রাজাকারের তালিকায় শীর্ষে আওয়ামী লীগ !

!!রাজাকারের তালিকায় শীর্ষে আওয়ামী লীগ!!
শীর্ষ ৪৬ জন রাজাকারের তালিকায় আঃলীগ নেতা।

আওয়ামী লীগ দলটি এমনই একটি দল এর জম্মই হয়ে ছিল অবৈধ দিয়ে যা আজ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এতোই গান গায় মনে হয় আঃলীগই মুক্তিযুদ্ধ দল অথচ এ দলটিই সব চেয়ে বড় রাজাকারের দল। আঃলীগের শীর্ষ তালিকায় আছি যদি তাহলে সর্ব প্রথমে উঠে আসে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম সহ তার ছেলে শেখ কামাল রাজাকারের তালিকায় অন্তভূক্ত। শেখের পরিবার কেহত মুক্তিযুদ্ধ করেই নাই বরং পাকিস্তানের মাসিক বাতা নিত নিয়ম মতো এবং শেখ মজিবুর রহমান কখনও বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নীই সে চেয়ে ছিল পৃর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তাহলে রাজাকার কে??

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে, এমন অভিযোগে বিরোধীজোট বিএনপি ও জামায়াতরে নেতাদের বিচার করছে রাজাকারের দল আওয়ামী লীগ। তারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের কথিত স্বপক্ষ শক্তি দাবি করে অথচয় শেখ মজিবুর রহমান সহ শেখ কামাল রাজাকারের নামে তালিকায়ও নম্মর ওয়ান অথচয় আওয়ামী লীগের থাকা রাজাকারদের ব্যাপারে একেবারে নিরব কি কারনে এ নিরব?? এদলটিতেও রয়েছে, কুখ্যাত রাজাকার, আল বদর, আল শামস, গণহত্যকারী, গণধর্ষণকারী, অগ্নিসংযোগাকরীসহ অসংখ্য স্বাধীনতাবিরোধী। আওয়ামী লীগের নেতারা বিভিন্ন সময় বক্তৃতায় বলেছেন, আওয়ামী লীগে রাজাকার থাকলে দেখিয়ে দেন-আমরা তাদের বিচার করব। আমাদের অনুসন্ধানে নিচে ৪৬জন আওয়ামী লীগের রাজাকারের তালিকা তুলে ধরা হলো এবং বিস্তারীত।

আওয়ামী লীগের এই ৪৬ জন যুদ্ধাপরাধী তাদের পরিবার কোন না কোনভাবে ৭১ সালে পাকিস্তান সরকার ও যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন।১৯৭১ সালে মক্তিযোদ্বাদের হত্যাসহ নানা ধরনের মানবতবিরোধী অপরাধের সঙ্গে তারা যুক্ত ছিলেন তারা।

► অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম:
ঢাকা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম রাজাকার পরিবারের সদস্য। তার বড় ভাই হাকিম হাফেজ আজিজুল ইসলাম নেজামে ইসলামি পার্টির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ছিলেন। পাক হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের শায়েস্তা করার জন্য তার নেতৃত্বেই ঢাকায় প্রথম শান্তি কমিটি গঠন হয়। একই সঙ্গে তিনি রাজাকার, আল বদর ও আল শাসম বাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসই স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকাণ্ড চালানোর পাশাপাশি মু্ক্তিযোদ্ধাদের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বড় ভাইকে সার্বিক সহযোগিতা করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তার রাজাকার ভাইয়ের মালিকাধীন প্রিন্টিং প্রেসে তিনি ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৬৯ সালে এ দেশে পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন জোরদার হলে নেজামের ইসলাম পার্টির পক্ষ থেকে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার প্রচারণা চালানোর জন্য ‘নেজামে ইসলাম’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। হাকিম অজিজুল ইসলাম এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। শেখ মজিবুর রহামনসহ পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনকারীদের নিয়ে তিনি এ পত্রিকায় ‘ইবলিশের দিনলিপি’ নামে প্রতি সপ্তাহে বিশেষ সম্পাদকীয় লিখেন। অ্যাডভোকেট কামরুল ১৯৯৪ সালে আওয়ামী লীগের রাজনীতেতে সক্রিয় হন। এর মধ্যে দিয়ে রাজাকার
পরিবারের গন্ধ হতে মুক্ত হতে চান তিনি। তার ব্যাপারে ‌‌’মুক্তিযুদ্ধে ইসলামী দল’ শীর্ষক বইয়ে বিস্তারিত উল্লেখ আছে।

► লে.কর্ণেল (অব) ফারুক খান:
পর্যটন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদের পক্ষে দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহীনীর পক্ষে প্রথম অপারেশন চালান এবং কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। সুত্র: “দিনাজপুরের মক্তিযুদ্ধ” বই।

► ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন:
ফরিদপুর– ৩ আসনের সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও শেখ হাসিনার বেয়াই ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন কুখ্যাত রাজাকার ছিলেন। তিনি শান্তি বাহিনী গঠন করে মুক্তিযোদ্বাদের হত্যার জন্য হানাদার বাহিনীদের প্ররোচিত করেন। “ দৃশ্যপট একাত্তর: একুশ শতকের রাজনীতি ও আওয়ামী লীগ” বইয়ের ৪৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার বেয়াই ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন শান্তি কমিটির জাদরেল নেতা ছিলেন। তার পিতা নুরুল ইসলাম নুরু মিয়া ফরিদপুরের কুখ্যাত রাজাকার ছিলেন।

► অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিন:
ময়মনসিংহ ৬ আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার ও
শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন বলে গত বছরের ৪ এপ্রিল ট্রাইবুনাল ওয়ার ক্রাইম ফাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহবায়ক ডা, এম এ হাসানের দেয়া যুদ্ধাপরাধের তালিকায় (ক্রমিক নং-৭৩) উল্লেখ করা হয়েছে। যা গত ২২ এপ্রিল দৈনিক ডেসটিনি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এ দিকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্বে গত ৬ এপ্রিল ফুলবাড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক ও জোড়বাড়িয়া গ্রামের ওয়াহেদ আলী মণ্ডলের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন বাদী হয়ে ময়মনসিংয়ের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিট্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন।

► সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী:
আওয়মী লীগের সেকেন্ড ইন কমান্ড সংসদ উপনেতা ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর কাছে একজন আস্থাভাজন নেত্রী ছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী এবং সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচিতদের মধ্যে থেকে ৮৮ জনকে পাকিস্তানের সামরিক সরকার আস্থাভাজন এন এন এ মেম্বার অব ন্যাশনাল এজেন্সী হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৭১ সালে ৭ আগষ্ট পাকিস্তানের তথ্য অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত ওই তালিকায় সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর নাম ছিল ৮৪ নম্বরে। জেনারেল রোয়াদেদ খান ওই দিন ইসলামাবাদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তালিকা প্রকাশ করেন। পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন জানানো এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ভূমিকা পালন করার সুবাদে তিনি এ খ্যাতি অর্জন করেন বলে জানা গেছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত গেজেটে এ তথ্য উল্লেখ আছে।

► সৈয়দ জাফরউল্লাহ:
আওয়ামী লীগের প্রেসেডিয়াম সদস্য সৈয়দ জাফরউল্লাহ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ হয়ে কাজ করেছেন। মাসিক “সহজকথা” আয়োজিত যুদ্ধাপরাধের বিচার:বর্তমান প্রেক্ষাপট শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, আওয়ামী লীগের বর্তমান প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ জাফরঊল্লাহ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন। জাফর উল্লাহ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদের পূর্ণ সমর্থন দেন। “মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান ” বইয়ে বিস্তারিত উল্লেখ আছে।

► মুসা বিন শমসের:
গত বছরের ২১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষোভ প্রকাশ করে ফরিদপুরের নেতাদের কাছে প্রশ্ন করেন, শেখ সেলিম যে তার ছেলেকে ফরিদপুরের রাজাকার মুসা বিন শমসেরর মেয়ে বিয়ে করিয়েছেন তার কথা কেউ বলছেন না কেন? এ খবর ২২ এপ্রিল আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখ্য, মুসা বিন শমসের গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ছেলের বেয়াই। ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইডিং কমিটির আহবায়ক ডা: এম এ হাসান যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ৩০৭ জনের নাম উল্লেখ করেছেন। সেখানে ফরিদপুর জেলায় গণহত্যাকারী হিসেবে মুসা বিন শমসের নাম রয়েছে। তিনি নিরীহ বাঙ্গালীদের গণহত্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং মুক্তিযোদ্দ্ধাদের হত্যাসহ নির্মম নির্যাতন করেছেন বলে জানা গেছে।

► মির্জা গোলাম কাশেম:
জামালপুর–৩ আসনের সংসদ সদস্য, যুবলীগের লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সরকার দলীয় হুইপ মির্জা গোলাম আযমের বাবা। ১৯৭১ সালে মির্জা কাশেম জামালপুরের মাদারগঞ্জে শান্তি কমিটির জাদরেল নেতা ছিলেন। তিনি রাজাকার, আল-বদরদের গঠন করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন। তার বিরুদ্ধে নারী ধর্ষণ ও লুটপাটের একাধিক অভিযোগ আছে। যা “জামালপুরের মুক্তিযুদ্ধ ( “১৯৮১ সালের সংস্বকরণ” বইয়ে উল্লেখ আছে। মির্জা কাশেম জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। প্রিয় নেতার নামানুসারে ছেলের নাম রাখেন মির্জা গোলাম আযাম।

► এইচ এন আশিকুর রহমান:
রংপুর ৫ আসনের সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক এইচ এন আশিকুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ হতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তার সরকারের অধীনে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদে টাঙ্গাইলে কর্মরত ছিলেন। এ সময় তিনি পাকিস্তান সরকারকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন। এস এস এম শামছুল আরেফিন রচিত ‘মুক্তিযুদ্বের প্রেক্ষাপট ব্যক্তির অবস্থান’ বইয়ের ৩৫০ পৃষ্টায় পূর্ব
পাকিস্তানে কর্মরত বাঙালি অফিসারদের তালিকায় তার নাম প্রকাশিত হয়েছে। ৯ জানুয়ারি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইঙ্গিত করে বলেন, রাজাকার আশিকুর রহমান আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ বলে তার বিচার করবেন না তা হয় না। আমরা সব রাজাকারের বিচার চাই। মন্ত্রীসভায় রাজাকার রেখে রাজাকারের বিচার করা যায় না।

► মহিউদ্দিন খান আলমগীর:
চাদপুর-১ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ হতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ময়মনসিংহে অতিরিক্তি জেলা প্রশারক পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি পাকিস্তান সরকারের অধীনে চাকরি করে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানকে সহযোগিতা করেছেন। তার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে। এ সময় আরেফিন রচিত “মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান বইয়ের ৩৫০ পৃষ্ঠার মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানের কর্মরত বাঙালি অফিসারদের তালিকা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। তাকে চিহ্নিত রাজাকার হিসেবে আখ্যা দিয়ে গত ৯ ফেব্রুয়ারি তার বিচার দাবি করেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী।

► মাওলানা নুরুল ইসলাম:
জামালপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মাওলানা নুরুল ইসলাম ১৯৭১ সালে জামালপুর সরিষা বাড়ী এলাকার রাজাকার কমান্ডার ছিলেন। তার নেতৃত্বে রাজাকাররা ঐ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। “ দৃশ্যপট এক্ত্তার: একুশ শতকের রাজনীতি ও আওয়ামী লীগ” গ্রন্থের ৪৫ পৃষ্ঠায় এর বিবরণ দেয়া আছে। এ ছাড়া গত ২৮ এগ্রিল দৈনিক আমাদের সময় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে মাওলানা নুরুল ইসলামকে সরিষাবাড়ি এলাকার রাজাকার কমান্ডার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

► মজিবর রহামান হাওলাদার:
কুটালীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক মজিবর রহমান হাওলাদার সশস্ত্র রাজাকার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন এলাকায়
বসতবাড়ীতে অগ্নিকাণ্ড ঘটানোসহ নানা অপকর্মের সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া ইউনিট কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার মজিবুল হক স্বাক্ষরিত গোপালগঞ্জের যুদ্ধাপরাধীর তালিকায় তার নাম ১ নম্বরে । এ তালিকা প্রকাশ করা হয় ২০০৮ সালের ১ আগষ্ট। দ্বিতীয় বার গত ১ এপ্রিল যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে সে তালিকায়ও যুদ্বাপরাধী হিসেব তার নাম আছে।

► আবদুল বারেক হাওলাদার:
গোপালগঞ্জ কোটালীপাড়া উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী রাফেজা বেগমের পিতা আবদুল বারেক হাওলাদার ৭১ এ দালাল ছিলেন। গোপালগঞ্জের কোটলীপাড়া ইউনিট কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার মজিবুল হক স্বাক্ষরিত গোপালগঞ্জের যুদ্বপরাধীর তালিকায় তার নাম ৪১ নম্বরে। এ তালিকা প্রকাশ করা হয় ২০০৮ সালের ১ আগষ্ট । দ্বিতীয় বার গত ১ এপ্রিল যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে সে তালিকাতেও তার নাম আছে। বারেক হাওলাদার মুক্তিযুদ্ধের সময় নারী নির্যাতনের সাথে জড়িত ছিলেন।

► আজিজুল হক:
গোপালগঞ্জ কোটালীপাড়া উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী রাফেজা বেগমের ভাই আজিজুল হক কুখ্যাত রাজাকার ছিলেন। গোপালগঞ্জের কোটলীপাড়া ইউনিট কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার মজিবুল হক স্বাক্ষরিত গোপালগঞ্জের যুদ্বপরাধীর তালিকায় তার নাম ৪৯ নম্বরে। এ তালিকা প্রকাশ করা হয় ২০০৮ সালের ১ আগষ্ট। দ্বিতীয় বার গত ১ এপ্রিল যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে সেখানেও তার নাম রয়েছে।

► মালেক দাড়িয়া:
আওয়ামী লীগ নেতা ও গোপালগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আবুল কালাম দাড়িয়ার বাবা মালেক দাড়িয়া কুখ্যাত রাজাকার ছিলেন। তিনি ছিলেন আল বদরের একনিষ্ঠ সহযোগী। গণহত্যায় নেতৃত্ব দেন তিনি। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া ইউনিট কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার মজিবুল হক স্বক্ষরিত গোপালগঞ্জের যুদ্বাপরাধীর তালিকায় তার নাম ১৪০ নম্বরে। তালিকা প্রকাশ করা হয় ২০০৮ সালের ১ আগষ্ট।

► মোহন মিয়া:
গোপালগঞ্জ কোটারিপাড়া উপজেলা শ্রমিকলীগ সভাপতি আমির হোসেনের পিতা মোহন মিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের দালাল ও রাজাকার
ছিলেন। স্থানীয় মু্ক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি লুটপাট করে অগ্নিসংযোগ করেছেন। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া ইউনিট কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার মজিবুল হক স্বাক্ষরিত গোপালগঞ্জের যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় তার নাম ছিল ১৫৭ নম্বরে।

► মুন্সি রজ্জব আলী দাড়িয়া:
উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া দাড়িয়ার বাবা মুন্সি রজ্জব আলী দাড়িয়া রাজাকার ছিলেন। যুদ্বাপরাধীর তালিকায় তার নাম আছে। তিনি পাকিস্তানীদের গুপ্তচর হিসেবে কাজ
করতেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মকাণ্ডের গোপন খবর পাকবাহিনীকে পৌঁছে দিতেন।

► রেজাউল হাওলাদারঃ
কোটালিপাড়া পৌর মেয়র ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এইচ এম অহেদুল ইসলামের ভগ্নিপতি রেজাউল হাওলাদের নাম ২০৩ জন রাজাকার, আল বদর, আলশামসসহ গত ১ এপ্রিল প্রকাশিত কোটালিপাড়ার যুদ্বাপরাধীর তালিকায় রয়েছে। তিনি আল বদর সদস্য হিসেব স্থানীয় মু্ক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।

► বাহাদুর হাজরাঃ
কোটালিপাড়া স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও পৌর মেয়র এইচ এম অহেদুল ইসলামের পিতা বাহাদুর হাজরার নাম গত ১ এপ্রিল প্রকাশিত কোটালিপাড়ার যুদ্ধাপরাধীর তালিকায় রয়েছে। তিনি একজন সক্রিয় রাজাকার ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন।

► আ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন সরদারঃ
গোপালগঞ্জের এ পি পি ও আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন সরদারের নাম গত ১ এপ্রিল প্রকাশিত কোটালিপাড়ার যুদ্বাপরাধীর তালিকায় রয়েছে। তিনি পাকিস্তানীদের দোসর ও আল বদর বাহিনীর সহযোগী ছিলেন। আল বদর বাহিনীর সকল ধরনের কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণ করতেন তিনি।

► হাসেম সরদার:
অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন সরদারের পিতা হাসেম সরদারের নাম কোটালীপাড়ার যুদ্ধাপরাধীর তালিকায় রয়েছে। তিনি একজন রাজাকার ছিলেন। ৭১ সালে তার নেতৃত্বে অনেক সাধারণ বাঙালির বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল।

► আবদুল কাইয়ুম মুন্সি:
জামালপুর বকশিগঞ্জ আওয়ামী লীগ সভাপতি অবুল কালাম আজাদের পিতা আবদুল কাইয়ুম মুন্সীর বিরুদ্বে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী বাহিনীকে সহয়তা ও মুক্তিযোদ্বাদের হত্যাসহ অগ্নিসংযোগের অভিযোগে গত ৬ এপ্রিল জামালপুর আমলি আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মালিচর নয়াপাড়া গ্রামের সিদ্দিক আলী এ মামলা দায়ের করেন। আবদুল কাউয়ুম মুন্সী পাকিস্তানী বংশোদ্ভুত বলে জানা গেছে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে আবদুল কাউয়ুম মুন্সী পাক হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য বকশিগঞ্জে আল বদর বাহিনী গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পাক বাহিনীর সাথে থেকে অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেন।

► নুরুল ইসলাম-নুরু মিয়া:
শেখ হাসিনার বেয়াই ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের পিতা নুরুল ইসলাম নূরু মিয়া ফরিদপুরের কুখ্যাত রাজাকার ছিলেন। গত ২১ এপ্রিল ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগ নেতারা শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করেন। এ সময় তারা মন্ত্রী ও তার ভাই খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবরের বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, তার বাবা নূরু মিয়া মু্ক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকর ছিলেন। এর উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, ফরিদপুরের রাজাকারের তালিকায় ১৪ নম্বরে নুরু মিয়ার নাম থাকলেও তিনি যুদ্বাপরাধী ছিলেন না। পরের দিন ২২ এপ্রিল আমার দেশ পত্রিকায় এ খবরটি প্রকাশিত হয়। নুরু মিয়ার অপকর্মের বিষয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান’ বইয়ে বিস্তারিত বলা আছে। জানা যায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জন প্রতিনিধি হয়েও আওয়ামী লীগের ২৭ নেতা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ছিলেন।

► নেত্রকোণার আওয়ামী লীগের স্বাধীনতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধী ও মানবতার বিরূদ্ধে অপরাধ সংগঠনকারীবৃন্দ-
১. নেত্রকোণা থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি নুরুল ইসলাম খান,
২. বায়লাতি ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী ডাঃ গিয়াসউদ্দীন আহমদ।
৩. নেত্রকোনা শহর আওয়ামী লীগের সদস্য জনাব সোহরাব হোসেন ও
৪. নেত্রকোনা মহকুমা আওয়ামীলীগের সদস্য সদস্য জনাব এমদাদুল হক
৫. নেত্রকোনা শহর আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট আমিনুল ইসলাম (এ্যাডভোকেট)
► তথ্যসূত্র: দৈনিক আজাদ,তাং- ১০-৯-১৯৭১ ,পৃঃ ৫-ক-৬, প্রকাশ ঢাকা ।
► তথ্য সূত্র: দৈনিক আজাদ, তাং- ৪-৮-১৯৭১ , পৃঃ ৫-ক-৩, প্রকাশ-ঢাকা।

এই সূত্রে পাকিস্তানী বাহিনীকে সহায়তায় তাদের সম্পৃক্ততার ঘটনাটিকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে-
নেত্রকোণার আওয়ামী লীগের চারজন সদস্য সমপ্রতি সংবাদ পত্রে প্রদত্ত বিবৃতিতে দলের সহিত সম্পর্কচ্ছেদ ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তাহারা বিবৃতিতে বলেন যে, তাহারা আওয়ামী লীগের পাকিস্তানের ঐক্য বিনষ্ট করার দুরভিসন্ধি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। ভারতের ন্যাক্কারজনক আক্রমণাত্মক তৎপরতা এবং ভারত কর্তৃক সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী প্রেরণ ও নাশকতামূলক কার্য সাধণের জন্য ভারতের প্রতি তীব্র নিন্দা করিয়া তাহারা পাকিস্তানের ঐক্যও সংহতি রক্ষাকল্পে সময়োচিত হসক্ষেপের জন্য প্রেসিডেন্টও সেনাবাহিনীর প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন জানান। বিবৃতিতে স্বাক্ষরদান কারীগণ হইলেনঃ নেত্রকোণা থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি নুরূল ইসলাম খান, বায়লাতি ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী ডাঃ গিয়াসউদ্দীন আহমদ। নেত্রকোনা শহর আওয়ামী লীগের সদস্য জনাব সোহরাব হোসেন ও নেত্রকোনা মহকুমা আওয়ামীলীগের সদস্য জনাব এমদাদুল হক।’
► চাঁদপুর জেলার আওয়ামী লীগের স্বাধীনতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধী ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংগঠনকারীবৃন্দ-
৬. চাঁদপুর আওয়ামী লীগের জনাব চান্দ বখশ পাটওয়ারী মোক্তার,
৭. মহকুমা আওয়ামীলীগের সভাপতি ডাঃ মুজিবুর রহমান চৌধুরী,
৮. জনাব নাসির উদ্দীন পাটওয়ারী মোক্তার,
৯. মহকুমা আওয়ামীলীগের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারী জনাব ফজলুল হক এডভোকেট
১০. মহকুমা আওয়ামীলীগের কার্যকরী কমিটির সাবেক সদস্য জনাব খুরশীদ আলম চৌধুরী,
১১. মহকুমা আওয়ামীলীগের সাবেক কোষাধ্যাক্ষ জনাব বজলুর রহমান শেখ,
১২. আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য ও তরপারচান্দি ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান মৃধা,
১৩. আওয়ামীলীগের সাবেক সদস্য ও ইব্রাহীমপুর ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান জনাব আজিজ শেখ পাটওয়ারী,
১৪. কণ্ট্রাক্টর ও আওয়ামীলীগের সাবেক সদস্য জনাব মোফাজ্জল হোসেন,
১৫. আওয়ামীলীগের সাবেক সদস্য ডাঃ নুরুল ইসলাম ও
১৬. ফরিদগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সমাজকল্যাণ সেক্রেটারী।
► তথ্য সূত্র: দৈনিক আজাদ ,তাং- ৯-৯-১৯৭১ ,পৃঃ ১-ক-২-৩, প্রকাশ ঢাকা।
পাকিস্তানী বাহিনীকে সহায়তায় তাদের সম্পৃক্ততার ঘটনাটিকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে-অধুনালুপ্ত আওয়ামীলীগের বেশ কিছু নেতা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিকট ওয়াদা করিয়া পাকিস্তানের ঐক্য, সংহতি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করিয়া যাওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করেন। ভারতীয় চর ও রাষ্ট্রদ্রোহী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ব্যাপারে ও তাহারা তাহাদের দৃঢ় সংকল্পের কথা প্রকাশ করেন। সে সকল ব্যক্তি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করার দৃঢ় আশ্বাস দিয়েছেন।
তাহারা হইলেন, চাঁদপুর আওয়ামী লীগের জনাব চান্দ বখশ পাটওয়ারী মোক্তার, মহকুমা আওয়ামীলীগের সভাপতি ডাঃ মুজিবুর রহমান চৌধুরী, জনাব নাসির উদ্দীন পাটওয়ারী মোক্তার, মহকুমা আওয়ামীলীগের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারী জনাব ফজলুল হক এডভোকেট, মহকুমা আওয়ামীলীগের কার্যকরী কমিটির সাবেক সদস্য জনাব খুরশীদ আলম চৌধুরী, মহকুমা আওয়ামীলীগের সাবেক কোষাধ্যাক্ষ জনাব বজলুর রহমান শেখ, আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য ও তরপারচান্দি ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান মৃধা, আওয়ামীলীগের সাবেক সদস্য ও ইব্রাহীমপুর ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান জনাব আজিজ শেখ পাটওয়ারী, কণ্ট্রাক্টর ও আওয়ামীলীগের সাবেক সদস্য জনাব মোফাজ্জল হোসেন, আওয়ামীলীগের সাবেক সদস্য ডাঃ নুরুল ইসলাম, ফরিদগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সমাজকল্যাণ সেক্রেটারী।
১৭. কেরানীগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট জনাব আমজাদ হোসেন
১৮. টাঙ্গাইলের সাবেক এম.পি.এ জনাব খোদা বখশ মোখতার
► তথ্য সূত্র: দৈনিক আজাদ, তাং- ২১-৫-১৯৭১, পৃঃ ৪-ক-৬, প্রকাশ-ঢাকা।
তাদের জড়িত থাকার বিষয়টি সূত্র থেকে এভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে:
‘আওয়ামী লীগের ২ জন সদস্য পৃথক পৃথক বিবৃতিতে দল হইতে তাহাদের সম্পর্কচ্ছেদ করিয়া বিচ্ছিন্নতার হাত হইতে দেশকে রক্ষাকল্পে সরকারের সহিত পূর্ণ সহযোগিতা দানের জন্য জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছেন। উক্ত ২ জন সদস্য হইতেছেন অধুনালুপ্ত কেরানীগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট জনাব আমজাদ হোসেন, টাঙ্গাইলের সাবেক এম.পি.এ জনাব খোদা বখশ মোখতার।’
১৯. জনাব সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
► তথ্য সূত্র: দৈনিক আজাদ, তাং- ৩-৭-১৯৭১, পৃঃ ৬-ক-৬, প্রকাশ-ঢাকা,
তার জড়িত থাকার বিষয়টি সূত্র থেকে এভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে:
চট্টগ্রামের পি.ই.২৪ নির্বাচনী এলাকা হইতে নবনির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য জনাব সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বেআইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগের সহিত সকল সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া পাকিস্তানকে সমর্থন করিয়া একটি বিবৃতি প্রদান করিয়াছেন।
তিনি বলেন, আমি আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নির্বাচিত হই। একজন পাকিস্তানী নাগরিক হিসাবে এবং সরল বিশ্বাসে আমি এই আশায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিয়াছিলাম। আমি আমার ক্ষুদ্র ক্ষমতা অনুসারে দেশ ও জনগণের খেদমত করিব। পাকিস্তানকে খণ্ড বিখণ্ড করার জন্য জনগণ আমাকে ভোট দেয় নাই।
তিনি বলেন , আওয়ামীলীগের এই সব ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে আমি কিছুই জানিতাম না এবং ২৫ মার্চের পূর্বে এবং পরবর্তী সময়ে আমাদের দেশের গোলযোগের অবস্থায় আমি কোন সমাজবিরোধী কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করি নাই। যথাসময়ে হস্তক্ষেপের জন্য এবং ধ্বংস ও ষড়যন্ত্র হইতে দেশকে রক্ষা করার জন্য আমি প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ ও বীর সেনাবাহিনীকে আন্তরিক মোবারক জানাইতেছি।’
২০. পটুয়াখালি হইতে নবনির্বাচিত এম.পি.এ জনাব মুজিবুর রহমান তালুকদার
► তথ্য সূত্র: দৈনিক আজাদ, তাং- ৬-৭-১৯৭১, পৃঃ ৪-ক-৫, প্রকাশ-ঢাকা।

কি রহস্য রয়েছে জহির রায়হানসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা ও ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কিংবা এর পরে কত মানুষ, কতজন বুদ্ধিজীবী নিহত হয়েছে কিভাবে নিহত হয়েছেন কারা হত্যা করেছে, আজকের জোর গলায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যবসায়ীরা কে কোথায় কিভাবে সময় কাটিয়েছে এরকম অনেক প্রশ্ন রহস্যই থেকে গেছে। এ নিয়ে কোনো গবেষণাই আলোর মুখ দেখেনি, থেমে গেছে শাসকের ধমকে, এমনকি এই গবেষণা করতে যারা ময়দানে নেমেছেন তাদের অনেকেই গুম হয়ে গেছেন। গুমের শিকার তেমনি একজন হলেন বাংলা চলচ্চিত্রের নামকরা পরিচালক জহির রায়হান। শুধু ‍তিনিই নন তার গুম হওয়ার সাথে সাথে গুম হয়ে গেছে তার গবেষণা, এক সত্য ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্বত্বভোগীদের মুখোশ উন্মোচনের দলীল। কারণ স্বাধীনতার চেতনার ব্যবসায়ী ও স্বত্বলোভীরা কখনোই চায়নি এরকম কোনো গবেষণা হোক। শুধু এটাই নয় বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে নিজেদের মুখোশ উন্মোচনের ঝুঁকি এড়িয়ে আবার এক ঢিলে দুই পাখি মারার মত বুদ্ধিজীবি হত্যার দায় চাপিয়েছে নিরাপরাধ জামায়াত নেতৃবৃন্দের উপর।

আসুন দেখা যাক কি রহস্য রয়েছে জহির রায়হানসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা ও ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে

জহির রায়হান অন্তর্ধান রহস্য ঘাঁটতে গিয়ে এমন কিছু ব্যক্তির এমন কতগুলো চাঞ্চল্যকর তথ্যের সন্ধান পাওয়া গেল যেগুলো পড়ে শরীরের লোম খাড়া হয়ে ওঠে। এসব তথ্য পাওয়া গেছে জহির রায়হানের শালী অভিনেত্রী ববিতা, জহির রায়হানের ভাবী আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য পান্না কায়সার এবং ঘাদানিক নেতা শাহরিয়ার কবির প্রমুখের কাছ থেকে। এছাড়াও এদের জবানীতে সত্যজিৎ রায় এবং শেখ মুজিবের যেসব উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে সেসব পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, জহির রায়হান ৩০ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেননি। তার পরেও বেশ কয়েকদিন তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। এদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, তিনি বাংলাদেশে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর বেষ্টনীর মধ্যেই ছিলেন।

জহির রায়হানের পরিচয়:

জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট বর্তমান ফেনী জেলার অন্তর্গত মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম ফেনীতে হলেও ওনারা পারিবারিকভাবে থাকতেন কলকাতায়। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি তার পরিবারের সাথে কলকাতা হতে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্থানান্তরিত হন। তিনি ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে দু’বার বিয়ে করেন। ১৯৬১ সালে সুমিতা দেবীকে এবং ১৯৬৬ সালে তিনি সুচন্দাকে বিয়ে করেন, দুজনেই ছিলেন সে সময়কার বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জহির রায়হান আগরতলা হয়ে কলকাতায় পৌঁছান। নিজেকে যুক্ত করেন মুক্তিযুদ্ধের প্রচার কাজ সংগঠিত করার কাজে নিজেকে যুক্ত করেন এবং পাকিস্থানের গণহত্যা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য ‘’স্টপ জেনোসাইড” নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো যুদ্ধে শরণার্থী শিবিরে মানুষের দুর্দশার চিত্র, কলকাতায় পালিয়ে যাওয়া বড় বড় নেতাদের আরাম আয়েশের চিত্র তুলতে গিয়ে জহির রায়হান মুজিবনগর সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন। সাধারন মানুষদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করার অমানুষিক পরিশ্রমের অনেক চিত্র তিনি জীবন বাজি রেখে ধারন করেছিলেন । ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করার সময় ও মুক্তির দেয়ার সময় কলকাতায় আওয়ামীলীগ নেতারা বারবার জহির রায়হানকে বাধাগ্রস্থ করেছিলেন।

“স্টপ জেনোসাইড” ছবিটি নির্মাণের সময় আওয়ামী লীগের নেতারা তাঁকে নানাভাবে বাধা দিয়েছে। বিভিন্ন সেক্টরে শুটিং করতে দেয় নি, এমন কি কোন কোন সেক্টরে তাঁর গমন পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল।

… আওয়ামী লীগের নেতারা ছবি দেখে ছাড়পত্র না দেয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সেন্সর বোর্ডকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন।”

তথ্যসূত্র : একুশে ফেব্রুয়ারী / জহির রায়হান (ভূমিকা : শাহরিয়ার কবির) ॥ [ পল্লব পাবলিশার্স – আগস্ট, ১৯৯২ । পৃ: ১৩-১৬ ]
গুম হওয়ার ঘটনা:

বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফিরে আসেন। ফিরে এসেই শুনলেন তার অগ্রজ শহীদুল্লাহ কায়সার ১৪ ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ। তার উদ্যোগে বেসরকারি বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডসহ অন্যান্য ঘটনার প্রচুর প্রমাণাদি তিনি সংগ্রহ করেন এবং সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা করেন যে, তার সংগৃহীত প্রমাণাদি প্রকাশ করলেই অনেকের কুকীর্তি ফাঁস হয়ে যাবে। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকান্ড, বিভিন্ন হোটেলে বিলাসবহুল ও আমোদ-ফুর্তিময় জীবনযাপন, রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষ আওয়ামী আদর্শে বিশ্বাসহীন বাঙালিদের নির্মূল করার ষড়যন্ত্র প্রভৃতির প্রামাণ্য দলিল জহির রায়হান কলকাতা থাকাকালে সংগ্রহ করেছিলেন। বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নিখোঁজ ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের ঘটনাবলী তাকে বিচলিত করে। এসব ঘটনা তাঁর পূর্বেকার রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দেয়।

শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের সর্বময় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার ১৫ দিন পর ১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকা প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান ঘোষণা দেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের পেছনে নীলনকশা উদ্ঘাটনসহ মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অনেক গোপন ঘটনার নথিপত্র, প্রামাণ্য দলিল তার কাছে আছে, যা প্রকাশ করলে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রীসভায় ঠাঁই নেয়া অনেক নেতার কুকীর্তি ফাঁস হয়ে পড়বে। আগামী ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় এই প্রেসক্লাবে ফিল্ম শো প্রমাণ করে দেবে কার কি চরিত্র ছিল।

১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি সাংবাদিক সম্মেলনের কয়েকদিন পর ৩০ জানুয়ারি রোববার সকালে এক রফিক নামের অজ্ঞাত টেলিফোন আসে জহির রায়হানের কায়েতটুলির বাসায়। রফিক ছিলেন জহিরের পূর্ব পরিচিত যিনি ইউসিসে চাকরি করতেন । প্রথমে ফোন ধরেছিলেন জহির রায়হানের ছোট বোন ডাক্তার সুরাইয়া যার কাছে জহিরকে খোঁজা হচ্ছিল । সুরাইয়া জহির রায়হানকে ডেকে ফোন ধরিয়ে দেয় । টেলিফোনে জহিরকে বলা হয়েছিল, আপনার বড়দা মিরপুর বারো নম্বরে বন্দী আছেন। যদি বড়দাকে বাঁচাতে চান তাহলে এক্ষুণি মিরপুর চলে যান। একমাত্র আপনি গেলেই তাকে বাঁচাতে পারবেন। টেলিফোন পেয়ে জহির রায়হান দুটো গাড়ী নিয়ে মিরপুরে রওনা দেন। তাঁর সাথে ছিলেন ছোট ভাই মরহুম জাকারিয়া হাবিব, চাচাত ভাই শাহরিয়ার কবির, বাবুল (সুচন্দার ভাই), আব্দুল হক (পান্না কায়সারের ভাই), নিজাম ও পারভেজ।মিরপুর ২ নং সেকশনে পৌছার পর সেখানে অবস্থানরত ভারতীয় সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী (ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট) এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে জহির রায়হানের টয়োটা গাড়ি (ঢাকা-ক-৯৭৭১)সহ থাকতে বলে অন্যদের ফেরত পাঠিয়ে দেন। শাহরিয়ার কবির অন্যদের সাথে করে বাড়ী ফিরে আসেন । এভাবেই জহির চিরতরে হারিয়ে যায়। অথচ সেদিন বিকেলেই প্রেসক্লাবে তাঁর কাছে থাকা অনেক দুর্লভ তথ্য প্রমান ফাঁস করার কথাছিল যা ফাঁস হলে অনেকের মুখোশ উম্মোচিত হয়ে যেতো যা আর কোনদিন করা হলো না ।

জহির রায়হানের স্বজনদের সন্দেহ ও কারণ:

ঘটনা পরম্পরা পর্যালোচনা করলে তার মৃত্যুর দায়-দায়িত্ব তৎকালীন প্রশাসনকেই গ্রহণ করতে হয় এবং (তাদের ভাষায়) রাজাকার বা দালালদের ওপর কোনভাবেই চাপানো যায় না। এই কলামে নিজস্ব মন্তব্যের পরিবর্তে ওপরে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গের উদ্ধৃতি এবং মন্তব্য ব্যাপকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ যখন অপপ্রচার এবং উস্কানিমূলক প্রচারণার বিষবাষ্পে আচ্ছন্ন তখন এসব ব্যক্তিবর্গের সেদিনের উক্তি এবং আজকের ভূমিকা মিথ্যা প্রচারণায় বিভ্রান্ত মানুষকে সত্যের আলোকবর্তিকা দেখাতে সাহায্যে করবে।

| এক |
সেই সময়কার সরকার নিয়ন্ত্রিত সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রায়’ বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। সংখ্যাটি ছিল ১৯৯২ সালের ১ মে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন আজকের আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবী শাহরিয়ার কবির। সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে সত্যজিৎ রায় শাহরিয়ার কবিরকে হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করলেন… -“জহিরের ব্যাপারটা কিছু জেনেছো?”

শাহরিয়ার কবির বলেন, “তাকে সরিয়ে ফেলার পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আমরা ব্যক্তিগতভাবে তদন্ত করে যা বুঝতে পেরেছি তাতে বলা যায়, ৩০ জানুয়ারি দুর্ঘটনায় তিনি হয়তো মারা যাননি। তারপরও দীর্ঘদিন তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। সেটাই ষড়যন্ত্রের মূলসূত্র বলে ধরছি। মিরপুরে দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হলে গভীর ষড়যন্ত্র মনে করার কোনো করণ ছিল না। আমি যতদূর জানি, বুদ্ধিজীবীদের হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে তিনি এমন কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন যা অনেক রথী-মহারথীর জন্যই বিপজ্জনক ছিল, যে জন্য তাকে সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন হয়েছিল।”

তথ্যসূত্র : একুশে ফেব্রুয়ারী / জহির রায়হান (ভূমিকা : শাহরিয়ার কবির) ॥ [ পল্লব পাবলিশার্স – আগস্ট, ১৯৯২ । পৃ: ১৩-১৬ ]

১৯৯২ সালেও শাহরিয়ার কবির মনে করতেন যে, জহির রায়হানকে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারির পরেও দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। তাহলে ঘাদানিক নেতৃবৃন্দ এবং আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা বলুন যে, স্বাধীন বাংলাদেশে জহির রায়হানকে আটকে রাখার ক্ষামতা ছিল কাদের? বলা হচ্ছে যে, বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে জহির রায়হানের হাতে এমন কিছু তথ্য এসেছিল যেটা রথী-মহারথীদের জন্য ছিল বিপজ্জনক। স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী সরকারের আমলে কারা ছিলেন রথী-মহারথী? যে বিপজ্জনক তথ্যের জন্য তাকে সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন হয়েছিল সেসব তথ্য কাদের জন্য বিপজ্জনক ছিল? তাদের ভাষায় ‘রাজাকার’ এবং ‘পাকিস্তানী দালালদের’ রাজনীতি তো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কারা তাহলে জহির রায়হানকে সরিয়েছে? যুদ্ধাপরাধী বা দালালদের বিচার করতে গেলে এসব প্রশ্ন এসে পড়বে।

| দুই |
জহির রায়হান নিখোঁজের প্রায় এক বছর পর [ ১৯৭৩ সালের ২২ শে জানুয়ারি] সাংবাদিক আহাম চৌধুরীর লিখা ” জহির রায়হান হত্যা রহস্য আর কতদিন ধামাচাপা পড়ে থাকবে ” শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলেছিলেন – জহির রায়হান মিরপুর কলোনির অভ্যন্তরে যাননি । ক্যাম্প থেকেই তিনি নাকি নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন । কারা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই খবরও কারো অজানা নয় । সরকার নিখোঁজ জহির রায়হান’কে খুঁজে বের করার কোন আন্তরিকতা দেখায়নি বরং জহির রায়হান নিখোঁজের রহস্য ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কতদিন থাকবে এই ধামাচাপা?
মুজিবনগরে যে কজন রুই কাতলার সাথে জহির রায়হানের চিন্তাধারার সাথে বচসা হয়েছিল জহির হত্যাকাণ্ডে তারাও নাকি জড়িত রয়েছেন । জহির হত্যার পরিকল্পনা ১৫ দিন ধরে করা হয়েছিল । জহিরকে তিরিশে জানুয়ারি খাঁচায় পুরে একত্রিশ তারিখে অন্য একটি স্থানে সরিয়ে দেয়া হয় । সেখানে তাঁকে তদন্ত কমিটি ভেঙে দেয়ার আহবান জানানো হয় । বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্তের চিন্তা না করে ভাতের চিন্তা করতে বলা হয় । জহির রায়হানের হত্যাকারী দল আরও একদিন তাঁকে চিন্তা করার সময়ও নাকি দিয়েছিলেন – আর সেদিনটি নাকি ছিল উনিশ’শ বাহাত্তর সালের দ্বিতীয় মাসের প্রথম দিন যথা সর্বনাশা ফেব্রুয়ারির সর্বনাশা মঙ্গলবার । ”

|তিন|
জহির রায়হান এর প্রথম স্ত্রী প্রয়াত অভিনেত্রী সুমিতা দেবী এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন ”জহির রায়হান নিখোঁজ এই নিয়ে পত্র-পত্রিকায় বেশ লেখালেখিও হলো। একদিন বড়দি অর্থাৎ জহিরের বড় বোন নাসিমা কবিরকে ডেকে নিয়ে শেখ মুজিব বললেন, জহিরের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে এ রকম চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে। পরে নাসিমা আর কিছু বলেনি। টেলিফোন করেছিল যে রফিক, তাকে নিয়ে যখন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি শুরু হলো। তখন তাকে নাগরিকত্ব দিয়ে পুরো পরিবারসহ আমেরিকায় পাঠিয়ে দেয়া হলো। এই ঘটনা জহিরের নিখোঁজ হওয়ার সম্পর্কে রফিকের ভূমিকাকে আরো সন্দেহযুক্ত করে তোলে আমার কাছে।”

(সুত্রঃ দৈনিক আজকের কাগজ ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩)

|চার|
দৈনিক আজকের কাগজ ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩ সংখ্যা ‘জহির রায়হানের হত্যাকারী রফিক এখন কোথায়’ শীর্ষক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে সরকার সাহাবুদ্দিন আহমদ লিখেছেন, প্রতিবেদনে বলা হয়, জহির রায়হান নিখোঁজ এই নিয়ে লেখালেখি হলে একদিন বড়দি অর্থাৎ জহির রায়হানের বড় বোন নাফিসা কবিরকে ডেকে নিয়ে শেখ মুজিব বললেন, জহিরের নিখোঁজ নিয়ে এ রকম চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, জহির রায়হানের মতো একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা স্বাধীনতার পর নিখোঁজ হয়েছে এটা নিয়ে চিৎকার হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শেখ মুজিব কেন জহির রায়হানের বড় বোনকে ডেকে নিয়ে নিখোঁজ করে ফেলার হুমকি দিলেন। কি রহস্য ছিল এর পেছনে? তাহলে কি বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যাপারে শেখ মুজিব এমন কিছু জানতেন, যা প্রকাশ পেলে তার নিজের কিংবা আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতির কারণ হতো? আর কেনইবা তড়িঘড়ি করে জহির রায়হানের তথাকথিত হত্যাকারী রফিককে সপরিবারে আমেরিকা পাঠিয়ে দেয়া হলো? রফিক কে ছিলেন/ কি তার রাজনৈতিক পরিচয়?

সূত্র : সরকার সাহাবুদ্দিন আহমদ, রাহুর কবলে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঢাকা, পৃষ্ঠা-১০৮, আসলাম সানী রচিত “শত শহীদ বুদ্ধিজীবী”

|পাঁচ|
৯ আগস্ট ১৯৯৯ দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় জহির রায়হানের মেজো সন্তান অনল রায়হানের অভিযোগ। তিনি অভিযোগ করেন, ‘জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার এক ভুয়া তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। এই কমিটি কোনো কাজ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের প্যানপ্যানানি করে আওয়ামী লীগ সরকার আবার ক্ষমতায় এলো …মুজিব হত্যার বিচার হচ্ছে। এই হত্যাকান্ড ঘটেছে ১৯৭৫ সালে। এর আগে জহির রায়হানসহ অনেক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছে। কই তাদের তো বিচার হলো না।

|ছয়|
শহীদ সেলিমের মায়ের মতে, বঙ্গভবনের ওর ঘর থেকে যে প্রয়োজনীয় কাগজগুলো উধাও হয়েছিল সেগুলো সম্ভবত তদন্ত কমিটির গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রই হবে। খোদ বঙ্গভবন থেকে জিনিসপত্র উধাও হয়ে যাবে তা ভাবতেও বিশ্বাস হয় না। শহীদ সেলিম বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তের কাজে সরাসরি জড়িত ছিলেন একথা আমি আগে জানতাম না। আমি কেন, আর কেউ জানে কিনা তাও জানি না। জহির রায়হান ও সেলিমের নিখোঁজ রহস্য এখন আমার কাছে আরও রহস্যজনক বলে মনে হচ্ছে। বুদ্ধিজীবী হত্যা যেমন ৭১ সালে গুরুত্বের সঙ্গে উদঘাটিত হয়নি, তেমনি জহির রায়হান নিখোঁজ রহস্যও গুরুত্বের সঙ্গে উদঘাটিত করার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেনি। অথচ এটা একটা গভীর ষড়যন্ত্র। যে ষড়যন্ত্রের বিষবৃক্ষের বীজ রোপণ হয়েছিল সেদিন।”

সূত্র: দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ বাংলা ১৩৯৯, ১০ জৈষ্ঠ্য, ইং ১৯৯২

|সাত|
জহির রায়হানের ভাবী আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য পান্না কায়সার নিজেই বলেছেন যে, খোদ বঙ্গভবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র উধাও হয়ে যাবে সেটা ভাবনারও অতীত। জহির রায়হানের সাথে লেফটেন্যান্ট সেলিমও বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এ সম্পর্কিত কাগজপত্র জহির রায়হান এবং সেলিম উভয়ের কাছ থেকেই উধাও হয়ে গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রেসিডেন্টের ভবন থেকে কাগজপত্র উধাও করতে পারে কারা? ‘রাজাকার’ বা ‘পাকিস্তানপন্থীরা’ অবশ্যই নয়। এটা করা সম্ভব একমাত্র তাদের পক্ষে, যারা ক্ষমতার আশপাশে ছিলেন।

সূত্র: দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ বাংলা ১৩৯৯, ১০ জৈষ্ঠ্য, ইং ১৯৯২

|আট|
জহির সম্পর্কে বলতে গিয়ে,জহির রায়হানের স্ত্রী সুচন্দার ছোট বোন নায়িকা ববিতা উল্লেখ করেছেন, ভারত থেকে ফিরে আসার পর একবার এক মিটিংয়ে উনি বলেছিলেন “যুদ্ধের নয়মাস আমি কলকাতায় ছিলাম। আমি দেখেছি সেখানে কে কি করেছে। কে দেশের জন্য করেছে, আর কে নিজের আখের গুছিয়েছে। আমার কাছে সব রেকর্ড আছে। আমি সব ফাঁস করে দেব। এটাই জহির রায়হানের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এজন্যই জহিরকে ফাঁদে ফেলে মিরপুর নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরিকল্পনামাফিক তাকে সরিয়ে দেয়া হয় পৃথিবী থেকে।

সূত্র: ‘আনন্দ ভুবন’ এর ১৬ মার্চ, ‘১৯৯৭ সংখ্যায় ‘কুলায় কালস্রোত’ বিভাগে শিরোনাম ‘পুরানো সেই দিনের কথা’

|নয়|
বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও প্রখ্যাত লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবনে গোলাম সামাদের ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে’ শীর্ষক লেখায় তিনি বলেছেন, “চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হানের সঙ্গে আমার কলকাতায় পরিচয় ঘটে। তার থাকবার কোন জায়গা ছিল না প্রথমে। আমি তাকে তিন মাসের জন্য থাকবার একটা খুব ভাল ব্যবস্থা করে দিতে পেরেছিলাম কলকাতায়। দেশে ফিরবার পর তিনি মারা যান।

ড. সামাদ আরো বলেছেন, ৭ ডিসেম্বর (৭১) কলকাতায় বাংলাদেশ দূতাবাসে একটি উৎসব হয়। রায়হান সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমিও ছিলাম। তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হিসেবে ছিলেন আমার দু’সারি আগে। হঠাৎ তাকে বলতে শুনি “দেশকে দু’বার স্বাধীন হতে দেখলাম। আবার একবার স্বাধীন হতে দেখবো কিনা জানি না।” কেন তিনি এ ধরনের মন্তব্য করেছিলেন, তা ভেবে আমার মনে পরে অনেক প্রশ্ন জেগেছে। তার মৃত্যু আজো হয়ে আছে রহস্যঘেরা।

জহির রায়হানের উপরোক্ত মন্তব্যে দেখা যায়, তিনি ৪৭ সালে ইংরেজদের বিদায়, ভারতবর্ষ বিভক্তি, পাকিস্তানের জন্মকেও স্বাধীনতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তার চেয়েও বেশি তাৎপর্যমণ্ডিত ব্যাপার হলো, মওলানা ভাসানীর অনুসারী জহির খুব সম্ভব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ভবিষ্যতে ভারতের আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদ কবলিত হওয়া এবং তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জনগণের আরেকবার বিজয় অর্জনের দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আর এই ইঙ্গিতে ভারতপন্থী মহল এবং তাদের গুরুদের গা-জ্বালা ধরে যাওয়াই স্বাভাবিক। তখনকার পরিস্থিতিতে খোদ কলকাতায় বসে প্রকাশ্যে এমন উক্তি করা তাদের কাছে ‘স্পর্ধা’ বলে মনে হতে পারে। হয়তো এই দুঃসাহসের মূল্য হিসেবেই জহিরকে জীবন দিতে হয়েছে। আমার বিশ্বাস জহির মিরপুরে মারা যায়নি। ঘাতকরা তাকে অন্য কোথাও হত্যা করেছে। এ বিশ্বাস এখনো আমার আছে, ।

|দশ|
বামপন্থীদের একটি পক্ষের মতে পাকিস্তানি হানাদার বা অবাঙালিরা নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশই জহির রায়হানকে খুন করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের এ অংশটির লক্ষ্য ছিল – বাংলাদেশকে স্বাধীন করা এবং সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থী বুদ্ধিজীবিসহ সামগ্রিকভাবে বামপন্থী শক্তিকে নি:শেষ করে দেয়া। এরা নাকি বামপন্থী বুদ্ধিজীবিদের হত্যার একটা তালিকা প্রণয়ন করেছিল। এদের ধারণা এ তালিকাটি জহির রায়হানের হাতে পড়েছিল। জহির রায়হানও জানত তার জীবন নিরাপদ নয়। তবুও সে ছিল ভাইয়ের শোকে মূহ্যমান। তাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নাম শুনেই সে ছুটে গিয়েছিল মিরপুরে তারপর আর ফিরে আসেনি। এ মহলই তাকে ডেকে নিয়ে খুন করেছে।

তাহলে কোনটি সত্য? জহির রায়হানকে কারা গুম করেছে? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা, আল বদর, আল শামস্, না রাজাকার? নাকি মুক্তিবাহিনীর একটি অংশ? স্পষ্ট করে বললে বলা যায় – মুক্তিবাহিনীর এ অংশটি মুজিব বাহিনী।
১৯৭১ সালে প্রবাসী স্বাধীন বাংলা সরকারের অজান্তে গড়ে ওঠা মুজিব বাহিনী সম্পর্কে অনেক পরস্পরবিরোধী তথ্য আছে। বিভিন্ন মহল থেকে বারবার বলা হয়েছে, এ বাহিনী গড়ে উঠেছিল ভারতের সামরিক বাহিনীর জেনারেল ওবান-এর নেতৃত্বে। এ বাহিনী নাকি মিজোরামে ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে মিজোদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। এদের নাকি দায়িত্ব ছিল – রাজাকার, শান্তি কমিটিসহ বাংলাদেশের সকল বামপন্থীদের নি:শেষ করে ফেলা। মুজিব বাহিনী সম্পর্কে এ কথাগুলো বারবার লেখা হচ্ছে। কোন মহল থেকেই এ বক্তব্যের প্রতিবাদ আসেনি। অথচ দেশে মুজিব বাহিনীর অনেক নেতা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আছেন। তারা কোন ব্যাপারেই উচ্চবাচ্চ্য করছেন না। তাদের নীরবতা তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বক্তব্যই প্রতিষ্ঠিত করছে এবং সর্বশেষ জহির রায়হানের নিখোঁজ হবার ব্যাপারেও মুজিব বাহিনীকেই দায়ী করা হচ্ছে॥”

– নির্মল সেন / আমার জবানবন্দি ॥ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৪০৫-৪০৬ ]

কবি নজরুলের বাড়ী

অনেকেই এই বাড়িটিকে কবি নজরুলের বাড়ি মনে করেন।এটি কবি নজরুলে বাড়ি নয় । এই বাড়িটি চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুরহুদা উপজেলাধীন কার্পাসডাঙ্গার এই পাড়ার শ্রী মহিম সরকারের গ্রামের বাড়ী । শ্রী মহিম সরকার স্বপরিবারে কলকাতা থাকতেন। সেখান থেকেই শ্রী মহিম সরকারের সাথে কবি কাজী নজরুল ইসলামের খুবই বন্ধুত্ব ছিলো। কেননা কবি নজরুলের রিবারের শাশুরী,স্ত্রী,ছেলেরা এমনকি কাজের মেয়েটিও ছিল হিন্দু ।কবিও তখন একেবারে কালীদেবির পুরোপুরি ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন ।কালী দেবিকে নিয়ে তিনি বিশাল শ্যামা সঙ্গিত রচনা করে গেছেন যা আজও কালী দেবী পূঁজারীদের প্রধান সঙ্গীত । তাই শ্রী মহিম সরকারের বাড়িতে কবির আসা-যাওয়া ছিলো আপনজনের মতো। মহিমের দুই মেয়ে আভা রাণী সরকার ও শিউলী রাণী সরকার নজরুল গীতি চর্চা করতেন। তাদের গানের তালিম দিতেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম নিজে। পরবর্তীতে আভা রাণী সরকারের গানের রেকর্ডও বের হয়। প্রখ্যাত লেখক ড. আশরাফ সিদ্দিকী অনুসন্ধান করে নজরুলের কথা ও সুরে আভা রাণী সরকারের ছয়টি গানের রেকর্ড-তথ্য পান। একাধিক তথ্যসূত্রে জানা যায়, মহিম সরকারের পারিবারিক আমন্ত্রণে একাধিকবার কবি নজরুল কার্পাসডাঙ্গায় এসেছেন। তবে ১৯২৬ সালে ২৭ বছর বয়সে কবি সপরিবারে এখানে বেড়াতে আসেন। এ সময় প্রায় দুই মাস কার্পাসডাঙ্গায় অবস্থান করেন । কবি নজরুলের সাথে এসেছিলেন শাশুড়ি গিরিবালা দেবী, স্ত্রী প্রমীলা দেবী ও বড় ছেলে কৃষ্ণ মোহাঃ ।

কৃষ্ণ নগর কটেজঃ
কৃষ্ণ নগর শাশুরীর বাড়ীর সামনে উঠানো ছবি । ছবিতে নজরুল এর কোলে তার ছেলে , সেবিকা প্রণতি ,
শ্বাশুরি গিরিবালা দেবী এবং স্ত্রী প্রমীলা দেবী।এই বাড়ীতেই কবি নিয়মিত বসবাস করতেন ।

ভারত নিয়ন্ত্রিত ঢাকায় ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করলো কে?

ভারত নিয়ন্ত্রিত ঢাকায় ১৪ ডিসেম্বর
বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করলো কে?
সাহাদত হোসেন খান

আমাদের জাতীয় ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সংঘটিত বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড একটি গভীর রহস্য। কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে এ হত্যাকান্ড সমর্থন করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতার প্রাক্কালে কোন পক্ষ তাদের হত্যা করতে পারে তা নিয়ে গবেষণার শেষ নেই। বিএনপির সাবেক মহাসচিব মরহুম আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার একটি উক্তি স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি দৈনিক দিনকালে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ১২ ডিসেম্বর থেকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় এবং তাদের সামরিক কমান্ড ভেঙ্গে পড়ে। সে সময় তারা ছিল আত্মসমর্পণ ও আত্মরক্ষায় ব্যস্ত। নিজেদের জান নিয়ে যেখানে টানাটানি সেখানে অন্যকে হত্যা করার সুযোগ কই। আমি মান্নান ভূঁইয়ার বিশ্লেষণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেই। কেননা তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মী নন, তিনি ছিলেন একজন গেরিলা নেতা। ১৯৭১ সালের গেরিলা কমান্ডার আবদুল মান্নান ভূঁইয়া তার সামরিক জ্ঞান থেকে এ মন্তব্য করেছিলেন।
আরো অনেকে অভিন্ন মতামত দিয়েছেন। হত্যাকান্ডের শিকার বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন পাকিস্তানপন্থী। তাদের কেউ ভারতে যাননি। জহির রায়হানের মতো অনেকে ছিলেন কমিউনিস্ট। পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের জীবনের সংকটকালে তাদের প্রতি অনুগত বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে যাবে কেন, তাই হলো প্রশ্ন। সামরিক বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি মাত্র বিশ্বাস করেন যে, পাকিস্তানি সৈন্যদের নাম ব্যবহার করে অন্য কেউ তাদের হত্যা করেছে। সন্দেহভাজন হিসেবে ভারতের নাম উচ্চারিত হয় সর্বাগ্রে। ভারতে না যাওয়ায় তাদের প্রতি ছিল ভারতের সন্দেহ। শহীদুল্লাহ কায়সারের হত্যাকান্ডে জড়িত ব্যক্তি ‘জল’ চেয়েছিল। জল কোনো মুসলমানের পরিভাষা নয়। ভারতীয় বাঙালিরা জল বলে। তাই বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের তীর ভারতের প্রতি।
পরাজয়ের শেষ মুহূর্তে ১৪ ডিসেম্বর ৯৯১ জন শিক্ষক, ১৩ জন সাংবাদিক, ৪৯ জন চিকিৎসক, ৪২ জন আইনজীবী, ১৬ জন লেখক, শিল্পী ও প্রকৌশলীকে হত্যা করা হয়। ঢাকার রায়েরবাজারসহ বহু জায়গায় গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র ভূমিকা ছিল বলে কেউ কেউ দাবি করছেন। তবে এ হত্যাকান্ডের মূল নায়ক হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের উপদেষ্টা রাও ফরমান আলীকে অভিযুক্ত করা হয়। তার ডায়েরীতে লেখা ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ মাটিকে রক্তে লাল করে দেয়া হবে।’ একথা লেখা থাকায় ১৯৭৪ সালে লাহোরে ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানকালে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিচারের জন্য তাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়ার জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুটোর কাছে দাবি জানান। ভুট্টো তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করেননি। বিচারের জন্য তাকে বাংলাদেশের আদালতে হাজির হতে না হলেও ফরমান নিস্তার পাননি। আন্তর্জাতিক রেডক্রস তার কাছে ডায়েরীতে একথা লিখে রাখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। তিনি বিস্তারিত তাদের জানান। তার বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয়। হামুদুর রহমান কমিশনও তাকে এব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জবাবে তিনি কমিশনকে জানান, লেখাটি তার নিজের হাতের হলেও কথাটি তার নয়।
রাও ফরমান বাংলাদেশি সাংবাদিক সৈয়দ মবনুর সঙ্গে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে জানান, ১৯৬৯ সালের ১৬ জুন পল্টন ময়দানে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সমাবেশে দলের অন্যতম নেতা কাজী জাফর আহমেদ একথা বলেছিলেন। সৈয়দ মবনুর ‘লাহোর থেকে কান্দাহার’ নামে বইয়ের ১৫৬-৫৭ পৃষ্ঠায় ফরমান আলীর সঙ্গে তার সাক্ষাৎকারের বিবরণ দেয়া হয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডে তার ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, তখন তো ঢাকা ছিল ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে। তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করলো কে? আমি মনে করি এব্যাপারে কাউকে দায়ী করতে হলে অবশ্যই ভারতকে। তিনি আরো বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ মাটি লাল করে দেয়ার ঘোষণা তার ছিল না। ঢাকায় কোর হেডকোয়ার্টার থেকে ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান তাকে জানান যে, তোয়াহা ঢাকায় ভাসানী ন্যাপের এক মিটিংয়ে বলেছেন, ‘আমি পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ মাটি রক্তে লাল করে দেবো।’ ইয়াকুব খানের মুখ থেকে কথাটি শুনে তিনি তার টেবিল ডায়েরীতে লিখে রাখেন। বাংলাদেশে তোয়াহা ছিলেন দু’জন। একজন ছিলেন ইসলামী এবং অন্যজন ছিলেন নোয়াখালীর সেক্যুলার মোহাম্মদ তোয়াহা। রাও ফরমান মোহাম্মদ তোয়াহাকে খবর দেন। তোয়াহার সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো ছিল। গ্রেফতার না করার আশ্বাস দিলে তিনি তার সঙ্গে দেখা করেন। এসময় রাও ফরমান তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি এসব কি বলছো?’ জবাবে তোয়াহা তাকে জানান, কথাটি তার নয়, কাজী জাফরের। রাও ফরমান তার কাছে কথাটির অর্থ জানতে চাইলে মোহাম্মদ তোয়াহা বলেন, একথার অর্থ এ দেশে কমিউনিস্ট বিপ্লব কায়েম করা হবে। লাল হচ্ছে কমিউনিজমের প্রতীক। ফরমান আলীর সঙ্গে দেখা করে মোহাম্মদ তোয়াহা চলে যান। কিন্তু কথাগুলো তার ডায়েরীতে থেকে যায়। ফরমান আলীর ডায়েরীর লেখার সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়ায় তার প্রতি সন্দেহের তীর নিক্ষিপ্ত হয়।
(লেখাটি আমার ‘পলাশী থেকে একাত্তর’ থেকে নেয়া। বইটি প্রকাশ করেছে আফসার ব্রাদার্স।)

হিটলার ও গ্র্যান্ড মুফতির সাক্ষাৎ এবং কিছু অলীক অভিযোগ

হিটলার – আমি তো ইহুদীদের হত্যা করতে চাই না, তাদেরকে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে চাই।
মুফতি – তাহলে তো তারা সবাই আমাদের দেশে (প্যালেস্টাইন) এসে জুটবে।
হিটলার – তাহলে আমি কী করতে পারি?
মুফতি – আপনি তাদের মেরে ফেলুন, পুড়িয়ে মেরে ফেলুন!
হিটলার – বাহ! চমৎকার বুদ্ধি! আপনাকে ধন্যবাদ মুফতি সাহেব!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অসংখ্য ঘটনার মাঝে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ঘটনাটি হলো ‘হলোকাস্ট’। ৬০ লক্ষ ইহুদীকে নৃশংসভাবে হত্যা করার এই চূড়ান্ত অমানবিক ঘটনাটি কেন ঘটেছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদগণ কম গবেষণা করেননি। জল ঘোলা হয়েছে অনেক, তথাপি সমাধান আসেনি। হিটলারের মনে কেন এই নৃশংস বুদ্ধির উদয় হয়েছিল, তা আজও রয়েছে ধোঁয়াশার মাঝেই। ইতিহাসবিদ আর পণ্ডিতগণ প্রচুর পড়াশোনা করেও যে বিষয়টি উদঘাটন করতে পারেননি, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কোনো এক অলৌকিক ক্ষমতাবলে সে কাজটি করে ফেলেন। তিনি জেনে গেছেন হলোকাস্টের বুদ্ধি হিটলারের মাথায় কোথা থেকে এসেছিল। কোথা থেকে? একজন ফিলিস্তিনির মাথা থেকে!

উপরের কাল্পনিক কথোপকথনটি নেতানিয়াহুর, যা একইসাথে হাস্যকর এবং অযৌক্তিক কল্পনা। ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে বিশ্ব জায়নবাদী কংগ্রেসের উদ্বোধনী বক্তৃতায় এমন ধারণাই পোষণ করেছিলেন তিনি। তার মতে, হলোকাস্টের বুদ্ধিটা এসেছিল তৎকালীন প্যালেস্টাইনের গ্র্যান্ড মুফতি হাজী আমিন আল হুসাইনির মাথা থেকে! হিটলার ইহুদীদের হত্যা করতে চাননি, তাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন হুসাইনি, এমনটাই দাবি করেন নেতানিয়াহু। এই ধারণার বিপরীতে আরেকদল একেবারে বিপরীত মেরুতে গিয়ে দাবি করেন, হুসাইনি কখনোই ইহুদীদের মৃত্যু কামনা করেননি, বরং তিনি হলোকাস্টের প্রতিবাদ করেছিলেন! কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই দুটি দাবিই ভুল। সত্যটা কী তা জানার চেষ্টা করা যাক তাহলে চলুন।

কে এই মুফতি?

হিটলারের সম্বন্ধে নতুন করে কিছু বলার অবশিষ্ট নেই। তবে, মুফতি হাজি আমিন আল হুসাইনির সম্বন্ধে জানা এ আলোচনার জন্য জরুরি। মুফতি আমিনকে আরবদের ইতিহাসের অন্যতম কট্টর জাতীয়তাবাদী বললেও ভুল হবে না। ১৯২১ সালে তাকে জেরুজালেমের মুফতি নিয়োগ করা হয়, যখন প্যালেস্টাইন ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ক্ষমতা গ্রহণ করেই তিনি প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনা করেন এবং এ অঞ্চলে জায়নবাদীদের একটি ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের তীব্র বিরোধীতা করেন। অবশ্য স্বাধীন ফিলিস্তিন গঠনে তার মনোযোগ ছিল না, তার ইচ্ছা ছিল একটি বৃহৎ আরব ফেডারেশন গঠন করা, যার আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন।

প্যালেস্টাইনে ইহুদীদের অভিবাসন সবচেয়ে বেশি হয় ১৯৩৬-৩৭ সালে। সে সময় ইহুদীদের অবৈধ স্থাপনা ও বাড়িঘর নির্মাণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান মুফতি আমিন। তার নেতৃত্বে ফিলিস্তিনিরা সংঘটিত হয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। ‘প্যালেস্টিনিয়ান ন্যাশনাল মুভমেন্ট’ নামক আন্দোলনের তিনিই নেতৃত্ব দেন। প্রতিবাদ সহিংস রূপ নিলে ব্রিটিশদের তোপের মুখে পড়েন মুফতি। তাকে গ্রেফতারের পরোয়ানা জারি হয়। গ্রেফতার এড়াতে তিনি প্রথমে লেবানন, পরে ইরাক এবং সবশেষ জার্মানি পাড়ি দেন। উল্লেখ্য, জার্মানিতে হিটলারের নাৎসি পার্টির ক্ষমতা গ্রহণ এবং যাবতীয় ইহুদীবিরোধী নীতির সমর্থক ছিলেন তিনি। নিজেদের সীমান্তে ইহুদী আগ্রাসনের কারণে ইহুদীদের প্রতি তিনি বরাবরই বিদ্বেষী মনোভাব প্রকাশ করেন।Newsletter

Subscribe to our newsletter and stay updated.SIGN UP

হিটলার আর মুফতির মধ্যে যেসব কথা হয়

নেতানিয়াহু নিজের মনগড়া তথ্য উপস্থান করলেও তা ইতিহাসবিদ, গবেষক, সমালোচক কারো কাছেই পাত্তা পায়নি, কেননা হিটলার আর মুফতির মধ্যকার কথোপকথনের সম্পূর্ণটাই প্রকাশ করেছে জার্মানি। দুই নেতার এই আলোচনাটি হয় ১৯৪১ সালের ২৮ নভেম্বর। এই আলোচনার বিষয়বস্তুর চেয়েও এর সময়কাল অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তখনো যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়ায়নি, ইহুদী হত্যা ততদিনে শুরু হয়ে গিয়েছে, তবে ইহুদী নিশ্চিহ্ন করার সিদ্ধান্ত তখনই নেয়া হচ্ছে বলে অনেকের ধারণা, জার্মানি তখন সবে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করেছে, লেনিনগ্রাদ দখল করে তারা বীরদর্পে এগোচ্ছে মস্কোর দিকে, পুরো বিশ্ব তখন ধরে নিয়েছে হিটলারের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন অনিবার্য। এরকম এক সময়ে হিটালারের সাথে দেখা করতে যান মুফতি, যখন হিটলার রাশিয়া জয়ের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত আর তার চেয়েও বেশি নিশ্চিত মুফতি আমিন নিজে।

মুফতি আমিন তার কথোপকথন শুরুই করেছিলেন জার্মানির প্রতি তার এবং সম্পূর্ণ আরবের (যদিও তিনি পুরো আরবের প্রতিনিধিত্ব করতেন না) সমর্থন প্রকাশ করে। তার ভাষ্য ছিল এই যে, আরবদের এবং জার্মানদের স্বার্থ একই, কেননা উভয়ের শত্রু একই। ব্রিটিশ, ইহুদী এবং কমিউনিস্টদের সাধারণ শত্রু উল্লেখ করে তিনি পুরো আরবজুড়ে বিদ্রোহ ঘটানোর প্রস্তাব করেন। তার প্রস্তাবনায় ছিল নাৎসি বাহিনীর সাথে আরবরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে যুদ্ধ করে প্যালেস্টাইন এবং ইরাক থেকে ব্রিটিশদের তাড়াবে, প্যালেস্টাইনে ইহুদী বসতি নির্মাণ বন্ধ করবে, এমনকি লেবানন, সিরিয়া থেকে ফরাসিদেরও ঝেটিয়ে বিদায় করবে। কোনো সন্দেহ নেই, তার উদ্দেশ্য ছিল কেবলই আরবদের স্বাধীনতা। তথাপি, নাৎসিদের সমর্থনে তাদের জন্য মিথ্যা প্রচার-প্রচারণা চালাতেও তিনি সম্মত হয়েছিলেন, যা ছিল তার একটি বড় ভুল।

যা-ই হোক, হিটলার কিন্তু মুফতি আমিনের প্রস্তাবে সরাসরি সম্মতি দেননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে ইহুদীবাদ ও কমিউনিজমের বিরুদ্ধে একটি ভাবাদর্শগত যুদ্ধ বলে উল্লেখ করে তিনি আরবদেরকে সর্বোচ্চ সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং যুদ্ধে আরবদের অংশগ্রহণকেও স্বাগত জানান। তবে, তাৎক্ষণিকভাবে আরব বিদ্রোহের জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি চাইছিলেন, রাশিয়ায় জার্মানির অবস্থান আরো শক্ত হলে তবেই আরবদের নিয়ে মাথা ঘামাতে। তবে প্যালেস্টাইনে ইহুদী বসতি নির্মাণ বন্ধের বিষয়ে তিনিও শতভাগ একমত ছিলেন। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের হয়ে প্রায় হাজার দশেক আরব যোদ্ধা যুদ্ধ করেছিল।

হলোকাস্টের সিদ্ধান্তে মুফতির প্রভাব কতটুকু?

নেতানিয়াহুর ২০১৫ সালের এ দাবি নানা কারণে কেবল অযৌক্তিকই নয়, হাস্যকরও বটে। প্রথমত, ইহুদীদের ইউরোপ থেকে বিতাড়িত করার পরিকল্পনা নাৎসি জার্মানির প্রথম থেকেই ছিল। তবে তা সর্বোচ্চ ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত। এরপরই, হিটলার ভিন্ন কিছু ভাবতে শুরু করেন। এরই মাঝে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ইহুদীদের মাদাগাস্কার দ্বীপে নির্বাসিত করা হবে। কিন্তু, ১৯৪০ সালের ‘ব্যাটেল অব ব্রিটেন’ হারার পর এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন অনেকটাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। সম্ভবত তখন থেকেই হলোকাস্টের পরিকল্পনা শুরু হয়ে থাকতে পারে। পরিকল্পনা হোক না হোক, হত্যাকাণ্ড ততদিনে শুরু হয়ে যায়। জুন মাসে জার্মানির রাশিয়া আক্রমণের সাথে শুরু হয় ‘আইনসাটজখুপেন’ (নাৎসিদের ছোট ছোট কিলিং স্কোয়াড) এর ইহুদী নিধন। সেপ্টেম্বরে ইউক্রেনের বাবি ইয়ার গিরিখাতে দুই দিনের অভিযানে ৩৪ হাজার ইহুদী হত্যা করে নাৎসিরা! অথচ মুফতি আর হিটলারের সাক্ষাৎ হতে তখনো আরো দু’মাস বাকি

এদিকে, মুফতি আমিনের ইহুদী বিদ্বেষী মনোভাবের কারণও দিনের আলোর মতো স্পষ্ট ছিল। প্রথমত, মুসলিম আর ইহুদীদের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই শত্রুভাবাপন্ন। তার উপর প্যালেস্টাইনে ইহুদীদের অবৈধ বসতি নির্মাণ এবং ফিলিস্তিনিদের ভূমিতে ইহুদীদের দখলদারিত্ব সেই বিদ্বেষের আগুনে ঘি ঢালে। বিশ্বযুদ্ধের আগে ফিলিস্তিনে বসবাসরত সময়ে কিংবা ১৯৪১-৪৫ পর্যন্ত বার্লিনে থাকাকালীন মুফতি আমিনের ইহুদীবিরোধী অবস্থানের কথা সর্বজনবিদিত। সাথে এটাও পরিষ্কার যে, তার বিরোধ ছিল কেবলই ইহুদীদের বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে, তাদেরকে হত্যা করবার জন্য মদদ তিনি দেননি, দেয়ার প্রয়োজনও ছিল না।

তাছাড়া, ঐ সময়ে মুফতি নিজেই এমন কোনো অবস্থানে ছিলেন না যেখান থেকে হিটলারকে তিনি প্রভাবিত করতে পারবেন। গ্রেফতার এড়াতে দেশান্তরি হওয়া মুফতি আমিন বরং পরাক্রমশালী হিটলার, নাৎসি বাহিনীর জাঁদরেল প্রধান হিমলার আর উপদেষ্টা আইখম্যানের সামনে অনুরোধ করার চেয়ে বেশি কিছু করতে পারেননি। তিনি ৩টি বিষয়ে মূলত জোর দিয়েছিলেন। আরব অঞ্চলে নাৎসি প্রচারণা চালিয়ে তাদের জন্য সমর্থন জোগাড় করা, নাৎসিদের সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে আরবদের অংশগ্রহণ এবং এসবের বিনিময়ে প্যালেস্টাইনে ইহুদী বসতি স্থাপন বন্ধে নাৎসিদের হস্তক্ষেপ। অর্থাৎ, মূল ছিল সেই ইহুদী বসতি স্থাপন বন্ধ করা। এসব আলোচনা থেকে হিটলার হলোকাস্টের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এমনটা ভাবাও পাগলামি বৈ কিছু না।

হলোকাস্টের সিদ্ধান্তের প্রকৃত চিত্র

Image Source: Amazon.com

হলোকাস্ট বা ‘দ্য ফাইনাল সল্যুশন’ এর সিদ্ধান্তে মুফতি আমিনের কোনো প্রভাব ছিল না তা প্রায় সকল ধরনের গবেষণা ও ঐতিহাসিক দলিল দ্বারা প্রমাণিত। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বেরি রুবেন এবং জি. শোয়ানিতজের বই ‘নাৎসিস, ইসলামিস্টস অ্যান্ড দ্য মেকিং অব দ্য মডার্ন মিডল ইস্ট’ বইটিকে এ সংক্রান্ত তথ্য উপাত্তের প্রামাণ্য দলিল ধরা যেতে পারে। এ বইয়ে রুবেন এবং শোয়ানিতজ স্পষ্ট করেছেন যে, ২৮ নভেম্বর মুফতির সাথে সাক্ষাতের অনেক আগেই হিমলারের সাথে ইহুদী হত্যা বিষয়ক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন হিটলার।

আইনসাটজখুপেনের পাশাপাশি নাৎসিদের বিভিন্ন ছোট ছোট বাহিনী ভ্রাম্যমাণ গ্যাসভ্যানে স্থানে স্থানে ইহুদী হত্যা করেছে। ইহুদীদের উপর বিভিন্ন অন্যায় অত্যাচার চাপিয়ে দিয়ে তাদেরকে বিতাড়িত করার পরিকল্পনাও রাশিয়া আক্রমণেরও বছর তিনেক আগেই পাল্টে যায়। প্রাথমিককালে যেখানে নাৎসিবাহিনীর উর্ধ্বতনদের আলোচনায় বিতর্ক হতো কেন ইহুদীদের হত্যা করা উচিৎ তা নিয়ে। অর্থাৎ, তখনো হত্যা শুরু হয়নি। সেখানে ১৯৪০ পরবর্তী বিতর্কগুলো হতো কেন তাদেরকে হত্যা না করলেও চলবে! অর্থাৎ, ততদিনে পুরোদমে নিধনযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে। এক হিসাবে বলা হয়, মুফতির সাথে হিটলারের সাক্ষাতের পূর্বে নাৎসিদের হাতে মারা পড়ে ৭ লক্ষাধিক ইহুদী।

“আন্তর্জাতিক শান্তির বিরুদ্ধে ইহুদীদের ষড়যন্ত্রে যদি আরো একবার বিশ্বযুদ্ধ হয়, তাহলে এবার আর কোনো বলশেভীকরণ ঘটবে না, ইহুদীদের জয় হবে না, বরং তারা ধ্বংস হবে।” – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর মাসখানেক পূর্বে হিটলার

ইহুদী বিদ্বেষের জন্য হিটলারের কোনো বহিঃস্থ প্রভাবের প্রয়োজন ছিল না। ব্যক্তিগত আক্রোশ কিংবা ধর্মীয় কারণের দিকে না গেলেও, রাজনৈতিক ফায়দা দিয়েই তা সহজে বোঝা যায়। যেকোনো একনায়ক সাধারণ জনগণের সামনে তার ক্ষমতাকে বৈধ করার জন্য কোনো কাল্পনিক ষড়যন্ত্র বা নেতিবাচক শক্তির বিশ্বাস মানুষের মনে বদ্ধমূল করতে চায়। হিটলার ও তার প্রশাসন তা-ই করেছিল। তারা বিশ্বব্যাপী ইহুদীদের ষড়যন্ত্র নিয়ে এক অলীক ধারণা মানুষের মনমগজে বদ্ধমূল করেছিল, যে ষড়যন্ত্র রুখতে না পারলে জার্মানি, এমনকি বিশ্বশান্তিই হুমকির মুখে পড়বে! গোয়েবলস, হিমলার, আইখম্যানের মতো মানুষজন এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে প্রামাণিকরূপে উপস্থান করতো।

Image Source: feministcurrent.com

হলোকাস্টের মতো নৃশংস সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে সহায়তা করেছে আরেকটি বিষয়, তা হলো নাৎসিদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। প্রথমদিকে প্রবল বৈশ্বিক সমালোচনা এবং হস্তক্ষেপের কথা ভেবে ইহুদীদের উপর গণহত্যা চালানো থেকে বিরত ছিল নাৎসিরা। কিন্তু রাশিয়া আক্রমণের সময়, অর্থাৎ ১৯৪১ সালের জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত হিটলার ও তার নাৎসিবাহিনীর মাঝে যুদ্ধ জয়ের এক প্রবল আত্মবিশ্বাস জন্মায়। তারা ধরেই নিয়েছিল কয়েকমাসের মধ্যে রাশিয়া তাদের দখলে থাকবে। ফলে, ইহুদী হত্যায় তাদের আর বাঁধা ছিল না! এছাড়াও আরো কিছু ব্যাপার কাজ করেছিল হলোকাস্টের সিদ্ধান্তের পেছনে। ইহুদীদের উপর শারীরিক অত্যাচার চালিয়ে আর স্থানে স্থানে খুনোখুনি করে তাদের ভয় দেখিয়ে দেশ থেকে বিতাড়িত করার প্রক্রিয়াটা বেশ লম্বাই। কিন্তু এত সংখ্যক নিরীহ মানুষ হত্যার মানসিক ধকল সহ্য করতে পারছিলেন না অনেক নাৎসি কর্মকর্তাও। অনেকে মানসিক সমস্যায় ভোগেন, অনেকে অবসর নিয়ে নেন। এমতাবস্থায় তারা আবিষ্কার করে একত্রে হাজারো মানুষ হত্যার হাতিয়ার গ্যাস চেম্বার আর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প! সেখানে হত্যা করলে একে তো অফিসারদের মানসিক ঝক্কি পোহাতে হবে না, তার উপর বিশ্বও অত বেশি জানতে পারবে না!

সবমিলিয়ে নেতানিয়াহুর বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা অপবাদ হিসেবেই প্রমাণিত হয়। প্রথমেই বলা হয়েছে, মুফতি আর হিটলারের সাক্ষাতের সময়টা বেশ জরুরি। এ সময়ের কারণেই মনে হয়েছে হিটলারের সিদ্ধান্তে মুফতি আমিনের প্রভাব থাকতে পারে। আবার সময়টা গভীরভাবে ব্যাখ্যা করলেই প্রতীয়মান হয় যে ইহুদী হত্যায় মুফতির কোনো প্রভাব নেই। মুফতির কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন সময়ের বক্তৃতায় তার ইহুদীবিদ্বেষই স্পষ্ট। একই সাথে এটিও সত্য যে তিনি ইহুদী হত্যার কথা না বললেও ইহুদী হত্যার বিরুদ্ধেও কিছু বলেননি।

#hitler_grandmufti

দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদককে পুলিশে সোপর্দ

মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লাকে নিজেদের প্রতিবেদনে ‘শহীদ’ বলায় দৈনিক সংগ্রাম অফিস ভাঙচুর করে সম্পাদক আবুল আসাদকে পুলিশে সোপর্দ করেছে ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’ নামের একটি সংগঠন। হাতিরঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) তমিজউদ্দিন জানান, দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদকে পুলিশ হেফাজতে আনা হয়েছে, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এর আগে শুক্রবার বিকেল থেকে সংগ্রাম অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ জানায় ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’র নেতাকর্মীরা। তখন পত্রিকার কয়েকটি কপিতে আগুন দেয়া হয়।

দৈনিক সংগ্রামে কর্মরত সাংবাদিকরা জানান: বাইরে বিক্ষোভের একপর্যায়ে তারা জোর করে অফিসের ভেতরে ঢুকে কক্ষগুলোতে ভাঙচুর চালায়। এরপর সম্পাদক আবুল আসাদকে তারা টেনে হিচড়ে নিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

আমিনুল ইসলাম বলেন: যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ বলার মাধ্যমে তারা দেশের শহীদদের অবমাননা করেছে। দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত করেছে। আমরা চাই সরকারিভাবে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়া হোক। আমরা পত্রিকার মেইন গেটে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছি। সংগ্রাম পত্রিকার সম্পাদক আবুল আসাদকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন বলেন, যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে শহীদ বলার মাধ্যমে তারা দেশের শহীদদের অবমাননা করেছে। দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত করেছে। আমরা চাই সরকারিভাবে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়া হোক। আমরা পত্রিকার মেইন গেটে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছি। নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধন হারানো রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত এ জাতীয় দৈনিকে আজকের (শুক্রবার) প্রকাশিত পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ‘শহীদ কাদের মোল্লার ৬ষ্ঠ শাহাদাত বার্ষিকী আজ’ শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়: ‘‘আজ ১২ই ডিসেম্বর শহীদ কাদের মোল্লার ৬ষ্ঠ শাহাদাত বার্ষিকী। ২০১৩ সালের এই দিনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করে সরকার। জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, মানবাধিকার সংগঠনের অনুরোধ উপেক্ষা করেই ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

মৃতদের জন্য নেক ও সওয়াব প্রেরণের ১৭টি হাদীস ভিত্তিক পন্থাঃ

মৃত ব্যক্তির নামে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যে কোন প্রকার খানাপিনার আয়োজন করা কুফরী ও হারাম । মৃতদের জন্য নেক ও সওয়াব প্রেরণের ১৭টি হাদীস ভিত্তিক পন্থাঃ
#মৃতের নাম এ কুরআন খানি , মিলাদ , আর লোকজন খাওয়ানো, আর চল্লিশা বা চৌঠা এইগুলি পালন করা আদৌ ইসলামসম্মত কি না ? বাবা-মা বা কোনও আত্মীয় স্বজন মারা যাওয়ার পর তার জন্য আমাদের কি কিকরনীয় রয়েছে? এমন কি কি কাজ আছে যা করলে মৃত ব্যক্তির নিকট নেকি পৌঁছাবে ? আসুন কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে জেনে নয়া যাক…
সকল প্রশংসা আল্লাহর এবংদরুদ ও সালাম আল্লাহর রাসূল (সা) এর উপর। পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।

মানুষ মৃত্যুর পর সিওম, চেহলাম, ফাতেহা খানি ইত্যাদি করতে দেখা যায়। সিওম অর্থ মৃত্যুর ৩ দিন বা ৪ দিন পর দোয়ার অনুষ্ঠান করা।

প্রকৃত পক্ষে ইসলামের পূর্বযুগে মৃত ব্যক্তির জন্য এভাবে খানা পিনার ব্যবস্থা করার প্রচলন ছিল। ইবনে মাযাহ শরীফে সাহাবী জায়ীর ইবনে আব্দুল্লাহ বাজ্জালী (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদিসে মৃতের বাড়ীতে এ ধরনের খানা পিনার ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষনা করা হয়েছে। মুসনাদে আহমাদে হযরত ওমর (রাঃ) মৃত্যুর পর এ ধরনের খানা পিনার আয়োজন করাকে ‘নিয়াহাত’ অর্থাৎ জাহেলিয়াত যুগের রসম বলে উল্লেখ করেছেন। “বুলগুল মারামে’ নামক গ্রন্থে ৪ মাযহাবের ইমামগণও একে ‘নিয়াহাত’ বলে উল্লেখ করেন।
ফতহুল কাদীর নামক কিতাবে উল্লেখ আছে , “নবীর তরিকায় এ কথা আদৌ নেই যে, মৃতের বাড়ীতে জামায়েত হয়ে কুরআনের কিছু অংশ পড়া ও খতম করা। কবরের পাশে হোক বা অন্য স্থানে হোক জমায়েত হওয়া বিদআত।”

হাদীসে বর্ণীত আমলগুলো ছাড়া মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে নামায পড়া, কুরআন তেলাওয়াত করা, যিকির-আযকার পড়া মৃত ব্যক্তির নামে চল্লিশা করা, প্রতি বছর মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা ও মীলাদ শরীফ পাঠ করা সম্পুর্ণ বিদআত। এগুলোর পক্ষে কোন দলীল নাই। আজকাল আমাদের সমাজে হাফেজ ও কারীদেরকে ভাড়া করে এনে মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন খতম করানো হয়। এটাকে আমাদের দেশের পরিভাষায় সাবিনা পাঠ বলা হয়। অনেক সময় দুপক্ষের মাঝে দামাদামি করে হাদীয়া নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। সর্ব যুগের সকল উলামা এব্যাপারে একমত যে, মৃত ব্যক্তির জন্য ভাড়া করা হাফেজ-কারী দিয়ে কুরআন খতম করানো হারাম। পূর্বযুগের কোন আলেম বা নির্ভরযোগ্য কোন ইমাম এব্যাপারে অনুমতি দেননি। পরবর্তীযুগের কিছু পেট পুঁজারী দুনিয়াদার আলেম অন্যায়ভাবে মানুষের অর্থ আত্মসাৎ করার জন্য এ পন্থাটি চালু করেছে। এটি একটি বেদআতী আমল যা, মৃত ব্যক্তির কোন কল্যাণে আসবে না। এর দ্বারা যে টাকা উপার্জন করা হয়, তাও সম্পুর্ণ হরাম ।

প্রকৃত পক্ষে উপমহাদেশের মুসলিম সম্প্রদায় ছিল সনাতন ধর্মের অনুসারী। সনাতন ধর্মের বহু রীতি নীতি আজো বৈশিষ্ঠগতভাবে ইসলামীয় রীতি নীতিতে ধারন করে নিয়েছে। তারই ফলশ্রুতিতে তাদের অনুকরনে এই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন দেখা যায়।
# “রাসুল সা: বলেন ‘যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরণ করবে, সে ব্যক্তি সেই জাতিরই একজন বলে গণ্য হবে’ ( আবূ দাঊদ হা/৪০৩১) ।”

মৃত ব্যক্তিদের নামে উপমহাদেশে যেসব অনুষ্ঠান চালু তার অধিকাংশই বিদআত ; হাদিস সম্মত কিছু বিষয় ছাড়া।
এখন আমাদের জেনে নিতে হবে যে, বাবা মা বা কোনও আত্মীয় স্বজন মারা যাওয়ার পর তার জন্য আমাদের কি করনীয়? এমন কি কি কাজ আছে যা করলে মৃত ব্যক্তির নিকট নেকি পৌঁছাবে ?
সহীহ হাদীছের দৃষ্টিতে মৃত ব্যাক্তির জন্য দু’প্রকার আমলের ছওয়াব অব্যাহত থাকে।

জীবিত থাকাবস্থায় কৃত আমল। যেমন আল্লাহর রাস্তায় কোন সম্পদ ওয়াক্ফ করে যাওয়া, সৎকাজে সম্পত্তি খরচ করার অসিয়ত করে যাওয়া, ছাদকায়ে জারিয়া করে যাওয়া, ইত্যাদি।
এমন আমল, যা মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিত ব্যক্তিগণ করে থাকে। যেমন মৃত ব্যক্তির জন্য মুসলমানদের দু’আ ও আল্লাহর দরবারে তার জন্য মাগফেরাত কামনা করা, মৃত ব্যক্তির জন্য দান-ছাদকা করা, তার পক্ষ থেকে হজ্জ করা, রোজা রাখা ইত্যাদি।
প্রথম প্রকার আমলের বর্ণনাঃ
মৃত্যুর পর জীবিত অবস্থায় কৃত আমল দ্বারা উপকৃত হওয়ার দলীলঃ
# আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি নবী করীম (সাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, নবী (সাঃ) বলেন, “মানুষ যখন মারা যায়, তখন সমস্ত আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমলের দরজা বন্ধ হয়না। (১) ছাদকায়ে জারিয়া। (২) যদি এমন সন্তান রেখে যায়, যে পিতার জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ করবে। (৩) যদি এমন দ্বীনি শিক্ষা রেখে যায়, যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়। (সহীহ মুসলিম)

অত্র হাদীসের মাধ্যমে একথা জানা গেল যে, কোন মানুষ যদি জীবিত থাকা অবস্থায় ছাদকায়ে জারিয়া করে যায়, তাহলে উক্ত ছাদকা দ্বারা যতদিন মানুষ উপকৃত হবে, ততদিন পর্যন্ত ছাদকা কারীর আমল নামায় ছাওয়াবের একটা অংশ পৌঁতে থাকবে। এমনি ভাবে যদি কোন মুসলমান দ্বীনি কোন শিক্ষা রেখে যায় যেমন ইসলামী বই-পুস্তক রচনা করা, ছাত্রদেরকে দ্বীনি শিক্ষা প্রদান করা, ইসলামী লাইব্রেরী বা দ্বিনী প্রতিষ্ঠান নির্মান করা, নির্মানে অংশ গ্রহণ করা ইত্যাদি। অনুরূপভাবে যদি কেহ সৎ সন্তান রেখে যায় এবং সে সন্তান আল্লাহর কাছে পিতা-মাতার নাজাতের জন্য দু’আ করে, তাহলে সে দু’আর মাধ্যমে তারা উপকৃত হবে।

দ্বিতীয় প্রকার আমলের বর্ণনাঃ
এক্ষেত্রে আমরা কয়েকটি আমলের উল্লেখ করব যা দ্বারা মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবে অথচ সে এসব আমল করে যায়নি, বা এসব আমলের কারণও ছিল না।

(১) মৃত ব্যক্তির জন্য মুসলমানদের দু‘আ এবং আল্লাহর নিকট তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা:
এব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে অনেক দলীল রয়েছে। আল্লাহ তায়া‘লা বলেন:
• “তারা (মু’মিনগণ) বলে: “হে আমাদের পালনকর্তা আমাদেরকে এবং আমাদের পূর্বে যারা ঈমান এনেছে, তাদেরকে ক্ষমা করো। আর ঈমানদারদের বিরোদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখো না।” (সূরা হাশরঃ ১০)

আল্লাহ তায়ালা মৃত বা জীবিত পিতা-মাতা ও মুমিদের জন্য দু‘আ করার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়ে বলেনঃ
• “হে আমাদের প্রভু! রোজ কিয়ামতে আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল মুমিনকে ক্ষমা করে দিন।” (সুরা ইবরাহীমঃ৪১)

এছাড়া আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পিতা-মাতার জন্য দূ‘আ করার বিশেষ নিয়ম শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেনঃ
• “এবং তুমি বল, হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।” (সূরা বানী ইসরাঈলঃ ২৪)

হাদীসে যে সমস্ত দলীল রয়েছে তা থেকে আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত উসমান বিন আফফান (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

# উসমান (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সাঃ) মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার কবরের পার্শ্বে দাঁড়াতেন এবং বলতেন, “তোমরা তোমাদের ভায়ের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তার জন্য ঈমানের উপর অবিচলতা ও দৃঢ়তা কামনা কর, কেননা এখনই তাকে প্রশ্ন করা হবে।”

এছাড়া কবর যিয়ারতের ব্যাপারে যে সমস্ত দু‘আ হাদীসে এসেছে, তাতে একথারই প্রমাণ রয়েছে যে, মৃত ব্যক্তির জন্য দু‘আ করলে সে দু‘আর মাধ্যমে সে উপকৃত হবে।

মূলত: জানাযার নামায প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির জন্য দু‘আ স্বরূপ।

(২) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান-ছাদকা করা:
এ ব্যাপারে বুখারী-মুসলিমে মুমিন জননী আয়েশা থেকে বর্ণিত হাদীসটি বিশেষ ভাবে প্রণিধানযোগ্য।
# আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ“জনৈক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ) এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেছেন। তাই কোন অছিয়ত করতে পারেন নি। আমার ধারণা তিনি যদি কথা বলার সুযোগ পেতেন তাহলে দান-ছাদকা করতেন। আমি তাঁর পক্ষ থেকে ছাদকা করলে তিনি কি এর ছাওয়াব পাবেন? রাসূল (সাঃ) বললেন হ্যাঁ, অবশ্যই পাবেন।” (বুখারী ও মুসলিম)

উপরোক্ত সহীহ হাদীসটির মাধ্যমে আমরা একথাই জানতে পারলাম যে, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান করলে তার ছাওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছবে এবং তা দ্বারা সে উপকৃত হবে।

(৩) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোজা রাখা:
তবে এক্ষেত্রে মানতের রোজা এবং রামাযানের কাজা রোযা উদ্দেশ্য। তার পক্ষ থেকে নফল রোজা রাখার পক্ষে কোন দলীল নাই। মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোজা রাখা বৈধ হওয়ার দলীল হলো
# আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি মৃত্যু বরণ করল এমতাবস্থায় যে তার উপর রোজা ওয়াজিব ছিল। তবে তার পক্ষ থেকে তার ওয়ারিসগণ রোজা রাখবে।” (বুখারী ও মুসলিম)

(৪) হজ্জ বা উমরাহ করা:
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্জ করলে তা আদায় হবে এবং মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবে। ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

# জুহাইনা গোত্রের একজন মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আগমণ করে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমার মা হজ্জ করার মানত করেছিলেন কিন্তু তিনি হজ্জ সম্পাদন না করেই মারা গেছেন। এখন আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করতে পারি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘তুমি তোমার মায়ের পক্ষ থেকে হজ্জ কর। তোমার কি ধারণা যদি তোমার মার উপর ঋণ থাকতো তবে কি তুমি তা পরিশোধ করতে না ? সুতরাং আল্লাহর জন্য তা আদায় কর। কেননা আল্লাহর দাবী পরিশোধ করার অধিক উপযোগী’’ [সহীহ বুখারী: ১৮৫২]

তবে মা-বাবার পক্ষ থেকে যে লোক হজ্জ বা ওমরাহ করতে চায় তার জন্য শর্ত হলো সে আগে নিজের হজ্জ-ওমরাহ করতে হবে।

(৫) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করা:
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করলে তার ছাওয়াব দ্বারা তারা উপকৃত হবে। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে,

# আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একটি শিংযুক্ত দুম্বা উপস্থিত করতে নির্দেশ দিলেন, যার পা কালো, চোখের চতুর্দিক কালো এবং পেট কালো। অতঃপর তা কুরবানীর জন্য আনা হলো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বললেন, হে আয়েশা! ছুরি নিয়ে আস, তারপর বললেন, তুমি একটি পাথর নিয়ে তা দ্বারা এটাকে ধারালো কর। তিনি তাই করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুরি হাতে নিয়ে দুম্বাটিকে শুইয়ে দিলেন। পশুটি যবেহ্ করার সময় বললেন, বিসমিল্লাহ, হে আল্লাহ তুমি এটি মুহাম্মাদ, তাঁর বংশধর এবং সকল উম্মাতে মুহাম্মাদীর পক্ষ থেকে কবুল কর”। এভাবে তিনি তা দ্বারা কুরবানী করলেন। [ সহীহ মুসলিম:৫২০৩]

(৬) ওসিয়ত পূর্ণ করা:
মা-বাবা শরীয়াহ সম্মত কোন ওসিয়ত করে গেলে তা পূর্ণ করা সন্তানদের উপর দায়িত্ব।

(৭) মৃতের বন্ধুদের সম্মান করা:
মা-বাবার বন্ধুদের সাথে ভাল ব্যবহার করা, সম্মান করা, তাদেরকে দেখতে যাওয়া,তাদেরকে হাদিয়া দেয়া। এ বিষয়ে হাদীসে উল্লেখ আছে,
# আব্দুল্লাহ ইবনে দীনার রাদিয়াল্লাহু আনহু আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, একবার মক্কার পথে চলার সময় আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর এক বেদুঈন এর সাথে দেখা হলে তিনি তাকে সালাম দিলেন এবং তাকে সে গাধায় চড়ালেন যে গাধায় আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা উপবিষ্ট ছিলেন এবং তাঁর (আব্দুল্লাহ) মাথায় যে পাগড়িটি পরা ছিলো তা তাকে প্রদান করলেন। আব্দুল্লাহ ইবান দীনার রাহেমাহুল্লাহ বললেন, তখন আমরা আব্দুল্লাহকে বললাম: আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুক! এরা গ্রাম্য মানুষ: সামান্য কিছু পেলেই এরা সন্তুষ্ট হয়ে যায়-(এতসব করার কি প্রয়োজন ছিলো?) উত্তরে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তার পিতা, (আমার পিতা) উমার ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বন্ধু ছিলেন। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি “পুত্রের জন্য পিতার বন্ধু-বান্ধবের সাথে ভাল ব্যবহার করা সবচেয়ে বড় সওয়াবের কাজ’’ [সহীহ মুসলিম:৬৬৭৭]।

মৃতদের বন্ধুদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমলও আমাদেরকে উৎসাহিত করে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,
# রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোন বকরী যবেহ করতেন, তখনই তিনি বলতেন, এর কিছু অংশ খাদীজার বান্ধবীদের নিকট পাঠিয়ে দাও [সহীহ মুসলিম: ৬৪৩১]

(৮) মা-বাবার আত্নীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখা:
সন্তান তার মা-বাবার আত্নীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
# ‘যে ব্যক্তি তার পিতার সাথে কবরে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে ভালবাসে, সে যেন পিতার মৃত্যুর পর তার ভাইদের সাথে সু-সম্পর্ক রাখে’ [সহীহ ইবন হিববান:৪৩২]

(৯) ঋণ পরিশোধ করা:
মা-বাবার কোন ঋণ থাকলে তা দ্রুত পরিশোধ করা সন্তানদের উপর বিশেষভাবে কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণের পরিশোধ করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
# ‘‘মুমিন ব্যক্তির আত্মা তার ঋণের সাথে সম্পৃক্ত থেকে যায়; যতক্ষণ তা তা তার পক্ষ থেকে পরিশোধ করা হয়”। [সুনান ইবন মাজাহ:২৪১৩]

ঋণ পরিশোধ না করার কারণে জান্নাতের যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়; এমনকি যদি আল্লাহর রাস্তায় শহীদও হয় । হাদীসে আরো এসেছে,
# যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দার ঋণ পরিশোধ না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। [নাসায়ী ৭/৩১৪; তাবরানী ফিল কাবীর ১৯/২৪৮; মুস্তাদরাকে হাকিম ২/২৯]

(১০) কাফফারা আদায় করা:
মা-বাবার কোন শপথের কাফফারা,ভুলকৃত হত্যাসহ কোন কাফফারা বাকী থাকলে সন্তান তা পূরণ করবে। আল-কুরআনে বলা হয়েছে,
• যে ব্যক্তি ভুলক্রমে কোন মুমিনকে হত্যা করবে, তাহলে একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করতে হবে এবং দিয়াত (রক্ত পণ দিতে হবে) যা হস্তান্তর করা হবে তার পরিজনদের কাছে। তবে তারা যদি সদাকা (ক্ষমা) করে দেয় (তাহলে সেটা ভিন্ন কথা) [ সূরা আন-নিসা:৯২]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
# ‘‘ যে ব্যক্তি কসম খেয়ে শপথ করার পর তার থেকে উত্তম কিছু করলেও তার কাফফারা অদায় করবে’’ [সহীহ মুসলিম: ৪৩৬০] ।

এ বিধান জীবিত ও মৃত সবার ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। দুনিয়ার বুকে কেউ অন্যায় করলে তার কাফফারা দিতে হবে। অনুরূপভাবে কেউ অন্যায় করে মারা গেলে তার পরিবার-পরিজন মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কাফফারা প্রদান করবেন।

(১১) ক্ষমা প্রার্থনা করা:
মা-বাবার জন্য আল্লাহর নিকট বেশী বেশী ক্ষমা প্রার্থনা করা গুরুত্বপূর্ণ আমল। সন্তান মা-বাবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করায় আল্লাহ তা‘আলা তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। হাদীসে বলা হয়েছে,
# আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মৃত্যুর পর কোন বান্দাহর মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়। তখন সে বলে হে আমার রব, আমি তো এতো মর্যাদার আমল করিনি, কীভাবে এ আমল আসলো ? তখন বলা হবে, তোমার সন্তান তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করায় এ মর্যাদা তুমি পেয়েছো’’ [আল-আদাবুল মুফরাদ:৩৬]।

মা-বাবা দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার পর তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার বিষয়ে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে এসেছে,
# উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন এক মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার কবরের পার্শ্বে দাঁড়ালেন এবং বললেন ‘‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তার জন্য ঈমানের উপর অবিচলতা ও দৃঢ়তা কামনা কর, কেননা এখনই তাকে প্রশ্ন করা হবে’’ [মুসনাদুল বাজ্জার :৪৪৫]।

তাই সুন্নাত হচ্ছে, মৃত ব্যক্তিকে কবরে দেয়ার পর তার কবরের পার্শ্বে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তার জন্য প্রশ্নোত্তর সহজ করে দেয়া, প্রশ্নোত্তর দিতে সমর্থ হওয়ার জন্য দো‘আ করা।

(১২) মান্নত পূরণ করা:
মা-বাবা কোন মান্নত করে গেলে সন্তান তার পক্ষ থেকে পূরণ করবে। ইবন আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,
# কোন মহিলা রোজা রাখার মান্নত করেছিল, কিন্তু সে তা পূরণ করার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করল। এরপর তার ভাই এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বলরেন, তার পক্ষ থেকে সিয়াম পালন কর। [সহীহ ইবন হিববান:২৮০]

(১৩) মা-বাবার ভাল কাজসমূহ জারী রাখা:
মা-বাবা যেসব ভাল কাজ অর্থাৎ মসজিদ তৈরী করা, মাদরাসা তৈরী করা, দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরীসহ যে কাজগুলো করে গিয়েছেন সন্তান হিসাবে তা যাতে অব্যাহত থাকে তার ব্যবস্থা করা। কেননা এসব ভাল কাজের সওয়াব তাদের আমলনামায় যুক্ত হতে থাকে। হাদীসে এসেছে,
# ‘‘ভাল কাজের পথপ্রদর্শনকারী এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ সাওয়াব পাবে’’। [সুনান আততিরমীযি : ২৬৭০]

# যে ব্যক্তির ইসলামের ভাল কাজ শুরু করল, সে এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ সাওয়াব পাবে। অথচ তাদেও সওয়াব থেকে কোন কমতি হবে না’’ [সহীহ মুসলিম:২৩৯৮]।

(১৪) কবর যিয়ারত করা:
সন্তান তার মা-বাবার কবর যিয়ারত করবে। এর মাধ্যমে সন্তান এবং মা-বাবা উভয়ই উপকৃত হবে। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
# আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম,অত:পর মুহাম্মাদের মায়ের কবর যিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এখন তোমরা কবর যিয়রাত কর, কেননা তা আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয় [সুনান তিরমীযি :১০৫৪]।

# যিয়রাত কর, কেননা তা আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয় [সুনান তিরমীযি :১০৫৪]।

কবর যিয়ারত কোন দিনকে নির্দিষ্ট করে করা যাবে না। কবর যিযারত করার সময় বলবে,
# কবরবাসী মুমিন-মুসলিম আপনাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক । নিশ্চয় আমরা আপনাদের সাথে মিলিত হবো। আমরা আল্লাহর কাছে আপনাদের এবং আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। [সুনান ইবন মাজাহ :১৫৪৭]

বি.দ্র. নারীরা কবর যিয়ারত করবে না ।

(১৫) ওয়াদা করে গেলে তা বাস্তবায়ন করা:
মা-বাবা কারো সাথে কোন ভাল কাজের ওয়াদা করে গেলে বা এমন ওয়াদা যা তারা বেচে থাকলে করে যেতেন, সন্তান যথাসম্ভব তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে,
# আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর, নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। [ সূরা বনী ইসরাঈল:৩৪]

(১৬) কোন গুনাহের কাজ করে গেলে তা বন্ধ করা:
মা-বাবা বেচে থাকতে কোন গুনাহের কাজের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে তা বন্ধ করবে বা শরীয়াহ সম্মতভাবে সংশোধন করে দিবে। কেননা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
# এবং যে মানুষকে গুনাহের দিকে আহবান করবে, এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ গুনাহ তার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে। অথচ তাদের গুনাহ থেকে কোন কমতি হবে না’’ [সহীহ মুসলিম:৬৯৮০]।

(১৭) মা-বাবার পক্ষ থেকে মাফ চাওয়া:
মা-বাবা বেচে থাকতে কারো সাথে খারাপ আচরণ করে থাকলে বা কারো উপর যুলুম করে থাকলে বা কাওকে কষ্ট দিয়ে থাকলে মা-বাবার পক্ষ থেকে তার কাছ থেকে মাফ মাফ চেয়ে নিবে অথবা ক্ষতি পূরণ দিয়ে দিবে। কেননা হাদীসে এসেছে,
# আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা কি জান নিঃস্ব ব্যক্তি কে? সাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে যার সম্পদ নাই সে হলো গরীব লোক। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে সে হলো গরীব যে, কিয়ামতের দিন নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে আসবে অথচ সে অমুককে গালি দিয়েছে, অমুককে অপবাদ দিয়েছে, অন্যায়ভাবে লোকের মাল খেয়েছে, সে লোকের রক্ত প্রবাহিত করেছে এবং কাউকে প্রহার করেছে। কাজেই এসব নির্যাতিত ব্যক্তিদেরকে সেদিন তার নেক আমল নামা দিয়ে দেয়া হবে। এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। [সুনান আততিরমিযি :২৪২৮]

সুতরাং এ ধরনের নিঃস্ব ব্যক্তিকে মুক্ত করার জন্য তার হকদারদের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়া সন্তানের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে মা বাবা এবং অন্যান্য মৃত স্বজনদের জন্য আমলগুলো করার তাওফীক দিন। আমীন

#অং_সান_সুকিঃ এক পতিত হওয়া শান্তির দূত?!!?

৯০ এর দশকে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে অং সান সু কি বিশ্ববাসীর মন জয় করে নিয়েছিলেন। নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতি সু কির সেই গণতান্ত্রিক চেহারার আড়ালে যে আরেকটি নিষ্ঠুর চেহারা আছে তা প্রকাশ করে দিয়েছে।
২০১৭ সালে দেশটির রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগণের উপর মিয়ানমার সামরিক বাহিনী নির্মম নির্যাতন আর তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করতে যে অভিযান চালিয়েছে এর বিরুদ্ধে সু কি ছিলেন পুরোদস্তুর নিশ্চুপ। বিশ্বের তামাম নেতা, নোবেল বিজেতা, মানবাধিকার কর্মী, জাতিসংঘসহ বিশ্বের সমস্ত মানুষ এই গণহত্যার নিন্দা করলেও সু কি ছিলেন এই বিষয়ে নীরব। কখনও এ নিয়ে মুখ খুললেও শব্দচয়নে ছিলেন অতি সাবধানী অথবা ইঙ্গিতে সামরিক বাহিনীর কর্মকান্ডকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছেন।
এতে অং সান সু কি বিশ্বজুড়ে হয়েছেন নিন্দিত এবং অপমানিত। সু কিকে দেয়া পুরস্কার অথবা সম্মাননা অনেক সংস্থা ফিরিয়ে নিয়েছে। দাবী উঠেছে তার নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে নেয়ার। কানাডা সু কিকে দেয়া তার দেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব বাতিল করেছে।
এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে (ICJ) গণহত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া।
এভাবেই বিশ্বজুড়ে সমালোচনার শিকার হচ্ছেন একসময়ে শান্তি আর গণতন্ত্রের দূত বিবেচিত হওয়া এই নেত্রী। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর সংগঠিত গণহত্যার দায় তিনি এড়াতে পারছেন না তার একচোখা সংখ্যাগরিষ্ঠ তোষণ নীতির কারণে। ক্ষমতার রাজনীতি যে আসলেই অন্ধ-বধির তা একসময়ে অহিংস আন্দোলনে বিশ্বাসী অং সান সু কিকে দেখলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।’৯০ দশকের ‘দ্য লেডি’ খেতাব পাওয়া জনপ্রিয় নেত্রী অং সান সু কি। গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে বিশ্ববাসীর মন জয় করা এক নারীর নাম। তার দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে নিঃশর্তে মেনে নিয়েছিলেন পরিবারবিহীন নির্জন, বন্দী জীবন। বাবা ছিলেন তৎকালীন বার্মার স্বাধীনতার অগ্রনায়ক। বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শুরু করেছিলেন তার দেশ মিয়ানমার তথা বার্মাকে সামরিক জেনারেলদের হাত থেকে গণতন্ত্রের ধারায় ফিরিয়ে আনার লড়াই। মহাত্না গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলার অনুসারী এই নেত্রী গণতন্ত্রের লড়াইয়ে আপোষহীন থেকে অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যান সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে। তাই ১৯৯১ সালে তাকে দেয়া হয় নোবেল শান্তি পুরস্কার।তবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তিনি কতটা সফল আর কতটা বিফল তা আজ প্রশ্নের উদ্রেক করে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার, তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া আর পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার পুরো ঘটনাচক্রে হয় তিনি নীরব থেকেছেন, নতুবা বিতর্কিত মতবাদের পক্ষ নিয়েছেন। এতেই হয়েছেন বিশ্বজুড়ে আলোচিত-সমালোচিত। সাম্প্রতিক সময়ে অনেকে তাকে দেয়া নোবেল শান্তি পুরস্কার কেড়ে নেয়ার দাবীও তুলেছেন।
অং সান সু কির জন্ম ১৯ জুন ১৯৪৫ সালে। বাবা অং সান ছিলেন তৎকালীন বার্মার স্বাধীনতার জনক। সু কি ছিলেন বাবা-মায়ের সবচেয়ে ছোট সন্তান। স্বাধীনতার মাত্র ছয় মাস আগে তার বাবা অং সান আততায়ীদের গুলিতে নিহত হন।বাবার মৃত্যুর পর ১৯৬০ সালে স্বাধীন বার্মার নতুন সরকার সু কির মা খিন কি-কে ভারত ও নেপালে বার্মার রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়। সু কি মায়ের সাথে চলে আসেন ভারত।
তিনি নয়া দিল্লির কনভেন্ট অব জিসাস এন্ড ম্যারি স্কুলে পড়ালেখা করেন। দিল্লি ইউনিভার্সিটির অধীন লেডি শ্রীরাম কলেজ থেকে ১৯৬৪ সালে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন এবং পরে সেইন্ট হাগ’স কলেজ, অক্সফোর্ড থেকে ১৯৬৭ সালে লাভ করেন বিএ ডিগ্রী। ১৯৬৮ সালে শেষ করেন স্নাতকোত্তর।কর্মজীবনে প্রবেশ করে সু কি নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে তিন বছর কাজ করেন। তিনি জাতিসংঘের বাজেট বিষয়ক কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন।
১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি অং সান সু কি বিয়ে করেন ড. মাইকেল এরিসকে যিনি ছিলেন তিব্বতিয়ান সংস্কৃতি ও সাহিত্যের গবেষক এবং ভুটানে বসবাসরত। ১৯৭৩ সালে সু কির প্রথম সন্তান অ্যালেকজান্ডার এরিস জন্মগ্রহণ করে। ১৯৭৭ সালে লন্ডনে সু কি জন্ম দেন তার দ্বিতীয় সন্তান মাইককে।
১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনে এম ফিল ডিগ্রী করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। লন্ডন ইউনিভার্সিটির অধীন স্কুল অব ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজে তিনি বার্মিজ সাহিত্যের উপর গবেষণা করেছিলেন।১৯৮৮ সালে সু কির মা খিন কি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে মায়ের দেখাশোনা করতে সু কি মিয়ানমার তথা বার্মায় ফিরে আসেন। তখন মিয়ানমার প্রচন্ড রাজনৈতিক উথাল-পাথাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।
১৯৬২ সালে জেনারেল ইউ নে উইন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন এবং তৎকালীন বার্মায় শুরু হয় সামরিক শাসন। তারপর থেকেই গণতন্ত্রের দাবীতে আন্দোলন চললেও ১৯৮৮ সালে হাজার হাজার ছাত্র, চাকরিজীবী, পেশাজীবী, জনতা, বৌদ্ধ সন্যাসী রাস্তায় নেমে গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিতে একজোট হয়ে আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই গণবিক্ষোভের মুখে সেই বছর আগস্টে নে উইন পদত্যাগ করে ক্ষমতা সামরিক জান্তার কাছে হস্তান্তর করেন। ৮-৮-৮৮ নামে সেই আন্দোলন আজও পরিচিত।সু কি মায়ের দেখাশোনা করতে দেশে ফিরলেও তিনি সেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। নে উইন পদত্যাগ করলেও পরবর্তী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে তিনি প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। তিনি বিভিন্ন জনসভায় জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আর মানবাধিকার নিয়ে কড়া বক্তব্য রাখেন। এর ফলে শীঘ্রই তিনি সামরিক সরকারের রোষানলে পড়েন।
১৯৮৯ সালের জুলাই মাসে সামরিক সরকার সু কি কে গৃহবন্দী করে বহির্বিশ্বের সাথে তার সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যদিও সামরিক জান্তা তাকে দেশত্যাগের শর্তে মুক্তির প্রস্তাব দেয়, তিনি সেই প্রস্তাবে রাজী না হয়ে বন্দীত্ব বেছে নেন।
১৯৯০ সালে সামরিক জান্তা একটি সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করলে সু কির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি সেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে। পার্লামেন্টের ৮০ শতাংশ সীট সু কির দলের দখলে চলে আসে। কিন্তু সরকার সেই নির্বাচনের ফল বাতিল করে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়। সু কি গৃহবন্দী থাকেন।
১৯৯১ সালে বন্দী থাকাবস্থায় তাকে নোবেল কমিটি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভুষিত করে।১৯৯৫ সালে সু কিকে মুক্তি দেয়া হয়। মুক্ত হয়ে তিনি ১৯৯৬ সালে এনএলডির কংগ্রেসে অংশগ্রহন করেন। ১৯৯৯ সালে তিনি একটি প্রতিনিধি কমিটি গঠন করে সেটিকে দেশটির বৈধ সরকার ঘোষণা দিলে ২০০০ সালে আবার তিনি গৃহবন্দী হন।
২০০২ সালে তিনি সাময়িক মুক্ত হলেও ২০০৩ সালে সরকার এনএলডি সমর্থকদের সঙ্গে সরকার সমর্থকদের সংঘর্ষ হলে তিনি আবার বন্দী হন। এবার তাকে গৃহবন্দীত্বের সাজা দেয়া হয় যা প্রতি বছর নবায়ন হতে থাকে।
২০০৯ সালে মুক্তির প্রাক্কালে তিনি আবার বন্দী হন। এবার তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি তার বাড়িতে বহিরাগত প্রবেশ করতে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক জন ইয়েত্তাও নাকি তার বাড়িতে দুই রাত থেকেছেন। এই অভিযোগে সু কিকে আঠারো মাসের সাজা দেয়া হয়। যদিও জাতিসংঘ এটাকে মিয়ানমারের আইনেই অবৈধ বলে ঘোষণা দেয়।
সু কি যাতে ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন তার জন্য সামরিক জান্তা নতুন নির্বাচনীআইন পাশ করে। এতে বলা হয়, বিদেশী নাগরিককে বিয়ে করা বা বিদেশী নাগরিকত্ব আছে এমন সন্তান যাদের আছে তারা প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। আবার আরেকটি আইন মতে, সাজাপ্রাপ্ত কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না- যার দুটোই সু কির ক্ষেত্রে খাটে, কারণ তার স্বামী এবং সন্তানেরা বিদেশী নাগরিক।
এনএলডি এই আইনের অধীনে নিবন্ধন করতে রাজি হয়নি, তাই ২০১০ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ২০১১ সালে সু কি মুক্ত হন এবং দলটিকে ওই আইনের অধীনেই নিবন্ধন করতে রাজি হয়ে যান, যার মাধ্যমে ২০১২ সালে সু কি পার্লামেন্টের সদস্য হন।অনেক দশকের পর ২০১৫ সালে একটি মোটামুটি মুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে সু কির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি মিয়ানমারের ক্ষমতায় আসে। সু কির বিদেশী সন্তান থাকার কারণে প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। তবে তিনি রাষ্ট্রটির নবসৃষ্ট পদ ‘স্টেট কাউন্সেলর’ এর দায়িত্ব পান। পদটিকে প্রধানমন্ত্রীর সমমর্যাদার হিসেবে মনে করা হয়।
রাজনৈতিক এই চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সু কি মিয়ানমারের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন। যদিও এখনও সামরিক বাহিনীর হাতেই মূল ক্ষমতার সুতা। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয়গুলো এখনও সামরিক বাহিনীর অধীনে রয়েছে।
সূত্রঃ rora

অনাগত শিশুর লিঙ্গ পরীক্ষা বন্ধে আইনি নোটিশ



গর্ভবতী নারী ও অনাগত সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পেটের শিশুদের লিঙ্গ পরিচয় জানার উদ্দেশ্যে পরীক্ষা ও লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

রোববার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান রেজিস্ট্রি ডাক যোগে এ নোটিশ পাঠান। স্বাস্থ্য সচিব, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সমাজ কল্যাণ সচিবকে এ নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

তাদের তিনদিনের মধ্যে সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে পেটের শিশুদের লিঙ্গ পরিচয় জানার উদ্দেশ্যে লিঙ্গ পরীক্ষা করে পরিচয় প্রকাশ বন্ধ করতে নির্দেশনা জারি করতে বলা হয়েছে। অন্যথায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, আমাদের দেশে এখনও বেশির ভাগ মানুষের ছেলে সন্তানই কাম্য। কারণ, তারা মনে করেন ছেলেরা বংশের ধারক, তারা আয় করে, বেশি শক্তিশালী। এমন কী অনেক নারীও মনে করে ছেলে সন্তান তাদের ভবিষ্যতের সুরক্ষা দেবে।

এ অবস্থায় যদি পরীক্ষার মাধ্যমে পেটে থাকা সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় জানা যায় এবং তা মা-বাবার কাঙ্ক্ষিত না হলে গর্ভবতী মায়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উপর প্রভাব ফেলে। মা যদি হতাশায় ভোগে তবে বাচ্চার brain developmentগঠন/বিকাশ ঠিকভাবে হয় না। চীন-ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পেটে থাকা সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পেটের শিশুদের লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ বন্ধ হওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেন এই আইনজীবী।

তিনি বলেন, গর্ভবতী মা ও শিশুর কল্যাণের জন্য বা অনাগত সন্তানের সুস্থতা জানতে তারা যেকোনো পরীক্ষা করতেই পারেন। কিন্তু শুধু পেটে থাকা সন্তান ছেলে না মেয়ে তা জানার উদ্দেশ্যে ডাক্তারি পরীক্ষা বা ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্টে লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ কারণেই লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছি।

প্রসঙ্গঃ #পৃথিবীর_প্রথম_মসজিদ ।


#পৃথিবীর_প্রথম_সৃষ্টি_কলম‘ এর মত প্রথম তৈরীকৃত মসজিদ নিয়েও কিছু লোকের বিতর্কের শেষ নেই । নিচে প্রথম তৈরী মসজিদ সম্পর্কে অল্প কিছু মাত্র দলীল সহ আলোচনা করা হলো।
#আল্লাহ‘র নিকট থেকে এই ওহি করা হয়েছে যে, মসজিদগুলো আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করার জন্য। অতএব তোমরা আল্লাহ তায়ালার সাথে আর কাইকে ডেকো না’ (সূরা জিন : ১৮)।
মসজিদ সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের বক্তব্য (আয়াত) সূরা বাকারা, সূরা আল-ইমরান, সূরা তাওবা, সূরা জিনসহ অনেক সূরাতে রয়েছে।
পৃথিবীর প্রথম মসজিদ সম্পর্কে সূরা আল-ইমরানের ৯৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘নিশ্চয় মানব জাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা তো মক্কায় অবস্থিত। উহা বরকতময় এবং বিশ্বজগতের জন্য পথপ্রদর্শক।’ পবিত্র কুরআনের এই বর্ণনা মতে, পৃথিবীর প্রথম মসজিদ হচ্ছে বায়তুল্লাহ বা মসজিদুল হারাম। এরপর দ্বিতীয় মসজিদ হচ্ছে মসজিদুল আকসা বা বায়তুল মোকাদ্দাস। তৃতীয়টি হচ্ছে মসজিদে কোবা এবং চতুর্থ মসজিদ ‘মসজিদে নববী’। পৃথিবীর প্রথম মসজিদ সম্পর্কে হজরত আবু যর রা: থেকে একটি হাদিস বর্ণিত রয়েছে। যে হাদিসে বলা হয়েছে, রাসূল সা:কে জিজ্ঞেস করা হলোÑ হে রাসূলুল্লাহ সা: পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত সর্বপ্রথম মসজিদ কোনটি? জবাবে রাসূলে করিম সা: বলেন, আল-মসজিদুল হারাম। অতঃপর জিজ্ঞেস করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, আল-মসজিদুল আকসা। এরপর তিনি (আবু যর) জিজ্ঞেস করলেন, এই দুটি মসজিদ প্রতিষ্ঠার মধ্যে সময়ের ব্যবধান কত দিনের? জবাবে রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ৪০ বছরের (মিশকাত)। অর্থাৎ নূহ আ:-এর প্লাবনের পর ইবরাহিম আ: তৈরি করেছিলেন বায়তুল্লাহ বা মসজিদুল হারাম, আর সুলায়মান আ: তৈরি করেছিলেন মসজিদুল আকসা। উভয় মসজিদই তৈরি করেছিলেন সর্বপ্রথম হজরত আদম আ:। আর ইবরাহিম আ: এবং সুলায়মান আ: নূহ নবীর প্লাবনের পর তা সংস্কার করেছিলেন মাত্র।
মসজিদ তৈরির ইতিহাসে হজরত মুহাম্মদ সা: প্রথম মসজিদ তৈরি করেছিলেন মদিনাতে; যার নাম মসজিদে কোবা। এরপর তিনি মদিনার কেন্দ্রস্থলে তৈরি করলেন মসজিদে নববী। আল্লাহর নির্দেশে মুহাম্মদ সা: যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন, তখন তিনি ‘কোবা’ নামক পল্লীতে ১৪ দিন অবস্থান করেন এবং সেখানেই তিনি মসজিদুল কোবা প্রতিষ্ঠিত করেন। এই মসজিদ সম্পর্কে আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘প্রথম দিন থেকে যে মসজিদ তাকওয়ার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; হে নবী তোমার জন্য সর্বাধিক উপযোগী সেটিই, যেখানে তুমি ইবাদতের জন্য দাঁড়াবে’ (সূরা তাওবা : ১০৮)।