আয়াত এবং তেলাওয়াত, পবিত্র কোরআনের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা।

📕📘 আয়াত ও তেলাওয়াত (বাক্য এবং তা পাঠ করা) এর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বারবার তাকিদ করেছেন এবং উল্লেখ করেছেন। সেই বিষয়গুলো মুফাসসিরগণ তাদের গবেষণা ও লেখনীর যারা তুলে ধরেছেন বিভিন্ন জায়গায় তাদের বিভিন্ন বই-পুস্তক ও তাফসীর গ্রন্থ সমূহে।
নিচে তেলাওয়াত এবং আয়াত এর বিষয়ে আলেমদের গবেষণালব্ধ একটি মোটামুটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো–

📕📘#তেলাওয়াত
“তেলাওয়াত” শব্দটি কুরআনের বেশ কিছু জায়গায় ব্যবহার হয়েছে। তবে এই শব্দটির আক্ষরিক অর্থ এবং ব্যবহারিক মর্মার্থ দ্বারা কুরআন না বুঝে পড়াকে বোঝানো হয়নি। বরং এই শব্দটি কুরআনে ব্যবহার করা হয়েছে, জানার জন্য পড়া এবং জানিয়ে দেওয়ার জন্য পড়াকে বুঝাতে।

— অর্থাৎ কুরআনের কথাগুলো পড়ে জানা এবং মানুষকে জানানো ও বোঝানো এবং এর মাধ্যমে মানুষের লাইফ স্টাইলকে সংশোধন করা, পবিত্র করা, আল্লাহর দেওয়া জ্ঞান এবং দিকনির্দেশনা অনুযায়ী মানুষের লাইফ স্টাইলকে সাজানো এবং আধুনিক ও বিজ্ঞান সম্মত, স্বাস্থ্য সম্মত করা। আল্লাহর বলা জ্ঞান অনুযায়ী নিজেকে সংশোধন ও বাস্তবসম্মত করা। মানুষকে আল্লাহর বলা কুরআনের কথাগুলো শোনানো এবং এর মাধ্যমে মানুষের জীবন বাস্তবতা সম্পর্কে জানানো, কুরআনের কথা শুনিয়ে মানুষকে জ্ঞান এবং হিকমাহ্ (বাস্তব পদ্ধতি) শিক্ষা দেওয়া, ইত্যাদি বুঝাতে কুরআনে তেলাওয়াত শব্দটি ব্যবহার হয়েছে।

অর্থাৎ পবিত্র কুরআনে তেলাওয়াত শব্দটির ব্যবহারিক মর্মার্থ দ্বারা কুরআন না বুঝে পাড়াকে বোঝানো হয়নি। বরং এই শব্দটি দ্বারা কুরআনের কথাগুলো জানার জন্য পড়া এবং জানিয়ে দেওয়ার জন্য পড়া বুঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে।

শব্দটি দ্বারা বুঝায়, বর্ণনা করা, শোনানো, জানিয়ে দেওয়া, আবৃত্তি করে শুনিয়ে দেওয়া। উদ্দেশ্য হলো: কোন বিষয় সম্পর্কে সরাসরি আল্লাহর বক্তব্য কি এবং এবিষয়ে আল্লাহর দিকনির্দেশনা কি; তা জানিয়ে দেওয়া। আল্লাহর আলোচনা বা বর্ণনা শুনিয়ে দেওয়া। তাঁর বলা আইন ও দন্ডবিধি সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়া এবং এর মাধ্যমে সংশোধন ও পবিত্র করা।

এ বিষয়টি সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জানতে কুরআনের এই আয়াতের কথাগুলো ভালোভাবে দেখা যেতে পারে —-

  • সূরা বাকারা-129, 151,
  • সূরা ইমরান-164,
  • সূরা যুমার-71
  • সূরা ত্ব’লাক-11,
  • সূরা জুমা-2,
  • সূরা মারইয়াম-73,
  • সূরা ইউনুস- 15,
  • সূরা ক্বলম- 15,
  • সূরা মুমিনূন- 66-
  • সূরা জাসিয়া- 6,

📕📘 এবার আসা যাক #আয়াত এর ব্যাপারে। আয়াত অর্থ বাক্য বা বাক্যাং। আর এই বাক্যগুলোকে ইংরেজিতে ভার্স বলা হয়। প্রতিটা আয়াত বা ভার্স আলাদা আলাদা মনোভাব ও অর্থ প্রকাশ করে থাকে। এবং সার্বিক একটা বিষয়কে উপস্থাপন করার জন্য অনেকগুলি ভার্স বা আয়াত একত্রে প্রয়োজন হতে পারে।
“আয়াত” শব্দটি কুরআনের প্রায় দুই শতাধিক জায়গায় ব্যবহার হয়েছে। যার অর্থ প্রমাণ, নিদর্শন, দলিল, চিহ্ন, সূত্র, আলামত, বাস্তবতার নির্দেশক, নিশানা ইত্যাদি। আয়াত হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বিষয়ের দিকনির্দেশনা, আলোচনা বা বর্ণনা, যা কোন বিষয়ের বৈজ্ঞানিক, আধুনিক, মানবিক, সামাজিক কিংবা এককথায় সার্বিক বাস্তবতা বোঝার জন্য সূত্র এবং মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। যখন কোন কিছু দেখে ও বুঝে কিংবা জেনে, আল্লাহর সত্যতা কিংবা তাঁর আলোচনা, তাঁর হুকুম ও দিকনির্দেশনার বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা, যথার্থতা এবং এর সত্যতা উপলব্ধি করতে পারা যায় তখন তাকে আয়াত বলা হয়।

কোন কিছু প্রমাণ করার জন্য যেসব উপাদানগুলো; প্রমাণ, দলিল কিংবা প্রয়োজনীয় সূত্র হিসেবে কাজ করে, সেইসব উপাদানকেই বলা হয় আয়াত বা নির্দেশক।

অন্যভাবে বলতে গেলে: যে বাস্তবতা দেখা বা প্রত্যক্ষ করার কারণে; বুঝা বা জানার কারণে এবং যে মৌজেযা বা অলৌকিকতা উপলব্ধি করার কারণে তা অস্বীকার করার আর কোনো সুযোগ থাকে না, তাকে আয়াত বা নিদর্শন বলা হয়।

এছাড়াও বলাযায় যে, যখন কোন বিষয়ের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য অন্য কোন বিষয় এসে সেখানে আলামত বা চিহ্ন হিসাবে কাজ করে, তখন তাকে আয়াত বলা হয়।

কোন বিষয়ের সত্যতা এবং যথার্থতা বোঝার জন্য যখন অন্য কোন কিছু এসে সেখানে প্রত্যক্ষ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়, যা সত্য প্রমাণের জন্য নির্দেশক হিসেবে কিংবা নিশানা বা নিশানী হিসেবে কাজ করে, তখনই তাকে আরবিতে আয়াত বা নিদর্শন বলা হয়।

যেমন প্রকৃতিতে যে বাস্তবতা রয়েছে তাও আয়াত বা আল্লাহর নিদর্শন। যা আল্লাহর সত্যতাকে প্রমাণ করে, অর্থাৎ এর সৃষ্টিকর্তাকে প্রমাণ করে। ঠিক একই ভাবে কুরআনের কথাগুলো নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আল্লাহর সত্যতাকে প্রমাণ করে। যেহেতু কুরআনের আয়াত বা কথাগুলো অস্বীকার করার কোন সুযোগ কিংবা সূত্র মানুষের হাতে নাই বা নেই।

অর্থাৎ কুরআনের কথাগুলোকে আয়াত বা নিদর্শন বলার কারণ হলো এটি একদিকে নিজেই স্বয়ংক্রিয় ভাবে দলিল বা প্রমাণ হিসাবে কাজ করে। আবার অন্যদিকে প্রকৃতি, বিজ্ঞান এবং মানুষের জীবন বাস্তবতাও, কুরআনের কথাগুলোর সত্যতার বিষয়টিকে প্রমাণ করে দিতে এবং বাস্তবে দেখিয়ে দিতে সহায়তা করে।

যখন কোনো মাধ্যম কিংবা প্রয়োজনীয় উপাদান দ্বারা কোন কিছু বুঝতে পারা যায়, উপলব্ধি করা যায়, কোন বিষয়ের সত্যতা এবং যথার্থতা বোধগম্য হয় এবং যা নিজেও প্রমাণ, নিদর্শন বা দলিল হিসেবে কাজ করে, তাকেই আয়াত বলা হয়।

বিস্ময়কর কিছু বাস্তবতার কারণে কিংবা অলৌকিক কিছু উপলব্ধি করার কারণে সত্যকে সত্য হিসেবে বুঝে নেওয়া। যার ফলে তা অস্বীকার করাকে, দুঃসাহস দেখানোর স্বামীল বলে গণ্য করা হয়। এজন্যই তাকে আয়াত বা নিদর্শন বলা হয়। ফলে যা অন্তর থেকে অস্বীকার করার আর কোন সুযোগ থাকে না। তারপরেও যদি তা কেউ অস্বীকার করে, তবে এটাকে যৌক্তিকভাবে একগুঁয়েমি স্বভাব বলা হয় এবং কুরআন এই আচরণকে সুস্পষ্ট কুফর হিসেবে গণ্য করে অর্থাৎ সে পূর্ণ কাফের হয়ে পড়বে। এজন্যই কুরআনের কথাগুলোকে বলা হয় “আয়াত”।

বিষয়টি সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জানতে কুরআনের এই আয়াতের কথাগুলো ভালোভাবে দেখুনঃ-

-সূরা জাসিয়া- 3-6
-সূরা যারিয়াত- 20
-সূরা নাযিয়া- 20
-সূরা আশ শুআরা- 4, 8, 15, 67, 121, 154, 158, 190, 197,
-সূরা হুদ- 59, 64, 96,
-সূরা যুখরুফ- 48,
-সূরা দুখান- 33,
-সূরা ইউনুস- 5-7, 21, 24, 74, 92, 97,
-সূরা আন‌’আম-4, 21, 25, 35, 37, 39, 97, 99, 109, 126,
-সূরা সাজদা- 26,
-সূরা সাবা- 15, 33,
-সূরা মায়েদা 114,
-সূরা ইমরান -13, 86, 183, 190,
-সূরা ইয়াসীন- 33, 97,
-সূরা আনফাল-58,
-সূরা বাকারা-164, 211, 259,
-সূরা আম্বিয়া-5
-সূরা ত্বহা- 47,54, 56, 72, 127, 128, 133, 134,
-সূরা মুমিন- 13, 22 23, 28, 34, 50, 56, 78, 81, 82,
-সূরা হামিম সাজদাহ- 39, 53,
-সূরা বনী ইসরাঈল- 1, 12, 13, 59, 98, 101-102,
-সূরা শূরা- 32, 33, 35,
-সূরা আনকাবূত- 44, 49, 50,
-সূরা মুমিনূন- 30, 45, 50,
-সূরা রুম- 20-25, 49, 47, 58,
-সূরা নামল- 12-13, 52, 86
-সূরা হজ্জ-36,
-সূরা কাসাস- 35-36,
-সূরা যুমার- 42,
-সূরা লোকমান- 32,
-সূরা কাহাফ- 9,17, 59, 105-106,
-সূরা নাহল- 11-13, 44, 64, 79, 105,
-সূরা ইউসূফ- 7, 35,105,
-সূরা আ’রাফ- 58, 73, 103, 126, 133, 136, 146, 147, 174, 203,
-সূরা ইব্রাহীম- 5, 81, 75,
-সূরা রাদ- 2-3, 9, 27, 38,
-সূরা ক্বলম- 15

📕📘মহান আল্লাহ্ তা’আলা সূরা আল কামার চারটি আয়াতে বারবার বলেনঃ-
“আমি এই কোরআনের কথাগুলোর মর্ম বোঝা মানুষের জন্য সহজ করে দিয়েছি । অতএব তোমাদের মধ্যে কি কেউ আছে যে কোরআনের পথ-নির্দেশ গুলো বা কথাগুলো বুঝতে চায় ?
—সূরা কামার- আয়াত- 17, 22, 32 এবং 40

📕📘সূরা মুহাম্মদ এর – আয়াত-24 নং আয়াতে আল্লাহ মোটামুটি ধমকের সুরে বলেন–
“”তোমরা আমার এই কোরআনের কথাগুলো নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করছো না কেন ? তোমাদের অন্তর কি তালাবদ্ধ”” ?
আয়াতের শেষে “তোমাদের অন্তর কি তালাবদ্ধ” এই বাক্য দ্বারা আল্লাহ ওই সমস্ত লোকদেরকে তিরস্কার করেছেন যারা কোরআন নিয়ে গবেষণা করে না এবং চিন্তা ভাবনা করে না আর কোরআন কি বলেছে কি আদেশ ও নিষেধ করেছে তা থেকে তারা শিক্ষা লাভ করে না।

📕📘আল্লাহ সুবহানাতায়ালা কোরআনের সূরা ইয়াসীন-70 এবং সূরা ফাতির-22 নং আয়াতে বলেন–
মৃত লাশের জন্য আমি এই কুরআনের কথাগুলো পাঠাইনি।
কবর বাসীদেরকে আপনি আমার এই চূড়ান্ত লাভ-ক্ষতি সংক্রান্ত কুরআনের কথাগুলো শোনাতে পারবেন না। এটি পাঠিয়েছি জীবিতদেরকে দিকনির্দেশনা জানিয়ে দিতে। অথচ আজকাল দেখা যায় যে মৃত মানুষকে কোরআন শোনানো হচ্ছে। কবরের পাশে গিয়ে কোরআন তেলাওয়াত করা হয় এবং মানুষ মারা গেলে তার চারপাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করা হয়। অথচ জীবিত থাকা অবস্থায় সেই লোকটার কাছে কোরআন পড়া হতো না এবং এমন বহু জীবিত লোক আছে যাদের কাছে কোরআন পড়া হলে তারা রাগ হয় এবং তারা সেখান থেকে সরে পড়ে।

পবিত্র কোরআনের সূরা মায়েদা-44, 45, 47 নং আয়াতে আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালা বলেন—
“”যারা আমার পাঠানো আইন বা বিধান অনুযায়ী বিচার মীমাংসা করে না, সবকিছুর পরিচালনা বা কর্ম পরিকল্পণা গ্রহণ করে না, তারা তো পূর্ণ কাফের, পূর্ণ জালেম, পূর্ণ ফাসেক।
অতএব এখানে তিনটি আয়াত দ্বারা একেবারে স্পষ্ট হয়ে গেল যে যারা পবিত্র কোরআনের আইন ও বিধান অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করে না এবং জমিনের মধ্যে আইন তৈরি করে না বরং বড় বড় আইন সভা ও সংসদ বানিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো আইন তৈরি করে তারা কাফের পাপাচারি এবং জালিম।
মুফাসসিরগণ বলেছেন আল্লাহ তিনটি আয়াতে তিন প্রকার লোকের কথা এই জন্য বর্ণনা করেছেন যে,
যারা আল্লাহর আইনের বিপরীতে আইন তৈরি করে স্বেচ্ছায় এবং যারা মনে করে যে বর্তমানে সেই 1400 বছর আগের আইন চলবে না তারা মূলত সরাসরি কাফের।
আর এই কাফেরদের আবাসস্থল হল অনন্তকাল জাহান্নাম। তারা যতই কালেমা পড়ুক যতই নামাজ রোজা যাই কিছু করুক যদি আল্লাহর আইনের বিপরীতে অথবা আল্লাহর আইন এর বিকৃত সাধন করেন নতুন কোন আইন তৈরি করে আইন সবার মাধ্যমে অথবা যে কোন ভাবে তবে তারা কাফের হিসেবে গণ্য হবে।।
মুফাসসিরগণ ওই সমস্ত লোককে এই আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী জালিম হিসেবে বর্ণনা করেছেন যারা এই আইনগুলো অত্যন্ত খারাপ এবং মানব রচিত জেনেও এই আইন দিয়ে বিচার ফায়সালা করে অর্থাৎ হাকিম ম্যাজিস্ট্রেট ইত্যাদি হয়ে বিচার ফায়সালা করে। কিন্তু তাদের ইচ্ছা ছিল না আল্লাহর বিরোধী আইন দিয়ে বিচার ফায়সালা করার তবে তারা বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তাদেরও যদি ইচ্ছা থাকে যে এই আইন গুলি ইসলামী আইনের চেয়ে অনেক ভালো তবে তারাও সরাসরি কাফের হয়ে যাবে।
এখানে তিনটি আয়াতের মধ্যে একটি আয়াতে বলা হয়েছে যারা আল্লাহর আইন দিয়ে বিচার ফায়সালা করে না আইন তৈরি করে না তাদেরকে পাপাচারী বলা হয়েছে। এখানেও যারা নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হাকিম ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে অথবা বিচারক হয়ে আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে আইন দেওয়া ইচ্ছা ছিল না কিন্তু দিতে বাধ্য হচ্ছে অথবা এই চাকরি করছে বলে দিচ্ছে তারা এখানে পাপাচারি হবে কিন্তু কাফের হবে না। তবে যদি তারা স্বেচ্ছায় এই আইনগুলোকে মেনে নেয় এবং তাদের মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি না হয় তবে তারাও সরাসরি কাফের হিসেবে গণ্য হবে।।।

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সূরা হাক্কাহ্-44-46 নং আয়াতে বলেন—
“নবী যদি তার নিজের কোনো কথা আমার নামে কুর‌আনের ভেতরে চালিয়ে দিত, তাহলে আমি তার হাত চেপে ধরতাম, তার কণ্ঠনালী কেটে ফেলে দিতাম এবং তোমাদের কেউই তাকে আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারতে না!

পবিত্র কোরআনে,সূরা ফাতির- আয়াত-37 নাম্বার আয়াতে বলা হয়েছে–
“”হে জাহান্নামিরা (জুলুমকারীরা) আমি “আল্লাহ্” কি তোমাদেরকে দুনিয়ায় বেঁচে থাকার জন্যে এতটা সময় সুযোগ বা বয়স দেয়নি ? যাতে তোমাদের যে কেউ আমার এই কুরআনের কথাগুলো জেনে নিতে চাইলে সে জেনে নিতে পারত ? তোমরা নিজেদেরকে শুধরে নিতে চাইলে শুধরে নিতে পারতে” ?

কুরআনুল কারীমের সূরা ফুরকান-30 নং আয়াতে আছে–“”তারপর রাসূল (সাঃ) হাশরের মাঠে আল্লাহর কাছে অভিযোগ করে বলবেন ( নালিশ করে বলবেন ) হে আল্লাহ্ এই জাতি কুরআনের কথাগুলোকে বাদ দিয়ে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল “”!

আল্লাহ জাল্লা শানুহু সূরা ত্ব’হা-124 নং আয়াতে বলেন—
“যারা আমার এই কুরআনের কথাগুলো পড়া থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখবে; আমি তাদের আশা, চিন্তা চেতনার সীমা এবং সফলতা বিষয়ক ধারণাকে অতি সংকীর্ণ করে দেব!

সূরা আর রাহমানের বর্ণিত দুই সাগরের অন্তরালের ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

📕📘দুই সাগরের অন্তরাল ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাঃ

👉👉 দুই সাগরের অন্তরালের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ
“তিনি প্রবাহিত করেন দুই সমুদ্র, যারা পরষ্পর মিলিত হয়, কিন্তু তাদের মধ্যে রয়েছে এক অন্তরাল যাারা অতিক্রম করতে পারে না। অতএব,তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে”
–সূরাহ আর-রহমান : ১৯-২১

👉👉পৃথিবীর জ্ঞানী মানুষ বিশেষ করে যারা এই সুফল নিয়ে গবেষণা করে ওই তাবৎ মানুষের নিকট একথা দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, দুই সগারের মিলনস্থলে অন্তরালেও আল্লাহর নিদর্শন বিদ্যমান। যা কার্যত দু’টি সাগরকে পৃথক করে রাখে এবং স্ব স্ব সাগরের নিজস্ব তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, ঘনত্ব ইত্যাদি স্বাতন্ত্রতা বজায় রাখে। দু’টি সাগরের মিলনস্থলে পানি ছোট একটি সমসত্ত্ব এলাকা গঠিত হয়, যা দু’টি সাগরের বৃহত্তর এলাকার পানিকে মিশ্রিত হতে দেয় না। আর এই প্রত্যেক শ্রেণীর পানিতে ভিন্ন রকম স্বাদ, ভিন্ন রকম প্রাণী এবং ভিন্ন রকম জীবন ব্যবস্থা রয়েছে।
পৃথিবীর এক প্রান্তের নদীতে বা সমুদ্রে যে সকল প্রাণীরা বসবাস করে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের নদীর সমুদ্রে সেই সকল প্রাণী ও জীবজন্তু বসবাস করে না। আমাদের বাংলাদেশের দুই একটি নদীতে কেবল ইলিশ মাছ পাওয়া যায় অথচ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের নদী সমুদ্রে বহু চেষ্টা করেও তা উৎপাদন করা সম্ভব নয়।।
আবার সারডিন মাছ বাংলাদেশের সমুদ্রে পাওয়া যায় না। পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু মাছ শ্যালমন বাংলাদেশে কোথাও পাওয়া যায় না।
প্রত্যেক শ্রেণীর পানির ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট আছে। দুই সাগরের কেমিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল উপাদানেরও বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান যা সাম্প্রতিক কালে জানা গেছে মাত্র।
এই পানির অন্তরালের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হচ্ছে যে, সেগুলোতে বৈদ্যুতিক পজিটিভ ও নেগেটিভ আকর্ষণ বিশিষ্ট লবণের স্থূলাণু রয়েছে।
যার কারণে সদৃশ আকর্ষণ বিশিষ্ট পানি তার পার্শস্থ পানি থেকে দূরে সরে থাকে। এবং নিজেকে আলাদা করে রাখে।।
এই সূক্ষ্ম জ্ঞান অবশ্যই আরবের নিরক্ষর নবী মুহাম্মদ সাঃ এর ছিল না। নিশ্চয়ই তাকে কেউ একজন জানিয়েছেন। আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে এত সুক্ষ জ্ঞান একজন নিরক্ষর মানুষ তো দূরের কথা তৎকালীন একজন জ্ঞানী মানুষ ও জানতেন না। তাহলে একজন লেখাপড়া না জানার লোক এ কি করে হঠাৎ করে এমন গভীর প্রজ্ঞা পূর্ণ কথা বলা শুরু করলেন???
নিশ্চয়ই তাকে কেউ একজন জানিয়েছেন।
আর তিনি আল্লাহ। যিনি তার দূত জিব্রাইল আঃ কে পাঠিয়ে একজন নিরক্ষর নবীকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন যে জ্ঞান পৃথিবীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আর কেউ কোনোদিন আয়ত্ত করতে পারবেনা এবং সম্ভবও নয়।।

যাই হোক, বিজ্ঞানীদের অভিমত হলো এই পজিটিভ ও নেগেটিভ আকর্ষণের কারণেই দুই পানির মধ্যে অন্তরাল সৃষ্টি হচ্ছে এবং এটাই বিভিন্ন শ্রেণীর পানির মধ্যে আনুভূমিক উঁচু-নীচু লম্বা পর্দা সৃষ্টি করছে।
বর্তমান শতাব্দী তথা স্যাটেলাইটের যুগে সমুদ্রতত্ত্ববিদগণ আবিষ্কার করেছেন যে, বিভিন্ন শ্রেণীর লোনা পানির মধ্যে অন্তরাল রয়েছে। আর এই তথ্যটি আল-কুরআন ১৫শ বছর পূর্বেই আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ সঃ এর মাধ্যমে প্রকাশ করেছে স্বয়ং আল্লাহ। যা সূরাহ আর-রহমানের উক্ত আয়াতসমূহের তথ্য সম্বন্ধে খুবই সূক্ষ্ম ও নিপুঁণ বর্ণনা দিয়েছে।
সুতরাং পবিত্র সেই সুমহান প্রভু, যিনি ইরশাদ করেনঃ “এই কুরআন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো রচনা নয়, পক্ষান্তরে তার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে এটা তার সমর্থন এবং তার বিধানসমূহের বিশদ ব্যাখ্যা। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তা জগতসমূহের প্রভূর পক্ষ হতে”। –সূরাহ ইউনুস : ৩৭!!
👉👉তথ্য সূত্র : সৃষ্টিতত্ত্বে আল্লাহর অস্তিত্ব, কুরআন-সুন্নায় বিজ্ঞানের অলৌকিক তথ্যÑকুরআন-সুন্নায় বৈজ্ঞানকি তথ্য গবেষণার আন্তর্জাতিক কমিশন (অনু. মো. মুহসিন) পৃঃ৪১-৪২।

মাদ্রাসার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও গ্রহণযোগ্য বিশ্ববিদ্যালয় সৌদি আরবের মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়।

মুসলিমদের মাদ্রাসার ইতিহাসঃ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
#মাদ্রাসা আরবি শব্দ এর বহুবচন মাদা-রিস।
আরবি শব্দ দারসুন থেকে এটি উদ্ভূত, এর অর্থ পাঠ। মাদ্রাসা মূলত মুসলিমদের অধ্যয়ন-অধ্যাপনা গবেষণা ইত্যাদির স্থান বা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সাধারণ অর্থে মাদ্রাসা হচ্ছে আরবি ভাষা ও ইসলামি বিষয়ে শিক্ষার প্রতিষ্ঠান।
মাদ্রাসা শিক্ষার প্রথম প্রতিষ্ঠান ছিল সাফা পর্বতের পাদদেশে সাহাবী যায়েদ-বিন-আরকামের বাড়িতে, যেখানে স্বয়ং রসুল (স:) ছিলেন এর শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী ছিলেন তাঁর কয়েকজন অনুসারীগণ কয়েকজন সাহাবী।
হিজরতের পর মদিনায় মসজিদে নববি’র পূর্বপাশে স্থাপিত হয় মাদ্রাসা আহলে সুফ্ফা। শিক্ষক ছিলেন উবাদা ইবনু সামিত আর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন আবু হুরাইরাই (রাঃ) মু‘আজ ইবনু জাবাল গিফারি (রাঃ) প্রমুখ আরো অনেক সাহাবি।
মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে ছিল
কুরআন,
হাদিস,
ফারায়িজ, (জমি ও জ্যামিতিক হিসাব ও বন্টন পদ্ধতি)
চিকিৎসা,
বংশ শাস্ত্র,
তাজবিদ , (প্রমিত উচ্চারণ এবং বিভিন্ন উচ্চারণ রীতি)
অশ্ব চালনা,
যুদ্ধবিদ্যা, (এই অশ্ব চালনা এত সামরিক যানবাহন পরিচালনা এবং যুদ্ধবিদ্যা বর্তমানে পৃথিবীর মূল পাঠ্য বিষয়)
হস্তলিপি বিদ্যা, (যা বর্তমানে লিপিকলা হিসেবে চিহ্নিত)
শরীর চর্চা ইত্যাদিও পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল।(শরীরচর্চা চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবং বর্তমানে সমস্ত দুনিয়া জুড়ে এই শরীর চর্চার উপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে)
উপরোক্ত বিষয়গুলো একই সাথে পাঠ্য দান করা হতো।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো ইসলামের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে মদিনা নামক ছোট্ট নগর রাষ্ট্রের মধ্যে মসজিদ ভিত্তিক যে মাদ্রাসা তথা বিদ্যালয় চালু হয়েছিল এবং সেখানে যে সকল সাবজেক্টের উপর বিদ্যা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো তা আজকাল বহু আধুনিক বড় বড় কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় দেওয়া হয় না।

নবুওয়্যাতের প্রথম দিন থেকে উমাইয়া বংশের শাসনামলের প্রথম ভাগ পর্যন্ত প্রায় একশ বছর সময়কালকে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রথম পর্যায় ধরা হয়।

বাংলায় মাদ্রাসার প্রবর্তনঃ
বাংলার প্রথম মুসলিম শাসক ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মাদ বিন বখতিয়ার খলজী ১১৯৭, মতান্তরে ১২০১ খ্রিস্টাব্দে বাংলার রাজধানী গৌড়ে একটি মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ করেন।

সুলতান গিয়াসুদ্দীন একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন ১২১২ খ্রিষ্টাব্দে। পরবর্তীকালে তাঁর বংশধর সুলতান দ্বিতীয় গিয়াসুদ্দীনও একটি মাদ্রাসা নির্মাণ করেন। মাদ্রাসা দুটির নাম যথাক্রমে গৌড় ও লাখনৌতী মাদ্রাসা।

হোসেন শাহ ও তাঁর পুত্র নুসরত শাহ গৌড়ে বেশ কয়েকটি মাদ্রাসা নির্মাণ করেন। এসব মাদ্রাসার অনেকগুলির ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান।
ঢাকায় মাদ্রাসা স্থাপনঃ
১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে সুবাহদার শায়েস্তা খানের উদ্যোগে ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে একটি মাদ্রাসা ও মাসজিদ নির্মিত হয়।
নবাব জাফর মোরশেদ আলি খান স্থাপন করেন মুর্শিদাবাদ মাদ্রাসা। যার ভবনটি কালের সাক্ষী হিসেবে এখনও অটুট রয়েছে।
১১৭৮ হিজরি সালে জমিদার মুন্সি সদরুদ্দীন আল মুসাভী বুহার গ্রামে বর্ধমান মাদ্রাসা স্থাপন করেন এবং লখনৌ ( ভারতের উত্তর প্রদেশের রাজধানী) থেকে আগত মাওলানা আব্দুল আলি বাহারুল উলুমকে শিক্ষক নিযুক্ত করেন। নওয়াবী আমলে মাদ্রাসা পরিচালনার জন্য সরকার এগুলির জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ লাখেরাজ জমি বরাদ্দ দিত। মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের জন্য সরকার ভাতা ও বৃত্তি দিত।

বয়কট

বয়কট!
একটি আতঙ্ক মিশ্রিত শব্দ।
এই শব্দটি বিশেষ করে জালিমদের হৃদয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে দেয়।। মজলুম জনসাধারণের একটি প্রিয় ও সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হল এই বয়কট। সমস্ত দুনিয়া জুড়ে যেহেতু বেশিরভাগ মানুষ মজলুম সেহেতু বয়কট শব্দটা সবচেয়ে জনপ্রিয় শব্দ এর মধ্যে একটি।
জালিম এবং খারাপ সম্প্রদায়কে সোজা করার জন্য বয়কটের চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র আর কিছুই নেই।।

👉👉সর্বজন পরিচিত শব্দটি অভিধানভুক্ত হওয়ার পেছনে রয়েছেন এক ইংরেজ ভদ্রলোক, যাঁর নাম #চার্লসকানিংহামবয়কট।

তাঁর কীর্তিকলাপের জন্য তাঁকে একঘরে করছিলেন আয়ারল্যান্ডের বর্গাচাষিসহ স্থানীয় লোকজন। বয়কটের এই একঘরে হওয়ার ঘটনা তখন প্রচারমাধ্যমেও আসে, যা কালক্রমে যুক্ত হয় অভিধানেও।

👉👉১৮৮০ সালের কথা সেটা। চার্লস কানিংহাম বয়কট ছিলেন খাজনা আদায়ের দায়িত্বে। সে বছর ফসলের ফলন কম হওয়ায় চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছিলেন। সে আশঙ্কা আমলে নিয়ে ১০ শতাংশ খাজনা মওকুফের ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু চাষিরা দাবি তোলেন ২৫ শতাংশ মওকুফের। চাষিদের দাবি অগ্রাহ্য করেন লর্ড আর্নে।

এদিকে বয়কট আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে এক কাণ্ড ঘটান। তিনি ১১ জন বর্গাচাষিকে উচ্ছেদের চেষ্টা করেন। সরব হয়ে ওঠে স্থানীয় লোকজন। সরব হওয়ার পেছনে অবশ্য কারণও আছে।

সে সময়টায় আয়ারল্যান্ডের ভূমি সংস্কারের পক্ষে লড়ে যাচ্ছিলেন আইরিশ রাজনীতিবিদ চার্লস স্টুয়ার্ট পার্নেল (১৮৪৬-১৮৯১)। তিনিই কোনো এক ভাষণে বলেছিলেন, কোনো জমি থেকে বর্গাচাষিকে উচ্ছেদ করা হলে, সে জমি যেন অন্য চাষিরা বর্গা না নেন। মালিকপক্ষ উচ্ছেদের হুমকি দিলে অহিংসভাবে তাঁকে এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

বয়কটের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজন সেই কৌশল বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর গৃহকর্মী থেকে দিনমজুরেরা কাজ বর্জন করেন। ব্যবসায়ীরা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করতে থাকেন। এক সময় দেখা যায়, স্থানীয় ডাকঘরের পিয়নও চিঠি সরবরাহ বন্ধ করেছেন।

বয়কট চেষ্টা করেন অন্য এলাকা থেকে লোক এনে চাষবাসের কাজ করানোর। সে উদ্যোগও সফল হয়নি তাঁর। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকেন বয়কট। হালের ‘ভাইরাল’ হওয়ার মতো এই ঘটনা তখন ব্যাপকভাবে জানাজানি হয়, ফলাও করে প্রচার করা হয় গণমাধ্যমে। বর্জন ও একঘরের সমার্থক হয়ে ওঠেন ‘বয়কট’, যা কালক্রমে যুক্ত হয় অভিধানেও। কিন্তু কে এই চার্লস কানিংহাম বয়কট?

বয়কট এক বিচিত্র চরিত্রের মানুষ। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ইংল্যান্ডের নরফোকের এক গ্রামে। পড়াশোনা করেছেন দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের ব্ল্যাকহিথ এলাকার একটি বোর্ডিং স্কুলে। স্কুলজীবন থেকেই বয়কটের ফৌজি জীবনের প্রতি ছিল দুর্নিবার আকর্ষণ। সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি সেই আকর্ষণের টানে ১৮৪৮ সালে দক্ষিণ লন্ডনের উলউইচে অবস্থিত রয়্যাল মিলিটারি একাডেমিতে ভর্তি হন। বছরখানেক পর পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে মিলিটারি একাডেমি ছাড়তেও হয় তাঁকে। কিন্তু হাল ছাড়েন না বয়কট।

পরিবারের সহায়তায় ১৮৪৯ সালে ৪৫০ পাউন্ডে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ক্যাপটেন পদ পেয়ে (ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে পদ কেনার সুযোগ ছিল) যান তিনি। পদাতিক বাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। যোগ দেন ৩৯তম ফুট রেজিমেন্টে। কিছুদিনের মধ্যে রেজিমেন্টের সঙ্গে বদলি হয়ে বয়কট চলে আসেন উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে। শুরু হয় আয়ারল্যান্ডের জীবন।

১৮৫১ সালের আগস্টে অসুস্থ হয়ে পড়েন বয়কট। প্রায় ছয় মাস রোগে ভোগার পর বয়কট তাঁর সেনাবাহিনীর পদ বিক্রি করে দেন। সে বছরই বিয়ে করেন মেরি অ্যান দুনেকে। টিপেরারি কাউন্টিতে খামার ইজারা নিয়ে আয়ারল্যান্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। আয়ারল্যান্ডের উত্তরাধিকার সনদ পাওয়ার হওয়ার পর দেশটির পশ্চিম উপকূলীয় মায়ো কাউন্টির একটি দ্বীপে চলে যান বয়কট।

মায়ো কাউন্টিতে তাঁর জীবনের ইতিহাস তো ‘বয়কট’ শব্দেই মিশে আছে!

সূত্র: উইকিপিডিয়া।

চিনির গল্প, Story of sugar

👉👉শুরুটা হল ক্রুসেডের সময়। উইলিয়াম অফ টাইরে কিংডম অফ জেরুসালেমে গিয়ে দেখলেন সেখানে লবনের মত সাদা একধরনের পাউডার পাওয়া যাচ্ছে। লবন নোনতা স্বাদের, কিন্তু এটা মধুর মত মিষ্টি।

হ্যা, এটা চিনির গল্প। দ্যা স্টোরি অফ সুগার, দ্যা স্টোরি অফ পিউর, হোয়াইট এন্ড ডেডলি।

চিনি উৎপাদনে খরচ ছিল আকাশছোয়া, পরিশ্রম ছিল অমানুষিক। কোন স্বাধীন নাগরিক এই পরিশ্রমে রাজি হত না। তাই আখচাষ থেকে চিনি উৎপাদনে ব্যবহার করা হত আবিসিনিয়া বা আফ্রিকার কাফ্রী গোলামদের।

জেরুসালেম, এন্টিয়কসহ ভূমধ্যসাগর তীরের বেশ কিছু শহর যখন ক্রুসেডাররা জয় করে নিল, তারা সেখানে পেয়ে গেল সাদা চিনির সন্ধান। এর আগে প্রায় চারশো বছর ধরে ইউরোপ এই চিনি উৎপাদন করে নি।

সেই যামানায় সাদা চিনি ছিল ওয়ান অফ দ্যা মোস্ট ডিজায়ার্ড লাক্সারি প্রোডাক্ট। এখনকার হীরার মতই ছিল দাম এবং
প্রথম ধাক্কাটা গেল মুসলিম বন্দীদের ওপর দিয়ে, এরপর সেখান থেকে চলে গেল বিশালদেহী রাশান দাসদের কাছে। হ্যা, সে আমলে ক্রিশ্চিয়ানরাও ক্রিশ্চিয়ানদের দাস বানাতো।

কিন্তু, ঠান্ডা জলবায়ুতে জন্মানো রাশানরা মধ্যপ্রাচ্যের গরমে খুব একটা প্রোডাক্টিভ লেবার হিসেবে নিজেদের প্রমান করতে পারলো না।

এরপর হল আরেক মুশকিল, মুশকিলের নাম সুলতান আল নাসির সালাহ উদ্দীন ইউসুফ ইবন নাজমুদ্দীন আল আইয়্যুবী।

১১৭১ থেকে ১১৯৩ সালের মধ্যে ক্রুসেডাররা ফালাস্তিন অঞ্চলের অধিকাংশ রাজ্য হারিয়ে ফেললো সালাহ উদ্দীনের মোকাবিলায়। এর একশো বছরের মধ্যে তারা মুখোমুখি হল আরো সালাহ উদ্দীনের আরো বিপজ্জনক কিছু উত্তরসুরীর, রুকনুদ্দীন আয যাহির বাইবার্স এবং সুলতান আল মানসুর কালাউন আস সালিহী, যারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে ক্রুসেডার রাজ্যগুলোর নাম নিশানা মুছে দেন।

জেরুসালেমের স্বাদ ভুলে গেলেও চিনির স্বাদ কিন্তু ইউরোপিয়ানরা ভুলতে পারে নি।

পর্তুগীজরা আটলান্টিক চষে বেড়াতে শুরু করলো পঞ্চদশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে। তাদের হাতে চলে এলো আজোরস, মাদেইরা আর ক্যানারী আইল্যান্ডস।

এই দ্বীপগুলো দখল করে তারা প্রথমেই খেয়াল করলো, এখানে আছে উর্বর, রসালো জমি। বৃষ্টিও ভালই হয়, বাতাসে আছে আর্দ্রতা।
এই সুযোগ হেলায় হারানো যায় না। ক্যানারী আইল্যান্ডস আর মাদেইরাতে শুরু হয়ে গেল আখ চাষ। শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগানোর জন্য পূর্ব ইউরোপ আর রাশিয়া থেকে ধরে নিয়ে আসা হল শক্তপোক্ত মানুষ।

পৃথিবীতে মানুষের আদিমতম নেশা হচ্ছে গ্লুকোজের নেশা। আর চিনি থেকে মানুষ ঠিক সেই জিনিসটাই পায় সরাসরি।

ক্রুসেডারদের মারফত ইউরোপে গিয়েই সাদা চিনি মাত করে দিয়েছিল বাজার। ইউরোপের অভিজাত পরিবারগুলোতে একটা স্টেইটাস সিম্বল হয়ে গেল বেশি চিনি খাওয়া। যে যত বেশি চিনি খায়, সে তত বড়লোক, এমন একটা অবস্থা।

তো, এই স্টেইটাস ধরে রাখতে গিয়ে বাড়তি চিনি খেয়ে ইউরোপিয়ান এলিটদের দাতের অবস্থার দফারফাও হচ্ছিল সমানে। মধ্যযুগের ১১০০-১৬০০ সালের ইউরোপিয়ান এলিটদের কারো দাত বের করা হাসির ছবি খুব একটা পাওয়া যায় না, কারন তাদের দাত হয়ে থাকতো কালো।

অন্যের চেয়ে আমি বেশি ক্লাসি, এই কথাটা বোঝাতে গিয়ে চিনি খাওয়ার দৌড় কোথায় গিয়ে ঠেকেছিল তার একটা উদাহরন হচ্ছে ইংল্যান্ডের কিং এডওয়ার্ডসের পরিবার। ১২৮৮ সালে শুধু রাজপরিবারের খাবারের জন্যই চিনি লেগেছিল ৬০০০ পাউন্ড।

অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার জন্য রানী প্রথম এলিজাবেথের সব দাতই ছিল কালো। এই চিনির সাপ্লাই এসেছিল মরোক্কোর সুলতানদের কাছ থেকে। মরোক্কান সুলতান স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের সাথে যুদ্ধ করার জন্য এলিজাবেথের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতেন, আর এলিজাবেথকে দিতেন সুন্দর কাপড় এবং চিনি। একদিকে এলিজাবেথের অস্ত্র দিয়ে তিনি মারতেন স্প্যানিশ সৈনিক, অন্যদিকে তার দেয়া চিনি থেকে বানানো ক্যান্ডি খেয়ে নষ্ট হত ব্রিটিশ এলিটদের দাত।

কালো দাত এবং চিনি নিয়ে ইউরোপিয়ানদের পাগলামি এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে যে কালো দাতকে মনে করা হতে থাকে আভিজাত্যের প্রতীক। মধ্যবিত্তরা নিজেদের মান মর্যাদা বাড়ানোর জন্য দাতে কালো রঙ করা শুরু করলো যাতে প্রতিবেশীরা ভাবে এদের অনেক টাকা আছে, এরা চিনি খেয়ে দাত কালো করে ফেলছে।

কিন্তু, চিনির উৎপাদন যা হত তা এলিটদের প্রয়োজন মেটানোর তুলনায় ছিল খুবই সামান্য। মাদেইরা বা ক্যানারী আইল্যান্ডস খুবই ছোট জায়গা, এখান থেকে সেভাবে বিপুল পরিমান চিনি উৎপাদন সম্ভবও ছিল না। ফলে চিনি আনা লাগতো সেই ভারত থেকে, আরব ও তুর্কী ব্যবসায়ীদের হাত হয়ে, ভেনিস-জেনোয়া ঘুরে ঐ চিনির দাম যা হত তাতে চিনি এমনকি এলিটদের কাছেও আর মিঠা থাকতো না।

এরইমধ্যে, কলম্বাস ভারত যাওয়ার পথ খুজতে বেরিয়ে পৌছে গেলেন আমেরিকা। তার কাছাকাছি সময়েই গেলেন আরো অনেকে। আমেরিগো ভেসপুচি, হেনরী আমেরিকা, জন ক্যাবট, পেদ্রো ক্যাব্রাল, গনজালো কোয়েলহো আর আলেক্সিও গার্সিয়ারা পুরো আমেরিকা চষে বেড়ালেন।

বাহামা, হিস্পানিওলা, জ্যামাইকা আর কিউবায় পা রাখার সাথে সাথেই কলম্বাস শুরু করেছিলেন আখ চাষের চিন্তাভাবনা। তার দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রার সাথে সাথে শুরু হয়ে গেল ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে আখ চাষ ও চিনি উৎপাদন।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বোঝা গেল, এভাবে চলবে না। চিনি উৎপাদনের জন্য স্থানীয় আরাওয়াক, তাইনু বা গুয়ানহানিদের মত নেটিভ আমেরিকানরা একেবারেই অদক্ষ এবং এত হাড়ভাঙ্গা পাশবিক পরিশ্রমে তারা অভ্যস্তও ছিল না। তারা ছিল স্বাধীনচেতা এবং ইউরোপিয়ানদের বয়ে আনা রোগজীবানুর বিরুদ্ধে কোন ইমিউনিটিও তাদের ছিল না। পরের পঞ্চাশ বছরে ৯০% এর বেশি নেটিভ আমেরিকানরা মরে সাফ হয়ে গেল মহামারীতে।

ফলে, স্প্যানিশদের বিকল্প ভাবনা ভাবতে হল। তারা সিদ্ধান্ত নিল, চিনি উৎপাদন করতে প্রয়োজনে আফ্রিকা থেকে দাস আমদানী করা হবে।

আমেরিকায় মায়া, অ্যাজটেক ও ইনকাদের লুট করে স্প্যানিশরা যে পরিমান সোনা ও রুপা পেয়েছিল, বা হয় তা দিয়ে আটলান্টিকের এপার থেকে ওপার তক ব্রিজ বানানো যেত।

কিন্তু এই সোনা-রুপার বেশিরভাগটাই তাদের ব্যয় করতে হয়েছিল উসমানী খিলাফতের সাথে যুদ্ধের খরচ মেটাতে৷

এই বাড়তি ব্যয় করা সোনা-রুপার ফলে ষোড়শ শতকের শেষদিকে এক অভুতপূর্ব ঘটনা ঘটে৷ সমস্ত ভু-মধ্যসাগরীয় অঞ্চল-মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে সোনা রুপা দিয়ে ইচ্ছামত মুদ্রা বানানোর ফলে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়, জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায় প্রায় দশগুন।

ফলে, আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় ঘাটি গাড়া কলোনিস্টরা ভাবলো, এবার তাদের এমন কিছু আমেরিকা থেকে রফতানি করতে হবে যা দিয়ে আসলেই ব্যবসা করা যায় এবং যা আসলে খাওয়া যায়।

এই ধরনের পন্যগুলোর মধ্যে তিনটা ছিল চাহিদার শীর্ষে। চিনি, কফি আর তামাক। এই তিনটার মধ্যে, চিনির বাজার ছিল সবচাইতে বড়, আর লাভও ছিল সবচাইতে বেশি।

নেটিভ আমেরিকানরা কথা শুনতো না, তাদের একটা নিজস্ব জীবনদর্শন ছিল। তাই তাদের খাটানো যেত না বেশি। স্প্যানিশরা তাই ভাবলো আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে প্রচুর শ্রমিক আমদানী করবে।

এই সিদ্ধান্তটা পরের তিনশো বছরে বদলে দিয়েছিল আফ্রিকা, আমেরিকা ও ইউরোপের ইতিহাস।

১৬৮৩ সালের সেকেন্ড ব্যাটল অফ ভিয়েনায় উসমানী (অটোমান) সামরিক শক্তির মেরুদণ্ড গুড়িয়ে যায়, আর এর ফলেই ইউরোপিয়ান জাহাজগুলো পেয়ে যায় আফ্রিকায় অবাধে দস্যুতা চালানোর লাইসেন্স। প্রতি বছর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে আফ্রিকানদের আফ্রিকা থেকে ধরে নিয়ে আমেরিকান কলোনিগুলোতে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া মানুষের সংখ্যা।

ইউরোপিয়ানরা ব্রিস্টল, লন্ডন, ম্যানচেস্টার, লিভারপুল, লিসবন, আমস্টারডাম, মালাগা, বার্সেলোনা, ভ্যালেন্সিয়া, আলজাজিরা, বিলবাও, ক্যাস্তেলোনের মত বন্দরগুলো থেকে তথাকথিত সভ্যমানুষদের জাহাজগুলো আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলোতে নামতো কামান, বন্দুক, তলোয়ার, ছুরি, ধাতুর তৈরি নানান যন্ত্রপাতি, রঙ্গিন কাপড় আর রাম নিয়ে, আর সেখান থেকে তুলে নিতো পালে পালে মানুষ।

দাস শিকারীরা তছনছ করে দিতো গ্রামের পর গ্রাম। আফ্রিকার সবুজ জলে ভরা নদীগুলো দিয়ে তারা যে গ্রামে ঢুকতো, সে গ্রাম পরিনত হত মৃত্যুপুরীতে। শক্ত-সমর্থ পুরুষদের পরিনত করা হত দাসে, প্রায় সময় নারীদেরও।

তারপর, দেড় থেকে আড়াই মাসের যাত্রাশেষে তারা পৌছুতো আমেরিকায়। কেউ দাস হিসেবে খাটতো ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে, কেউ উত্তর আমেরিকান কোন কলোনিতে আর বাকিরা ব্রাজিলে।

১৫০০-১৯০০ সাল, এই চারশো বছরে আফ্রিকা থেকে ইউরোপিয়ানরা ধরে নিয়ে গেছে অন্তত ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ। এদের ধরার জন্য মারতে হয়েছে আরো অন্তত কোটিখানেক মানুষ।

তারপর, এই দাসদের দিয়ে উৎপাদন করা হয়েছে হাজার হাজার টন চিনি।

১৭০০-১৯০০ সাল ছিল মূলত চিনির ব্যবসার স্বর্নযুগ। এই সময়টা জুড়ে মসলা বা সোনা-রুপা নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে লাভজনক পন্য ছিল চিনি।

চিনির মূল্য কত ছিল তার উদাহরন দেয়া যায় ১৭৬৩, সালের প্যারিস চুক্তির একটা ঘটনা থেকে।

প্যারিস চুক্তির সময়ে ফ্রেঞ্চরা কানাডার প্রায় অর্ধেকটা অঞ্চল জুড়ে রাজত্ব করতো, বাকি অঞ্চলটা ছিল ব্রিটিশদের। আর ব্রিটিশদের অধিকারে ছিল মূলত ক্যারিবিয়ান আইল্যান্ডস।

কানাডাতে আখ চাষ করা সম্ভব ছিল না। আখ চাষ করতে হলে দরকার ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এবং দক্ষিণ আমেরিকার। আর এদিক থেকে যে চিনি ও তামাক উৎপন্ন হবে, তা ফ্রান্সে নিয়ে আসতে প্রয়োজন ক্যারিবিয়ানের একটা ভাল বন্দর।

এই বন্দরটি ছিল গুয়াদিলোপে। গুয়াদিলোপে দ্বীপের আয়তন মাত্র ১৬০০ বর্গ কিলোমিটার। চিনির ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ১৬০০ বর্গ কিলোমিটারের বিনিময়ে ফ্রান্স ব্রিটেনের কাছে বিক্রি করে দিলো কানাডার ৩০ লাখ বর্গ কিলোমিটার জমি।

এমনকি, আজকের আমেরিকা হয়তো ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীন হতে পারতো না যদি না ব্রিটিশরা তাদের সৈনিকদের একটা বড় অংশ রেভলুশনারী ওয়ারের সময় আমেরিকাতে না নামিয়ে ক্যারিবিয়ানে রাখতো।
ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দাদের শতকরা ৯৫% ছিল আফ্রিকা থেকে ধরে আনা দাস। বাকিরা ছিল মূলত চিনি ব্যবসায়ী। এই চিনি ব্যবসায়ীরা ছিল ব্রিটেনের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের নিরাপত্তার জন্য ব্রিটেনের পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত নেয়, প্রায় অর্ধেক সামরিক শক্তি ক্যারিবিয়ান আইল্যান্ডে রাখার। বেশিরভাগ সৈন্য আমেরিকায় নামালে ভয় ছিল, দাসরা বিদ্রোহ করে সমস্ত চিনিকলগুলো দখল করে নেবে।

ফলে আমেরিকান সেনাবাহিনী খর্বশক্তির ব্রিটিশ বাহিনীকে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে পরাজিত করে জিতে নেয় আমেরিকান ওয়ার অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স। এর বিপরীতে ব্রিটিশরা টিকিয়ে রাখে তাদের চিনির সাম্রাজ্য

👉👉উনবিংশ শতকে ব্রিটিশরা আইন করে দাসত্ব বন্ধ করলো ঠিকই, কিন্তু তার বদলে তারা রেখে দিলো বন্ডেজ সিস্টেম, অনানুষ্ঠানিক দাসত্ব। বাকি ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যগুলিও ধরলো ব্রিটেনের পথ। যেই লাউ সেই কদুই রয়ে গেলো অনেকটা।

শত শত বছরের দাসত্বে আখ, তামাক আর কফি চাষ ছাড়া আর কিছুই শেখানো হয় নি দাসদের এবং তাদের সন্তানদের। তাই দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে তাদের অবস্থাটা ছিল এমন যে, আখ খেতে কাজ না করতে পারলে রাহাজানি করে খাওয়া ছাড়া তাদের আর উপায় ছিল না।
কিন্তু রাহাজানির সুযোগটাও কি আসলে ছিল?? নাহ, ছিল না।

সাদারা হাতে ফ্লিন্টলক বন্দুক আর পিস্তল নিয়ে নামতো, তাদের ছিল অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী, তাদের ছিল নৌবাহিনী, তাদের ছিল পুলিস বাহিনী। আর কালোদের হাতিয়ার ছিল কুঠার, ছোরা, কোদাল এসব সেকেলে অস্ত্র।

তাই, লড়াইয়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা না করে কালোরা চেয়েছে বউ ছেলেমেয়েকে খাওয়াতে। বছরের পর বছর আখক্ষেত আর চিনিকলে দাসের মতই পরিশ্রম করেছে, দাসত্ব থেকে মুক্তির পরেও, কারন তাদের বেচে থাকার আর কোন উপায় সাদারা রাখে নি।

আজকের আমেরিকার সবচেয়ে ধনী শহর নিউইয়র্কের আশপাশটা তখন ছিল নিউ ইংল্যান্ডের অংশ। নিউ ইংল্যান্ডওয়ালাদের বংশধররা আজকে পৃথিবী শাসন করছে দশকের পর দশক ধরে।

আর দক্ষিনের নিউ অর্লিন্স, সেকালের লুইজিয়ানার দাসদের শহর এখনো আছে সেই কালোদের শহর হিসেবেই, যারা সাদা ধনীদের ওপরে ওঠার সিড়ি হয়ে রয়েছে শত শত বছর ধরে।

চিনির পাপ কিন্তু ব্রিটেন বা আমেরিকাকে ছাড়ে নি। প্রতি তিনজনে একজন ব্রিটিশ/আমেরিকান আজ ওবিস। যে চিনির নেশা তাদের সম্পদের অট্টালিকার চুড়ায় তুলেছে, সেই চিনি থেকে হওয়া রোগ ডায়বেটিস, ওবিসিটি, হার্ট এটাক আর স্ট্রোক ঠেকাতে আমেরিকান সরকার এখন প্রতিবছর খরচ করে ট্রিলিয়ন ডলার।

চিনির সাদা চেহারা দেখে আমাদের চোখে এই রক্তাক্ত ইতিহাস ভেসে ওঠে না। চিনি এখন আমাদের কাছে শুধুই ভোগ্যপন্য।

কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর #ব্রিটিশ_বেনিয়া বা আফ্রিকান দাসের কাছে ব্যাপারটা তা ছিল না। তাদের কাছে চিনি ছিল জীবন অথবা মরনের প্রশ্ন, যার জবাব দিতে গিয়ে কেউ মরে বেঁচে যেত, কেউ আবার বেঁচে থাকতো প্রতিদিন মরে যাওয়ার জন্য।

তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে

❤️💙 আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম
বিসমিল্লাহ হিররাহমানির রাহিম ।

وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ ۚ وَأُولٰٓئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

অর্থঃ আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল যেন থাকে যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে * আর তারাই সফলকাম।
–সূরা আল ইমরান, আয়াত ১০৪

👉👉 ইসলাম যেসব সৎকর্ম ও পূণ্যের নির্দেশ দিয়েছে এবং প্রত্যেক নবী আপন আপন যুগে যে সব সৎকর্মের প্রচলন করেছেন, তা সবই আয়াতের উল্লেখিত মারুফ তথা সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত। ‘মারুফ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ পরিচিত। এসব সৎকর্ম সাধারণ্যে পরিচিত। তাই এগুলোকে ‘মারুফ’ বলা হয়। এমনিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব অসৎকর্মরূপী কাজকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন বলে খ্যাত, তা সবই আয়াতে উল্লেখিত মুনকার’ এর অন্তর্ভুক্ত। এ স্থলে ‘ওয়াজিবাত’ অর্থাৎ জরুরী করণীয় কাজ ও ‘মা’আসী’ অর্থাৎ ‘গোনাহর কাজ’ -এর পরিবর্তে ‘মারুফ’ ও ‘মুনকার’ বলার রহস্য সম্ভবত এই যে, নিষেধ ও বাধাদানের নির্দেশটি শুধু সবার কাছে পরিচিত ও সর্বসম্মত মাসআলা-মাসায়েলের প্রযোজ্য হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোন খারাপ কাজ দেখবে, সে যেন তা হাত দ্বারা প্রতিহত করে, তা যদি সম্ভব না হয় তাহলে মুখ দ্বারা প্রতিহত করবে, আর যদি তাও সম্ভব না হয় তাহলে অন্তর দ্বারা ঘৃণা করবে। এটাই ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘এর পরে সরিষা পরিমাণ ঈমানও বাকী নেই।
–মুসলিমঃ ৪৯, আবু দাউদঃ ১১৪০।

অন্য এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘যার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ করে বলছি, অবশ্যই তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। নতুবা অচিরেই আল্লাহ তোমাদের উপর তাঁর পক্ষ থেকে শাস্তি নাযিল করবেন। তারপর তোমরা অবশ্যই তাঁর কাছে দো’আ করবে, কিন্তু তোমাদের দোআ কবুল করা হবে না।
–তিরমিযীঃ ২১৬৯, মুসনাদে আহমাদঃ ৫/৩৯১!!

অনুরূপভাবে রাসূল সাঃ কে এক লোক জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহ্‌র রাসূল, কোন লোক সবচেয়ে বেশী ভাল? তিনি বললেনঃ সবচেয়ে ভাল লোক হল যে আল্লাহ্‌র তাকওয়া অবলম্বন করে, সৎকাজে আদেশ দেয় ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখে।
—মুসনাদে আহমাদঃ ৬/৪৩১!!!

রমজান মাসে কি কবরের আজাব বন্ধ থাকে!?!

📘📕 রমজানে অর্থাৎ রোজার মাসে কবর বারযাখের আজাব বন্ধ থাকে, মূলত এটি একটি ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন কথা। অনেককেই বিশেষ করে অনেক আলেম ওলামাকে বলতে শোনা যায়, ‘রমজান মাসে কবরের আজাব মাফ থাকে’।আবার আরো একটু আগ বাড়িয়ে একথাও বলতে শোনা যায় যে, ‘দাফনের পর জুমা বা রমজান এলে কেয়ামত পর্যন্ত কবরের আজাব বন্ধ থাকে।
👉👉 আসল কথা হল,মানুষের এমন ধারণা ঠিক নয়, এটি একটি ভিত্তিহীন ধারণা। তাছাড়া অনুমান ধারণা থেকে কথা বলতে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। কোরআন-সুন্নায় এ সম্পর্কে কোনো কথা বলা হয়নি বা কোন দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি ।
তবে আল্লাহ তাআলা সবার বারযাখ অর্থাৎ কবরের আজাব মাফ করে দিতে পারেন যেকোনো সময় ।
মূলতঃ কবরের আজাব হওয়া না-হওয়ার সঙ্গে রমজানের কোনো সম্পর্ক নেই। কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ মৃত্যু পরবর্তী বারযাখি জীবনে কবরে অথবা অন্য কোথাও কোন ব্যক্তির ঈমান ও নেক আমলের সঙ্গে আজাব হওয়া না হওয়ার সম্পর্ক।

মানুষের উচিত এই জাতীয় অনুমান ও ভিত্তিহীন ধারণা অথবা কথাবার্তার দ্বারা প্রবাহিত না হয়ে, এমনসব আমল করা ও সেই সব আমলের প্রতি যত্নবান হওয়া, যার মাধ্যমে মৃত্যু পরবর্তী বারযাখের জীবন তথা কবরের আজাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। বারজাখি জীবনের আজাবকে কবরের আজাব হিসাবে উল্লেখ করা হয়; কেননা বেশিরভাগ মানুষকেই মৃত্যুর পর কবর দেওয়া হয় অর্থাৎ গ্রাউন্ডেড করা হয়। কিংবা অন্যভাবে তার লাশ ধ্বংস হলে কিংবা পুড়ে ফেললেও তা মূলত ধ্বংসাবশেষ মাটির মধ্যেই ফিরে যায় অর্থাৎ গ্রাউন্ডেড হয়ে যায়।
এইজন্য বাহ্যিক অর্থে এবং সার্বিকভাবে এটাকে কবরের আজাব বলা হয়ে থাকে। কেননা কেউ কেউ বলে থাকেন যে অনেকের তো কবর হয় না বরং তাদের পুড়ে ফেলা হয় অথবা বিভিন্ন জীবজন্তু খেয়ে ফেলে তখন তাদের আজাব হয় কি করে। মূলত তাদের এই ধারণা ও কথাবার্তা ভিত্তিহীন ও নিজের সাথেই প্রতারণার শামিল।
যাইহোক, রোজার মাসের সাথে কিংবা রোজার মাসের বরকতের সাথে কবরের আজাবের এর কোন সম্পর্ক নেই। বরং এটি একটি রহমত বরকত মাগফেরাতের মাস এবং পুরো মাস ধরেই রহমত বরকত মাগফেরাত হতে থাকে। তার এরই মধ্যে যদি আল্লাহ কাউকে ক্ষমা করে দেন, তা একান্তই আল্লাহর রহমত। রমজানের বাইরেও আল্লাহ মানুষকে ক্ষমা করেন।

👉👉তবে হ্যা, রোজা রাখা অবস্থায় ইন্তেকাল করলে তার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। অথবা যে কোন এবাদতরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এইজন্যই আল্লাহর নিকট চাইতে হয়, হে আল্লাহ আমার মৃত্যু দান করুন অবশ্যই ঈমানের সহিত, এবাদত তত অবস্থায়, সুস্থ শরীরে এবং প্রিয়জনদের মাঝে (আমিন) । হাদিসে এসেছে, হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একদিন রোজা রাখে এবং এ রোজা হয় তার জীবনের শেষ আমল (অর্থাৎ রোজা অবস্থায় তার ইন্তেকাল হয়) সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
–মুসনাদে আহমাদ ২৩৩২৪; বায়হাকি ৬৫১; মাজমাউয যাওয়ায়েদ ১১৯৩৫)
এ হাদিসের আলোকে জানা যায়, রোজাদার অবস্থায় ইন্তেকাল করলে, আশা করা যায়, আল্লাহ তাআলা তাকে মাফ করে দেবেন।
কিন্তু রমজান মাসে কবরের আজাব বন্ধ থাকে, এমনটি কোথাও পাওয়া যায় না।

সম্ভবত যে কারণে মানুষ এমনটি মনে করে
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-.
‘যখন রমজানের প্রথম রাতের আগমন ঘটে, তখন দুষ্ট জিন শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়(অবশ্য মানুষ শয়তানগুলো ছেড়ে দেওয়া অবস্থায় থাকে আর এই জন্য রমজান মাসে শয়তানেও চলতে থাকে! আর তাই মানুষ শয়তান এবং জিন শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়ার জন্য আল্লাহ বলেছেন, তোমরা বলো- “মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাছ”আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই মানুষ শয়তান আর জ্বিন শয়তান থেকে) ।
এ মাসে জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়,একটি দরজাও খোলা হয় না এবং জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, একটি দরজাও বন্ধ করা হয় না। একজন ঘোষক ঘোষণা করতে থাকে- হে কল্যাণের প্রত্যাশী! আরো অগ্রসর হও। হে অকল্যাণের যাত্রী! ক্ষান্ত হও। আর আল্লাহ তাআলা এ মাসের প্রতি রাতে অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। –ইবনে মাজাহ ১৬৪২; ইবনে খুযায়মা ১৮৮৩; মুসতাদরাকে হাকেম ১৫৩২।।
আর এই সকল হাদিসের মর্মার্থ হল, এই মাসে ব্যাপক কল্যাণ বর্ষিত হয় এবং অকল্যাণ থেকে মানুষকে কল্যাণের দিকে আহবান করা হয়।।।

উপরের হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, ‘জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়’- এখান থেকে হয়ত কারও মাঝে এ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে, তাহলে রমজানে কবরের আযাবও বন্ধ থাকে। আর এই সকল ধারনা থেকেই মানুষ নিজে মন থেকে বানিয়ে এই সমস্ত কথা বলে থাকেন যদিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম থেকে এ কথা প্রমাণিত নয়।

হাদিস শাস্ত্র বিশারদ এবং বিজ্ঞ আলেমদের মতে, রমজানে জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ থাকে, প্রতি রাতে আল্লাহ বহু মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন এবং রোজাদার অবস্থায় ইন্তেকাল করলে আশা করা যায় আল্লাহ তাআলা মাফ করে দেবেন এবং জান্নাতে প্রবেশ করাবেন- এগুলো বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু রমজানে কবরের আজাব বন্ধ থাকে- হাদিসের এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।

আমিন বলা প্রসঙ্গে

❤️💜আমিন শব্দের বাহ্যিক অর্থ হল “কবুল করুন”!
আমিন শব্দের আরো একটি অর্থ হল “”আমি যা বলেছি তাই যেন হয় এবং তাই করুন হে আমাদের রব””!
👉👉বিভিন্ন দোয়া এবং নামাজের সুরা ফাতিহার পর আমরা যে #আমিন বলে থাকি, সেটার অর্থ হলো—”হে আল্লাহ কবুল করুন”। আল্লাহর কাছে যখনই দোয়া করি তখনই কবুলের জন্য আমরা আমিন বলে থাকি। এটি আল্লাহর কাছে কবুলের জন্য দোয়া। মূলত ইহুদি খ্রিস্টান এবং মুসলিমগণ দোয়া ও প্রার্থনা শেষে আমীন বলে থাকে!!
ইহুদি এবং খ্রিস্টান গন কিছু কিছু আল্লাহ প্রদত্ত এবং নবী প্রদত্ত কালচার এখনো ধরে রেখেছে যা ধরে রাখা তাদের জন্য সহজ হয়েছে কিন্তু যা ধরে রাখা কঠিন তা তারা বাদ দিয়েছে এবং শিরক লিপ্ত হয়েছে।
আমিন বা আমেন শব্দটি তাওরাত এবং ইঞ্জিল তথা বাইবেলেও এসেছে। যেহেতু তাওরাত এবং ইঞ্জিল তথা বাইবেলের অরিজিনাল এসেছে সরাসরি আল্লাহর তরফ থেকে যদিও তারা পরবর্তী সময়ে প্রচুর বিকৃতি সাধন করেছে তথাপিও জান্নাত জাহান্নাম এবং এই জাতীয় প্রার্থনার আয়াতগুলো তারা ঠিক রেখেছে।
👉👉সেমেটিক মূলের মূল অর্থ যা থেকে এটি উদ্ভূত হয়েছে “দৃঢ়”, “স্থির” বা “নিশ্চিত” এবং সম্পর্কিত হিব্রু ক্রিয়াপদের অর্থ “বিশ্বস্ত হওয়া” এবং “বিশ্বস্ত হওয়া”। গ্রীক ওল্ড টেস্টামেন্ট সাধারণত আমেনকে “তাই হোক” হিসাবে অনুবাদ করে; ইংরেজি বাইবেলে এটি প্রায়শই “সত্যিই” বা “সত্যি” হিসাবে রেন্ডার করা হয়েছে।
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটেনিকায় এভাবে দেওয়া আছে—
Amen, expression of agreement, confirmation, or desire used in worship by Jews, Christians, and Muslims. The basic meaning of the Semitic root from which it is derived is “firm,” “fixed,” or “sure,” and the related Hebrew verb also means “to be reliable” and “to be trusted.” The Greek Old Testament usually translates amen as “so be it”; in the English Bible it has frequently been rendered as “verily,” or “truly.”

বিভিন্ন দোয়া,মুনাজাত, এবং আল্লাহর কাছে বিভিন্ন বিষয়ে আশ্রয় বা পানাহ চাওয়ার শেষে যে ‘আ-মীন’ آمـين বলা হয় ।
তার অর্থ: হে আল্লাহ, তুমি কবুল করো, ডাকে সাড়া দিন ইত্যাদি।
আরবি অভিধানে লেখা হয়েছে:
آمِينُ: (اسم) اِسْمُ فِعْلِ أمْرٍ مَبْنِيّ عَلَى الفَتْحِ بِمَعْنَى اِسْتَجِبْ

হাদিসে আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“যখন ইমাম সাহেব “আমীন” বলবেন তখন তোমরাও “আমীন” বলবে। কারণ, যার “আমীন” বলা ফিরিশতাগণের “আমীন” বলার সাথে মিলে যাবে তার পূর্বেকার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে”।
হাদীসটি বুখারী, মুসলিম, তিরমিজি, এবং আবু দাউদে সরাসরি এসেছে!!

অন্য আরো একটি বর্ণনায় এসেছে—
“যখন ইমাম সাহেব غَيْرِ المَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ বলবেন তখন তোমরা “আমীন” বলবে। কারণ, যার “আমীন” বলা ফিরিশতাগণের “আমীন” বলার সাথে মিলে যাবে তার পূর্বেকার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”
—-এই হাদিসটিও এসেছে বুখারী, মুসলিম এবং আবু দাউদ এর মধ্যে!

👉আবু মুসা আশ‘আরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশ্যে খুৎবা দিয়ে তিনি আমাদেরকে সালাত ও সুন্নত শিক্ষা দিয়েছেন তিনি তাঁর খুৎবায় বলেন,
“যখন তোমরা সালাত আদায় করতে যাবে তখন তোমরা সালাতের সারিগুলো সোজা করে নিবে অতঃপর তোমাদের মধ্যকার যে কোনও একজন ইমামতি করবেন। যখন তিনি “আল্লাহু আকবার” বলবেন তখন তোমরাও “আল্লাহু আকবার” বলবে। আর যখন তিনি
غَيْرِ المَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ
“গায়রিল মাগযুবি আলাইহিম ওয়ালায যাল্লীন” বলবেন তখন তোমরা “আমীন” বলবে-তাহলে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে ভালবাসবেন।”
—-এই হাদিসটি আছে সহিহ মুসলিম এবং আবু দাউদ শরীফে
👉 আমিন/আমীন শব্দের আরবি বানান, উচ্চারণ ও প্রয়োগের পার্থক্যের কারণে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ:
যখন “আ-মীন” এর আলিফকে মাদ্দ সহকারে ( লম্বা করে টেনে) পড়া হবে তখন তার অর্থ কবুল করা (যেমনটি আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি)। কিন্তু মাদ্দ ছাড়া পড়লে তা বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ অনুযায়ী বিভিন্ন ধরণের অর্থ প্রকাশ করে। যেমন:

● আমীন أمين বা আল আমীন الأمين অর্থ: বিশ্বস্ত, আস্থা ভাজন, সৎ।
এ কথা প্রসিদ্ধ যে, নবুওয়ত প্রাপ্তির পূর্বে যুবক বয়সে আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ‘আল আমিন’ বা বিশ্বস্ত বলে সম্বোধন করা হত।

💜❤️আল আমীন অর্থ: নিরাপদ, শান্তিময়। আল্লাহ তাআলা মক্কা নগরীকে ‘নিরাপদ বা শান্তিময় নগরী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন,
وَهَٰذَا الْبَلَدِ الْأَمِينِ
“এবং (শপথ) এই নিরাপদ নগরীর।” [সূরা ত্বী-ন: ৩]

👉👉মোটকথা এটি ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলিম ধর্মীয় অনুশীলনে একটি সমাপ্তি সূচক শব্দ হিসাবে বা দোয়া বা প্রার্থনার প্রতিক্রিয়া হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আমিন/আমেন শব্দের সাধারণ ইংরেজি অনুবাদের মধ্যে রয়েছে “সত্যিই”, “সত্যি”, “এটি সত্য”, এবং “এটি হতে দিন”। দৃঢ় চুক্তি প্রকাশ করার জন্য এটি পরস্পর কথোপকথনেও ব্যবহৃত হয়। যেহেতু বান্দা যখন আল্লাহর কাছে কোন কিছু প্রার্থনা করে অথবা আশ্রয় চায় তখন মূলত আল্লাহর সাথে বান্দার কথোপতন চলতে থাকে।

👉👉উইকিপিডিয়াতে এসেছে—

আমিন শব্দের ব্যুৎপত্তিঃ
আমেন বাইবেলের হিব্রু উৎপত্তির একটি শব্দ । এটি হিব্রু বাইবেলে বহুবার একটি নিশ্চিত প্রতিক্রিয়া হিসাবে আবির্ভূত হয়, বিশেষ করে আশীর্বাদ অনুসরণ করে। ইঞ্জিলে অর্থাৎ বাইবেলের শব্দটি ৩০ বার এসেছে। মৌলিক ত্রিকোণীয় মূল যেখান থেকে এই শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে, বাইবেলের আরামাইক সহ আফ্রোএশিয়াটিক ভাষার সেমিটিক শাখার বেশ কয়েকটি ভাষায় সাধারণ । হিব্রুতে মূলের অর্থ দৃঢ় বা নিশ্চিত হওয়া, নির্ভরযোগ্য বা নির্ভরযোগ্য হওয়া, বিশ্বস্ত হওয়া, বিশ্বাস করা, বিশ্বাস করা অন্তর্ভুক্ত। শব্দটি প্রাথমিক চার্চের ইহুদি ধর্ম থেকে গ্রীক ভাষায় আমদানি করা হয়েছিল ।গ্রীক থেকে, আমেন অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় প্রবেশ করেছে। ইংরেজি শব্দের একটি প্রমিত অভিধানের ব্যুৎপত্তি অনুসারে, আমেন গ্রীক থেকে ল্যাটিন ভাষায় এবং সেখান থেকে ইংরেজিতে এসেছে।

হিব্রু থেকে, শব্দটি পরে আরবি ধর্মীয় শব্দভাণ্ডারে গৃহীত হয় এবং আরবি মূল أم ن [ উদ্ধৃতি প্রয়োজন ] , যা হিব্রু ভাষার অনুরূপ অর্থে সমতল করা হয়। খ্রিস্টান এবং ইসলামিক অভিধানে ইন্টারজেকশনটি ঘটে, সাধারণত প্রার্থনায়, সেইসাথে ধর্মনিরপেক্ষভাবে, যদিও কম সাধারণভাবে, যাতে সম্পূর্ণ নিশ্চিতকরণ বা সম্মান বোঝাতে পারে। ধর্মীয় গ্রন্থে, এটি বাইবেলের আরবি অনুবাদে এবং কুরআনের ঐতিহ্যগতভাবে প্রথম অধ্যায় পাঠ করার পরে ঘটে, যা আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মীয় প্রার্থনার অনুরূপ।

কিছু থিওসফিস্টদের মধ্যে জনপ্রিয় , [১২] ইতিহাসের আফ্রোকেন্দ্রিক তত্ত্বের প্রবক্তা , [১৩] এবং গুপ্ত খ্রিস্টধর্মের অনুসারী [১৪] অনুমান হল যে আমেন মিশরীয় দেবতা আমুন (যাকে কখনও কখনও আমেন বানানও বলা হয়) এর নামের একটি উৎস । . পূর্ব ধর্মের কিছু অনুসারী বিশ্বাস করেন যে আমেন হিন্দু সংস্কৃত শব্দ অম এর সাথে শিকড় ভাগ করে । [15] [16] [17] [18] এই ধরনের বাহ্যিক ব্যুৎপত্তি আদর্শ ব্যুৎপত্তিগত রেফারেন্স রচনায় অন্তর্ভুক্ত নয়। উপরে উল্লিখিত হিব্রু শব্দটি আলেফ দিয়ে শুরু হয়, যখন মিশরীয় নামটি যোদ দিয়ে শুরু হয় । [১৯]

ফরাসি ভাষায়, হিব্রু শব্দ আমেন কখনও কখনও আইন্সি সোইট-ইল হিসাবে অনুবাদ করা হয় , যার অর্থ “তাই হোক।” [২০]

ভাষাবিদ গিল’আদ জুকারম্যান যুক্তি দেন যে, হালেলুজার ক্ষেত্রে , আমেন শব্দটি সাধারণত অনুবাদের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় না কারণ বক্তাদের আইকনিসিটিতে বিশ্বাসের কারণে , তাদের ধারণা যে শব্দের মধ্যে সম্পর্ক সম্পর্কে অন্তর্নিহিত কিছু আছে। সংকেতকারী (শব্দ) এবং এটি কী বোঝায় (এর অর্থ)। [২১] : ৬২
👉👉 এ শব্দটি ভূমি জরিপকারী ও কর্মচারী অর্থেও ব্যবহৃত হয়। (বাংলা ব্যবহারিক অভিধান-বাংলা একাডেমি)
👉👉আমিন অর্থ: সচিব, সেক্রেটারি, ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি। (আরবি-বাংলা অভিধান-ফজলুর রাহমান)

এর পরে অন্য শব্দ যুক্ত করে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন:
👉👉আমীনুস সানদুক أمـــين الصــندوق অর্থ: ক্যাশিয়ার।
👉👉আমিনুল মাকতাবাহ أمـــين المكتبـــة অর্থ: লাইব্রেরিয়ান।
👉👉আল আমীনুল আম الأمـــين العام অর্থ: সাধারণ সম্পাদক ইত্যাদি।
মোটকথা, বানান এবং ব্যবহারের পার্থক্যের কারণে এই আমীন বা আমিন শব্দটি ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে থাকে।

🟥🟪 এবার আসা যাক #ছুম্মা_আমিন বলার বিষয়ে–
ছুম্মা শব্দটির অর্থ অতঃপর অথবা আবারও এবং আমিন শব্দটির অর্থ কবুল করো বা গ্রহণ করে নাও। সাধারণত আল্লাহ্ তা’লার নিকট কোন দোয়া চাওয়ার পর আমিন বলা হয়। এর অর্থ- হে আল্লাহ্ কবুল করে নাও। আবার কখনো কখনো দোয়ার শেষে আল্লাহ্ তা’লার কাছে অধিক আকুতির সাথে আমিন-ছুম্মা আমিন কথাটি বলা হয়।

তবে বিষয়ে প্রত্যেকটি আল্লাহ খুব ভালোভাবে অবগত এবং আল্লাহ আমাদের যে কোন বিষয়ে যতটুকু জ্ঞান দান করেছেন আমরা কেবল সেখান থেকে কথা বলতে পারি।

শবে মেরাজের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, করনীয় এবং বর্জনীয়।।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহীল কারীম।
আম্মা বাদ।
কালাল্লাহি তায়ালা ,
আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
سبحان الذي اسرى بعبده ليلا من المسجد الحرام الى المسجد الاقصى الذي باركنا هو له لنوره لنور يهو من اياتنا،انه هو السميع البصير….
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালার কাছে জন্য যিনি আমাদেরকে আজকের এই দিন পর্যন্ত জীবিত রেখেছেন এবং আজকের এই আলোচনা করার তৌফিক দান করেছেন, এজন্য আবারও আমরা আল্লাহর শোকর আদায় করি, আলহামদুলিল্লাহ।
উপরোক্ত আয়াতটি সূরা বনী ইসরাইল অথবা ইসরা এর প্রথম আয়াত।
পবিত্র কোরআনে ইসরা বা ভ্রমণ সম্পর্কে এই একটি আয়াতই ব্যক্ত করা হয়েছে। এবং উর্ধা আকাশের কিছু বর্ণনা দেওয়া হয়েছে সূরা নুজমে।
সূরা বনী ইসরাঈলে প্রথম আয়াতে আল্লাহ বলেছেন–
“”তিনি পবিত্র (আল্লাহ) যিনি তার বান্দাকে রাত্রিভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত। যার আশপাশ আমি বরকতময় করেছি। যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাতে পারি। নিশ্চয় তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’

এই হলো আয়াতের মোটামুটি বাংলা তর্জমা বা অনুবাদ।।
সূরা বনী ইসরাইলে শুধু মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত একরাত্রিতে ভ্রমণের কথা উল্লেখ আছে এবং আয়াতের শেষে বলে দেওয়া হয়েছে যে, তিনি তাঁকে এই জন্য ভ্রমণ করাচ্ছেন এই জন্য, যাতে তিনি আল্লাহর নিদর্শনসমূহ দেখাতে পারেন।।।
অতঃপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে উর্ধ আকাশে গমন করেন এবং এই ব্যাপারে কমপক্ষে 25 জন জলিল ও কদর সাহাবীর বর্ণনা করা হাদিস উল্লেখ আছে বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে।
মেরাজ সংঘটিত হয়েছিল নবুওয়তের ১১তম বছরের ২৭ রজবে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বয়স ৫১ বছর। মেরাজ হয়েছিল সশরীরে জাগ্রত অবস্থায়। মেরাজের বিবরণ পবিত্র কোরআনের সুরা নাজমে ও সুরা ইসরায় বিবৃত হয়েছে। হাদিসের কিতাব বোখারি , মুসলিম ও সিহাহ সিত্তাসহ অন্যান্য কিতাবে মেরাজের বিষয়টি নির্ভরযোগ্য বিশুদ্ধ সূত্রে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম সকালবেলা যখন বলা শুরু করলেন যে আমি গতরাতে বায়তুল মোকাদ্দাস গিয়েছি এবং সেখান থেকে আকাশের ভ্রমণ করে এসেছি তখন মক্কার কাফেররা ঠাট্টা বিদ্রুপ করা শুরু করলেন।

অতঃপর এই ব্যাপারে আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন।

সূরা নাজমে ১ থেকে ১৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন–
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘শপথ নক্ষত্রের যখন তা বিলীন হয়। তোমাদের সাথী (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিপথগামী হননি এবং বিভ্রান্ত হননি। আর তিনি নিজে থেকে কোনো কথা বলেন না। (বরং তিনি যা বলেন) তা প্রদত্ত ওহি (ভিন্ন অন্য কিছু) নয়। তাকে শিখিয়েছেন মহাশক্তিধর (জিবরাইল আ.)। সে (জিবরাইল আ.) পাখাবিশিষ্ট, সে স্থিত হয়েছে দূর ঊর্ধ্বে। অতঃপর নিকটবর্তী হলো, পরে নির্দেশ করল। তারপর হলো দুই ধনুকের প্রান্তবর্তী বা আরও নিকট। পুনরায় তিনি ওহি করলেন তার বান্দার প্রতি যা তিনি ওহি করেছেন। ভুল করেনি অন্তর যা দেখেছে। তোমরা কি সন্দেহ করছ তাকে, যা তিনি দেখেছেন সে বিষয়ে। আর অবশ্যই দেখেছেন তিনি তাকে দ্বিতীয় অবতরণ স্থলে; সিদরাতুল মুনতাহার কাছে; তার নিকটেই জান্নাতুল মাওয়া। যখন ঢেকে গেল সিদরা যা ঢেকেছে; না দৃষ্টিভ্রম হয়েছে আর না তিনি বিভ্রান্ত হয়েছেন; অবশ্যই তিনি দেখেছেন তাঁর রবের বড় বড় নিদর্শনসমূহ।’

মেরাজ অর্থ ঊর্ধ্বগমন। মূলতঃ মেরাজ হলো, মহানবী মুহাম্মাদ সাঃ কর্তৃক সশরীরে ও সজ্ঞানে জাগ্রত অবস্থায় জিবরাইল আঃ ও মিকাল আঃ সাথে বিশেষ কুদরতি একপ্রকার বাহনের মাধ্যমে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা এবং সেখান থেকে বিশেষ এক প্রকার কুদরতি সিঁড়ির মাধ্যমে প্রথম আসমান থেকে একে একে সপ্তম আসমান এবং সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত গমন করেন।

👉👉এখানে বলে রাখা ভালো যে অনেকেই বলে থাকেন যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বোরাকের মাধ্যমে এবং “রফরফ” নামক বাহনের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করেছেন।।
এবং “বোরকা” নামক প্রাণীটিকে চিত্রাহিত করা হয়েছে একজন সুন্দরী মহিলার মাথা বিশিষ্ট একটি পাখাওয়ালা ঘোড়া’র আকৃতি দিয়ে।
নাউজুবিল্লাহ।
এ জাতীয় বহু ছবি ও চিত্র এঁকে শিয়া এবং ইহুদীরা প্রচার করেছে এবং করছে ইসলামকে বিভ্রান্ত করার জন্য।

👉 মেরাজ সংক্রান্ত সকল হাদিস একত্রে বিশ্লেষণ করে প্রখ্যাত আলেম-উলামাদের সিদ্ধান্তও এটি যে, রাসুল সাঃ সে রাতে সিঁড়িতে করে আসমানে গিয়েছেন। বুরাকে করে নয়।

সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফাসসির ইমাম ইবন কাসির(র) তাঁর তাফসির গ্রন্থে সুরা বনী ইস্রাঈলের ১নং আয়াতের তাফসির] ইসরা-মিরাজ সংক্রান্ত বিভিন্ন হাদিস উল্লেখ করে শেষ অংশে উল্লেখ করেছেন যে, রাসুল সাঃ সে রাতে বুরাকে করে বাইতুল মুকাদ্দাসে গিয়েছেন। এরপর এক প্রকার মইতে বা সিঁড়িতে করে প্রথম আসমানে গিয়েছেন, এরপর অবশিষ্ট আসমানগুলোতে গিয়েছেন। 

 

 

অর্থঃ “রাসুলুল্লাহ(ﷺ) যখন বাইতুল মুকাদ্দাসের কাজ শেষ করলেন তখন তাঁর জন্য মিরাজ (সিঁড়ি) আনা হল এবং এতে করে তিনি আসমানে গমন করেন। বুরাকে করে যাননি। যেমন কতিপয় মানুষ তা ধারণা করে থাকে। বরং বুরাক বাইতুল মুকাদ্দাসের দরজায় সাথে বাঁধা ছিল যেন তাতে করে তিনি আবার মক্কায় ফিরে আসতে পারেন।” [21]

এ সংক্রান্ত সকল হাদিসের আলোকে এটিই তাঁর অভিমত। তিনি তাঁর ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন,

 

 


👉তাফসির মা’আরিফুল কুরআনেও সুরা বনী ইস্রাঈলের ১নং আয়াতের তাফসিরে ও ইবনে কাসিরের মতটিকেই সমর্থন করা হয়েছে। তাঁর বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে রাসুল সাঃ মেরাজের রাতে সিঁড়িতে করে আসমানে গিয়েছেন , কোন রফরফ বা বোরাকে করে নয় ।

👉জালালুদ্দিন সুয়ুতী রহঃ বলেছেন,
“বিশুদ্ধ মত যা সহীহ হাদিস থেকে স্থিরকৃত হয়েছে, ঊর্ধ্বগমন মিরাজ বা সিঁড়ি জাতীয় এক ধরণের বস্তুর মাধ্যমে হয়েছিল, বোরাকের মাধ্যমে নয়।

আল্লাহর কি সিঁড়ির এত অভাব পড়েছে, বা বিভিন্ন যানবাহনের এত অভাব পড়েছে যে , রাসূলকে একটি মহিলা মার্কা পাখা ওয়ালা ঘোড়া দিয়ে আসমানে নিতে হবে?? মূলত এমন কোন বিষয় নেই যেখানে ইহুদিরা ইসলামকে বিকৃত করেনি!!

👉অনেকেই বলে থাকেন যে সেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম আল্লাহর সাথে দেখা করেছেন। কিন্তু এই কথার কোন দলিল নাই। বরং হাদিসের দলিল অনুযায়ী এটি একটি মিথ্যা বানোয়াট কথা।।
বুখারী শরীফের মেরাজ অধ্যায়ে একটি হাদিসে স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে যে, আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা বলেন, যে ব্যক্তি বলবে যে রাসূলের সাথে আল্লাহ দেখা করেছেন সাক্ষাত করেছেন সে আল্লাহর প্রতি অপবাদ দিল।
(বুখারী শরীফের মেরাজ অধ্যায় হাদীসটি দেখে নেওয়া যেতে পারে)
রাসূল সাঃ কে উপরে নিয়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো আল্লাহর নিদর্শনসমূহ স্বচক্ষে দেখানো যাতে তিনি উম্মতকে তার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে পারেন!!
আর এ সমস্ত কথাগুলো বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থের হাদিস সমূহে এভাবেই বর্ণনা করা আছে।

সূরা বনী ইসরায়েলে প্রথম আয়াত দিয়ে আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর রাত্রিকালীন ভ্রমণের বর্ণনা দিয়েছেন। ইসরা অর্থ রাত্রিকালীন ভ্রমণ। রাসুলুল্লাহ সাঃ মেরাজ রাত্রিকালে হয়েছিল বলে এটিকে ইসরা বলা হয়।
বিশেষত বায়তুল্লাহ অর্থাৎ মসজিদুল হারাম থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সফরকে ইসরা বলা হয় ।
সূরা ইসরার অর্থাৎ বনি ইসরাইলের সেই আয়াতটি প্রথমেই বর্ণনা করা হয়েছে।

মেরাজের রাতে রাসুলুল্লাহ জান্নাত-জাহান্নাম দেখানো হয়েছে।
সেখানে রাসূল সাঃ কে বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি দেখানো হয়।
এ রাতেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ ঘোষণা করা হয়।
এ রাতে আরো কিছু বিষয়ের সতর্কের তার ব্যাপারে বিভিন্ন হাদিসে এসেছে। যেমন–
👉আল্লাহকে ছাড়া কারও ইবাদত করবে না,
👉 পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে,
👉নিকট স্বজনদের তাদের অধিকার দাও;
👉মিসকিনদের ও পথসন্তানদের (তাদের অধিকার দাও);
👉অপচয় করো না, অপচয়কারী শয়তানের ভাই,
👉কৃপণতা করো না,
👉সন্তানদের হত্যা করবে না,
👉 ব্যভিচারের নিকটেও যেও না,
👉 বিনা কারণে মানব হত্যা করো না,
👉 এতিমের সম্পদের কাছেও যেয়ো না,
👉 প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো,
👉মাপে পূর্ণ দাও,
👉 ওইসবের অনুসরণ করো না যাতে তোমার জ্ঞান নেই,
👉 পৃথিবীতে অহংকার করে চলাফেরা না করা । এ সবই মন্দ, তোমার রবের কাছে অপছন্দ।
আর এই সমস্ত বিষয়গুলো সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে সূরা বনী ইসরাইলের 22 থেকে 44 নম্বর আয়াত সমূহে যা তাফসীর থেকে পড়ে নেওয়া যেতে পারে।

শবে মেরাজকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে বেশ কিছু প্রচলনসহ বিশেষ নামাজ ও রোজা রাখার প্রথাও প্রচলিত রয়েছে। শবে মেরাজ উপলক্ষে কোনো নামাজ বা রোজার বিধান কি আসলেই ইসলামে রয়েছে? বলে?

অনেককে শবে মেরাজ উপলক্ষে বিশেষ নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে সমবেত হতে দেখা যায়। বহু নারীও সেই রাতে নামাজ আদায় করার পদ্ধতি কী জানতে চান। বহু মুসলমান এই রাত উপলক্ষে মেরাজের রোজা রাখতে চান বা রাখার বিধান জানতে চান। নামাজ আদায় করা ও রোজা রাখা অবশ্যই পুণ্যের কাজ। কিন্তু শবে মেরাজ উপলক্ষে বিশেষ কোনো নামাজ ও রোজার বিধান ইসলামি শরিয়তে নেই। এ ব্যাপারে আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.) তৎপ্রণীত লাতায়েফ ও মাআরেফ গ্রন্থে বলেন, ‘রজব মাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষ কোনো নামাজ নেই। রজব মাসের প্রথম জুমায় সালাতুর রাগায়েব প্রসঙ্গে যেসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে সেগুলো ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও বানোয়াট।’

অধিকাংশ আলেমের মতে, শবে মেরাজ উপলক্ষে নামাজ বিদআত। পরবর্তী যুগের আলেমগণের মধ্যে যারা এই মত ব্যক্ত করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন আবু ইসমাঈল আনসারি, আবু বকর সামআনি, আবুল ফযল ইবনে নাসির ও আবুল ফারায ইবনে জাওযি (রহ.)সহ আরও অনেক আলেম। শবে মিরাজ উপলক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো নামাজ আল্লাহর রাসুলের হাদিসের মাধ্যমে অথবা সাহাবিদের আমলের মাধ্যমে অথবা তাবেয়িদের আমলের মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়নি। এ রাতের কোনো ইবাদত আল্লাহর রাসুলের কোনো হাদিসের মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়নি। ভিন্ন কোনো নামাজ, বিশেষ কোনো নামাজ আদায় করার কোনো প্রয়োজন নেই। অন্যান্য রাতের মতোই এ রাতে নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতে পারেন। সেটা স্বাভাবিক নিয়ানুযায়ী আগে যেভাবে আদায় করতেন সেভাবেই আদায় করবেন।

অনেক মুসলিম ভাই ও বোনেরা শবে মেরাজ উপলক্ষে ১২ /২০/৪০/১০০ রাকাত পর্যন্ত নামাজ আদায় করেন। ইসলামি শরিয়তেও শবে মেরাজের নামাজ বলে কোন নামাজ নেই।
নফল নামাজ পড়া নেকীর কাজ, কিন্তু শবে মেরাজ উপলক্ষে নফল নামাজ আদায়ের কোনো ভিত্তি ও প্রমাণ ইসলামে নেই। কাজেই শবে মেরাজের নামে নফল নামাজ আদায় করা এবং এর ব্যবস্থা প্রণয়ন করা মানে ইসলামি শরিয়তে নিজের পক্ষ থেকে কিছু সংযোজন করা। আর এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসুল বলেছেন, যে আমাদের ধর্মে এমন কিছু সংযুক্ত বা উদ্ভাবন করবে, যা তার শরিয়তের অংশ নয়, বরং তা প্রত্যাখ্যাত হবে। -সহিহ বোখারি।

আমাদের অনেক মুসলিম ভাই ও বোনেরা শবে বরাত ও শবে কদরের সঙ্গে মিলিয়ে শবে মেরাজেও নফল রোজা রেখে থাকেন। একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য- নফল রোজা যখন ইচ্ছা তখন রাখা যায় কিন্তু কোনো উপলক্ষে নফল রোজা রাখতে হলে অবশ্যই আগে জেনে নিতে হবে, আমি বা আমরা যে উপলক্ষে নফল রোজা রাখছি শরিয়ত সেটাকে অনুমতি দিয়েছে কিনা।

শবে মেরাজ উপলক্ষে নফল রোজা রাখার কোনো বর্ণনা কোরআন-হাদিসের কোথাও নেই। আল্লাহর রাসুল ও তার অনুসারীরা এই দিনে বিশেষভাবে কোনো রোজা রেখেছেন এমনে কোনো বর্ণনা ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই এই দিনে শবে মেরাজ উপলক্ষে রোজা রাখা কোনো ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে না। সুতরাং শবে মেরাজ উপলক্ষে আলাদা বিশেষ নামাজ-রোজা আদায় করা থেকে বিরত থাকা উচিত
👉👉 এক কথায় বলতে গেলে সবে বেরাজ বা মেরাজের রাত্রিতে কিংবা দিনে কোন অতিরিক্ত আমল নেই। যদি অতিরিক্ত কিছু করা হয় তবে তা বেদআত বলি গণ্য হবে। এটা আমাদের মনে রাখতে হবে যে নফল এবাদতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবাদত হল শেষ রাত্রিতে জেগে এবাদত করা কেননা ওই সময় আল্লাহ দোয়া কবুল করেন।
আর নফল রোজা গুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ রোজা হলো
১/ আরাফার দিনের রোজা।
২/ আশুরার দুই রোজা।
৩/ শাওয়াল মাসের ছয় রোজা।
অর্থাৎ বছরে এই নয়টি রোজা যে ব্যক্তি রাখবেন তার পূর্বের এক বছরের এবং পরের এক বছরের রোজা রাখার সওয়াব আল্লাহ আমলনামায় লিপিবদ্ধ করে দেবেন এবং পূর্বের এক বছরের ও পরের এক বছরের সকল গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দেবেন ইনশাআল্লাহ।
তাছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম মাঝেমধ্যেই বৃহস্পতিবার এবং সোমবারে রোজা রাখতেন।
তাছাড়া মাঝেমধ্যে রাসূল সাঃ প্রতি মাসের অর্থাৎ চন্দ্র মাসের ১৩-১৪ এবং ১৫ তারিখে তিনটি রোজা রাখতেন।
আর এই রোজাগুলো বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
কিন্তু সবে মেরাজের কোন রোজার কথা কোথাও উল্লেখ নেই কিংবা কোন অতিরিক্ত আমল করার কথা উল্লেখ নেই।
অপরদিকে সবাই বরাত এর কোন আমল বা রোজার কথাও উল্লেখ নেই বরং যা আছে সব মিথ্যা ও বানোয়াট হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত করা হয়েছে।।
আল্লাহ আমাদের সঠিক জিনিস সঠিকভাবে জেনে বিশুদ্ধভাবে আমল করার তৌফিক দান করুন।
আল্লাহ আমাদের শিরক বিদআত কুফর এবং নেফাক এর মত ভয়ংকর গুনাহ থেকে হেফাজত করুন।।
আল্লাহ আমাদের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত সুস্থ সুন্দর থাকার ও নেক আমল করার তৌফিক দান করুন।
আর আল্লাহ আমাদের অবশ্যই মৃত্যু দান করুন ঈমানের সহিত, সুস্থ শরীরে, এবাদতরত অবস্থায় এবং প্রিয়জনদের মাঝে।
আর আমাদেরকে এবং কেয়ামত পর্যন্ত আমাদের বংশধরগণকে সঠিক ইসলামের উপর ইস্তেকামাত রাখুন।
ওমা তৌফিকি ইল্লা বিল্লাহ।
ও আখেরি জামানা অনিল হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।
সুবহানাকা আল্লাহুম্মা বিহামদিকা, আশহাদু আনল্লা ইলাহা ইল্লা আংতা আস্তাগ ফিরকা ওতুবূ ইলাইক।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।।।

হাট্টিমাটিম টিম মূলত একটি বাহান্ন লাইনের পূর্ণ ছড়া

হাট্টিমাটিম’ আসলে ৫২ লাইনের একটি ছড়া, যার শেষের চার লাইন আমাদের প্রায় সকলকেই শিখানো হয়েছিল আমাদের ছোটবেলায়।। বাঙালিরা ছোটবেলায় পড়া এই ছড়াটি কোনওদিনই ভুলবেন না হয়তো কেউ। কারণ এই জাতীয় উদ্ভট অজনক কথাবার্তা ও ঘটনার কথা সকলের মনে থাকে।। গরুর চারটি ঠ্যাং আছে ও একটি লেজ আছে এটি হয়তো ভুলে যেতে পারে কিন্তু হাট্টিমাটিম টিম নামক অদেখা অচেনা এক পাখি জাতীয় প্রাণী যার শিং আছে আবার ডিমও পারে এই প্রাণীর কথা কেউ বলবে না।।

কারণ কবিতার মাধ্যমে বাচ্চাদের মস্তিষ্কে এমন এক ফালতু চিন্তা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে এই বিষয় নিয়ে সব বাচ্চারা চিন্তা করতে বাধ্য হত।

আমি নিজেই বহুদিন পর্যন্ত চিন্তা করেছি, শিংওয়ালা প্রাণীর ডিম পারে কিভাবে?? কারণ আমাদের চোখের সামনে কোন শিংওয়ালা প্রাণী ডিম পাড়তে দেখিনি।।
তাছাড়া ছোটবেলায় চিড়িয়াখানা গিয়েও খুঁজে দেখতাম কোথাও হাট্টিমাটিম টিম প্রাণীটি আছে কিনা!

🔰🔰শরীফ আর শরিফার কাহিনী সৃষ্টিকারী এবং এমন অসংখ্য মিথ্যা ভুল ও বানোয়াট কাহিনী দিয়ে কারিকুলাম সাজানো শিক্ষা কমিশন শুধু বর্তমানেই নয় বরং ইতিপূর্বেও হয়েছিল এবং এরাও একই পথ ধরেছে। কথায় আছে, “শিশুদের সাথে কখনোই মিথ্যা কথা বলতে হয় না”। অথচ শিশুদের প্রাথমিক ও প্রথম শিক্ষা শুরু হয় মিথ্যা কথার ছড়া দিয়ে!!
বাঙালি অবুঝ শিশুদের জন্য তৎকালীন কারিকুলাম তৈরি কারক ছড়াটি মোটেই মাত্র চার লাইনের নয়।
মোটামুটি কথা ফুটলেই বাঙালি শিশুদের যে কয়েকটি ছড়া কণ্ঠস্থ করানো হয়, তার মধ্যে হাট্টিমাটিম ছড়াটি অন্যতম।।
ছড়াটি ছিল—-
“হাট্টিমাটিম টিম’।
তারা মাঠে পাড়ে ডিম,
তাদের খাড়া দুটো শিং,
তারা হাট্টিমাটিম টিম”।
এর চেয়ে বেশি তথ্য শতকরা ৯৯ জন বাঙালির কাছে নেই!! সাহিত্য কবিতা ছড়া নিয়ে যারা গবেষণা করে শুধুমাত্র তারাই এই ব্যাপারটি সম্পর্কে জানে!!
মূলত ছড়াটি মোটেই ৪ লাইনের নয়।
এটি ছড়াকার #রোকনুজ্জামান_খানের লেখা একটি ৫২ লাইনের সম্পূর্ণ ছড়া।

🔰🔰রোকনুজ্জামান খান জন্মেছিলেন ১৯২৫ সালের ৯ এপ্রিল বর্তমান ফরিদপুর জেলায়। বাংলাদেশে তিনি ‘দাদাভাই’ নামে পরিচিত ছিলেন। তৎকালীন দেশের জনপ্রিয় দৈনিক ইত্তেফাক সংবাদপত্রের শিশু-কিশোরদের বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন তিনি বহু বছর।
তাঁর রচনার বেশিরভাগই শিশু-কিশোরদের জন্য। হাট্টিমাটিম সম্ভবত তাঁর রচনাগুলির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়।
১৯৬২ সালে রচিত হয় ছড়াটি। ১৯৬৮ সালে #বাংলা_একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত করা হয় তাঁকে। ১৯৯৯ সালে মারা যান রোকনুজ্জামান।
সেই 52 লাইনের আসল ছড়াটা এইরকম –

টাট্টুকে আজ আনতে দিলাম
বাজার থেকে শিম
মনের ভুলে আনল কিনে
মস্ত একটা ডিম।

বলল এটা ফ্রি পেয়েছে
নেয়নি কোনো দাম
ফুটলে বাঘের ছা বেরোবে
করবে ঘরের কাম।

সন্ধ্যা সকাল যখন দেখো
দিচ্ছে ডিমে তা
ডিম ফুটে আজ বের হয়েছে
লম্বা দুটো পা।

উল্টে দিয়ে পানির কলস
উল্টে দিয়ে হাড়ি
আজব দু’পা বেড়ায় ঘুরে
গাঁয়ের যত বাড়ি।

সপ্তা বাদে ডিমের থেকে
বের হল দুই হাত
কুপি জ্বালায় দিনের শেষে
যখন নামে রাত।

উঠোন ঝাড়ে বাসন মাজে
করে ঘরের কাম
দেখলে সবাই রেগে মরে
বলে এবার থাম।

চোখ না থাকায় এ দুর্গতি
ডিমের কি দোষ ভাই
উঠোন ঝেড়ে ময়লা ধুলায়
ঘর করে বোঝাই।

বাসন মেজে সামলে রাখে
ময়লা ফেলার ভাঁড়ে
কাণ্ড দেখে টাট্টু বাড়ি
নিজের মাথায় মারে।

শিঙের দেখা মিলল ডিমে
মাস খানিকের মাঝে
কেমনতর ডিম তা নিয়ে
বসলো বিচার সাঁঝে।

গাঁয়ের মোড়ল পান চিবিয়ে
বলল বিচার শেষ
এই গাঁয়ে ডিম আর রবে না
তবেই হবে বেশ।

মনের দুখে ঘর ছেড়ে ডিম
চলল একা হেঁটে
গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে
ডিম গেলো হায় ফেটে।

গাঁয়ের মানুষ একসাথে সব;
সবাই ভয়ে হিম
ডিম ফেটে যা বের হল তা
হাট্টিমাটিম টিম।

হাট্টিমাটিম টিম-
তারা মাঠে পারে ডিম
তাদের খাড়া দুটো শিং
তারা হাট্টিমাটিম টিম।

🔰🔰 পোস্টমর্টেমঃ একথা সর্বজন বিদিত যে, রোকনুজ্জামান খান একজন জনপ্রিয় ছড়াকার ,সাহিত্যিক, ও সাংবাদিক ছিলেন।
কেউ আকাশচুম্বী জনপ্রিয় হয়ে গেলেই তিনি অনুসরণীয় আদর্শ হয়ে যান না। একজন মুসলিম হিসাবে রোকনুজ্জামান খানের উচিত হয়নি মিথ্যা কথা দিয়ে সাজানো কবিতা লিখে বাচ্চাদেরকে উপহার দেওয়া। তিনি ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছিলেন এবং মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন।।
মুসলিম অর্থ আত্মসমর্পণকারী এবং মুসলিমের প্রথম ও প্রধান কাজ হল সত্যের সাক্ষ্য দেওয়া।।
সেখানে তিনি প্রথমেই বাচ্চাদেরকে অর্থাৎ মুখে কথা ফোটার পর বাচ্চাদেরকে যে কথা শিক্ষা দেওয়া হবে সেটি তিনি সাজিয়েছেন শুধু মিথ্যা নয় বরং উদ্ভট অজানা এক জন্তুর নামে যার অস্তিত্ব পৃথিবীতে ছিল না, নাই, এবং কোনদিন হবে না।
এটি উনার ভুল ছিল না বরং রীতিমতো একটি অন্যায় কর্ম। কেননা মানুষকে বিশেষ করে বাচ্চাদেরকে মিসগাইড করা একটি বড় রকমের ক্রাইম।।
আর একজন মুসলিমের জন্য তো সেটি হল বিরাট বড় একটি অন্যায় যার শাস্তি জাহান্নাম।।।
দুনিয়াতে এত সুন্দর সুন্দর ও আজব প্রাণী থাকতে এবং এত নবী-রাসূল ও সৎ লোক থাকা অবস্থায় একটি উদ্ভট প্রাণীর ইমেজ উপস্থাপন করে কবিতা লিখতে হবে কেন???
ইবলিশ যখন মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং মানুষ যখন নবী-রাসূলদের শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে নিজেদের মন মস্তিষ্ক অনুযায়ী চলতে থাকে তখন মানুষের মগজ থেকে এই জাতীয় ফালতু কথা বের হয়।।।
শয়তানের কাজ হল মানুষের সামনে খারাপ জিনিস গুলো সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা।। এবং এভাবেই সে মানুষকে বিপথগামী করে।।
শয়তান মূলত দুই প্রকার।
একটি হলো “জ্বীন শয়তান” এবং দ্বিতীয় টি হল “মানুষ শয়তান”।
এজন্যই আল্লাহ সূরা নাসে উভয় প্রকার শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট পানা বা আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।
“মিনাল জিন্নাতি ওয়ান্নাস” অর্থাৎ (আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই) মানুষ শয়তান এবং জিন শয়তান থেকে।
সত্য জনপ্রিয়তার মানদন্ডে প্রতিষ্ঠিত হয় না বরং একই সাথে একটি বিশাল দল বা জামাত কিংবা একটি দেশের পুরো লোক মিথ্যাবাদী থাকতে পারে এবং মিথ্যার অনুসারী হতে পারে।।
তৎকালীন ইরাকের #নিমরদ বা #নমরুদের পুরো দেশের সব লোক ছিল মিথ্যাবাদী শুধু ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম ছাড়া। অবশেষে তিনি হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
মিশরের পুরো ফেরাউন কওমের সবাই ছিল মিথ্যাবাদী এবং সেখান থেকে একমাত্র সত্যবাদী মূসা আলাইহিস সালাম হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

অতএব কোন একজন কবি বা সাহিত্যিক জনপ্রিয় হলেই তিনি ভালো হয়ে যাবেন, কিংবা সত্যবাদী হয়ে যাবেন, অথবা তিনি অনুসরণযোগ্য হয়ে যাবেন, এমনটি চিন্তা করা বোকামি।
তাই আমাদের উচিত অর্থাৎ প্রত্যেকের উচিত সত্যের সাক্ষ্যদানকারী হয়ে যাওয়া, সত্যকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করা, এবং সকল প্রকার মিথ্যাকে চিহ্নিত করে তার বিরোধিতা করা।
কেননা মিথ্যার ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকলে মিথ্যা ডালপালা প্রসারিত করে সমাজকে কোনো সুখি করে ফেলে।।
যেমন এই মিথ্যা কবিতাটি সেই শৈশবে অর্থাৎ শিশুকালেই আমাদের মন মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেওয়ার ফলে আমাদের শিশু মেধার অপচয় হয়েছে ব্যাপক হারে এবং একটি ফালতু প্রাণীকে নিয়ে কোটি কোটি শিশুর শৈশব কেটেছে অহেতুক চিন্তা ভাবনায়।
আর এর জন্য দায়ী এই রোকনুজ্জামান খানের মতো মিথ্যা সাক্ষ্য দানকারী এবং উদ্ভট ও মিথ্যা প্রচারকারী কবিগণ।
কাব্য শাশ্বত সুন্দর।
একটি কবিতা দিয়ে মনের ভাব সংক্ষিপ্ত আকারে সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা যায়।
ছোট্ট একটি কবিতার মাধ্যমে বিশাল একটি ইতিহাস তুলে ধরা যায়।
কিন্তু একটি মিথ্যা কবিতা বা ছড়ার মাধ্যমে পুরো একটি জাতিকে বিপথগামী করে দেওয়া যায়।
আল্লাহ আমাদের সঠিক জিনিস সঠিকভাবে বুঝার তৌফিক দান করুন আমিন।