কলকাতার বাবুরা বলেছেন,”ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় করার কোন দরকার নেই।

কলকাতার বাবুরা বলেছেন,”ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় করার কোন দরকার নেই। ফার্মগেট আছে,ধানমণ্ডি আছে পাশে একটা কৃষি কলেজ করে দাও। “
এই ধরনের কায়েমী স্বার্থবাদী আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিটিশ লর্ডের কাছে গিয়ে শেরে বাংলা ফজলুল হক বোঝালেন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। এবার ব্রিটিশরা কিছুটা নমনীয় হল — কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হল একটু দেরীতে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক ।কলকাতার বাবুরা বলেছেন,”ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় করার কোন দরকার নেই। ফার্মগেট আছে,ধানমণ্ডি আছে পাশে একটা কৃষি কলেজ করে দাও। “
এই ধরনের কায়েমী স্বার্থবাদী আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিটিশ লর্ডের কাছে গিয়ে শেরে বাংলা ফজলুল হক বোঝালেন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। এবার ব্রিটিশরা কিছুটা নমনীয় হল — কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হল একটু দেরীতে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক ।
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯১৬ সালে মুসলিম লীগ এর সভাপতি নির্বাচিত হন । পরের বছর ১৯১৭ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এর সাধারণ সম্পাদক হন । তিনিই ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি যিনি একই সময়ে মুসলিম লীগ এর প্রেসিডেন্ট এবং কংগ্রেস এর জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন । ১৯১৮ -১৯ সালে জওহরলাল নেহেরু ছিলেন ফজলুল হকের ব্যক্তিগত সচিব ।
১৯৩৭ এর নির্বাচনে শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক ঘোষণা দিয়েছেন নির্বাচনে জিতলে তিনি জমিদারি প্রথা চিরতরে উচ্ছেদ করবেন।তিনি যাতে নির্বাচিত হতে না পারেন তার জন্য সারা বাংলাদেশ আর কলকাতার জমিদাররা একত্র হয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেছেন। লাভ হয়নি — কৃষকরা তাদের নেতাকে ভোট দিয়েছেন।
মুসলিম লীগ এর লাহোর অধিবেশনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বক্তব্য দিচ্ছেন । হঠাৎ করে একটা গুঞ্জন শুরু হলো, দেখা গেল জিন্নাহর বক্তব্যের দিকে কারও মনযোগ নাই । জিন্নাহ ভাবলেন, ঘটনা কী ? এবার দেখলেন, এক কোণার দরজা দিয়ে ফজলুল হক সভামঞ্চে প্রবেশ করছেন, সবার আকর্ষণ এখন তার দিকে । জিন্নাহ তখন বললেন — When the tiger arrives, the lamb must give away. এই সম্মেলনেই তিনি উত্থাপন করেছিলেন ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব ।
১৯৪০ সালের ২২-২৪ শে মার্চ লাহোরের ইকবাল পার্কে মুসলিম লীগের কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এই কনফারেন্সে বাংলার বাঘ আবুল কাশেম ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি তার প্রস্তাবে বলেন, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বাস্তবতায় হিন্দু মুসলিম একসাথে বসবাস অসম্ভব। সমাধান হচ্ছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র এবং পূর্বাঞ্চলে বাংলা ও আসাম নিয়ে আরেকটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।
পাঞ্জাবের মওলানা জাফর আলী খান, সীমান্ত প্রদেশের সর্দার আওরঙ্গজেব, সিন্ধের স্যার আব্দুল্লাহ হারুন, বেলুচিস্তানের কাজী ঈসা ফজলুল হকের প্রস্তাব সমর্থন করেন। কনফারেন্সে এই প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়।
লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের সময়ে হিন্দুপ্রধান প্রদেশগুলোতে মুসলিম নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকার কারণে ফজলুল হক খুবই উদ্বিগ্ন এবং কিছুটা উত্তেজিত ছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে একবার বলেন, ‘ আমি আগে মুসলিম, পরে বাঙালী (muslim first, bengali afterwards)’। বক্তৃতার এক পর্যায়ে এসে বলেন, ‘কংগ্রেস শাসিত রাজ্যগুলোতে যদি আর কোনো মুসলিম নির্যাতিত হয় তাহলে আমি বাংলার হিন্দুদের উপর তার প্রতিশোধ নেব।’
যে ফজলুল হক তিন বছর আগে সোহরাওয়ার্দী, নাজিমউদ্দিনকে রেখে শ্যামাপ্রসাদের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছেন সেই ফজলুল হকের মুখে এমন বক্তব্য তখনকার ভারতে ব্যাপক আলোড়ন সৃাষ্ট করেছিল।
বর্তমানে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র তার ভিত্তি হচ্ছে লাহোর প্রস্তাব। তাই ২৩ শে মার্চ কে পাকিস্তানে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
কিন্তু লাহোর প্রস্তাব পাশ হওয়ার কয়েকদিন পরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চালাকির আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবটি টাইপ করার সময়ে ভুল করে muslim majority states লেখা হয়েছে; আসলে হবে state । জিন্নাহর ধারণা ছিল, দেন-দরবার করে দুই পাশে দুইটা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই স্টেটস এর জায়গায় স্টেট লিখে একটা মুসলিম মেজরিটি রাষ্ট্র করতে হবে।
জিন্নাহর এই ধূর্ততার কারণে ফজলুল হক তার সাথে পাকিস্তান আন্দোলনে সম্পৃক্ত হননি। তরুণ শেখ মুজিব যখন জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তখন অভিজ্ঞ ফজলুল হক পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন। ‘তিঁনি অনুমান করতে পেরেছিলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে কী কী দুর্দশা হবে বাংলার মানুষের। তাই তিঁনি পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন…….”বাংলার মাটিও তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেছি, তখনই বাধা পেয়েছি। একদিন আমার মনে আছে একটা সভা করছিলাম আমার নিজের ইউনিয়নে, হক সাহেব কেন লীগ ত্যাগ করলেন, কেন পাকিস্তান চাননা এখন? কেন তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সাথে মিলে মন্ত্রীসভা গঠন করেছেন? এই সমস্ত আলোচনা করছিলাম, হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লোক যিনি আমার দাদার খুব ভক্ত, আমাদের বাড়িতে সকল সময়েই আসতেন, আমাদের বংশের সকলকে খুব শ্রদ্ধা করতেন- দাঁড়িয়ে বললেন,”যাহা কিছু বলার বলেন, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলবেন না। তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাই না। জিন্নাহ কে? তার নামও তো শুনি নাই। আমাদের গরিবের বন্ধু হক সাহেব।” এ কথার পর আমি অন্যভাবে বক্তৃতা দিতে শুরু করলাম। সোজাসুজিভাবে আর হক সাহেবকে দোষ দিতে চেষ্টা করলাম না। কেন পাকিস্তান আমাদের প্রতিষ্ঠা করতেই হবে তাই বুঝালাম। শুধু এইটুকু না, যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কালো পতাকা দেখাতে গিয়েছি, তখনই জনসাধারণ আমাদের মারপিট করেছে। অনেক সময় ছাত্রদের নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি, মার খেয়ে।”
বঙ্গবন্ধু ‘ র বাবা বলেছেন , ” বাবা তুমি যাই করো শেরে বাংলার বিরুদ্ধে কিছু বলো না। শেরে বাংলা এমনি এমনি শেরে বাংলা হয়নি। “
ফজলুল হক জানতেন মাঝখানে ভারতকে রেখে পশ্চিম আর পূর্বে জোড়া দিয়ে এক পাকিস্তান করলে তা কখনো টিকবে না। ‘ জিন্নাহ আমার লাহোর প্রস্তাবের খৎনা করে ফেলেছে -বলে ফজলুল হক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় থাকেননি।
১৯৪৬ এ এসে জিন্নাহ সোহরাওয়ার্দীর দুই বাংলা একত্র করে স্বাধীন যুক্তবাংলার দাবী মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণে শেষ পর্যন্ত বাংলাও ভাগ করতে হল।
ফজলুল হক বলেছিলেন, একটি পাকিস্তান কখনও টিকবে না। বাংলা এবং আসামকে নিয়ে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র করতে হবে।
১৯৭১ সালে এসে দেখা গেল, ফজলুল হকের আশঙ্কা এবং ভবিষ্যতবাণী সঠিক। ১৯৭১ এর মত এমন কিছু যে ঘটবে শেরে বাংলা ফজলুল হক তা আঁচ করতে পেরেছিলেন ১৯৪০ সালেই। তাই তিনি ১৯৪০ সালেই বাংলা আর আসাম নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র করতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক।
১৯৭১ এর যুদ্ধ হল ফজলুল হকের লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন। লাহোর প্রস্তাব ফজলুল হক যেভাবে উত্থাপন করে ছিলেন সেভাবে মানলে একাত্তরে এই দেশে রক্তগঙ্গা বইত না।
পেশাজীবনে ‘কলকাতা হাইকোর্টের নামকরা আইনজীবী ছিলেন। একদিন তাঁর জুনিয়র হাতে একগাদা পত্রিকা নিয়ে এসে বললেন, ” স্যার , দেখুন , কলকাতার পত্রিকাগুলো পাতার পর পাতা লিখে আপনার দুর্নাম ছড়িয়ে যাচ্ছে — আপনি কিছু বলছেন না । ” তিঁনি বললেন, ” ওরা আমার বিরুদ্ধে লিখছে তার মানে হল আমি আসলেই পুর্ব বাংলার মুসলমান কৃষকদের জন্য কিছু করছি। যেদিন ওরা আমার প্রশংসা করবে সেদিন মনে করবে বাংলার কৃষক বিপদে আছে। “
মুহাম্মদ ওয়াজেদ আলী বরিশাল বারের নামকরা উকিল । একবার ওয়াজেদ আলী র প্রতিপক্ষ মামলার ইস্যু জটিল হওয়ার কারণে কলকাতা থেকে তরুণ উকিল ফজলুল হককে নিয়ে আসে ওয়াজেদ আলীকে মোকাবেলা করার জন্য । ফজলুল হক ওই সময়ে কেবলমাত্র ফজলুল হক , শেরে বাংলা তখনও হননি । তিনি মামলা লড়তে এসেছেন , কিন্তু বিপক্ষের উকিল কে সেই খবর জানতেন না ।
কোর্টে এসে দেখলেন বিপক্ষে তার বাবা ওয়াজেদ আলী দাঁড়িয়েছেন । ফজলুল হক স্বাভাবিকভাবে যুক্তিতর্ক শুরু করলেন ।
এক পর্যায়ে ওয়াজেদ আলী আদালতকে উদ্দেশ করে বললেন , “ ইনি যা বলছেন তা আইনসংগত না । আইনটা হল আসলে এরকম এরকম ……. ইনি নতুন উকিল তো আইন কানুন ভালো বোঝেন না । “
উত্তরে ফজলুল হক বললেন , “ তিনি পুরাতন অভিজ্ঞ উকিল হলে কী হবে ? তিনি হচ্ছেন কৃষকের ছেলে উকিল ( প্রকৃতপক্ষে তার দাদা আকরাম আলী ছিলেন ফারসি ভাষার পন্ডিত ) , তিনি আইনের কী আর বোঝেন ? আমি হচ্ছি উকিলের ছেলে উকিল , যুক্তি আমারটাই ঠিক । “
খ্যাতির সাথে ৪০ বছর ধরে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি করেছেন । আইন পাশ করার আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্স কেমেস্ট্রি আর ম্যাথমেটিক্সে ট্রিপল অনার্স করেছেন । মাস্টার্স করেছেন ম্যাথমেটিক্স এ । ছোটবেলায় একবার পড়ে বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলার গল্প রূপকথার মত এদেশের সবার মুখে মুখে ।
বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের বাজেট অধিবেশনে একজন এম পি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে বক্তব্য দিতে লাগলেন । ঐ এম পি শেরে বাংলার বিরুদ্ধে গানও লিখে এনেছেন এবং সংসদের বাজেট বক্তুতা করতে গিয়ে সেই গানটি হেলেদুলে কর্কশ কণ্ঠে গাইতে শুরু করলেন । এরকম পরিস্থিতিতে যে কারও পক্ষে মাথা ঠাণ্ডা রাখা মুশকিল ।
শেরে বাংলা ঐ এমপি র বক্তব্যের মধ্যেই বলে উঠলেন — “Mr Speaker, I can jolly well face the music, but I cannot face a monkey.”
এবার ঘটলো মারাত্মক বিপত্তি । তার মত নেতার কাছ থেকে এরকম মন্তব্য কেউ আশা করেনি । এদিকে , ঐ এম পি স্পিকারের কাছে দাবী জানালেন — এই মুহূর্তে ক্ষমা চাইতে হবে এবং এই অসংসদীয় বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে । স্পিকার পড়লেন আরেক বিপদে — তিনি কীভাবে এত বড় একজন নেতাকে এই আদেশ দেবেন ।
শেরে বাংলা ছিলেন ঠাণ্ডা মাথার বুদ্ধিমান মানুষ । তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন — ” Mr. Speaker, I never mentioned any honourable member of this House. But if any honourable member thinks that the cap fits him, I withdraw my remark.”
‘জ্ঞানতাপস প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক তাঁর জীবনী লিখতে চান জেনে বলেছিলেন, ” রাজ্জাক, সত্যি বলো, তোমার মতলবটা আসলে কী ? ” প্রফেসর রাজ্জাক বললেন, ” আমার এই বিষয়টা খুব ভালো লাগে —- আপনি যখন ইংরেজদের সাথে চলেন তখন মনে হয় আপনি জাত ইংরেজ। যখন বরিশালে আসেন মনে হয় আপনি বহুবছর ধরে নিজেই কৃষিকাজ করেন। আবার যখন কলকাতায় শ্যামাপ্রসাদ বাবুকে ভাই বলে ডাক দেন তখন আপনাকে আসলেই হিন্দু মনে হয়। আবার যখন ঢাকার নবাব বাড়িতে ঘুড়ি উড়ান তখন মনে হয় আপনিও নবাব পরিবারের একজন । নিজেকে কেউ আপনার মত এত পাল্টাতে পারে না। আপনি যাই বলেন, সত্য হোক — মিথ্যা হোক, মানুষ বিনা দ্বিধায় তা বিশ্বাস করে। “
মহাত্মা গান্ধী র নাতি রাজমোহন গান্ধী তার বইতে লিখেছেন — তিন নেতার মাজারে তিনজন নেতা শায়িত আছেন যার মধ্যে দুজন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন । একজনকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দেওয়া হয়নি, অথচ তিনিই ছিলেন সত্যিকারের বাঘ ।
কিন্তু এটা তার জীবনের কোনো অপূর্ণতা নয়, একমাত্র রাষ্ট্রপতি হওয়া ছাড়া সম্ভাব্য সব ধরনের পদে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে । তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী, পূর্ব বাংলার তৃতীয় মুখ্য মন্ত্রী; পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পূর্ব – পাকিস্তানের গভর্নর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ।
সর্বভারতীয় রাজনীতি ছেড়ে শুধু পূর্ববাংলার রাজনীতি কেন করছেন এই প্রশ্নের উত্তরে ফজলুল হক বলেছিলেন — এরোপ্লেন এ উঠলে নিচের জিনিস ছোট আর ঝাপসা দেখাতে পারে, তাই আমি মাটিতেই থাকছি । রাজনীতির এরাপ্লেন এ না চড়লেও সৌদি বাদশাহ সউদ ফজলুল হকের সাথে একটা মিটিং করার জন্য নিজের ব্যক্তিগত বিমান পাঠিয়েছিলেন ফজলুল হককে নিয়ে যাওয়ার জন্য ।
অসীম সাহসী এই মানুষটি আমাদেরকে সকল অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে প্রতিবাদ করার কথা বলেছেন। বাঙালী জাতিকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন অনেক আগেই । তিনি বলেছেন, যে জাতি তার বাচ্চাদের বিড়ালের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ায়, তারা সিংহের সাথে লড়াই করা কিভাবে শিখবে ?
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছিলেন ফজলুল হকের শিক্ষক। আবুল মনসুর আহমদের সাথে আলাপচারিতায় ফজলুল হক সম্পর্কে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মন্তব্য :
“ফযলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাঙ্গালী।সেই সঙ্গে ফযলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি মুসলমান।খাঁটি বাঙ্গালীত্বের সাথে খাটি মুসলমানত্বের এমন অপূর্ব সমন্বয় আমি আর দেখি নাই। ফযলুল হক আমার ছাত্র বলে বলছিনা, সত্য বলেই বলছি।খাঁটি বাঙ্গালীত্ব ও খাটি মুসলমানত্বের সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ বাঙ্গালীর জাতীয়তা।”
রেফারেন্স: আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর।(পৃষ্ঠা ১৩৫-৩৬)
পহেলা বৈশাখের সরকারি ছুটি, বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা এই ফজলুল হকের অবদান । কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে ফজলুল হক মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন কারণ কৃষক–শ্রমিক সংখ্যাগরিষ্ঠ এই উপমহাদেশে মাত্র একজন ব্যক্তি কৃষকদের জন্য রাজনীতি করেছেন । তিঁনি হলেন — শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ।
১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসেছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বললে ছাত্ররা তীব্র প্রতিবাদ করে। জিন্নাহ ছাত্রদের সাথে বৈঠকও করেন। কিন্তু ছাত্ররা ছিল নাছোড়বান্দা। জিন্নাহর ধারণা হলো, ফজলুল হক ছাত্রদেরকে উসকানি দিচ্ছেন। ফজলুল হকের বুদ্ধিতে ছাত্ররা উর্দুর বিরোধিতা করছে। জিন্নাহ এবার ফজলুল হকের সাথে দেখা করতে চাইলেন। কিন্তু ফজলুল হক দেখা করতে রাজি হলেন না। ফজলুল হক জিন্নাহকে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করতেন।
জিন্নাহর পীড়াপিড়িতে শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন ফজলুল হক। বন্ধ দরজার আড়ালে কথা হয়েছিল দুই মহান নেতার। কিন্তু ইংরেজিতে কী ধরনের বাক্য বিনিময় হয়েছিল তাদের মধ্যে পরবর্তীতে তা লিখেছেন ফজলুল হকের একান্ত সহকারী আজিজুল হক শাহজাহান —
জিন্নাহ : পাকিস্তান তো তুমি কোনোদিন চাওনি। সব সময়ে বিরোধিতা করে এসেছো।
হক : প্রস্তাবটি তো আমিই করেছিলাম। পরে ওটার খতনা করা হয়েছে। আমি এটা চাইনি।
জিন্নাহ: পাকিস্তানের এই অংশ বেঁচে থাক তা তুমি চাও না। তাই ভারতের কংগ্রেসের টাকা এনে ছাত্রদের মাথা খারাপ করে দিয়েছ। তারা আমাকে হেস্তনেস্ত করছে।
হক: আমি এখানে কোনো রাজনীতি করি না। হাইকোর্টে শুধু মামলা নিয়ে চিন্তা করি। আইন আদালত নিয়ে থাকি ।
জিন্নাহ : জানো, তুমি কার সাথে কথা বলছো ?
হক: আমি আমার এক পুরোনো বন্ধুর সাথে কথা বলছি।
জিন্নাহ: নো নো, ইউ আর টকিং উইথ দ্য গভর্নর জেনারেল অব পাকিস্তান ।
হক: একজন কনস্টিটিউশনাল গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা আমি জানি।
জিন্নাহ: জানো, তোমাকে আমি কী করতে পারি ?
হক: (ডান হাতের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে) তুমি আমার এ্যাই করতে পারো। মিস্টার জিন্নাহ, ভুলে যাওয়া উচিত নয় এটা বাংলাদেশ এবং তুমি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সাথে কথা বলছ।
(আজিজুল হক শাহজাহানের কলাম,অমরাবতী প্রকাশনী,ঢাকা;পৃষ্ঠা ৪৬-৪৭)
২৬ শে অক্টোবরে শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের ১৪৬ তম জন্মবার্ষিকীো।
জন্ম-২৬ অক্টোবর ১৮৭৩মৃত্যু-২৭ এপ্রিল ১৯৬২ (বয়স ৮৮)

দুনিয়াটাই চলছে #ডাবল_স্টান্ডার্ড থিউরীতে!!!

কলেজ লাইফে “#মাসুদ_রানা” সিরিজের একটি বই পড়েছিলাম #ডাবল_এজেন্ট নামে । পড়ে ভেবেছিলাম এ ও কি সম্ভব??!! এখন দেখছি দুনিয়াটাই চলছে #ডাবল_স্টান্ডার্ড থিউরীতে!!!

দাঙ্গার সময়ে হিন্দুত্ববাদীরা গুজরাটে পাঁচ শতাধিক মসজিদ ও মুসলিম স্কলারদের দরগা ধ্বংস করেছিলো। এর মধ্যে উর্দু কবি ওয়ালি মহম্মদের দরগা দাঙ্গাকারীরা গুঁড়িয়ে দেয়ার পরে, সেখানে রাতারাতি গুজরাট সরকার রাস্তা বানিয়ে ফেলে যেন সেই দরগা কখনো পুননির্মাণ না করা যায়।
আফগানিস্তানে তালিবানরা বিশ্ব ঐতিহ্যের #বামিয়ানা_বৌদ্ধমন্দির ধ্বংস করার পর সারা দুনিয়ায় তালিবানরা “বর্বর” হিসেবে অভিহিত হয়। কিন্তু মোদীর বিজেপি বিশ্ব ঐতিহ্যের #বাবরী_মসজিদ ধ্বংস করার পর কেউ কি তাকে বর্বর বলে??
বিঃদ্রঃ অথচ তালেবানরা যখন বৌদ্ধমন্দির ভেংঙ্গেছে তখন সেখানে কোন বৌদ্ধের অস্তিত্ব ছিলোনা। তারপরও উগ্রবাদী মিডিয়া,মানবতাবাদীদের জ্বালাপোঁড়া।

গান্ধী নয়, প্রথম ভারত ছাড়ো স্লোগান দিয়েছিলেন ইউসুফ মেহের আলী

ইতিহাস কথা বলে। বিশেষ করে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস, ভারতের স্বাধীনতা দিবসে দেশের ইতিহাস নিয়ে বেশি আলোচনা হয়। কিন্তু জানেন কি বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে ‘ভারত ছাড়ো’ (Quit India) এই স্লোগানটি প্রথম কে দিয়েছেন? এই দুটি শব্দ প্রথম ব্যবহার করেছিলেন কংগ্রেস নেতা ইউসুফ মেহের আলি৷ এই স্লোগান পরবর্তী কালে ইংরেজদের কাপুনী ধরিয়ে দিয়েছিলো।
এটা ঠিক ১৯৪২ সালের ৮ অগস্ট গান্ধাজি মুম্বইয়ের গোয়ালিয়া ট্যাঙ্ক ময়দানে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির বৈঠকে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন৷ সেই আন্দোলনের সময়ই তিনি ডাক দেন ‘‘করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে’’৷ শুধু তাই নয় গান্ধীর গ্রেফতারের পরেও কয়েক মাস ধরে গোটা ভারতরবর্ষ জুড়ে ব্রিটিশ বিরোধী এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে দেখা গিয়েছিল৷ কিন্তু এই ‘ভারত ছাড়ো’ স্লোগানটি ইউসুফ মেহের আলি নামে এক কংগ্রেস নেতার উদ্ভাবন৷
‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন শুরুর বেশ কিছু দিন আগে মুম্বইতে গান্ধীর ঘনিষ্ঠদের নিয়ে কংগ্রসের এক বৈঠকে এই শব্দ দুটি ব্যবহার করেছিলেন মেহেরআলি, তিনি সেই সময় মুম্বাইয়ের মেয়র ছিলেন৷ স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য এই ইউসুফ মেহারালি আটবার জেলে যান৷ গান্ধীর সঙ্গে মেহের আলিও ১৯৪২ সালের ৯ আগষ্ট গ্রেফতার হয়েছিলেন৷ পরে ১৯৪৬ সালে তিনি জেল থেকে ছাড়া পান এবং স্বাধীন ভারতে এমএলও হয়েছিলেন৷ তিনিই কংগ্রেস সোশালিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৫০ সালে মুম্বাইয়ে তাঁর মৃত্যু হয়৷
কে গোপালস্বামীর বই ‘Gandhi and Bombay’তে বর্ণনা করেছেন একেবারে পরাধীন ভারতের শেষ কয়েকটা বছর এই ‘ভারত ছাড়ো’ স্লোগানটি দেশজুড়ে আধিপত্য বিস্তার লাভ করেছিল৷ সেখানে বলা হয়েছে, শান্তিকুমার মোরারজির রেকর্ড অনুসারে গান্ধী তাঁর সহকর্মীদের বলেছিলো স্বাধীনতার জন্য শ্রেষ্ঠ স্লোগান তৈরি করতে৷ প্রথমে একজন করেছিলেন ‘বেরিয়ে যাও’( ‘Get out’) ৷ কিন্তু সেটা গান্ধীর পছন্দ হয়নি৷
রাজাগোপালাচারি বলেছিলেন ‘অপসারণ অথবা প্রত্যাহার’ (Retreat’ or ‘Withdraw)৷ কিন্তু সেটাও গান্ধীর মনোমত হয়নি৷ অবশেষে ইউসুফ মেহের আলি দিয়েছিলেন ‘ভারত ছাড়ো’ সেটা গান্ধী অনুমোদন করে৷
মেহের আলির জীবনীকার মধু দন্ডপত ১৯৪২ সালে আন্দোলন শুরুর আগে ‘ভারত ছাড়ো’ নামে একটি বুকলেট প্রকাশ করেন৷ যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিক্রি হয়েগিয়েছিল৷ তাছাড়া ৭ অগস্ট কংগ্রেস কমিটি বৈঠক শুরুর আগেই এই স্লোগানকে জনপ্রিয় করতে ‘ভারত ছাড়ো’ ব্যাচ ছাপানো হয়েছিল-এ কথা জানিয়েছেন ইউসুফ মেহের আলি সেন্টারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জিসি পারেখ৷ এই জিসি পারেখও ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ১৭ বছর ৷

বাবরী মসজিদ ও মুঘল সম্রাট প্রসঙ্গঃ

বাবরী মসজিদ যেসব সাম্প্রদায়িক হিন্দরা ভেঙেছিল তারাইতো এখন ক্ষমতা মসনদে । সুতরাং রায়টা যে তাদের পক্ষে যাবে তা আগেই ধারণা করেছেছল আমার মত অনেকেই।যেখান বিচার বিভাগ যোগীদের কব্জায় সেখানে এরচেয়ে বেশি কি আশা করা যায়??আমি তেমন কষ্ট পাইনি । কারণ আমার এই রায় গ্রহণ করার মানসিক প্রস্তুতি ছিল । তাছাড়া এটা এমন নয় যে এই মসজিদে নামাজ পড়তেই হবে । আমাদের মসজিদ গোয়ালঘর,কবরস্থান ও হাম্মাম ছাড়া সারা দুনিয়া । বরং প্রয়োজনে মন্দিরেও নামাজ হয়ে যাবে ।আজ আমার সকল ক্ষেদ #মোগল_শাষকদের প্রতি যারা ভারতে মুসলীমদের শিক্ষার উন্নয়ন না করে নারী ও মদ নিয়ে মত্ত ছিল । ভারতবর্ষে মুসলীম শাষকদের মধ্যে সর্বোত্তম ছিলেন #সম্রাট_বাবর এবং সর্ব নিকৃষ্ট ছিলেন #সম্রাট_শাহ_জাহান ।আর শাহজাহানের দাদা #সম্রাট_আকবরতো ছিল #কাট্টা_কাফের । আমরা আশা করেছিলাম তাজমহলটা ভাঙ্গবে । এখনো আশা করছি উগ্র হিন্দুরা #তাজমহল ভেঙ্গে ফেলুক ইনশাল্লাহ। কিন্ত এই আশা কখনোই পূর্ণ হবে বলে মনে হয়না । কারণ ওখান থেকে হাজার হাজার কোটি রুপি আয় হচ্ছে যোগীদের ট্যুরিজম খাত থেকে । সম্রাট শাহ জাহান ছিল মূর্খ,গোয়ার,একরোখা ও বেয়াকুফ । সম্রাট শাহ জাহান তার স্ত্রীর মাজার তৈরী করার জন্য সমগ্র ভারতে দীর্ঘ ২০ বছরের সকল ও টেক্সের টাকা দিয়ে শয়তানী এই মাজার বানিয়েছে যেখানে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল ২২হাজার মুসলীম স্থাপত্য ইঞ্জিনিয়ার ও কারিগরদের যারা ছিল তৎকালীন দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ট।এবং কথিত আছে সম্রাট শহ জাহান শত শত ইঞ্জিনিয়ারকে হত্যা করেছিল এই জন্য যে তারা যেন এমন একটি বিল্ডিং আর বানাতে না পারে ।ঐ সময় এই টাকা দিয়ে সে মুসলীমদের শিক্ষা ও বিজ্ঞানের উন্নয়নের জন্য ২০০ বিশ্ববিদ্যালয় বানাতে পারতো ।অথচ তখন মুসলীমরা নেংটি পড়ে থাকতো । আর এই মুসলীমদের পয়সায় শাহজহান তার স্ত্রী মমতাজের মাজার বানাচ্ছিলো আর তার বড় ছেলে দাড়াশিকো ২০০নারী নিয়ে স্ফুর্তীতে মত্ত ছিলো । উল্লেখ্য যে, শাহ জাহান তার আসল নাম নয় । তার আসল নাম শাহবুদ্দিন মুহাম্মদ। শাহ জাহান একটি কুফরী নাম যার অর্থ #জগতের_বাদশা।জগতের বাদশা একমাত্র আল্লাহ । এই নাম সে নিজেই দিয়েছিল।তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং তার হিন্দু #রাজপুত স্ত্রী তাজ বিবি বিলকিস মাকানি-র সন্তান ছিলেন যিনি সিংহাসন আরোজনের পূর্ব পর্যন্ত শাহাজাদা খুররাম নামে পরিচিত ছিলেন।

মহান উসমানি খিলাফতের সকল সুলতানদের নাম ও শাসনকাল-

১) সুলতান প্রথম উসমান (১২৯৯-১৩২৬)ইং [উসমানি সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা]
২) সুলতান প্রথম ওরহান (১৩২৬-১৩৫৯) [ঐতিহাসিক ‘জেনেসারি’ সৈন্যবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা]
৩) সুলতান প্রথম মুরাদ (১৩৫৯-১৩৮৯)
৪) সুলতান প্রথম বায়েজিদ (১৩৮৯-১৪০৩) [The Thunder/বজ্রকড়ক উপাধি খ্যাত]
৫) সুলতান প্রথম মুহাম্মাদ (১৪০৩-১৪২১) [উসমানি সালতানাতের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা]
৬) সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ (১৪২১-১৪৫১)
৭) সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ (১৪৫১-১৪৮১) [The Conqueror/বিজেতা, রাসূল স:-এর ভবিষ্যত বাণীকে বাস্তবায়নকারী]
৮) সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ (১৪৮১-১৫১২)
৯) সুলতান প্রথম সেলিম (১৫১২-১৫২০) [হেজাজ-মিসর-সিরিয়া বিজয় করে খেলাফতের মহান দায়িত্বভার গ্রহণকারী]
১০) সুলতান সুলাইমান আল-কানুনি (১৫২০-১৫৬৬) [The Magnificent-Great. তাঁর যুগকে বলা হতো উসমানিদের স্বর্ণযুগ, তাঁর প্রতিটা অভিযানকে তিনি জিহাদ বলে উল্লেখ করেছেন]
১১) সুলতান দ্বিতীয় সেলিম (১৫৬৬-১৫৭৪)
১২) সুলতান তৃতীয় মুরাদ (১৫৭৪-১৫৯৫)
১৩) সুলতান তৃতীয় মুহাম্মাদ (১৫৯৫-১৬০৩)
১৪) সুলতান প্রথম আহমাদ (১৬০৩-১৬১৭)
১৫) সুলতান প্রথম মুস্তাফা (১৬১৭-তিনমাস)
১৬) সুলতান দ্বিতীয় উসমান (১৬১৭-১৬২৩)
১৭) সুলতান চতুর্থ মুরাদ (১৬২৪-১৬৪০) [বাগদাদ বিজেতা]
১৮) সুলতান প্রথম ইবরাহীম (১৬৪০-১৬৪৮)
১৯) সুলতান চতুর্থ ইবরাহীম (১৬৪৮-১৬৮৭)
২০) সুলতান দ্বিতীয় সুলাইমান (১৬৮৭-১৬৯১)
২১) সুলতান দ্বিতীয় আহমাদ (১৬৯১-১৬৯৫)
২২) সুলতান দ্বিতীয় মুস্তাফা (১৬৯৫-১৭০৩)
২৩) সুলতান তৃতীয় আহমাদ (১৭০৩-১৭৩০) [লিলি ফুল প্রেমি সুলতান]
২৪) সুলতান প্রথম মাহমুদ (১৭৩০-১৭৫৪)
২৫) সুলতান তৃতীয় উসমান (১৭৫৪-১৭৫৭)
২৬) সুলতান তৃতীয় মুস্তাফা (১৭৫৭-১৭৭৩)
২৭) সুলতান প্রথম আবদুল হামিদ (১৭৭৩-১৭৮৯)
২৮) সুলতান তৃতীয় সেলিম (১৭৮৯-১৮০৭)
২৯) সুলতান চতুর্থ মুস্তাফা (১৮০৭-১৮০৮)
৩০) সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ (১৮০৮-১৮৩৯) [ঐতিহাসিক জেনেসারি সৈন্যবাহিনীর বিলুপ্তকারী]
৩১) সুলতান প্রথম আবদুল মজিদ (১৮৩৯-১৮৬১)
৩২) সুলতান আবদুল আযীয (১৮৬১-১৮৭১)
৩৩) সুলতান পঞ্চম মুরাদ (১৮৭১-১৮৭৬)
৩৪) সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ (১৮৭৬-১৯০৯) [মাজলুম সুলতান]
৩৫) সুলতান পঞ্চম মুহাম্মদ রাশাদ (১৯০৯-১৯১৮)
৩৬) সুলতান ষষ্ঠ মুহাম্মদ (১৯১৮-১৯২২)
৩৭) সুলতান দ্বিতীয় আবদুল মজিদ (১৯২২-১৯২৪) [হতভাগা সুলতান]

দাজ্জালের আলোচনা

দাজ্জালের আলোচনা-১
হযরত ইমরান বিন হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘হযরত আদম (আঃ) এর জন্ম থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দাজ্জালের ফিতনার চেয়ে বড় ফিতনা আর কোনো কিছুই হবে না। (সহীহ মুসলিম)
দাজ্জালের আলোচনা উম্মতের জন্য একটি অতিব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রায় সকল মুসলমানই জাহিলী সভ্যতা-সংস্কৃতিতে মজে সেই আলোচনা থেকে উদাসীন। দাজ্জাল আবির্ভাবের যতগুলো আলামত রয়েছে, তন্মধ্যে এটিও একটি যে, সে সময় মানুষ দাজ্জালের আলোচনা ভুলে যাবে।
সুতরাং আপনি যদি নিজেকে ও পরিবারের লোকজনকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা করার ইচ্ছে রাখেন, এর জন্য মুসলমানদেরর ঘরে ঘরে এর আলোচনা খুবই জরুরী। যাতে আপনার কোলে বেড়ে ওঠা শিশুটি তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুশমন দাজ্জাল সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করতে পারে।

দাজ্জাল সম্পর্কে ইহুদিদের দৃষ্টিভঙ্গিঃ
সে ইহুদিদের সম্রাট হবে। সকল ইহুদীকে বাইতুল মুকাদ্দাসে আবাদ করবে। সমস্ত পৃথিবীর উপর ইহুদিদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। পৃথিবীতে ইহুদিদের কোনো ভয় থাকবে না। সকল সন্ত্রাসবাদীকে নির্মূল করে ফেলবে এবং সর্বত্র শান্তি ও সুবিচারের রাজত্ব কায়েম হয়ে যাবে। সমগ্র পৃথিবীর সকল ইহুদিদেরকে ইসরায়েলে এনে জমায়েত করবে।।

দাজ্জালের ফিতনা-২

দাজ্জালের ফিতনা কতটা ভয়ংকর একটি বিষয় দ্বারাই অনুমান করা যায় যে, স্বয়ং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন এবং তিনি যখন সাহাবায়ে কেরামের সামনে এই ফিতনার আলোচনা করতেন, তখন তাঁদের চেহারায় ভয়ের ছাপ পরিলক্ষিত হত। প্রশ্ন হলো, দাজ্জালের ফিতনায় সেই বিষয় কোনটি, যেটি সাহাবিদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল? সেটা কি ভয়াবহ যুদ্ধ নাকি মৃত্যু? কিন্তু সাহাবাগণ এ বিষয়গুলোকে ভয় পাওয়ার মতো মানুষ ছিলেন না।
সেই বিষয়টা হচ্ছে, দাজ্জালের ধোঁকা এবং প্রতারণা। সে সময়টা এত ভয়াবহ হবে যে, বাস্তব অবস্থাটা আসলে কি তা বুঝাই সম্ভব হবে না। মানুষকে বিভ্রান্তকারী নেতার ছড়াছড়ি থাকবে। অপপ্রচারের হালচাল এমন হবে যে, মূহুর্তের মধ্যে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যা বানিয়ে পৃথিবীর কোনায় কোনায় পৌঁছে দেওয়া হবে। মানবতার শত্রুকে মুক্তিদাতা আর মুক্তিদাতাকে সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করা হবে।
এ কারনেই প্রিয়নবী (সাঃ) দাজ্জালের ফিতনাকে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। তার গঠন, আকৃতি ও আত্মপ্রকাশের স্থান পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, সাধারণ মানুষ তো বটে, বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও এই ফিতনার আলোচনা একদম ছেড়ে দিয়েছেন। অথচ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার এই ফিতনার আলোচনা করে বলেছেন, “আমি বিষয়টি তোমাদেরকে বারবার আলোচনা এজন্য করছি, যাতে তোমরা বিষয়টি ভুলে না যাও। তোমরা বিষয়টি উপলব্ধি করো, তাতে গবেষণা করো এবং অন্যদের কানে পৌঁছে দাও।”

পর্ব-৩
দাজ্জালের গঠন-প্রকৃতিঃ
হযরত উবাদাহ বিন সামেত, আব্দুল্লাহ বিন ওমর ও আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদের কাছে দাজ্জাল সম্পর্কে বারবার আলোচনা করেছি, তবুও আশংকা করছি যে, তোমরা তার প্রকৃত অবস্থা হয়ত নাও বুঝতে পারো। জেনে রাখ, মাসীহে দাজ্জাল হবে খাট ও মোটা, পায়ের নলা লম্বা লম্বা এবং হালকা বাঁকা। মাথার চুলগুলো খুব ঘন, কোঁকড়ানো এবং জটবাঁধা। তার বাম চক্ষু কানা, দেখতে যেন ফোলা আঙুরের মতো। আর ডান চক্ষু সমান। চোখ সিসার মতো সবুজ হবে। এরপরও যদি সন্দেহে পড়ে যাও, তবে একথা মনে রাখবে যে, তোমাদের রব অবশ্যই কানা নন। তার দুচোখের মাঝখানে (আরবীতে) ‘কাফের’ লিখা থাকবে। যেটি লেখাপড়া জানা অজানা সব মুমিন পড়তে পারবে। তার সঙ্গে জান্নাত ও জাহান্নাম থাকবে। কিন্তু মূলত তার জাহান্নাম হল জান্নাত আর জান্নাত হল জাহান্নাম। [ সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬৫৯৮/ সহীহ মুসলিম, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২২৪৮] দাজ্জাল সুনির্দিষ্ট এক ব্যক্তি হবে। কারণ হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে। কাজেই কোনো রাষ্ট্রকে দাজ্জাল মনে করা ঠিক নয়। যেমনটি খাওয়ারিজ ও জাহমিয়া প্রভৃতি ভ্রান্ত দলগুলো মনে করে থাকে।।
আলোচ্য হাদিসে ‘কাফের’ লেখাটি সব মুমিনই পড়তে পারবে। প্রশ্ন জাগে, সবাই যখন পড়তে পারবে তখন মানুষ তার ফিতনায় আক্রান্ত হবে কেন?
এর উত্তর হল সেই হাদিস, যাতে বলা হয়েছে পরিচয় পাওয়া সত্ত্বেও বহু মানুষ জাগতিক স্বার্থের খাতিরে দাজ্জালের সঙ্গ দিবে। আরেকটি উত্তর এই হতে পারে, পড়তে পারা আর লেখার মর্ম অনুযায়ী আমল করা এক নয়। বর্তমান যুগেও বহু মুসলমান এমন আছে যারা কুরআনের বিধানাবলী পড়ে, কিন্তু সেই অনুযায়ী আমল করে না।সবাই জানে সুদী ব্যবস্থা সরাসরি আল্লাহর সাথে যুদ্ধ। কিন্তু বহু মানুষ তার সাথে জড়িত।
দাজ্জালের যুগেও বহু মানুষ ধন-দৌলত ও জাগতিক সৌন্দর্যের বিনিময়ে নিজদের ঈমান বিক্রি করে ফেলবে। তারা ঈমান পরিত্যাগ করে দুনিয়াকে বরণ করে নিবে। যারা দাজ্জালের বিরুদ্ধে লড়াই করবে তাদেরকে এরা বিভ্রান্ত বলবে। নিজেদেরকে তারা মুসলিম বলেই দাবি করবে। অধচ ইসলামের সাথে এদের কোনোই সম্পর্ক থাকবে না।।

(পর্ব-৪)
দাজ্জালের সঙ্গে তামীম দারী (রাঃ) এর মোলাকাতঃ

হযরত ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোষককে এই ঘোষণা দিতে শুনলাম, “আসসালাতু জামি’আতুন’ (নামাজ প্রস্তুত)। সুতরাং আমি মসজিদে চলে গেলাম এবং প্রিয়নবীর পিছনে নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে তিনি মিম্বরে বসলেন এবং মৃদু হেসে বললেন, প্রত্যেকে নিজ নিজ নামাজের স্থানে বসে থাক। অতঃপর বললেন, তোমরা কি জান আমি কেন তোমাদেরকে একত্র করেছি? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।
তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তোমাদেরকে কিছু দেওয়ার জন্য বা ভয়-ভীতি দেখানোর জন্য সমবেত করিনি। বরং আমি তোমাদেরকে একটি ঘটনা শোনাবো।
তামীম দারী নামে এক খৃস্টান ছিল। সে আমার নিকট এসে মুসলমান হয়েছে। সে আমাকে একটি ঘটনা বলেছে, যেটি আমি দাজ্জাল সম্পর্কে আগে যা বলেছি তার অনুরূপ। সে আমাকে বলেছে,
আমরা বনু লাখম ও বনু জুযামের ত্রিশজন লোক নিয়ে সমুদ্রে নৌকা ভ্রমনে বের হয়ে ছিলাম। সমুদ্রের তরঙ্গ একমাস যাবত আমাদেরকে দিকবিদিক ঘুরাতে লাগলো। অবশেষে একদিন সন্ধ্যাবেলা আমাদের নৌকাটি একটি অজানা দ্বীপে গিয়ে উপনীত হল। অতঃপর আমরা ছোট ছোট ডিঙিতে করে দ্বীপটির ভেতরে ঢুকে গেলাম। ওখানে আমরা একটি বিস্ময়কর প্রাণীর সাক্ষাৎ পেলাম। যার সারা দেহ বড় বড় পশমে ঢাকা। চুলের আধিক্যের কারণে আমরা তার অগ্র-প্রশ্চাত নির্ণয় করতে পারিনি। আমরা বললাম, তোর ধ্বংস হোক, কে তুই?
প্রাণীটি বলল, আমি জাসসাসা। (গুপ্ত সংবাদ অন্বেষণকারিণী) তোমরা গীর্জায় আবদ্ধ সেই লোকটার কাছে যাও, যে তোমাদের সংবাদ নিয়ে খুবই বিচলিত।
তামীম দারী বলেন, আমরা ঐ প্রাণীটির কথা শুনে ভয় পেয়ে গেলাম যে, ওটা ভূত-পেত্নী কিনা! আমরা খুব তাড়াতাড়ি গির্জায় চলে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, ভেতরে বৃহদাকার এমন এক লোক বসে আছে যে, এমন ভয়ংকর মানব এর আগে আমরা কখনো দেখিনি। লোকটার হাত দু’টো কাঁধ অবধি আর পা দুটি হাঁটু পর্যন্ত লোহার শৃঙ্খল দিয়ে বাঁধা। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, তোমার ধ্বংস হোক, কে তুমি?
সে বলল, নিশ্চয়ই তোমরা আমার সম্পর্কে জানতে পারবে। তবে প্রথমে বলো, তোমরা কারা? আমরা বললাম, আমরা আরবের লোক। আমরা সমুদ্রে একটি নৌকায় আরোহী ছিলাম, দীর্ঘ একমাস সাগরের ঢেউ আমাদেরকে এদিক সেদিক ঘুরিয়ে এখানে পৌঁছে দিয়েছে।

পর্ব-৫
সে জিজ্ঞেস করল, বায়সান এলাকার খেজুর বাগানে ফল আসে কি? আমরা বললাম, হ্যাঁ আসে। সে বলল, অদূর ভবিষ্যতে সেই বাগানে ফল ধরবে না।
অতঃপর সে জিজ্ঞেস করল, তাবারিয়া নদীতে পানি আছে কি? আমরা বললাম, সেই নদীতে প্রচুর পানি আছে। সে বলল, সেই সময়টি নিকটে, এই নদীর পানি শুকিয়ে যাবে।
তারপর সে বলল, যোগার ঝর্ণায় পানি আছে কি? সেখানকার লোকেরা সেই পানি দ্বারা কৃষিকাজ করে কি? আমরা বললাম, হ্যাঁ।
অতঃপর জিজ্ঞেস করল, উম্মীদের নবীর সংবাদ কি? আমরা বললাম, তিনি মক্কা থেকে হিযরত করে ইয়াসরিবে (মদিনায়) চলে গেছেন।
সে জিজ্ঞেস করল, আরবরা তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে কি? আমরা বললাম, হ্যাঁ, করেছে।
সে বলল, তিনি আরবদের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করেছেন? আমরা বললাম, তাঁর আশেপাশের আরবদের উপর তিনি বিজয়ী হয়েছন এবং তাঁর আনুগত্য মেনে নিয়েছেন। সে বলল, তাঁর আনুগত্য মেনে নেওয়াই এদের জন্য উত্তম।
এবার আমি তোমাদেরকে আমার অবস্থা বলছি, আমি মাসীহে দাজ্জাল। অদূর ভবিষ্যতে আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। আমি বাইরে বের হয়ে চল্লিশ দিনের মধ্যে সারা পৃথিবী বিচরণ করব। (একটি পাড়া বা মহল্লাও বাদ যাবেনা আমার ভ্রমন থেকে) কিন্তু মক্কা ও মদিনা যাব না। ওখানে যেতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। আমি যখন তার কোনটিতে ঢুকতে চেষ্টা করব, তখনই একজন ফেরেশতা তলোয়ার হাতে নিয়ে আমাকে প্রতিহত করবে। ওই শহরগুলোর প্রতিটি সড়কে ফেরেশতা মোতায়েন থাকবে।
এই ঘটনা শোনানোর পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতের লাঠি দিয়ে মিম্বরে আঘাত করে বললেন, এই হল তাইবাহ, এই হল তাইবাহ, এই হল তাইবাহ অর্থাৎ মদীনা। তারপর তিনি বললেন, শোন আমি তোমাদেরকে এই বিষয়টিই বলতাম। মনে রেখো, দাজ্জাল শাম কিংবা ইয়ামেনের কোন সাগরে নেই। সে পূর্বদিকের কোন একস্থানে রয়েছে। এই বলে তিনি হাত দ্বারা পূর্বদিকে ইশারা করলেন। [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-৫২৩৫]

পর্ব-৬
দাজ্জালের পূর্বে পৃথিবীর হালাতঃ

দাজ্জালের আবির্ভাবের আগের বছরগুলোতে পৃথিবীতে বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও গণহত্যা চলতে থাকবে। বেকারত্ব, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অস্থিতিশীলতা, উচ্চমূল্য ও সামাজিক অবিচারের রাজত্ব চলবে। পরিবারে শান্তি ও নিরাপত্তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। সর্বত্র পাপ ও মন্দের জয়জয়কার হবে। কোথাও কোথাও সামান্য সৎকর্ম ও সচ্চরিত্র চোখে পড়বে। মানুষ এমন লোকেরও প্রশংসা করবে, যে ৯৯ভাগ পাপ-অন্যায় ও জুলুমে লিপ্ত; মাত্র ১ভাগ সৎকাজ করছে। নেতাদের থেকে নিরাশ হয়ে মানুষ এমন কোন মুক্তিদাতার সন্ধানে থাকবে যাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরণ করা হবে।

হযরত আসমা বিনতে ইয়াযিদ (রাঃ) বলেন, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমার ঘরে অবস্থানরত ছিলেন এবং দাজ্জাল সম্পর্কে বলেনঃ দাজ্জাল আবির্ভাবের আগের তিন বৎসর এমন হবে যে, প্রথম বৎসর আসমান একতৃতীয়াংশ বৃষ্টি আটকে রাখবে এবং যমীন একতৃতীয়াংশ ফসল উৎপাদন বন্ধ রাখবে। দ্বিতীয় বৎসর আকাশ দুই-তৃতীয়াংশ বৃষ্টি আটকে রাখবে আর যমীন দুই-তৃতীয়াংশ ফসল উৎপাদন বন্ধ রাখবে। আর শেষ তৃতীয় বৎসর আসমান সম্পূর্ণ বৃষ্টি আটকে রাখবে আর যমীন পূর্ণ ফসল উৎপাদন বন্ধ রাখবে। অর্থাৎ কোন গাছে ফল ধরবে না, তরুলতা-শাকসবজি উৎপন্ন হবে না। সব ধরনের গবাদিপশু ধ্বংস হয়ে যাবে। [আল মুজামুল কাবীর, হাদিস নং-৪০৬]

হযরত আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল আবির্ভাবের আগের কয়েকটি বছর হবে প্রতারণার বছর। এই সময়ে সত্যবাদীকে মিথ্যাবাদী আর মিথ্যাবাদীকে সত্যবাদী আখ্যায়িত করা হবে। দুর্নীতিবাজকে আমানতদার আর আমানতদারকে দুর্নীতিবাজ মনে করা হবে। [মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং-১৩৩২]

হযরত উমায়ের বিন হানী বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একটি সময় আসবে যখন মানুষ দুটি তাঁবুতে (দলে) বিভক্ত হয়ে যাবে। একটি তাঁবু হবে ঈমানের, যেখানে যেখানে কোন মুনাফেকি থাকবে না। আরেকটি তাঁবু হবে নিফাকের, যেখানে কোন ঈমান থাকবে না। যখন এমন পরিবেশ তৈরি হয়ে যাবে সেদিন থেকে অথবা তার পরেরদিন থেকে দাজ্জালের অপেক্ষা করো। [আবু দাউদ, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৯৪]

হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলাম। আমি তাঁকে বলতে শুনলাম, আমি আমার উম্মতের জন্য একটা বিষয়ে দাজ্জালের থেকে বেশি ভয় করছি। এটা শুনে আমি ভয় পেলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, সেটা কি? তিনি বললেন, পথভ্রষ্ট এবং ধ্বংসযোগ্য আলেমরা। [মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং-২১৩৩৪]
হযরত আবু দারদা (রাঃ) এর হাদিসে রয়েছে, বিভ্রান্তকারী নেতৃবৃন্দের কথা।
দাজ্জালের সময়ে এই চরিত্রের আলেম ও নেতার ছড়াছড়ি থাকবে। দাজ্জালী শক্তির চাপ বা প্রলোভনে এসে তারা নিজেরাও সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে এবং তাদের অনুগত অনুসারীদেরকেও সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখার কারণ হবে।।

পর্ব-৭
দাজ্জাল কোন দেশ থেকে আত্মপ্রকাশ করবে।

এ বিষয়ে দুটি বর্ণনা পাওয়া যায়।
হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দাজ্জাল ইস্পাহানের ইহুদিয়া অঞ্চল থেকে আত্মপ্রকাশ করবে। ইস্পাহানের ৭০হাজার ইহুদী দাজ্জালের অনুসারী হবে। তাদের দেহে সবুজ রঙের চাদর বা জুব্বা থাকবে। [সহীহ মুসলিম, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২২৬৬]

হযরত আবু বকর (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল পৃথিবীর এমন একটি অঞ্চল থেকে বের হবে, যেটি পূর্বদিকে অবস্থিত এবং যাকে খোরাসান বলা হয়। তার সঙ্গে বহু দল মানুষ থাকবে। তাদের একটা দলের লোকদের চেহারা স্ফীত ঢালের মতো হবে। [সুনানে ইবনে মাজাহ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৩৫৩]

এই হাদিসে খোরাসানকে দাজ্জাল আবির্ভাবের স্থান বলা হয়েছে। এর আগের হাদিসে বলা হয়েছে ইস্পাহান। এই দুই বর্ণনায় আসলে কোন বৈপরীত্য নেই। কেননা ইস্পাহান ইরানের একটি প্রদেশ আর ইরান একসময় খোরাসানের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
খোরাসান সম্পর্কে সেই বাহিনীর বিবরণ হাদিসে রয়েছে, যারা ইমাম মাহদীর সাহায্যে এগিয়ে আসবে। সুতরাং আমরা যদি মাহদী বাহিনীর আলামত সমূহ সমগ্র খোরাসানে তালাশ করি, আফগানিস্থানের সেই অঞ্চলটি পরিদৃষ্ট হবে, যেখানে সম্প্রতি পাখতুন বসতি অধিক। তাই লক্ষণদৃষ্টে অনুমান হয় ইমাম মাহদীর সাহায্যকারী বাহিনীটি খোরাসানের সেই এলাকা থেকে গমন করবে যেটি বর্তমানে তালেবান আন্দোলনের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
অন্য এক হাদিসে দাজ্জালের আত্মপ্রকাশের স্থান ইরাক ও শামের মাঝামাঝি একটি জায়গার কথা বলা হয়েছে। যেকারণে বাহ্যত এখানে বিরোধ পরিলক্ষিত হয়। এই বিরোধের সমাধান হচ্ছে, দাজ্জালের আবির্ভাব ইস্পাহান থেকেই হবে। তবে তার প্রচার ও খোদায়ী দাবী হবে ইরাকে। এই হিসেবেও একে আবির্ভাব নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
আল ফিতানে একটি হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল দুই বছর ইরাক শাসন করবে। তাতে তার সুশাসন প্রশংসিত হবে এবং মানুষ তার দিকে আকৃষ্ট হবে। দুই বছর পর একদিন সে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণে জনতাকে লক্ষ্য করে বলবে, এখনো কি সময় আসেনি, তোমরা তোমাদের প্রভুর পরিচয় লাভ করবে? এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করবে, আমাদের প্রভু কে? দাজ্জাল বলবে, আমি। আল্লাহর এক বান্দা তার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করবে। দাজ্জাল তাকে হত্যা করে ফেলবে। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৩৯]

পর্ব-৮
দাজ্জালের বাহন, গতি ও অবস্থানঃ

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল একটি ফকফকে সাদা বর্ণের গাধায় সওয়ার হয়ে বের হবে। গাধার উভয় কানের মধ্যবর্তী স্থানটি ৭০ বা’আ চওড়া হবে। [মিশকাত, হাদিস নং ৫২৫৯]
উভয় হাতকে প্রশস্ত করলে যে পরিমাণ লম্বা হয় তাকে বা’আ বলে। দুই হাত প্রশস্ত করলে কমপক্ষে চার হাত হয়। এ হিসেবে প্রায়, ২৮০ হাত চওড়া হবে বুঝা যায়।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, দাজ্জালেে গাধার কানগুলো এত বড় হবে যে, সত্তর হাজার মানুষ তার তলে ছায়া গ্রহণ করতে পারবে। [আল ফিতান]

হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জালের গাধার এক একটি পদক্ষেপ তিনদিনের ভ্রমনের সমান হবে। সে তার গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে সাগরে এমনভাবে ঢুকে যাবে যেমন তোমরা ঘোড়ার পিঠে চড়ে পানির ছোট নালায় ঢুকে থাক (এবং নালা পার হয়ে থাক)। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৩]
দাজ্জালের একেকটি পদক্ষেপ তিনদিনের সফরের সমান হবে। হিসাব করলে দেখা যায় এই পরিমাণটা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৮২ কিলোমিটার। ঘন্টায় ২ লক্ষ ৬৫ হাজার ২ শত কিলোমিটার। হিসাবটা যেভাবে বের করা হয়েছে, তিনদিনের শরয়ী সফর হচ্ছে ৪৮ মাইল। ৪৮ মাইলে ৮২ কিলোমিটার।

হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাজ্জালের আলোচনা করছিলেন, আমরা জিজ্ঞেস করলাম সে কতদিন যমীনে অবস্থান করবে? তিনি বললেন চল্লিশ দিন। তবে তার প্রথম দিনটি হবে এক বছরের সমান। দ্বিতীয় দিনটি এক মাসের সমান। তৃতীয় দিনটি এক সপ্তাহের সমান। আর বাকি (৩৭টি) দিন অন্যান্য স্বাভাবিক দিনের মতই হবে।
আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, সেই একদিন যা এক বছরের সমান হবে সেদিন কি আমাদের একদিনের নামাজই যথেষ্ট হবে? তিনি বললেন, না। বরং সেদিন একেকদিনের পরিমাণ হিসাব করে (এক বছরের) নামাজ আদায় করতে হবে।
আমরা জিজ্ঞেস করলাম, যমীনে তার চলার গতি কেমন হবে? তিনি বললেন, সেই মেঘমালার মত যাকে প্রবল বায়ু হাঁকিয়ে নিয়ে যায়। [ সহীহ মুসলিম ]
হযরত কা’ব (রাঃ) বর্ণনা করেন, দাজ্জাল যখন উর্দুনে (জর্ডানে) আসবে, তখন তূর পাহাড়, ছাওড় পাহাড় ও জুদি পাহাড়কে ডাকবে। এমনকি এই তিনটি পাহাড় পরস্পর এমনভাবে সংঘাতে লিপ্ত হবে যেমন দুটি ষাঁড় বা ছাগল পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। [আল ফিতান]

পর্ব-৯
দাজ্জালের ফিতনার সরূপ!

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের সামনে যখনই দাজ্জালের আলোচনা করতেন তখনই তাঁদের মধ্যে ভীতি সঞ্চারিত হয়ে যেত এবং কান্না শুরু করতেন। কিন্তু এর কারণ কি যে, আজ মুসলমানরা এই বিষয়ে কোনো চিন্তাই করছে না?
সম্ভবত এর কারণ, আজ মানুষ এই ফেতনাটিকে সেই অর্থে বুঝবার চেষ্টা করে না, যে অর্থে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝিয়েছেন। আজ যদি কোন মুসলমান এই হাদিসটি শুনে, দাজ্জালের কাছে খাদ্যের পাহাড় ও পানির নহর থাকবে। তখন সে হাদিসটি এমন অবস্থায় শুনে যে, তার পেট খাবারে পূর্ণ থাকে এবং পানির কোন তৃষ্ণাই থাকে না। ফলে সে দাজ্জালের সময়কার পরিস্থিতিকেও নিজের ভরা পেট ও ভেজা গলার সময়কার উপর অনুমান করে। এই হাদিসগুলো শোনার সময় তার চোখের সামনে এ দৃশ্যটি মোটেও ভাসেনা যে, তখনকার পরিস্থিতি এমন হবে যে-
দিনের পর দিন নয় বরং সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে যাবে রুটির একটা টুকরোও জুটবে না। অনাহার মানুষকে কাহিল করে তুলবে। পানির অভাবে কন্ঠনালীতে কাঁটা বিঁধবে। খাদ্য ও পানির তালাশে কয়েক দিন যাবত পথে পথে ঘুরে নিরাশ হয়ে আপনি যখন ঘরে ফিরে আসবেন তখন দেখতে পাবেন আপনার কলিজার টুকরো যে সন্তানটির একটিমাত্র ইশারাতে তার প্রতিটি বাসনা ও দাবি পূরণ হয়ে যেত, আজ তীব্র ক্ষুধা ও পিপাসায় তার জীবনটা বের হয়ে গেছে। ছেলের মরা মুখটি দেখে আপনার অন্তর খাঁ খাঁ করে উঠল। কিন্তু আপনি অসহায়, অক্ষম। কষ্ট সহ্য করতে না পেরে সন্তানের দিক থেকে আপনার মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু যেদিকে তাকালেন অদিকে পড়ে আছে আক্ষেপ আর যন্ত্রণার আরেকখানি প্রতিচ্ছবি -মা, হ্যাঁ আপনার গর্ভধারিণী আম্মাজান। সেই মা যিনি আপনাকে ক্ষুধার্ত পেটে কোনদিন ঘুমুতে দেননি। যিনি আপনার ইঙ্গিতেই আপনার পিপাসার কথা বুঝে ফেলতেন। যিনি নিজের সমস্ত সুখ-আহ্লাদকে আপনার জন্য কুরবান করে দিয়ে ছিলেন। আজ আপনার সেই মা চোখের দৃষ্টিতে হাজারো প্রশ্ন ভরে নিয়ে যুবক পুত্রের দিকে তাকিয়ে আছেন এই আশায় যে, বাছা আমার আজ এক টুকরো রুটি এক কাতরা পানি কোথাও থেকে সংগ্রহ করে এনেছে। কিন্তু পুত্রের মুখের লেখা পড়তে সক্ষম মা আপনার মুখাবয়বের লেখা জবাবটা পড়ে নিলেন। পুত্রের অসহায়ত্বের ফলে মায়ের চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আপনার কলিজাটা মুখে বেরিয়ে আসবার উপক্রম হলো। আপনি ভেতরে ভেতরেই ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে লাগবেন।।

পর্ব-১০
দাজ্জালের ফিতনার সরূপ!

কষ্টটা সহ্য করতে না পেরে এবার আপনি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এই আশায় যে, সম্ভবত ওদিকে কেউ নাই। কিন্তু না, আছে। ওখানে একজন পড়ে আছে- আপনার জীবন সফরের সঙ্গিনী। পরীক্ষার প্রতিটি মুহূর্তে যে আপনাকে সাহস যুগিয়েছেন। কিন্তু আজ ঠোঁট দুটো তার শুকনো। আর দেখতে না দেখতেই প্রেম আপনার অশ্রুতাপে গলে যেতে শুরু করল। অবশেষে আপনিও তো মানুষ। আপনার বুকেও তো গোশত পিণ্ডই ধুকধুক করে। সন্তানের স্নেহ, মায়ের মমতা ও স্ত্রীর প্রেম সবাই মিলে আপনার হৃদয়টাকে তামার মতো গলিয়ে দিল। কোথাও কোনো আশ্রয় নেই। কেউ নেই আপনার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াবার। কিভাবে থাকবে, প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি দরজায় এই একই দৃশ্য। কেউ নেই সাহায্য করবার- সকলেরই সাহায্য দরকার।
এমন সময় বাইরে থেকে সুস্বাদু খাবারের সুঘ্রাণ আর সুমিষ্ট পানির কলকল শব্দ কানে ভেসে এল। আপনি ও আপনার পরিজন সবাই দৌড়ে বাইরে গেলেন। মনে হল কষ্টের দিন বুঝি শেষ হয়ে গেছে। মানুষের এই বনে কোন মাসিহা এসে পড়েছেন। আগত মাসিহা ঘোষণা করেছে, ক্ষুধা পিপাসায় কাতর লোকেরা! এই সুঘ্রাণযুক্ত সুস্বাদু খাবার তোমাদেরই জন্য।
ঘোষণাটি শোনামাত্র আপনার, আপনার পরিজন ও নগরীর অন্যান্য বাসিন্দাদের আধা জীবন যেন এমনিতেই ফিরে এসেছে। মাসিহা আবার বলতে শুরু করল, এই সবকিছুই তোমাদের জন্য। কিন্তু তোমরা কি বিশ্বাস কর যে, এই খাবার ও পানির মালিক আমি? তোমরা কি এই বাস্তবতাকে স্বীকার করছ যে, এই সবকিছু আমার অধীনে?
এই দ্বিতীয় ঘোষণাটি শোনার পর খাবার পানির প্রতি অগ্রসরমান আপনার পা কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল। আপনি কিছু ভাবতে শুরু করলেন। আপনার স্মৃতি বলল, এই শব্দগুলো তো চেনা চেনা মনে হচ্ছে। আপনার মনে পড়ে গেল এই মাসিহাটা কে? কিন্তু সেই মুহূর্তে পেছন থেকে আপনার সন্তানের কান্না তীব্র হতে লাগল। মায়ের আর্তনাদ কানে এসে বাজল। স্ত্রীর করুণ আহাজারিতে কান ভারী হতে লাগল। আপনি ছুটে গেলেন। আপনার কলিজার টুকরো- আপনার সন্তানটি মৃত্যু ও জীবনের মাঝে ঝুলছে। যদি কয়েক ফোঁটা পানি জুটে যায় তাহলে শিশুটির জীবন বেঁচে যেতে পারে।
এখন একদিকে আপনার সন্তান, মা ও স্ত্রীর ভালোবাসা, অপরদিকে ঈমান বিধ্বংসী একটি প্রশ্নের জবাব। একদিকে আনন্দপূর্ণ ঘর, অন্যদিকে বিলাপের আসর। যেন একদিকে আগুন, অন্যদিকে মনমাতানো ফুল বাগান।
বলুন, বিবেকের বন্ধ জানালাগুলো খুলে দিয়ে ভাবুন, বিষয়টি কি এতই সহজ, যতটা আপনি মনে করছেন? বরং তখনকার পরিস্থিতি হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ফেতনা।

পর্ব-১১
দাজ্জালের ফিতনা সমূহ!

হযরত আসমা বিনতে ইয়াযীদ (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে অবস্থানরত ছিলেন। তখন তিনি দাজ্জাল সম্পর্কে কিছু কথা বললেন। তিনি বলেছেন, তার ফেতনাসমূহের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ফেতনাটি এই হবে যে, সে এক গ্রাম্য লোকের নিকট আসবে এবং বলবে, তোমার খেয়াল কি; আমি যদি তোমার মৃত উটটি জীবিত করে দেই তাহলে কি তুমি মেনে নিবে আমি তোমার রব? গ্রাম্য লোকটি বলবে, হ্যা। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তারপর শয়তানরা তার মৃত উটটিকে ঠিক আগের মত বরং তার চেয়েও উত্তম- যেমন দুগ্ধদায়িনী ভরাপেট ছিল বানিয়ে দিবে।
অনুরূপভাবে দাজ্জাল এমন এক ব্যক্তির নিকট আসবে যার পিতা ভাই মারা গেছে। তাকে বলবে, তোমার ধারণা কি; আমি যদি তোমার বাপ ও ভাইকে জীবিত করে দেই তাহলে কি তুমি মেনে নিবে আমি তোমার রব? উত্তরে সে বলবে, কেন নয়? ফলে তারপর শয়তানরা লোকটির পিতা ভাইয়ের আকৃতিতে এসে হাজির হবে। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৩৫]
আবু উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল এক গ্রাম্য লোকের কাছে এসে বলবে, আমি যদি তোমার মৃত পিতা-মাতাকে জীবিত করে দেই তাহলে আমাকে প্রভু বলে মেনে নিতে তোমার কোন আপত্তি থাকবে? গ্রাম্য লোকটা বলবে, না। অতঃপর দুটি শয়তান তার মা বাবার রূপ ধারণ ধরে তাকে বলবে, হে সন্তান! একে অনুসরণ কর, সেই তোমার প্রভু। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৪০৬৭)
হযরত হুযায়ফা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি দাজ্জালের বিষয়টি বারবার এজন্য বর্ণনা করছি, যেন তোমরা বিষয়টিতে গভীর মনোযোগ দিয়ে চিন্তা ভাবনা কর, সচেতন হও, সে অনুযায়ী কাজ কর এবং বিষয়টি তোমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আলোচনা কর। কারণ, দাজ্জালের ফিতনা ভয়াবহতম একটি ফিতনা।।

পর্ব-১২
হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল দাবি করবে আমি বিশ্বজগতের রব এবং আকাশের সূর্যটা আমার কথামতই চলছে। তোমরা কি চাও আমি একে থামিয়ে দেই? তার কথায় সূর্য থেমে যাবে। এমনকি একটি দিন মাস ও সপ্তাহের সমান হয়ে যাবে। এবার সে বলবে তোমরা কি চাও আমি এটিকে আবার চালিয়ে দেই? লোকেরা বলবে, হ্যা দিন। তখন দিন ঘন্টার সমান হয়ে যাবে।
তার কাছে এক মহিলা এসে বলবে, হে আমার রব, আপনি আমার পুত্র এবং স্বামীকে জীবিত করে দিন। তখন শয়তানরা তার পুত্র ও স্বামীর আকৃতিতে এসে হাজির হবে। মহিলা শয়তানকে গলায় জড়িয়ে ধরবে এবং তার সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হবে। মানুষের ঘরগুলো শয়তানদের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে যাবে।
এক গ্রাম্যলোক দাজ্জালের নিকট আসবে এবং বলবে, হে আমাদের রব, আপনি আমাদের জন্য আমাদের বকরীগুলোকে জীবিত করে দিন। দাজ্জাল তাদেরকে বকরীর আকৃতিতে কতগুলো শয়তানকে দিয়ে দিবে। এই পশুগুলো ঠিক সেই বয়স ও সেই শরীর স্বাস্থ্যের হবে যেমনটি তাদের মৃত বকরিগুলো ছিল। এসব দেখে গ্রামের লোকজন বলবে, সে যদি আমাদের রব না হত তাহলে আমাদের মৃত বকরিগুলোকে কোনোভাবেই জীবিত করতে পারতো না।
দাজ্জালের সঙ্গে ঝোল ও গোশতওয়ালা হাড়ের পাহাড় থাকবে। যেগুলো সবসময় গরম থাকবে, কখনো ঠান্ডা হবে না। প্রবাহমান নদী থাকবে। একটি পাহাড় থাকবে ফল ও সবজির বাগানের। একটি পাহাড় থাকবে আগুন ও ধোঁয়ার। (এগুলো তার সাথে সাথে চলবে।) সে বলবে এটি আমার জান্নাত আর এটি আমার জাহান্নাম। এগুলো আমার খাদ্য এবং এগুলো আমার পানীয়। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৩]
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল আবির্ভাব করবে। তখন কিছু মানুষ তার অনুসারী হয়ে যাবে। তারা বলবে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি দাজ্জাল নিঃসন্দেহে কাফের। তবে তার খাদ্য ভান্ডার থেকে খেতে এবং তার বাগানে পশুপাল চড়াতে তার অনুসারী হয়েছি। পরবর্তী সময়ে যখন আল্লাহর গজব নাজিল হবে, তা তাদের সকলের উপর নাজিল হবে। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৬]
আজ মুসলমান এই হাদিসগুলোতে চিন্তা করে না। যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে গোটা সুরতহাল স্পষ্ট হয়ে যাবে। আজও কি এমনটি হচ্ছে না যে, বাতিলের জালিমের পরিচয় জানা সত্বেও অর্থনৈতিক বা অন্য কোন স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মুসলমান এদের সঙ্গ দিচ্ছে, সহযোগিতা দিচ্ছে কিংবা নীরব দর্শকের ভুমিকা পালন করছে?

পর্ব-১৩
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- দাজ্জাল মক্কা ও মদিনার কাছে গিয়ে বিকট শব্দে চিৎকার দিবে। ফলে সেখানে তিনবার ভুমিকম্প হবে। এই ভুমিকম্পের কারণে মক্কা ও মদিনায় বসবাসরত সকল মুনাফিক পুরুষ ও নারী নিজেদের জান বাঁচাতে সেখান থেকে বেরিয়ে যাবে। তারা দাজ্জালের সঙ্গী হয়ে যাবে।
এক তথ্য সংগ্রহকারী মুসলমান মুসলমানদের এই দলটির কাছে আসবে, যারা কস্তুনতুনিয়া (বর্তমান ইস্তাম্বুল) জয় করেছে এবং যাদের সঙ্গে বাইতুল মুকাদ্দাসের মুসলমানদের সম্প্রীতি থাকবে। বলবে অচিরেই দাজ্জাল তোমাদের কাছে এসে পৌঁছাবে। শুনে মুজাহিদগণ বলবে, আসুক আমরা তার সাথে যুদ্ধ করব। তুমিও আমাদের সঙ্গে থাকো। দূত বলবে, না। বরং আমাকে অন্যদেরও সংবাদটা পৌঁছাতে হবে। কিন্তু এই লোকটি যখন রওনা হবে দাজ্জাল তাকে ধরে ফেলবে এবং করাত দ্বারা চিড়ে টুকরো টুকরো করে মেরে ফেলবে।
তারপর দাজ্জাল জনতাকে লক্ষ্য করে বলবে, আমি যদি এই লোকটিকে তোমাদের সামনে জীবিত করে দেই তাহলে কি তোমরা বিশ্বাস করবে আমি তোমাদের রব? জনতা বলবে, আমরা তো আগে থেকেই জানি আপনি আমাদের রব। তারপরও এই বিশ্বাসটিকে পাকাপোক্ত করার জন্য দাজ্জাল লোকটিকে জীবিত করে তুলবে। লোকটি আল্লাহর ইচ্ছায় দাঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু মহান আল্লাহ এই লোকটি ছাড়া আর কারো ক্ষেত্রে দাজ্জালকে এই শক্তি দেবেননা যে, কাউকে হত্যা করে সে আবার জীবিত করবে।
তারপর দাজ্জাল মুসলিম দূতকে বলবে, আমি কি তোমাকে হত্যা করে জীবিত করিনি? কাজেই আমি তোমার রব। উত্তরে দূত বলবে, এখন তো আমি আরও নিশ্চিত হয়েছি যে, আমিই সেই ব্যক্তি যার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুসংবাদ দিয়েছেন যে, তুমি আমাকে হত্যা করবে এবং পরে আল্লাহর ইচ্ছায় জীবিত করবে। আর আল্লাহ আমাকে ছাড়া আর কাউকে জীবিত করবেন না। তারপর উক্ত দূতের গায়ে তামার চাদর জড়িয়ে দেওয়া হবে, যার ফলে দাজ্জালের কোন অস্ত্র তার উপর ক্রিয়া করবে না। না তরবারি, না ছুরি, না পাথর, না অন্য কোন অস্ত্র। ফলে দাজ্জাল বলবে একে আমার জাহান্নামে নিক্ষেপ করো। আল্লাহ দাজ্জালের আগুনের পর্বতটাকে সবুজ শ্যামল বাগানে পরিনত করে দেবেন। (কিন্তু লোকজন মনে করবে ওকে আগুনের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে।) মানুষ সংশয়ে নিপতিত হবে। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৩]

চলবে

বলকান কসাই: বসনিয়া যুদ্ধে গণহত্যার নেতৃত্ব দেয়া তিন খলনায়ক

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নৃশংসতার কথা তখন অনেকেই ভুলে গেছে। এর অস্তিত্ব তখন বইয়ের পাতায়, সিনেমার রূপালি পর্দায় কিংবা সামরিক জাদুঘরের ক্যাবিনেটে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিলো। ইউরোপের বড় রাষ্ট্রগুলো তখন শান্তিপূর্ণভাবে একজোট হয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছিলো। ঠিক তখন ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি যুগোস্লোভিয়াতে বিভক্তির গুঞ্জন শুরু হয়। যুগোস্লোভিয়ার রাষ্ট্রনায়ক মার্শাল টিটোর মৃত্যুর পর দেশটি বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর মাধ্যমে সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, মেসিডোনিয়া, বসনিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু ভিন্ন জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ দেখা দেয়। আঞ্চলিক নেতারা সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। ফলে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে এক নৃশংস গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

১৯৯১ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ চলে কয়েক বছর জুড়ে। যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে জন্ম নেয় এক অভিশপ্ত ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের খলনায়কদের মধ্যে প্রথম যে তিনজনের নাম মনে আসে তারা হলো স্লোবোদান মিলোসেভিচ, রাদোভান কারাদজিচ এবং রাতকো ম্লাদিচ। উগ্র জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী এই তিন সার্ব নেতার হাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। ইতিহাসের পাতায় এদেরকে একসাথে ‘বলকান কসাই’ নামে ডাকা হয়।

সাবেক সার্বিয়ার রাষ্ট্রপতি স্লোবোদান মিলোসেভিচ

শুধুই সার্ব’ মতবাদের বিশ্বাসী রাষ্ট্রপতি মিলোসেভিচ

১৯৮৭ সালে যুগোস্লোভিয়ার অন্তর্গত রাজ্য কসোভো পরিদর্শনে যান সার্ব নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচ। তৎকালীন কসভোর অধিকাংশ নাগরিক ছিলো আলবেনীয় বংশোদ্ভূত। তারা সার্বদের উপর পৈশাচিক নির্যাতন চালাতো। রাজ্যের সংখ্যালঘু সার্বরা মিলোসেভিচের আগমনে আশার আলো খুঁজে পায়। তারা একজোট হয়ে তাদের নেতার সাথে দেখা করতে যায়। তারা মিলোসেভিচের হোটেলের ফটকের সামনে বিভিন্ন ব্যানার নিয়ে ভিড় করে। একপর্যায়ে পুলিশ তাদের উপর লাঠিচার্জ করে। ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে সার্বরা। মিলোসেভিচ এই ঘটনায় ক্ষুদ্ধ হয়ে পড়েন। তিনি সার্বদের অধিকার রক্ষার্থে কসভোতে বিশাল সমাবেশের আয়োজন করেন। সমাবেশে তিনি সার্বদের অধিকার আন্দোলনকে সমর্থন করেন এবং ঘোষণা করেন, “From now on, no one has the right to beat you”।হাজার হাজার সার্ব সেদিন মিলোসেভিচের বক্তব্যে নতুন আশার আলো খুঁজে পায়। পরবর্তীতে যুগোস্লোভিয়া ভাঙনের ফলে গঠিত নতুন রাষ্ট্র সার্বিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন মিলোসেভিচ। কসোভোতে সার্বদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের সমর্থন করায় সার্বরা তাকে বিপুল ভোটে জয়ী করে। শুরু হয় কুখ্যাত মিলোসেভিচের শাসন।

তিনি প্রথমেই তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইভান স্তাম্বোলিচকে হত্যা করেন। তার রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি ছিলো ‘শুধুই সার্ব, বৃহত্তর সার্বিয়ার লক্ষ্যে’। সার্বিয়ার সাথে স্লোভেনিয়া এবং ক্রোয়েশিয়া নামক আরো দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। স্লোভেনিয়াতে কোনো সার্ব বসবাস করতো না। তাই মিলোসেভিচ স্লোভেনিয়ার প্রতি আগ্রহী ছিলেন না। তার কুনজর পড়ে ক্রোয়েশিয়ার উপর। সেখানে সংখ্যালঘু সার্বরা নতুন রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে অপারগতা প্রকাশ করলে মিলোসেভিচ তাদের পক্ষ নিয়ে ক্রোয়েশিয়ার সাথে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। মিলোসেভিচের কাছে ক্রোটদের গুরুত্বপূর্ণ নগরী ভুকুবারের পতন ঘটে। সার্বরা ভুকুবারের হাজার হাজার ক্রোটদের নির্বিচারে হত্যা করে। কী ছিলো তাদের অপরাধ? তাদের অপরাধ তারা সার্বিয়ার নাগরিক নন।

বসনিয়ায় হত্যাকাণ্ড;

মিলোসেভিচের সৈনিকরা ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। মর্ত্যের বুকে নেমে আসে নরকের অভিশাপ। মিলোসেভিচের পরবর্তী আগ্রাসনের শিকার হয় নব্য রাষ্ট্র বসনিয়া এবং হার্জেগোভিনা। বসনিয়া যুদ্ধে তার সাথে হত্যাযজ্ঞে অংশ নেন অপর দুই কুখ্যাত নেতা রাদোভান কারাদজিচ এবং রাতকো ম্লাদিচ।

সারায়েভো গণহত্যার পর শহর পরিদর্শনে কারাদজিচ;

সার্বিয়া রক্ষার্থে গণহত্যাকে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে মনে করতেন তৎকালীন বসনিয়া-সার্ব অঞ্চলের রাষ্ট্রপ্রধান রাদোভান কারাদজিচ। দ্বিতীর বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যার কারিগর মানুষরূপী পিশাচ কারাদজিচ। স্লোবোদান মিলোসেভিচের মতো তিনিও ছিলেন উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা। বসনিয়ার গৃহযুদ্ধে তিনি নির্বিচারে নিরীহ নারী, শিশুসহ লক্ষাধিক নাগরিক হত্যা করেন। তাকে আড়ালে ডাকা হতো ‘বসনিয়ার কসাই’ এবং ‘বলকানের কসাই’ হিসেবে।

রাদোভান কারাদজিচ একজন আত্মকেন্দ্রিক নেতা। তিনি কিছু কবিতাও রচনা করেন। তার কবিতার ভাষায় ফুটে উঠেছে তার উগ্রতা। একটি কবিতায় তিনি নিজেকে ‘লৌহমানব’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার প্রচণ্ড ক্ষমতার নেশা ছিল। ১৯৯২ সালে তিনি বসনিয়া এবং হার্জেগোভিনার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার শাসনামলে বসনিয়ায় বসবাসরত মুসলিম এবং ক্রোটদের সাথে সার্বদের দ্বন্দ্ব বেঁধে যায়।

কারাদজিচ বসনিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা সারায়েভো অবরোধের আদেশ দেন। ৪৪ দিনব্যাপী অবরুদ্ধ সারায়েভোতে কারাদজিচের নির্দেশে নির্বিচারে মুসলিম হত্যা করা হয়। ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১,৫০০ শিশুসহ ১০ হাজারের মতো মুসলিম হত্যা করা হয়।

বিশ্বের অন্যান্য কুখ্যাত নেতা থেকে কারাদজিচ একদিক দিয়ে আলাদা। কারণ তিনি একটি নয়, দুটি গণহত্যার খলনায়ক। নিষ্ঠুর কারাদজিচের পরবর্তী শিকার হয় আরেক মুসলিম অধ্যুষ্যিত অঞ্চল স্রেব্রেনিৎসা। এই গণহত্যার নেতৃত্ব দেন কারাদজিচের অধীনস্থ সামরিক অধিনায়ক রাতকো ম্লাদিচ।

স্রেব্রেনিৎসার খলনায়ক রাতকো ম্লাদিচ

স্রেব্রেনিৎসার খলনায়ক রাতকো ম্লাদিচ

উগ্র রাষ্ট্রপ্রধান কারাদজিচ এবং মিলোসেভিচের সবচেয়ে বড় মিত্র ছিলেন বসনিয়া যুদ্ধে বসনিয়া-সার্ব সামরিক অধিনায়ক রাতকো ম্লাদিচ। তিনি নিজে আগ্রাসনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন। সারায়েভোর গণহত্যায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করার ফলে তাকে আরেকটি গণহত্যার দায়িত্ব প্রদান করেন কারাদজিচ। স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা জার্মান হলোকাস্টের পর ইউরোপে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে ম্লাদিচ তার বাহিনী নিয়ে স্রেব্রেনিৎসা অবরোধ করেন। শহরের সাথে পুরো বসনিয়ার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এরপর সুসজ্জিত সামরিক বাহিনী নিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন নিরীহ মুসলিমদের উপর।

স্রেব্রেনিৎসায় প্রায় ৮ হাজার মুসলিমকে হত্যা করা হয়। কারাদজিচ এবং মিলোসেভিচের লক্ষ্য ছিলো এই অঞ্চল থেকে নন-সার্ব জাতিদের বিতাড়িত করা। গণহত্যার পর ম্লাদিচ তার সৈনিকদের শহর থেকে নন-সার্বদের তাড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন।

প্রায় ২০ হাজার মুসলিম নারী এবং শিশুকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। সার্বসেনারা বসনিয়ান মুসলিম এবং ক্রোট নারীদের ধর্ষণ করার মতো ঘৃণ্য অপরাধে লিপ্ত হয়। ম্লাদিচের নির্দেশে হাজার হাজার ক্রোট এবং মুসলিম নাগরিককে বন্দী করা হয়।

এভাবে তিনজন কসাইয়ের আগ্রাসনের ফলে বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপে মানবতার চূড়ান্ত পতন ঘটে। বলকান কসাইত্রয়ীর পাশবিকতায় প্রাণ হারায় হাজারো নিরীহ নাগরিক।

স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যায় নিহতদের লাশের ভিড়ে নিজের সন্তানকে খুঁজছেন এক মা

যুদ্ধাপরাধে মামলা দায়ের এবং গ্রেফতার

১৯৯৯ সালের মে মাসে বসনিয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত সংগঠন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে প্রধান আসামী হিসেবে স্লোবোদান মিলোসেভিচ, রাদোভান কারাদজিচ এবং রাতকো ম্লাদিচের নাম উল্লেখ করা হয়।

ওদিকে গৃহযুদ্ধ অবসান হওয়ার পর, সার্বিয়ায় মিলোসেভিচের জনপ্রিয়তা কমে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি চলে যায়। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। কিন্তু ক্ষমতালোভী মিলোসেভিচ ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন। সার্বিয়ার জনগণ মিলোসেভিচের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। মাসব্যাপী আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন তিনি। যে সার্বদের জন্য তিনি এতো হত্যাযজ্ঞ করলেন, শেষপর্যন্ত তারাই তার বিরুদ্ধে পথে নামলো। তিনি এতোটাই হতাশ হয়ে পড়েন যে, বাড়ি ফিরে নিজের স্ত্রীকে হত্যা করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে পুলিশ এসে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।

২০০২ সালে তাকে নেদারল্যান্ডসের দি হেগ শহরে আন্তর্জাতিক আদালতের হাতে হস্তান্তর করা হয়। শুরু হয় মিলোসেভিচের বিচার। তিনি সেখানেও দর্পের সাথে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। বিচারকার্য শেষ হবার আগেই ২০০৬ সালে মিলোসেভিচ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কারাগারে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মিলোসেভিচকে গ্রেফতার করা গেলেও বাকি দুজন বলকান কসাই তখন পলাতক। FBI, CIA, Interpol সহ পৃথিবীর বিখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর Most Wanted List-এর শীর্ষে চলে আসে তাদের নাম। তাদের ধরিয়ে দিতে পারলে প্রায় ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়।

প্রায় ১৩ বছর পালিয়ে বেড়ানোর পর বেলগ্রেডের এক মফস্বল থেকে ধরা পড়েন রাদোভান কারাদজিচ। তিনি সেখানে একজন চিকিৎসকের ছদ্মবেশে বহুদিন ধরে বাস করছিলেন। তার বিরুদ্ধে দুটি গণহত্যা, পাঁচটি মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড, চারটি যুদ্ধাপরাধ এবং একটি জেনেভা চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়েছিলো।

মিলোসেভিচের মতোই কারাদজিচ নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তার মতে যুদ্ধাপরাধের দায় সংশ্লিষ্ট সামরিক অধিনায়কদের উপর বর্তায়। কিন্তু মামলায় তিনি হেরে যান। তাকে ৪০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

কারাদজিচের বিচার চলমান অবস্থায় ধরা পড়েন শেষ পলাতক কসাই রাতকো ম্লাদিচ। তিনি উত্তর সার্বিয়ার একটি গ্রামে লুকিয়ে ছিলেন। ম্লাদিচের বিরুদ্ধেও কারাদজিচের অনুরূপ অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছিলো। তিনি দি হেগে বিচারকার্য চলার সময় কোর্টের নিয়ম বহির্ভূত আচরণ করে সমালোচনার মুখে পড়েন। তাকে ২০১১ সালে প্রথম বিচারের জন্য আদালতে হাজির করা হয়। তিনি কোর্টে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ‘বানোয়াট’ বলে দাবি করেন। এরপর তিনি অসুস্থতার দোহাই দিয়ে ২০১২ সালের জুলাই পর্যন্ত বিচারকার্য স্থগিত রাখেন। এখন পর্যন্ত তার বিচারকার্য চলছে।

বসনিয়া যুদ্ধে বলকান কসাইদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বিশ্বমানবতার জন্য এক কালো অধ্যায়। কিন্তু অপরাধ করে কেউ ছাড় পেতে পারে না। পৃথিবীর বুকে সকল অত্যাচারী নেতার পতন ঘটেছে। তাদের অহংকার ধূলিস্যাৎ হয়েছে ন্যায়ের হাতে। বলকান কসাইদের গ্রেফতার এবং বিচারকার্য পরিচালনা যেন তাই প্রমাণ করে। আর যেন পৃথিবীর বুকে নতুন করে স্রেব্রেনিৎসার অভিশাপ ফিরে না আসে, সেদিকে লক্ষ্য রেখে বিশ্বনেতাদের একসাথে কাজ করতে হবে। কারণ মানবতাহীন মানবজাতি পশুর সমান।

ফিচার ইমেজ: The Japan Times

যেভাবে ইংরেজরা খুবলে খেয়েছিল উপমহাদেশ ও বাংলার অর্থনীতি


সুপ্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল স্বাধীন রাজা-বাদশাহদের শাসনাধীন। ইংরেজ শাসন শুরুর পূর্বে ভারতভূমি কখনও পরাধীন ছিল না। দ্রাবিড়, আর্য, আরব, ইরানী, পাঠান, মুঘল, তুর্কি- অর্থাৎ বহিরাগত যারাই এই ভূমিতে রাজনৈতিক কারণে পা রেখেছে, তারাই একে আপন করে নিয়েছে; ভারতের আলো মেখে এর বাতাসে মিশে গেছে। এমনকি দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডার যখন ভারত আক্রমণে আসেন, তখন তার কয়েকজন সেনানায়ক এ দেশের জলবায়ু ও ধনসম্পদে মুগ্ধ হয়ে এখানেই বসতি স্থাপন করেন। এর ব্যতিক্রম হয় অর্থনৈতিক কারণে আগত ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের বণিকদের বেলায়।

ভাস্কো ডা গামার ভারত প্রবেশের জলপথ আবিষ্কারের পর পর্তুগিজ বণিকরা এদেশে একচেটিয়া বাণিজ্য শুরু করে ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে তাদের পথ ধরে আসে ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইংরেজরা। সুঁচ হয়ে ঢোকা এই ইংরেজরা একসময় ফাল হয়ে বেরিয়ে এসে ইতিহাস গড়ে। এককালের আশ্রিত এই বিদেশিরাই একসময় হয়ে ওঠে গোটা ভারতবর্ষের প্রভু। ১৬১৮ সালে বার্ষিক এককালীন তিন হাজার টাকার বিনিময়ে ইংরেজদের বিনা শুল্কে এদেশে বাণিজ্যের অনুমতি দানের মধ্যেই এই ট্রাজেডির বীজ নিহিত ছিল। সম্রাট শাহজাহানের সাথে ইংরেজ দূত টমাস রো’র করা এই চুক্তিই গঙ্গা অববাহিকায় ইংরেজদের লোলুপ দৃষ্টি প্রসারে সহায়ক ছিল। সুদীর্ঘ ইংরেজ শাসনকালে উপমহাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলের সাথে সাথে বদলে যায় এর অর্থনৈতিক অবস্থা। আর এর জন্য দায়ী ইংরেজদের ব্যাপক লুণ্ঠন ও শোষণ। চলুন জানা যাক, ঠিক কীভাবে অত্যাচার ও নিপীড়নের মাধ্যমে ভারতবর্ষের অর্থনীতিকে তারা ধ্বংস করে।
১৫৯৯ সালে কয়েকজন ইংরেজ ব্যবসায়ী মাত্র ৩০ হাজার পাউন্ডের ক্ষুদ্র মূলধন নিয়ে গঠন করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তৎকালীন মুদ্রামান অনুযায়ী, তা ২৫ হাজার ভারতীয় রুপির চেয়েও কম ছিল। এর পরের বছর রানী এলিজাবেথের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ভারতের সাথে তারা বাণিজ্য শুরু করে। ১৬১২ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমতিতে তৎকালীন ভারতের প্রধান সমুদ্র বন্দর সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে তারা। সুরাটে তখন আরও অনেক ভারতীয় ব্যবসায়ী ছিলেন, যাদের একেকজনের মূলধন পুরো ইংরেজ কোম্পানীর চেয়ে কয়েকশত গুণ বেশি ছিল। ইংরেজদের দৈন্যদশা দেখে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা তাদের করুণার দৃষ্টিতে দেখতেন এবং তাদের মোটেও গুরুত্ববহ মনে করতেন না। এই গুরুত্বহীন, করুণার পাত্র, নামমাত্র মূলধন নিয়ে ব্যবসা করতে আসা ইংরেজগণ একদা পুরো উপমহাদেশের শাসনক্ষমতা দখল করে নিল। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রহসনমূলক যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে পুরো ভারতবর্ষে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করে ইংরেজরা। তারা প্রলুব্ধ হয়েছিল শুধুমাত্র এদেশের সম্পদ দ্বারা। আর তাই সুদীর্ঘকালের শাসনামলে ভারতবর্ষের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়ে যায় তারা।
পলাশীর যুদ্ধের পর মুর্শিদাবাদে রাজকোষ ও রাজপ্রাসাদ লুণ্ঠিত হয়, সরকার দেউলিয়া হয়ে পড়ে। হিন্দু জমিদার ও চাকলাদারদের অর্থে তখন সরকার পরিচালিত হতো। গদি লাভের জন্য ইংরেজদের দাবি অনুযায়ী ঘুষ সংগ্রহ করার জন্য মীর জাফর ও মীর কাসিম রাজস্ব বাড়িয়ে দেন। নবাবের এসব রাজস্ব বৃদ্ধির অজুহাতে জমিদাররা প্রান্তিক মুসলিম প্রজা ও রায়তদের উপর বহুগুণে খাজনা বাড়িয়ে দেয়। দেশব্যাপী শুরু হয় অরাজকতা। কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যে দেখা দেয় অস্থিতিশীল অবস্থা। একইসাথে, বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অন্য বিদেশি বণিকদের বাংলাছাড়া করে ইংরেজরা রেশম, মসলিন, সুতি কাপড়, চিনি, চাল, আফিম, সল্টপিটার প্রভৃতি পণ্য রপ্তানীর ক্ষেত্রে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। বাজার কুক্ষিগত করে এরা এসব পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিক রকম নামিয়ে দেয়।

ব্যবসায় ইংরেজদের সবচেয়ে বড় চারণক্ষেত্র ছিল আমাদের বঙ্গভূমি। সে সময় বাংলা থেকে কৃষিজ ও প্রাণিজ পণ্য বাদে শুধু মসলিন, মোটা সুতি বস্ত্র, রেশম ও রেশমী বস্ত্র ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানী করেই বছরে দশ-বারো হাজার কোটি টাকা আয় হতো। নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, কিশোর মিলিয়ে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতো এই বস্ত্রখাতে। এছাড়া ইউরোপে সল্টপিটার, ইস্ট ইন্ডিজে চাল, চীন ও জাপানে আফিম, আরব, ইরাক ও ইরানে লাল চিনি, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে মরিচ, আদা, দারুচিনি রপ্তানি হতো। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা শুধু বাংলা থেকেই হতো।
ইংরেজদের আধিপত্য বিস্তারের আগে উৎপাদকরা সরাসরি রপ্তানিকারকের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারতো। রপ্তানিমুখী অবাধ বাণিজ্য ছিল বাংলার অর্থনীতি ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য। ইংরেজদের হাতে রপ্তানির একচেটিয়া অধিকার চলে আসার পর প্রতিযোগিতার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। পণ্যের উৎপাদন খরচের চাইতে বিক্রয়মূল্য কমিয়ে দেয়া হয়। ওদিকে জমিদাররা রাজস্বের পরিমাণ চার-পাঁচগুণ বাড়িয়ে দেয়। এমন ভগ্ন অর্থনীতিতে বাড়তি রাজস্ব দিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যায় কৃষক ও কারিগরগণ।
স্বাভাবিক উৎপাদন হার কমে এলে ইংরেজরা হিন্দু জমিদার ও প্রশাসনিক কর্মচারীদের উৎপীড়ন ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে হিন্দু গোমস্তা, দালাল ও ফড়িয়াদের দ্বারা গ্রামে-গঞ্জে আড়ৎ-গদি প্রতিষ্ঠা করায় ও অত্যাচারের-নিপীড়নের মাধ্যমে উৎপাদন চালাতে বাধ্য করে। এরা থানার দারোগা, পরগণার শিকদার ও পাইক নামিয়ে বলপূর্বক দাদন দিতে বাধ্য করতো এবং চাবুক মেরে কম মূল্যে কাপড়, লবণ ও অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী বিক্রি করতে বাধ্য করতো। অত্যাচারের মাত্রাতিরিক্ততায় তাঁতীরা তাদের হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে ফেলে। মধ্যাঞ্চলের চাষীরা আসামের অরণ্যের দিকে পালিয়ে যায়। এভাবে বিশ্বঅর্থনীতির অবাধ ও প্রতিযোগিতামুখর একটি উৎপাদন ক্ষেত্রকে ইংরেজরা এক দাসত্বপ্রথামূলক নারকীয় যজ্ঞে পরিণত করে।
পলাশী যুদ্ধের পর টাকার অবমূল্যায়ন ও পাউন্ডের অধিমূল্যায়ন করা হয়। মুর্শিদ কুলি খাঁর চাইতে মীর জাফরের সময় বত্রিশগুণ বেশি কর ও খাজনা আদায় করা হয়। জমিদাররা এক কোটি ত্রিশ লাখ পাউন্ড খাজনা আদায় করে কোম্পানিকে দেয় আটত্রিশ লাখ পাউন্ড। অতিরিক্ত রাজস্ব ও খাজনার চাপে ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে উৎপাদক গোষ্ঠী। খাজনা আদায়ের ঝঞ্ঝাট এড়ানোর জন্য ইংরেজরা পরগনা নিলামে চড়াতে শুরু করে। নব্য হিন্দু কোটিপতিরা ইজারা দিয়ে বিঘাপ্রতি দু’টাকা বারো আনা খাজনা ধার্য করে। আলীবর্দি খানের সময় এই খাজনা ছিল মাত্র আট আনা। এভাবে ১৬৬০ পরগনার মধ্যে ১০০০ পরগনা হিন্দুদের হাতে দেয়া হয়। অত্যাচার-নিপীড়ন আর আর্থিক মন্দার কারণে চাষীরা এমনিই চাষ ছেড়ে দিয়েছিল, এর মধ্যে অনাবৃষ্টি আর খরায় ফসল এসেছিল কমে। এছাড়া খাদ্যশস্য উৎপাদনের ভূমিতে জোর করে অত্যধিক লাভজনক ব্যবসাপণ্য আফিম ও নীল চাষ করানোর কারণেও অনেক জমি উর্বরতা হারিয়ে ফেলে। আফিম যেত চীন ও জাপানে, আর ইউরোপে সেই সময় শিল্প বিপ্লব ঘটায় তুঙ্গে ছিল নীলের চাহিদা।

এমন অবস্থায় ১৭৭০ সালের মাঘ মাসে সারাদেশে ধান কিনে গুদামজাত করা শুরু হলে জন্ম নেয় দুর্ভিক্ষ। বাংলা ১৭৭৬ সালের এ মহাদুর্ভিক্ষ ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। মানব ইতিহাসে এমন ভয়াবহ এবং পুরোপুরি মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের কথা আর জানা নেই। বিশ্বের অন্যতম শস্যভাণ্ডার খ্যাত জনপদটির এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এই দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারায়। যারা বেঁচে থাকে, তাদের হাল হয় আরও খারাপ। কারণ এত বড় দুর্যোগেও ইংরেজরা কোনো সাহায্য না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকে, এমনকি খাজনা হ্রাসেরও তারা কোনো পদক্ষেপ নেয় না। বাংলার অপার সম্ভাবনার আধার কৃষক সমাজ এ দুর্ভিক্ষের ফলে সর্বহারা, দুর্গত এক শ্রেণীতে পরিণত হয়। ধনী হিন্দুরা নৌকা বোঝাই করে দুর্ভিক্ষের অনাথ বালকদের কলকাতায় এনে জড়ো করতো। সেখান থেকে ইংরেজরা তাদের ক্রীতদাস হিসেবে ইউরোপে চালান করে দিতো।
এ কাহিনী যেমন বেদনাদায়ক, তেমনি ক্রোধ ও প্রতিহিংসা সঞ্চারক। এমন অমানবিক ও বর্বর শাসন দুনিয়ার ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন। মাত্র ১৩ বছরের শাসনে পৃথিবীর তৎকালীন সমৃদ্ধ একটি জনপদ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে যেভাবে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়, তা নেহাত শাসকশ্রেণীর খামখেয়ালীর ফল। যারা সেই সময়টায় জীবিত ছিল, শুধু তারাই জানে আসলেই কতটা ভয়ানক ছিল সেই নারকীয় অভিজ্ঞতা। এই অর্থনৈতিক নিপীড়নের পথ ধরেই একসময় ভারতবাসীর মনে দানা বাঁধে স্বাধিকারের সাধ, আর সেখান থেকেই ক্রমে উপমহাদেশ এগিয়ে যায় স্বাধীনতার দিকে। মার্ক্স সত্যই বলেছেন, “এযাবৎকালের সকল সমাজ ব্যবস্থার ইতিহাস শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস।”

তথ্যসূত্র: উপমহাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিবৃত্ত; লেখক: সিরাজুল হোসেন খান (প্রকাশকাল ২০০২; পৃষ্ঠা: ১৫-১৮)

সার্জারির আবিষ্কারক ছিলেন একজন মুসলিম চিকিৎসক

প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন বিষয়ে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান অনস্বীকার্য। মধ্যযুগে সভ্য-পৃথিবী বিনির্মাণে তাদের ভূমিকা অকুণ্ঠভাবে স্বীকৃত। কর্ডোভার সোনালি যুগে বিখ্যাত শল্যচিকিৎসাবিদ আবুল কাসিম আল-জাহরাভির পৃথিবীকে উপহার দেন তার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘আত-তাসরিফ’। শল্যচিকিৎসায় আল-জাহরাভি কেমন পারদর্শী ও অভিজ্ঞ ছিলেন গ্রন্থটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
আল-জাহরাভির জন্ম ও বেড়ে ওঠাপুরো নাম আবুল কাসিম খালাফ ইবনুল আব্বাস আল-জাহরাভি। জাহরাভির জন্ম স্পেনের কর্ডোভার শহরতলীর প্রধান অংশ আল-জাহরায়। কারো মতে তিনি ৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ‘মদিনাতুজ জাহরা’য় জন্মগ্রহণ করেন। প্রসঙ্গত স্পেনের তৃতীয় খলিফা আবদুর রহমান আন-নাসির লিদিনিল্লাহ (৯৮৯-৯৬১ খ্রি) তার প্রিয়তমা ও মহীয়সী আল-জাহরার ইচ্ছানুসারে এই অপূর্ব সুন্দর নগরী নির্মাণ করেন। (আলী আশ-শাতশাত, তারিখুল জারাহা ফি-ত্তিব্বিল আরবি: ১/৭৫ দ্রষ্টব্য)php glass
ইউরোপে আল-জাহরাভি আল-বুকাসিস (Albucasis), বুকাসিস (Bucasis) ও আল-য়্যারভিয়াস (Alyaharvious) নামে পরিচিত। জাহরাভির পিতা-মাতা স্পেনের অধিবাসী ছিলেন।
আবুল কাসিম আল-জাহরাভি কর্ডোভার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন শাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা ও চিকিৎসা শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। শিক্ষা শেষে জাহরায় চিকিৎসাসেবা শুরু করেন।
শল্যচিকিৎসায় প্রথম থেকেই তিনি আশ্চর্যজনক সফলতা লাভ করেন। ফলে দ্রুত সবদিকে তার সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সফলতার স্বাক্ষর হিসেবে খলিফা আবদুর রহমান ও খলিফা আবুল হাকাম—উভয়েরই চিকিৎসক হিসেবে নিযুক্ত হন। কর্ডোভার বিখ্যাত হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক হিসেবেও নিয়োগ পান তিনি। তার ভুবনবিখ্যাত চিকিৎসাগ্রন্থ ‘আত-তাসরিফ’র মতো বিষয়বস্তু ও তত্ত্বনির্ভর এতো চমৎকার গ্রন্থ তৎকালীন যুগে আর কেউ লিখেনি। (ইবনে হাজাম, ফাদায়েলু আহলিল আন্দালুস: ২/১৮৫)
শল্যচিকিৎসা বিভাগের প্রভূত সংস্কার ও উন্নতি সাধন করেন। শেষ জীবনে আবুল কাসিম সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। জীবনসায়াহ্নে তিনি চিকিৎসাগ্রন্থ প্রণয়নে মনোনিবেশ করেন। বিভিন্ন মতামত অনুসারে ১০১৩ খ্রিস্টাব্দে আল-জাহরাতে তিনি ইন্তিকাল করেন। তার মৃত্যুর পর তার যশ-খ্যাতি অত্যধিক হারে স্পেন থেকে প্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
ছবি: সংগৃহীততার ব্যাপারে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও গবেষকরা বলেছেন, জাহরাভি স্পেনের আরব চিকিৎসাবিদদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শল্যবিদ ছিলেন। (ইবনু আবি উসাইবা, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, পৃষ্ঠা: ৫০১; ঐতিহাসিক হিট্টিও জোরালোভাবে এই মত ব্যক্ত করেন।)
ব্যক্তিজীবনে জাহরাভি ছিলেন সাদাসিধে ও ‘অল্পে তুষ্টি’ প্রকৃতির। চিকিৎসাবিদ্যা ও ঔষধ তৈরি ইত্যাদির প্রতি ভীষণ ঐকান্তিক ছিলেন। গরিব-দুঃখী ও অসুস্থদের সেবায় নিজের অধিকাংশ সময় ব্যয় করতেন। (মুহাম্মদ শাবান আইয়ুব, আবুল কাসিম আল-জাহরাভি, মাজা তারিফু আন আলমি জার্রাহিল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা?, আল-জাজিরা অ্যারাবিক, ২৫/০৮/২০১৯)পদার্থ, রসায়ন ও চিকিৎসা শাস্ত্রের উপর আল-জাহরাভি বিশটি গ্রন্থ রচনা করেন। কিন্তু পদার্থ ও রসায়নের উপর রচিত গ্রন্থ তাকে শ্রেষ্ঠত্বের সোপানে পৌঁছাতে সক্ষম হয় নি। চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থগুলোই তৎকালীন শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকের মর্যাদা দেয়। তার পদার্থ ও রসায়ন সংক্রান্ত গ্রন্থাবলী সম্পর্কে আলোচনা তেমন পাওযা যায় না।
চিকিৎসাবিষয়ক যে গ্রন্থটি তাকে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে সেটি হলো ‘কিতাবুত তাসরিফ লিমান আজিযা আনিত তা’লিফ। এই গ্রন্থটি ৩০টি অধ্যায়ে শিক্ষাগত (Educational) ও কার্যকরী (Effective) বিস্তৃত। প্রথম খণ্ডে এনাটমি (Anatomy), ফিজিওলজি (physiology) ও ডায়াটেটিকস (Dietetics) নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। (বিস্তারিত দেখুন: আবদুল মওদুদ, মুসলিম মনীষা, পৃষ্ঠা: ৭৯)
আল-জাহরাভির গ্রন্থে চিকিৎসার বিভিন্ন যন্ত্রের ছবি।দ্বিতীয় খণ্ডে বিশেষত সার্জারি (Surgery) সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। গ্রন্থটিকে অধ্যাপক সারটন ‘Medical Encyclopedia’ নামে অভিহিত করেছেন। এর চিকিৎসার অংশের চেয়ে সার্জারীর অংশ সর্বদিক দিয়ে উন্নত ও মৌলিকতার পরিচায়ক হলেও চিকিৎসার অংশেও মৌলিকতার অভাব নেই। ঔষধ তৈরি করতে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অনুসরণে পতন (Distillation) ও ঊর্ধ্বপাতন (sublimation) প্রথা প্রয়োগ করেছেন। (বিস্তারিত দেখুন: আবদুল মওদুদ, মুসলিম মনীষা, পৃষ্ঠা: ৭৯-৮০)
এসব দিক বিবেচনায় গ্রন্থটিকে অভিনব বলা চলে। এছাড়াও গ্রন্থটির দ্বিতীয় খণ্ডে বা কার্যকরী-সার্জারি অংশে রয়েছে অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্যবলী।
প্রথম সার্জারির প্রচলন করেন জাহরাভিঐতিহাসিকদের মতে জাহরাভিই সর্বপ্রথম চিকিৎসক যিনি ইউরোপে বৈজ্ঞানিক প্রথায় সার্জারির প্রচলন ও এর বিশদ বিবরণ প্রচার করেন।
সার্জারি খণ্ডের বিশেষত্ব হলো- এর মধ্যে সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে বিশেষ কোনো আলোচনা করা হয়নি, ফলে এটা এমনিতেই পরিপূর্ণ বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ খ-টি পৃথকভাবে চিত্রাদিসহ প্রকাশিত হয়। ডা. ক্যাম্পবেলের মতে, ‘এ হলো এ বিষয়ের সর্বপ্রথম স্বাধীন সচিত্রগ্রন্থ” (The first independent illustrated book on the subject) (আবদুল মওদুদ, মুসলিম মনীষা, পৃষ্ঠা: ৭৮)
জিরাল্ড কর্তৃক ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ‘আত-তাসরিফ’ গ্রন্থের সার্জারী খণ্ডটি জিরাল্ড ল্যাটিন ভাষায় মূল আরবিসহ প্রকাশ করেন। ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করে গ্রন্থটির নাম দেন ‘De Chirurgia’। এটি সালার্নো ও মন্টেপেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। (আকবর আলী, বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, পৃষ্ঠা: ৩৩৮)
এ গ্রন্থে ২০০ প্রকার সার্জারির যন্ত্রপাতির নমুনা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। গ্রন্থটি ইউরোপে কি পরিমাণ মর্যাদা লাভ করেছে, তা এর বারবার অনুবাদ থেকেই বোঝা যায়। ডা. ক্যাম্পবেলের মতে, গ্রন্থটি পরপর পাঁচবার ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। আর একথা সর্বসম্মত যে, তার এ গ্রন্থের প্রভাবেই ইউরোপে সার্জারির মান বিশেষভাবে উন্নীত হয়। (আবদুল আজিম আদ-দায়েব, আবুল কাসিম আল-জাহরাভি; আওয়ালু তাবিবিন –জার্রাহ- ফিল আম, পৃষ্ঠা: ৫৭)
আল-জাহরাভির চিকিৎসা। ছবি: সংগৃহীতজাহরাভির সচিত্র গ্রন্থের যে কয়েকটি পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়, তন্মধ্যে দুইটি রয়েছে অক্সফোর্ডের বডলিয়েন (Bodleian) লাইব্রেরিতে এবং অন্য একটি রয়েছে গোথাতে। জিরাল্ডের ল্যাটিন অনুবাদের একটি পাণ্ডুলিপি রয়েছে প্যারিসে। এতে তিনি গ্রন্থকারের নাম দিয়েছেন Abul Casim। কিছু পাণ্ডুলিপি ফ্লোরেন্স, ব্যামবার্গ, ফ্রাঙ্কয়েস, মন্টেপেলিয়ার, লিডেন ও ডেনিস রক্ষণাগারে সুরক্ষিত আছে। (আবদুল মওদুদ, মুসলিম মনীষা, পৃষ্ঠা: ৮০)
মেডিসিন বা ঔষধ বিষয়ে তার অবদানসার্জারির ক্ষেত্রে এই মহান মনীষীর অপরিসীম ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাফল্য হলেও মেডিসিন বা ঔষধ বিষয়েও যথেষ্ট অবদান পাওয়া যায়। তিনি কুষ্ঠরোগ ও এর প্রতিকার সম্বন্ধে তাঁর গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। তিনি অবস্থা বুঝে এ রোগের চিকিৎসা করতেন। এ রোগ সম্বন্ধে তার আগে আর কোনো বিজ্ঞানী এমন বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন বলে জানা যায় না। (আবদুল আজিম আদ-দায়েব, আবুল কাসিম আল-জাহরাভি; আওয়ালু তাবিবিন –জার্রাহ- ফিল আম, পৃষ্ঠা: ৫৭-৫৮)
শিশুরোগের চিকিৎসায় জাহরাভিজাহরাভি শিশু রোগের চিকিৎসাতেও কিছু কিছু অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। তিনি শিশু রোগের চিকিৎসার জন্য মাতৃস্তন থেকে দূষিত দুধ চুষে বের করার পরিবর্তে এর জন্য এক প্রকার যন্ত্র আবিষ্কার করেন। শিশুদের রিকেট হবার কারণ এবং এর প্রতিকারেরও এক অভিনব পন্থা উদ্ভাবন করেছিলেন। তিনি শিশুদের মেরুদণ্ড বাঁকা হওয়ার কারণ সম্বন্ধে পূর্বেকার সব মতের ওপর নতুন মত প্রকাশ করেন। (আকবর আলী, বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, পৃষ্ঠা: ৩৩৯)

হিটলারের জন্য অবৈধ সন্তান জন্ম দিয়েছিলো যে নারীরা…..


গত শতকের ত্রিশের দশকের ঘটনা। হিটলারের নাৎসি বাহিনী তখন ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া শুরু করেছে। এ সময় দেশে তাদের অগণিত সমর্থকের মাঝে একজন ছিলেন হিল্ডেজার্ড ট্রুট্‌জ। হিটলার এবং তার নাৎসি বাহিনীর এক অন্ধ সমর্থক ছিলেন তিনি। অন্ধ সমর্থন যে কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকতে পারে তার নমুনা তুলে ধরতেই আজকের এ লেখা।
তরুণ-তরুণীদের মাঝে নাৎসি বাহিনীর মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে যে সংগঠনটি কাজ করতো, তার নাম ‘হিটলার ইয়ুথ’। এই হিটলার ইয়ুথেরই নারী শাখার নাম ছিলো Bund Deutscher Mädel (BDM), বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘জার্মান নারীদের সংগঠন’। নাৎসি বাহিনীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই ১৯৩৩ সালে সংগঠনটিতে যোগ দেন ট্রুট্‌জ। নিয়মিতই এর সাপ্তাহিক মিটিংগুলোতে অংশ নিতেন তিনি, স্বপ্ন দেখতেন নতুন এক জার্মানির। তার ভাষ্যমতে, “হিটলার এবং আরো উন্নত জার্মানির জন্য আমি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা তরুণ-তরুণীরা জার্মানির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটি আমি বুঝতে পেরেছিলাম।”
অল্প কিছুদিনের ভেতরেই ট্রুট্‌জ তাদের এলাকার বিডিএম-এর এক পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেন। জার্মান বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন তার সোনালী চুল এবং আকাশের বিশালতা মাখানো নীল চোখও যেন এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো। অনেকেই তাকে নর্ডিক নারীদের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতো। এর পেছনে শারীরিক উচ্চতার পাশাপাশি প্রশস্ত হিপ ও পেলভিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো বলে মনে করেন তিনি।

১৯৩৬ সালের কথা। ট্রুট্‌জ সেই বছর আঠারোতে পা রাখলেন। মনে তার হাজারো রঙের প্রজাপতি ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। একই বছর তার স্কুল জীবনও শেষ হলো। এরপর তিনি যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না কী করবেন। তার মনের প্রজাপতিগুলো যেন ঠিক ফুলের সন্ধান করে উঠতে পারছিলো না। এমন বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে তাই তিনি ছুটে গেলেন বিডিএম-এর এক নেতার কাছে, জানালেন তার মনের বিস্তারিত খবরাখবর। সেই নেতা সেদিন তাকে এমন কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন যা ট্রুট্‌জের সারা জীবনের গতিপথ পাল্টে দিয়েছিলো। তিনি তাকে সেসব পরামর্শ না দিলে সম্ভবত আজকে ট্রুট্‌জকে নিয়ে আমিও লিখতে বসতাম না!
তিনি তাকে বললেন, “তুমি যদি ঠিক করতে না-ই পার যে এখন কী করবে, তাহলে ফুয়েরারকে (অ্যাডলফ হিটলার) একটা বাচ্চা দিচ্ছ না কেন? এখন জার্মানির জন্য অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে দরকার হলো জাতিগতভাবে বিশুদ্ধ শিশু।”

নেতার কাছ থেকে এই কথা শোনার পরই ট্রুট্‌জ প্রথমবারের মতো নাৎসি বাহিনীর ‘লেবেন্সবর্ন’ প্রোগ্রামের কথা জানতে পারেন। ‘বিশুদ্ধ’ জার্মানদের নিজেদের মাঝে মিলনের মাধ্যমে সোনালী রঙের চুল ও নীল চোখ সম্পন্ন ‘আর্য’ শিশুদের জন্মহার বাড়ানোই ছিলো সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রোগ্রামের মূল লক্ষ্য। এজন্য বাছাইকৃত ‘বিশুদ্ধ’ জার্মান নারীরা শয্যাসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতেন কোনো শ্যুত্‌জস্টাফেল অফিসারকে (যিনি নিজেও তথাকথিত ‘বিশুদ্ধ’)। এরপর সেই নারীর গর্ভে আসা সন্তানকেও তাই ‘বিশুদ্ধ’ বলেই মনে করা হতো। উল্লেখ্য, নাৎসি জার্মানিতে কালো ইউনিফর্ম পরিহিত শ্যুত্‌জস্টাফেল কিংবা সংক্ষেপে ‘এসএস’ ছিলো হিটলার বাহিনীর সবচেয়ে বড় প্যারামিলিটারি সংগঠন।
মূল আলাপে ফিরে আসা যাক। সেই বিডিএম নেতা এরপর ট্রুট্‌জকে পুরো প্রক্রিয়া খুলে বললেন। লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামে সিলেক্ট হতে প্রথমেই তাকে একগাদা মেডিকেল টেস্টের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। সেই সাথে তার জীবনের অতীত ইতিহাস সম্পর্কেও বিস্তারিত অনুসন্ধান চালানো হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো প্রার্থীর শরীরে কোনোভাবেই ইহুদীদের রক্ত থাকা চলবে না। এতসব অনুসন্ধান ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার গন্ডি পার হতে পারলে তখনই কেবল সেই নারী প্রার্থী একদল এসএস অফিসার থেকে তার পছন্দের শয্যাসঙ্গী বেছে নিতে পারবে।

এতক্ষণ যেন তন্ময় হয়ে নেতার কথা শুনে যাচ্ছিলেন ট্রুট্‌জ। নিজের গর্ভে দশ মাস দশ দিন একটি সন্তানকে ধারণ করে তাকে নাৎসি বাহিনীর জন্য দিয়ে দেয়ার মতো দেশপ্রেম তার মনকে মারাত্মকভাবে আলোড়িত করে তুললো। অ্যাডলফ হিটলারের জন্য, তার নাৎসি বাহিনীর জন্য, সর্বোপরি দেশের জন্য এমন কিছু একটাই তো করতে চাচ্ছিলেন তিনি! তাই আর দেরি করলেন না ট্রুট্‌জ। শীঘ্রই লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামের টেস্টের জন্য নিজের নামটি রেজিস্ট্রেশন করালেন তিনি। তবে বাসায় বাবা-মাকে কিছুই জানান নি ট্রুট্‌জ, কারণ তারা তার সেই সিদ্ধান্তকে মেনে নেবে না। প্রোগ্রামের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। এজন্য তিনি বাসায় জানালেন ন্যাশনাল সোশ্যালিজম নিয়ে পড়াশোনা করতে একটি আবাসিক কোর্সে তিনি ভর্তি হয়েছেন।

এরপর এলো সেই নির্ধারিত দিনটি। ট্রুট্‌জকে নিয়ে যাওয়া হলো জার্মানির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বাভারিয়া প্রদেশের একটি পুরনো দুর্গে। এটি ছিলো টেগের্নসী লেকের কাছাকাছি একটি জায়গা, চমৎকার মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ। সেখানে গিয়ে নিজের মতো আরো চল্লিশ জন নারীকে দেখতে পেলেন ট্রুট্‌জ। সবার উদ্দেশ্যই এক, গর্ভে সন্তান ধারণ করে তাকে নাৎসি বাহিনীতে দিয়ে দেয়া। সেই নারীদের কেউ কারো আসল নাম জানতো না, সবাইকে দেয়া হয়েছিলো ছদ্মনাম। আর সেখানে আসতে কেবল একটি সার্টিফিকেটই লাগতো- ‘জাতিগত বিশুদ্ধতা’। এজন্য একজন নারীর প্রপিতামহ পর্যন্ত বংশ ইতিহাস অনুসন্ধান করা হতো।

দুর্গ পুরনো হলে কী হবে! সেখানে ভোগ-বিলাসের উপকরণের কোনো কমতি ছিলো না। লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামে নির্বাচিত সেই তরুণীদের জন্য সেখানে খেলাধুলা, লাইব্রেরি, মিউজিক রুম, এমনকি সিনেমা হল পর্যন্ত ছিলো। ট্রুট্‌জের মতে, “সেখানে আমি যে খাবার খেয়েছিলাম, তা আমার জীবনে খাওয়া সেরা খাবার। সেখানে আমাদের কোনো কাজ করতে হতো না, অনেক চাকরবাকরই ছিলো সেখানে।” এভাবে রাজকন্যার মতোই কাটছিলো তাদের দিনগুলো। অপেক্ষা শুধু একজন এসএস রাজপুত্রের!

পুরো প্রোগ্রামটি নিয়ন্ত্রণ করতেন একজন উচ্চপদস্থ এসএস ডাক্তার। মেয়েরা সেখানে আসার পরপরই তিনি তাদেরকে ভালোমতো পরীক্ষা করেছিলেন। তাদেরকে জানাতে হয়েছিলো বংশগতভাবে তারা কোনো রোগ পেয়েছে কিনা, তাদের পরিবারে কেউ মাত্রাতিরিক্ত পানাসক্ত কিনা এবং পরিবারে কখনো কোনো বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নিয়েছে কিনা। তিনি তাদেরকে এটা বলেও সতর্ক করে দেন যে, তাদের গর্ভে আসা সন্তানকে কোনোভাবেই নিজের কাছে রাখা যাবে না। কিছুদিন পরই সেই সন্তানকে তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হবে। তাকে বড় করা হবে আলাদা পরিচর্যা কেন্দ্রে। তাকে নাৎসি পরিবেশে, নাৎসি আদর্শ শিখিয়ে একজন নাৎসি সদস্য হিসেবেই গড়ে তোলা হবে।

এরপর আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অর্থাৎ সঙ্গী বাছাইয়ের বিষয়টি। প্রাথমিক বিষয়াদি জানানোর পর সেই নারীদের সামনে হাজির করা হলো একদল এসএস অফিসারকে। সুঠাম দেহের অধিকারী, লম্বা সেই অফিসাররা সহজেই নারীদের মন কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সম্পর্ক বিছানা পর্যন্ত গড়ানোর আগে একে অপরকে চিনে নেয়ার ব্যবস্থাও ছিলো। এজন্য তাদেরকে একসাথে খেলাধুলা করা, সিনেমা দেখা, সন্ধ্যায় মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে একসাথে গল্পগুজব করার মতো বিষয়ের মাঝে দিয়ে যেতে হয়েছিলো।

শয্যাসঙ্গী বেছে নেয়ার জন্য ট্রুট্‌জদের দেয়া হয়েছিলো সাতদিন সময়। তাদের বিশেষভাবে বলে দেয়া হয়েছিলো যেন তাদের চুল ও চোখের রঙের সাথে শয্যাসঙ্গীর চুল ও চোখের রঙ সর্বোচ্চ পরিমাণে মিলে যায়। বলাবাহুল্য, সেই অফিসারদের কারো নামই তাদেরকে জানানো হয় নি। সবই ছিলো কঠোর গোপনীয়তার অংশ।

একসময় সঙ্গী পছন্দ করা হয়ে গেলে আরো কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয় তাদের। তখন সেই নারীদের আরো কিছু মেডিকেল টেস্টের ভেতর দিয়ে যাওয়া লাগে। এরপরই একদিন জানিয়ে দেয়া হয় সেদিনই তাদেরকে শয্যাসঙ্গীর সাথে রাত কাটাতে হবে। ট্রুট্‌জের ভাষ্যমতে, সেদিন তিনি এতটাই উত্তেজিত ও আনন্দিত ছিলেন যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এতে একদিকে যেমন শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি ছিলো, তেমনি অ্যাডলফ হিটলারের জন্য কিছু করতে পারার গর্বও মিশে ছিলো! তাদের সেই সঙ্গমকে তারা দেশের জন্য, ভালোবাসার ফুয়েরারের জন্যই মনে করেছিলেন। এজন্য তাদের মাঝে কোনো লজ্জাবোধ কিংবা অনুশোচনাও কাজ করে নি। প্রথম সপ্তাহে সেই লোকটি তিন রাতে ট্রুট্‌জের শয্যাসঙ্গী হয়েছিলো। পরের সপ্তাহে তাকে অন্যান্য নারীদের সাথে ডিউটি পালন করতে হয়েছিলো!

মিলনের পর অল্প কিছুদিনের মাঝেই গর্ভধারণ করেন ট্রুট্‌জ। এরপরই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আলাদা এক মাতৃসেবা কেন্দ্রে। বাচ্চা জন্মানোর আগপর্যন্ত নয়টি মাস তিনি সেখানেই কাটান। এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন ট্রুট্‌জ। তবে মাত্র দু’সপ্তাহই জীবনের প্রথম মাতৃত্বের স্বাদ উপভোগ করতে পেরেছিলেন তিনি। এরপরই বাচ্চাটিকে আলাদা আরেকটি এসএস হোমে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে তাকে পুরোপুরি নাৎসি পরিবেশে বড় করা হবে। এরপর আর কোনোদিনই নিজের গর্ভের সন্তান দেখতে পান নি তিনি, খোঁজ পান নি তার সেই শয্যাসঙ্গীরও।

পরবর্তী বছরগুলোতে আরো সন্তান নেয়ার জন্য বলা হয়েছিলো ট্রুট্‌জকে। কিন্তু ততদিনে তিনি আরেকজন অফিসারের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাই আর ওদিকের কথা ভাবেন নি তিনি। একসময় তাদের বিয়েও হয়ে যায়। বিয়ের পরে একদিন আনন্দে গদগদ হয়ে ট্রুট্‌জ তার স্বামীকে লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামে নিজের সংযুক্তি এবং বাচ্চা জন্মদানের কথাটি জানিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, হিটলারের প্রতি এমন ভালোবাসা ও আনুগত্য দেখে নাৎসি বাহিনীতে চাকরিরত তার স্বামী বোধহয় খুশি হবেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটলো ঠিক তার উল্টোটা! অমন প্রোগ্রামে ট্রুট্‌জের জড়ানোর বিষয়টি একেবারেই স্বাভাবিকভাবে নেন নি তার স্বামী। তবে স্ত্রী কাজটি হিটলারের জন্য করেছে দেখে তিনি তাকে কিছু বলতেও পারছিলেন না!
দুর্গ পুরনো হলে কী হবে! সেখানে ভোগ-বিলাসের উপকরণের কোনো কমতি ছিলো না। লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামে নির্বাচিত সেই তরুণীদের জন্য সেখানে খেলাধুলা, লাইব্রেরি, মিউজিক রুম, এমনকি সিনেমা হল পর্যন্ত ছিলো। ট্রুট্‌জের মতে, “সেখানে আমি যে খাবার খেয়েছিলাম, তা আমার জীবনে খাওয়া সেরা খাবার। সেখানে আমাদের কোনো কাজ করতে হতো না, অনেক চাকরবাকরই ছিলো সেখানে।” এভাবে রাজকন্যার মতোই কাটছিলো তাদের দিনগুলো। অপেক্ষা শুধু একজন এসএস রাজপুত্রের!

পুরো প্রোগ্রামটি নিয়ন্ত্রণ করতেন একজন উচ্চপদস্থ এসএস ডাক্তার। মেয়েরা সেখানে আসার পরপরই তিনি তাদেরকে ভালোমতো পরীক্ষা করেছিলেন। তাদেরকে জানাতে হয়েছিলো বংশগতভাবে তারা কোনো রোগ পেয়েছে কিনা, তাদের পরিবারে কেউ মাত্রাতিরিক্ত পানাসক্ত কিনা এবং পরিবারে কখনো কোনো বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নিয়েছে কিনা। তিনি তাদেরকে এটা বলেও সতর্ক করে দেন যে, তাদের গর্ভে আসা সন্তানকে কোনোভাবেই নিজের কাছে রাখা যাবে না। কিছুদিন পরই সেই সন্তানকে তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হবে। তাকে বড় করা হবে আলাদা পরিচর্যা কেন্দ্রে। তাকে নাৎসি পরিবেশে, নাৎসি আদর্শ শিখিয়ে একজন নাৎসি সদস্য হিসেবেই গড়ে তোলা হবে।

এরপর আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অর্থাৎ সঙ্গী বাছাইয়ের বিষয়টি। প্রাথমিক বিষয়াদি জানানোর পর সেই নারীদের সামনে হাজির করা হলো একদল এসএস অফিসারকে। সুঠাম দেহের অধিকারী, লম্বা সেই অফিসাররা সহজেই নারীদের মন কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সম্পর্ক বিছানা পর্যন্ত গড়ানোর আগে একে অপরকে চিনে নেয়ার ব্যবস্থাও ছিলো। এজন্য তাদেরকে একসাথে খেলাধুলা করা, সিনেমা দেখা, সন্ধ্যায় মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে একসাথে গল্পগুজব করার মতো বিষয়ের মাঝে দিয়ে যেতে হয়েছিলো।

শয্যাসঙ্গী বেছে নেয়ার জন্য ট্রুট্‌জদের দেয়া হয়েছিলো সাতদিন সময়। তাদের বিশেষভাবে বলে দেয়া হয়েছিলো যেন তাদের চুল ও চোখের রঙের সাথে শয্যাসঙ্গীর চুল ও চোখের রঙ সর্বোচ্চ পরিমাণে মিলে যায়। বলাবাহুল্য, সেই অফিসারদের কারো নামই তাদেরকে জানানো হয় নি। সবই ছিলো কঠোর গোপনীয়তার অংশ।

একসময় সঙ্গী পছন্দ করা হয়ে গেলে আরো কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয় তাদের। তখন সেই নারীদের আরো কিছু মেডিকেল টেস্টের ভেতর দিয়ে যাওয়া লাগে। এরপরই একদিন জানিয়ে দেয়া হয় সেদিনই তাদেরকে শয্যাসঙ্গীর সাথে রাত কাটাতে হবে। ট্রুট্‌জের ভাষ্যমতে, সেদিন তিনি এতটাই উত্তেজিত ও আনন্দিত ছিলেন যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এতে একদিকে যেমন শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি ছিলো, তেমনি অ্যাডলফ হিটলারের জন্য কিছু করতে পারার গর্বও মিশে ছিলো! তাদের সেই সঙ্গমকে তারা দেশের জন্য, ভালোবাসার ফুয়েরারের জন্যই মনে করেছিলেন। এজন্য তাদের মাঝে কোনো লজ্জাবোধ কিংবা অনুশোচনাও কাজ করে নি। প্রথম সপ্তাহে সেই লোকটি তিন রাতে ট্রুট্‌জের শয্যাসঙ্গী হয়েছিলো। পরের সপ্তাহে তাকে অন্যান্য নারীদের সাথে ডিউটি পালন করতে হয়েছিলো!

মিলনের পর অল্প কিছুদিনের মাঝেই গর্ভধারণ করেন ট্রুট্‌জ। এরপরই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আলাদা এক মাতৃসেবা কেন্দ্রে। বাচ্চা জন্মানোর আগপর্যন্ত নয়টি মাস তিনি সেখানেই কাটান। এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন ট্রুট্‌জ। তবে মাত্র দু’সপ্তাহই জীবনের প্রথম মাতৃত্বের স্বাদ উপভোগ করতে পেরেছিলেন তিনি। এরপরই বাচ্চাটিকে আলাদা আরেকটি এসএস হোমে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে তাকে পুরোপুরি নাৎসি পরিবেশে বড় করা হবে। এরপর আর কোনোদিনই নিজের গর্ভের সন্তান দেখতে পান নি তিনি, খোঁজ পান নি তার সেই শয্যাসঙ্গীরও।

পরবর্তী বছরগুলোতে আরো সন্তান নেয়ার জন্য বলা হয়েছিলো ট্রুট্‌জকে। কিন্তু ততদিনে তিনি আরেকজন অফিসারের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাই আর ওদিকের কথা ভাবেন নি তিনি। একসময় তাদের বিয়েও হয়ে যায়। বিয়ের পরে একদিন আনন্দে গদগদ হয়ে ট্রুট্‌জ তার স্বামীকে লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামে নিজের সংযুক্তি এবং বাচ্চা জন্মদানের কথাটি জানিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, হিটলারের প্রতি এমন ভালোবাসা ও আনুগত্য দেখে নাৎসি বাহিনীতে চাকরিরত তার স্বামী বোধহয় খুশি হবেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটলো ঠিক তার উল্টোটা! অমন প্রোগ্রামে ট্রুট্‌জের জড়ানোর বিষয়টি একেবারেই স্বাভাবিকভাবে নেন নি তার স্বামী। তবে স্ত্রী কাজটি হিটলারের জন্য করেছে দেখে তিনি তাকে কিছু বলতেও পারছিলেন না!