এবং অসৎ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখা।”
মূলত এই সমস্ত ওয়াজ মাহফিল এবং এস্তেমাগুলোতে সস্তা জনপ্রিয় কিছু কথাবার্তা বলা হয় এবং সস্তা কিছু আমলের কথা বলা হয়।

👉👉এবার আসি দ্বিতীয় পয়েন্টে–
৩৮ বছরে বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিলেন এরশাদ, যিনি বাংলাদেশকে ইসলামী জমহুরিয়াত বানাতে চেয়েছিলেন। শুধু তাই নয় তিনি বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট যিনি টুপি মাথায় দেওয়া শুরু করেন এবং নিজের ধার্মিকতা প্রকাশ করার জন্য দেশের বিভিন্ন অলি আউলিয়ার দরবারে আসা যাওয়া শুরু করেন। তাছাড়া তৎকালীন জনপ্রিয় পীর আটরশির একনিষ্ঠ মুরিদ ছিলেন এরশাদ এবং প্রায়ই নাকি সরকারি পয়সা খরচ করে ঢাকা থেকে ফরিদপুর পর্যন্ত হেলিকপ্টারে গিয়ে তিনি জুমার নামাজ পড়তেন তার বাবা পীরের পেছনে।
ক্ষমতায় ছিল বি এনপি, এরপর আওয়ামী লীগ, চারদলীয় জোট, (বিএনপি ,জামাত ইসলামী ঐক্য জোট) মইনুদ্দিন ফখরুদ্দিন, আবার আওয়ামী লীগ টানা ১৭ বছর ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরশাসন চালিয়েছেন এরশাদের চেয়েও জঘন্যভাবে!,
এরপর ২০২৪ সালের পাঁচই আগস্ট গণ অসন্তোষ এবং ছাত্র জনতার বিপ্লবের ফলে হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর ক্ষমতায় আসে ইউনুস রেজিম; যিনি আমূল পরিবর্তন করে ফেলবেন বলে ঘোষণা করেছিলেন। এখন আবার বিএনপি । কোন সরকারই দৌলতদিয়া সহ বাংলাদেশের প্রায় ১৪টি সরকার অনুমোদিত যৌনপল্লীর হাজার হাজার যৌনকর্মীর তথা পতিতার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেনি।
তবে চার দলীয় জোট ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় জামাত ইসলামের পক্ষ থেকে মাওলানা সাঈদী বেশ কয়েকবার বিষয়টি উত্থাপন করলেও বিএনপি কোন আমল দেয়নি বরং বহু এমপি এবং মন্ত্রী বিরোধীতা করেছে। সাঈদী সাহেবের প্রশ্নের জবাবে এটাও বলেছে যে, দেশে পতিতালয় থাকলে নাকি ধর্ষণ সংখ্যা কমে যাবে। অথচ ধর্ষণের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে।
আজকাল হঠাৎ মন্ত্রী হয়ে যাওয়া বা পয়সা দিয়ে নমিনেশন খরিদ করে এমপি হয়ে যাওয়া বহু লোককে সংসদে দাঁড়িয়ে বড় বড় বক্তৃতা দিতে দেখা যায়। স্বার্থে আঘাত লাগলে সংসদের ভেতরে এবং বাইরে গালাগালি এবং অপবাদ দিতেও দেখা যায়। এবং নারীদের পক্ষে কথা বলার জন্য বহু লোক পাওয়া যায় কিন্তু দেশের লক্ষ লক্ষ যৌনকর্মীদের পক্ষে এবং তাদের সম্মান ও কর্মসংস্থানের ব্যাপারে একমাত্র জামাত ছাড়া আর কাউকে কথা বলতে শোনা যায়নি।
জামাতের কোন এমপি বা কোন নেতা যতবার যৌনপল্লী গরু বন্ধ করার কথা বলেছেন ততবারই বিরোধী পক্ষগুলো এবং তথাকথিত নারী পক্ষ গুলো, এবং নাস্তিকেরা ও বামপন্থীরা হেই হেই গেল গেল বলে চিৎকার করতে করতে জামাতের মুখ স্তব্ধ করে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। এবছরের জামাতে ইসলামের নির্বাচনের বিভিন্ন বক্তৃতা ও প্রতিশ্রুতির মধ্যে ও পতিতাদের পুনর্বাসন করা এবং হিজড়াদের পুনর্বাসন করার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে তাদের প্রায় একশত আসন চুরি করে নিয়ে যাওয়ার ফলে তারা আর ক্ষমতায় যেতে পারেনি।
যারা এই দেশে পতিতালয় রাখতে চায়, তাদের যুক্তি হলো- এটা নাকি পেশা! ইজ্জত বিক্রি করে দুনিয়াতে কোন পেশা হতে পারে না। এই পতিতারা শুধু নিজেরা পতিতা নয় বরং এক একজন পতিতার কাছে যাচ্ছে বছরের প্রায় ৪ #পতিত পুরুষ। এরা #পতিতা হলেও পুরুষ কিন্তু “পতিত” হয় না!
পতিতালয়ে গমন করা বহু পতিত পুরুষকে আমি প্রতিটা বলে গালি দিতে দেখেছি এবং শুনেছি।

👉👉 প্রায়শই ছাত্রদের আন্দোলন করতে দেখা যায়। রাস্তায় বসে, বৃষ্টিতে ভিজে ঢাবির শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছে। এটা চাই ওটা চাই, দাবী পূরণ করতে হবে। কিন্ত কারও দাবীতে যৌনকর্মীদের কথা নেই। এবং মাদকবিরোধী কথাবার্তা নেই। যদিও বাংলাদেশি ইসলামী ছাত্রশিবির এই সমস্ত কথার বিরুদ্ধে কিছু বলতে চেষ্টা করে ঠিক তখনই চারদিক থেকে রে রে করে ছুটে আসে এ তথাকথিত সেক্যুলার , ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী , জাতীয়তাবাদী ও অন্যান্য এমনকি নারীবাদী সংগঠন পর্যন্ত তাদের সমালোচনা করে ছাড়ে না।

একটি দেশে ১৪ টি অনুমোদিত এবং সহস্রাধিক অনুমোদনহীন যৌন পল্লী থাকা নিশ্চয়ই গর্বের বিষয় নয়। বরং এটি আমাদের জাতীয় লজ্জা। যেখানে দেশের ৯০% মুসলিম। এবং দেশের অলিতে গলিতে গড়ে উঠেছে ব্যাঙের ছাতার মত হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসা। এমনকি বহু মাদ্রাসা এ পতিতালয় থেকে দান-খয়রাত নিয়েও চলে এবং পতিতারা তাদের পাপ মোচনের জন্য এবং নেকির উদ্দেশ্যে মাদ্রাসাগুলোতে দান করে থাকে এমন বহু প্রমাণ রয়েছে।
তাছাড়া বাংলাদেশ #হেফাজতে_ইসলাম নামক বিরাট এক সংগঠন আছে যাদের উদ্দেশ্য হল ইসলামকে হেফাজত করা (যদিও তাদের মুখ এবং চরিত্রকে আজ পর্যন্ত তারা হেফাজত করতে পারেনি এবং হেফাজত করতে পারেনি তাদের কর্মীদের যেখানে শাপলা চত্বরে তাদের পিটিয়ে মারা হয়েছে! )
যতদিন অবাধে এসব যৌনতা চলবে, ততদিন এদেশে কোনো ওয়াজ মাহফিল, তাবলীগ জামাত, ইজতেমা, নামাজ রোজা হজ্ব প্রায় অর্থহীন। কারণ যে ইসলাম যে ওয়াজ মাহফিল যে তাবলীগ ও এস্তেমা পতিতালয় বন্ধ করতে পারেনা, যারা এই সমস্ত পতিতালয় বন্ধ করার জন্য সরকারকে চাপ দেয় না বরং যে সরকার এই সমস্ত পতিতালয় চালু রাখে সেই সরকারকে সমর্থন দিয়ে ক্ষমতায় নেয় তাদের এবাদত কতটা কবুল হবে তা একমাত্র আল্লাহ জানেন।
যৌন পল্লী বন্ধ না করে উন্নয়ন প্রকল্পের পদক্ষেপ নিলে সেটাও অর্থহীন। যারা মানুষের উন্নয়ন করতে পারেনা যারা দরিদ্র শ্রেণীর নারীদের উন্নয়ন করতে পারেনা সেই দেশে অন্যান্য উন্নয়ন মূলত কিছুই না। প্রথমে তো মানুষ। একটা কথা আছে, সবার উপর মানুষত্ব তাহার উপর নাই। সেই মানুষেরই যখন উন্নয়ন হয় না, সেখানে অবকাঠামোর উন্নয়ন একটা ধোকাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনি বাড়িতে একটা কুকুর পালন করেন সেই কুকুরকে খাবার না দিয়ে এবং চিকিৎসা না দিয়ে যদি কুকুরের ঘর বানানোর জন্য সুন্দর ও দৃষ্টি নন্দন উপকরণ কিনে আনেন তাহলে এই কুকুরের লাভ হল কি?
সরকারের উচিত দ্রুত এগুলোর অনুমোদন বাতিল করে হালাল পন্থায় যৌন কর্মীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। তাদের জন্য বিশেষ করে আলাদাভাবে প্রকল্প হাতে নেওয়া এবং ঐ সমস্ত প্রকল্প সরাসরি সরকার দ্বারা পরিচালিত করে এবং দুর্নীতিমুক্ত করে তাদের কাজে লাগানো এবং প্রশিক্ষণ দেওয়া। আর হিজড়া সম্প্রদায়কে বিভিন্ন কাজের ও চাকরির আওতায় নিয়ে আসা।
Mahabubur Rahman
mahabuburrahman1720@gmail.com

রাসূলুল্লাহ সাঃ এর দৃষ্টিতে সর্বোত্তম মানুষ

🇸🇦🇸🇦 রাসূলুল্লাহ সাঃ এর দৃষ্টিতে “সর্বোত্তম মানুষ”।

মানুষের মর্যাদা ধন-সম্পদ বা বাহ্যিক অবস্থার উপর নয়; বরং ঈমান, চরিত্র ও নেক আমলের উপর নির্ভর করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে এমন কিছু গুণের কথা শিখিয়েছেন, যেগুলো অর্জন করলে একজন মানুষ আল্লাহর কাছে প্রিয় ও মর্যাদাবান হয়ে ওঠে। নিচে হাদিসের আলোকে সেই ১২টি গুণ তুলে ধরা হলো—নিজেকে মিলিয়ে দেখার জন্য:

🇸🇦রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন,
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে নিজে কুরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।”
(সহিহ বুখারি: ৫০২৭)
কুরআনের সাথে যার সম্পর্ক গভীর, সে আল্লাহর কাছে তত প্রিয়।

🇸🇦“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।”
(সহিহ বুখারি: ৬০৩৫)
উত্তম আখলাক একজন মুমিনের আসল পরিচয়।

🇸🇦 সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে ঋণ পরিশোধে উত্তম।”
(সহিহ বুখারি: ২৩৩৫)
দায়িত্বশীলতা ও আমানতদারিতা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

🇸🇦সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যার থেকে মানুষ কল্যাণ আশা করে এবং অনিষ্টের ভয় করে না।”
(তিরমিজি: ২২৬৩/২৪০১)
একজন প্রকৃত মুমিন মানুষের জন্য নিরাপত্তার উৎস।

🇸🇦তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।”
(সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪১৭৭)
পরিবারের সাথে আচরণই একজন মানুষের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।

🇸🇦 সর্বোত্তম সে, যার জীবন দীর্ঘ এবং আমল উত্তম।”
(মুসনাদ আহমাদ: ৭২১২)
দীর্ঘ জীবন তখনই মূল্যবান, যখন তা নেক আমলে পরিপূর্ণ হয়।

🇸🇦 সর্বোত্তম মানুষ সে, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।”
(সহিহুল জামে’: ৩২৮৯)
মানুষের উপকারে আসাই প্রকৃত সফলতা।

🇸🇦 শ্রেষ্ঠ মানুষ সে, যার অন্তর পরিষ্কার এবং জিহ্বা সত্যবাদী।”
(ইবনে মাজাহ: ৪২১৬)
হিংসা, বিদ্বেষ ও প্রতারণামুক্ত হৃদয়ই প্রকৃত সৌন্দর্য।

🇸🇦 আল্লাহর কাছে উত্তম সঙ্গী সে, যে তার সঙ্গীর জন্য উত্তম। আর উত্তম প্রতিবেশী সে, যে তার প্রতিবেশীর জন্য উত্তম।”
(তিরমিজি: ১৯৪৪)
সুন্দর সম্পর্ক একজন মানুষের মর্যাদা বাড়ায়।

🇸🇦 নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সে, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।”
(সহিহ বুখারি: ৩৫৫৯)
আখলাকের গুরুত্ব বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

🇸🇦 মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সে, যে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায় এবং অন্যায়কে প্রতিহত করে।”
(সহিহুল জামিউস সাগীর: ৪২৯১)
সাহস ও ন্যায়ের প্রতি অটল থাকা বড় গুণ।

🇸🇦 সেই মুমিন শ্রেষ্ঠ, যে আল্লাহর পথে তার জান ও মাল দিয়ে সংগ্রাম করে।”
(সহিহ বুখারি: ২৭৮৬, মুসলিম: ১৮৮৪)
ত্যাগ ও কুরবানি ঈমানকে পরিপূর্ণ করে।

এই গুণগুলো একদিনে অর্জন করা সম্ভব নয়, তবে চেষ্টা শুরু করা যায় আজ থেকেই। প্রতিদিন একটি করে গুণ নিজের জীবনে আনার চেষ্টা করলে ধীরে ধীরে আমরা সেই উত্তম মানুষের কাতারে পৌঁছাতে পারি, যাদেরকে রাসূলুল্লাহ  সাঃ ভালোবাসতেন।

জাপান! কথিত সভ্য জাতির এক অসভ্য ইতিহাসের গল্প…

চিন্তা করে দেখুন, পৃথিবীতে এমন একটি দেশ আছে যাকে আজ সভ্য, উন্নত এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ জাতি হিসেবে সবাই সম্মান করে। সেই দেশের মানুষকে বলা হয় ন্যায়পরায়ণ, পরিশ্রমী, দয়ালু এবং শান্তিপ্রিয়। আধুনিক প্রযুক্তি, শিক্ষা আর উন্নয়নের উদাহরণ হিসেবে বহু দেশের তরুণদের কাছে তারা আজ অনুপ্রেরণা।

কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। একসময় এই দেশই নিজেদের সামরিক শক্তির দাপটে পুরো এশিয়াজুড়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে দিয়েছিল। ক্ষমতা আর আধিপত্যের নেশায় বহু দেশকে যুদ্ধ, ধ্বংস আর মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। এই দেশের অতীত ইতিহাস অত্যন্ত জঘন্য; ইতিহাসের পাতায় তাদের কর্মকাণ্ড সভ্য না অসভ্য জাতি হিসাবে বেশি পরিচিত।
দেশটির নাম জাপান। শুনে কি একটু অবাক লাগছে?

১৯৩০ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জাপানের সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছিল, যেখানে যুদ্ধ শুধু সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ ছিল না; বরং কোটি মানুষের জীবনে নেমে এসেছিল সংগঠিত সহিংসতা, যৌন দাসত্ব, গণহত্যা, বাধ্যতামূলক শ্রম এবং ব্যাপক সম্পদ লুটের এক দীর্ঘ অন্ধকার অধ্যায়।

জাপান তখন দ্রুত শিল্পশক্তিতে পরিণত হচ্ছিল, কিন্তু তাদের বড় সমস্যা ছিল প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব তাদের কোন প্রাকৃতিক সম্পদ নাই। তেল, লোহা, রাবার, খাদ্যশস্য—সবকিছুর জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো। সামরিক নেতৃত্ব বিশ্বাস করতে শুরু করে, যদি তারা এশিয়ার সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চল দখল করতে পারে, তাহলে জাপান বিশ্বশক্তি হয়ে উঠবে। এই চিন্তাধারা থেকেই শুরু হয় সামরিক সম্প্রসারণ, যা শেষ পর্যন্ত কয়েক কোটি মানুষের জীবনে অভিশপ্ত করে তুলে।

সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় শুরু হয় চীনে। ১৯৩৭ সালে জাপানি বাহিনী নানজিং শহরে প্রবেশ করার পর যা ঘটে, তা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত। মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে আনুমানিক ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ মানুষ নিহত হয় বলে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ও বহু ঐতিহাসিক গবেষণায় উল্লেখ আছে। শহরের রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে মানুষকে গুলি করা, নদীর ধারে গণহত্যা, জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে মারা—এসব ঘটনা প্রত্যক্ষদর্শীদের ডায়েরি ও বিদেশি কূটনীতিকদের রিপোর্টে উঠে আসে। অনেক গবেষক অনুমান করেন, শুধু নানজিংয়েই প্রতিদিন গড়ে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল।

এই হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি ঘটে ব্যাপক যৌন সহিংসতা। বিভিন্ন গবেষণায় অনুমান করা হয়, নানজিং দখলের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় ৮০,০০০ থেকে ১০০,০০০ নারী ধর্ষণের শিকার হন। বয়স ছিল ৮ বছর থেকে ৩৫ বছর। অনেক নারীকে পরিবার সদস্যদের সামনে নির্যাতন করা হয়, এরপর হত্যা করা হয় যাতে কোনো সাক্ষী না থাকে। এই ঘটনাগুলো এতটাই ব্যাপক ছিল যে বিদেশি মিশনারিরা শহরের মধ্যে “সেফটি জোন” তৈরি করে হাজার হাজার নারীকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।

কিন্তু নানজিং কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। জাপানি সামরিক বাহিনী যুদ্ধ চলাকালে একটি সংগঠিত যৌন দাসত্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যা ইতিহাসে “কমফোর্ট উইমেন” নামে পরিচিত। নামটি যতই নরম শোনাক, বাস্তবে এটি ছিল সামরিক নিয়ন্ত্রিত যৌন দাসত্ব। কোরিয়া, চীন, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার এবং অন্যান্য দখলকৃত অঞ্চল থেকে নারী ও কিশোরীদের অপহরণ বা প্রতারণার মাধ্যমে নিয়ে গিয়ে সামরিক ক্যাম্পে বন্দি রাখা হতো।

ইতিহাসবিদদের অনুমান অনুযায়ী এই ব্যবস্থায় অন্তত ২০০,০০০ থেকে ৩,০০,০০০ নারী জোরপূর্বক যৌন দাসে পরিণত হন। কিছু গবেষণা বলছে প্রকৃত সংখ্যা ৫ থেকে ৬ লাখ পর্যন্ত হতে পারে, কারণ যুদ্ধ শেষে বহু নথি ধ্বংস করা হয় এবং অসংখ্য ভুক্তভোগী সামাজিক লজ্জার কারণে কখনো সামনে আসেননি। প্রতিদিন একজন নারীকে ২০ থেকে ৪৫ জন সৈন্য পর্যন্ত নির্যাতন করত—এমন সাক্ষ্য বহু বেঁচে থাকা নারীর জবানবন্দিতে পাওয়া গেছে। যুদ্ধ শেষে অনুমান করা হয়, এই নারীদের অর্ধেকেরও বেশি জীবিত ফিরে যেতে পারেননি।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জাপানের দখলদারিত্ব আরেক ধরনের মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। ইন্দোনেশিয়ায় “রোমুশা” নামে বাধ্যতামূলক শ্রম ব্যবস্থা চালু করা হয়। আনুমানিক ৮০ লাখের বেশি মানুষকে শ্রমে বাধ্য করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তাদের দিয়ে রেললাইন, সামরিক ঘাঁটি, রাস্তা ও বিমানঘাঁটি নির্মাণ করানো হয়। খাদ্যস্বল্পতা, রোগ এবং নির্যাতনের কারণে লাখ লাখ শ্রমিক মারা যায়। অনেক অঞ্চলে মৃত্যুহার এত বেশি ছিল যে শ্রমিকদের গণকবর দেওয়া হতো।

মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড সীমান্তে নির্মিত কুখ্যাত বার্মা রেলওয়ে ছিল এই শ্রম ব্যবস্থার প্রতীক। প্রায় ৩ লাখ এশীয় শ্রমিক এবং ৬০ হাজার যুদ্ধবন্দী সেখানে কাজ করতে বাধ্য হয়। অনুমান করা হয়, শুধু এই রেললাইন নির্মাণেই ১২০০০০ হাজারের বেশি এশীয় শ্রমিক এবং ৩০ হাজারের বেশি যুদ্ধবন্দী প্রাণ হারান।

ফিলিপাইনে জাপানি দখলদারিত্বের শেষ পর্যায়ে ১৯৪৫ সালে ম্যানিলা শহর প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। কয়েক সপ্তাহে আনুমানিক ২ লাখ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়। শহরের হাসপাতাল, স্কুল ও ধর্মীয় স্থাপনাও রক্ষা পায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীরা লিখেছেন, অনেক পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

কোরিয়ায় দীর্ঘ ৩৫ বছরের উপনিবেশ শাসনের সময় জাপান শুধু রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণই নেয়নি, সাংস্কৃতিক পরিচয়ও মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল। কোরিয়ান ভাষা ব্যবহার সীমিত করা হয়, মানুষকে জাপানি নাম নিতে বাধ্য করা হয়, এবং শিল্প ও কৃষি উৎপাদনের বড় অংশ জাপানে পাঠানো হতো। যুদ্ধের সময় লক্ষাধিক কোরিয়ান শ্রমিককে জাপানের কারখানা ও খনিতে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও জাপানের দখলদারিত্ব ছিল ব্যাপক লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তেল, রাবার ও খনিজ সম্পদ সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়। ইন্দোনেশিয়ার তেলক্ষেত্র, মালয়েশিয়ার রাবার বাগান এবং চীনের শিল্প কারখানা জাপানি সামরিক অর্থনীতির অংশে পরিণত হয়। ঐতিহাসিক অনুমান অনুযায়ী দখলকৃত অঞ্চলগুলো থেকে যুদ্ধ চলাকালে শত শত কোটি ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ জাপানের নিয়ন্ত্রণে যায়, যা বর্তমান মূল্যে ট্রিলিয়ন ডলারের সমান অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রতিনিধিত্ব করে।

এই সময় খাদ্য সংকটও একটি বড় অস্ত্র হয়ে ওঠে। অনেক অঞ্চলে খাদ্য জব্দ করে সেনাবাহিনীর জন্য রাখা হতো, ফলে সাধারণ মানুষ অনাহারে মারা যেত। চীনের কিছু এলাকায় দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন পর্যন্ত পৌঁছায় বলে গবেষকরা ধারণা করেন।

ইতিহাসবিদদের হিসাব অনুযায়ী, জাপানের সামরিক অভিযানের ফলে এশিয়াজুড়ে মোট নিহতের সংখ্যা ২.৫ থেকে ৩ কোটিরও বেশি হতে পারে, যার বড় অংশই ছিল বেসামরিক মানুষ। এই সংখ্যার মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত সৈন্যের তুলনায় সাধারণ মানুষের মৃত্যুই বেশি।

তবে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জাপান নিজেও ভয়াবহ ধ্বংসের মুখে পড়ে। টোকিওসহ বহু শহর বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়, শিল্পভিত্তি ভেঙে পড়ে, এবং শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক হামলার মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। ফলে যে সাম্রাজ্য গড়ার স্বপ্ন থেকে এই অভিযান শুরু হয়েছিল, সেটি সম্পূর্ণ বিপর্যয়ে শেষ হয়।

আজ এশিয়ার বহু দেশে সেই সময়ের স্মৃতি এখনো রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার অংশ। কোরিয়ার বেঁচে থাকা “কমফোর্ট উইমেন”রা বহু দশক ধরে ক্ষমা ও স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন করেছেন। চীনে নানজিং গণহত্যার স্মৃতিসৌধ প্রতি বছর লাখো মানুষ পরিদর্শন করে। ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার বহু পরিবার এখনো তাদের নিখোঁজ পূর্বপুরুষদের গল্প ধরে রেখেছে।

এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের ভয়াবহতা শুধু বন্দুকের শব্দে সীমাবদ্ধ থাকে না। যুদ্ধ শেষ হলেও তার প্রতিধ্বনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকে। হারিয়ে যাওয়া মানুষ, ভাঙা সমাজ এবং নীরব কষ্টের গল্পগুলোই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে সত্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ মানচিত্র বদলায় দ্রুত, কিন্তু মানুষের স্মৃতি বদলাতে অনেক সময় লাগে।