চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট Xi Jing Ping

চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট Xi Jing Ping এর ভাষ্যে;
“আমার বাবার দেওয়া তিনটে উপদেশ আমাকে আজ এখানে পৌঁছে দিয়েছে।

ছোটবেলায় আমি খুব স্বার্থপর ছিলাম। সবকিছুতেই নিজের সুবিধে আর লাভটা বুঝে নেবার চেষ্টা করতাম। আমার এই দোষের জন্য আস্তে আস্তে আমার বন্ধুর সংখ্যা কমতে শুরু করল। শেষে অবস্থা এমন হোলো যে আমার আর কোনো বন্ধুই অবশিষ্ট রইল না। কিন্তু, সেই অপরিনত বয়েসে আমি এর জন্য নিজেকে দায়ী না করে সিদ্ধান্ত নিলাম আমার বন্ধুরা আসলে হিংসুটে। ওরা আমার ভাল দেখতে পারে না। আমার বাবা সবই লক্ষ করতেন, মুখে কিছু না বললেও।
একদিন রাতে বাড়ি ফিরে দেখি, বাবা আমার জন্য খাবার টেবিলে অপেক্ষা করছেন। টেবিলে রাখা আছে রান্না করা ন্যুডলের দুটি ডিশ। একটা ডিশে সেদ্ধ ন্যুডলের ওপর রাখা একটি খোসা ছাড়ানো সেদ্ধ ডিম। অন্য ডিশটিতে শুধু ন্যুডলসের যে কোনো একটি ডিশ বেছে নিতে বললেন বাবা। স্বাভাবিক ভাবেই আমি ডিম সমেত ডিশটাই উঠিয়ে নিলাম। সেই সব দিনে চীনে ডিম ছিল এক দুস্প্রাপ্য জিনিস। উৎসবের দিন ছাড়া কারো বাড়িতে ডিম খাবার কথা তখন ভাবা যেত না। খাওয়া শুরু করবার পর দেখা গেল বাবার ডিশে ন্যুডলসের তলায় আসলে লুকিয়ে রাখা আছে দুটো ডিম। আমার এত দুঃখ লাগছিল তখন। কেন যে তাড়াহুড়ো করে বাছতে গেলাম। বাবা আমাকে দেখছিলেন। খাবার পর মৃদু হেসে বললেন, “মনে রেখো, তোমার চোখ যা দেখে, সেটা সব সময় সত্যি নাও হতে পারে। শুধু চোখে দেখে যদি মানুষ বা কোনো পরিস্থিতিকে বিচার করে সিদ্ধান্ত নাও, ঠকে যাবার সম্ভবনা থাকবে।”

পর দিন আমার বাবা আবার খাবার টেবিলে ন্যুডলস ভর্তি দুটো ডিশ রেখে আমাকে খেতে ডাকলেন। আগের দিনের মত এবারেও একটাতে ডিম আছে, আর একটাতে নেই। আমাকে যে কোনো একটি ডিশ বেছে নিতে বলা হোলো। আমি আগের অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি, চোখ যা দেখে তা সত্যি নাও হতে পারে। আমি ডিম ছাড়া ডিশটিই বেছে নিলাম। কিন্তু খেতে গিয়ে দেখলাম, ভেতরে কোনো ডিমই নেই। বাবা আমার দিকে তাকিয়ে আবার হাসলেন।
“অভিজ্ঞতা সব সময় সঠিক পথ দেখায় না। জীবন বড় বিচিত্র। জীবনে চলার পথে বহুবার আমাদের মরীচিকার সামনে পরতে হয়। এর থেকে উত্তরন অসম্ভব। জীবন যেটা তোমাকে দিয়েছে, সেটা মেনে নিলে কষ্ট কম পাবে। তোমার অভিজ্ঞতা এবং বুদ্ধিমত্তা তুমি অবশ্যই কাজে লাগাবে, কিন্তু শেষ কথা জীবনই বলবে।”
তৃতীয় দিনে আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। আগের দিনের মতই এবারেও একটাতে ডিম আছে, আর একটাতে নেই। তবে একটা ব্যাপার এবার একটু অন্য রকম হলো। এবার আমি বাবাকে বললাম, আগে তুমি নাও। তার পর আমি। কারন তুমি বাড়ির সবার বড়, এই সংসার তোমার রোজগারে চলে। তোমার অধিকার সবার আগে। শুনে বাবার মুখে উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল, মুখে কিছু বললেন না যদিও। খাওয়া শুরু করবার পর আমি দেখলাম ন্যুডলসে র নীচে আমার ডিশে দুটো ডিম। খাবার পর বাবা আমাকে কাছে ডাকলেন। সস্নেহে আমার হাত ধরে বললেন, “মনে রেখো, কৃতজ্ঞতা এবং ঋণ স্বীকার করা মানুষের শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তুমি জীবনে যদি অন্যের জন্য ভাব, অন্যকে দাও, জীবনও তোমার কথা ভাববে, তোমাকে আরো বহুগুণে ফিরিয়ে দেবে।

বাবার এই তিনটে উপদেশ আমি আজীবন মনে রেখেছি, এবং মেনে চলেছি। কি আশ্চর্য , সত্যি জীবন আমাকে বহু গুণ ফিরিয়ে দিয়েছে। আমি আজ যেখানে আছি, সেটা জীবনের দান ছাড়া আর কি?”

আল্লামা ইকবাল : যাঁর কবিতা ও দর্শনে জেগেছে মুসলিম বিশ্ব


(উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতিতে আল্লামা ইকবাল গুরুত্বপূর্ণ নানা কারণে প্রাসঙ্গিক। এ ভূখণ্ডে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের স্বপ্ন সর্বপ্রথম তিনিই দেখেছিলেন। কবিতা ও দর্শনে যেমন তিনি অনন্য, রাজনীতিতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর কবিতা ও দর্শনে উপমহাদেশের মুসলমান তো বটেই, বিশ্ব মুসলিমও নানাভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছে। সেই ধারা আজও চলমান।)
১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে এক উত্তাল, অশান্ত সময়। শুক্রবার ফজরের আজানের পর বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোট নগরীতে এক মধ্যবিত্ত সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আল্লামা ইকবাল। একতলা একটি জীর্ণ বাড়ির যে প্রকোষ্ঠে তাঁর জন্ম হয়েছিল, তা এখনও পাকিস্তান সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের জন্য এটি একটি দর্শনীয় বাড়ি।
ইকবালের পূর্ব-পুরুষগণ কাশ্মীর থেকে হিজরত করে শিয়ালকোটে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর পিতার নাম শেখ নুর মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন শিয়ালকোটের অন্যতম টুপি-ব্যবসায়ী এবং অত্যন্ত আল্লাহভীরু ও ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ একজন সৎ মানুষ৷ আল্লামা ইকবালের পিতার হৃদয়ে পবিত্র ইসলামের প্রতি কতটা ভালবাসা ও আঁকুতি ছিল, তা দুইটি ঘটনার মধ্য দিয়ে জানা যায়। আল্লামা ইকবালের জন্মের পর প্রথম যখন তাঁকে পিতার কোলে দেয়া হয়, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘যদি তোমার এই জীবন ইসলামের কোনো উপকারে আসে তাহলে দীর্ঘজীবী হও, অন্যথায় এ জীবন মূল্যহীন।’ শিয়ালকোটের সেই জরাজীর্ণ ঘরের মেঝেয় পিতার কোলে বসে ইকবাল কি বুঝতে পেরেছিলেন জীবনের মূল্য? সেই মূল্যবোধই কি মুসলিম হোমল্যান্ডের স্বপ্নদ্রষ্টা আল্লামা ইকবালকে তাড়া করে গেছে সারাজীবন?
মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশু ইকবাল মাওলানা গোলাম হাসান ও সৈয়দ মীর হাসানের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। স্কচ মিশন স্কুলের শিক্ষক সৈয়দ মীর হাসান মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তনে খুব আগ্রহী ছিলেন। পিতা শেখ নুর মুহাম্মদের অনুমতিক্রমে ইকবালকে তিনি স্কচ মিশন স্কুলে ভর্তি করেছেন। ইকবালের সঙ্গে তাঁর বাবার ঐতিহাসিক দ্বিতীয় ঘটনাটি এখানে ঘটে। বাবা বললেন, ‘যদি স্কুল থেকে ফেরত এসে অবশিষ্ট জীবনে ইসলামের খেদমত করতে পারো, তাহলে আমি তোমাকে স্কুলে যাওয়ার অনুমতি দেব।’
ইকবাল কথা রেখেছিলেন। পিতার সঙ্গে কৃত ওয়াদা ইকবাল জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছেন।
প্রাথমিক স্তর থেকে এফএ পর্যন্ত দশ বছরকাল তিনি সৈয়দ মীর হাসানের তত্ত্বাবধানে শিক্ষাগ্রহণ করেন। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সৈয়দ মীর হাসান অভিনব পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণ ইকবালের মনে ঐকান্তিক পিপাসা জাগিয়ে তোলেন। ১৮৮৮ সালে প্রাথমিক, ১৮৯১ সালে মিডল এবং ১৮৯৩ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বৃত্তি ও মেডেলসহ উত্তীর্ণ হন। ১৮৯৫ সালে ইকবাল ঐ কলেজ থেকে এফএ পাস করেন এবং একই বছর ১৮ বছর বয়সে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে লাহোর গমন করেন। লাহোর সরকারি কলেজ থেকে ১৮৯৭ সালে স্নাতক ও ১৮৯৯ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। একই বছর তিনি লাহোরের ওরিয়েন্টাল কলেজে ইতিহাস ও দর্শন শাস্ত্রে অধ্যাপনার চাকরি গ্রহণ করেন।
আল্লামা ইকবালের জীবন ছিল আপাদমস্তক কীর্তিমান এক মহাপুরুষের জীবন৷ জীবনের প্রতিটি লক্ষ্য ও দর্শনকে তিনি ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও তৎপরতার মাধ্যমে সফলতার মুখ দেখান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থা বিশেষ করে মুসলমানদের দুঃখজনক চিত্র তাঁকে ব্যথিত করে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন, রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়া ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুসলমানদের উত্তরণ আর সম্ভব নয়। মুসলমানদের প্রতিটি সমস্যায় গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে আমৃত্যু ভারতীয় রাজনীতির কঠিন মাঠে বিচরণ করেন তিনি।
১৯২৬ সালে পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৭ সালে বৃটিশ সরকার ভবিষ্যৎ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের পটভূমি তৈরির জন্য ‘সাইমন কমিশন’ প্রেরণ করলে কংগ্রেস দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে আল্লামা ইকবাল নওয়াব জুলফিকার আলি খান ও মাওলানা মোহাম্মদ আলির সাথে যৌথভাবে এক বিবৃতি প্রকাশ করে কমিশনকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি মুসলমানদের লক্ষ্য করে বলেন, যদি আমরা কমিশনকে সহায়তা না করি তবে বৃটিশরা মুসলমানদের স্বার্থকেই বিঘ্নিত করবে। আল্লামা ইকবালের এই ধারণা বৃটিশদের শাসন পরিচালনায় মুসলমানরা হারে হারে টের পেয়েছিল। বৃটিশরা সবসময় মুসলমানদের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করার কারণে মুসলমানদেরকেই প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করছে। যা তাদের দীর্ঘ দিনের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।
মুসলমান শাসনের অবসানের পর কাশ্মীরের মুসলমানরা নানাবিধ নির্যাতন ও লাঞ্চনার শিকার হয়। অসহায় কাশ্মীরি মুসলমান ভাই-বোনদেরকে সহযোগিতা করার জন্য লাহোরে চলে আসা কাশ্মীরিরা আঞ্জুমান নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর আল্লামা ইকবাল এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। যেহেতু তিনিও ছিলেন মূলত কাশ্মীরি। তাঁর পূর্বপুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়েই কাশ্মীর ছেড়ে চলে আসেন।
১৯৩০ সালের দিকে মুসলমানদের প্রতি জুলুম-নির্যাতন অত্যধিক পরিমাণে বেড়ে যায়। ডোগরা মহারাজার ক্রমবর্ধমান জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদে লাহোরে সর্বভারতীয় কাশ্মীর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে কাশ্মীর প্রশাসনের অন্যায় নির্যাতনের সমালোচনা করে প্রস্তাব গৃহীত হয়। আল্লামা ইকবাল এই প্রস্তাবের প্রতি একাত্মতা পোষণ করেন। এ সময় তিনি মুসলিম কনফারেন্সের সভাপতি ছিলেন। তিনি কাশ্মীরিদের সার্বিক সমস্যার কথা সরকারের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরেন। এর প্রেক্ষিতে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কাশ্মীরিদের সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধান হয়।
১৯৩২ সালে আলোয়ার রাজ্যের মহারাজা কর্তৃক নির্যাতিত মুসলমানগণ ‘খাদেমুল মুসলিমিন’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করালে মহারাজার সরকার এটিকে বেআইনি ঘোষণা করে। এ অন্যায় আদেশের প্রতিবাদে মুসলমানরা বিক্ষোভ করলে তাদের উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে শহিদ হন প্রায় এক শত মুসলমান। এরপর শুরু হয় গণ-গ্রেফতার। বাড়ি-ঘরে ছেড়ে পালাতে থাকে মুসলমানগণ। এই অন্যায় আচরণের প্রতিকার চেয়ে আল্লামা ইকবাল ভাইসরয় লর্ড ওয়েলিংটনের নিকট একটি স্মারক লিপি পেশ করেন। পরিণতিতে মুসলমানগণ ফেরারি জীবন ছেড়ে বাড়ি ফেরার সুযোগ পায়।
১৯৩৬ সালে আল্লামা ইকবাল পাঞ্জাব মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি বোর্ডের সভাপতি নিযুক্ত হন। একই সালে পাঞ্জাব মুসলিম লীগ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ঘোষণা করা হয় তাঁকে। ১৯৩৮ সালে লাহোরে মসজিদের দখল নিয়ে শিখ-মুসলমান দাঙ্গার সময় আল্লামা ইকবাল মসজিদ পুনরুদ্ধারে শাহাদাত প্রত্যাশী মুসলমান যুবকদের উৎসাহ যোগান। এক কথায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে আল্লামা ইকবাল মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
এরপরও কেউ কেউ আল্লামা ইকবালের রাজনৈতিক কার্যকলাপের সমালোচনা করেন। কিন্তু তৎকালীন পরিস্থিতির বিচারে একজন মুসলমানের এরচেয়ে কতটুকু বেশি করার সুযোগ ছিল তা কিন্তু প্রশ্ন সাপেক্ষ। সার্বিক বিবেচনায় ভারতীয় মুসলমানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণে আল্লামা ইকবালের অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। তিনিই সর্বপ্রথম মুসলিম লীগের অধিবেশনে ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করেন। এই দাবিই পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনের সূচনা করে। আজকের ক্ষমতাধর মুসলিম পাকিস্তান রাষ্ট্রটির স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন আল্লামা ইকবাল।
একজন নেতা, লেখক কিংবা একজন দার্শনিকের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন হয়তো সেটাই, যেদিন তিনি দেখতে পান, তাঁর মস্তিষ্ক-নিসৃত একটি চিন্তা পৃথিবীর বুকে বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে। আল্লামা ইকবালের জীবনে সেই মহানন্দের দিনটি তাঁর জীবদ্দশায় আসেনি৷ যেদিন দক্ষিণ-এশিয়ায় তাঁর স্বপ্নের স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন বস্তবে রূপ নেয়, দিনটি ছিল ১৯৪৭ সালের পয়লা আগস্ট। ইকবাল সে দিনটি পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারেননি।
১৯৩০ সালের ২৪ মার্চ লাহোরের মিন্টু পার্কে জনসমুদ্র এসে হাজির হয়েছিল ইকবালের ‘মুসলিম হোমল্যান্ড’ ধারণাকে স্বাগত জানাতে। এই ধারণা কবি ইকবাল দিয়েছিলেন ১৯৩০ সালের ৩০ ডিসেম্বর, এলাহাবাদে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনে। তাঁর এই ধারণা এই সম্মেলনে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। এই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার দুই বছর আগেই তিনি এই জাগতিক দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। তাঁর জীবনে একটি স্মরণীয় দিন ছিল সেটি, যখন জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণ বিদ্রোহ করেছিল বর্বর সামন্ত স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। তিনি সেই দিনটিতে দেখতে পেয়েছিলেন, তাঁর আলাদা ‘মুসলিম হোমল্যান্ডের’ স্বপ্ন একদিন বাস্তবায়িত হবে।
একাধারে কবি, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ ও আইন বিশেষজ্ঞ আল্লামা ইকবাল ছিলেন প্রচণ্ড শিকড়-আকড়ে-থাকা মানুষ। যৌবনকাল কাটিয়েছেন ইউরোপের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে৷ কঠোর অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে জ্ঞানের রস নিংড়ে এনেছেন৷ কিন্তু ইউরোপের জীবনধারায় গা ভাসাননি। ১৯২৩ সালে বৃটিশ সরকার ইকবালকে নাইট খেতাব দিয়ে সম্মানিত করে। তাঁর এই নাইটপ্রাপ্তিতে ভক্ত-অনুরাগীদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। বিরুদ্ধবাদী কবিরা ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা লিখে তাঁকে আক্রমণ করেন। এমনকি তাঁর বন্ধুরা চিঠি লিখে তাঁর মতামত জানতে চান এবং আশ্বস্ত হতে চান ঘটনা যেন কোনো ক্রমেই তাঁর স্বাধীন মতামত প্রকাশে কিংবা কওমের প্রতি খেদমতে বাধার সৃষ্টি না করে। আল্লামা ইকবাল বাকি জীবন কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন যে, তিনি কখনো দুর্দশাগ্রস্থ মুসমানদের কথা ভুলেননি। সকল বিবাদ-বিসংবাদের ঊর্ধ্বে গিয়ে নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষগ্রহণ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদের চিন্তা তাঁকে কখনো স্বার্থপর ও বিলাসী হয়ে উঠতে দেয়নি। তিনি সারাজীবন একজন দুঃখী মানুষ ও একটি অবরুদ্ধ পাখির বেদনায় কেঁদেছেন। হিন্দুস্তানের মাটির পক্ষে গেয়ে গেছেন নিষ্কলুষ প্রেমের গান। এজন্যই তিনি ইউরোপমুখী প্রফেসর ইকবাল না হয়ে হয়ে উঠেছেন আমাদের আল্লামা ইকবাল।
আল্লামা ইকবালের কিছু বিখ্যাত গ্রন্থ১. ইলমুল ইকতিসাদ : অর্থনীতির উপর লেখা উর্দুভাষার প্রথম গ্রন্থ। তিনি এটি লাহোর সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক থাকাকালে রচনা করেন।২. তারিখ-ই-হিন্দ : বইটির মূল কপির সন্ধান পাওয়া যায় না এখন। এর একটি সংস্করণ অমৃতসর থেকে প্রকাশিত হয়।৩. আসরার-ই-খুদি : আল্লামা ইকবালের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। এটি ১৯১৫ সালে প্রকাশিত হয়। এ বই প্রকাশের পর সাড়া পড়ে যায় সর্বত্র। কিন্তু সুফি তরিকার অনুসারীরা এ পুস্তক প্রকাশকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে গ্রহণ করেননি। কেননা ইকবাল এ গ্রন্থে সুফি কবি হাফিজ শিরাজির তীব্র সমালোচনা করে ৩৫টি কবিতা লিখেছিলেন। উত্তেজনা এতই চরম আকার ধারণ করেছিল যে, ইকবালের চিন্তাধারার সমালোচনা করে খানবাহাদুর পীরজাদা মোজাফফর আহমদ ‘ফজলে রাজ-ই-বেখুদি’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতা প্রকাশ করেন। ইকবাল পরবর্তী সংস্করণে উল্লেখিত ৩৫টি কবিতা বাদ দিয়ে দেন। প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ আর এ নিকলসন ১৯২০ সালে এর ইংরেজি তর্জমা প্রকাশ করেন।৪. রমুজে বেখুদি : আসরার-ই-খুদিরই ক্রম সম্প্রসারিত এই সংকলনটি ১৯১৮ সালে রমুজে বেখুদি নামে প্রকাশিত হয়। আর্থার জন আর্বারি এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন।৫. পায়াম-ই-মাশারিক : এ বইটি প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে। এ সময় ইকবাল কবি হিসেবে অর্জন করেছেন সর্বজন স্বীকৃতি। তাঁর কবিতা এগিয়ে চলেছে পূর্ণ-পরিণতির দিকে। তিনি এ কাব্যে পাশ্চাত্য দর্শনের পাশাপাশি প্রাচ্যের কোরআনি চিন্তার ফসলকেও তুলে এনেছেন। এ কাব্যাটি গ্যেটের চিন্তাধারার অনুসরণে রচনা করেন। এতে মোট ৮০টি কবিতা সংকলিত হয়েছে।৬. বাঙ্গ-ই-দারা : ইকবালের কবিজীবনের শুরু উর্দু কবিতার হাত ধরে। আর এই কাব্যটি উর্দু কবিতা সংকলন। উর্দুতেই তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর শ্রেষ্ঠ দেশাত্মবোধক এবং জনচিত্তে আগুন ধরানো কবিতাগুলো। ১৯২৪ সালে তিনি বাঙ্গ-ই-দারা নামে এসব উর্দু কবিতার সংকলনটি প্রকাশ করেন। এ কাব্যের কবিতাগুলো দেশাত্মবোধক, প্রকৃতি প্রীতি ও ইসলামি অনুভূতি–এ তিনটি অংশে বিভক্ত।৭. জবুর-ই-আজম : ইকবালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফার্সি কবিতা সংকলন জবুর-ই-আজম। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয়। এর দুইটি অংশের প্রথম অংশে কবিতা ও গীত এবং দ্বিতীয় অংশের নাম গুলশান-ই-রাজ-ই-জাদিদ।
ব্যক্তিগত জীবনে আল্লামা ইকবাল ছেলে ড. জাবেদ ইকবাল ও মেয়ে মুনীরার জনক। ১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল ভোর ৫টা ১৪ মিনিটে চতুর্দিকে ফজরের আজান ধ্বনিত হবার মুহূর্তে ৬০ বছরের কিছু বয়েস নিয়ে এই মহান মুসলিম মনীষী ইন্তেকাল করেন।

#ডঃ_মুহম্মদ_শহিদুল্লাহ : মুসলিম বাংলার কিংবদন্তী ভাষাতাত্ত্বিক।

মুসলিম বাংলার কিংবদন্তী ভাষাতাত্ত্বিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্মবার্ষিকী। ১৮৮৫ সালের এ দিনে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন তুমুল আনন্দোচ্ছল। হাসি ও আনন্দ দিয়ে আশপাশের সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন সারাক্ষণ। বন্ধু-বান্ধবরা এজন্য তাঁর নাম দিয়েছিল সদানন্দ। স্কুলের মাস্টার মশাই চলনে বলনে মুনশিয়ানা দেখে ডাকতেন সিরাজুদ্দৌলা নামে। আর আকিকার সময় আত্মীয়-স্বজনের পছন্দে নাম রাখা হয়েছিল ইবরাহিম। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় মায়ের রাখা শহিদুল্লাহ নামটা সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। শহিদে কারবালার চাঁদে মায়ের গর্ভে এসেছিলেন তিনি। মা ভাবলেন, ছেলের নাম ‘শহীদুল্লাহ’ রাখলে নামের বরকতে একসময় হয়তো স্মরণীয় মনীষীদের তালিকায় নাম উঠবে তাঁর ছেলের। মায়ের এ আশা ও ভাবনা পরবর্তীকালে ষোল আনাই পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল। মায়ের রাখা নাম অনুযায়ী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনি বরণীয় হয়ে আছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নামে।
পড়াশোনায় সর্বদা নিমগ্ন থাকতে ভালোবাসতেন, অধ্যয়ন আর জ্ঞান-গবেষণায় ছিল তাঁর সমস্ত আনন্দ। এজন্য নিজে নিজের নাম দিয়েছিলেন জ্ঞানানন্দ। নামের যেমন বাহার ছিল তাঁর, কর্মের বাহার ছিল তারচেয়ে ঢের বেশি। কর্মের বাহারে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মুসলিম বাংলার কিংবদন্তী ভাষাবিদ, ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। ভাষা ও ভাষাতত্ত্বে অর্জন করেছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্য। আঠারোটি ভাষায় বিস্তৃত ছিল তাঁর এ পাণ্ডিত্য। বাংলা, ইংরেজি তো রয়েছেই, সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি, উর্দু, হিন্দিতে যথেষ্ট জ্ঞান ছিল তাঁর। এ ছাড়া তিনি রপ্ত করেছিলেন গ্রিক, তামিল, আর ল্যাটিন ভাষাও। আসামি, পাঞ্চাবি, গুজরাটি, মারাঠি, ওড়িয়া, কাশ্মীরী, নেপালি, তিব্বতি ইত্যাদি ভাষাও শিখেছিলেন।
ভাষাশিক্ষার এ আগ্রহ বলতে গেলে পারিবারিক সূত্রে অর্জন করেছিলেন তিনি। তাঁর পিতাও চার-পাঁচটা ভাষা জানতেন। সেই সুবাদে প্রাথমিক পর্যায়ে পারিবারিকভাবে এবং পরে ব্যক্তি উদ্যোগে তাঁর ভাষাশিক্ষা জ্ঞানার্জনের শুরু।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পিতার নাম মফিজুদ্দীন আহমদ আর মাতা হুরুন্নেসা খাতুন। তাঁর বংশ পরিচয় সম্পর্কে জানা যায়, সৈয়দ আব্বাস আলি মক্কি নামে এক কামিল দরবেশ চতুর্দশ শতকে দক্ষিণ বাংলায় ইসলাম প্রচার করেন। পীর গোরাচাঁদ নামেও তিনি পরিচিত। ১২৬৫ সালে পবিত্র মক্কানগরে এই সাধকের জন্ম। কারো কারো মতে তিনি হজরত শাহজালাল রহমতুল্লাহি আলায়হির ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম। হাড়োয়ায় পীর গোরাচাঁদের মাজার অবস্থিত। শহীদুল্লাহর আদি পুরুষ শেখ দারা মালিক এই দরবেশ সাহেবের প্রধান খাদেমরূপে হিন্দুস্তান থেকে এ দেশে আগমন করেন এবং তাঁর দরগাহের বংশানুক্রমিক খাদেমরূপে বহাল হন। ইনিও একজন কামেল দরবেশ ছিলেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর রক্তে এই কামেল দরবেশের রক্তধারা এবং পীর গোরাচাঁদের রুহানি ফায়েজ প্রবাহিত হয়েছিল।
চার ভাই ও তিন বোনের সংসারে ভাইদের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। ১০ বছর বয়সে তাকে ভর্তি করানো হয়েছিল হাওড়ার মধ্য ইংরেজি স্কুলে। সেখানে চার বছর পড়াশোনার পর ১৮৯৯ সালে ভর্তি হলেন হাওড়া জেলা স্কুলে। পড়াশোনায় যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন আর স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। হাওড়া জেলা স্কুলে ভর্তির পর প্রথমবারই বার্ষিক পরীক্ষায় লাভ করলেন রৌপ্য পদক।
ছাত্রাবস্থায়ই ভাষা শেখার প্রতি ছিল তাঁর ভীষণ ঝোঁক। স্কুলে পড়া অবস্থায় তিনি সংস্কৃত আর ফার্সি কবিতা বাংলায় অনুবাদ করতেন। ১৯০৪ সালে প্রবেশিকা বা এনট্রান্স পাস করে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে ১৯০৬ সালে এফএ পাস করেন। সংস্কৃতে অনার্স নিয়ে বিএ ভর্তি হন হুগলি কলেজে। অসুস্থতার জন্য বিএ পরীক্ষায় পাস করা হয় না, ফলে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন যশোর জেলা স্কুলে। পরবর্তীকালে ১৯১০ সালে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে বিএ অনার্স ডিগ্রি লাভ করেছিলেন।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন সংস্কৃতে এমএ পড়বেন বলে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। ফলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পরামর্শক্রমে তিনি ভর্তি হন তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব নামে নতুন একটি বিষয়ে। সে বছরই এ বিষয়টি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের ন্যায় যুক্ত হয় এবং শহীদুল্লাহ এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ের প্রথম ছাত্র হিসেবে ১৯১২ সালে এমএ পাস করেন। জার্মানিতে সংস্কৃত বিষয়ে পড়াশোনার জন্য সরকারি বৃত্তি লাভ করলেও স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে যেতে পারেননি। পরবর্তীকালে ফ্রান্সের প্যারিসের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে ডিপ্লোমা করেন। এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিলিট ডিগ্রি লাভের গৌরব অর্জন করেন।
অসামান্য প্রতিভাধর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন সুপণ্ডিত ও বহু ভাষাবিদ। ছিলেন মুক্তবুদ্ধির অধিকারী। প্রাচীন ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে দুরূহ ও জটিল সমস্যার যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে অসামান্য পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন তিনি।
১৯১৪ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর রুটি-রুজির তাগিদে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু এক বছরের বেশি চাকরি করলেন না। শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দিয়ে ১৯১৫ সাল থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত ওকালতি ব্যবসা শুরু করলেন। এ সময় তাঁর সাহিত্য চর্চাও চলল সমান তালে।
১৯১০ সালে বিয়ে করেন। তাঁর স্ত্রী মারগুবা খাতুন। দাম্পত্যজীবনে দুই ছেলের জনক তিনি।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তৎকালীন স্বনামখ্যাত পত্রিকা ‘ভারতী’তে ‘মদনভস্ম’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। কোহিনুর পত্রিকায় কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন। প্রতিভা পত্রিকায় লিখেছিলেন প্রবন্ধ। সেই সঙ্গে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন বেশকিছু দিন। ‘আল-এসলাম’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করতেন, পাশাপাশি এর সহ-সম্পাদকও ছিলেন। সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় তার বাংলা ভাষা সম্পর্কে গবেষণাপত্র ছাপা হয়েছিল। তিনি বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সম্পাদক ছিলেন। শহীদুল্লাহ নিজেই ছোটদের জন্য ‘আঙ্গুর’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ ড. দীনেশচন্দ্র সেন এ পত্রিকার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। প্রথম সংখ্যায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘রথযাত্রা’ নামক ছোটদের জন্য গল্প লিখেছিলেন। ৩য় সংখ্যায় নজরুল কবিতা লিখেছিলেন।
শহীদুল্লাহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শরৎকুমার লাহিড়ী গবেষণা সহায়ক পদে চাকরিতে যোগদান করলেও ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকা চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম এবং একমাত্র শিক্ষক হিসেবে ওই বছরের জুন মাসে যোগদান করেন। ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত টানা তেইশ বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছিলেন। পরবর্তীকালেও বিক্ষিপ্তভাবে আরও কয়েক বছর এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৩৭ সালে সংস্কৃত থেকে বাংলা বিভাগ আলাদা হয়ে গেলে তিনি বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৪০ সালে ফজলুল হক মুসলিম হল নির্মিত হলে তিনি এর প্রভোস্টের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে তিনি বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে চার বছর কাটিয়ে ১৯৪৮ সালে আবার ফিরে এলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ১৯৫২-৫৪ সাল পর্যন্ত বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষরূপে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি কলা অনুষদের ডিন ছিলেন এক বছর। ১৯৫৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি সেখানকার বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষরূপে যোগদান করেন। ১৯৫৫ সালে সেখানেও তিনি কলা অনুষদের ডিন ছিলেন। উর্দু উন্নয়ন সংস্থার উর্দু অভিধানের সম্পাদক হিসেবে করাচিতে কাটিয়েছেন দু’বছর। পড়াশোনার খাতিরে তিনি ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। ঘুরেছেন চীন, সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশে ও শান্তি নিকেতনে গিয়েছেন বেশ কয়েকবার। প্যারিসের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। বাংলা ভাষার সবচেয়ে পুরনো কবিতা সম্পর্কে গবেষণা করে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৩১ সালে তার প্রথম প্রবন্ধের বই ‘ভাষা ও সাহিত্য’ প্রকাশিত হয়। ১৯৩২ সালে ‘রকমারি’ নামক একটি গল্পের বই প্রকাশ করেন। ১৯৫৩ সালে ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’ প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। এ সময় ‘আমাদের সমস্যা’ নামে একটি বইও প্রকাশ করেন। আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ আর ‘বিদ্যাপতি-শতক’ নামে দুটি গ্রন্থের সম্পাদনা করেন। বাংলা একাডেমিতে থাকাকালীন তিনি একাডেমির হয়ে বাংলা আঞ্চলিক ভাষার অভিধান ও ইসলামী বিশ্বকোষ সম্পাদনা করেন। ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’ (২য় খণ্ড) ও ‘বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত’ নামক বইগুলো প্রকাশিত হয় এ সময়ে। তিনি ওমর খৈয়ামের বাংলা অনুবাদ করেন। তাঁর রচিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
আশি বছর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে দেশবাসীর পক্ষ থেকে তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা দেয়া হয়। ধীরে ধীরে তাঁর শরীর খারাপ হয়ে আসতে থাকে। একসময় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন রোগভোগের পর হাসপাতালেই ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর অত্যন্ত পছন্দের স্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই তাঁকে দাফন করা হয়।
মুসলিম বাংলার কিংবদন্তী ভাষাতাত্ত্বিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মাতৃভাষা আর মাতৃভূমির ভালোবাসায় আজীবন বেঁচে থাকবেন।

আবদুস সাত্তার ইদি : এক মহান পুরুষের জীবনের উপাখ্যান

অনেকে চেনেন না তাঁকে। যাঁরা চেনেন তাঁরাও প্রায় ভুলতে বসেছেন। একটি নাম যখন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় তখন অনেক কথা বলা উচিত। তেমন কোনো কথা নয়। শুধু এটুকুই, আবদুস সাত্তার ইদি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান ছিলেন না, ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠানবিরোধী প্রতিষ্ঠান।
তাঁকে কিংবদন্তি বললে ছোট করা হবে, সে কথা বলছি না। তিনি ছিলেন আরো একটু বড়, আরো খানিকটা বেশি। তিনি শুধু একটি দেশের ছিলেন না, ছিলেন গোটা বিশ্বের।
আসুন, এবার তাঁর সম্পর্কে কিছু জেনে নিই। জন্ম ব্রিটিশ ভারতের গুজরাটের বান্তভায়। ১৯২৮ সালের আজকের দিনে। বিখ্যাত মেমন পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, তাঁর মা তাঁকে ১ পয়সা দিতেন খাবার খাওয়ার জন্য আর ১ পয়সা দিতেন গরিব কোনো শিশুকে দেওয়ার জন্য। মা তাঁর ১১ বছর বয়সে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন আর মারা যান তাঁর বয়স যখন ১৯। মাকে প্রাণপণ সেবা করেন তিনি আর এটাই তাঁকে বয়োঃজ্যেষ্ঠদের প্রতি সাধারণ সেবাদানের প্রতি আকৃষ্ট করে।
১৯৪৭ সালে তাঁর পরিবার মাইগ্রেট করে পাকিস্তানে। এরপর শুরু হয় তাঁর সংগ্রামপর্ব। করাচিতে শুরু হয় নতুন জীবন, নতুন সংগ্রাম। করাচির জোদিয়া বাজারের কাছে একটি ছোট্ট ঘর ভাড়া নিয়ে মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেন তিনি। প্রথমেই মিথাদারের কাছাকাছি সারফা বাজার থেকে কয়েকজন ডাক্তারকে নিয়ে আসেন এবং ১১টি মোবাইল ডিসপেনসারি খোলেন শহরের ফুটপাতে। আজ সেই একই স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইদি সেন্টার। অন্যের কষ্ট লাঘবে ইদির নেয়া ছোট্ট একটি মানবহিতৈষী কাজ তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় বিশাল এক প্রান্তিক জনগোষ্ঠির সঙ্গে এবং ধীরে ধীরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চ্যারিটি নেটওয়ার্ক হয়ে যায় এই উদ্যোগ, যার নাম ইদি ফাউন্ডেশন।
ইদি ফাউন্ডেশন এখন বিশাল এক সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানজুড়ে শত শত বিনামূল্যের নার্সিং হোম, বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, এতিমখানা, নারীদের আশ্রয় ও পুনর্বাসনকেন্দ্র, বৃদ্ধনিবাস, প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন কেন্দ্র, মাদক নিরাময় কেন্দ্র, স্কুল ও হাসপাতাল পরিচালনা করে থাকে। সংস্থাটি কবরস্থান এবং মর্গগুলোও পরিচালনা করে থাকে। গত কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানে সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন তিনি।
ইদি ফাউন্ডেশনের জন্য নিজেই ভিক্ষে করতেন আব্দুস সাত্তার ইদি
উল্লেখ করার মতো ব্যাপার হলো, পাকিস্তানের অস্থিতিশীল সমাজে যে কোনো হামলা বা সংঘর্ষের স্থানে সর্বপ্রথম যে অ্যাম্বুলেন্স দেখতে পাবেন সেটা হলো ইদি ফাউন্ডেশনের। সন্ত্রাসী হামলা থেকে শুরু করে দাঙ্গা পরিস্থিতির ভেতরেও ইদির সদস্যরা বুদ্ধিমত্তা এবং সাহসিকতার সঙ্গে মানুষের লাশ সংগ্রহ করে।
১৯৫১ সালে তিনি প্রথম ক্লিনিক খোলেন। কখনো কখনো রাষ্ট্র যেসব সেবা দিতে ব্যর্থ হয় সেগুলোও দিয়ে থাকে এই ইদি ফাউন্ডেশন। তিনি পাকিস্তানের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং অনেকেই তাকে সাক্ষাৎ দেবদূত জ্ঞান করত।
কোনোদিন স্কুলের বারান্দা না মাড়ালেও ২০০৬ সালে করাচির ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে তাকে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধিতে ভূষিত করে। এছাড়াও ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের বেডফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ও তাকে ডিলিট দেয়। অবসর এমনিতেই খুব কম পেতেন তিনি, তবে যাও পেতেন তখন তার নেশা ছিল বই পড়া।
২০১৪ সালে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইদি জানিয়েছিলেন, সাধারণ জীবনযাপন, সততা, কঠোর পরিশ্রম ও সময়ানুবর্তিতা তার কাজের মূল বিষয়। তিনি বলেছিলেন, অন্যদের সেবা করা প্রত্যেকের কর্তব্য, মানুষের জীবনের অর্থও তাই। বেশি বেশি মানুষ এমনভাবে চিন্তা করতে শুরু করলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
একেবারে শ্রমিকদের মতো করে ইদি ফাউন্ডেশনের কাজ নিজের হাতেই করতেন তিনি
সাধারণ জীবনযাপনের জন্যও তিনি পরিচিত ছিলেন। জানামতে, তার মাত্র দুইপ্রস্থ পোশাক ছিল। ফাউন্ডেশনের কার্যালয়ের পাশে একটি ছোট ও প্রায় আসবাবপত্রহীন ঘরে তিনি বসবাস করতেন।
২০১৩ সালে তার কিডনি অকেজো হয়ে যায়। বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে পাকিস্তানের সরকারি কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
বিলকিস বেগম নামের এক নারীকে ১৯৬৬ সালে বিয়ে করেন ইদি। দু’জনে মিলেই শুরু করেছিলেন তাদের সকল কাজ। যুদ্ধ সংঘাতময় অঞ্চলে অনেক সময় নিজেও গাড়ি নিয়ে ছুটে গেছেন আহত নিহতদের সংগ্রহে। আহতদের যতটা সম্ভব দ্রুত হাসপাতালে আনার জন্য অনেক সময় নিজেও গাড়ি চালিয়েছেন। তবে অধিকাংশ সময়ই তিনি গাড়ির সামনে চালকের ঠিক পাশের চেয়ারটিতে কালো পাগড়ি পরিধান করে বসে থাকতেন এবং নিজে বিভিন্ন প্রকল্প পরিদর্শন করতেন। একেবারে জীবনের শেষদিনটি পর্যন্ত তিনি একই কাজ করে গেছেন, একদিনের জন্যও অলসতাকে কাছে আসতে দেননি।
শিশুদের তিনি ভালোবাসতেন দারুণ
২০০৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান ভারত যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তৎকালীন করাচির কিছু অংশে বোমা হামলা চালানো হয়েছিল। সেসময় ইদি এবং তার স্ত্রী বিলকিস শিশু এবং নারীদের শরীরের বিভিন্ন অংশ কুড়িয়ে সংগ্রহ করেছিলেন। স্ত্রী বিলকিস নারীদের শরীর ধোয়ার কাজটি করেন এবং বাকিদের ধোয়ান ইদি নিজে। ওই ঘটনার পর ইদির বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষত বিক্ষত, ছিন্ন বিচ্ছিন্ন দেহগুলো দেখে আমার হৃদয় কঠিন হয়ে যায় সেদিন। মানবতার কাছে এবং ধর্মের কাছে সেদিন থেকেই আমি আমার জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলাম।
কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের দুঃস্থ শিশুদের সহযোগিতা করে আসছে ইদি ফাউন্ডেশন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, পাকিস্তানে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে খুব কড়াকড়ি হয়ে থাকে। এর মধ্যেও যেসব সন্তান তাদের পিতা-মাতা না থাকায় নাগরিকত্ব কার্ড তৈরি করতে পারে না, তাদের পিতা হয়ে নাগরিকত্ব পাওয়ারও বন্দোবস্ত করতেন তিনি। এই কাজের জন্য সিন্ধুর উচ্চ আদালত তাকে একবার তলবও করেছিলেন।
গোটা জীবন মানুষের জন্য করতে গিয়ে বিভিন্ন বৈরী পরিবেশে কাজ করতে হয়েছে তাকে। কখনও পচা লাশের মাঝে আবার কখনও বোমা হামলার মাঝে ক্ষতিকারক গ্যাস মুখোমুখি করে নিরপরাধ মানুষকে বাঁচাতে গিয়েছিলেন তিনি। আজও তাই শত্রু-মিত্র, ভালো-মন্দ, ইতিবাচক-নেতিবাচক সবার কাছেই আবদুস সাত্তার ইদি এক চিরস্মরণীয় ব্যক্তিত্বের নাম। যার আলোয় আলোকিত বহু মানুষ।
ইদি ফাউন্ডেশন পাকিস্তান ছাড়াও বিশ্বের অন্য দেশেও সেবামূলক কাজ করে। আবদুস সাত্তার ইদির স্ত্রী বিলকিস ইদি বিলকিস ইদি ফাউন্ডেশনের প্রধান। ১৯৮৬-তে ইদি দম্পতিকে যুগ্মভাবে রামন ম্যাগসাসে পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়েছিল।
প্রসঙ্গত, কোনওক্রমে পাকিস্তানে ঢুকে পড়া ভারতের মূক ও বধির তরুণী গীতা এই ইদি ফাউন্ডেশনের আশ্রয়েই ছিল। ২০০৩-০৪ সালে লাহোরে গীতাকে উদ্ধার করে পাকিস্তান বর্ডার গার্ডস। তারা গীতাকে ইদি অনাথ আশ্রমে নিয়ে যায়। এরপর গীতার দেখভাল করে ইদি ফাউন্ডেশন এবং বিলকিস ইদি। গত বছরে গীতাকে ভারতে ফেরানো হয়। সেই সময় ইদি ফাউন্ডেশনের সদস্যরাও ভারতে এসেছিলেন। গীতাকে এক দশকেরও বেশি সময় দেখভালের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইদি ফাউন্ডেশনকে এক কোটি রুপী দেয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সেবামূলক কাজের জন্য ওই অর্থ গ্রহণ করতে রাজি হননি আবদুস সাত্তার ইদি।
মৃত্যুর পর তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল
২০১৩ সালের ২৫ জুন আবদুস সাত্তার ইদির কিডনি অকেজো হয়ে পড়ে। ২০১৬ সালের ৮ জুলাই কিডনির নিষ্ক্রিয়তার জন্য পৃথিবীকে চিরবিদায় জানান মানবতার বন্ধু কিংবদন্তিতুল্য এ মানুষটি। করাচির ইদি পল্লীতে তাঁকে দাফন করা হয়।

এরদোগান : ফেরিওয়ালা থেকে তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধান

বর্তমান মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত এবং সমাদৃত সফল রাষ্ট্রনায়ক তুরস্কের রজব তাইয়্যেব এরদোগান। তুর্কি জনগণের কাছে তাঁদের প্রেসিডেন্ট কতটা প্রিয়, ২০১৬ সালে সেখানকার সেনাবাহিনীর ব্যর্থ অভ্যূত্থান-চেষ্টায় পুরো বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে। এরদোগানের এক আহ্বানেই শক্তিশালী সেনাবাহিনীর সেই অপচেষ্টাকে তুর্কি জনগণ জানবাজি রেখে রুখে দিয়েছিল।
আজকের এরদোগানের এই যে জনপ্রিয়তা, এই যে সফলতা, তা এম্নি এম্নি অর্জিত হয়নি। দীর্ঘ একটা সময় তিনি কঠোর পরিশ্রম এবং বহু বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে এই পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছেন।
এরদোগানের জন্ম, শৈশব এবং বেড়ে ওঠা নিতান্ত সাদা-মাটা দরিদ্র এক তুর্কি পরিবারে। সেখান থেকেই তিনি নিজেকে তিলে তিলে গড়ে আজকের বিশ্বনন্দিত এরদোগান হয়েছেন।
ইস্তাম্বুলের কাসিমপাশায় ১৯৫৪ সালের ২৬ শে ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্ম। বাবা ছিলেন একজন ফলবিক্রেতা। বাবার ফলবিক্রির সূত্রে পরিবারের সাথে এরদোগানের শৈশব কেটেছে কৃষ্ণ সাগরের পাড়ে। ১৩ বছর বয়েসে পরিবারের সাথেই আবার ফিরে আসেন ইস্তাম্বুলে। ভর্তি হন একটি মাদরাসায়। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার সঙ্গে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় রাস্তায় লেবু বাদাম ইত্যাদি ফেরি করতে থাকেন।
কিশোর বয়েস থেকেই শুরু হয় এরদোগানের জীবন-সংগ্রাম। বাবার কাজে সহায়তা, পাশাপাশি মাদরাসার পড়াশোনা–এভাবে একদিন পবিত্র কুরআন হিফজ করে ফেলেন তিনি।
ইস্তাম্বুলের একটি সংবর্ধনা-অনুষ্ঠানে এরদোগান তাঁর শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘ছেলেবেলা আমি যখন প্রতিদিন সকালে বই বগলদাবা করে মাদরাসায় যেতাম, পথে মুরব্বি কিসিমের অনেকেই উপদেশ দিতেন–বেটা, মাদরাসায় পড়াশোনা করে কী লাভ বল! পড়াশোনা শেষ করে তো তুমি মুর্দা কাফন-দাফনের কাজ ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না। আমি তাদের কথা শুনে কেবল মুচকি হাসতাম। কোনো জবাব দিতাম না। আপন মনে হেঁটে যেতাম মাদরাসায়। আমার পরিবার নিতান্ত অসচ্ছল ছিল, অভাবের কারণে কোনো কোনো সময় রুটির সঙ্গে তরকারির পরিবর্তে আমরা তরমুজ খেতাম। গরিব হলেও আমার বাবা-মা ছিলেন খুব ধার্মিক। তাঁদের স্বপ্ন ছিল আমি বড় হব। মুসলিম জাতির জন্য কিছু করব। আমিও সেই স্বপ্ন বুকে লালন করে সামনের পথে এগোতে থাকি।’
১৯৭৩ সালে এরদোগান মাদরাসা-শিক্ষা সমাপ্ত করে তুরস্কের প্রসিদ্ধ মারমারাহ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। সেখান থেকে ব্যবসায় এবং প্রশাসন শিক্ষায় মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
সত্তরের দশকেই নাজিমুদ্দিন আরবেকানের হিজবুল খালাসিল ওয়াতানি সংগঠনে যোগদানের মাধ্যমে এরদোগান রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৮০ সালের সেনা অভ্যূত্থানের পর সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। এরদোগান তখন হিজবুল খালাসি থেকে নিস্ক্রিয় হয়ে যান। পরে ১৯৮৩ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে তিনি হিজবুর রাফাহ-এ যোগদান করেন।
হিজবুর রাফাহ থেকে ১৯৯৪ সালে ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচনে মনোনয়ন পান এরদোগান। বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন সে নির্বাচনে।
মেয়র নির্বাচিত হবার পর তিনি ইস্তাম্বুল শহরকে সম্পূর্ণ নতুন করে সাজিয়ে তোলেন। দেড় কোটি মানুষের শহরটি তখন নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। জীবনমান ছিল খুব নিম্নমানের।
বিশুদ্ধ পানির সংকট, বায়ুদূষণ, যানজট–সব রকম সমস্যার যেন কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইস্তাম্বুল। এরদোগান এসে অল্প দিনের ভেতর এসব সমস্যার সমাধান করে নাগরিক সেবাকে গতিময় করে তোলেন। ফলে ইস্তাম্বুল পরিণত হয় অত্যাধুনিক এক নগরীতে।
এভাবেই জনমনে আলাদা একটা জায়গা করে নেন তিনি। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ইস্তাম্বুলের মেয়র পদে থেকে জনগণের সেবা করেন।
৯৭-তে সেনা অভ্যূত্থান হয় তুরস্কে। নতুন সেনা-শাসক দেশটিতে সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দেয়। এর প্রতিবাদে তুর্কি জনগণ খেপে ওঠে। দেশ জুড়ে শুরু হয় প্রতিবাদী মিছিল-মিটিং-সমাবেশ। এমনই এক সমাবেশে এরদোগান একদিন বক্তৃতাকালে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন–‘মসজিদ আমাদের ক্যান্টনমেন্ট, গম্বুজ আমাদের হেলমেটমিনার আমাদের বেয়নেট, মুসল্লিরা সৈনিক।’
কবিতাটি আবৃত্তির কারণে ক্ষমতাসীন স্বৈরশাসক ধর্মীয় উস্কানির অভিযোগ তুলে এরদোগানকে গ্রেপ্তার করে নেয়। ১০ মাস কারাভোগের পর তিনি মুক্তি পান কারাগার থেকে।
২০০১ সালে তুরস্কের আরেক নেতা আবদুল্লাহ গুলকে নিয়ে গঠন করেন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট পার্টি (একেপি)। ২০০২ সালে তুরস্কের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে একেপি। প্রায় ৫০০টি আসনের মধ্যে ৩৬৩টি আসনে বিজয় লাভ করে তারা ক্ষমতায় আরোহন করে। আইনি জটিলতার কারণে এরদোগান তখন প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। পরের বছর, ২০০৩ সালে, সংসদে আইন সংশোধন করে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়।
টানা ১১ বছর তিনি তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা করেন। মাঝখানে ২০০৭ এবং ১১ সালে দুই বার নির্বাচন হলেও উভয় নির্বাচনে একেপিই জয় লাভ করে। তাই প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার থেকে তাঁকে আর নড়তে হয়নি।
এরপর পার্লামেন্টারি সরকারব্যবস্থা পরিবর্তন করে এরদোগান তুরস্কে প্রেসিডেন্সিয়ালি রাষ্ট্রব্যবস্থা চালু করেন। ২০১৪ সালে ২৮ আগস্ট দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১১ বছরের সফল প্রধানমন্ত্রী জনপ্রিয় এরদোগান বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
প্রধানমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট–দুই পদ মিলিয়ে এরদোগান তুরস্কের শাসন ক্ষমতায় আরোহনের ১৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই ১৫ বছরে তলাবিহীন তুরস্ককে উন্নতির অনন্য এক শিখরে নিয়ে গেছেন তিনি। তাঁর ক্ষমতায় আরোহনের পূর্বে টার্কিশ মুদ্রার তেমন একটা মূল্য ছিল না বিশ্ববাজারে। ব্রিটিশ মুদ্রা ১ পাউন্ড দিয়ে একশ’রও বেশি টার্কিশ লিরা পাওয়া যেত। এরদোগান ক্ষমতায় এসে টার্কিশ মুদ্রার মান বাড়ানোতে মনোযোগ দেন। যার ফলে বর্তমান বিশ্ববাজারে ৪ লিরা টার্কিশ মুদ্রার দাম ১ পাউন্ড। রাষ্ট্রপ্রদান হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা। তাঁর শাসনামলের শুরু থেকেই দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ভেতরে আছে এবং দিনকে দিন মানুষের গড় আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এরদোগানের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হচ্ছে তিনি জনগণের সাথে মিশতে পারেন, তাঁদের হৃদয়ের আকুতি সহজেই বুঝতে পারেন। তুরস্কের জনগণ এজন্যই বারবার তাঁকে ক্ষমতায় বসায়।

#ইসমাইল_হোসেন_সিরাজী : বাংলার রাজনীতি ও সাহিত্যের উত্তম পুরুষ

একাধারে কবি, লেখক, বাগ্মী ও তুখোড় রাজনীতিবিদ ছিলেন সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী। ছিলেন বাংলার মুসলিম রাজনীতি ও সাহিত্যের উত্তম পুরুষ। উপমহাদেশের খ্যাতিমান দুই মুসলিম মনীষী আল্লামা শিবলি নোমানি (১৮৫৭-১৯১৪) ও আল্লামা ইকবালের (১৮৭৬-১৯৩৮) ভাবশিষ্য ছিলেন। এই দুই চিন্তানায়কের ভাবাদর্শে উজ্জীবিত হয়ে মুসলিম বাংলার ঝিমিয়ে পড়া চেতনার পুনরুজ্জীবনে অসামান্য অবদান রেখেছেন তিনি।
১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ জুলাই সৈয়দ ইসমাইল হোসেনের জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলায়। সিরাজগঞ্জ নিজের জন্মস্থান হবার কারণে নামের শেষে ‘সিরাজী’ ব্যবহান করতেন।
আর্থিক সংকট এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে তৎকালীন মুসলিম সমাজের পিছিয়ে থাকার কারণে সৈয়দ সিরাজীর পড়াশোনা স্কুলের গণ্ডি টপকাতে পারেনি। কিন্তু ব্যক্তিগত অধ্যবসায় আর নিবিড় পাঠের কারণে কৈশোরকালেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন দারুণ চিন্তার অধিকারী। ব্রিটিশদের শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট বাংলার পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজের দুর্দশা তাঁকে তখন থেকেই ভাবিয়ে তোলে।
কৈশোর পেরিয়ে যখন তারুণ্যে নামেন, পরিচয় ঘটে বাংলার আরেক সংগ্রামী সাধক মুন্সী মুহাম্মদ মেহেরুল্লাহর সঙ্গে। মুন্সী মেহেরুল্লাহর সাহচর্যে একই সঙ্গে তাঁর লিখনী ও বাগ্মিতার প্রতিভা বিকশিত হয়। মেহেরুল্লাহ ছিলেন তার্কিক এবং বাগ্মী, কবিও। তাঁর সঙ্গে ইসমাইল হোসেন সিরাজী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জাগরণী বক্তৃতায় অংশগ্রহণ করতেন। মুন্সী মেহেরুল্লাহর সহযোগিতায় ১৮৯৯ সালে, সিরাজীর বয়স যখন সবে ১৯ বছর, তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অনল প্রবাহ প্রকাশিত হয়। অনল প্রবাহ ছিল জাগরণী কবিতা-সমৃদ্ধ। প্রথম প্রকাশের সময় বইটি ব্রিটিশদের চোখে না পড়লেও ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে যখন এর দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়, ব্রিটিশদের নজরে আসে কাব্যগ্রন্থখানি। সিরাজীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়। অনল প্রবাহ করা হয় বাজেয়াপ্ত।
মামলার সূত্র ধরে ১৯১০ সালে তরুণ সিরাজীকে সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে জেলে পাঠায় ব্রিটিশ আদালত। আর এর মধ্য দিয়ে তিনি উপমহাদেশে জাগরণের কবিতা লিখে কারাভোগকারী প্রথম কবি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান।
দু’বছর কারাভোগের পর সিরাজী যখন মুক্তিলাভ করেন, তুরস্কে উসমানি খেলাফতের তখন টালমাটাল অবস্থা। মুসলমানদের সর্বশেষ সাম্রাজ্য চতুর্মুখী আক্রমণে পর্যুদস্ত হবার জোগাড়। সাম্রাজ্য জুড়ে চলছে যুদ্ধ আর সংঘাত। মুসলিম মিল্লাতের কল্যাণপ্রত্যাশী সিরাজী সিদ্ধান্ত নেন তিনি তুরস্ক যাবেন। খেলাফত রক্ষার জন্য লড়াই করবেন।
১৯১২ সালে জেল থেকে বেরোনোর পরপরই তিনি পাড়ি জমান তুরস্কের উদ্দেশ্যে। বছর খানেক সেখানে অবস্থান করে খেলাফতের পক্ষে লড়াই করেন অসীম বীরত্ব আর সাহসিকতার সাথে। উসমানি খেলাফতের পক্ষ থেকে লাভ করেন ‘গাজি’ উপাধি। কিন্তু সিরাজী লক্ষ করলেন আভ্যন্তরীণ কোন্দল, অপরাজনীতি আর স্বার্থবাদিতার কারণে খেলাফতের যে অধঃপতন শুরু হয়েছে, তা টেকানোর আপাত কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই তুরস্কের লড়াই বাদ দিয়ে স্বদেশের মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করাটাকেই তিনি উত্তম মনে করলেন। ফিরে এলেন মাতৃভূমিতে।
আবার শুরু হলো ব্রিটিশ বেনিয়া আর তাদের আজ্ঞাবহ দেশীয় জমিদার শ্রেণির বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। স্থানীয় জমিদারদের বিরুদ্ধে একদিকে যেমন তিনি কৃষকদেরকে সংগঠিত করছিলেন, অপরদিকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এবং মুসলিম বাংলার জাগরণের জন্য লিখে যাচ্ছিলেন অনবদ্য কবিতা আর জাগরণী রচনা। পাশাপাশি বিভিন্ন সভা-সেমিনারে রাখছিলেন বাগ্মিতাসূলভ বক্তব্য।
সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর এসব কর্মতৎপরতায় ব্রিটিশ সরকার এতটা ভীত হয়েছিল যে, তাঁর সভা-সেমিনারে ৮২ বার জারি করেছিল ১৪৪ ধারা। ১৯৩০ সালে রাষ্ট্রীয় আইন অমান্যের অভিযোগে আবারও গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে। তিন মাস কারান্তরীণ থেকে মুক্তিলাভ করেন।
বাংলার মুসলমানদের জাগরণের জন্য জীবনভর কাজ করে গেছেন সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী। সমসাময়িক পত্রিকা আল-এসলাম, ইসলাম প্রচারক, প্রবাসী, প্রচারক, কোহিনূর, সোলতান, মোহাম্মদী, সওগাত, নবযুগ, নবনূর প্রভৃতিতে সিরাজীর লেখা প্রকাশিত হতো। তাঁর অধিকাংশ লেখায় ইসলামি ঐতিহ্য সংস্কৃতি ও উত্তরাধিকারকে উদ্দীপ্ত করে তোলার প্রয়াস ছিল।
লেখালেখির পাশাপাশি সরাসরি রাজনীতিতেও অবিচ্ছিন্ন সম্পৃক্তি ছিল সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, আঞ্জুমান-ই-উলামা-ই-বাঙ্গালা, জামিয়াত-ই-উলামা-ই-হিন্দ, স্বরাজ পার্টি ও কৃষক সমিতির সঙ্গে নানা সময়ে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তিনি।
মুসলিম বাংলার জাগরণ ও মুক্তির মুয়াজ্জিন এ মহান মনীষী কবি ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

কায়কোবাদ : আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি ছিলেন কায়কোবাদ। অজপাড়া গ্রামে পোস্টমাস্টারির চাকরি করেছেন জীবনভর, আর লিখেছেন কবিতা। এই কাব্যচর্চাই তাঁকে এনে দিয়েছে মহাকবির খ্যাতি। আজ ২১ জুলাই তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী, ১৯৫১ সালের এ দিনে প্রায় ৯৪ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
কালের লিপিতে ‘মহাকবি কায়কোবাদ’ নামে তিনি উৎকীর্ণ হয়ে থাকলেও তাঁর পিতৃপ্রদত্ত নাম কাজেম আল-কোরায়েশি। ১৮৫৭ সালে, ঐতিহাসিক সিপাহি বিপ্লবের বছর বর্তমান ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জের আগলা-পূর্বপাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা শাহামতুল্লাহ আল-কোরায়েশি ছিলেন ব্যারিস্টার, ঢাকা জেলা জজকোর্টে আইন ব্যবসা করতেন। সেই সুবাদে কায়কোবাদের পড়াশোনা ঢাকাতেই হয়েছিল।
সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে পড়াশোনা কালে পিতার মৃত্যু হয়, কায়কোবাদ স্কুলের বদলে তখন ভর্তি হন মাদরাসায়, ঢাকা মাদরাসা, যেটা বর্তমানে নজরুল কলেজে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু মাদরাসায় প্রবেশিকা পর্যন্ত পড়াশোনার পর পরীক্ষার আগ মুহূর্তে পোস্ট মাস্টারির চাকরি পেয়ে যান তিনি, পিতৃহীন পরিবারের ঘানি টানতে প্রবেশিকা পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি কায়কোবাদের। পোস্টমাস্টারির চাকরি নিয়ে ফিরে যান আপন গ্রামে। এবং অবসরগ্রহণ অবধি গ্রামেই থাকেন পোস্টমাস্টারির চাকরি নিয়ে। আর করেন কাব্যসাধনা।
অতি অল্পবয়সে কায়কোবাদের সাহিত্য-প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। মাত্র তেরো বছর বয়সে তাঁর প্রথম কাব্য বিরহবিলাপ (১৮৭০) প্রকাশিত হয়। তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে কুসুম কানন (১৮৭৩), অশ্রুমালা (১৮৯৫), মহাশ্মশান (১৯০৪), অমিয়ধারা (১৯২৩), মহরম শরীফ (১৯৩২), প্রেমের বাণী (১৯৭০), প্রেম-পারিজাত (১৯৭০), গওছ পাকের প্রেমের কুঞ্জ (১৯৭৯) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি বাংলা একাডেমী কায়কোবাদ রচনাবলী (৪ খন্ড, ১৯৯৪-৯৭) প্রকাশ করেছে।
কায়কোবাদের মহাশ্মশান একটি বিখ্যাত মহাকাব্য। তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ অবলম্বনে রচিত এ কাব্যে জয়-পরাজয় অপেক্ষা ধ্বংসের ভয়াবহতা প্রকট হওয়ায় এর নাম হয়েছে ‘মহাশ্মশান’। এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা এবং এর দ্বারাই মহাকবিরূপে খ্যাতি অর্জন করেন। কাব্যটি তিন খন্ডে বিভক্ত। প্রথম খন্ডে ঊনত্রিশ সর্গ, দ্বিতীয় খন্ডে চব্বিশ সর্গ, এবং তৃতীয় খন্ডে সাত সর্গ। মোট ষাট সর্গে প্রায় নয়শ’ পৃষ্ঠার এই মহাকাব্য বঙ্গাব্দ ১৩৩১ মুতাবেক খ্রিষ্টাব্দ ১৯০৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়; যদিও গ্রন্থাকারে প্রকাশ হতে আরও ক’বছর দেরি হয়েছিল। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধযজ্ঞকে রূপায়িত করতে গিয়ে কবি বিশাল কাহিনি, ভয়াবহ সংঘর্ষ, গগনস্পর্শী দম্ভ, এবং মর্মভেদী বেদনাকে নানাভাবে চিত্রিত করেছেন এ মহাকাব্যে।
কায়কোবাদের গীতিকবিতায় প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ পেয়েছে।
তাঁর কাব্যসাধনার মূল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চাৎপদ মুসলমান সম্প্রদায়কে তার অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করা এবং তা পুনরুদ্ধারে উদ্বুদ্ধ করা। তিনি ছিলেন সাম্প্রদায়িক সমন্বয়ে বিশ্বাসী, যার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর বিভিন্ন রচনায়। তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন।
বাংলা মহাকাব্যের অস্তোন্মুখ এবং গীতিকবিতার স্বর্ণযুগে মহাকবি কায়কোবাদ মুসলিমদের গৌরবময় ইতিহাস থেকে কাহিনি নিয়ে ‘মহাশ্মশান’ মহাকাব্য রচনা করে যে দুঃসাহসিকতা দেখিয়েছেন তা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের গৌরবময় আসনে স্থান করে দিয়েছে।
সেই গৌরবের প্রকাশে ১৯৩২ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের মূল অধিবেশনে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা কাব্যসাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য নিখিল ভারত সাহিত্য সংঘ তাঁকে ‘কাব্যভূষণ’, ‘বিদ্যাভূষণ ও ‘সাহিত্যরত্ন’ (১৯২৫) উপাধিতে ভূষিত করে।

খাইরুদ্দিন পাশা : উছমানি খেলাফতের মহান সংস্কারক

#খাইরুদ্দিন_পাশা : উছমানি খেলাফতের মহান সংস্কারক
উছমানি খেলাফতের পতনোন্মুখ সময়ে সাম্রাজ্যের কাঠামো, নীতি এবং জনগণের জীবনমানের সংস্কারে যে কজন মহান ব্যক্তিত্ব আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন, তাঁদের অন্যতম খাইরুদ্দিন পাশা আত-তিউনিসি। একদিকে যেমন ছিলেন আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের একান্ত অনুরাগী, অন্যদিকে ছিলেন ইসলামি আইন শাস্ত্র ও ইলমে শরিয়াহ’র ওপর অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপ যখন জীবনমানের উন্নয়ন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনে সফলতার স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করছিল, উছমানি সাম্রাজ্য তখন আভ্যন্তরীণ সংঘাত, স্বার্থবাদিতা আর নানা রকম দুর্নীতিতে জর্জরিত। খাইরুদ্দিন পাশা এই সময়টায় খেলাফতের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে থেকে শাসনব্যবস্থা থেকে নিয়ে জনগণের জীবনমানের উৎকর্ষ সাধন ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি সাম্রাজ্যের প্রজাসাধারণকে উদ্বুদ্ধকরণে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। নিজের সাধ্যানুযায়ী বৈষয়িক নানা কাজে এনেছেন সংস্কার।
ভাগ্য বিড়ম্বনা : যোদ্ধার সন্তান থেকে ক্রিতদাস
ককেশাস পর্বতমালার একটি গ্রামে ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম খাইরুদ্দিন পাশা আত-তিউনিসির। অতি অল্পবয়সে মর্মান্তিকভাবে পিতাকে হারান। রাশিয়ার বিরুদ্ধে উসমানিদের একটি যুদ্ধে পিতা নিহত হন। পিতার মৃত্যুর পর ঘটনাচক্রে শিশু খাইরুদ্দিনকে অপহরণ করা হয় এবং ইস্তাম্বুলের ক্রীতদাস বেচাকেনার বাজারে গোলাম হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
তাহসেন বেগ আল কাবরিসি নামক এক ব্যক্তি তাঁকে কিনে নিয়ে যান। তাহসেন বেগ শিশু খাইরুদ্দিনের মেধা ও বুদ্ধিমত্তা দেখে সন্তানের মতো তাঁকে লালন-পালন করেন। ইস্তাম্বুলের অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরবি, তুর্কি ও ফ্রেঞ্চ ভাষার ওপর পড়াশোনা করেন খাইরুদ্দিন।
ক্রিতদাস থেকে রাজপ্রাসাদে
তারপর ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি যখন ১৭ বছরের টগবগে তরুণ, তাহসেন বেগ তাঁকে উছমানি খেলাফতের অধীন তিউনিসিয়া অঞ্চলের শাসনকর্তার প্রাসাদে প্রেরণ করেন। তিউনিসিয়া শাসনকর্তা তখন আহমদ পাশা। তিনিও খাইরুদ্দিনের মেধা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দেখে নিজের ছেলের মতো তাঁকে গ্রহণ করেন এবং নিজের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর পড়াশোনার সুযোগ করে দেন।
তিউনিসিয়ার তৎকালীন উচ্চতর শিক্ষাগার মা’হাদুয যাইতুনায় ভর্তি হন খাইরুদ্দিন এবং ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্বের ওপর অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্যারিস গমন করেন এবং সেখানে তিনবছর অবস্থান করে প্রশাসনিক জ্ঞান ও আধুনিক আইন শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন।
প্যারিসে থাকাকালে ইউরোপের জীবনমানের উৎকর্ষতা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে তাদের ক্রমশ উন্নতির কৌশল পর্যবেক্ষণ করেন। তিন বছর পর তিউনিসিয়ায় ফিরে এসে বহুল সমস্যায় জর্জরিত উছমানি সাম্রাজ্যকে কীভাবে আধুনিক পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাইয়ে এগিয়ে নেওয়া যায়, সেই চিন্তা থেকে নিজের সাধ্যমাফিক বেশ কিছু সংস্কার কাজে হাত দেন খাইরুদ্দিন।
প্রশাসনে : রাষ্ট্রক্ষমতায়
১৮৫৭ সালে তিনি তিউনিসিয়ার যুদ্ধমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলে তিউনিসিয়ার নৌবন্দরের আধুনিকায়ন করেন। ঢেলে সাজান সামরিক বাহিনীকেও।
কয়েক বছর পর তাঁকে তিউনিসিয়ার কৃষি ও শিক্ষা বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ সময় তিনি তিউনিসিয়ার কৃষিখাতকে আধুনিকরূপে দাঁড় করান। জনগণকে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করেন খেজুর ও জলপাই চাষে। শিক্ষাখাতেও আনেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ইসলামি শিক্ষাদীক্ষার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সমান গুরুত্বের সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্লাস চালু করেন।
প্রশাসনিক কাঠামোকেও ঢেলে সাজাবার চেষ্টা চালান এ সময়ে। কিন্তু খেলাফতের স্তরে স্তরে দুর্নীতি আর স্বার্থবাদিতা এতটাই প্রকট হয়ে ছিল যে, খাইরুদ্দিন পাশার পক্ষে এখানে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভবপর ছিল না।
এই রাগ থেকে ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে প্রশাসনিক সব রকমের দায়িত্ব থেকে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন। কয়েক বছর রাজনীতি ও দর্শন নিয়ে একাগ্রচিত্তে পড়াশোনা করেন। ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে তিউনিসিয়ার বায়তুল মালের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। তার দুবছর পর দেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব। এইসব দায়িত্বে থাকাকালে তিউনিসিয়ার অর্থনৈতিক কাঠামোকে আধুনিকরূপে দাঁড় করাবার চেষ্টা করেন তিনি। কৃষিখাতের অসম্পূর্ণ কাজও সম্পূর্ণ করেন। পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদেন উৎকর্ষ সাধনে প্রতিষ্ঠা করেন উচ্চতর বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাদরাসা আস সাদিকিয়্যাহ। এটা পরিচালিত হতো তাঁর সরাসরি তত্ত্বাবধানে। যেখানে ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমান পারদর্শিতা অর্জন করত শিক্ষার্থীরা।
মাদরাসাপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জ্ঞানপিপাসুদের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য তৈরি করেছিলেন বিশালায়তেনের লাইব্রেরি। মাকতাবায়ে আবদালিয়া নামের এ লাইব্রেরিতে ইসলাম ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান বিষয়ক বইয়ের দুর্লভ ও বিপুল সংগ্রহ ছিল।
খেলাফতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দায়িত্বে
১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে খেলাফতের পক্ষ থেকে তুরস্কে ডেকে নেওয়া হয় এবং খেলাফতের প্রধান নির্বাহী বা সদরে আজম হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়৷ উছমানি খেলাফতের মসনদে তখন ছিলেন সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ। ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সদরে আজম পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
একই বছর খাইরুদ্দিন পাশা খেলাফতের উচ্চতর বিশেষ কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং মৃত্যু অবধি এ দায়িত্বে বহাল থাকেন।
খাইরুদ্দিন পাশা উসমানি খেলাফতের কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদই ছিলেন না, ছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী একজন অনন্য ব্যক্তিত্বও৷ উলুমে শরিয়াহর ওপর তাঁর যেমন দখল ছিল, তেমনি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কেও ছিলেন পুরোপুরি ওয়াকিবহাল।
উছমানি খেলাফতের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেও তিনি প্রশাসনিক সংস্কার ও জনগণের অধিকারের পক্ষে কাজ করে গেছেন অকপটে। তবে খেলাফত ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতেও তিনি সচেষ্ট ছিলেন।
অবদান
তাঁর সংস্কারবাদিতার মূল লক্ষ্য ছিল, শরিয়াহর গণ্ডির ভেতরে থেকে সাম্রাজ্যের প্রজাসাধারণকে আধুনিকরূপে গড়ে তোলা এবং শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়াহর পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে শিক্ষার্থীদেরকে সমানভাবে পারদর্শী করে তোলা। তাছাড়া তুর্কি জনগণ এবং অতুর্কি জনগণের মধ্যে একটা বৈষম্য গড়ে উঠেছিল উছমানি সাম্রাজ্যে, খাইরুদ্দিন চাইতেন তুর্কি-অতুর্কির মধ্যকার এ বৈষম্য দূর করে সবাইকে ইসলামের মাপকাঠিতে মূল্যায়ন করতে।
আধুনিক সভ্যতার পর্যালোচনা বিষয়ে তিনি ‘আকওয়ামুল মাসালিক ফী মারিফাতি আহওয়ালিল মামালিক’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ বই লেখেন। এর পাশাপাশি ‘ইলা আওলাদি : মুজাক্কারাতু হায়াতিল খাসসাহ ওয়াস সিয়াসিয়াহ’ নামে আত্মজীবনীও লেখেন।
ইন্তেকাল
১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে উছমানি খেলাফতের রাজধানী ইস্তাম্বুলে মহান এ সংস্কারক ইন্তেকাল করেন। ইস্তাম্বুলের জামে আইয়ুব মসজিদের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। কিন্তু ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মরদেহকে তিউনিসিয়ায় স্থানান্তর করা হয় এবং সেখানকার বিখ্যাত কবরস্তান মাকবারাতুল জালাযে পুনরায় দাফন করা হয়।
আল-জাজিরা অবলম্বনে

সাইয়েদ কুতুব : মহান শহীদ চিন্তাবিদ


মিশরের আসয়ুত অঞ্চলের মুশা নামক গ্রামে ৯ অক্টোবর ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে মহান শহীদ চিন্তাবিদ সাইয়েদ কুতুবের জন্ম। গ্রামেই কেটেছে তাঁর বাল্যকাল। কুরআনও হিফজ করেছেন এখানে। ১৯১৯ সালের ব্রিটিশবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের ঠিক একবছর পর তিনি কায়রো আসেন। তখন তাঁর বয়স ছিল চৌদ্দ বছর।
কায়রোতে এসে তিনি শিক্ষক সমিতি পরিচালিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। এখানে পড়াশোনা শেষে ১৯২৮ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন কায়রোর দারুল উলুম ইউনিভার্সিটিতে। চারবছর পড়াশোনার পর দারুল উলুম থেকে তিনি সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষ হবার এক বছর পর মিশরের শিক্ষামন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্তি পান।
বলে রাখছি, সাইয়েদ কুতুব যে বছর জন্মগ্রহণ করেন মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা শাইখ হাসানুল বান্নার জন্মও সে বছরে। এই দুই মনীষীর উভয়ই একই ভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন। তবে সাইয়েদ কুতুব কোনো কারণে শায়েখ হাসানুল বান্নাহ থেকে একবছর পিছিয়ে ছিলেন। তাই বলে সাইয়েদ কুতুব ভার্সিটি থাকাকালীন সময়েই যে শায়েখ হাসানুল বান্নার সাথে পরিচিত হয়েছেন এবং তাঁর চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়েছেন, এমন কিন্তু না। তাঁরা উভয়ে ছিলেন নিজ নিজ জগত নিয়ে। অর্থাৎ তাঁদের চিন্তাচেতনা ছিল একদম আলাদা। সাইয়েদ কুতুব ছিলেন সাহিত্যিক আব্বাস মাহমুদ আক্কাদের লেখায় অত্যন্ত প্রভাবিত। সাথে বেশ কিছুদিন জড়িত ছিলেন সাআদ জগলুলের হাতে প্রতিষ্ঠিত লিবারেল রাজনৈতিক দল হিজবুল ওয়াফদ-এর সঙ্গে।
অল্প বয়সেই সাইয়্যেদ কুতুবের লেখালেখির প্রতিভা বিকশিত হয়েছিল। তাঁর প্রশংসা করে মিশরের সাবেক রেডিও-প্রধান ফারুক শুশাহ বলেন, ‘সাইয়েদ কুতুব ছিলেন একজন রোমান্টিক কবি। সাহিত্যিক আব্বাস মাহমুদ আক্কাদের হাতেগড়া প্রথম ছাত্র তিনি। নোবেলজয়ী মিশরী লেখক নাজিব মাহফুজের লেখার উপর বিশ্বে সর্বপ্রথম সমালোচনাপত্র প্রকাশ করেছেন যুবক সাইয়েদ কুতুব। এর অর্থ কী? তিনি ছিলেন প্রতিভাবান অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন একজন সমালোচক।’ ফারুক শুশার এই কথার মাধ্যমে বুঝে আসে, মুসলিম ব্রাদারহুডের থেকে তাঁর চিন্তাচেতনার বেশ দূরত্ব ছিল। তখন অবধি তাঁর সব রচনাই ছিল শিল্পসাহিত্য নিয়ে। তাঁর দেশপ্রেম ও ভালোবাসার ব্যাপারে কারও কোনো বিরোধমত ছিল না।
১৯৩৯ শালে তিনি التصوير الفني في القرآن শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন সাইয়্যেদ কুতুব। এটাকে ধরা যায় তাঁর সর্বপ্রথম ইসলামী সাহিত্যকর্ম। তবে এই প্রবন্ধ এবং একই শিরোনামে প্রকাশিত তাঁর পরবর্তী বইয়ের মাঝে বেশ তফাৎ রয়েছে। প্রবন্ধ এবং বই–দুটো আলাদা আলাদা কাজ।
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের বিশেষ এক মিশনের সদস্য হয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। মিশনের উদ্দেশ্য ছিল, সেখানকার উন্নত শিক্ষার হালচাল জানা। যাতে করে আমেরিকান শিক্ষাপদ্ধতি মিশরেও চালু করা যায়। সাইয়েদ কুতুব সেখানে চার বছর কাটান। আমেরিকা অবস্থানকালেই তিনি ব্রাদারহুডের চিন্তাধারার সঙ্গে প্রথমবারের মতো ঘনিষ্ঠ হন এবং এর দ্বারা প্রভাবিত হন।
১২/২/১৯৪৯ সালে শায়েখ হাসানুল বান্নাকে শহীদ করা হয়। তাঁর শাহাদাতের খবর সবখানে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে তাঁর শাহাদাতের খবরকে বিশাল জয় হিসেবে উদযাপন করা হয়। এ ঘটনায় সাইয়েদ কুতুব যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বসে অপমানবোধ করেন। তবে প্রথমদিকে তাঁর এই অনুভূতি ধর্মীয় আবেগ থেকে ছিল না, ছিল নিরেট দেশাত্মবোধ ও আরববাদী চেতনা থেকে।
তখন থেকে তিনি ভাবতে লাগেন, কে এই হাসানুল বান্না, কী তাঁর ইতিহাস? মুসলিম ব্রাদারহুডের ইতিহাস ও তাদের নিয়ে গবেষণা শুরু করেন সাইয়্যেদ কুতুব। যুক্তরাষ্ট্রে বসেই লিখে ফেলেন ‘العدالة الاجتماعية في الإسلام’ নামের বইটি। ধরা যায় নিরেট ইসলামকে গবেষণা করে লেখা এটাই তাঁর প্রথম বই। এই বইয়েই তাঁর ইসলামী ব্যক্তিত্বের প্রথম প্রকাশ ঘটে। তাঁর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য একদম স্পষ্ট হয়ে যায়। বইয়ের শব্দে শব্দে পাঠককে তিনি তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবে এই বইয়ের সব চিন্তা গ্রহণযোগ্য, এটাও বলা যায় না।
যাইহোক, ২৩/৮/১৯৫২ সালে তিনি আমেরিকা থেকে দেশে ফেরেন। সময়টা ছিল সেনা অভ্যুত্থানের ঠিক একমাস পর। এর দুমাস পরেই শিক্ষামন্ত্রণালয় থেকে আনুষাঙ্গিক কারণে তিনি অব্যাহতি নেন।
পাঠকের জানা থাকা দরকার যে, সাইয়েদ কুতুব ছিলেন সেনাবাহিনীর একদম ঘনিষ্ঠ লোক। বিশেষ করে অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী সেনা অফিসারদের। তিনি তাদের এতটাই কাছের ছিলেন যে, অভ্যূত্থান-পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুন নাসের তাঁকে বিপ্লবী নেতৃত্বের উপদেষ্টা নির্বাচন করেন। শুধু তাই না, তাঁর লিখিত العدالة الاجتماعية في الإسلام নামক বইটি বিপ্লবী সেনা অফিসারদের মাঝে নিজ দায়িত্বে প্রচার করেছিলেন তিনি।
জামাল আব্দুন নাসের جبهة التحرير নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে তিনি রাষ্ট্রের বিশেষ ব্যক্তিবর্গ ও নেতৃবৃন্দকে সমবেত করার চেষ্টা করেছেন। যাদের দিয়ে তিনি পরবর্তীতে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিরোধ করবেন। কারণ, জামাল আব্দুন নাসেরের সামনে ব্রাদারহুড ছিল বিশাল পাহাড় স্বরূপ। সবচেয়ে বড় বিপদ ছিলো, মুসলিম ব্রাদারহুডের অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি। এসব বিষয়ের প্রতি খেয়াল করেই তাঁর এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠা। جبهة التحرير-এর পক্ষ থেকে সাহিত্যিক ও গবেষক সাইয়েদ কুতুবকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য ১৯৫৩ সালে একটি কনফারেন্স ডাকা হয়। উক্ত কনফারেন্সে সাইয়েদ কুতুব তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট বলেছেন যে, তিনি তাঁর যাত্রাপথে সকল বাধা সইতে রাজি আছেন। সাইয়্যেদ কুতুবের এ কথার প্রেক্ষিতে তখন আব্দুন নাসের প্রতিজ্ঞা করে বলেন, যেকোনো মূল্যে হোক তিনি সাইয়েদ কুতুবকে রক্ষা করবেন। শেষে সেই আব্দুন নাসেরই তাঁকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছিলেন।
উক্ত কনফারেন্সে সাইয়েদ কুতুব ঠিক ধরে ফেলেন জাবহাতুুত তাহরীরের লক্ষ্য কী? জামাল আব্দুন নাসের কী করতে যাচ্ছেন তাও তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। সাইয়েদ কুতুব তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। দেরি না করে মুসলিম ব্রাদারহুডের পৃষ্ঠপোষক হাসান হুদাইবী’র কাছে চলে যান। মতামতের পরই হাসান হুদাইবী তাঁকে প্রধান আহ্বায়ক নির্বাচন করেন। এসবের কোনো কিছুই আব্দুন নাসের জানেন না। সেনাপ্রধানদের অগোচরেই সব হয়েছে।
মাসকয়েক বাদে আব্দুন নাসের তাঁর অফিসে جماعة الإخوان المسلمين নামে একটি সংবাদপত্রের লাইসেন্সের আবেদনপত্র পান। পত্রিকাটির সম্পাদক সাহিত্যিক ও গবেষক সাইয়েদ কুতুব। আব্দুন নাসের আকাশ থেকে পড়লেন যেন। কীভাবে সম্ভব! সাথে সাথে লোক পাঠালেন সাইয়েদ কুতুবের তলবে। তারা হৈচৈ করে প্রশ্ন করল, আপনি কি আসলেই মুসলিম ব্রাদারহুড করেন? তিনি সরাসরি হ্যাঁ বলে দিলেন। এসময় আব্দুন নাসের বিরাট ধাক্কা খেলেন। তাদের সম্পর্ক দুদিকে ছিটকে পড়ল।
যাইহোক, ১৯৫৪-এর ২৬ অক্টোবর আলেকজান্দ্রিয়ার মানশিয়া নামক এলাকায় বক্তব্য প্রদানকালে জামাল আব্দুন নাসেরের উপর আক্রমণের চেষ্টা করা হয়। এই ব্যর্থ আক্রমণের দায়ভার চাপানো হয় ব্রাদারহুডের উপর। একই সাথে রাষ্ট্রীয় আদেশ মতে ব্রাদারহুডের جماعة الإخوان المسلمين নামক পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ব্রাদারহুডের নেতাদের আটক শুরু হয়। আটকের কাতারে সাইয়েদ কুতুবও ছিলেন। আদালত তাঁকে ১৫ বছর কারাদণ্ডের হুকুম দেয়।
দশবছর চলে যায় বন্দীখানায়। তারপর ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুস সালাম আরেফ-এর মধ্যস্থতায় ব্রাদারহুডের অনেক নেতাকে আদালত মুক্তি দান করে। মুক্তিপ্রাপ্তদের মাঝে সাইয়েদ কুতুবও ছিলেন। জেল থেকে মুক্তি পেলেও চিকিৎসার অভাবে তাঁর শরীর একদম ভেঙে পড়েছিল।
শরীরের এই দুরবস্থা সত্ত্বেও তিনি চুপসে থাকেননি। معالم في الطريق নামের আলোড়ন-জাগানো বইটি লেখেন তখন। বইটির শক্ত ভাষা সেনাবাহিনীর উপর পরামাণু হয়ে অবতীর্ণ হলো। কেনই-বা হবে না, ক্ষুব্ধ সাহিত্যক ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন একজন বন্দী দশবছর স্বচক্ষে বন্দীশালার পাশবিকতা দেখেছেন। কে পারবে শব্দ গেঁথে অনুভূতির সুন্দর-অসুন্দরকে তাঁর মতো তুলে ধরতে?
যাইহোক, সাইয়েদ কুতুব মাত্র একবছর ছিলেন জেলের বাইরে। أعضاء التنظيم السر অর্থাৎ গোপন সংস্থার সদস্য বলে আবার ধর-পাকড় শুরু হয়। এখনকার জঙ্গি অপবাদের মতো অনেকটা। প্রায় বিশ হাজারের মতো আটক করা হয়। পঁচাত্তর জনকে সরকার উৎখাতের অপবাদে ফাঁসানো হয়। যাদের বেশির ভাগই ছিলেন ভার্সিটির প্রফেসর, ইঞ্জিনিয়ার ও ডাক্তার। তাদের মাঝে ছিলেন সাহিত্যিক ও গবেষক সাইয়েদ কুতুবও।
আদালতে সরকারের ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তা সাইয়েদ কুতুবকে বলেন, আপনি তো ব্রাদারহুডের সাথে নতুন যুক্ত হয়েছেন, বিচারপতির সামনে দুটি তুষ্টকথা উচ্চারণ করুন, আপনাকে মুক্তি দিয়ে দিবেন তিনি।
তাঁর কথার উত্তরে সাইয়েদ কুতুব বলেন, আকিদার ক্ষেত্রে গোপনকরণ শোভা পায় না। আর একজন নেতার জন্য তুচ্ছতা গ্রহণও অসম্মানজনক।
শেষমেশ ফাঁসির রায় শোনানো হয়। মূলত আব্দুন নাসের চেয়েছিলেন সাইয়েদ কুতুবকে আগে অপদস্ত করবেন, পরে মুক্তি দেবেন অথবা তাঁর ফাঁসির আদেশ রহিত করে সাজা কমিয়ে আনবেন। কিন্তু কে চায় কার রহমত? সাইয়েদ কুতুব হলেন আত্মমর্যাদার উপর সুদৃঢ় একজন ব্যক্তি। শুরু থেকেই সবাই এ ব্যাপারে জ্ঞাত।
আহমাদ ফাররাগ নামের এক অফিসার এক সাক্ষাতে তাঁকে বলেন, যেন তিনি ছোট করে একটি ওজরনামার মতো কিছু লিখে দেন, অফিসার নিজ দায়িত্বে তাঁর মুক্তির ব্যবস্থা করবেন। অফিসারের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সাইয়্যেদ কুতুব তখন বলেছিলেন, যেই শাহাদাত আঙুল আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকার করে আসমানের দিকে উত্থিত হয়, স্বেচ্ছাচারীর সমর্থনে ওজরনামা লিখতে সে আঙুল কোনোভাবেই ব্যবহৃত হবে না।
সাইয়েদ কুতুবকে ফাঁসির কাষ্ঠে ওঠানোর আগে ওখানে ফুয়াদ আল্লাম নামে এক অফিসার ছিলেন। ফুয়াদ আল্লামও একই প্রস্তাব রেখেছিলেন সাইয়েদ কুতুবের কাছে। বলেছিলেন, জনাব, আসলেই আপনাকে মুক্তি দানের অভিপ্রায় ছিল, আপনি মুখে একটু ক্ষমাপ্রার্থনা করবেন মাত্র। তখনও কুতুবের প্রত্যাখানমূলক সুদৃঢ় জবাব ছিল। বলেছিলেন, আল্লাহর রাস্তায় কাজ করে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলছি, এ তো সৌভাগ্য, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে কেন আমার এ সৌভাগ্যকে আমি বিনষ্ট করব?
অফিসার আবার বলেন, জনাব, শুধু মিনতি করবেন একটু, আমি এখনই সরকারকে জানিয়ে দেবো। সাইয়েদ কুতুব উত্তরে বলেন, কেন মিনতি করব? যদি আমি সৎভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকি, তাহলে আমি এই সিদ্ধান্তেই সন্তুষ্ট। আর যদি অন্যায়ভাবে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে থাকি, তাহলে বাতিলের কাছে মিনতি করার নীচুতা থেকে আমি অনেক ঊর্ধ্বে!
২৯ আগস্ট ১৯৬৬ সালে ফজরের সময় সাইয়েদ কুতুবকে ফাঁসি দেওয়া হয়। রহিমাল্লাহু। ফাঁসির আগে তিনি বলে গেছেন, ‘রক্তে সিঞ্চিত না হলে কোনো চেতনার স্থায়িত্ব আসে না।’
সামরিক শাসন তাঁকে ফাঁসি দিয়ে তাঁর দেহ বিদায় করেছে ঠিকই, কিন্তু হাজার বছরের জন্য তাঁর চেতনায় প্রাণ সঞ্চার করেছে। তাঁকে ছেড়ে দিলে আজ হয়তো বিশ শতকের আর দশজন লেখকের মতো তাঁকেও মানুষ ভুলে যেত। কিন্তু জীবনের বিনিময়ে তিনি পৃথিবীর সচেতন সত্যপন্থী প্রতিটা মানুষের হৃদয়ে চেতনার মিনার হিসেবে বেঁচে আছেন পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে। তাঁর নাম উচ্চারণের সাথে সাথে মানুষের দিল ফুঁড়ে আরেকটি বাক্য বেরিয়ে আসে–রাহিমাহুল্লাহ–আল্লাহ রহম করুন তাঁর এ বান্দার প্রতি।

মুহাম্মদ_কুতুবঃ বিশ শতকের এই মহান চিন্তাবিদকে কতটুকু চেনেন?


মুহাম্মদ কুতুব। মিশরের একজন প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ। ইসলামি চিন্তাধারা নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা-পত্র রয়েছে তাঁর। ভাই সাইয়েদ কুতুবের সাথেই একটা অভিজ্ঞতাপূর্ণ সময় পার করেছেন তিনি। রাষ্ট্রীয় শত বাধা-প্রতিবন্ধকতা সত্বেও তাদের শক্ত যুক্তি এবং স্পষ্ট দর্শন ও পর্যবেক্ষণ সর্বদাই অনড় ও অবিচল ছিল।
জন্মকাল
মিশরের আসয়ুতের মুশা নামক গ্রামে ২৬ এপ্রিল ১৯১৯ সালে মুহাম্মদ কুতুব জন্মগ্রহণ করেন। যে বছরের গণজাগরণ ইংরেজ দখলদারকে মিশরের মাটি ছাড়তে বাধ্য করেছে। শুধু মিশর না, এই গণজাগরণের ফলে আরব জাহান থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে হয়েছিল তারা। তাই বলা যায়, মুহাম্মদ কুতুবের দুনিয়ায় আগমন এবং তাঁর শৈশব-কৈশোর পার হয়েছে আরব গণজাগরণের কালে। আরবভূখণ্ডে ইউরোপিয়ান ঔপনিবেশিক শাসনামলের শেষ যুগ ছিল এটা।
ভাইয়ের ছায়ায়
পিতার মৃত্যুর পর মা সিদ্ধান্ত নেন পড়াশোনার জন্য সন্তানদের কায়রো পাঠাবেন। বড় ভাই সাইয়েদ কুতুব এবং বোন আমিনা ও হামিদার সাথে মুহাম্মদ কুতুবও রাজধানী কায়রো পাড়ি জমান। নিম্নমাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে কায়রো ভার্সিটিতে ভর্তি হন। এখানেই ইংলিশ ভাষা-সাহিত্যের উপর ডিগ্রী অর্জন করেন। পরে এডুকেশন ইনিস্টিটিউট থেকে শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞানের উপর ডিপ্লোমা করেন। এরপর চারবছর শিক্ষকতা করেন। এক সময় শিক্ষকতা ছেড়ে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের ট্রান্সলেশন অফিসে কাজ শুরু করেন। পরে দুই বছরের জন্য শিক্ষকতায় ফিরলেও আবার শিক্ষামন্ত্রণালয়ের ‘আলফ কিতাব’ নামক প্রজেক্টে অংশ নেন।
তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে অবদান রয়েছে তিন মহাপুরুষের। সাইয়েদ কুতুব, সাহিত্যিক আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ এবং তাঁর মামা আহমাদ হুসাইন আল মুশী। আহমাদ হুসাইন ছিলেন সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ। যার সাহিত্যিক প্রতিভা এবং কাব্যচর্চা বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। তবে সবার থেকে আলাদা করে ভাইয়ের প্রশংসা করেছেন তিনি। স্বীকার করেছেন যে, তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা ও ব্যক্তিসত্তা উন্নায়নে সাইয়েদ কুতুবের দিক-নির্দেশনা মূল ভূমিকা পালন করেছে। সাইয়েদ কুতুবের সাথে তাঁর সম্পর্ক বয়ান দিতে গিয়ে তিনি বলেন- ‘শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে আমার সাথে সাইয়েদের সম্পর্ক ছিল কখনো নমনীয়, আবার কখনো কঠিন। এতোটা নরম হতেন না, যাতে আমি বিগড়ে যাই। আবার এতটা কঠোর হতেন না, যাতে আমি তাঁর কাছে না ভিড়ি। তিনি নিজে তো বইপোকা ছিলেনই, অন্যদিকে সবসময় আমাকেও বিভিন্ন বিষয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাঁর এই উদ্বুদ্ধকরণ শৈশব থেকেই পাঠের প্রতি আমার ভিন্ন ভালোবাসা যুগিয়েছে।’
নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ব্যাপারে মুহাম্মদ কুতুব বলেন, ‘বুঝমান হওয়ার পর থেকে সাইয়েদ কুতুবের সকল দৃষ্টিভঙ্গী ও চিন্তাভাবনার সেই বিশাল রাজ্যে অন্তরঙ্গভাবে বাস করেছি। আর যখন উচ্চমাধ্যমিক পার করি, তখন তিনি নিজ থেকেই তাঁর বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আমার সাথে শেয়ার করতেন। সেসব বিষয়ে আমাকেও আলোচনা করার সুযোগ করে দিতেন। এজন্যই আমাদের আত্মা ও চিন্তাধারার মাঝে বড় একটা মিল রয়েছে। সাথে ভ্রাতৃত্ব ও একই পরিবারে বেড়ে ওঠার সম্পর্ক আরো অন্তরঙ্গ হওয়ার পথ করে দিয়েছে।
জেলজীবন
১৯৪৮ সালের ৮ই ডিসেম্বরে মিশরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ ফাহমী ‘সশস্ত্র গোপণ সংস্থা’ ও আরও বিভিন্ন হামলার তোহমতে মুসলিম ব্রাদারহুডের উপর রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষেধাজ্ঞ্য জারি করেন। সাথে মুসলিম ব্রাদারহুডের উচ্চপর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে আটকের হুকুম দেন। তখন ধরপাকড় হলেও খুব একটা জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। একই মাসের ২৮ তারিখ মাহমুদ ফাহমীকে হত্যা করা হয়। যার পুরাপুরি দায়ভার মুসলিম ব্রাদারহুডের উপর অর্পিত হয়। মাহমুদ ফাহমীর হত্যার পর ধরপাকড় খুব আকারে বেড়ে যায়। দুই মাস যেতে না যেতেই ১৯৪৯ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসানুল বান্নাকে হত্যা করা হয়। সাইয়েদ কুতুব এর কিছুদিন পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরত আসেন।
১৯৫২ সালে সেনাঅভ্যুত্থানের পর মিশরের রাজতন্ত্র মিটিয়ে দেয় বিদ্রোহী সেনারা। এখানে একটি বিষয় বলে রাখি, সেনা কর্মকর্তা ও মুসলিম ব্রাদারহুডের মাঝে বেশ সম্পর্ক ছিল। এর পিছনে কারণও আছে। ১৯৪৮ সালে দখলদার ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধকালে ব্রাদারহুডের যুবকরাও সেই যুদ্ধে শামিল হয়। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী জামাল আব্দুন নাসেরও ব্রাদারহুডের উক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু বায়ান্নর পরে সেনাদের অবস্থান একদম পাল্টে যায়। ১৯৫৪ সালে জামাল আব্দুন নাসেরকে হত্যার চেষ্টা করা হলে সেই দোষও গিয়ে চাপে মুসলিম ব্রাদার হুডের উপর। এ সময় হত্যা চেষ্টার অভিযোগে সাইয়েদ কুতুব ও তাঁর ভাই মুহাম্মদ কুতুবকেও আটক করা হয়। দুই ভাইকে সামরিক ভিন্ন দুই কারাগারে বন্দী করা হয়। এতটা দূরত্ব ছিল তাঁদের মাঝে, কেউ কারও অবস্থান সম্পর্কে জানতেন না। জেলের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সাইয়েদ কুতুব বলেন, ‘সামরিক কারাগারের কষ্ট আমার অন্তরে বড় প্রভাব ফেলেছে। কারণ, এটাই ছিল আমার কারাগারের প্রথম অভিজ্ঞতা। শাস্তি এবং নির্দয়তা এতটাই তীব্র ছিল যে, আমি বলতে পারি আমার আত্মাকে একদম বদলে দিয়েছে।’
অল্প কিছুদিন পরমুহাম্মদ কুতুবকে মুক্তি দেওয়া হয়। অন্যদিকে সাইয়েদ কুতুবকে ১৫ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ প্রদান করা হয়। আর এই সময়েই সাইয়েদ কুতুব তাঁর প্রসিদ্ধ বই في ظلال القرآن লেখেন। মুহাম্মদ কুতুব তাঁর কারামুক্তি নিয়ে বলেন, ‘আমাকে জেল মুক্তি দেওয়া হয়েছে পরিবারের বোঝা বহনের জন্য। যেই পরিবারের পুরো দায়িত্বভার ছিল ভাইয়ের উপর। যেমনটি আমরা দেখে এসেছি আগে থেকে। সেই পরিবারের বোঝা নিয়ে দশ বছরের বাস্তব জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতায় আমি নিবিষ্ট হয়েছি।’
১৯৬৪ সালে মে মাসে সাইয়েদ কুতুবকে শারীরিক অবক্ষয়ের কারণে মুক্তি দেওয়া হয়। মুহাম্মদ কুতুব ভাইয়ের মুক্তির কথা ব্যক্ত করেন, ‘তাঁর মুক্তিকে আমরা অনেকটা উদ্বেগের সাথে গ্রহণ করেছি। গভীরভাবে আনুভব করছিলাম, ওরা তাঁকে এত সহজে ছেড়ে দিবে না। এরচেয়ে বড়ো কোনো ষড়যন্ত্রের ফাঁদ আটছে কারাগারে। যা ভেবেছিলাম , তাই হয়েছিল।’ সাইয়েদ কুতুব কারাগার থেকে বের হতে না হতেই রাজ্যে আবার উত্তেজনা বেড়ে যায়। জামাল আব্দুন নাসেরও ধরপাকড় শুরু করে। এবারো তাঁদের দুই ভাইকে কারাবন্দী করা হয়। কিন্ত এবার কিছুটা উল্টো হল। মুহাম্মদ কুতুব ছয় বছরের দীর্ঘ কারাজীবন পার করলেন। এই ফাঁকে সাইয়েদ কুতুবসহ আরো ছয়জনকে ফাঁসি দেওয়া হল। তাঁর বড় বোনের ছেলেকে গোপনে হত্যা করা হয়। তিন বোনকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়।
হিজরত
সত্তর দশকের গোড়ার দিকে মুহাম্মদ কুতুব সৌদি হিজরত করেন। মক্কার উম্মুল কুরা ভার্সিটিতে শরীয়াহ ফ্যাকালটির লেকচারার হিসেবে নিযুক্ত হন। সেখান থেকে পরে জেদ্দার কিং আব্দুল আজীজে নিযুক্ত হন।
মুহাম্মাদ কুতুবের তত্বাবধানে বেশ কিছু থিসিস পেপার প্রকাশিত হয়েছে। যেগুলো শায়েখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাবের চিন্তাচেতনা ও সমসাময়িক চিন্তাধারার মাঝে দৃঢ় সম্পর্কের সৃষ্টি করেছে। প্রসিদ্ধ থিসিস পেপারের মধ্যে ছিল ‘العلمانية.. نشأتها وتطورها وآثارها في الحياة الإسلامية المعاصرة’ গবেষণা পত্রটি লিখেছেন ডঃ সাফর আল হাওয়ালী। আরো ছিল ‘ الولاء والبراء’ লিখেছেন ডঃ মুহাম্মাদ বিন সায়ীদ আল কাহতানী। প্রসিদ্ধের মাঝে আরো ছিল ” أهمية الجهاد” লিখেছেন আলী বিন নাফী আল আলয়ানী। তা ছাড়া সৌদির বিভিন্ন স্তরের সিলেবাস প্রণয়নের ক্ষেত্রেও তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে। ১৯৮৮ শালে তিনি ইসলামি স্টাডিজের জন্য আন্তর্জাতিক কিং ফয়সাল পুরুষ্কার অর্জন করেছেন।
মৃত্যু
২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল জুমার দিন জেদ্দায় মুহাম্মদ কুতুব মৃত্যুবরণ করেন। রহিমাহুল্লাহ।
পরিশিষ্ট
সাইয়েদ কুতুব ও মুহাম্মদ কুতুব গত শতকের সেরা মুসলিম ব্যক্তিত্ব। তাঁদের আবিষ্কার ও গবেষণা পত্রগুলো সাময়িক অনেক ঘটনা সম্পৃক্ত হলেও ইসলামি পবিত্র চেতনার কমতি নেই। তাঁদের ব্যাপারে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মতামত রয়েছে। কেউ বলে তাকফিরী (মন মতো কাফের সাব্যস্ত করেছেন), কেউ বলে সালাফীদের গোঁড়ামির চাদরে বেড়ে উঠেছে তাদের চিন্তাভাবনা। যেই যা বলুক, তাদের আবিষ্কার ছিল যুগ সেরা। তবে বিশেষজ্ঞগণ বলেন, যেকোনো স্থরের ছাত্রদেরকে ব্যক্তিগতভাবে তাদের গ্রন্থ পাঠ না করা শ্রেয়। বরং বিজ্ঞ কোনো ব্যক্তিত্বের তত্ত্বাবধানে এগুলোর পাঠ আবশ্যক। আল্লাহ তাঁদেরকে জান্নাতবাসী করুন।