আল-খাত্তাবি: আধুনিক গেরিলাযুদ্ধের জনক

চীনের মাও সে তুং, ভিয়েতনামের হো চি মিন, কিংবা কিউবার চে গুয়েভারার নাম আমরা সবাই জানি। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মরক্কোর রিফ অঞ্চলে এমন একজন বিপ্লবী নেতা ছিলেন, যার গেরিলা যুদ্ধের কৌশল এবং সাফল্য অনুপ্রাণিত করেছিল এই তিন নেতাকেই! অনেকেই তাকে আধুনিক গেরিলাযুদ্ধের জনক হিসেবে অভিহিত করে থাকে। তার নাম মোহাম্মদ বিন আব্দুল করিম আল-খাত্তাবি।
কে এই খাত্তাবি?খাত্তাবির জন্ম ১৮৮২ সালে মরক্কোর উত্তরে রিফ অঞ্চলের আজদির শহরের এক বার্বার (Berber) তথা আমাজিঘ আদিবাসী পরিবারে। তার বাবা আব্দুল করিম ছিলেন রিফ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এবং প্রভাবশালী আমাজিঘ গোত্র আইত ওয়ারিয়াগালের অত্যন্ত সম্মানিত একজন কাজি। বাবার উৎসাহে খাত্তাবি প্রথমে স্থানীয় মাদ্রাসায় কুরআন এবং আরবি ভাষার উপর পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি এবং তার ভাই কয়েক বছর স্প্যানিশ স্কুলেও পড়াশোনা করেন। এরপর তার ভাই মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনার জন্য মাদ্রিদে চলে যান, অন্যদিকে খাত্তাবি ফেজের বিখ্যাত কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আরবি এবং ইসলামি আইনশাস্ত্রের ওপর পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।সে সময় মরক্কোর অংশবিশেষ ছিল ঔপনিবেশিক স্প্যানিয়ার্ডদের নিয়ন্ত্রণে। পড়াশোনা শেষ করে খাত্তাবি প্রথমে স্প্যানিয়ার্ডদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মেলিলা এলাকায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি শিক্ষক এবং অনুবাদক হিসেবে চাকরিজীবন শরু করেন। তিনি স্প্যানিশ পত্রিকা এল তেলিগ্রামা দেল রিফের হয়ে কয়েক বছর সাংবাদিক এবং কলামিস্ট হিসেবে চাকরি করেন। মেলিলার স্প্যানিশ মিলিটারি প্রশাসনের অধীনে তিনি কিছুদিন অনুবাদক এবং সেক্রেটারি হিসেবেও চাকরি করেন। তার ধর্মীয় এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা বুঝতে পেরে ১৯১৫ সালে তারা তাকে মেলিলার কাজি হিসেবে নিয়োগ করে।
প্রথম জীবনে খাত্তাবি এবং তার বাবা স্প্যানিয়ার্ডদের সাথে ঝামেলায় না গিয়ে তাদের সহায়তা নিয়ে নিজেদের অবস্থার উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন। তারা স্প্যানিশ মাইনিং কোম্পানীগুলোকে সাহায্য করেছিলেন এই আশায় যে, এতে রিফের জনগণও ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হবে এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছলতার মুখ দেখবে। তাদের সহায়তার প্রতিদান হিসেবে স্প্যানিশ প্রশাসন খাত্তাবির বাবাকে ক্রস অফ মিলিটারি মেরিট পুরস্কারে ভূষিত করে এবং তার জন্য মাসিক ৫০ পেসেতা ভাতা বরাদ্দ করে।
খাত্তাবির উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামপ্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই খাত্তাবি এবং তার বাবার কাছে ধীরে ধীরে স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসনের প্রকৃত দিকগুলো ফুটে উঠতে শুরু করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় খাত্তাবি তুরস্কের পক্ষে তার অবস্থান প্রকাশ করলে এবং স্প্যানিশ শাসনকে ইসলামবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করলে তার সকল সুযোগ-সুবিধা বাতিল করে উপনিবেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাকে আটক করা হয়। দীর্ঘ ১১ মাস আটক করে তার বাবার উপর চাপ সৃষ্টি করে তাকে স্প্যানিয়ার্ডদের সাথে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।বিশ্বযুদ্ধ শেষে খাত্তাবি আজদিরে নিজ শহরে ফিরে যান। ততদিনে স্প্যানিয়ার্ডদের দখলদারিত্ব তাদের শহর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। তারা স্থানীয় জনগণের উপর অত্যাধিক কর আরোপ করছিল, তাদের জায়গা-জমি দখল করে নিচ্ছিল এবং কিছু সুবিধাভোগী গোত্রপ্রধানকে ঘুষ দিয়ে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিচ্ছিল। খাত্তাবি, তার ভাই এবং বাবা নিজেদের অঞ্চলকে স্প্যানিয়ার্ডদের দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। স্বাধীন রিফ প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে তারা স্থানীয় গোত্রগুলোর সাথে যোগাযোগ করেন এবং সংঘবদ্ধ হতে শুরু করেন।১৯২০ সালে খাত্তাবির বাবার মৃত্যু হলে খাত্তাবি এলাকার নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। শত শত বছর ধরেই তাদের পরিবার ছিল রিফের সবচেয়ে সম্মানিত পরিবারগুলোর মধ্যে একটি। যুগ যুগ ধরে তারা পুরুষানুক্রমে কাজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সে হিসেবে এমনিতেই স্থানীয় সমাজে তাদের বিশাল প্রভাব ছিল। সেই সাথে যুক্ত হয়েছিল ঔপনিবেশিক ফরাসি এবং স্প্যানিয়ার্ডদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং খাত্তাবির অসামান্য মেধা, যোগ্য নেতৃত্ব, বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর এবং মানুষকে প্রভাবিত করার অকল্পনীয় দক্ষতা। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি স্প্যানিয়ার্ডদেরকে রিফ থেকে উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে রিফের বিচ্ছিন্ন গোত্রগুলোকে নিয়ে একটি সশস্ত্র গেরিলাদল তৈরি করে ফেলেন।
খাত্তাবির রিফ বিদ্রোহ এবং আনুয়াল যুদ্ধখাত্তাবির নেতৃত্বে শুরু হওয়া রিফ বিদ্রোহে প্রথম বড় ধরনের জয় আসে ১৯২১ সালের জুন মাসে। সে সময় মাওলায়ে আহমেদ আর-রাইসুনি নামে স্থানীয় এক গোত্রপ্রধানের দুর্ধর্ষ গেরিলাবাহিনীকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে স্প্যনিশ বাহিনী রিফের কাছাকাছি এসে উপস্থিত হয়। খাত্তাবি স্প্যানিশ বাহিনীর প্রধান জেনারেল ম্যানুয়েল ফার্নান্দেজ সিলভেস্ত্রেকে হুঁশিয়ার করে দেন, তার বাহিনী যদি নদী পার হয়ে রিফে প্রবেশ করে, তাহলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে। সিলভাস্ত্রে হেসেই খাত্তাবির হুমকি উড়িয়ে দেন।
জেনারেল সিলভাস্ত্র ছিলেন স্পেনের রাজা ত্রয়োদশ আলফঁনসোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যুদ্ধযাত্রা শুরুর আগে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি খাত্তাবির বাহিনীকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিবেন। এরপর খাত্তাবির বাড়িতে প্রবেশ করে সেখানে চা পান করবেন। কিন্তু তার সে অভিযান স্থায়ী হয়েছিল কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত। চা পান তো দূরের কথা, খাত্তাবির বাহিনীর গেরিলা আক্রমণে তার বিশাল বাহিনী যখন ধরাশায়ী, তখন পান করার মতো পানিও তাদের ছিল না। অনেককেই নিজেদের মূত্র পান করে তৃষ্ণা মেটাতে হয়েছিল।জুন মাসের শেষের দিকে সিলভাস্ত্রের বাহিনীর সাথে খাত্তাবির রিফিয়ান গেরিলাদের প্রথম সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রথম দিনেই গেরিলাদের আক্রমণে স্প্যানিয়ার্ডদের ৩০০ সৈন্যের মধ্যে ১৭৯ জন নিহত হয়। বাকিরা কোনো রকমে প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরে যায়। পরবর্তী দিনগুলোতে অনেকগুলো ছোট ছোট যুদ্ধ সংগঠিত হয়, কিন্তু অধিকাংশ যুদ্ধেই স্প্যানিয়ার্ডরা খাত্তাবির গেরিলা বাহিনীর কাছে পর্যুদস্ত হয়। সিলভাস্ত্রে সর্বশক্তি নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেন। খাত্তাবিকে পরাজিত করার জন্য তিনি ৬০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী জড়ো করেন। এর বিপরীতে খাত্তাবির সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র তিন থেকে চার হাজার।
১৯২১ সালের ২২ই জুলাই সংঘটিত হয় রিফ বিদ্রোহের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে স্মরণীয় যুদ্ধ, যা ব্যাটেল অফ আনুয়াল নামে পরিচিত। পাঁচ দিন বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের পর সেদিন ৩,০০০ রিফি গেরিলা একযোগে স্প্যানিশ বাহিনীর উপর চূড়ান্ত আক্রমণ করে। মাত্র একরাতের মধ্যে স্প্যানিশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। তাদের ১৬,০০০ থেকে ২২,০০০ এর মতো সৈন্য নিহত হয়। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় তারা পেছনে ফেলে যায় অন্তত ১৫টি কামান, ৪০০টি মেশিনগান, ২৫,০০০ রাইফেল, ২,০০০ ঘোড়া এবং অন্তত ৭০০ বন্দী। আর এই জয় অর্জিত হয় মাত্র ৮০০ রিফি গেরিলার প্রাণের বিনিময়ে!আনুয়াল যুদ্ধ ছিল যেকোনো ঔপনিবেশিক শক্তির জন্য এক বিশাল পরাজয়। জেনারেল সিলভাস্ত্রে নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মহত্যা করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। নিজেদের পরাজয়ের গ্লানি মুছে ফেলার জন্য স্প্যানিশ বাহিনী ফরাসি বাহিনীর সাথে মিলে মরক্কোতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। তারা ১৯১৯ সালের ভার্সেই চুক্তি ভঙ্গ করে রিফের জনগোষ্ঠীর উপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করতে শুরু করে। শেষপর্যন্ত ১৯২৬ সালের ২৬ মে প্রায় আড়াই লাখ ঔপনিবেশিক বাহিনীর বিশাল অভিযানের মুখে খাত্তাবি পরাজয় স্বীকার করে নিতে বাধ্য হন। তিনি ফরাসি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ফরাসিরা খাত্তাবিকে লা রিইউনিয়ন দ্বীপে নির্বাসন দেয়। ১৯৪৭ সালে সেখান থেকে পালিয়ে তিনি মিসরে গিয়ে আশ্রয় নেন। এরপর সেখানেই ১৯৬৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আনুয়াল যুদ্ধের এবং খাত্তাবির প্রভাবখাত্তাবির আত্মসমর্পণের পরপরই রিফ বিদ্রোহ স্তিমিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তার আগেই তিনি শুধু মরক্কো না, সমগ্র উত্তর আফ্রিকার শোষিত জনগণের মধ্যে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে গিয়েছিলেন। আনুয়াল যুদ্ধে খাত্তাবির বিজয়ের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ঐ যুদ্ধে অপমানজনক পরাজয় স্প্যানিশ সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ এবং হতাশার সৃষ্টি করে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯২৩ সালে মিগুয়েল প্রিমো দে রিভেরার সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, যা পরবর্তী ১৩ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তার দুঃশাসন স্পেনে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে আসে এবং পরবর্তীতে স্পেনকে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।
মোহাম্মদ বিন আব্দুল করিম আল-খাত্তাবি নিজে শেষপর্যন্ত ঔপনিবেশিক শক্তির বিশাল বাহিনী এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের কাছে পরাজিত হলেও তিনি দেখিয়ে গিয়েছিলেন কীভাবে গেরিলাযুদ্ধের মাধ্যমে হালকা অস্ত্রশস্ত্র দিয়েও বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করা যায়। তার গেরিলা যুদ্ধের অসামান্য সাফল্য এবং কৌশল যুগ যুগ ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিপ্লবী যোদ্ধাদেরকে অনুপ্রাণিত করে এসেছে।
কিউবার বিপ্লবী নেতা চে গুয়েভারাও খাত্তাবির গেরিলা কৌশল দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। গুয়েভারার সামরিক প্রশিক্ষক আলবার্তো বাইয়ো রিফ বিদ্রোহের সময় খাত্তাবির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তার কৌশলগুলোর সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি গুয়েভারাকে সেসব কৌশলের উপর প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। গুয়েভারা যখন ১৯৫৯ সালে মিসর সফরে গিয়েছিলেন, তখন তিনি খাত্তাবির সাথে সাক্ষাৎ করে তার লড়াইয়ের পেছনে খাত্তাবির অনুপ্রেরণার কথা স্বীকার করেছিলেন বলেও অনেক ইতিহাসবিদ দাবি করে থাকেন।
খাত্তাবির রণকৌশল অনুপ্রাণিত করেছিল ভিয়েতনামের হো চি মিন এবং চীনের মাও সে তুংকেও। ১৯৭১ সালে ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী সংগঠন ফাতাহ’র কয়েকজন নেতা যখন চীনের বিপ্লবী নেতা মাও সে তুংয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন, তখন মাও সে তুং তাদেরকে বলেছিলেন, “আপনারা আমার কাছে এসেছেন মানুষের স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে আমার কথা শোনার জন্য, কিন্তু আপনাদের নিজেদেরই সাম্প্রতিক ইতিহাসে আব্দুল করিম নামে এমন একজন নেতা আছেন, যিনি হচ্ছেন অনুপ্রেরণার সবচেয়ে বড় উৎসগুলোর মধ্যে একটি। তার সংগ্রামের ইতিহাস থেকেই আমি শিখেছি জনগণের স্বাধীনতা যুদ্ধ আসলে কী!”
মাও সে তুং কথাটা ১৯৭১ সালে বললেও এটা এখনও সত্য। আমরা দেশ-বিদেশের অনেক সফল সামরিক নেতার, বিপ্লবী নেতার নামই জানি, তাদের আন্দোলনের ইতিহাস পড়ে মুগ্ধ হই। কিন্তু মাত্র এক রাতের মধ্যে স্পেনের বিশাল বাহিনীকে ধ্বংস করে দেওয়া এই “রিফের সিংহ” সম্পর্কে আমরা খুব কমই আলোচনা করি।সূত্রঃ https://roar.media/bangla/

আসহাবে কাহাফ: ঘুমন্ত সেই গুহাবাসীদের কাহিনী ।

আসহাবে কাহাফ: ঘুমন্ত সেই গুহাবাসীদের কাহিনী । জনাকয়েক পলাতক যুবক, একটি গুহা আর তিন শতাব্দীর নিদ্রা- আসহাবে কাহাফের কাহিনী কেবল মুসলিমদের কাছেই প্রবল জনপ্রিয় একটি ঘটনা নয়, বরং খ্রিস্টানদের কাছেও ছিল খুব জনপ্রিয় ও অলৌকিক ঘটনা। কুরআনে বর্ণিত এই কাহিনীর সাথে সাথে সেই সিরিয়ান উপাখ্যান এবং যে নগরীতে এই ঘটনা ঘটেছিল- সবই আমরা এ লেখায় আলোচনা করার চেষ্টা করব।শুরুতেই বলে রাখা দরকার, এই ঘটনাটি কুরআনে বর্ণিত বিধায়, মুসলিমদের বিশ্বাস ওতপ্রোতভাবে এর সাথে জড়িত। অনেক পাঠকই অভিযোগ করে থাকেন বিধায়, কুরআনের আয়াত বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করার সময় কেবল ইসলামিক সূত্র ব্যবহার করা হবে, এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে তাফসির ইবনে কাসিরের বঙ্গানুবাদের চতুর্দশ খণ্ড। তবে কুরআনে যে ঘটনার বর্ণনা করা হয়েছে, সেটি কুরআন অবতরণের কয়েক শতাব্দী আগের ঘটনা এবং সেটার বিস্তারিত বিবরণও দেওয়া হবে, সেজন্য আমরা ব্যবহার করব ৫ম শতকের স্থানীয় সিরীয় উপকথা, ঠিক যেমনটা লিপিবদ্ধ ছিল। কাহিনীগুলোর পার্থক্য তখনই প্রতীয়মান হবে। তাহলে প্রথমে শুরু করা যাক কুরআনে বলা ঘটনাটি দিয়ে।
কুরআনের ১৮ নম্বর সুরা ‘সুরা কাহাফ’ মক্কাতে অবতীর্ণ হয়; অর্থাৎ তখনও নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) ও তাঁর অনুসারীরা মদিনায় চলে যাননি। কিন্তু মক্কাতে তখন তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে দেখে কুরাইশরা খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ে। যেহেতু নবী (সা) এমন ধর্ম প্রচার করে চলেছিলেন, যেখানে আগের নবীদের সাথে ইহুদি-খ্রিস্টানদের নবীরা মিলে যায়, তাই কুরাইশ নেতারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তাঁরা ইহুদি র‍্যাবাইদের (আলেম) সাথে পরামর্শ করবে। নাযার ইবনে হারিস এবং উকবা ইবনে মুয়িত নামের দুজনকে তাঁরা মদিনার ইহুদি র‍্যাবাইদের কাছে প্রেরণ করে এই বলে যে, তাঁরা যেন মুহাম্মাদ (সা) এর ব্যাপারে তাদের মতামত জানায়।
তারা মদিনা পৌঁছালে ইহুদি আলেমরা তাদের কথা শুনে মীমাংসা করার জন্য একটি উপায় বাতলে দেন,“দেখো, আমরা তোমাদের মীমাংসা করার জন্য একটি কথা বলছি। তোমরা ফিরে গিয়ে তাঁকে তিনটি প্রশ্ন করবে। তিনি যদি উত্তর দিতে পারেন, তবে তিনি যে সত্য নবী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর না দিতে পারলে তিনি মিথ্যেবাদী। প্রথম প্রশ্ন: পূর্বযুগে যে যুবকেরা বেরিয়ে গিয়েছিলেন তাদের ঘটনা বর্ণনা করুন তো? এ এক বিস্ময়কর ঘটনা…”এরকম আরো দুটি প্রশ্ন তাঁরা করতে বলেন। বাকি ঘটনা এখানে আমরা লিখছি না, তবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হিসেবেই অবতীর্ণ হয় সুরা কাহাফ (‘গুহা’)।


‘আসহাবে কাহাফ’ অর্থ ‘গুহাবাসী’। এ ঘটনা ঘটেছিল প্রাচীন গ্রিক শহর আনাতোলিয়া বা এফিসাসে (Ephesus)। কাছেই ছিল গ্রিক দেবী আরটেমিসের বিখ্যাত মন্দির। বর্তমানে ভৌগোলিকভাবে শহরটি তুরস্কে পড়েছে। তবে কুরআনে অবশ্য নাম-ঠিকানা উল্লেখ করা নেই।প্রথমে কুরআনের ভাষ্যতেই কাহিনী শুনে নেয়া যাক।
তুমি কি ধারণা করো যে, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর ছিল? যখন যুবকেরা পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করে তখন দোয়া করে: “হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে নিজের কাছ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজ সঠিকভাবে পূর্ণ করুন।” তখন আমি কয়েক বছরের জন্য গুহায় তাদের ঘুমন্ত অবস্থায় রাখলাম। অতঃপর আমি তাদেরকে পুনরুত্থিত করি, একথা জানার জন্যে যে, দুই দলের মধ্যে কোন দল তাদের অবস্থানকাল সম্পর্কে অধিক নির্ণয় করতে পারে। আপনার কাছে তাদের ইতিবৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। তারা ছিল কয়েকজন যুবক। তারা তাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমি তাদের মন দৃঢ় করেছিলাম, যখন তারা উঠে দাঁড়িয়েছিল। অতঃপর তারা বলল: “আমাদের পালনকর্তা আসমান ও যমীনের পালনকর্তা, আমরা কখনও তার পরিবর্তে অন্য কোনো উপাস্যকে আহবান করব না। যদি করি, তবে তা অত্যন্ত গর্হিত কাজ হবে। এরা আমাদেরই স্ব-জাতি, এরা তাঁর পরিবর্তে অনেক উপাস্য গ্রহণ করেছে। তারা এদের সম্পর্কে প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থিত করে না কেন? যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা উদ্ভাবন করে, তার চাইতে অধিক পাপী আর কে?” তোমরা যখন তাদের থেকে পৃথক হলে এবং তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের এবাদত করে তাদের থেকে, তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ কর। তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্যে দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজকর্মকে ফলপ্রসু করার ব্যবস্থা করবেন। তুমি সূর্যকে দেখবে, যখন উদিত হয়, তাদের গুহা থেকে পাশ কেটে ডান দিকে চলে যায় এবং যখন অস্ত যায়, তাদের থেকে পাশ কেটে বাম দিকে চলে যায়, অথচ তারা গুহার প্রশস্ত চত্বরে অবস্থিত। এটা আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্যতম… তুমি মনে করবে তারা জাগ্রত, অথচ তারা নিদ্রিত। আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাই ডান দিকে ও বাম দিকে। তাদের কুকুর ছিল সামনের পা দুটি গুহাদ্বারে প্রসারিত করে। যদি তুমি উঁকি দিয়ে তাদেরকে দেখতে, তবে পেছন ফিরে পলায়ন করতে এবং তাদের ভয়ে আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়তে। আমি এমনিভাবে তাদেরকে জাগ্রত করলাম, যাতে তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের একজন বলল: “তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ?” তাদের কেউ বলল: “একদিন অথবা একদিনের কিছু অংশ অবস্থান করছি।” কেউ কেউ বলল: “তোমাদের পালনকর্তাই ভালো জানেন তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ। এখন তোমাদের একজনকে তোমাদের এই মুদ্রাসহ শহরে প্রেরণ কর; সে যেন দেখে কোন খাদ্য পবিত্র। অতঃপর তা থেকে যেন কিছু খাদ্য নিয়ে আসে তোমাদের জন্য; সে যেন নম্রতা সহকারে যায় ও কিছুতেই যেন তোমাদের খবর কাউকে না জানায়। তারা যদি তোমাদের খবর জানতে পারে, তবে পাথর মেরে তোমাদেরকে হত্যা করবে, অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নেবে। তাহলে তোমরা কখনই সাফল্য লাভ করবে না।” এমনিভাবে আমি তাদের খবর প্রকাশ করে দিলাম, যাতে তারা জ্ঞাত হয় যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং কেয়ামতে কোনো সন্দেহ নেই। যখন তারা নিজেদের কর্তব্য বিষয়ে পরস্পর বিতর্ক করছিল, তখন তারা বলল: “তাদের উপর সৌধ নির্মাণ কর।” তাদের পালনকর্তা তাদের বিষয়ে ভালো জানেন। তাদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হল, তারা বলল: “আমরা অবশ্যই তাদের স্থানে উপাসনালয় নির্মাণ করব।” অজ্ঞাত বিষয়ে অনুমানের উপর ভিত্তি করে এখন তারা বলবে: তারা ছিল তিন জন, তাদের চতুর্থটি তাদের কুকুর। একথাও বলবে, তারা পাঁচ জন। তাদের ছষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর। আরও বলবে, তারা ছিল সাত জন। তাদের অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর। বলুন: আমার পালনকর্তা তাদের সংখ্যা ভালো জানেন। তাদের খবর অল্প লোকই জানে। সাধারণ আলোচনা ছাড়া তুমি তাদের সম্পর্কে বিতর্ক করবে না এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে তাদের কাউকে জিজ্ঞাসাবাদও করবে না… তাদের উপর তাদের গুহায় তিনশ বছর, অতিরিক্ত আরও নয় বছর অতিবাহিত হয়েছে। বল: তারা কতকাল অবস্থান করেছে, তা আল্লাহই ভালো জানেন। নভোমণ্ডল ও ভুমণ্ডলের অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই কাছে রয়েছে।” [আল কুরআন ১৮:৯-২৬]
এটুকুই কুরআন কাহিনীটি সম্পর্কে জানায়। এ বিষয়ে তাফসিরে রয়েছে অনেক অনেক বক্তব্য। যেমন- ইবনে কাসিরে একটি মতবাদ লিখিত আছে যে, উপরে আয়াতে লিখা ‘রাকীম’ বলতে ফলকে লেখা বোঝায়, গুহার বাইরে কি কোনো ফলকে করে লিখে দেওয়া হয়েছিল? আমরা কিছুক্ষণ পরেই সেটা জানতে পারব। ইবনে কাসিরে এ-ও লিখা আছে যে, যে অত্যাচারী শাসকের তাড়ায় যুবকেরা পালিয়ে যায়, তার নাম ছিল দাকইয়ানুস। তাছাড়া, যে কুকুরটি তাদের সাথে ছিল, সেটি রাজবাবুর্চির কুকুর ছিল, কুকুরের নাম কিতমির। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) নিশ্চিত করে বলেন যে, গুহাবাসীর সংখ্যা সাতজনই ছিল। কোনো কোনো মত অনুযায়ী, তাদের নাম ছিল মুকসালমিনা, তামলিখা, মারতুনিস, সানুনিস, সারিনুনিস, যুনিওয়াস, কাস্তিতিউনিস। নামগুলো দেখে বোঝা যায়, রোমান নামের আরবিকরণ করা হয়েছে।এবার চলুন আমরা শুনে আসি সেই সিরিয়ার উপকথাটি। পঞ্চম শতকের সিরিয়ান বিশপ জ্যাকব অফ স্যারাগ এর কাছ থেকে আমরা এই ঘটনার বর্ণনা পাই, তিনি আবার সেটা সংগ্রহ করেছেন আরো আগের গ্রিক কোনো সূত্র থেকে, সেই সূত্র কালের বিবর্তনে আজ হারিয়ে গিয়েছে। এছাড়াও আরো কয়েক জায়গায় আমরা এর দেখা পাই।
এ কাহিনী অনুযায়ী, আড়াইশ সালের দিকে রোমান সম্রাট ডিসিয়াস এর শাসনকালে (২৪৯-২৫১) সাতজন তরুণ ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান যুবককে ধর্মত্যাগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পৌত্তলিক রোমান সাম্রাজ্যে তাদের জোর করা হয় পুরনো দেবদেবীদের বিশ্বাসে ফিরে যেতে। তাদের সময় দেওয়া হয় পুরনো বিশ্বাসে ফেরত আসতে, কিন্তু তাঁরা তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাদের সকল সম্পদ গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেন। এরপর তাঁরা পালিয়ে যান অক্লন পাহাড়ের এক গুহায়। সেখানে প্রার্থনা শেষে তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েন। বলা আছে, গুহার খবর পাবার পর সম্রাট তাদের সেই গুহা সিলগালা করে দেন, যেন তাঁরা ক্ষুধায় মারা যান।ডিসিয়াস মারা যান ২৫১ সালে। পৌত্তলিক রোমান সাম্রাজ্যের অত্যাচারিত খ্রিস্টানদের ধর্ম এক সময় রাজ্যের প্রধান ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তবে সে অনেক অনেক বছর পরের কাহিনী। কাহিনীর একটি বর্ণনা মোতাবেক, সম্রাট দ্বিতীয় থিওডোসিয়াস (৪০৮-৪৫০) এর আমলে, গুহার সিলগালা ধ্বংস করা হয়। যিনি খুলেছিলেন, তিনি ভাবছিলেন ওটাকে গোয়ালঘর বানাবেন, তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি ভেতরে সাত জন যুবক ঘুমিয়ে। যুবকেরা ঘুম ভেঙে উঠলেন, তাঁরা ভাবলেন এক দিন পুরো ঘুমিয়ে উঠেছেন। তাদের একজনকে বাজারে পাঠানো হলো, সাবধানে বাজার করতে বলা হলো যেন কেউ চিনে না ফেলে তাদের, চিনে ফেললে অত্যাচারী রাজার পৌত্তলিক অনুসারীরা তাদের গ্রেফতার করবেন। কিন্ত শহরে গিয়ে তো যুবক ম্যাল্কাস তো অবাক! আশপাশে ক্রুশ লাগানো দালানকোঠা, লোকে প্রকাশ্যেই যীশুর নাম করছে! আবার দোকানি তাঁর মুদ্রাও নিচ্ছে না, এটা নাকি অনেক পুরনো ডিসিয়াসের আমলের মুদ্রা।
বিশপ তাদের কাছ থেকে ঘটনা শুনলেন। ধর্মপ্রাণ সম্রাট নিজে এসে তাদের সাথে কথা বললেন। সম্রাট তাদের জন্য অনেক কিছু করতে চাইলেন, কিন্তু তাঁরা না করে দিয়ে সেই গুহায় গিয়েই ঘুমালেন এবং এক সময় মারা গেলেন। অর্থোডক্স খ্রিস্টান চার্চ এই সাত মহাপ্রাণকে বছরে দুদিন স্মরণ করে ভোজ করবার রীতি করে- আগস্ট ৪ এবং অক্টোবর ২২ তারিখে।

গুহাটির আরেকটি ছবি; source:Wikimedia Commons


কুরআনে যে এফিসাস শহরের এই ঘটনাই বলা হচ্ছিল সে ব্যাপারে স্কলারগণ একমত। তবে ট্রাডিশনের জায়গায় জায়গায় রয়েছে কিছু পার্থক্য, কিন্তু অধিকাংশই মিলে যায়। দুটো ঘটনাই নিশ্চিত করে যে, একজন অত্যাচারী শাসক ছিলেন। সিরিয়ার উপাখ্যানে তো নামই বলে দেওয়া আছে। এও বলা আছে, ডিসিয়াসের শাস্তি এত ভয়ংকর ছিল যে, বন্ধু বন্ধুকে ভুলে যেত, পিতা ছেলেকে এবং ছেলে পিতাকে ভুলে যেত!
সিরিয়ান কাহিনীতে বলা আছে, গুহার বাইরে সম্রাট সিলগালা করার পাশাপাশি ফলকে লিখেও দিয়েছিলেন এই বিপথগামীদের কথা। ইবনে আব্বাস (রা) এই মতবাদ সমর্থন করেন।তবে কুরআনে বলা হয়েছে তাদের ঘুমন্ত থাকবার সময় ৩০০ বছর, সাধারণ সৌর হিসেবে। তবে চান্দ্র হিসেবে অতিরিক্ত ৯ বছর ধরলে, সেটি ৩০৯। তৎকালীন চান্দ্র ক্যালেন্ডার ব্যবহারকারীগণ প্রতি একশ সৌর বছরের তিন বছর যোগ করে নিত। কিন্তু সিরিয়ার কাহিনীতে নিশ্চিত করে সময় বলা নেই। কোনো কোনো মতে সেটি ১৮৪ বছর, কোনো কোনো মতে দু’শো বছরের বেশি, কেউ কেউ বলেন ২০৮ বছর। তবে তাঁরা যে যুবক ছিলেন, সে ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই কোথাও। তাঁরা মনে করেছিলেন, তাঁরা মাত্র একদিনের মতো ঘুমিয়েছেন- এটাও সিরীয় কাহিনীতে বলা আছে। যে যুবক খাবার কিনতে গিয়েছিলেন, তাঁর নাম ম্যাল্কাস এবং তিনি একটি রুপার মুদ্রা নিয়ে গিয়েছিলেন।
তাদের নামগুলো ছিল Maximian, Malchus, Marcian, John, Denis, Serapion ও Constantine। ভিন্ন উচ্চারণ ও বানানে তাদের নামগুলো Maximilian, Jamblichus, Martin, John, Dionysius, Antonius এবং Constantine।
এফিসাস শহরের বাইরের সেই গুহার এলাকায় ১৯২৭-১৯৩০ সালের দিকে প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান চালানো হয়, সেখানে ২,০০০ টেরাকোটা ল্যাম্প পাওয়া যায়, যেগুলো চার্চের জন্য উৎসর্গ করা ছিল। কার্বন ডেটিংয়ে সেগুলো চতুর্থ বা পঞ্চম শতকের বলে নির্ধারিত হয়। এর মানে, সেখানে চার্চ বানিয়েছিল স্থানীয়রা। ল্যাম্পগুলোর গায়ে ছিল ক্রুশের ছবি, কোনো কোনোটার গায়ে ছিল আদম-হাওয়া থেকে শুরু করে তাওরাতের মহারথীদের ছবি- যেমন ইব্রাহিম (আ), ইসহাক (আ) এবং সিংহের গুহায় দানিয়েল (আ)। এছাড়াও সামাজিক ছবিও ছিল, যেমন জেলেদের কাজ বা সবাই মিলে কোনো অনুষ্ঠান উপভোগের ছবি। কিন্তু এগুলোর পাশে হারকিউলিস ও সিংহ, জিউস ও আফ্রোদিতি, মন্দিরের ছবি ও দেবতা আত্তিসের মাথার ছবিও ছিল। অর্থাৎ এগুলোর নির্মাতারা নব্য খ্রিস্টান হলেও আদি রোমান সংস্কৃতি ফেলে আসেনি। ঐতিহাসিক বিশ্লেষকগণ অবশ্য এ ঘটনার কোনো নিশ্চয়তা দেন না এবং রিপ ভ্যান উইংকেলের শত বছরের ঘুমের সাথে সাদৃশ্য দেখিয়ে থাকেন। উল্লেখ্য, আসহাবে কাহাফ নিয়ে ইরানে জনপ্রিয় একটি টিভি সিরিজ ‘দ্য মেন অফ অ্যাঞ্জেলোস’ নির্মাণ করা হয়।তুরস্কের এই শহরটির বাইরে গেলে গুহাটি দেখতে পাওয়া যায়। তবে জর্ডানের আম্মানের কাছেও ১৯৬৩ সালে বের করা আরেকটি জায়গাকে আসহাবে কাহাফের জায়গা বলে দাবি করা হয়। এ জায়গাকে আল রাকীম ডাকা হয়। তবে স্থানীয় বর্ণনা ছাড়া আর কোনো ঐতিহাসিক সূত্র এটির ব্যাপারে পাওয়া যায় না, যার সাথে কোনোভাবে সেভেন স্লিপার্স (খ্রিস্টানরা এ নামেই ডাকে এ ঘটনাকে) এর ঘটনার মিল করা যায়। দাবি করা হয়, এখানে নাকি সাতজনের কঙ্কাল এবং একটি কুকুরের কঙ্কালও পাওয়া গেছে, আর সাথে ছিল কিছু তামার মুদ্রা। তবে সেগুলোর কার্বন ডেটিং করে সময়ের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। সেই গুহায় চারজনের কবর করবার জায়গা পাওয়া গেছে, যার দ্বারা বোঝা যায়, ওটা সাতজনের কিছু ছিল না।

ইরানের সেই টিভি সিরিজ, যেটি বাংলাতে ডাবিং করে প্রচার করা হয়; source: YouTube


এসব ছাড়াও অনেক মুসলিম দেশের অনেক স্থানকেই আসহাবে কাহাফের জায়গা বলে দাবি করা হয়েছে- যেমন, তুরস্কের আম্মুরিয়াগ হায হামজা, টারসাস, মিসরের কায়রোতে, এমনকি উত্তর আফ্রিকা কিংবা চীনেও! মূলত পেছনের কাহিনী না জেনে হরহামেশা ধর্মীয় রেলিক পাবার দাবিদাওয়া করবার কারণেই পৃথিবীর নানা প্রান্তে এরকম দেখা যায়। অথচ কুরআনের বর্ণনা মতেই জানা যায় যে, এই ঘটনাটি আরবদের কাছে অজানা হলেও বিদেশি লোকদের অজানা ছিল না, অন্তত যে এফিসাসে কাহিনী হয়েছিল, সেখানে যে সেটি খুবই জনপ্রিয় ছিল, তা তো বলবার অপেক্ষা রাখে না।সূত্রঃ https://roar.media/bangla/main/history/cave-of-the-seven-sleepers-ashabe-kahaf/

দেশেবিদেশে ফসল বাঁচাতে কাকতাড়ুয়া!

জেনে নেই কাকতাড়ুয়া ইতিহাস ।কাকতাড়ুয়া। পশুপাখির জন্য আদতে ভয় পাওয়ার মতো একটা জিনিস হলেও, মানুষের জন্য এটা একটা মজার বিষয় বটে। আমরা প্রায়ই কাউকে নিয়ে মজা করে বলে ফেলি, “কাকতাড়ুয়ার মতো লাগছে!” কারণ কাকতাড়ুয়া শুনলেই আমাদের মনে পড়ে, কাঠের গায়ে জামা পরিয়ে, মাথায় উল্টো করে হাঁড়ি বসানো একটা হাস্যকর কাঠামো। কারণ আমাদের গ্রামবাংলায় এরকম চেহারার কাকতাড়ুয়া দেখতেই আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু শুধু গ্রামবাংলা নয়, সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এত রকমের কাকতাড়ুয়া আছে, এত বৈচিত্র্য তাদের চেহারায়, জানলে অবাক হতে হয়!
কাকতাড়ুয়া নাম শুনে মনে হতে পারে, কাক তাড়ানোর সঙ্গে এর একটা সম্পর্ক আছে। তবে শুধু কাক তাড়ানোই নয়, যেসব পশুপাখি ফসলের ক্ষতি করে, তাদের ভয় দেখানোর জন্যই চাষজমিতে কাকতাড়ুয়া বসার প্রচলন। তাই গ্রামের কৃষিনির্ভর জীবনে কাকতাড়ুয়া মোটেই মজার জিনিস নয়, বরং খুবই প্রয়োজনীয় একটা জিনিস।ইতিহাস বলছে, ৩১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশর সভ্যতায় প্রথম কাকতাড়ুয়ার ব্যবহার শুরু হয়। নীলনদের অববাহিকার উর্বর পলিমাটিতে মিশরীয়রা চাষাবাদ করত। গম থেকে শুরু করে নানা রকমের শস্য খুব পরিশ্রম করে ফলাত তারা। কিন্তু পাখির উৎপাতে সে সব ফসল রক্ষা করায় দায় হয়ে পড়েছিল মিশরীয়দের। ফসল রক্ষার জন্যে ফসলের উপরে জাল বিছিয়ে, পাখি ধরত তারা। ফসলও বাঁচত, পাখির মাংসও খাওয়া হতো। কিন্তু এই ভাবে পশুদের আটকানো যাচ্ছিল না। তখনই পাথর দিয়ে ভয়ালদর্শন কিছু কাঠামো সাজিয়ে খেতে দাঁড় করিয়ে রাখা শুরু হয়। সভ্যতার প্রথম কাকতাড়ুয়া সম্ভবত সেটাই ছিল।এর পরে ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক কৃষকেরা তাঁদের ফসল রক্ষার জন্য কাঠের তৈরি কাকতাড়ুয়া ফসলের মাঠে স্থাপন করতে শুরু করে। ইতিহাস বলছে, এই কাকতাড়ুয়াগুলি অনেকটা দেবতা ডায়োনিসাসের ছেলে প্রিয়েপাস দেব এবং জিউসের কন্যা আফ্রোদিতি দেবীর আদলে তৈরি হতো। গ্রিকদের বিশ্বাস ছিল, ফসলের খেতে এই সব দেবতার প্রতিমূর্তি রাখলে পশুপাখিরা ফসলের ক্ষতি করতে পারে না। এবং দেবতাদের আশীর্বাদে প্রচুর পরিমাণে ফসলও উৎপাদিত হবে। গ্রিকরা এই কাঠের কাকতাড়ুয়াগুলোকে লাল রং করে দিত বলে জানা যায়। তাদের একটি হাতে থাকত লাঠি বা মুগুর জাতীয় কোনও অস্ত্র।রোমান সভ্যতার কাকতাড়ুয়ায় আবার ছাপ পড়ে যায় গ্রিকদের অনুকরণে। কারণ রোমান সৈন্যরা যখন ইউরোপ অভিযানে বেরিয়েছিল, তখন তারা প্রিয়েপাসের আদলে তৈরি কাকতাড়ুয়া দেখতে পায় বিভিন্ন ফসলের খেতে। পরবর্তী কালে রোমের কৃষকদের ফসলের মাঠেও এই ধরনেরই কাকতাড়ুয়া স্থাপন করা হয়।
কিন্তু মধ্যযুগে, ব্রিটেন ও ইউরোপে আবার কোনও কাঠামো নয়, ছোট ছোট বাচ্চাদের কাকতাড়ুয়া হিসেবে ব্যবহার করা হতো! তাদের কাজ ছিল লাঠি দিয়ে টিনের বাক্স বাজিয়ে, ফসলের মাঠগুলোয় ছুটে বেড়ানো। যাতে সেই শব্দ শুনে পাখিরা পাকা ফসল খেতে আসতে না পারে। কিন্তু ১৩৪৭ থেকে ১৩৫১ সালে সারা ইউরোপ জুড়ে ভয়াবহ প্লেগ রোগের মহামারী দেখা দেয়। বহু মানুষ মারা যান। মারা যায় বাচ্চারাও। ফসলের মাঠে পাখি তাড়ানোর জন্য আর পাওয়া যাচ্ছিল না কোনও বাচ্চাকে। তখন কৃষকেরাই পুরনো কাপড় ও খড় দিয়ে বাচ্চা ছেলের আদলে কাকতাড়ুয়া তৈরি করতে শুরু করে। সেগুলোকে খেতের মাঝে উঁচু লাঠির মাথায় দাঁড় করিয়ে পাখি তাড়ানোর ব্যবস্থা করে। এতে আশাতীত সাফল্য পাওয়া যায়। ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কাকতাড়ুয়া।এশিয়ার মধ্যে প্রথম কাকতাড়ুয়ার প্রচলন জাপানে শুরু হয় বলে জানা যায়। সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল ‘কাকাসি’ নামের কাকতাড়ুয়া। কাকাসি কাকতাড়ুয়াকে জাপানি মানুষের আদলে তৈরি করা হতো। সেই কাকতাড়ুয়ার গায়ে থাকত বর্ষাতি, মাথায় থাকত টুপি আর হাতে থাকত তির-ধনুক।
আমেরিকার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে আবার কাকতাড়ুয়া এসেছে অনেক পরে। শেতাঙ্গদের দখলের আগে বর্তমানের ভার্জিনিয়া এবং ক্যারোলিনার বেশ কিছু অঞ্চলে শস্যখেতের আশপাশে কোনও পশুপাখি দেখলে নেটিভ আমেরিকানরা জোরে জোরে আওয়াজ করে তাদের তাড়াত। কেউ কেউ পাখি তাড়ানোর জন্য শস্য বীজের সঙ্গে এক ধরনের ওষধি গাছের রস মিশিয়ে ছড়িয়ে দিতেন ফসলের খেতের আশপাশে। পাখি আসত না তাতে। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে আবার আমেরিকান শিশুদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত, কে কত ভয়ঙ্কর কাকতাড়ুয়া সাজতে পারে!পরবর্তী কালে আমেরিকায় অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে ফসলের খেতে ব্যাপক পরিমাণে কাকতাড়ুয়ার ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, সে দেশে আচমকাই প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার শুরু হয় কীটনাশকের। এর ফলে ফসলে পোকামাকড়ের উপদ্রব কমে যায় এবং পশুপাখিরাও কীটনাশক থেকে দূরে থাকে। কিন্তু ১৯৬০ সালের পরে মার্কিন কৃষকেরা বুঝতে পারে, এত কীটনাশক পাখিদের জন্য যেমন ক্ষতি করে, তেমনই মানুষেরও ক্ষতি করে। তখন ধীরে ধীরে কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে কাকতাড়ুয়ার প্রচলন শুরু হয় ফের।
বাংলাদেশে কাকতাড়ুয়াঃআমাদের গ্রামবাংলায় যে সব কাকতাড়ুয়া চোখে পড়ে, সেগুলোর আদল প্রায় একই রকম। কালো মাটির হাঁড়ির ওপর সাদা চুন দিয়ে মুখ-চোখ এবং বড়-বড় দাঁত এঁকে, লম্বা লাঠির ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়। কখনও ছেঁড়া জামা আর খাটো লুঙ্গিও পরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে দূর থেকে কিম্ভূতকিমাকার এক জন রাক্ষস পাহারাদার বলে মনে হয়। ব্রিটিশ কাকতাড়ুয়া
ইংল্যান্ডের এক বিশেষ অঞ্চলে নৃত্যরত কাকতাড়ুয়া চোখে পড়ে। এগুলির পোশাক-আশাক এবং দাঁড়ানোর ভঙ্গি এমনই, যাতে দূর থেকে মনে হয়, একটি মেয়ে নাচছে। কখনও কখনও এই কাকতাড়ুয়াগুলির হাতে ছেঁড়া ছাতাও ধরিয়ে দেওয়া হয়।পর্তুগিজ কাকতাড়ুয়া
এপ্রন পড়া পর্তুগিজ কাকতাড়ুয়া দেখতে অনেকটা মেয়েদের মতো হলেও, এদের মাথায় থাকে ঝলমলে বড় টুপি।
স্প্যানিশ কাকতাড়ুয়া
ঈগলের হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য স্পেনের কাকতাড়ুয়াগুলিকে ভয়ঙ্কর মূর্তির মতো করে তৈরি করা হয়। ছেঁড়া প্যান্ট, শার্ট, টুপি, জুতো ইত্যাদি পরিয়ে এমন ভাবে মাঠের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, যে শুধু ঈগল নয়, যে কেউই ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে। কাকতাড়ুয়াকে ভূতের সঙ্গেও তুলনা করা হয় সেখানে।ফরাসি কাকতাড়ুয়া
ফ্রান্সে আবার ঠিক উল্টো। এ দেশে কেউ কাকতাড়ুয়াকে ভূত বলে তো মনে করেই না, বরং এরা কাকতাড়ুয়াকে সাজিয়ে তোলে একেবারে নিজেদের আদলে। যতটা সম্ভব নিখুঁত ভাবে কোর্ট-প্যান্ট-টাই পরিয়ে দেওয়া হয়। কখনও কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে, সাইকেলের ওপর এমন ভাবে খেতের বেড়ার পাশে বসানো হয়, যাতে পশুপাখি তো বটেই, মানুষও জ্যান্ত পাহারাদার বলে ভুল করে।পোলিশ কাকতাড়ুয়া
পোল্যান্ডের চাষিরা অবশ্য খড়, শুকনো পাতা ইত্যাদি দিয়ে তৈরি মোটাসোটা কাকতাড়ুয়া পছন্দ করে। কখনও-কখনও এদের চোখে চশমাও পরিয়ে দেওয়া হয়।কাকতাড়ুয়া উৎসবও হয় নানা দেশে
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাকতাড়ুয়াদের নিয়ে আয়োজিত হয় কাকতাড়ুয়া উৎসব। স্কটল্যান্ডে প্রথম কাকতাড়ুয়া উৎসব পালিত হয়েছিল ২০০৪ সালে।ইংল্যান্ডে প্রতি বছর মে ডে-তে ‘আর্চফন্ট স্কেয়ারক্রো ফেস্টিভ্যাল’ আয়োজিত হয়। ব্রিটেনের বিভিন্ন অঞ্চলে বছরের বিভিন্ন সময়ে কাকতাড়ুয়া উৎসব পালন করা হয়। এর মধ্যে ল্যাঙ্কাশায়ারের ‘ওয়েরি ফেস্টিভ্যাল’ উল্লেখযোগ্য। কাকতাড়ুয়া উৎসব উপলক্ষে পৃথিবীর বৃহত্তম জমায়েত হয় ইংল্যান্ডের স্টেফোর্ডশায়ারে। ফিলিপাইনের ইসাবেলা প্রদেশে যে কাকাতাড়ুয়া উৎসব পালিত হয়, স্থানীয় ভাষায় সেই উৎসবের নাম ‘বামবান্তি ফেস্টিভ্যাল’।কাকতাড়ুয়া রোবোট
আজকাল অবশ্য কাক তো বটেই, অন্য পাখিরাও কাকতাড়ুয়াকে আর তেমন ভয় পায় না। বরং তাদের মাথার ওপর বসেই দিব্যি কিচিরমিচির করে। এই দেখে জাপানিরা কাকতাড়ুয়ার কাজে লাগিয়েছে রোবোটকে। জ্যান্ত মানুষের মতো কাকতাড়ুয়ারা ‍দিনরাত লাঠি হাতে সমস্ত মাঠ ঘুরে-ঘুরে ফসল পাধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।হারা দেয়। আর এভাবেই, প্রযুক্তির গ্রাসে গ্রাম্য কাকতাড়ুয়ার সেই বৈশিষ্ট্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

ফেসবুক হ্যাকড হলে বুঝবেন যেভাবে ।হ্যাকার থেকে ফেসবুক একাউন্ট নিরাপদ রাখার যত উপায়ঃ


দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা ফেসবুক আইডি হ্যাক করে অঘটন ঘটানোর অপচেষ্টা চলছে বারবার। এতে বিপাকে পড়ছেন যাঁর ফেসবুক আইডি হ্যাক করা হয় তিনিও। ফলে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে। কেউ যদি আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে আপনার ক্ষতি করতে চায়, তাহলে আপনার অ্যাকাউন্টে আপনি পাসওয়ার্ড দিয়েও ঢুকতে পারবেন না। কিন্তু আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে ই-মেইল বা পোস্ট যেতে থাকবে। তখন আপনি বুঝবেন আপনি আপনার অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন।আবার এমনও হতে পারে, আপনি আপনার অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারছেন কিন্তু আপনার নামে আপত্তিকর মেইল বা পোস্ট দেয়া হচ্ছে; সে ক্ষেত্রে আপনি ধরে নিতে পারেন আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে।

#ফেসবুক একাউন্ট নিরাপদ রাখার যত উপায়ঃ

কখনো কি আপনার ফেসবুক একাউন্ট হ্যাকিংয়ের চেষ্টা হয়েছে? অথবা অপরিচিত কোন এলাকা বা কম্পিউটার থেকে লগইন হয়েছে, যা আপনি মনে করতে পারছেন না? আপনার একাউন্ট থেকে আপনার অজান্তেই কারো কাছে বার্তা চলে যাচ্ছে?
এরকম হলে আপনার একাউন্টে হয়তো অযাচিত প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে।
সাইবার হামলা, একাউন্ট হ্যাকিংয়ের চেষ্টা নতুন নয়। ইন্টারনেটের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতা অনেক বেড়েছে। কিছুদিন আগে এরকম একটি হামলায় পাঁচ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য চুরি হয়েছে।
ফেসবুকের জনপ্রিয়তা যেমন বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে বিভিন্ন একাউন্টে ব্যক্তিগত তথ্য থাকা এবং সামাজিক বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ থাকার কারণে একাউন্টগুলো অনেক ক্ষেত্রেই হ্যাকারদের লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে।
সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন।
বিটিআরসি জানিয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তারা সামাজিক মাধ্যম সম্পর্কিত ১২১টি অভিযোগ পেয়েছে। মূলত ফেসবুক ব্যবহার করে গুরুতর অপরাধ বা সমস্যা তৈরি করার অভিযোগ বিটিআরসি পর্যন্ত গড়ায়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার নাজমুল ইসলাম বলছেন, “প্রতিদিন ফেসবুক সম্পর্কিত গড়ে প্রায় পাঁচশো অভিযোগ আমরা পাই। এর বেশিরভাগই একাউন্ট হ্যাক হয়ে গেছে, প্রবেশ করা যাচ্ছে না এ ধরণের।”
তবে হ্যাকিং বা সমস্যার শিকার হলেও অনেক অভিযোগই কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত যায়না।
ফেসবুকের নিরাপত্তা পাতা Security and Login একাউন্ট নিরাপদ রাখার বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে:
পাসওয়ার্ড: ফেসবুকের পাসওয়ার্ড অন্য কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা উচিত নয় বা এটি কারো সঙ্গে শেয়ার করা ঠিক না। পাসওয়ার্ড হতে হবে ছোটবড় অক্ষর ও নম্বর মিলিয়ে, অন্ততপক্ষে আট সংখ্যার, যা সহজে কেউ ধারণা করতে না পারে। যেমন নিজের বা ঘনিষ্ঠ কারো নাম, জন্মতারিখ, বিয়ে বার্ষিকী, পরীক্ষার বছর ইত্যাদি পাসওয়ার্ড হিসাবে সবসময়েই ঝুঁকিপূর্ণ।
#লগইন: কখনোই ফেসবুকের লগইন তথ্য ফেসবুক ছাড়া আর কোথাও প্রবেশ করানো যাবে না। অনেক সময় স্ক্যামাররা ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে ফেসবুকের আইডির লগইন ইমেইল বা পাসওয়ার্ড চাইতে পারে। এরকম ক্ষেত্রে আগে সেই ওয়েবসাইটের ইউআরএল দেখে নিন। ফেসবুকের বাইরে আরো কোন শব্দ সেখানে থাকলে বা কোন সন্দেহ হলেই http://www.facebook.com টাইপ করে একাউন্ট খুলুন।
যেখানে অনেক ব্যক্তি একই কম্পিউটার ব্যবহার করেন, সেখানে অবশ্যই ফেসবুক ব্যবহার শেষে লগআউট করুন। যদি ভুলে যান, তাহলে ফোন বা অন্য কোন কম্পিউটারে ফেসবুকে লগইন করে সিকিউরিটি এন্ড লগইন সেটিংয়ে গিয়ে দেখতে পাবেন, সর্বশেষ কোথায় আপনি লগইন করেছিলেন। সেখানে ডিভাইস সনাক্ত করে লগআউট করে দিতে পারেন।বন্ধু গ্রহণে সতর্কতা: ফেসবুকের পরামর্শ, কখনোই এমন কাউকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ না করা, যাকে আপনি চেনেন না। এক্ষেত্রে হ্যাকাররা হয়তো মিথ্যা পরিচয়ে আপনার বন্ধু হয়ে আপনার টাইমলাইনে স্প্যাম ছড়াতে পারে, আপনাকে বিব্রতকর পোস্টে ট্যাগ করতে পারে বা হ্যাকিংয়ের মেসেজ পাঠাতে পারে।
দূষিত সফটওয়্যার বা কম্পিউটার: অনেক সময় আপনার ফোন, ট্যাব, কম্পিউটার, এমনকি ক্রোম বা ফায়ারফক্সের মতো ব্রাউজিং সফটওয়্যার বিশেষ কোড দ্বারা আক্রমণের শিকার হতে পারে। যদি আপনার একাউন্ট থেকে নিজে নিজেই অন্যদের কাছে বার্তা যেতে থাকে, বা একাউন্ট ব্যবহারের ভুল ইতিহাস দেখায় অথবা অ্যাকটিভিটি লগে এমন সব পোস্ট দেখতে পান, যা আপনি মনে করতে পারছেন না, তখন আপনার সতর্ক হওয়া উচিত।
কম্পিউটার বা মোবাইল খুব আস্তে কাজ করছে, এমন সফটওয়্যার দেখতে পাচ্ছেন যা আপনি ইন্সটল করেননি, আপনার সার্চ ইঞ্জিন পাল্টে গেছে কিন্তু আপনি তা করেননি,তখনো বুঝতে হবে হয়তো আপনি আক্রান্ত হয়েছেন।
এ ধরণের ক্ষেত্রে ESET বা TrendMicro সফটওয়্যার ব্যবহার করে কম্পিউটার বা মোবাইল পরিষ্কার করার পরামর্শ দিয়েছে ফেসবুক। ক্রোম ক্লিন আপ টুল ব্যবহার করে ব্রাউজার দূষণ মুক্ত করা যেতে পারে। এছাড়া ওয়েব ব্রাউজার নিয়মিত আপডেট করা উচিত।কখনোই সন্দেহজনক কোন লিংকে ক্লিক করবেন না: যদি ঘনিষ্ঠ কোন বন্ধু বা ফেসবুক বন্ধুর কাছ থেকে কোন ইমেইল, মেসেঞ্জারে বার্তা, বা পোস্ট পান, যা হয়তো তার স্বাভাবিক আচরণের সঙ্গে মেলে না, সবচেয়ে ভালো হবে সেটায় ক্লিক না করা বা সাড়া না দেয়া। যেমন কেউ হয়তো লিখতে পারে যে, সে কোথাও বেড়াতে গিয়ে বিপদে পড়েছে অথবা আপনার মেসেঞ্জারে এমন একটি লিংক পাঠিয়েছে, যার কোন কারণ নেই। এক্ষেত্রে তাকে আলাদাভাবে একাউন্টে নক করে বা বার্তা পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারেন। এ ধরণের সন্দেহজনক কিছু দেখলে রিপোর্ট করার পরামর্শ দিয়েছে ফেসবুক।
তবে আইটি বিশেষজ্ঞ জাকারিয়া স্বপন বলছেন, বাংলাদেশে কোন ফেসবুক একাউন্ট পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কারণ যখন একাউন্ট করার সময় একটি ফোন নম্বর দেয়া হয়, সেসব ফোনের ওপর যে কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি থাকে, তারা চাইলে সেসব বার্তা দেখতে পারে। তখন এর মাধ্যমে তাদের পক্ষে ফেসবুকের প্রবেশ বা নিয়ন্ত্রণ নেয়া সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাছে এমন কিছু প্রযুক্তি রয়েছে, যা দিয়ে বিভিন্ন বাহিনী বা সংস্থার সদস্যরা যেকোন ফেসবুক একাউন্ট সনাক্ত বা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন।কিভাবে অতিরিক্ত সতর্ক ব্যবস্থা নেয়া যায়?এডিসি নাজমুল ইসলাম বলছেন, “নিরাপদ রাখার ব্যাপারে ফেসবুকে যেসব পরামর্শ দেয়া হয়েছে, আমিও সেগুলোই সবাইকে অনুসরণ করতে বলবো।”
“তবে সমস্যা হলো, যখন কাউকে টার্গেট করা হয়,তখন হ্যাকাররা নানা পদ্ধতি অনুসরণ করে তাদের বিপদে ফেলে। আমরা বিষয়টি ফেসবুককে জানিয়েছে। তবে নিজে সতর্ক থাকলে বা প্রতিটি মন্তব্য বা লিংকে ক্লিক করার আগে সতর্ক হলে অনেকাংশে নিরাপদ থাকা সম্ভব।”


একাউন্টের নিরাপত্তার জন্য বাড়তি কিছু ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে ফেসবুক। এর সবগুলোই রয়েছে আপনার একাউন্টের সিকিউরিটি এন্ড লগনই পাতায়। ফেসবুকের একবারে ডানদিকে যে চিহ্নটি রয়েছে, সেখানে ক্লিক করে সিকিউরিটি এন্ড লগইনে প্রবেশ করুন।অপরিচিত লগইনের বিষয়ে তথ্য: একটু নীচের দিকে দেখতে পাবেন, যেখানে বলা হয়েছে, অপরিচিত লগইনের বিষয়ে সতর্ক বার্তা গ্রহণের ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে। ডানদিকে এডিট বাটনে ক্লিক করে একাউন্ট এবং মেসেঞ্জারের লগইনের বিষয়ে সতর্ক বার্তা পাবার বিষয়টি চালু করে দিন। এরপর সেভ বাটনে ক্লিক করলে আপনার পাসওয়ার্ড চাইবে। এরপর থেকে কোথাও আপনার একাউন্ট লগইন হবে,তখন আপনাকে একটি বার্তা বা মেসেজ দিয়ে জানাবে ফেসবুক।
দ্বি-স্তর যাচাই: এই পাতার একটু নীচের দিকে টু-ফ্যাক্টর ভেরিফিকেশন বা দ্বি-স্তর যাচাই ব্যবস্থা প্রথমে আপনাকে চালু করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে কেউ আপনার পাসওয়ার্ড পেলেও এই কোড না থাকার কারণে লগইন করতে পারবে না। এজন্য মোবাইল নম্বর বা ফোনে একটি অ্যাপলিকেশন ব্যবহার করতে পারেন। সিকিউরিটি এন্ড লগইন পাতায় গিয়ে আপনার মোবাইল ফোনের নম্বরটি যোগ করে দিকে পারেন। এরপর থেকে প্রতিবার ফেসবুকে প্রবেশের সময় বিনামূল্যে একটি এসএমএস আসবে এবং সেটি প্রবেশ করিয়ে লগইন করতে হবে।অথবা আপনি গুগল থেকে অথেনটিকেটর অ্যাপ মোবাইলে ডাউন লোড করে নিতে পারেন। এরপর ফেসবুকে এই পাতায় নতুন অ্যাপ সংযুক্ত করার বাটনে ক্লিক করলে যে কিউআর কোড আসবে, সেটা স্ক্যান করে নিলেই অ্যাপটি ফেসবুকের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যাবে। এরপর প্রত্যেকবার ফেসবুকে প্রবেশ করতে হলে এই অ্যাপ থেকে পাওয়া কোডটি আপনার পাসওয়ার্ডের সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে দিতে হবে।
এই দুইটি পদ্ধতি বেশিরভাগ মানুষ ব্যবহার করেন। এছাড়া পেন ড্রাইভের মাধ্যমে ইউনিভার্সাল সেকেন্ড ফ্যাক্টর বা রিকভারি কোড ব্যবহারেরও সুযোগ আছে।
একজন বন্ধুকে নির্বাচন: আপনার ফেসবুক একাউন্ট যদি কখনো আটকে যায়, তখন একজন নির্বাচিত বিশ্বস্ত বন্ধুর সহায়তা সেটি পুনরুদ্ধার করতে পারেন। নিরাপত্তার এই পাতাতেই নীচের দিকে তিন থেকে পাঁচজন বন্ধুকে নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছে, যারা একাউন্ট লক হয়ে গেলে বা হ্যাকিংয়ের শিকার হলে আপনাকে ফিরে পেতে সহায়তা করবে। সেখানে এডিট বাটনে ক্লিক করে তিন থেকে পাঁচজন বন্ধুকে সিলেক্ট করে দিন।
তবে কম্পিউটারটি যদি আপনি নিয়মিত ব্যবহার করেন, তাহলে ব্রাউজারটি সেভ করে রাখলে পরবর্তীতে আর এই ব্যবস্থা অনুসরণ করতে হবে না।
নিরাপদ থাকতে ফেসবুকে আরো কিছু ব্যবস্থাঃফেসবুকে কারো অনধিকার প্রবেশে হয়েছে মনে হলেই আইডি ও পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া প্রতি দুই মাসে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা উচিত বলে তারা মনে করেন।
কখনো যদি মনে করেন কারো পোস্ট বা বক্তব্য আপনার জন্য ক্ষতিকর বা হুমকি, তখন আপনি রিপোর্ট বাটনে ক্লিক করে ফেসবুকের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন।
ফেসবুকে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার, শিশুদের জন্য নির্যাতনমূলক ভাষা বা পোস্ট ঠেকাতে বিভিন্ন দেশের সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে ফেসবুক। এই পাতায় এ সংক্রান্ত বিস্তারিত রয়েছে, যেখানে অভিযোগ জানালে ফেসবুক ব্যবস্থা নেবে।

বিনামূল্যে বাংলা বই পড়তে ৬টি দারুণ ওয়েবসাইট

কাগজের বইয়ের সময় কি ফুরিয়ে আসছে ক্রমশ! না, একটি তরতাজা বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে উল্টিয়ে পড়া আর নতুন বইয়ের ঘ্রাণ এর আবেদন কখনোই ফুরাবে না। তবে ই-বুক বা পিডিএফ ফরমেটের বইয়ের চাহিদাও বেড়েছে। বই রাখা নিয়ে ঝামেলা যেমন নেই— তেমন মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ বা পিসিতে বসে পড়ে ফেলা যায় সহজেই। একটা মেমোরি কার্ডে রাখা যায় হাজার হাজার বই। যারা ই-বুক, পিডিএফ ফরমেটে বই পড়তে ভালোবাসেন। সেইসব বইয়ের পোকাদের জন্য দিচ্ছি ফ্রি-বইয়ের খোঁজ। ঘুরে আসুন অনলাইন বইয়ের জগৎ থেকে। ডাউনলোড করে নিন প্রিয় বই, প্রয়োজনীয় বই। আর সমৃদ্ধ করুন জ্ঞানের পরিধি।
১। বইয়ের দোকান: (www.boierdokan.com)২০০৯ সালে প্রথম চালু হলেও টেকনিক্যাল কারণে খুব একটা বেশি বই আপলোড হয়নি । ২০১১ সালে পুনরায় নতুন আঙ্গিকে শুরু হয় বইয়ের দোকান। বইয়ের দোকানের উঠানে গিয়ে দাঁড়ালে উপন্যাস, কবিতা, গল্প, সমালোচনা, নাটক, নন-ফিকশন প্রভৃতি বইয়ের দরজাগুলো দেখাবে। দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেই অজস্র বই। ফ্রি ডাউনলোড করে করতে পারবেন বইগুলো। আর ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো বইয়ের দোকান ই-বইমেলার আয়োজন করেছিলো।
২। আমার বই: (www.amarboi.com)এই সাইটে ফ্রি বই থাকলেও সব বই ফ্রিতে পাওয়া যায় না। প্রতি বছরের জন্য ২৪.৯৯ ডলার ফি দিয়ে প্রিমিয়াম সদস্য হওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রিমিয়াম সদস্যদের বই ডাউনলোডের সুযোগ-সুবিধা একটু বেশিই।
৩। সোভিয়েট বইয়ের অনুবাদ: (www.sovietbooksinbengali.com)তলস্তয়, দস্তোয়ভস্কি, নিকোলাই অস্ত্রভস্কি, আর্কিদি গাইদার কিংবা ম্যাক্সিম গোর্কি সহ আর আর রুশ লেখকদের বইয়ের অনুবাদ পাবেন এই সাইটে। রুশ উপকথা বা কিশোর সাহিত্যের দুষ্প্রাপ্য বইগুলোও ইলেকট্রনিক ফরমেটে ডাউনলোড করে নিতে পারেন।
৪। অলবাংলাবুকস: (www.allbdbooks.com/viewbook/B/1182/)এই সাইটে হাজার খানিকের মতো বই রয়েছে। ফ্রি ডাউনলোড করতে পারবেন গল্প, উপন্যাস, ম্যাগাজিন, রহস্যপত্রিকা এবং সেবা প্রকাশনীর প্রিয় বইয়ের কিছু।
৫। বাংলা ইন্টারনেট: (www.banglainternet.com)বাংলা ইন্টারনেট বইয়ের পাশাপাশি লেখকদেরও সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল যুক্ত করা রয়েছে। ফলে শুধু বই-ই না, লেখক সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় তথ্য আপনি পেতে পারেন বাংলা ইন্টারনেট থেকে।
৬। দ্য বাংলাবুক: (www.thebanglabook.com)দেড় হাজারের মতো বই রয়েছে এই সাইটে। লেখক অনুসারে সাজানো বইগুলো থেকে ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। এ ছাড়া আছে বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও পত্রিকা।
এগুলো ছাড়াও আরো অনেক সাইট রয়েছে যেখান থেকে আপনি ফ্রিতে ডাউনলোড করে নিতে পারবেন প্রয়োজনীয় বাংলা বই। তবে একটা বইয়ের পেছনে লেখকের যেমন মেধা ও শ্রমের বিনিয়োগ থাকে তেমন প্রকাশকের থাকে অর্থের বিনিয়োগ। তাই অবশ্যই বই কিনে পড়া উচিত।

ভালো লেখক হওয়ার সাত মন্ত্র

লেখালেখি। এই কাজটা হয়তো আপনাকে প্রতিদিনই করতে হয়। কিন্তু আপনি কি চান আপনার লেখা যেন আর দশজনের থেকে আলাদা করে চেনা যায়?

ভালো লেখক হওয়ার কলাকৌশল মানলেই যে আপনি পুরস্কার জয়ী সাহিত্যিক বনে যাবেন তা নয়। কিন্তু আপনি যদি একজন ভালো লেখক হতে চান, পেশাদারদের কিছু পরামর্শ মেনে চলা ভালো।

লেইন গ্রিন একজন ‘ভাষা গুরু।’ নামকরা সাময়িকী দ্য ইকনোমিস্টের সাবেক আর্টস এডিটর এবং কলামিস্ট। ভালো লেখার জন্য তার সাতটি পরামর্শ:

১. শুরুতেই মনোযোগ কাড়ুন

যে বিষয়টি আপনি যুক্তি দিয়ে তুলে ধরতে চাইছেন বা যে গল্পটি আপনি বলতে চাইছেন, সেটি ভুলে যান। শুরু করুন এমন কোন একটা বিষয় বা উদাহারণ দিয়ে, যাতে আপনি আপনি পাঠকের মনোযোগটা প্রথমেই কেড়ে নিতে পারেন।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মারকোয়েযের ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউডে’র শুরুর লাইনটার কথাই মনে করা যাক।

কে ফায়ারিং স্কোয়াডের মুখে? কেন? একটা লেখার শুরুতেই পাঠকের মনোযোগ কেড়ে নেয়ার জন্য এর চেয়ে শক্তিশালী লাইন আর কী হতে পারে?

২. ছোট ছোট বাক্যে লিখুন

ছোট বাক্যে লেখার মানে এই নয় যে আপনি আপনার লেখার গুরুত্ব কমিয়ে ফেলছেন। ‘সহজ কথা যায় না লেখা সহজে।’ কিন্তু সহজ ছোট বাক্যে লেখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এটা কেবল স্টাইলের ব্যাপার নয়, মানুষের স্মৃতি আসলে কীভাবে কাজ করে, তার সম্পর্ক আছে এর সঙ্গে।

একটি দীর্ঘ বাক্য বোঝা এবং মনে রাখার জন্য কিন্তু যথেষ্ট মনোযোগ দেয়ার দরকার হবে। এটা বেশ কঠিন।

পাঠককে কোনো লেখার ব্যাকরণ বুঝে পাঠোদ্ধারের জন্য এত বেশি চেষ্টার মধ্যে না ফেলাটাই উচিত। লেখক হিসেবে আপনার চেষ্টা হবে বরং আপনি যা বলতে চান সেটার দিকেই তার মনোযোগ আকর্ষণ করা।

৩. একই সঙ্গে দীর্ঘ বাক্যও ব্যবহার করুন

সেই প্রবাদটা নিশ্চয়ই মনে আছে। কোনো কিছুই বেশি করা ঠিক নয়। সব কিছুতেই মাত্রা মেনে চলা ভালো।

কাজেই আপনার লেখার বেশিরভাগ বাক্য ছোট হওয়া ভালো, কিন্তু পুরো লেখাটাই যদি কেবল ছোট বাক্যে লেখেন, সেটি পড়তে খুব একঘেঁয়ে হয়ে উঠতে পারে। সেটা নিশ্চয়ই আপনি চান না।

৪. সুনির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করুন

ছোট বাক্যে লেখা ছাড়াও কোন শব্দ ব্যবহার করছেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেসব বিষয় আপনি ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করেন- যেমন কোনো গন্ধ, স্বাদ বা আপনার পা দিয়ে স্পর্শ করছেন এমন কিছু, সেসবের বর্ণনার ক্ষেত্রে একেবারে সুনির্দিষ্ট শব্দ চয়ন খুবই দরকার। পাঠকের মনে যেন আপনি সঠিক ছবিটি ফুটিয়ে তুলতে পারেন।

যে দৃশ্যকল্প আপনি তৈরি করতে চান, এবং যে ভাষায় আপনি সেটি করতে চান, তারা যেন পরস্পরের উপযোগী হয়। যাতে আপনার বক্তব্য সুস্পষ্ট এবং স্মরণীয় হয়ে উঠে।

৫. বিমূর্ত শব্দ ব্যবহার পরিহার করুন

এগুলো আসলে প্রাণহীন ভুতুড়ে শব্দ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক, রাজনীতিক, আমলারা এ জাতীয় গুরুগম্ভীর ভারিক্কি শব্দ প্রচুর ব্যবহার করেন। তাদের আড়ষ্ট গদ্য এসব শব্দে ভারাক্রান্ত থাকে। সহজে কল্পনা করা যায় এমন কোনো কিছু বা শব্দ দিয়ে দিয়ে আপনার লেখার বিষয়টি ফুটিয়ে তুলুন।

৬. নিজের লেখা নিজেকে পড়ে শোনান

লেখা শেষ করার পর সেটি সম্পাদনা-পুনর্লিখন যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সেটি নিজেই নিজেকে পড়ে শোনানো। এই কাজটি করলে দেখতে পাবেন আপনার লেখায় কোথায় অসঙ্গতি আছে, কোথায় পরিমার্জন দরকার। কোথায় লেখাটির ছন্দপতন ঘটেছে সেটিও আপনার নজরে আসবে।

৭. সমাপ্তি টানবেন যেভাবে

লেখার সমাপ্তি টানুন এমন কোনো শব্দ বা বাক্যে, যাতে সেটা পাঠকের মনে একটা শক্ত ছাপ রাখতে পারে। আপনার লেখার এই শেষ শব্দগুলোই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই সেই শব্দগুলো খুব ভেবে-চিন্তে ব্যবহার করুন। সূত্র: বিবিসি বাংলা

যুগের প্রবর্তক ও প্রেরণার বাতিঘর #মাওলানা_মুহিউদ্দীন_খানের বর্ণিল কর্মময় জীবনঃ

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত এমন আলেমের সংখ্যা বাংলাদেশে নিতান্তই কম। হাতেগোনা এমন আলেমদের একজন ছিলেন হযরত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান। গত ২৫ জুন তিনি চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে। তাঁর ব্যক্তিত্বের বিভা ও খেদমতের গণ্ডি অনেক বিস্তৃত। নানামুখী খেদমতের কারণে তিনি ছিলেন দেশ-বিদেশে পরিচিত। তবে আমি মনে করি তাঁর সব পরিচয় ছাপিয়ে শীর্ষ পরিচিতিটি হলো আলেম #সাংবাদিক_ও_সম্পাদক। সাংবাদিকতা ও সম্পাদনা দুটি শব্দের সঙ্গে যখন আলেমদের কোনো পরিচয়ই ছিল না তখন আলেম সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে সর্বপ্রথমে তাঁর নাম ওঠে আসতো। আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.-এর পরে এদেশে ইসলামী পঠন-পাঠন সামগ্রীর যোগানদানে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা মাওলানা খানের। ইসলামী ‘পঠন-পাঠন’ সামগ্রী কথাটি তাঁর মুখ থেকেই প্রথমে শুনি। এদেশের মুসলমানদের দ্বীন শেখার কোনো উপকরণ যখন ছিল না, মকছুদুল মুমিনীন আর নেয়ামুল কোরআন যখন ছিল প্রধান অবলম্বন সেই যুগে মাওলানা খান বিশুদ্ধ আকিদার পাঠযোগ্য উপকরণ যোগানে নিরলস শ্রম দিয়েছেন।এক কথায় বলা যায়, তিনি একটি যুগের প্রবর্তক। সেই ষাট ও সত্তরের দশকে যখন আলেমদের লেখালেখির চর্চা তো দূরের কথা বাংলা লেখা ও চর্চাকে অপরাধ মনে করতো সে যুগে একজন খান অবিরত সংগ্রাম করেছেন চলমান স্রোতের বিরুদ্ধে। একজীবনের সংগ্রাম ও সাধনার কাঙ্ক্ষিত ফল তিনি পেয়েছেন। কণ্টকাকীর্ণ, অমসৃণ যে পথে তিনি যাত্রা করেছিলেন পরবর্তী সময়ে এসে তাঁর সঙ্গে অভিযাত্রী হয়েছেন আরও অনেকেই। মাঝপথে যোগ দেয়া কারো কারো কাজের গতি হয়ত আরও বিস্তৃত ও ব্যাপক। কিন্তু একটি নতুন যুগের প্রবর্তক হিসেবে চিরদিন অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.।দেশ-বিদেশে, ইসলামী-সাধারণ সব অঙ্গনে ইসলামী পত্রিকার কথা বললেই ওঠে আসে মাসিক মদীনার নাম। মাওলানা খানের আর কোনো পরিচয় যদি নাও থাকতো তবুও একমাত্র মাসিক মদীনার সম্পাদক হিসেবেই তিনি অনেক বরেণ্য ও সমাদৃত হতেন। ইসলামিক অঙ্গন থেকে আজ অর্ধশতাধিক নিয়মিত-অনিয়মিত সাময়িকী ও ম্যাগাজিন বের হচ্ছে। টাকা থাকলে যে কেউ আজ সম্পাদক হয়ে পত্রিকা বের করতে পারছেন। কিন্তু মাওলানা খান যখন মাসিক মদীনার জন্ম দেন তখন বিষয়টি এতোটা সহজ ছিল না। তাঁকে অনেক বেশি সংগ্রাম ও সাধনা করতে হয়েছে মাসিক মদীনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে। তিনি যে যোগ্যতা ও মেধার অধিকারী, ইচ্ছে করলে অনেক আরামের জীবনযাপন করতে পারতেন চাকরগিরি করে। অর্থের পেছনে ছুটলেও আজ তাঁর অঢেল সম্পদ থাকতো। কিন্তু দেশ ও জাতির জন্য একটি নতুন যুগের এবং নতুন ধারার সূচনা করতে গিয়ে শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি নিজের জীবনের পুরোটা ব্যয় করেছেন একটি দ্বীনি ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠা ও প্রচারে। বাহ্যত মনে হতে পারে তিনি একটি মাত্র মাসিক পত্রিকার জন্যই জীবনের সবটুকু বিলিয়ে দিলেন। কিন্তু মূলত শুধু মাসিক মদীনা নয়, সারা দেশ থেকে আজ ইসলামী ধারার যত পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী ও বই-পুস্তক বের হচ্ছে আমি মনে করি এর পেছনে মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের পরোক্ষ ভূমিকা আছে। আজকে ইসলামী অঙ্গনে যারাই একটু-আধটু লিখছেন সবাই কোনো না কোনোভাবে মাওলানা খানের দ্বারা প্রেরণা পেয়েছেন।Babor (1)মাওলানা খান শুধু যে নিজেই লিখেছেন এবং পাঠযোগ্য ইসলামী উপকরণ যোগান দিয়েছেন তাই নয়, তিনি নিজ হাতে গড়েছেন অসংখ্য মানুষ। আজকে ইসলামী ধারায় যাদের কলম সরব রয়েছে তাদের অনেককেই মাওলানা খান পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন, হাতে-কলমে শিখিয়েছেন। লেখালেখি চর্চা ও বিকাশে ক্ষেত্রে তরুণদের উন্নতির জন্য বরাবরই তাঁকে ভাবতে দেখেছি। যে কয়বার তাঁর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে তাঁর ভেতরে একটি জ্বলন অনুভব করেছি। যার মধ্যে মেধার স্ফূরণ দেখেছেন তাকেই কাজে লাগাতে চেয়েছেন। জীবনের শেষ দিকে এসে তিনি নিজে কাজ করার চেয়ে করানোর প্রতি বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। তাঁর আবাদ করা অঙ্গনটি পুরোপুরি আবাদ হোক, এ অঙ্গনের বিচরণটা আরও মসৃণ হোক এটাই তিনি চেয়েছেন জীবনভর। শারীরিকভাবে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ার পরও শেষ বয়সে তিনি কলম হাতছাড়া করেননি।মহীরুহতুল্য এই মনীষী চলে যাওয়ায় যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। একজীবনে মাওলানা খান রহ. নিজেকে উজার করে দেশ, জাতি ও উম্মাহকে দিয়ে গেছেন। বিনিময়ে আমরা তাঁকে কিছুই দিতে পারিনি। ‘অকৃতজ্ঞ’ এই জাতির কাছে মুহিউদ্দীন খানদের মতো মহামনীষীদের পাওয়ার তেমন কিছু নেই। কারণ তাঁরা জীবনভর কাজ করেন যার সন্তুষ্টির জন্য সেটাই তাদের কাছে মূখ্য। পার্থিক খ্যাতি, বাজারি স্বীকৃতি আর করপোরেট প্রচার-প্রচারণায় তাঁরা অপাঙক্তেয়। কলমের ময়দানে যে সংগ্রাম জীবনভর করে গেছেন মাওলানা খান তা কবুল হলে আর কোনোকিছুই তাঁর দরকার নেই। দুআ করি, আল্লাহ তাঁর জীবনের খেদমতগুলো কবুল করে নিন। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরবর্তী প্রজন্মকে চলার তাওফিক দিন।
মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের বর্ণিল কর্মময় জীবনঃ
মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, জন্ম ৭ বৈশাখ ১৩৪২ বাংলা, ময়মনসিংহের মাতুলালয়ে। ইসলামি সাহিত্য সাংবাদিকতা জগতে তিনি জীবন্ত কিংবদন্তি। বাংলা ভাষায় সিরাত চর্চা প্রবর্তন, মাআরেফুল কুরআনের অনুবাদ, ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো দুষ্প্রাপ্য ও উচ্চাঙ্গের কিতাবাদি সহজ- সরল, সাবলীল ভাষায় সবার বোধগম্য করে প্রকাশ করে তিনি আমাদের কাছে দূর আকাশের দীপিত তারকা। এছাড়া বংলাদেশের ইসলামি রাজনীতি, তাহজিব তামাদ্দুনের তিনি ছিলেন পুরোধা। জাতীর এক মহান রাহবার।মাওলানা মহিউদ্দীন খান গোটা পৃথিবীর দু’একজন বিরল সম্মানের অধিকারী মুসলিম মনীষাদের অন্যতম। যার প্রতিটি কথা হয় গ্রন্থিত। জীবনের প্রতিটি দিক একেক ইতিহাস।প্রতিটি বক্তৃতা সংকলিত। রচিত পুস্তক হয় চিরন্তন সাহিত্য। চিন্তার প্রতিটি ক্ষণহয়ে উঠে দিব্যদৃষ্টির বার্তা। উপলব্দি ও মূল্যায়ন হয় ইতিহাসের আক্ষরিক পথ নির্দশন।আধুনিক বিশ্বের চিন্তা, গবেষনা, ইসলামি জাগরণ আর কর্ম সাধনার অন্যতম পুরুষ। যার লেখা গ্রন্থ ইউরোপের শ্রেষ্ট বিদ্যাপিঠ ক্যামবিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য। বাংলাদেশে তিনিই কেবল ‘খানায়ে কাবা’র তেতরে প্রবেশ করে নামাজ পড়ার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি বহুমুখী কর্মতৎপর একটি সফল প্রতিষ্ঠান । আসুন এক নজরে বিশ্বব্যাপী তার বিশাল কর্মযজ্ঞ জীবন সর্ম্পকে জেনে নেই।১. ইসলামী একাডেমী প্রতিষ্ঠা : পাকিস্তান আমলেই তিনি ঢাকাতে ইসলামী একাডেমী প্রতিষ্ঠা করেন । সরকার যা পরবর্তিতে অধিগ্রহণ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর যা পরবর্তিতে বঙ্গবন্ধু ইসলামী ফাউন্ডেশন নামে রপান্তরিত করেন।
২. আধুনিক বাংলা ইসলামি সাহিত্যের নির্মাতা : আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ইসলাম চর্চার পথিকৃৎ তিনি৷ তাকে অনুসরণ করে এবং তার পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়ে এদেশে অসংখ্য লেখক অনুবাদক ও গবেষক তৈরি হয়েছেন৷
৩. মাসিক মদীনা : বাংলাদেশের সম্ভ্রান্ত এমন কোন মুসলিম পরিবার পাওয়া যাবে না যাদের ঘরে মাসিক মদীনার একটি কপি পৌঁছেনি। ষাটের দশকের প্রথম দিকে ১৯৬১ সালে তার প্রতিষ্ঠিত মাসিক মদীনা পত্রিকা এদেশের সবচেয়ে বহুল প্রচারিত জনপ্রিয় বাংলা পত্রিকা। দেশে বিদেশে যার পাঠক সংখ্যা কয়েক লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। বাংলা ভাষায় ইসলামী পত্রিকার নতুন এই ধারার পথপ্রদর্শক তিনি। তার অমর কীর্তি মাসিক মদীনার অনুকরণে অনেকগুলো ইসলামী ম্যাগাজিন এদেশে পরবর্তিতে চালু হয়ছে৷
৪. সাপ্তাহিক মুসলিম জাহান : উম্মাহর চিন্তা ও বাঙালি মুসলমানের সুখ দুঃখের কথা ফুটিয়ে তুলতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাপ্তাহিক মুসলিম জাহান। এটাও বাংলা ভাষা ও সাংবাদিকতায় প্রথম কোন ইসলামি ধারার সাপ্তাহিক। তার স্বপ্ন ছিল দৈনিক মুসলিম জাহান তৈরির । সামাজিক বৈরি পরিবেশ ও রাজনৈতিক হিংস্রতার ফলে দৈনিক মুসলিম জাহান প্রতিষ্টা না করতে পারলেও সাপ্তাহিক মুসলিম জাহানের মাধ্যমে যে কর্মী বাহিনী ও কলম সৈনিক তিনি তৈরি করেছিলেন তারাই পরবর্তিতে জাতীয় দৈনিক ও মিডিয়াতে এখন সাব এডিটরসহ সাংবাদিকতায় অনেক বড়ো অবস্হানে কাজ করছেন।
৫. মদীনা পাবলিকেশন্স : তার অমর কীর্তি ঐতিহ্যবাহী মদীনা পাবলিকেশন্স । মকসুদুল মুমিন আর নেয়ামুল কোরআনের অশুদ্ধ পাঠ চর্চা থেকে তিনি এই প্রতিষ্টানের মাধ্যমে বাঙ্গালী মুসলমানকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন বিশ্ব সাহিত্যের ইসলামি বিশাল ভান্ডারের সাথে। শুধু ইসলামি বইকে বট তলা থেকে আধুনিক করনই করেন নি বরং আজ থেকে অর্ধ শতাব্দি আগে এমন মান ও শৈল্পকতার সাথে ইসলামী বইয়ের সমাহার নিয়ে একটি কাশনীর যাত্রা করলেন তখন বাম পাড়াতেও এমন মান সম্পন্ন প্রকাশনা চোখে পড়েনি। মদীনা প্রাবলিকেশন্স এর পথ ধরে পরবর্তিতে শতশত ইসলামী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তৈরী হয়েছে৷ বাংলা বাজারে ইসলামি টাওয়ার আজ মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে বিশাল ইসলামি বই বাজার নিয়ে। এর পেছনে যে মানুষটি শক্তি সাহস ও প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছেন তিনি মাওলানা মহিউদ্দীন খান। মদীনা পাবলিকেশন্স শুধু বাংলা একাডেমী ২১শে বই মেলাতে নয় কলিকতা ও সৌদি বইমেলাতে অংশ গ্রহন করে আমাদের মুখোজ্জল করেছে ।
৬. রাবাতে আল আলম ইসলামী : বিশ্বের বরেণ্য ইসলামি স্কলার ও পন্ডিতদের আন্তজাতিক এই প্রতিষ্টানের তিনি বাংলাদেশের প্রথম সদস্য। দীর্ঘদিন রাবেতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ব সংস্হার নির্বাহী পর্ষদের দায়িত্ব পালন করেছেন । ফলে আরব বিশ্ব ও বিশ্বের বড়ো বড়ো পণ্ডিতদের সাথে তার কাজ করার সুযোগ হয়েছে । রাবেতার মাধ্যমে এদেশে অসংখ্য মসজিদ মাদরাসা দাতব্য চিকিৎসালয় তিনি তৈরি করেছেন।
৭. বিনামুল্যে কোরআন বিতরণ : সংক্ষিপ্ত মারিফুল কোরআনের অনুবাদ ও সৌদি বাদশা ফাহাদ বিন আব্দুল আজিজের সৌজন্য ও মাওলানা মহিউদ্দীন খানের তত্বাবধানে বাংলাভাষাভাষি মানুষদের জন্য কোটি কপি মারিফুল কোরআন তরজমা ও কোরআন শরিফ বিনামুল্যে কয়েকযুগব্যাপী বিতরণ তার এক অসমান্য মকবুল একটি খেদমত।
৯. মদীনা ইউনিভার্সিটির স্কলার : বিশ্বখ্যত মদীনা ইউনিভার্সিটির একজন সম্মানিত স্কলার ও ভিজিটিং প্রফেসার মাওলানা মহিউদ্দীন খান। তার সত্যায়ন ও সুপারিশে অগণিত বাংলাদেশি যুবক মেধাবী শিক্ষার্থী আল আজহার কিংবা মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রতিষ্টানে শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে৷ যা বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে এক অসামান্য অবদান তৈরি করেছে।
১০. অনুবাদ : বিশ্বসাহিত্যের ইসলামি গ্রন্হকে বাংলা অনুবাদের এই মহান কাজটি তিনিই প্রথম শুরু করেন । দার্শনিক ইমাম গাজ্জালী, ইবনে তাইমিয়া সহ বিশ্বের বড় বড় মুসলিম লেখককে তিনিই প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন বাঙ্গালী মুসলমানদের সাথে। এহিয়ায়ে উলুমদ্দীন, কিমিয়য়ে সাদত, মুর্শিদুল আমিন, বার্নাবাসের বাইবেলের মতো গ্রন্হ তিনি অনুবাদ ও প্রকাশ করেছেন। মুফতি শফি রহ তাফসিরে মারিফুল কোরআনের মতো বিশাল গ্রন্থ ১০ খন্ডে তিনি অনুবাদ করেছেন এককভাবে। এছাড়া অসংখ্য আরবী উর্দু ফার্সি ইংরেজি গ্রন্হ তিনি অনুবাদ করেছেন ।
১১. মৌলিক রচনা : অর্ধশতের উপরে তিনি মৌলিক গ্রন্হ রচনা করেছন। তার অসামান্য আত্মজীবনী গ্রন্হ জীবনের খেলাঘর বাংলা সাহিত্যে বহুল পাঠিক একটি ক্লাসিকেল গ্রন্হ । স্বপ্নযুগে রাসুল সাঃ তার লিখিত একটি জনপ্রিয় গ্রন্হ। রওজা শরিফের ইতিকথা গ্রাম বাংলায় বহুল পাঠিত একটি গ্রন্থ।ছাড়া তার লিখিত শতাধিক গ্রন্হ বাংলা ভাষার পাঠকরের মধ্যে ব্যপক জনপ্রিয় ।
১২. নওমুসলিম পূর্ণাবাসন কেন্দ্র : গরীব, অসহায় অসংখ্য নওমুসলিমকে তার প্রতিষ্টিত এই সংস্হার মাধ্যমে পুনর্বাসন করেছেন। খিস্টান মিশনারির বিকল্প দাওয়াতের কাজে অমুসলিমদের মাঝে প্রতিষ্টানটি ব্যাপক সফলতা তৈরি করে। বাংলাদেশ নওমুসলিম পূর্ণাবাসন আইডিয়াটি তিনিই প্রথম তৈরি করেন।
১৩. সীরাত চর্চার পথিকৃৎ: বাংলা ভাষায় সিরাত চর্চার পথিকৃত মাওলানা মূহিঊদ্দীন খান । মাসিক মদীনা, মুসলিম জাহান এর সীরাতুন্নবী সংখ্যাবিশাল কলরবে ঈদ সংখ্যার মতো প্রকাশ করার আইডিয়ার জনক তিনি । তিনি মদীনা পাবলিকেশন্স এর মাধ্যমে অসংখ্য সীরাত গ্রন্হ প্রকাশ করেছেন। রাসুলে পাক সাঃ এর সিরাত চর্চায় বাংলা ভাষায় কেন বিশ্ব সিরাত সাহিত্যের তিনি প্রাণ পুরুষ।
১৬. জাতীয় সিরাত কমিটি : তার মহান কার্যক্রমের অন্যতম জাতীয় সিরাত কমিটি । এর মাধ্যমে জাতীয়ভাবে সীরাত চর্চা । সীরাত সম্মেলন ।জাতীয় সীরাত স্মারক এপর্যন্ত ৬খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে। যা বাংলা সাহিত্যের এক বিশাল অবদান তৈরি করেছে। তিনি জাতীয় সিরাত কমিটির চেয়ারম্যান।
১৭. সিরাত স্বর্ণ পদক : তার অসমান্য অবদানের একটি সিরাত স্বর্ণ পদক। সীরাত চর্চাকে উৎসাহিত করতে এবং যারা সিরাত চর্চা ও সীরাত সাহিত্য অবদান রেখেছনে এরকম অসংখ্য মনীষাকে তিনি মুল্যায়িত করেছেন এই পদক প্রদান করে । খতিব উবায়দুল হক রহ আল্লামা আহমদ শফি সহ অনেক বিখ্যাত জনরা এপদকে ভূষিত হয়েছেন।
১৮. আগ্রাসন প্রতিরোধ কমিটি : মাওলানা মহিউদ্দীন খান দেশ মাতৃকার এক জাগ্রত সিপাহসালার । তিনি এই আলোচিত সংগঠনটির মাধ্যমে সামজ্রবাদী আগ্রাসনের বিরোদ্ধ তিনি প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ করেছেন আজীবন। তার নেতৃত্বে এই অরাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ডানপন্থী বিদ্ধুজীবি লেখকদের একটি প্লাটফর্ম তৈরি করেছেন।
১৯. আনসার নগর কমপ্লেক্স : খান সাহেবের পিতা হাকীম আনসার উদ্দীন খানের নামে ময়মনশাহীর গফরগাঁও আনসার নগর এক সুবিশাল শিক্ষা কার্যক্রমের যাত্রা করেছেন। এতিমখানা, মাদরাসা, মহিলা মাদরাসা, ইসলামিক স্কুল, সেবা ট্রাস্ট, হাসপাতাল, মসজিদ, গন পাঠাগার, সহ বহুমুখী কাংযক্রম তার অমর কৃর্তি।
২১. সমকালীন জিজ্ঞাসার জবাব : তিনি চলন্ত এক বিশ্বকোষ। মাসিক মদীনাকে ঘিরে তিনি যে প্রশ্নোত্তর বিভাগ চালু করেছিলেন তা, খান সাহেবর এক অমর জ্ঞান ভান্ডার। প্রতি মাসে শতাধিক প্রশ্ন উত্তর নিয়ে এই বিশাল আযোজন ছিল মদীনা পত্রিকার মূল আর্কষন। এককভাবে বাগত ৭০ বছর যাবৎ কয়েক লক্ষ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। মহাকাশ, বিজ্ঞান, ফেকাহ, কোরআন, হাদীস, মনীষা,বিভিন্ন সভ্যতা, এমন কোন বিষয় নেই যার উত্তর তিনি দেন নি। “সমকালিন জিজ্ঞাসা” জবাব নামে যা শতাধিক খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে। যা বিশ্ব ইতিহাসে একক এক বিশ্বকোষ বা জ্ঞান ভান্ডারের মর্যাদা লাভ করেছে।
২১. রাবেতা আল আদবঃ বিশ্ব ইসলামি সাহিত্য পরিষদের তিনি অন্যতম প্রতিষ্টা। সৌদি আরবের রিযাদ কেন্দ্রীক আন্তজর্তিক এই সাহিত্য সংগঠনটির মাধ্যমে পুরো পৃথিবীতে সাহিত্য চর্চার ইসলামিক ধারার নব যুগের সূচনা কর বিশ্ব দরবারে অমর হয়ে আছেন। রাবেতা আল আদবের মাধ্যমে কিনি পৃথিবীর সবকটি মুসলিম দেশ সফর করেছেন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে বহুদেশ ভ্রমন করে তিনি বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্ব্যব্যাপি মানব সভ্যতার নির্মান ও বিকাশ সম্পর্কে বহু গ্রন্থ লিখেছেন।
২২. ইসলামী পত্রিকা পরিষদ : বাংলাদেশের সকল ইসলামী পত্রিকার সমন্নয়ে ইসলামী পত্রিকা পরিষদ গঠন তার অমর কৃর্তি। জাতীয় লেখক সম্মেলন, লেখক পুরস্কার তার অমরকৃর্তি।
২৩. টিপাই মূখ লংমার্চ : নদী আগ্রাসন প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে তিনিই প্রথম ভারতীয় নদী আগ্রাসন ও টিপাইমূখ বাধের বিরোদ্ধে তিনি গর্জেউঠেছিলেন। তার নেতৃত্ত লাখো জজনতার টিপাইমূখ বাধ বিরোধী টিপাইমূখ অভিমূখে লংসার্চ মুহিউদ্দীন খানের জীবনের ঐতিহাসিক নেতৃত্বের সফলতা।
২৪. বাংলাদেশ সবোর্চ্চ উলামা পরিষদ : বায়লাদেশের সব মত পথের আলেমদের নিয়ে সবোর্চ্চ উলামা পররিশদ গঠন খান সাহেবের অনন্য ব্যক্তিত্বের আরেকটি মাইল ফলক। দেওবন্দি, ছরছিনা, ফুলতুলি, বায়তুশ শরফ সহ নানান মতের উলামাদের নিয়ে ইসলাম বিরোধি যে কোন বাজে তিনি প্রতিবাদ করেছেন। এবং আজীবন উলামাদের ঐক্য ও মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের পক্ষে কাজ করেছেন। কার দরবার সব মত পথের আলেমরা আশ্রিত হবার শেষ ঠিকানা।
২৫. মাসিক মদীনার মাধ্যমে তিনি যে লেখক কাফেলাকে এদেশে এক বিনি সুতার মালায় গেথে ছিলেন, তারাই মূলত এদেশের তাহযিব তমদ্দুন সংরক্ষন বিকাশ ও লালনে অসামান্য অবদান রেখেছেন। প্রেন্সিপাল ইব্রাহিম খা, কবি ফররুখ আহমদ,কবি বন্দে আলী মা, নুর মোহাম্মদ আজমি, দেওয়ান আব্দুল হামিদ, অধ্যাপক আবু তালিব, সৈয়দ আব্দুস সুলতান, সৈয়দ আশরাফুল হক আকিক, এজেড শামছুল আলেম সিএসপি, আব্দুল খালেক জোয়ারদার, জহুরী, কবি মুজ্জাম্মেল হক, ইতিহাস গবেষক সৈয়দ আব্দুল্লাহ, কবি আব্দুল হালিম খা,অধ্যাপক আবুল হোসেন মল্লিক, সৈয়দ মোস্তফা কামাল, ড আফম খালেদ হুসেন, মাওলানা জুনাইদ বাবুনগরী, মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ, উবায়দুর রহমান খান নদভী, মাওলানা লিয়াকত আলী প্রমূখের এই কাফেলা তিনি মদীনা পত্রিকার মাধ্যমে তৈরি করেছিলেন। কিংবদন্তির কলম সৈনিকের এক কাফেলা।তাদের অনেকেই আজ নেই। তবে তাদের কর্ম আলো ছড়াচ্ছে চারদিকে। মুহিউদ্দীন খান সাহেব হুজুর আমাদের দেখা বিশ্ব মনীষাদের শেষ সলতে।
আজ ১৯ রমজান ২৫ জুন ২০১৬ ইংরেজি ইফতারেরর পূর্বক্ষণে সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন।

একবার আমাদের ওখানে একটি মাদ্রাসা উদ্ভোধনের জন্য প্রধান অতিথী হয়ে এসেছিলেন তিন ।তিনি ছিলেন খুবই বাস্তববাদী ।ওনার সামনে মাদ্রাসার বাচ্চাদের পাগড়ী পড়িয়ে নিয়ে আসায় তিনি খুবই অসন্তুষ্ট হয়ে বলেছিলেন “এই বাচ্চাদের পাগড়ী পড়িয়ে বন্দী করেছেন কেন?এ ভুল করবেননা । ওদের এখন খেলার বয়স” কেবল ঐ একবারই ওনাকে খেদমত করার তৌফিক হয়েছিলো আমার । আমার ইসলামী জ্ঞানের যে অল্প পরিসরের একটি ছোট্ট ভান্ডার আছে, তার শুরুটা হয়েছিল ওনার প্রতিষ্ঠিত মদীনা পাবলিকেশন্সের বই পুস্তক দিয়েই । যদিও আমি ওনার সকল কথায় একমত নই তথাপিও তার প্রজ্ঞার কাছে আমার মত লক্ষ কোটি বাঙ্গালী মুসলীম ঋণী ।জান্নাতে ওনার উচ্চ মাকাম কামনা করছি । আমিন।উপরের লিখাটা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে সংগৃহীত ও আমার দ্বারা কিয়দাংশ সম্পাদিত । — #মরুচারী_মুসাফির

গরীব একটি দেশে ক্রিকেটারদের বেতন এতো বেশি হওয়া সত্ত্বেও আবার আন্দোলন!!!

বাংলাদেশের মতো গরীব একটি দেশে ক্রিকেটারদের বেতন এতো বেশি হওয়া সত্ত্বেও আবার আন্দোলন!
এ প্লাস ক্যাটাগরি- ৪,০০,০০০/- চার লক্ষ টাকা।
এ ক্যাটাগরি- ৩,০০,০০০/- তিন লক্ষ টাকা।
বি ক্যাটাগরি- ২,০০,০০০/- দুই লক্ষ টাকা।
সি ক্যাটাগরি- ১,৫০,০০০/- দেড় লক্ষ টাকা।
ডি ক্যাটাগরি- ১,০০,০০০/- এক লক্ষ টাকা।
যেখানে…
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বেতন পান- ১,২০,০০০/-
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বেতন পান – ১,১৫,০০০/-
এত কিছুর পরও আপনাদের দাবী, ভাই কি বলবো লজ্জা জনক!!!

কৃষকদের দিকে তাকান ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায়, না খেয়ে থাকছে হাজার হাজার কৃষি পরিবার।

গ্রামের মানুষদের জীবন যাত্রার মান ২% এরও নিচে।

বেকারত্বের হার এদেশে ৬৪%

আর আপনারা প্রতিমাসে গুনছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। এছাড়া অন্যান্য ইনকাম তো আছেই।
এরপরও বেতন নিয়ে দাবী…!

পৃথিবীর ২৬টি রাজতন্ত্র দেশ

{{{উল্লেখ্য যে গণতন্ত্র একটি ত্বগুত । কিন্তু রাজতন্ত্র একটি সহীহ আকীদার খেলাফত পদ্ধতি । এই রাজতন্ত্র যে মানবেনা সে ঈমান ভঙ্গকারী ফুজ্জার হবে। সে অনন্ত কাল জাহান্নামে জ্বলবে ।}}}
১।সৌদী আরব
২।ভুটান
৩।যুক্তরাজ্য
৪।সোয়াজিল্যান্ড
৫। লেসোথো
৬।মরক্কো
৭।ব্রুনেই
৮।কম্বোডিয়া
৯। কুয়েত
১০।থাইল্যান্ড
১১। সংযুক্ত আরব আমীরশাহী
১২।মালয়েশিয়া [এখানে প্রধানমন্ত্রী ভোটে নির্বাচিত হয়]
১৩। জরডন
১৪।ওমান
১৫।কাতার
১৬। বাহরিন
১৭ এন্ডরা
১৮।বেলজিয়াম
১৯।ডেনমারক
২০। স্পেন
২১। লিতচেন্সটাইন
২২। লুক্সেম্বারগ
২৩।মোনাকো
২৪। নরওয়ে
২৫। নেদারল্যান্ড
২৬। টোঙগা

মিত্র বাহিনীর যেসব নিষ্ঠুরতার কথা জানে না অনেকেই


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস নির্ভর কোনো বই পড়তে গেলে কিংবা কোনো সিনেমা-ডকুমেন্টরি দেখতে গেলে সবসময় একটা চিত্র দেখা যায়। অক্ষ শক্তির নেতৃত্বে থাকা জার্মানি, ইতালি ও জাপানের কারণে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে দুনিয়ায়, কষ্টে আছে সাধারণ জনগণ। এরপরই অত্যাধুনিক নানা কৌশল নিয়ে, নিজেদের জীবন বাজি রেখে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মতো আরো দেশ নিয়ে গঠিত মিত্র বাহিনী।

শেষপর্যন্ত বিজয় যে মিত্র বাহিনীরই হয়েছিলো, তা তো আজ সবারই জানা। কিন্তু বইপত্রে, সিনেমায় তাদেরকে যেভাবে মানবজাতির উদ্ধারকারী, খুব ভালো এক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তা কি আসলেই ততটা ভালো ছিলো? অবশ্যই না!


বলা হয়ে থাকে, যুদ্ধ আমাদের মনের ভেতরে বাস করা সুপ্ত পশুর সবচেয়ে কদর্য রুপকে প্রকাশিত করে দেয়। এ কদর্য রুপ যেমন অক্ষ শক্তির দেশগুলো প্রকাশ করেছিলো, তেমনি পিছিয়ে ছিলো না মিত্র বাহিনীর দেশগুলোও। পার্থক্য হলো, আজকের ইতিহাস আমাদের কেবল অক্ষ শক্তির নির্মমতার কাহিনীগুলোই শোনায়, মিত্র বাহিনীর না। আজ তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর কিছু নৃশংসতার ইতিহাস তুলে ধরা হলো এ লেখার মাধ্যমে, যা হয়তো অনেকের কাছেই অজানা।

১) জাপানে সাধারণ জনগণের উপর লাগাতার বোমাবর্ষণ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা উঠলে প্রথমেই অল্প যে ক’টি ঘটনার কথা সকলের মনে আসে, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলা সেগুলোর মাঝে শীর্ষস্থানীয়। এর পেছনে আমেরিকান সরকারের যুক্তি ছিলো, কোনোভাবেই আত্মসমর্পণে রাজি না হওয়া জাপানীদের বশে আনতে এর বিকল্প কোনো পথ খোলা ছিলো না তাদের সামনে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে স্থলভাগে বেশ দীর্ঘকালীন যুদ্ধ ও ভবিষ্যতে অগণিত জানমালের ক্ষতি হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিলো বিশ্ব- এমনটাই বলে থাকেন আমেরিকার হর্তাকর্তারা।

পারমাণবিক এই বোমা হামলার অনেক আগে থেকেই নিয়মিতভাবে বিভিন্ন যুদ্ধবিমান থেকে জাপানে বোমাবর্ষণ করে যাচ্ছিলো আমেরিকা। অগণিত সাধারণ মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শত্রুকে হতোদ্যম করে তোলাটাই ছিলো এই বোমাবর্ষণের মূল কারণ। এসব হামলার পেছনের কারিগর ছিলেন জেনারেল কার্টিস লিমে। জাপানের সাধারণ জনগণকে এভাবে মেরে ফেলার মতো বিষয়গুলো তার মনে বিন্দুমাত্র দাগ কাটে নি। বরং তিনি মনে করতেন, পুরোপুরিভাবে নিশ্চিহ্ন হওয়ার আগপর্যন্ত বুঝি জাপানীরা কোনোভাবেই মাথা নত করবে না। এজন্যই নিয়মিত বোমা হামলার বাইরে তিনি জাপানের বড় শহরগুলোতে আরো ব্যাপক মাত্রায় হামলা চালানোর পরিকল্পনা করলেন।

১৯৪৫ সালের ৯ মার্চ, জেনারেল লিমের নির্দেশে জাপানের দিকে উড়ে গেলো যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমানের বহর, উদ্দেশ্য টোকিওতে হামলা চালানো। তবে সেদিনের বোমা হামলাটি ছিলো অন্যান্য যেকোনো দিনের চেয়ে আলাদা। সেদিন নিক্ষেপ করা হয়েছিলো নাপাল্ম সিলিন্ডার ও পেট্রোলিয়াম জেলী। প্রায় চল্লিশ বর্গ কিলোমিটার পরিমাণ জায়গা জ্বলে-পুড়ে ছাড়খার হয়ে গিয়েছিলো সেদিন। পুড়ে যাওয়া মানুষগুলো একজনের উপর আরেকজন পড়ে ছিলো, সে এক ভয়াবহ দৃশ্য। আনুমানিক এক লক্ষ সাধারণ জাপানী নাগরিক সেদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের সিদ্ধান্তের জন্য প্রাণ হারিয়েছিলো।

২) সোভিয়েত সেনাবাহিনী কর্তৃক গণধর্ষণ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর সদস্য হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা ছিলো উল্লেখযোগ্য। অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি বাহিনীকে সফলতার সাথে মোকাবেলা করা এবং পাশাপাশি তাদের অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে বিভিন্ন এলাকা জার্মানদের দখলমুক্ত করে গর্জন করতে করতেই এগোচ্ছিলো দেশটির সেনাবাহিনী। তবে সমস্যা বাধলো অন্য জায়গায়। ক্রমাগত এই যুদ্ধবিগ্রহ আর রক্তপাত দেশটির সেনাদের মানবিকতাবোধ ধীরে ধীরে লোপ পাইয়ে দিচ্ছিলো। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে স্ত্রীর সাথে না থাকতে পারার মতো বিষয়টিও তাদেরকে বেশ হতাশ করে তুলেছিলো। এ হতাশা কাটাতে তাদের কেউ কেউ বিজিত এলাকায় লুটতরাজের সাথে জড়িয়ে পড়ছিলো। সবচেয়ে ঘৃণ্য ব্যাপার হলো, তারা গণহারে ধর্ষণ করছিলো শত্রুপক্ষের নারীদের। উপরমহল থেকেও এমন ন্যাক্কারজনক কাজকে সমর্থন করা হচ্ছিলো এই যুক্তিতে যে, এভাবে ধর্ষণ চালিয়ে গেলে শত্রুপক্ষের মনোবল আস্তে আস্তে দুর্বল হতে বাধ্য।

নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে ইউরোপকে মুক্ত করে তারা আসলে অনেক বড় কিছু করে ফেলেছে, এজন্য তারা যা খুশি সেটাই করতে পারে- এমন মনোভাব সোভিয়েত সেনাদেরকে এসব কাজে আরো প্ররোচিত করছিলো। তাদের হাতে ধর্ষিত নারীদের তালিকায় শুধু জার্মান নারীরাই ছিলো না। পোল্যান্ডেও বিভিন্ন ক্যাম্প দখলমুক্ত করার পর সেখানকার নারীদের উপর নিজেদের পশুবৃত্তিকে চরিতার্থ করছিলো তারা।

৩) মার্কিন সেনারা যখন সংগ্রহ করছিলো জাপানীদের খুলি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধবন্দীদের সাথে জাপানীরা কতটা নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেছিলো, সেই ইতিহাস কম-বেশি অনেকেরই জানা। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে ইউনিট ৭৩১। সেখানে বন্দী মানুষগুলোর উপর জাপানী সেনাদের অত্যাচারের বর্ণনা শুনলে অবাক হয়ে যেতে হয়।

একজন রোগাক্রান্ত বন্দীকে আরেকজন নিরোগ বন্দীর সংস্পর্শে রেখে দেখা হতো রোগ কতটা দ্রুত ছড়াতে পারে। নারী বন্দীদেরকে সেখানকার প্রহরীরা রুটিনমাফিক ধর্ষণ করতো। ওদিকে চিকিৎসকেরা গ্যাস চেম্বার, খাবার, পানীয় ইত্যাদির মাধ্যমে বন্দীদের মাঝে নানা রোগের জীবাণু ছড়িয়ে দিতো। তাদের কোনো অঙ্গ কেটে দেয়া হতো রক্তক্ষরণ নিয়ে গবেষণার জন্য। প্রথম ডিভিশনে বিউবোনিক প্লেগ, কলেরা, অ্যানথ্রাক্স, টাইফয়েড, যক্ষার মতো ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ নিয়ে গবেষণা করা হতো। রোগগুলোর জীবাণু আগে এই বন্দীদের দেহেই প্রবেশ করানো হতো। যৌনরোগ নিয়ে গবেষণার জন্য বন্দী নারী-পুরুষদের বন্দুকের মুখে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করা হতো। পাশাপাশি ফ্রস্টবাইট, নতুন নতুন অস্ত্র আর বিষ্ফোরকের পরীক্ষাও করা হতো বন্দীদের উপর।

সবসময় কেবল জাপান কিংবা জার্মানীতে যুদ্ধবন্দীদের সাথে খারাপ আচরণের কথা উঠে আসলেও মার্কিন সেনারাও কিন্তু কম যায় নি। হয়তো তাদের নিষ্ঠুরতার মাত্রা অক্ষ শক্তির দেশগুলোর মতো হয় নি, তবে তাদের কাজগুলো সম্পর্কে জানলে সেটাকেও কম নৃশংস বলে মনে হবে না।

জাপানী যুদ্ধবন্দীদের মৃতদেহ ছিলো মার্কিন সেনাদের খেলার সামগ্রী। মৃতদেহগুলোকে বিকৃত করে এক অদ্ভুত আনন্দ পেত তারা, পাশাপাশি মৃতদেহ থেকে বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নিতো ট্রফি হিসেবে। এরপর আরো একধাপ এগিয়ে অনেকে আবার সেই কাটা অংশ পাঠিয়ে দিতো জাপানে, খোদ দুর্ভাগা মানুষটির বাড়িতেই! তাদের সবচেয়ে প্রিয় অংশ ছিলো কান, কারণ সেটা সহজেই কাটা যায়।

সবচেয়ে নিন্দনীয় ছিলো খুলি নিয়ে মজা করার বিষয়টি, যেমনটা এ ছবিতে দেখা যাচ্ছে। এ উদ্দেশ্যে তারা দুটি পথ অবলম্বন করতো- হয় খুলিকে সিদ্ধ করে চামড়া-মাংস ছাড়িয়ে নিতো, নাহয় সেটাকে ফেলে রাখতো কিছুদিন, যাতে করে পোকামাকড় খেয়ে মাংস থেকে হাড়কে আলাদা করে ফেলে।

৪) সোভিয়েত ভিন্ন মতাবলম্বীদের দুর্দশা

১৯৪৫ সালের কথা। সেই বছরের ৪-১১ ফেব্রুয়ারি সোভিয়েত ইউনিয়নের লিভ্যাডিয়া প্যালেসে অনুষ্ঠিত হয় ইয়াল্টা কনফারেন্স, যা ক্রিমিয়া কনফারেন্স নামেও অনেকের কাছে পরিচিত। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইউরোপের নানা বিষয় কীভাবে পরিচালিত হবে, সে সম্পর্কে আলোচনা করাই ছিলো এ কনফারেন্সের মূল উদ্দেশ্য। এখানে গৃহিত বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মাঝে একটি ছিলো যুদ্ধ শেষে এক মিত্র দেশে আটকা পড়া কিংবা বন্দী থাকা অপর মিত্র দেশের অধিবাসীদেরকে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হবে।

যুদ্ধ শেষে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লাখ লাখ ভিন্ন মতাবলম্বী সোভিয়েত নাগরিক রয়েছে, যারা স্বদেশে ফিরে যেতে অনিচ্ছুক। শুরুতে তাদেরকে ফেরত পাঠাতে ধরপাকড়ের আশ্রয় নিয়েছিলো মার্কিন কর্তৃপক্ষ। তখন কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ পর্যন্ত বেছে নেয়। এমন পরিস্থিতি এড়াতে এবার ছলনার আশ্রয় নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তারা লোকগুলোকে জানাতে থাকে, তাদেরকে অন্য আরেক জায়গায় পাঠানো হচ্ছে। এভাবে মিথ্যা বলে তাদেরকে আসলে সোভিয়েত ইউনিয়নেই ফেরত পাঠানো হয়েছিলো।

ভিন্ন মতাবলম্বীদের শেষ পরিণতি হয়েছিলো বেশ মর্মান্তিক। দেশ ত্যাগ সহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে তাদের অনেকের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। বাকিদেরকে পাঠিয়ে দেয়া হয় বিভিন্ন লেবার ক্যাম্পে, যেখানে আমৃত্যু কাজ করে যেতে হয়েছে মানুষগুলোকে।

৫) জার্মানির নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর দুর্ভাগ্য

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পাল্টে গিয়েছিলো বিশ্বের অনেক সমীকরণই। তেমনই এক সমীকরণের অংশ ছিলো জার্মানির বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সদস্যরা। মিত্র বাহিনীর দেশগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এ মানুষগুলোকে জার্মানিতে পাঠাতে হবে, সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে দরকারে আঙুল বাঁকা করে হলেও এমনটা করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলো তারা। সমস্যা হলো, এসব মানুষের সংখ্যা কয়েক হাজার কিংবা কয়েক লাখ ছিলো না। প্রায় এক থেকে দেড় কোটি জার্মান নৃতাত্ত্বিক জনগণ বাস করতো মিত্র বাহিনীর বিভিন্ন সদস্য দেশগুলোতে। তাদের অনেকের জন্মও হয়েছিলো সেখানেই।

পাশ্চাত্যের অনেক বইয়েই এদের ব্যাপারে উল্লেখ নেই। বাধ্যতামূলক এ অভিবাসনের সময় প্রাণ হারায় প্রায় পাঁচ লাখের মতো মানুষ। জার্মানিতে গিয়ে তাদের দুর্ভাগ্য যেন নতুন মাত্রা পেলো। থাকার জায়গার অভাবে তাদের ঠাই মিললো বিভিন্ন পরিত্যক্ত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে, তাদেরকে লাগানো হতে থাকলো বিভিন্ন শ্রমসাধ্য কাজকর্মে। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ ছিল নারী, বৃদ্ধ ও কিশোর-কিশোরী, যুদ্ধে অংশ নেয়া যাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না। এভাবেই মিত্র বাহিনীর আক্রোশের শিকার হয়েছিলো অগণিত নিরপরাধ মানুষ।


৬) স্টালিনের জ্বালাও-পোড়াও নীতি

যদি শত্রুপক্ষ কোনো এলাকা দখল করে নিতে যেত, তাহলে নাৎসি বাহিনী সেই এলাকার সকল খাদ্যশস্যে আগুন লাগিয়ে দিতো, যত পারতো স্থাপনা ধ্বংস করতো এবং ক্ষতি করতো সেখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থার। এর পেছনে তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো যেন প্রতিপক্ষ আর এগোতে না পারে। তবে হিটলারের এমন নীতি পছন্দ হয় নি নাৎসি বাহিনীর অনেক কর্মকর্তারই। সেজন্য তাদের অনেকেই এর প্রতিবাদ করেছিলেন। তাদের যুক্তি ছিলো, ভবিষ্যতে হয়তো এ স্থানটি তারা আবার দখল করতেও পারেন, তখন জায়গাটিতে ধ্বংসের পরিমাণ কম হলে সংস্কার কাজ সহজ হবে।

এমন ধ্বংসাত্মক মানসিকতা কেবল নাৎসি বাহিনীর মাঝেই ছিলো- এমনটা ভাবলে আপনি ভুল করবেন। কারণ মিত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা জোসেফ স্টালিনও একই নীতি অনুসরণ করতেন। সেনাবাহিনীর উপর তার কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিলো। ফলে তার নির্দেশ অমান্য করার দুঃসাহস সৈন্যরা দেখাতো না। কেবলমাত্র উচ্ছেদকরণের জন্যই সোভিয়েতদের আলাদা একটি ব্যাটালিয়ন ছিলো। জার্মানদের বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস করা, ফসল নষ্ট করা, শহর জ্বালিয়ে দেয়ার মতো কাজই ছিলো তাদের মূল উদ্দেশ্য।

স্টালিনের এ নীতির অন্যতম বড় শিকার হয়েছিলো ইউক্রেন। সেখানে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলো জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। উভয়পক্ষই চেয়েছিলো জ্বালাও-পোড়াও নীতির মাধ্যমে প্রতিপক্ষের অগ্রযাত্রাকে যেভাবেই হোক থামাতে। এজন্য তারা যেন প্রতিযোগিতা দিয়ে নেমেছিলো বিভিন্ন স্থাপনা আর খাদ্যশস্য ধ্বংসে। যুদ্ধ শেষে দেখা যায়, ইউক্রেনের স্থাপনার এক বিরাট অংশই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।