
ঐতিহ্যগতভাবে একটি প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে যে “ব্যবহারে বংশের পরিচয়”, তবে আধুনিক চিন্তাভাবনা ও সামাজিক বিশ্লেষণে এটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
জনপ্রিয় এই ভুল প্রবাদটি ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তবতার আলোকে সঠিক নয়।
আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান ইসলামে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার ব্যক্তিগত চরিত্র, তাকওয়া বা আল্লাহভীতি, মানুষের ব্যক্তিগত আচরণ তথা কর্মের মাধ্যমে।
বংশের বা গোত্রের মাধ্যমে নয়।
ব্যবহারে বংশের পরিচয়” বাক্যটির মূল উৎস হলো সংস্কৃত ভাষা। মূলতঃ এটি একটি সংস্কৃত শ্লোক যার সংস্কৃত উচ্চারণ হল- “কুলমাখ্যাতি দেশমাখ্যাতি ভাষণম্”।
অর্থ: আচার বা ব্যবহার দিয়ে বংশের পরিচয় পাওয়া যায় এবং ভাষা বা কথা বলার ভঙ্গি দিয়ে অঞ্চলের পরিচয় পাওয়া যায়।
এই নীতিবাক্যটি প্রাচীন ভারতীয় বা সংস্কৃত সাহিত্য যেমন চাণক্য নীতি বা বিভিন্ন সুভাষিত থেকে প্রচলিত হয়ে পরবর্তীকালে বাংলাসহ অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় প্রবাদ হিসেবে রূপ লাভ করেছে।
সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলায় রূপান্তরিত এই প্রবাদ বাক্যটির সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ইংরেজি হল- Manners make the man.
তবে আমাদের ভুল বুঝতে লেখা থাকলেও ইংরেজরা এই কথাটা বিশ্বাস করে না।
✅✅এ ব্যপারে ইসলাম কী বলে আসুন তা জেনে নেয়া যাক:
ব্যক্তিগত দায়ভার ও পরিচয়ের ক্ষেত্রে ইসলামে প্রত্যেক মানুষ তার নিজের কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে।
সূরা ইসরা ও সূরা ফাতির এ আল্লাহ বলেন-
“কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।” । অর্থাৎ একজনের পাপের ভার অন্যজন গ্রহণ করবে না।
ভালো বংশে জন্ম নিলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো হয়ে যায় না, আবার খারাপ বংশে জন্ম নিলেও সে খারাপ হবে এমন নয়।
তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়ে খারাপ থাকাই কাজ থেকে বিরত থাকাই হলো শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি। ইসলামে বংশ, বর্ণ বা আভিজাত্যের চেয়ে আল্লাহর কাছে তাকওয়া বা উত্তম চরিত্রই গ্রহণ যোগ্যতা রয়েছে।
আবুল হাশেম রচিত “বিদায় হজ্জ” কবিতার জনপ্রিয় দুটি পংক্তি হলো-
“নহে আশরাফ যার আছে শুধু
বংশের পরিচয়,
সেই আশরাফ জীবন যাহার
পুণ্য কর্মময়।”
আরবী ‘আশরাফ’ শব্দের বাংলা অর্থ হলো কুলীন, সম্ভ্রান্ত বা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি।
কবি এখানে তার কবিতার মাধ্যমে বুঝাতে চেয়েছেন- কেবল উচ্চবংশ বা পরিবারে জন্ম নিলেই কেউ প্রকৃত কুলীন বা মহৎ হতে পারে না। মানুষের আসল পরিচয় তার বংশে নয়, বরং তার সৎকর্ম, চরিত্র ও কল্যাণকর কাজের মধ্যে নিহিত। যিনি ভালো ও পুণ্যময় কর্ম করেন, সমাজে তিনিই প্রকৃত ‘আশরাফ’ বা শ্রেষ্ঠ মানুষ।
রাসুলুল্লাহ সা. বিদায় হজের ভাষণে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, আরব-অনারব কিংবা সাদা-কালো চামড়ার মাঝে কোনো ভেদাভেদ নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া।
পরিচিতির জন্য বংশের গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু বংশ চরিত্র বা আচরণের মাপকাঠি নয়।
ইসলামে বংশ পরিচয় জানা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার গুরুত্ব দেয়,তবে তা বাধ্যতামূলক নয়।
নুহ আ.-এর পুত্র কিংবা লুত আ.-এর স্ত্রীর মতো উত্তম বংশে বা পরিবারেও অবাধ্য ও মন্দ চরিত্রের মানুষ জন্ম নিয়েছে।
আবার অনেক সাধারণ বা ভিন্ন বংশ থেকেও ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মহামানব তৈরি হয়েছেন।
আলী রাঃ, সালমান ফারসি রাঃ এর বংশ বা গোত্র পরিচয় কি? কিন্তু তাদের অবস্থান এবং মর্যাদা আজ কোথায়!
ভালো বা মন্দ আচরণ মূলত ব্যক্তির নিজস্ব শিক্ষা, রুচি ও চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ, কোনো বংশের সিলমোহর নয়।
👉👉 “ব্যবহারে বংশের পরিচয়” প্রবাদ বাক্যটি কোনো নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির বলা সুনির্দিষ্ট বা মৌলিক কোনো উক্তি নয়; এটি বাংলা ভাষার একটি প্রচলিত প্রবাদ বা লোকজ বচন, যা বহু প্রাচীনকাল থেকেই সমাজে মুখে মুখে চলে আসছে।
এই প্রবাদটির মাধ্যমে বোঝানো হতো যে, ভালো পরিবারের সন্তানরা সাধারণত ভালো ও মার্জিত ব্যবহার করে থাকে।
তবে আধুনিককালে এই প্রবাদটি নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনা রয়েছে। এবং এই কথাটি যে ভুল তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্যবহারে মূলত ব্যক্তির নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, শিক্ষা ও চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়; কারণ ভালো বংশেও অনেক সময় খারাপ চরিত্রের মানুষ বা কুলাঙ্গার জন্ম নিয়েছে।
ব্যবহারে বংশের পরিচয়” প্রবাদটি সর্বপ্রথম সংস্কৃত ভাষায় প্রচলিত হয়।
সংস্কৃত সাহিত্যের প্রাচীন নীতিশ্লোক।
সংস্কৃত ভাষায় এই বিষয়টি নিয়ে বিখ্যাত একটি শ্লোক রয়েছে:
“মানুষের আচার-ব্যবহার বা আচরণ দেখে তার বংশ বা কুল সম্পর্কে পরিচয় পাওয়া যায়।” এই কথাটি আধুনিক গবেষণায় সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কেননা ব্যবহার বংশের পরিচয় নয় বরং
“ব্যবহার হল ব্যক্তির পরিচয়।”
আরবী ভাষায় একটি প্রবাদ আছে-
মানুষের ” মানুষের ভাষা বা কথা বলার ধরন থেকে তার অঞ্চলের পরিচয় মেলে।” এই কথাটা তো আমরা সবাই জানি। চট্টগ্রাম, সিলেট বা নোয়াখালীর মানুষের কথা শুনেই বোঝা যায় তারা কোন এলাকা থেকে আগত।
সংস্কৃত নীতিশাস্ত্র, চাণক্য নীতি বা বিভিন্ন পুরাণে এই শিক্ষাগুলো বহুকাল ধরে প্রচলিত ছিল। যে “ব্যবহারে বংশের পরিচয়”! বিশেষ করে প্রাচীন হিন্দু বিভিন্ন নীতিবাক্য থেকে এই ভুল কথাটি প্রচলিত হয়ে আসছে। আর এই বংশগুলো বা বংশের classification যেমন উচ্চ বংশ – নিম্ন বংশ ইত্যাদি এসেছে হিন্দুদের ধর্মীয় আচার-আচরণ থেকে। যেমন ব্রাহ্মণরা তাদের সন্তানদের শিক্ষা দেয়- “ব্রাহ্মণ হল ভগবানের মোচ থেকে তৈরি। অতএব তোমার আচরণ যেন বংশের পরিচয় বহন করে। সেখান থেকেই মূলত “ব্যবহারে বংশের পরিচয়” কথাটার প্রচলন।
✅ ‘ব্যবহার ব্যক্তির পরিচয়’, বংশের নয়! তুর্কি ভাষায় একটি প্রবাদ আছে-
“খড়ের আগুন দিয়ে যেমন সোনা চেনা বা পরীক্ষা করা যায়, তেমনি মানুষের আচরণের বা ব্যবহারের মাধ্যমে তার আসল পরিচয় বা আভিজাত্য জানা যায়।”








