দাজ্জালের আলোচনা

দাজ্জালের আলোচনা-১
হযরত ইমরান বিন হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘হযরত আদম (আঃ) এর জন্ম থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দাজ্জালের ফিতনার চেয়ে বড় ফিতনা আর কোনো কিছুই হবে না। (সহীহ মুসলিম)
দাজ্জালের আলোচনা উম্মতের জন্য একটি অতিব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রায় সকল মুসলমানই জাহিলী সভ্যতা-সংস্কৃতিতে মজে সেই আলোচনা থেকে উদাসীন। দাজ্জাল আবির্ভাবের যতগুলো আলামত রয়েছে, তন্মধ্যে এটিও একটি যে, সে সময় মানুষ দাজ্জালের আলোচনা ভুলে যাবে।
সুতরাং আপনি যদি নিজেকে ও পরিবারের লোকজনকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা করার ইচ্ছে রাখেন, এর জন্য মুসলমানদেরর ঘরে ঘরে এর আলোচনা খুবই জরুরী। যাতে আপনার কোলে বেড়ে ওঠা শিশুটি তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুশমন দাজ্জাল সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করতে পারে।

দাজ্জাল সম্পর্কে ইহুদিদের দৃষ্টিভঙ্গিঃ
সে ইহুদিদের সম্রাট হবে। সকল ইহুদীকে বাইতুল মুকাদ্দাসে আবাদ করবে। সমস্ত পৃথিবীর উপর ইহুদিদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। পৃথিবীতে ইহুদিদের কোনো ভয় থাকবে না। সকল সন্ত্রাসবাদীকে নির্মূল করে ফেলবে এবং সর্বত্র শান্তি ও সুবিচারের রাজত্ব কায়েম হয়ে যাবে। সমগ্র পৃথিবীর সকল ইহুদিদেরকে ইসরায়েলে এনে জমায়েত করবে।।

দাজ্জালের ফিতনা-২

দাজ্জালের ফিতনা কতটা ভয়ংকর একটি বিষয় দ্বারাই অনুমান করা যায় যে, স্বয়ং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন এবং তিনি যখন সাহাবায়ে কেরামের সামনে এই ফিতনার আলোচনা করতেন, তখন তাঁদের চেহারায় ভয়ের ছাপ পরিলক্ষিত হত। প্রশ্ন হলো, দাজ্জালের ফিতনায় সেই বিষয় কোনটি, যেটি সাহাবিদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল? সেটা কি ভয়াবহ যুদ্ধ নাকি মৃত্যু? কিন্তু সাহাবাগণ এ বিষয়গুলোকে ভয় পাওয়ার মতো মানুষ ছিলেন না।
সেই বিষয়টা হচ্ছে, দাজ্জালের ধোঁকা এবং প্রতারণা। সে সময়টা এত ভয়াবহ হবে যে, বাস্তব অবস্থাটা আসলে কি তা বুঝাই সম্ভব হবে না। মানুষকে বিভ্রান্তকারী নেতার ছড়াছড়ি থাকবে। অপপ্রচারের হালচাল এমন হবে যে, মূহুর্তের মধ্যে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যা বানিয়ে পৃথিবীর কোনায় কোনায় পৌঁছে দেওয়া হবে। মানবতার শত্রুকে মুক্তিদাতা আর মুক্তিদাতাকে সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করা হবে।
এ কারনেই প্রিয়নবী (সাঃ) দাজ্জালের ফিতনাকে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। তার গঠন, আকৃতি ও আত্মপ্রকাশের স্থান পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, সাধারণ মানুষ তো বটে, বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও এই ফিতনার আলোচনা একদম ছেড়ে দিয়েছেন। অথচ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার এই ফিতনার আলোচনা করে বলেছেন, “আমি বিষয়টি তোমাদেরকে বারবার আলোচনা এজন্য করছি, যাতে তোমরা বিষয়টি ভুলে না যাও। তোমরা বিষয়টি উপলব্ধি করো, তাতে গবেষণা করো এবং অন্যদের কানে পৌঁছে দাও।”

পর্ব-৩
দাজ্জালের গঠন-প্রকৃতিঃ
হযরত উবাদাহ বিন সামেত, আব্দুল্লাহ বিন ওমর ও আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদের কাছে দাজ্জাল সম্পর্কে বারবার আলোচনা করেছি, তবুও আশংকা করছি যে, তোমরা তার প্রকৃত অবস্থা হয়ত নাও বুঝতে পারো। জেনে রাখ, মাসীহে দাজ্জাল হবে খাট ও মোটা, পায়ের নলা লম্বা লম্বা এবং হালকা বাঁকা। মাথার চুলগুলো খুব ঘন, কোঁকড়ানো এবং জটবাঁধা। তার বাম চক্ষু কানা, দেখতে যেন ফোলা আঙুরের মতো। আর ডান চক্ষু সমান। চোখ সিসার মতো সবুজ হবে। এরপরও যদি সন্দেহে পড়ে যাও, তবে একথা মনে রাখবে যে, তোমাদের রব অবশ্যই কানা নন। তার দুচোখের মাঝখানে (আরবীতে) ‘কাফের’ লিখা থাকবে। যেটি লেখাপড়া জানা অজানা সব মুমিন পড়তে পারবে। তার সঙ্গে জান্নাত ও জাহান্নাম থাকবে। কিন্তু মূলত তার জাহান্নাম হল জান্নাত আর জান্নাত হল জাহান্নাম। [ সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬৫৯৮/ সহীহ মুসলিম, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২২৪৮] দাজ্জাল সুনির্দিষ্ট এক ব্যক্তি হবে। কারণ হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে। কাজেই কোনো রাষ্ট্রকে দাজ্জাল মনে করা ঠিক নয়। যেমনটি খাওয়ারিজ ও জাহমিয়া প্রভৃতি ভ্রান্ত দলগুলো মনে করে থাকে।।
আলোচ্য হাদিসে ‘কাফের’ লেখাটি সব মুমিনই পড়তে পারবে। প্রশ্ন জাগে, সবাই যখন পড়তে পারবে তখন মানুষ তার ফিতনায় আক্রান্ত হবে কেন?
এর উত্তর হল সেই হাদিস, যাতে বলা হয়েছে পরিচয় পাওয়া সত্ত্বেও বহু মানুষ জাগতিক স্বার্থের খাতিরে দাজ্জালের সঙ্গ দিবে। আরেকটি উত্তর এই হতে পারে, পড়তে পারা আর লেখার মর্ম অনুযায়ী আমল করা এক নয়। বর্তমান যুগেও বহু মুসলমান এমন আছে যারা কুরআনের বিধানাবলী পড়ে, কিন্তু সেই অনুযায়ী আমল করে না।সবাই জানে সুদী ব্যবস্থা সরাসরি আল্লাহর সাথে যুদ্ধ। কিন্তু বহু মানুষ তার সাথে জড়িত।
দাজ্জালের যুগেও বহু মানুষ ধন-দৌলত ও জাগতিক সৌন্দর্যের বিনিময়ে নিজদের ঈমান বিক্রি করে ফেলবে। তারা ঈমান পরিত্যাগ করে দুনিয়াকে বরণ করে নিবে। যারা দাজ্জালের বিরুদ্ধে লড়াই করবে তাদেরকে এরা বিভ্রান্ত বলবে। নিজেদেরকে তারা মুসলিম বলেই দাবি করবে। অধচ ইসলামের সাথে এদের কোনোই সম্পর্ক থাকবে না।।

(পর্ব-৪)
দাজ্জালের সঙ্গে তামীম দারী (রাঃ) এর মোলাকাতঃ

হযরত ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোষককে এই ঘোষণা দিতে শুনলাম, “আসসালাতু জামি’আতুন’ (নামাজ প্রস্তুত)। সুতরাং আমি মসজিদে চলে গেলাম এবং প্রিয়নবীর পিছনে নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে তিনি মিম্বরে বসলেন এবং মৃদু হেসে বললেন, প্রত্যেকে নিজ নিজ নামাজের স্থানে বসে থাক। অতঃপর বললেন, তোমরা কি জান আমি কেন তোমাদেরকে একত্র করেছি? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।
তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তোমাদেরকে কিছু দেওয়ার জন্য বা ভয়-ভীতি দেখানোর জন্য সমবেত করিনি। বরং আমি তোমাদেরকে একটি ঘটনা শোনাবো।
তামীম দারী নামে এক খৃস্টান ছিল। সে আমার নিকট এসে মুসলমান হয়েছে। সে আমাকে একটি ঘটনা বলেছে, যেটি আমি দাজ্জাল সম্পর্কে আগে যা বলেছি তার অনুরূপ। সে আমাকে বলেছে,
আমরা বনু লাখম ও বনু জুযামের ত্রিশজন লোক নিয়ে সমুদ্রে নৌকা ভ্রমনে বের হয়ে ছিলাম। সমুদ্রের তরঙ্গ একমাস যাবত আমাদেরকে দিকবিদিক ঘুরাতে লাগলো। অবশেষে একদিন সন্ধ্যাবেলা আমাদের নৌকাটি একটি অজানা দ্বীপে গিয়ে উপনীত হল। অতঃপর আমরা ছোট ছোট ডিঙিতে করে দ্বীপটির ভেতরে ঢুকে গেলাম। ওখানে আমরা একটি বিস্ময়কর প্রাণীর সাক্ষাৎ পেলাম। যার সারা দেহ বড় বড় পশমে ঢাকা। চুলের আধিক্যের কারণে আমরা তার অগ্র-প্রশ্চাত নির্ণয় করতে পারিনি। আমরা বললাম, তোর ধ্বংস হোক, কে তুই?
প্রাণীটি বলল, আমি জাসসাসা। (গুপ্ত সংবাদ অন্বেষণকারিণী) তোমরা গীর্জায় আবদ্ধ সেই লোকটার কাছে যাও, যে তোমাদের সংবাদ নিয়ে খুবই বিচলিত।
তামীম দারী বলেন, আমরা ঐ প্রাণীটির কথা শুনে ভয় পেয়ে গেলাম যে, ওটা ভূত-পেত্নী কিনা! আমরা খুব তাড়াতাড়ি গির্জায় চলে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, ভেতরে বৃহদাকার এমন এক লোক বসে আছে যে, এমন ভয়ংকর মানব এর আগে আমরা কখনো দেখিনি। লোকটার হাত দু’টো কাঁধ অবধি আর পা দুটি হাঁটু পর্যন্ত লোহার শৃঙ্খল দিয়ে বাঁধা। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, তোমার ধ্বংস হোক, কে তুমি?
সে বলল, নিশ্চয়ই তোমরা আমার সম্পর্কে জানতে পারবে। তবে প্রথমে বলো, তোমরা কারা? আমরা বললাম, আমরা আরবের লোক। আমরা সমুদ্রে একটি নৌকায় আরোহী ছিলাম, দীর্ঘ একমাস সাগরের ঢেউ আমাদেরকে এদিক সেদিক ঘুরিয়ে এখানে পৌঁছে দিয়েছে।

পর্ব-৫
সে জিজ্ঞেস করল, বায়সান এলাকার খেজুর বাগানে ফল আসে কি? আমরা বললাম, হ্যাঁ আসে। সে বলল, অদূর ভবিষ্যতে সেই বাগানে ফল ধরবে না।
অতঃপর সে জিজ্ঞেস করল, তাবারিয়া নদীতে পানি আছে কি? আমরা বললাম, সেই নদীতে প্রচুর পানি আছে। সে বলল, সেই সময়টি নিকটে, এই নদীর পানি শুকিয়ে যাবে।
তারপর সে বলল, যোগার ঝর্ণায় পানি আছে কি? সেখানকার লোকেরা সেই পানি দ্বারা কৃষিকাজ করে কি? আমরা বললাম, হ্যাঁ।
অতঃপর জিজ্ঞেস করল, উম্মীদের নবীর সংবাদ কি? আমরা বললাম, তিনি মক্কা থেকে হিযরত করে ইয়াসরিবে (মদিনায়) চলে গেছেন।
সে জিজ্ঞেস করল, আরবরা তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে কি? আমরা বললাম, হ্যাঁ, করেছে।
সে বলল, তিনি আরবদের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করেছেন? আমরা বললাম, তাঁর আশেপাশের আরবদের উপর তিনি বিজয়ী হয়েছন এবং তাঁর আনুগত্য মেনে নিয়েছেন। সে বলল, তাঁর আনুগত্য মেনে নেওয়াই এদের জন্য উত্তম।
এবার আমি তোমাদেরকে আমার অবস্থা বলছি, আমি মাসীহে দাজ্জাল। অদূর ভবিষ্যতে আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। আমি বাইরে বের হয়ে চল্লিশ দিনের মধ্যে সারা পৃথিবী বিচরণ করব। (একটি পাড়া বা মহল্লাও বাদ যাবেনা আমার ভ্রমন থেকে) কিন্তু মক্কা ও মদিনা যাব না। ওখানে যেতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। আমি যখন তার কোনটিতে ঢুকতে চেষ্টা করব, তখনই একজন ফেরেশতা তলোয়ার হাতে নিয়ে আমাকে প্রতিহত করবে। ওই শহরগুলোর প্রতিটি সড়কে ফেরেশতা মোতায়েন থাকবে।
এই ঘটনা শোনানোর পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতের লাঠি দিয়ে মিম্বরে আঘাত করে বললেন, এই হল তাইবাহ, এই হল তাইবাহ, এই হল তাইবাহ অর্থাৎ মদীনা। তারপর তিনি বললেন, শোন আমি তোমাদেরকে এই বিষয়টিই বলতাম। মনে রেখো, দাজ্জাল শাম কিংবা ইয়ামেনের কোন সাগরে নেই। সে পূর্বদিকের কোন একস্থানে রয়েছে। এই বলে তিনি হাত দ্বারা পূর্বদিকে ইশারা করলেন। [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-৫২৩৫]

পর্ব-৬
দাজ্জালের পূর্বে পৃথিবীর হালাতঃ

দাজ্জালের আবির্ভাবের আগের বছরগুলোতে পৃথিবীতে বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও গণহত্যা চলতে থাকবে। বেকারত্ব, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অস্থিতিশীলতা, উচ্চমূল্য ও সামাজিক অবিচারের রাজত্ব চলবে। পরিবারে শান্তি ও নিরাপত্তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। সর্বত্র পাপ ও মন্দের জয়জয়কার হবে। কোথাও কোথাও সামান্য সৎকর্ম ও সচ্চরিত্র চোখে পড়বে। মানুষ এমন লোকেরও প্রশংসা করবে, যে ৯৯ভাগ পাপ-অন্যায় ও জুলুমে লিপ্ত; মাত্র ১ভাগ সৎকাজ করছে। নেতাদের থেকে নিরাশ হয়ে মানুষ এমন কোন মুক্তিদাতার সন্ধানে থাকবে যাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরণ করা হবে।

হযরত আসমা বিনতে ইয়াযিদ (রাঃ) বলেন, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমার ঘরে অবস্থানরত ছিলেন এবং দাজ্জাল সম্পর্কে বলেনঃ দাজ্জাল আবির্ভাবের আগের তিন বৎসর এমন হবে যে, প্রথম বৎসর আসমান একতৃতীয়াংশ বৃষ্টি আটকে রাখবে এবং যমীন একতৃতীয়াংশ ফসল উৎপাদন বন্ধ রাখবে। দ্বিতীয় বৎসর আকাশ দুই-তৃতীয়াংশ বৃষ্টি আটকে রাখবে আর যমীন দুই-তৃতীয়াংশ ফসল উৎপাদন বন্ধ রাখবে। আর শেষ তৃতীয় বৎসর আসমান সম্পূর্ণ বৃষ্টি আটকে রাখবে আর যমীন পূর্ণ ফসল উৎপাদন বন্ধ রাখবে। অর্থাৎ কোন গাছে ফল ধরবে না, তরুলতা-শাকসবজি উৎপন্ন হবে না। সব ধরনের গবাদিপশু ধ্বংস হয়ে যাবে। [আল মুজামুল কাবীর, হাদিস নং-৪০৬]

হযরত আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল আবির্ভাবের আগের কয়েকটি বছর হবে প্রতারণার বছর। এই সময়ে সত্যবাদীকে মিথ্যাবাদী আর মিথ্যাবাদীকে সত্যবাদী আখ্যায়িত করা হবে। দুর্নীতিবাজকে আমানতদার আর আমানতদারকে দুর্নীতিবাজ মনে করা হবে। [মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং-১৩৩২]

হযরত উমায়ের বিন হানী বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একটি সময় আসবে যখন মানুষ দুটি তাঁবুতে (দলে) বিভক্ত হয়ে যাবে। একটি তাঁবু হবে ঈমানের, যেখানে যেখানে কোন মুনাফেকি থাকবে না। আরেকটি তাঁবু হবে নিফাকের, যেখানে কোন ঈমান থাকবে না। যখন এমন পরিবেশ তৈরি হয়ে যাবে সেদিন থেকে অথবা তার পরেরদিন থেকে দাজ্জালের অপেক্ষা করো। [আবু দাউদ, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৯৪]

হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলাম। আমি তাঁকে বলতে শুনলাম, আমি আমার উম্মতের জন্য একটা বিষয়ে দাজ্জালের থেকে বেশি ভয় করছি। এটা শুনে আমি ভয় পেলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, সেটা কি? তিনি বললেন, পথভ্রষ্ট এবং ধ্বংসযোগ্য আলেমরা। [মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং-২১৩৩৪]
হযরত আবু দারদা (রাঃ) এর হাদিসে রয়েছে, বিভ্রান্তকারী নেতৃবৃন্দের কথা।
দাজ্জালের সময়ে এই চরিত্রের আলেম ও নেতার ছড়াছড়ি থাকবে। দাজ্জালী শক্তির চাপ বা প্রলোভনে এসে তারা নিজেরাও সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে এবং তাদের অনুগত অনুসারীদেরকেও সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখার কারণ হবে।।

পর্ব-৭
দাজ্জাল কোন দেশ থেকে আত্মপ্রকাশ করবে।

এ বিষয়ে দুটি বর্ণনা পাওয়া যায়।
হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দাজ্জাল ইস্পাহানের ইহুদিয়া অঞ্চল থেকে আত্মপ্রকাশ করবে। ইস্পাহানের ৭০হাজার ইহুদী দাজ্জালের অনুসারী হবে। তাদের দেহে সবুজ রঙের চাদর বা জুব্বা থাকবে। [সহীহ মুসলিম, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২২৬৬]

হযরত আবু বকর (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল পৃথিবীর এমন একটি অঞ্চল থেকে বের হবে, যেটি পূর্বদিকে অবস্থিত এবং যাকে খোরাসান বলা হয়। তার সঙ্গে বহু দল মানুষ থাকবে। তাদের একটা দলের লোকদের চেহারা স্ফীত ঢালের মতো হবে। [সুনানে ইবনে মাজাহ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৩৫৩]

এই হাদিসে খোরাসানকে দাজ্জাল আবির্ভাবের স্থান বলা হয়েছে। এর আগের হাদিসে বলা হয়েছে ইস্পাহান। এই দুই বর্ণনায় আসলে কোন বৈপরীত্য নেই। কেননা ইস্পাহান ইরানের একটি প্রদেশ আর ইরান একসময় খোরাসানের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
খোরাসান সম্পর্কে সেই বাহিনীর বিবরণ হাদিসে রয়েছে, যারা ইমাম মাহদীর সাহায্যে এগিয়ে আসবে। সুতরাং আমরা যদি মাহদী বাহিনীর আলামত সমূহ সমগ্র খোরাসানে তালাশ করি, আফগানিস্থানের সেই অঞ্চলটি পরিদৃষ্ট হবে, যেখানে সম্প্রতি পাখতুন বসতি অধিক। তাই লক্ষণদৃষ্টে অনুমান হয় ইমাম মাহদীর সাহায্যকারী বাহিনীটি খোরাসানের সেই এলাকা থেকে গমন করবে যেটি বর্তমানে তালেবান আন্দোলনের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
অন্য এক হাদিসে দাজ্জালের আত্মপ্রকাশের স্থান ইরাক ও শামের মাঝামাঝি একটি জায়গার কথা বলা হয়েছে। যেকারণে বাহ্যত এখানে বিরোধ পরিলক্ষিত হয়। এই বিরোধের সমাধান হচ্ছে, দাজ্জালের আবির্ভাব ইস্পাহান থেকেই হবে। তবে তার প্রচার ও খোদায়ী দাবী হবে ইরাকে। এই হিসেবেও একে আবির্ভাব নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
আল ফিতানে একটি হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল দুই বছর ইরাক শাসন করবে। তাতে তার সুশাসন প্রশংসিত হবে এবং মানুষ তার দিকে আকৃষ্ট হবে। দুই বছর পর একদিন সে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণে জনতাকে লক্ষ্য করে বলবে, এখনো কি সময় আসেনি, তোমরা তোমাদের প্রভুর পরিচয় লাভ করবে? এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করবে, আমাদের প্রভু কে? দাজ্জাল বলবে, আমি। আল্লাহর এক বান্দা তার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করবে। দাজ্জাল তাকে হত্যা করে ফেলবে। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৩৯]

পর্ব-৮
দাজ্জালের বাহন, গতি ও অবস্থানঃ

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল একটি ফকফকে সাদা বর্ণের গাধায় সওয়ার হয়ে বের হবে। গাধার উভয় কানের মধ্যবর্তী স্থানটি ৭০ বা’আ চওড়া হবে। [মিশকাত, হাদিস নং ৫২৫৯]
উভয় হাতকে প্রশস্ত করলে যে পরিমাণ লম্বা হয় তাকে বা’আ বলে। দুই হাত প্রশস্ত করলে কমপক্ষে চার হাত হয়। এ হিসেবে প্রায়, ২৮০ হাত চওড়া হবে বুঝা যায়।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, দাজ্জালেে গাধার কানগুলো এত বড় হবে যে, সত্তর হাজার মানুষ তার তলে ছায়া গ্রহণ করতে পারবে। [আল ফিতান]

হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জালের গাধার এক একটি পদক্ষেপ তিনদিনের ভ্রমনের সমান হবে। সে তার গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে সাগরে এমনভাবে ঢুকে যাবে যেমন তোমরা ঘোড়ার পিঠে চড়ে পানির ছোট নালায় ঢুকে থাক (এবং নালা পার হয়ে থাক)। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৩]
দাজ্জালের একেকটি পদক্ষেপ তিনদিনের সফরের সমান হবে। হিসাব করলে দেখা যায় এই পরিমাণটা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৮২ কিলোমিটার। ঘন্টায় ২ লক্ষ ৬৫ হাজার ২ শত কিলোমিটার। হিসাবটা যেভাবে বের করা হয়েছে, তিনদিনের শরয়ী সফর হচ্ছে ৪৮ মাইল। ৪৮ মাইলে ৮২ কিলোমিটার।

হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাজ্জালের আলোচনা করছিলেন, আমরা জিজ্ঞেস করলাম সে কতদিন যমীনে অবস্থান করবে? তিনি বললেন চল্লিশ দিন। তবে তার প্রথম দিনটি হবে এক বছরের সমান। দ্বিতীয় দিনটি এক মাসের সমান। তৃতীয় দিনটি এক সপ্তাহের সমান। আর বাকি (৩৭টি) দিন অন্যান্য স্বাভাবিক দিনের মতই হবে।
আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, সেই একদিন যা এক বছরের সমান হবে সেদিন কি আমাদের একদিনের নামাজই যথেষ্ট হবে? তিনি বললেন, না। বরং সেদিন একেকদিনের পরিমাণ হিসাব করে (এক বছরের) নামাজ আদায় করতে হবে।
আমরা জিজ্ঞেস করলাম, যমীনে তার চলার গতি কেমন হবে? তিনি বললেন, সেই মেঘমালার মত যাকে প্রবল বায়ু হাঁকিয়ে নিয়ে যায়। [ সহীহ মুসলিম ]
হযরত কা’ব (রাঃ) বর্ণনা করেন, দাজ্জাল যখন উর্দুনে (জর্ডানে) আসবে, তখন তূর পাহাড়, ছাওড় পাহাড় ও জুদি পাহাড়কে ডাকবে। এমনকি এই তিনটি পাহাড় পরস্পর এমনভাবে সংঘাতে লিপ্ত হবে যেমন দুটি ষাঁড় বা ছাগল পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। [আল ফিতান]

পর্ব-৯
দাজ্জালের ফিতনার সরূপ!

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের সামনে যখনই দাজ্জালের আলোচনা করতেন তখনই তাঁদের মধ্যে ভীতি সঞ্চারিত হয়ে যেত এবং কান্না শুরু করতেন। কিন্তু এর কারণ কি যে, আজ মুসলমানরা এই বিষয়ে কোনো চিন্তাই করছে না?
সম্ভবত এর কারণ, আজ মানুষ এই ফেতনাটিকে সেই অর্থে বুঝবার চেষ্টা করে না, যে অর্থে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝিয়েছেন। আজ যদি কোন মুসলমান এই হাদিসটি শুনে, দাজ্জালের কাছে খাদ্যের পাহাড় ও পানির নহর থাকবে। তখন সে হাদিসটি এমন অবস্থায় শুনে যে, তার পেট খাবারে পূর্ণ থাকে এবং পানির কোন তৃষ্ণাই থাকে না। ফলে সে দাজ্জালের সময়কার পরিস্থিতিকেও নিজের ভরা পেট ও ভেজা গলার সময়কার উপর অনুমান করে। এই হাদিসগুলো শোনার সময় তার চোখের সামনে এ দৃশ্যটি মোটেও ভাসেনা যে, তখনকার পরিস্থিতি এমন হবে যে-
দিনের পর দিন নয় বরং সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে যাবে রুটির একটা টুকরোও জুটবে না। অনাহার মানুষকে কাহিল করে তুলবে। পানির অভাবে কন্ঠনালীতে কাঁটা বিঁধবে। খাদ্য ও পানির তালাশে কয়েক দিন যাবত পথে পথে ঘুরে নিরাশ হয়ে আপনি যখন ঘরে ফিরে আসবেন তখন দেখতে পাবেন আপনার কলিজার টুকরো যে সন্তানটির একটিমাত্র ইশারাতে তার প্রতিটি বাসনা ও দাবি পূরণ হয়ে যেত, আজ তীব্র ক্ষুধা ও পিপাসায় তার জীবনটা বের হয়ে গেছে। ছেলের মরা মুখটি দেখে আপনার অন্তর খাঁ খাঁ করে উঠল। কিন্তু আপনি অসহায়, অক্ষম। কষ্ট সহ্য করতে না পেরে সন্তানের দিক থেকে আপনার মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু যেদিকে তাকালেন অদিকে পড়ে আছে আক্ষেপ আর যন্ত্রণার আরেকখানি প্রতিচ্ছবি -মা, হ্যাঁ আপনার গর্ভধারিণী আম্মাজান। সেই মা যিনি আপনাকে ক্ষুধার্ত পেটে কোনদিন ঘুমুতে দেননি। যিনি আপনার ইঙ্গিতেই আপনার পিপাসার কথা বুঝে ফেলতেন। যিনি নিজের সমস্ত সুখ-আহ্লাদকে আপনার জন্য কুরবান করে দিয়ে ছিলেন। আজ আপনার সেই মা চোখের দৃষ্টিতে হাজারো প্রশ্ন ভরে নিয়ে যুবক পুত্রের দিকে তাকিয়ে আছেন এই আশায় যে, বাছা আমার আজ এক টুকরো রুটি এক কাতরা পানি কোথাও থেকে সংগ্রহ করে এনেছে। কিন্তু পুত্রের মুখের লেখা পড়তে সক্ষম মা আপনার মুখাবয়বের লেখা জবাবটা পড়ে নিলেন। পুত্রের অসহায়ত্বের ফলে মায়ের চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আপনার কলিজাটা মুখে বেরিয়ে আসবার উপক্রম হলো। আপনি ভেতরে ভেতরেই ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে লাগবেন।।

পর্ব-১০
দাজ্জালের ফিতনার সরূপ!

কষ্টটা সহ্য করতে না পেরে এবার আপনি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এই আশায় যে, সম্ভবত ওদিকে কেউ নাই। কিন্তু না, আছে। ওখানে একজন পড়ে আছে- আপনার জীবন সফরের সঙ্গিনী। পরীক্ষার প্রতিটি মুহূর্তে যে আপনাকে সাহস যুগিয়েছেন। কিন্তু আজ ঠোঁট দুটো তার শুকনো। আর দেখতে না দেখতেই প্রেম আপনার অশ্রুতাপে গলে যেতে শুরু করল। অবশেষে আপনিও তো মানুষ। আপনার বুকেও তো গোশত পিণ্ডই ধুকধুক করে। সন্তানের স্নেহ, মায়ের মমতা ও স্ত্রীর প্রেম সবাই মিলে আপনার হৃদয়টাকে তামার মতো গলিয়ে দিল। কোথাও কোনো আশ্রয় নেই। কেউ নেই আপনার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াবার। কিভাবে থাকবে, প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি দরজায় এই একই দৃশ্য। কেউ নেই সাহায্য করবার- সকলেরই সাহায্য দরকার।
এমন সময় বাইরে থেকে সুস্বাদু খাবারের সুঘ্রাণ আর সুমিষ্ট পানির কলকল শব্দ কানে ভেসে এল। আপনি ও আপনার পরিজন সবাই দৌড়ে বাইরে গেলেন। মনে হল কষ্টের দিন বুঝি শেষ হয়ে গেছে। মানুষের এই বনে কোন মাসিহা এসে পড়েছেন। আগত মাসিহা ঘোষণা করেছে, ক্ষুধা পিপাসায় কাতর লোকেরা! এই সুঘ্রাণযুক্ত সুস্বাদু খাবার তোমাদেরই জন্য।
ঘোষণাটি শোনামাত্র আপনার, আপনার পরিজন ও নগরীর অন্যান্য বাসিন্দাদের আধা জীবন যেন এমনিতেই ফিরে এসেছে। মাসিহা আবার বলতে শুরু করল, এই সবকিছুই তোমাদের জন্য। কিন্তু তোমরা কি বিশ্বাস কর যে, এই খাবার ও পানির মালিক আমি? তোমরা কি এই বাস্তবতাকে স্বীকার করছ যে, এই সবকিছু আমার অধীনে?
এই দ্বিতীয় ঘোষণাটি শোনার পর খাবার পানির প্রতি অগ্রসরমান আপনার পা কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল। আপনি কিছু ভাবতে শুরু করলেন। আপনার স্মৃতি বলল, এই শব্দগুলো তো চেনা চেনা মনে হচ্ছে। আপনার মনে পড়ে গেল এই মাসিহাটা কে? কিন্তু সেই মুহূর্তে পেছন থেকে আপনার সন্তানের কান্না তীব্র হতে লাগল। মায়ের আর্তনাদ কানে এসে বাজল। স্ত্রীর করুণ আহাজারিতে কান ভারী হতে লাগল। আপনি ছুটে গেলেন। আপনার কলিজার টুকরো- আপনার সন্তানটি মৃত্যু ও জীবনের মাঝে ঝুলছে। যদি কয়েক ফোঁটা পানি জুটে যায় তাহলে শিশুটির জীবন বেঁচে যেতে পারে।
এখন একদিকে আপনার সন্তান, মা ও স্ত্রীর ভালোবাসা, অপরদিকে ঈমান বিধ্বংসী একটি প্রশ্নের জবাব। একদিকে আনন্দপূর্ণ ঘর, অন্যদিকে বিলাপের আসর। যেন একদিকে আগুন, অন্যদিকে মনমাতানো ফুল বাগান।
বলুন, বিবেকের বন্ধ জানালাগুলো খুলে দিয়ে ভাবুন, বিষয়টি কি এতই সহজ, যতটা আপনি মনে করছেন? বরং তখনকার পরিস্থিতি হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ফেতনা।

পর্ব-১১
দাজ্জালের ফিতনা সমূহ!

হযরত আসমা বিনতে ইয়াযীদ (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে অবস্থানরত ছিলেন। তখন তিনি দাজ্জাল সম্পর্কে কিছু কথা বললেন। তিনি বলেছেন, তার ফেতনাসমূহের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ফেতনাটি এই হবে যে, সে এক গ্রাম্য লোকের নিকট আসবে এবং বলবে, তোমার খেয়াল কি; আমি যদি তোমার মৃত উটটি জীবিত করে দেই তাহলে কি তুমি মেনে নিবে আমি তোমার রব? গ্রাম্য লোকটি বলবে, হ্যা। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তারপর শয়তানরা তার মৃত উটটিকে ঠিক আগের মত বরং তার চেয়েও উত্তম- যেমন দুগ্ধদায়িনী ভরাপেট ছিল বানিয়ে দিবে।
অনুরূপভাবে দাজ্জাল এমন এক ব্যক্তির নিকট আসবে যার পিতা ভাই মারা গেছে। তাকে বলবে, তোমার ধারণা কি; আমি যদি তোমার বাপ ও ভাইকে জীবিত করে দেই তাহলে কি তুমি মেনে নিবে আমি তোমার রব? উত্তরে সে বলবে, কেন নয়? ফলে তারপর শয়তানরা লোকটির পিতা ভাইয়ের আকৃতিতে এসে হাজির হবে। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৩৫]
আবু উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল এক গ্রাম্য লোকের কাছে এসে বলবে, আমি যদি তোমার মৃত পিতা-মাতাকে জীবিত করে দেই তাহলে আমাকে প্রভু বলে মেনে নিতে তোমার কোন আপত্তি থাকবে? গ্রাম্য লোকটা বলবে, না। অতঃপর দুটি শয়তান তার মা বাবার রূপ ধারণ ধরে তাকে বলবে, হে সন্তান! একে অনুসরণ কর, সেই তোমার প্রভু। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৪০৬৭)
হযরত হুযায়ফা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি দাজ্জালের বিষয়টি বারবার এজন্য বর্ণনা করছি, যেন তোমরা বিষয়টিতে গভীর মনোযোগ দিয়ে চিন্তা ভাবনা কর, সচেতন হও, সে অনুযায়ী কাজ কর এবং বিষয়টি তোমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আলোচনা কর। কারণ, দাজ্জালের ফিতনা ভয়াবহতম একটি ফিতনা।।

পর্ব-১২
হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল দাবি করবে আমি বিশ্বজগতের রব এবং আকাশের সূর্যটা আমার কথামতই চলছে। তোমরা কি চাও আমি একে থামিয়ে দেই? তার কথায় সূর্য থেমে যাবে। এমনকি একটি দিন মাস ও সপ্তাহের সমান হয়ে যাবে। এবার সে বলবে তোমরা কি চাও আমি এটিকে আবার চালিয়ে দেই? লোকেরা বলবে, হ্যা দিন। তখন দিন ঘন্টার সমান হয়ে যাবে।
তার কাছে এক মহিলা এসে বলবে, হে আমার রব, আপনি আমার পুত্র এবং স্বামীকে জীবিত করে দিন। তখন শয়তানরা তার পুত্র ও স্বামীর আকৃতিতে এসে হাজির হবে। মহিলা শয়তানকে গলায় জড়িয়ে ধরবে এবং তার সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হবে। মানুষের ঘরগুলো শয়তানদের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে যাবে।
এক গ্রাম্যলোক দাজ্জালের নিকট আসবে এবং বলবে, হে আমাদের রব, আপনি আমাদের জন্য আমাদের বকরীগুলোকে জীবিত করে দিন। দাজ্জাল তাদেরকে বকরীর আকৃতিতে কতগুলো শয়তানকে দিয়ে দিবে। এই পশুগুলো ঠিক সেই বয়স ও সেই শরীর স্বাস্থ্যের হবে যেমনটি তাদের মৃত বকরিগুলো ছিল। এসব দেখে গ্রামের লোকজন বলবে, সে যদি আমাদের রব না হত তাহলে আমাদের মৃত বকরিগুলোকে কোনোভাবেই জীবিত করতে পারতো না।
দাজ্জালের সঙ্গে ঝোল ও গোশতওয়ালা হাড়ের পাহাড় থাকবে। যেগুলো সবসময় গরম থাকবে, কখনো ঠান্ডা হবে না। প্রবাহমান নদী থাকবে। একটি পাহাড় থাকবে ফল ও সবজির বাগানের। একটি পাহাড় থাকবে আগুন ও ধোঁয়ার। (এগুলো তার সাথে সাথে চলবে।) সে বলবে এটি আমার জান্নাত আর এটি আমার জাহান্নাম। এগুলো আমার খাদ্য এবং এগুলো আমার পানীয়। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৩]
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল আবির্ভাব করবে। তখন কিছু মানুষ তার অনুসারী হয়ে যাবে। তারা বলবে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি দাজ্জাল নিঃসন্দেহে কাফের। তবে তার খাদ্য ভান্ডার থেকে খেতে এবং তার বাগানে পশুপাল চড়াতে তার অনুসারী হয়েছি। পরবর্তী সময়ে যখন আল্লাহর গজব নাজিল হবে, তা তাদের সকলের উপর নাজিল হবে। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৬]
আজ মুসলমান এই হাদিসগুলোতে চিন্তা করে না। যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে গোটা সুরতহাল স্পষ্ট হয়ে যাবে। আজও কি এমনটি হচ্ছে না যে, বাতিলের জালিমের পরিচয় জানা সত্বেও অর্থনৈতিক বা অন্য কোন স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মুসলমান এদের সঙ্গ দিচ্ছে, সহযোগিতা দিচ্ছে কিংবা নীরব দর্শকের ভুমিকা পালন করছে?

পর্ব-১৩
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- দাজ্জাল মক্কা ও মদিনার কাছে গিয়ে বিকট শব্দে চিৎকার দিবে। ফলে সেখানে তিনবার ভুমিকম্প হবে। এই ভুমিকম্পের কারণে মক্কা ও মদিনায় বসবাসরত সকল মুনাফিক পুরুষ ও নারী নিজেদের জান বাঁচাতে সেখান থেকে বেরিয়ে যাবে। তারা দাজ্জালের সঙ্গী হয়ে যাবে।
এক তথ্য সংগ্রহকারী মুসলমান মুসলমানদের এই দলটির কাছে আসবে, যারা কস্তুনতুনিয়া (বর্তমান ইস্তাম্বুল) জয় করেছে এবং যাদের সঙ্গে বাইতুল মুকাদ্দাসের মুসলমানদের সম্প্রীতি থাকবে। বলবে অচিরেই দাজ্জাল তোমাদের কাছে এসে পৌঁছাবে। শুনে মুজাহিদগণ বলবে, আসুক আমরা তার সাথে যুদ্ধ করব। তুমিও আমাদের সঙ্গে থাকো। দূত বলবে, না। বরং আমাকে অন্যদেরও সংবাদটা পৌঁছাতে হবে। কিন্তু এই লোকটি যখন রওনা হবে দাজ্জাল তাকে ধরে ফেলবে এবং করাত দ্বারা চিড়ে টুকরো টুকরো করে মেরে ফেলবে।
তারপর দাজ্জাল জনতাকে লক্ষ্য করে বলবে, আমি যদি এই লোকটিকে তোমাদের সামনে জীবিত করে দেই তাহলে কি তোমরা বিশ্বাস করবে আমি তোমাদের রব? জনতা বলবে, আমরা তো আগে থেকেই জানি আপনি আমাদের রব। তারপরও এই বিশ্বাসটিকে পাকাপোক্ত করার জন্য দাজ্জাল লোকটিকে জীবিত করে তুলবে। লোকটি আল্লাহর ইচ্ছায় দাঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু মহান আল্লাহ এই লোকটি ছাড়া আর কারো ক্ষেত্রে দাজ্জালকে এই শক্তি দেবেননা যে, কাউকে হত্যা করে সে আবার জীবিত করবে।
তারপর দাজ্জাল মুসলিম দূতকে বলবে, আমি কি তোমাকে হত্যা করে জীবিত করিনি? কাজেই আমি তোমার রব। উত্তরে দূত বলবে, এখন তো আমি আরও নিশ্চিত হয়েছি যে, আমিই সেই ব্যক্তি যার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুসংবাদ দিয়েছেন যে, তুমি আমাকে হত্যা করবে এবং পরে আল্লাহর ইচ্ছায় জীবিত করবে। আর আল্লাহ আমাকে ছাড়া আর কাউকে জীবিত করবেন না। তারপর উক্ত দূতের গায়ে তামার চাদর জড়িয়ে দেওয়া হবে, যার ফলে দাজ্জালের কোন অস্ত্র তার উপর ক্রিয়া করবে না। না তরবারি, না ছুরি, না পাথর, না অন্য কোন অস্ত্র। ফলে দাজ্জাল বলবে একে আমার জাহান্নামে নিক্ষেপ করো। আল্লাহ দাজ্জালের আগুনের পর্বতটাকে সবুজ শ্যামল বাগানে পরিনত করে দেবেন। (কিন্তু লোকজন মনে করবে ওকে আগুনের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে।) মানুষ সংশয়ে নিপতিত হবে। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৩]

চলবে

বলকান কসাই: বসনিয়া যুদ্ধে গণহত্যার নেতৃত্ব দেয়া তিন খলনায়ক

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নৃশংসতার কথা তখন অনেকেই ভুলে গেছে। এর অস্তিত্ব তখন বইয়ের পাতায়, সিনেমার রূপালি পর্দায় কিংবা সামরিক জাদুঘরের ক্যাবিনেটে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিলো। ইউরোপের বড় রাষ্ট্রগুলো তখন শান্তিপূর্ণভাবে একজোট হয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছিলো। ঠিক তখন ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি যুগোস্লোভিয়াতে বিভক্তির গুঞ্জন শুরু হয়। যুগোস্লোভিয়ার রাষ্ট্রনায়ক মার্শাল টিটোর মৃত্যুর পর দেশটি বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর মাধ্যমে সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, মেসিডোনিয়া, বসনিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু ভিন্ন জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ দেখা দেয়। আঞ্চলিক নেতারা সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। ফলে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে এক নৃশংস গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

১৯৯১ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ চলে কয়েক বছর জুড়ে। যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে জন্ম নেয় এক অভিশপ্ত ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের খলনায়কদের মধ্যে প্রথম যে তিনজনের নাম মনে আসে তারা হলো স্লোবোদান মিলোসেভিচ, রাদোভান কারাদজিচ এবং রাতকো ম্লাদিচ। উগ্র জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী এই তিন সার্ব নেতার হাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। ইতিহাসের পাতায় এদেরকে একসাথে ‘বলকান কসাই’ নামে ডাকা হয়।

সাবেক সার্বিয়ার রাষ্ট্রপতি স্লোবোদান মিলোসেভিচ

শুধুই সার্ব’ মতবাদের বিশ্বাসী রাষ্ট্রপতি মিলোসেভিচ

১৯৮৭ সালে যুগোস্লোভিয়ার অন্তর্গত রাজ্য কসোভো পরিদর্শনে যান সার্ব নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচ। তৎকালীন কসভোর অধিকাংশ নাগরিক ছিলো আলবেনীয় বংশোদ্ভূত। তারা সার্বদের উপর পৈশাচিক নির্যাতন চালাতো। রাজ্যের সংখ্যালঘু সার্বরা মিলোসেভিচের আগমনে আশার আলো খুঁজে পায়। তারা একজোট হয়ে তাদের নেতার সাথে দেখা করতে যায়। তারা মিলোসেভিচের হোটেলের ফটকের সামনে বিভিন্ন ব্যানার নিয়ে ভিড় করে। একপর্যায়ে পুলিশ তাদের উপর লাঠিচার্জ করে। ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে সার্বরা। মিলোসেভিচ এই ঘটনায় ক্ষুদ্ধ হয়ে পড়েন। তিনি সার্বদের অধিকার রক্ষার্থে কসভোতে বিশাল সমাবেশের আয়োজন করেন। সমাবেশে তিনি সার্বদের অধিকার আন্দোলনকে সমর্থন করেন এবং ঘোষণা করেন, “From now on, no one has the right to beat you”।হাজার হাজার সার্ব সেদিন মিলোসেভিচের বক্তব্যে নতুন আশার আলো খুঁজে পায়। পরবর্তীতে যুগোস্লোভিয়া ভাঙনের ফলে গঠিত নতুন রাষ্ট্র সার্বিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন মিলোসেভিচ। কসোভোতে সার্বদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের সমর্থন করায় সার্বরা তাকে বিপুল ভোটে জয়ী করে। শুরু হয় কুখ্যাত মিলোসেভিচের শাসন।

তিনি প্রথমেই তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইভান স্তাম্বোলিচকে হত্যা করেন। তার রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি ছিলো ‘শুধুই সার্ব, বৃহত্তর সার্বিয়ার লক্ষ্যে’। সার্বিয়ার সাথে স্লোভেনিয়া এবং ক্রোয়েশিয়া নামক আরো দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। স্লোভেনিয়াতে কোনো সার্ব বসবাস করতো না। তাই মিলোসেভিচ স্লোভেনিয়ার প্রতি আগ্রহী ছিলেন না। তার কুনজর পড়ে ক্রোয়েশিয়ার উপর। সেখানে সংখ্যালঘু সার্বরা নতুন রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে অপারগতা প্রকাশ করলে মিলোসেভিচ তাদের পক্ষ নিয়ে ক্রোয়েশিয়ার সাথে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। মিলোসেভিচের কাছে ক্রোটদের গুরুত্বপূর্ণ নগরী ভুকুবারের পতন ঘটে। সার্বরা ভুকুবারের হাজার হাজার ক্রোটদের নির্বিচারে হত্যা করে। কী ছিলো তাদের অপরাধ? তাদের অপরাধ তারা সার্বিয়ার নাগরিক নন।

বসনিয়ায় হত্যাকাণ্ড;

মিলোসেভিচের সৈনিকরা ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। মর্ত্যের বুকে নেমে আসে নরকের অভিশাপ। মিলোসেভিচের পরবর্তী আগ্রাসনের শিকার হয় নব্য রাষ্ট্র বসনিয়া এবং হার্জেগোভিনা। বসনিয়া যুদ্ধে তার সাথে হত্যাযজ্ঞে অংশ নেন অপর দুই কুখ্যাত নেতা রাদোভান কারাদজিচ এবং রাতকো ম্লাদিচ।

সারায়েভো গণহত্যার পর শহর পরিদর্শনে কারাদজিচ;

সার্বিয়া রক্ষার্থে গণহত্যাকে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে মনে করতেন তৎকালীন বসনিয়া-সার্ব অঞ্চলের রাষ্ট্রপ্রধান রাদোভান কারাদজিচ। দ্বিতীর বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যার কারিগর মানুষরূপী পিশাচ কারাদজিচ। স্লোবোদান মিলোসেভিচের মতো তিনিও ছিলেন উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা। বসনিয়ার গৃহযুদ্ধে তিনি নির্বিচারে নিরীহ নারী, শিশুসহ লক্ষাধিক নাগরিক হত্যা করেন। তাকে আড়ালে ডাকা হতো ‘বসনিয়ার কসাই’ এবং ‘বলকানের কসাই’ হিসেবে।

রাদোভান কারাদজিচ একজন আত্মকেন্দ্রিক নেতা। তিনি কিছু কবিতাও রচনা করেন। তার কবিতার ভাষায় ফুটে উঠেছে তার উগ্রতা। একটি কবিতায় তিনি নিজেকে ‘লৌহমানব’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার প্রচণ্ড ক্ষমতার নেশা ছিল। ১৯৯২ সালে তিনি বসনিয়া এবং হার্জেগোভিনার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার শাসনামলে বসনিয়ায় বসবাসরত মুসলিম এবং ক্রোটদের সাথে সার্বদের দ্বন্দ্ব বেঁধে যায়।

কারাদজিচ বসনিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা সারায়েভো অবরোধের আদেশ দেন। ৪৪ দিনব্যাপী অবরুদ্ধ সারায়েভোতে কারাদজিচের নির্দেশে নির্বিচারে মুসলিম হত্যা করা হয়। ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১,৫০০ শিশুসহ ১০ হাজারের মতো মুসলিম হত্যা করা হয়।

বিশ্বের অন্যান্য কুখ্যাত নেতা থেকে কারাদজিচ একদিক দিয়ে আলাদা। কারণ তিনি একটি নয়, দুটি গণহত্যার খলনায়ক। নিষ্ঠুর কারাদজিচের পরবর্তী শিকার হয় আরেক মুসলিম অধ্যুষ্যিত অঞ্চল স্রেব্রেনিৎসা। এই গণহত্যার নেতৃত্ব দেন কারাদজিচের অধীনস্থ সামরিক অধিনায়ক রাতকো ম্লাদিচ।

স্রেব্রেনিৎসার খলনায়ক রাতকো ম্লাদিচ

স্রেব্রেনিৎসার খলনায়ক রাতকো ম্লাদিচ

উগ্র রাষ্ট্রপ্রধান কারাদজিচ এবং মিলোসেভিচের সবচেয়ে বড় মিত্র ছিলেন বসনিয়া যুদ্ধে বসনিয়া-সার্ব সামরিক অধিনায়ক রাতকো ম্লাদিচ। তিনি নিজে আগ্রাসনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন। সারায়েভোর গণহত্যায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করার ফলে তাকে আরেকটি গণহত্যার দায়িত্ব প্রদান করেন কারাদজিচ। স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা জার্মান হলোকাস্টের পর ইউরোপে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে ম্লাদিচ তার বাহিনী নিয়ে স্রেব্রেনিৎসা অবরোধ করেন। শহরের সাথে পুরো বসনিয়ার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এরপর সুসজ্জিত সামরিক বাহিনী নিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন নিরীহ মুসলিমদের উপর।

স্রেব্রেনিৎসায় প্রায় ৮ হাজার মুসলিমকে হত্যা করা হয়। কারাদজিচ এবং মিলোসেভিচের লক্ষ্য ছিলো এই অঞ্চল থেকে নন-সার্ব জাতিদের বিতাড়িত করা। গণহত্যার পর ম্লাদিচ তার সৈনিকদের শহর থেকে নন-সার্বদের তাড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন।

প্রায় ২০ হাজার মুসলিম নারী এবং শিশুকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। সার্বসেনারা বসনিয়ান মুসলিম এবং ক্রোট নারীদের ধর্ষণ করার মতো ঘৃণ্য অপরাধে লিপ্ত হয়। ম্লাদিচের নির্দেশে হাজার হাজার ক্রোট এবং মুসলিম নাগরিককে বন্দী করা হয়।

এভাবে তিনজন কসাইয়ের আগ্রাসনের ফলে বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপে মানবতার চূড়ান্ত পতন ঘটে। বলকান কসাইত্রয়ীর পাশবিকতায় প্রাণ হারায় হাজারো নিরীহ নাগরিক।

স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যায় নিহতদের লাশের ভিড়ে নিজের সন্তানকে খুঁজছেন এক মা

যুদ্ধাপরাধে মামলা দায়ের এবং গ্রেফতার

১৯৯৯ সালের মে মাসে বসনিয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত সংগঠন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে প্রধান আসামী হিসেবে স্লোবোদান মিলোসেভিচ, রাদোভান কারাদজিচ এবং রাতকো ম্লাদিচের নাম উল্লেখ করা হয়।

ওদিকে গৃহযুদ্ধ অবসান হওয়ার পর, সার্বিয়ায় মিলোসেভিচের জনপ্রিয়তা কমে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি চলে যায়। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। কিন্তু ক্ষমতালোভী মিলোসেভিচ ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন। সার্বিয়ার জনগণ মিলোসেভিচের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। মাসব্যাপী আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন তিনি। যে সার্বদের জন্য তিনি এতো হত্যাযজ্ঞ করলেন, শেষপর্যন্ত তারাই তার বিরুদ্ধে পথে নামলো। তিনি এতোটাই হতাশ হয়ে পড়েন যে, বাড়ি ফিরে নিজের স্ত্রীকে হত্যা করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে পুলিশ এসে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।

২০০২ সালে তাকে নেদারল্যান্ডসের দি হেগ শহরে আন্তর্জাতিক আদালতের হাতে হস্তান্তর করা হয়। শুরু হয় মিলোসেভিচের বিচার। তিনি সেখানেও দর্পের সাথে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। বিচারকার্য শেষ হবার আগেই ২০০৬ সালে মিলোসেভিচ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কারাগারে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মিলোসেভিচকে গ্রেফতার করা গেলেও বাকি দুজন বলকান কসাই তখন পলাতক। FBI, CIA, Interpol সহ পৃথিবীর বিখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর Most Wanted List-এর শীর্ষে চলে আসে তাদের নাম। তাদের ধরিয়ে দিতে পারলে প্রায় ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়।

প্রায় ১৩ বছর পালিয়ে বেড়ানোর পর বেলগ্রেডের এক মফস্বল থেকে ধরা পড়েন রাদোভান কারাদজিচ। তিনি সেখানে একজন চিকিৎসকের ছদ্মবেশে বহুদিন ধরে বাস করছিলেন। তার বিরুদ্ধে দুটি গণহত্যা, পাঁচটি মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড, চারটি যুদ্ধাপরাধ এবং একটি জেনেভা চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়েছিলো।

মিলোসেভিচের মতোই কারাদজিচ নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তার মতে যুদ্ধাপরাধের দায় সংশ্লিষ্ট সামরিক অধিনায়কদের উপর বর্তায়। কিন্তু মামলায় তিনি হেরে যান। তাকে ৪০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

কারাদজিচের বিচার চলমান অবস্থায় ধরা পড়েন শেষ পলাতক কসাই রাতকো ম্লাদিচ। তিনি উত্তর সার্বিয়ার একটি গ্রামে লুকিয়ে ছিলেন। ম্লাদিচের বিরুদ্ধেও কারাদজিচের অনুরূপ অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছিলো। তিনি দি হেগে বিচারকার্য চলার সময় কোর্টের নিয়ম বহির্ভূত আচরণ করে সমালোচনার মুখে পড়েন। তাকে ২০১১ সালে প্রথম বিচারের জন্য আদালতে হাজির করা হয়। তিনি কোর্টে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ‘বানোয়াট’ বলে দাবি করেন। এরপর তিনি অসুস্থতার দোহাই দিয়ে ২০১২ সালের জুলাই পর্যন্ত বিচারকার্য স্থগিত রাখেন। এখন পর্যন্ত তার বিচারকার্য চলছে।

বসনিয়া যুদ্ধে বলকান কসাইদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বিশ্বমানবতার জন্য এক কালো অধ্যায়। কিন্তু অপরাধ করে কেউ ছাড় পেতে পারে না। পৃথিবীর বুকে সকল অত্যাচারী নেতার পতন ঘটেছে। তাদের অহংকার ধূলিস্যাৎ হয়েছে ন্যায়ের হাতে। বলকান কসাইদের গ্রেফতার এবং বিচারকার্য পরিচালনা যেন তাই প্রমাণ করে। আর যেন পৃথিবীর বুকে নতুন করে স্রেব্রেনিৎসার অভিশাপ ফিরে না আসে, সেদিকে লক্ষ্য রেখে বিশ্বনেতাদের একসাথে কাজ করতে হবে। কারণ মানবতাহীন মানবজাতি পশুর সমান।

ফিচার ইমেজ: The Japan Times

যেভাবে ইংরেজরা খুবলে খেয়েছিল উপমহাদেশ ও বাংলার অর্থনীতি


সুপ্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল স্বাধীন রাজা-বাদশাহদের শাসনাধীন। ইংরেজ শাসন শুরুর পূর্বে ভারতভূমি কখনও পরাধীন ছিল না। দ্রাবিড়, আর্য, আরব, ইরানী, পাঠান, মুঘল, তুর্কি- অর্থাৎ বহিরাগত যারাই এই ভূমিতে রাজনৈতিক কারণে পা রেখেছে, তারাই একে আপন করে নিয়েছে; ভারতের আলো মেখে এর বাতাসে মিশে গেছে। এমনকি দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডার যখন ভারত আক্রমণে আসেন, তখন তার কয়েকজন সেনানায়ক এ দেশের জলবায়ু ও ধনসম্পদে মুগ্ধ হয়ে এখানেই বসতি স্থাপন করেন। এর ব্যতিক্রম হয় অর্থনৈতিক কারণে আগত ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের বণিকদের বেলায়।

ভাস্কো ডা গামার ভারত প্রবেশের জলপথ আবিষ্কারের পর পর্তুগিজ বণিকরা এদেশে একচেটিয়া বাণিজ্য শুরু করে ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে তাদের পথ ধরে আসে ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইংরেজরা। সুঁচ হয়ে ঢোকা এই ইংরেজরা একসময় ফাল হয়ে বেরিয়ে এসে ইতিহাস গড়ে। এককালের আশ্রিত এই বিদেশিরাই একসময় হয়ে ওঠে গোটা ভারতবর্ষের প্রভু। ১৬১৮ সালে বার্ষিক এককালীন তিন হাজার টাকার বিনিময়ে ইংরেজদের বিনা শুল্কে এদেশে বাণিজ্যের অনুমতি দানের মধ্যেই এই ট্রাজেডির বীজ নিহিত ছিল। সম্রাট শাহজাহানের সাথে ইংরেজ দূত টমাস রো’র করা এই চুক্তিই গঙ্গা অববাহিকায় ইংরেজদের লোলুপ দৃষ্টি প্রসারে সহায়ক ছিল। সুদীর্ঘ ইংরেজ শাসনকালে উপমহাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলের সাথে সাথে বদলে যায় এর অর্থনৈতিক অবস্থা। আর এর জন্য দায়ী ইংরেজদের ব্যাপক লুণ্ঠন ও শোষণ। চলুন জানা যাক, ঠিক কীভাবে অত্যাচার ও নিপীড়নের মাধ্যমে ভারতবর্ষের অর্থনীতিকে তারা ধ্বংস করে।
১৫৯৯ সালে কয়েকজন ইংরেজ ব্যবসায়ী মাত্র ৩০ হাজার পাউন্ডের ক্ষুদ্র মূলধন নিয়ে গঠন করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তৎকালীন মুদ্রামান অনুযায়ী, তা ২৫ হাজার ভারতীয় রুপির চেয়েও কম ছিল। এর পরের বছর রানী এলিজাবেথের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ভারতের সাথে তারা বাণিজ্য শুরু করে। ১৬১২ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমতিতে তৎকালীন ভারতের প্রধান সমুদ্র বন্দর সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে তারা। সুরাটে তখন আরও অনেক ভারতীয় ব্যবসায়ী ছিলেন, যাদের একেকজনের মূলধন পুরো ইংরেজ কোম্পানীর চেয়ে কয়েকশত গুণ বেশি ছিল। ইংরেজদের দৈন্যদশা দেখে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা তাদের করুণার দৃষ্টিতে দেখতেন এবং তাদের মোটেও গুরুত্ববহ মনে করতেন না। এই গুরুত্বহীন, করুণার পাত্র, নামমাত্র মূলধন নিয়ে ব্যবসা করতে আসা ইংরেজগণ একদা পুরো উপমহাদেশের শাসনক্ষমতা দখল করে নিল। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রহসনমূলক যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে পুরো ভারতবর্ষে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করে ইংরেজরা। তারা প্রলুব্ধ হয়েছিল শুধুমাত্র এদেশের সম্পদ দ্বারা। আর তাই সুদীর্ঘকালের শাসনামলে ভারতবর্ষের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়ে যায় তারা।
পলাশীর যুদ্ধের পর মুর্শিদাবাদে রাজকোষ ও রাজপ্রাসাদ লুণ্ঠিত হয়, সরকার দেউলিয়া হয়ে পড়ে। হিন্দু জমিদার ও চাকলাদারদের অর্থে তখন সরকার পরিচালিত হতো। গদি লাভের জন্য ইংরেজদের দাবি অনুযায়ী ঘুষ সংগ্রহ করার জন্য মীর জাফর ও মীর কাসিম রাজস্ব বাড়িয়ে দেন। নবাবের এসব রাজস্ব বৃদ্ধির অজুহাতে জমিদাররা প্রান্তিক মুসলিম প্রজা ও রায়তদের উপর বহুগুণে খাজনা বাড়িয়ে দেয়। দেশব্যাপী শুরু হয় অরাজকতা। কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যে দেখা দেয় অস্থিতিশীল অবস্থা। একইসাথে, বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অন্য বিদেশি বণিকদের বাংলাছাড়া করে ইংরেজরা রেশম, মসলিন, সুতি কাপড়, চিনি, চাল, আফিম, সল্টপিটার প্রভৃতি পণ্য রপ্তানীর ক্ষেত্রে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। বাজার কুক্ষিগত করে এরা এসব পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিক রকম নামিয়ে দেয়।

ব্যবসায় ইংরেজদের সবচেয়ে বড় চারণক্ষেত্র ছিল আমাদের বঙ্গভূমি। সে সময় বাংলা থেকে কৃষিজ ও প্রাণিজ পণ্য বাদে শুধু মসলিন, মোটা সুতি বস্ত্র, রেশম ও রেশমী বস্ত্র ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানী করেই বছরে দশ-বারো হাজার কোটি টাকা আয় হতো। নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, কিশোর মিলিয়ে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতো এই বস্ত্রখাতে। এছাড়া ইউরোপে সল্টপিটার, ইস্ট ইন্ডিজে চাল, চীন ও জাপানে আফিম, আরব, ইরাক ও ইরানে লাল চিনি, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে মরিচ, আদা, দারুচিনি রপ্তানি হতো। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা শুধু বাংলা থেকেই হতো।
ইংরেজদের আধিপত্য বিস্তারের আগে উৎপাদকরা সরাসরি রপ্তানিকারকের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারতো। রপ্তানিমুখী অবাধ বাণিজ্য ছিল বাংলার অর্থনীতি ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য। ইংরেজদের হাতে রপ্তানির একচেটিয়া অধিকার চলে আসার পর প্রতিযোগিতার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। পণ্যের উৎপাদন খরচের চাইতে বিক্রয়মূল্য কমিয়ে দেয়া হয়। ওদিকে জমিদাররা রাজস্বের পরিমাণ চার-পাঁচগুণ বাড়িয়ে দেয়। এমন ভগ্ন অর্থনীতিতে বাড়তি রাজস্ব দিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যায় কৃষক ও কারিগরগণ।
স্বাভাবিক উৎপাদন হার কমে এলে ইংরেজরা হিন্দু জমিদার ও প্রশাসনিক কর্মচারীদের উৎপীড়ন ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে হিন্দু গোমস্তা, দালাল ও ফড়িয়াদের দ্বারা গ্রামে-গঞ্জে আড়ৎ-গদি প্রতিষ্ঠা করায় ও অত্যাচারের-নিপীড়নের মাধ্যমে উৎপাদন চালাতে বাধ্য করে। এরা থানার দারোগা, পরগণার শিকদার ও পাইক নামিয়ে বলপূর্বক দাদন দিতে বাধ্য করতো এবং চাবুক মেরে কম মূল্যে কাপড়, লবণ ও অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী বিক্রি করতে বাধ্য করতো। অত্যাচারের মাত্রাতিরিক্ততায় তাঁতীরা তাদের হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে ফেলে। মধ্যাঞ্চলের চাষীরা আসামের অরণ্যের দিকে পালিয়ে যায়। এভাবে বিশ্বঅর্থনীতির অবাধ ও প্রতিযোগিতামুখর একটি উৎপাদন ক্ষেত্রকে ইংরেজরা এক দাসত্বপ্রথামূলক নারকীয় যজ্ঞে পরিণত করে।
পলাশী যুদ্ধের পর টাকার অবমূল্যায়ন ও পাউন্ডের অধিমূল্যায়ন করা হয়। মুর্শিদ কুলি খাঁর চাইতে মীর জাফরের সময় বত্রিশগুণ বেশি কর ও খাজনা আদায় করা হয়। জমিদাররা এক কোটি ত্রিশ লাখ পাউন্ড খাজনা আদায় করে কোম্পানিকে দেয় আটত্রিশ লাখ পাউন্ড। অতিরিক্ত রাজস্ব ও খাজনার চাপে ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে উৎপাদক গোষ্ঠী। খাজনা আদায়ের ঝঞ্ঝাট এড়ানোর জন্য ইংরেজরা পরগনা নিলামে চড়াতে শুরু করে। নব্য হিন্দু কোটিপতিরা ইজারা দিয়ে বিঘাপ্রতি দু’টাকা বারো আনা খাজনা ধার্য করে। আলীবর্দি খানের সময় এই খাজনা ছিল মাত্র আট আনা। এভাবে ১৬৬০ পরগনার মধ্যে ১০০০ পরগনা হিন্দুদের হাতে দেয়া হয়। অত্যাচার-নিপীড়ন আর আর্থিক মন্দার কারণে চাষীরা এমনিই চাষ ছেড়ে দিয়েছিল, এর মধ্যে অনাবৃষ্টি আর খরায় ফসল এসেছিল কমে। এছাড়া খাদ্যশস্য উৎপাদনের ভূমিতে জোর করে অত্যধিক লাভজনক ব্যবসাপণ্য আফিম ও নীল চাষ করানোর কারণেও অনেক জমি উর্বরতা হারিয়ে ফেলে। আফিম যেত চীন ও জাপানে, আর ইউরোপে সেই সময় শিল্প বিপ্লব ঘটায় তুঙ্গে ছিল নীলের চাহিদা।

এমন অবস্থায় ১৭৭০ সালের মাঘ মাসে সারাদেশে ধান কিনে গুদামজাত করা শুরু হলে জন্ম নেয় দুর্ভিক্ষ। বাংলা ১৭৭৬ সালের এ মহাদুর্ভিক্ষ ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। মানব ইতিহাসে এমন ভয়াবহ এবং পুরোপুরি মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের কথা আর জানা নেই। বিশ্বের অন্যতম শস্যভাণ্ডার খ্যাত জনপদটির এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এই দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারায়। যারা বেঁচে থাকে, তাদের হাল হয় আরও খারাপ। কারণ এত বড় দুর্যোগেও ইংরেজরা কোনো সাহায্য না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকে, এমনকি খাজনা হ্রাসেরও তারা কোনো পদক্ষেপ নেয় না। বাংলার অপার সম্ভাবনার আধার কৃষক সমাজ এ দুর্ভিক্ষের ফলে সর্বহারা, দুর্গত এক শ্রেণীতে পরিণত হয়। ধনী হিন্দুরা নৌকা বোঝাই করে দুর্ভিক্ষের অনাথ বালকদের কলকাতায় এনে জড়ো করতো। সেখান থেকে ইংরেজরা তাদের ক্রীতদাস হিসেবে ইউরোপে চালান করে দিতো।
এ কাহিনী যেমন বেদনাদায়ক, তেমনি ক্রোধ ও প্রতিহিংসা সঞ্চারক। এমন অমানবিক ও বর্বর শাসন দুনিয়ার ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন। মাত্র ১৩ বছরের শাসনে পৃথিবীর তৎকালীন সমৃদ্ধ একটি জনপদ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে যেভাবে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়, তা নেহাত শাসকশ্রেণীর খামখেয়ালীর ফল। যারা সেই সময়টায় জীবিত ছিল, শুধু তারাই জানে আসলেই কতটা ভয়ানক ছিল সেই নারকীয় অভিজ্ঞতা। এই অর্থনৈতিক নিপীড়নের পথ ধরেই একসময় ভারতবাসীর মনে দানা বাঁধে স্বাধিকারের সাধ, আর সেখান থেকেই ক্রমে উপমহাদেশ এগিয়ে যায় স্বাধীনতার দিকে। মার্ক্স সত্যই বলেছেন, “এযাবৎকালের সকল সমাজ ব্যবস্থার ইতিহাস শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস।”

তথ্যসূত্র: উপমহাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিবৃত্ত; লেখক: সিরাজুল হোসেন খান (প্রকাশকাল ২০০২; পৃষ্ঠা: ১৫-১৮)

সার্জারির আবিষ্কারক ছিলেন একজন মুসলিম চিকিৎসক

প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন বিষয়ে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান অনস্বীকার্য। মধ্যযুগে সভ্য-পৃথিবী বিনির্মাণে তাদের ভূমিকা অকুণ্ঠভাবে স্বীকৃত। কর্ডোভার সোনালি যুগে বিখ্যাত শল্যচিকিৎসাবিদ আবুল কাসিম আল-জাহরাভির পৃথিবীকে উপহার দেন তার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘আত-তাসরিফ’। শল্যচিকিৎসায় আল-জাহরাভি কেমন পারদর্শী ও অভিজ্ঞ ছিলেন গ্রন্থটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
আল-জাহরাভির জন্ম ও বেড়ে ওঠাপুরো নাম আবুল কাসিম খালাফ ইবনুল আব্বাস আল-জাহরাভি। জাহরাভির জন্ম স্পেনের কর্ডোভার শহরতলীর প্রধান অংশ আল-জাহরায়। কারো মতে তিনি ৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ‘মদিনাতুজ জাহরা’য় জন্মগ্রহণ করেন। প্রসঙ্গত স্পেনের তৃতীয় খলিফা আবদুর রহমান আন-নাসির লিদিনিল্লাহ (৯৮৯-৯৬১ খ্রি) তার প্রিয়তমা ও মহীয়সী আল-জাহরার ইচ্ছানুসারে এই অপূর্ব সুন্দর নগরী নির্মাণ করেন। (আলী আশ-শাতশাত, তারিখুল জারাহা ফি-ত্তিব্বিল আরবি: ১/৭৫ দ্রষ্টব্য)php glass
ইউরোপে আল-জাহরাভি আল-বুকাসিস (Albucasis), বুকাসিস (Bucasis) ও আল-য়্যারভিয়াস (Alyaharvious) নামে পরিচিত। জাহরাভির পিতা-মাতা স্পেনের অধিবাসী ছিলেন।
আবুল কাসিম আল-জাহরাভি কর্ডোভার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন শাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা ও চিকিৎসা শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। শিক্ষা শেষে জাহরায় চিকিৎসাসেবা শুরু করেন।
শল্যচিকিৎসায় প্রথম থেকেই তিনি আশ্চর্যজনক সফলতা লাভ করেন। ফলে দ্রুত সবদিকে তার সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সফলতার স্বাক্ষর হিসেবে খলিফা আবদুর রহমান ও খলিফা আবুল হাকাম—উভয়েরই চিকিৎসক হিসেবে নিযুক্ত হন। কর্ডোভার বিখ্যাত হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক হিসেবেও নিয়োগ পান তিনি। তার ভুবনবিখ্যাত চিকিৎসাগ্রন্থ ‘আত-তাসরিফ’র মতো বিষয়বস্তু ও তত্ত্বনির্ভর এতো চমৎকার গ্রন্থ তৎকালীন যুগে আর কেউ লিখেনি। (ইবনে হাজাম, ফাদায়েলু আহলিল আন্দালুস: ২/১৮৫)
শল্যচিকিৎসা বিভাগের প্রভূত সংস্কার ও উন্নতি সাধন করেন। শেষ জীবনে আবুল কাসিম সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। জীবনসায়াহ্নে তিনি চিকিৎসাগ্রন্থ প্রণয়নে মনোনিবেশ করেন। বিভিন্ন মতামত অনুসারে ১০১৩ খ্রিস্টাব্দে আল-জাহরাতে তিনি ইন্তিকাল করেন। তার মৃত্যুর পর তার যশ-খ্যাতি অত্যধিক হারে স্পেন থেকে প্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
ছবি: সংগৃহীততার ব্যাপারে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও গবেষকরা বলেছেন, জাহরাভি স্পেনের আরব চিকিৎসাবিদদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শল্যবিদ ছিলেন। (ইবনু আবি উসাইবা, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, পৃষ্ঠা: ৫০১; ঐতিহাসিক হিট্টিও জোরালোভাবে এই মত ব্যক্ত করেন।)
ব্যক্তিজীবনে জাহরাভি ছিলেন সাদাসিধে ও ‘অল্পে তুষ্টি’ প্রকৃতির। চিকিৎসাবিদ্যা ও ঔষধ তৈরি ইত্যাদির প্রতি ভীষণ ঐকান্তিক ছিলেন। গরিব-দুঃখী ও অসুস্থদের সেবায় নিজের অধিকাংশ সময় ব্যয় করতেন। (মুহাম্মদ শাবান আইয়ুব, আবুল কাসিম আল-জাহরাভি, মাজা তারিফু আন আলমি জার্রাহিল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা?, আল-জাজিরা অ্যারাবিক, ২৫/০৮/২০১৯)পদার্থ, রসায়ন ও চিকিৎসা শাস্ত্রের উপর আল-জাহরাভি বিশটি গ্রন্থ রচনা করেন। কিন্তু পদার্থ ও রসায়নের উপর রচিত গ্রন্থ তাকে শ্রেষ্ঠত্বের সোপানে পৌঁছাতে সক্ষম হয় নি। চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থগুলোই তৎকালীন শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকের মর্যাদা দেয়। তার পদার্থ ও রসায়ন সংক্রান্ত গ্রন্থাবলী সম্পর্কে আলোচনা তেমন পাওযা যায় না।
চিকিৎসাবিষয়ক যে গ্রন্থটি তাকে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে সেটি হলো ‘কিতাবুত তাসরিফ লিমান আজিযা আনিত তা’লিফ। এই গ্রন্থটি ৩০টি অধ্যায়ে শিক্ষাগত (Educational) ও কার্যকরী (Effective) বিস্তৃত। প্রথম খণ্ডে এনাটমি (Anatomy), ফিজিওলজি (physiology) ও ডায়াটেটিকস (Dietetics) নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। (বিস্তারিত দেখুন: আবদুল মওদুদ, মুসলিম মনীষা, পৃষ্ঠা: ৭৯)
আল-জাহরাভির গ্রন্থে চিকিৎসার বিভিন্ন যন্ত্রের ছবি।দ্বিতীয় খণ্ডে বিশেষত সার্জারি (Surgery) সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। গ্রন্থটিকে অধ্যাপক সারটন ‘Medical Encyclopedia’ নামে অভিহিত করেছেন। এর চিকিৎসার অংশের চেয়ে সার্জারীর অংশ সর্বদিক দিয়ে উন্নত ও মৌলিকতার পরিচায়ক হলেও চিকিৎসার অংশেও মৌলিকতার অভাব নেই। ঔষধ তৈরি করতে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অনুসরণে পতন (Distillation) ও ঊর্ধ্বপাতন (sublimation) প্রথা প্রয়োগ করেছেন। (বিস্তারিত দেখুন: আবদুল মওদুদ, মুসলিম মনীষা, পৃষ্ঠা: ৭৯-৮০)
এসব দিক বিবেচনায় গ্রন্থটিকে অভিনব বলা চলে। এছাড়াও গ্রন্থটির দ্বিতীয় খণ্ডে বা কার্যকরী-সার্জারি অংশে রয়েছে অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্যবলী।
প্রথম সার্জারির প্রচলন করেন জাহরাভিঐতিহাসিকদের মতে জাহরাভিই সর্বপ্রথম চিকিৎসক যিনি ইউরোপে বৈজ্ঞানিক প্রথায় সার্জারির প্রচলন ও এর বিশদ বিবরণ প্রচার করেন।
সার্জারি খণ্ডের বিশেষত্ব হলো- এর মধ্যে সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে বিশেষ কোনো আলোচনা করা হয়নি, ফলে এটা এমনিতেই পরিপূর্ণ বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ খ-টি পৃথকভাবে চিত্রাদিসহ প্রকাশিত হয়। ডা. ক্যাম্পবেলের মতে, ‘এ হলো এ বিষয়ের সর্বপ্রথম স্বাধীন সচিত্রগ্রন্থ” (The first independent illustrated book on the subject) (আবদুল মওদুদ, মুসলিম মনীষা, পৃষ্ঠা: ৭৮)
জিরাল্ড কর্তৃক ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ‘আত-তাসরিফ’ গ্রন্থের সার্জারী খণ্ডটি জিরাল্ড ল্যাটিন ভাষায় মূল আরবিসহ প্রকাশ করেন। ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করে গ্রন্থটির নাম দেন ‘De Chirurgia’। এটি সালার্নো ও মন্টেপেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। (আকবর আলী, বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, পৃষ্ঠা: ৩৩৮)
এ গ্রন্থে ২০০ প্রকার সার্জারির যন্ত্রপাতির নমুনা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। গ্রন্থটি ইউরোপে কি পরিমাণ মর্যাদা লাভ করেছে, তা এর বারবার অনুবাদ থেকেই বোঝা যায়। ডা. ক্যাম্পবেলের মতে, গ্রন্থটি পরপর পাঁচবার ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। আর একথা সর্বসম্মত যে, তার এ গ্রন্থের প্রভাবেই ইউরোপে সার্জারির মান বিশেষভাবে উন্নীত হয়। (আবদুল আজিম আদ-দায়েব, আবুল কাসিম আল-জাহরাভি; আওয়ালু তাবিবিন –জার্রাহ- ফিল আম, পৃষ্ঠা: ৫৭)
আল-জাহরাভির চিকিৎসা। ছবি: সংগৃহীতজাহরাভির সচিত্র গ্রন্থের যে কয়েকটি পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়, তন্মধ্যে দুইটি রয়েছে অক্সফোর্ডের বডলিয়েন (Bodleian) লাইব্রেরিতে এবং অন্য একটি রয়েছে গোথাতে। জিরাল্ডের ল্যাটিন অনুবাদের একটি পাণ্ডুলিপি রয়েছে প্যারিসে। এতে তিনি গ্রন্থকারের নাম দিয়েছেন Abul Casim। কিছু পাণ্ডুলিপি ফ্লোরেন্স, ব্যামবার্গ, ফ্রাঙ্কয়েস, মন্টেপেলিয়ার, লিডেন ও ডেনিস রক্ষণাগারে সুরক্ষিত আছে। (আবদুল মওদুদ, মুসলিম মনীষা, পৃষ্ঠা: ৮০)
মেডিসিন বা ঔষধ বিষয়ে তার অবদানসার্জারির ক্ষেত্রে এই মহান মনীষীর অপরিসীম ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাফল্য হলেও মেডিসিন বা ঔষধ বিষয়েও যথেষ্ট অবদান পাওয়া যায়। তিনি কুষ্ঠরোগ ও এর প্রতিকার সম্বন্ধে তাঁর গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। তিনি অবস্থা বুঝে এ রোগের চিকিৎসা করতেন। এ রোগ সম্বন্ধে তার আগে আর কোনো বিজ্ঞানী এমন বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন বলে জানা যায় না। (আবদুল আজিম আদ-দায়েব, আবুল কাসিম আল-জাহরাভি; আওয়ালু তাবিবিন –জার্রাহ- ফিল আম, পৃষ্ঠা: ৫৭-৫৮)
শিশুরোগের চিকিৎসায় জাহরাভিজাহরাভি শিশু রোগের চিকিৎসাতেও কিছু কিছু অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। তিনি শিশু রোগের চিকিৎসার জন্য মাতৃস্তন থেকে দূষিত দুধ চুষে বের করার পরিবর্তে এর জন্য এক প্রকার যন্ত্র আবিষ্কার করেন। শিশুদের রিকেট হবার কারণ এবং এর প্রতিকারেরও এক অভিনব পন্থা উদ্ভাবন করেছিলেন। তিনি শিশুদের মেরুদণ্ড বাঁকা হওয়ার কারণ সম্বন্ধে পূর্বেকার সব মতের ওপর নতুন মত প্রকাশ করেন। (আকবর আলী, বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, পৃষ্ঠা: ৩৩৯)

হিটলারের জন্য অবৈধ সন্তান জন্ম দিয়েছিলো যে নারীরা…..


গত শতকের ত্রিশের দশকের ঘটনা। হিটলারের নাৎসি বাহিনী তখন ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া শুরু করেছে। এ সময় দেশে তাদের অগণিত সমর্থকের মাঝে একজন ছিলেন হিল্ডেজার্ড ট্রুট্‌জ। হিটলার এবং তার নাৎসি বাহিনীর এক অন্ধ সমর্থক ছিলেন তিনি। অন্ধ সমর্থন যে কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকতে পারে তার নমুনা তুলে ধরতেই আজকের এ লেখা।
তরুণ-তরুণীদের মাঝে নাৎসি বাহিনীর মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে যে সংগঠনটি কাজ করতো, তার নাম ‘হিটলার ইয়ুথ’। এই হিটলার ইয়ুথেরই নারী শাখার নাম ছিলো Bund Deutscher Mädel (BDM), বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘জার্মান নারীদের সংগঠন’। নাৎসি বাহিনীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই ১৯৩৩ সালে সংগঠনটিতে যোগ দেন ট্রুট্‌জ। নিয়মিতই এর সাপ্তাহিক মিটিংগুলোতে অংশ নিতেন তিনি, স্বপ্ন দেখতেন নতুন এক জার্মানির। তার ভাষ্যমতে, “হিটলার এবং আরো উন্নত জার্মানির জন্য আমি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা তরুণ-তরুণীরা জার্মানির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটি আমি বুঝতে পেরেছিলাম।”
অল্প কিছুদিনের ভেতরেই ট্রুট্‌জ তাদের এলাকার বিডিএম-এর এক পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেন। জার্মান বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন তার সোনালী চুল এবং আকাশের বিশালতা মাখানো নীল চোখও যেন এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো। অনেকেই তাকে নর্ডিক নারীদের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতো। এর পেছনে শারীরিক উচ্চতার পাশাপাশি প্রশস্ত হিপ ও পেলভিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো বলে মনে করেন তিনি।

১৯৩৬ সালের কথা। ট্রুট্‌জ সেই বছর আঠারোতে পা রাখলেন। মনে তার হাজারো রঙের প্রজাপতি ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। একই বছর তার স্কুল জীবনও শেষ হলো। এরপর তিনি যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না কী করবেন। তার মনের প্রজাপতিগুলো যেন ঠিক ফুলের সন্ধান করে উঠতে পারছিলো না। এমন বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে তাই তিনি ছুটে গেলেন বিডিএম-এর এক নেতার কাছে, জানালেন তার মনের বিস্তারিত খবরাখবর। সেই নেতা সেদিন তাকে এমন কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন যা ট্রুট্‌জের সারা জীবনের গতিপথ পাল্টে দিয়েছিলো। তিনি তাকে সেসব পরামর্শ না দিলে সম্ভবত আজকে ট্রুট্‌জকে নিয়ে আমিও লিখতে বসতাম না!
তিনি তাকে বললেন, “তুমি যদি ঠিক করতে না-ই পার যে এখন কী করবে, তাহলে ফুয়েরারকে (অ্যাডলফ হিটলার) একটা বাচ্চা দিচ্ছ না কেন? এখন জার্মানির জন্য অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে দরকার হলো জাতিগতভাবে বিশুদ্ধ শিশু।”

নেতার কাছ থেকে এই কথা শোনার পরই ট্রুট্‌জ প্রথমবারের মতো নাৎসি বাহিনীর ‘লেবেন্সবর্ন’ প্রোগ্রামের কথা জানতে পারেন। ‘বিশুদ্ধ’ জার্মানদের নিজেদের মাঝে মিলনের মাধ্যমে সোনালী রঙের চুল ও নীল চোখ সম্পন্ন ‘আর্য’ শিশুদের জন্মহার বাড়ানোই ছিলো সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রোগ্রামের মূল লক্ষ্য। এজন্য বাছাইকৃত ‘বিশুদ্ধ’ জার্মান নারীরা শয্যাসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতেন কোনো শ্যুত্‌জস্টাফেল অফিসারকে (যিনি নিজেও তথাকথিত ‘বিশুদ্ধ’)। এরপর সেই নারীর গর্ভে আসা সন্তানকেও তাই ‘বিশুদ্ধ’ বলেই মনে করা হতো। উল্লেখ্য, নাৎসি জার্মানিতে কালো ইউনিফর্ম পরিহিত শ্যুত্‌জস্টাফেল কিংবা সংক্ষেপে ‘এসএস’ ছিলো হিটলার বাহিনীর সবচেয়ে বড় প্যারামিলিটারি সংগঠন।
মূল আলাপে ফিরে আসা যাক। সেই বিডিএম নেতা এরপর ট্রুট্‌জকে পুরো প্রক্রিয়া খুলে বললেন। লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামে সিলেক্ট হতে প্রথমেই তাকে একগাদা মেডিকেল টেস্টের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। সেই সাথে তার জীবনের অতীত ইতিহাস সম্পর্কেও বিস্তারিত অনুসন্ধান চালানো হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো প্রার্থীর শরীরে কোনোভাবেই ইহুদীদের রক্ত থাকা চলবে না। এতসব অনুসন্ধান ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার গন্ডি পার হতে পারলে তখনই কেবল সেই নারী প্রার্থী একদল এসএস অফিসার থেকে তার পছন্দের শয্যাসঙ্গী বেছে নিতে পারবে।

এতক্ষণ যেন তন্ময় হয়ে নেতার কথা শুনে যাচ্ছিলেন ট্রুট্‌জ। নিজের গর্ভে দশ মাস দশ দিন একটি সন্তানকে ধারণ করে তাকে নাৎসি বাহিনীর জন্য দিয়ে দেয়ার মতো দেশপ্রেম তার মনকে মারাত্মকভাবে আলোড়িত করে তুললো। অ্যাডলফ হিটলারের জন্য, তার নাৎসি বাহিনীর জন্য, সর্বোপরি দেশের জন্য এমন কিছু একটাই তো করতে চাচ্ছিলেন তিনি! তাই আর দেরি করলেন না ট্রুট্‌জ। শীঘ্রই লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামের টেস্টের জন্য নিজের নামটি রেজিস্ট্রেশন করালেন তিনি। তবে বাসায় বাবা-মাকে কিছুই জানান নি ট্রুট্‌জ, কারণ তারা তার সেই সিদ্ধান্তকে মেনে নেবে না। প্রোগ্রামের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। এজন্য তিনি বাসায় জানালেন ন্যাশনাল সোশ্যালিজম নিয়ে পড়াশোনা করতে একটি আবাসিক কোর্সে তিনি ভর্তি হয়েছেন।

এরপর এলো সেই নির্ধারিত দিনটি। ট্রুট্‌জকে নিয়ে যাওয়া হলো জার্মানির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বাভারিয়া প্রদেশের একটি পুরনো দুর্গে। এটি ছিলো টেগের্নসী লেকের কাছাকাছি একটি জায়গা, চমৎকার মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ। সেখানে গিয়ে নিজের মতো আরো চল্লিশ জন নারীকে দেখতে পেলেন ট্রুট্‌জ। সবার উদ্দেশ্যই এক, গর্ভে সন্তান ধারণ করে তাকে নাৎসি বাহিনীতে দিয়ে দেয়া। সেই নারীদের কেউ কারো আসল নাম জানতো না, সবাইকে দেয়া হয়েছিলো ছদ্মনাম। আর সেখানে আসতে কেবল একটি সার্টিফিকেটই লাগতো- ‘জাতিগত বিশুদ্ধতা’। এজন্য একজন নারীর প্রপিতামহ পর্যন্ত বংশ ইতিহাস অনুসন্ধান করা হতো।

দুর্গ পুরনো হলে কী হবে! সেখানে ভোগ-বিলাসের উপকরণের কোনো কমতি ছিলো না। লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামে নির্বাচিত সেই তরুণীদের জন্য সেখানে খেলাধুলা, লাইব্রেরি, মিউজিক রুম, এমনকি সিনেমা হল পর্যন্ত ছিলো। ট্রুট্‌জের মতে, “সেখানে আমি যে খাবার খেয়েছিলাম, তা আমার জীবনে খাওয়া সেরা খাবার। সেখানে আমাদের কোনো কাজ করতে হতো না, অনেক চাকরবাকরই ছিলো সেখানে।” এভাবে রাজকন্যার মতোই কাটছিলো তাদের দিনগুলো। অপেক্ষা শুধু একজন এসএস রাজপুত্রের!

পুরো প্রোগ্রামটি নিয়ন্ত্রণ করতেন একজন উচ্চপদস্থ এসএস ডাক্তার। মেয়েরা সেখানে আসার পরপরই তিনি তাদেরকে ভালোমতো পরীক্ষা করেছিলেন। তাদেরকে জানাতে হয়েছিলো বংশগতভাবে তারা কোনো রোগ পেয়েছে কিনা, তাদের পরিবারে কেউ মাত্রাতিরিক্ত পানাসক্ত কিনা এবং পরিবারে কখনো কোনো বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নিয়েছে কিনা। তিনি তাদেরকে এটা বলেও সতর্ক করে দেন যে, তাদের গর্ভে আসা সন্তানকে কোনোভাবেই নিজের কাছে রাখা যাবে না। কিছুদিন পরই সেই সন্তানকে তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হবে। তাকে বড় করা হবে আলাদা পরিচর্যা কেন্দ্রে। তাকে নাৎসি পরিবেশে, নাৎসি আদর্শ শিখিয়ে একজন নাৎসি সদস্য হিসেবেই গড়ে তোলা হবে।

এরপর আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অর্থাৎ সঙ্গী বাছাইয়ের বিষয়টি। প্রাথমিক বিষয়াদি জানানোর পর সেই নারীদের সামনে হাজির করা হলো একদল এসএস অফিসারকে। সুঠাম দেহের অধিকারী, লম্বা সেই অফিসাররা সহজেই নারীদের মন কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সম্পর্ক বিছানা পর্যন্ত গড়ানোর আগে একে অপরকে চিনে নেয়ার ব্যবস্থাও ছিলো। এজন্য তাদেরকে একসাথে খেলাধুলা করা, সিনেমা দেখা, সন্ধ্যায় মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে একসাথে গল্পগুজব করার মতো বিষয়ের মাঝে দিয়ে যেতে হয়েছিলো।

শয্যাসঙ্গী বেছে নেয়ার জন্য ট্রুট্‌জদের দেয়া হয়েছিলো সাতদিন সময়। তাদের বিশেষভাবে বলে দেয়া হয়েছিলো যেন তাদের চুল ও চোখের রঙের সাথে শয্যাসঙ্গীর চুল ও চোখের রঙ সর্বোচ্চ পরিমাণে মিলে যায়। বলাবাহুল্য, সেই অফিসারদের কারো নামই তাদেরকে জানানো হয় নি। সবই ছিলো কঠোর গোপনীয়তার অংশ।

একসময় সঙ্গী পছন্দ করা হয়ে গেলে আরো কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয় তাদের। তখন সেই নারীদের আরো কিছু মেডিকেল টেস্টের ভেতর দিয়ে যাওয়া লাগে। এরপরই একদিন জানিয়ে দেয়া হয় সেদিনই তাদেরকে শয্যাসঙ্গীর সাথে রাত কাটাতে হবে। ট্রুট্‌জের ভাষ্যমতে, সেদিন তিনি এতটাই উত্তেজিত ও আনন্দিত ছিলেন যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এতে একদিকে যেমন শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি ছিলো, তেমনি অ্যাডলফ হিটলারের জন্য কিছু করতে পারার গর্বও মিশে ছিলো! তাদের সেই সঙ্গমকে তারা দেশের জন্য, ভালোবাসার ফুয়েরারের জন্যই মনে করেছিলেন। এজন্য তাদের মাঝে কোনো লজ্জাবোধ কিংবা অনুশোচনাও কাজ করে নি। প্রথম সপ্তাহে সেই লোকটি তিন রাতে ট্রুট্‌জের শয্যাসঙ্গী হয়েছিলো। পরের সপ্তাহে তাকে অন্যান্য নারীদের সাথে ডিউটি পালন করতে হয়েছিলো!

মিলনের পর অল্প কিছুদিনের মাঝেই গর্ভধারণ করেন ট্রুট্‌জ। এরপরই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আলাদা এক মাতৃসেবা কেন্দ্রে। বাচ্চা জন্মানোর আগপর্যন্ত নয়টি মাস তিনি সেখানেই কাটান। এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন ট্রুট্‌জ। তবে মাত্র দু’সপ্তাহই জীবনের প্রথম মাতৃত্বের স্বাদ উপভোগ করতে পেরেছিলেন তিনি। এরপরই বাচ্চাটিকে আলাদা আরেকটি এসএস হোমে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে তাকে পুরোপুরি নাৎসি পরিবেশে বড় করা হবে। এরপর আর কোনোদিনই নিজের গর্ভের সন্তান দেখতে পান নি তিনি, খোঁজ পান নি তার সেই শয্যাসঙ্গীরও।

পরবর্তী বছরগুলোতে আরো সন্তান নেয়ার জন্য বলা হয়েছিলো ট্রুট্‌জকে। কিন্তু ততদিনে তিনি আরেকজন অফিসারের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাই আর ওদিকের কথা ভাবেন নি তিনি। একসময় তাদের বিয়েও হয়ে যায়। বিয়ের পরে একদিন আনন্দে গদগদ হয়ে ট্রুট্‌জ তার স্বামীকে লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামে নিজের সংযুক্তি এবং বাচ্চা জন্মদানের কথাটি জানিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, হিটলারের প্রতি এমন ভালোবাসা ও আনুগত্য দেখে নাৎসি বাহিনীতে চাকরিরত তার স্বামী বোধহয় খুশি হবেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটলো ঠিক তার উল্টোটা! অমন প্রোগ্রামে ট্রুট্‌জের জড়ানোর বিষয়টি একেবারেই স্বাভাবিকভাবে নেন নি তার স্বামী। তবে স্ত্রী কাজটি হিটলারের জন্য করেছে দেখে তিনি তাকে কিছু বলতেও পারছিলেন না!
দুর্গ পুরনো হলে কী হবে! সেখানে ভোগ-বিলাসের উপকরণের কোনো কমতি ছিলো না। লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামে নির্বাচিত সেই তরুণীদের জন্য সেখানে খেলাধুলা, লাইব্রেরি, মিউজিক রুম, এমনকি সিনেমা হল পর্যন্ত ছিলো। ট্রুট্‌জের মতে, “সেখানে আমি যে খাবার খেয়েছিলাম, তা আমার জীবনে খাওয়া সেরা খাবার। সেখানে আমাদের কোনো কাজ করতে হতো না, অনেক চাকরবাকরই ছিলো সেখানে।” এভাবে রাজকন্যার মতোই কাটছিলো তাদের দিনগুলো। অপেক্ষা শুধু একজন এসএস রাজপুত্রের!

পুরো প্রোগ্রামটি নিয়ন্ত্রণ করতেন একজন উচ্চপদস্থ এসএস ডাক্তার। মেয়েরা সেখানে আসার পরপরই তিনি তাদেরকে ভালোমতো পরীক্ষা করেছিলেন। তাদেরকে জানাতে হয়েছিলো বংশগতভাবে তারা কোনো রোগ পেয়েছে কিনা, তাদের পরিবারে কেউ মাত্রাতিরিক্ত পানাসক্ত কিনা এবং পরিবারে কখনো কোনো বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নিয়েছে কিনা। তিনি তাদেরকে এটা বলেও সতর্ক করে দেন যে, তাদের গর্ভে আসা সন্তানকে কোনোভাবেই নিজের কাছে রাখা যাবে না। কিছুদিন পরই সেই সন্তানকে তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হবে। তাকে বড় করা হবে আলাদা পরিচর্যা কেন্দ্রে। তাকে নাৎসি পরিবেশে, নাৎসি আদর্শ শিখিয়ে একজন নাৎসি সদস্য হিসেবেই গড়ে তোলা হবে।

এরপর আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অর্থাৎ সঙ্গী বাছাইয়ের বিষয়টি। প্রাথমিক বিষয়াদি জানানোর পর সেই নারীদের সামনে হাজির করা হলো একদল এসএস অফিসারকে। সুঠাম দেহের অধিকারী, লম্বা সেই অফিসাররা সহজেই নারীদের মন কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সম্পর্ক বিছানা পর্যন্ত গড়ানোর আগে একে অপরকে চিনে নেয়ার ব্যবস্থাও ছিলো। এজন্য তাদেরকে একসাথে খেলাধুলা করা, সিনেমা দেখা, সন্ধ্যায় মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে একসাথে গল্পগুজব করার মতো বিষয়ের মাঝে দিয়ে যেতে হয়েছিলো।

শয্যাসঙ্গী বেছে নেয়ার জন্য ট্রুট্‌জদের দেয়া হয়েছিলো সাতদিন সময়। তাদের বিশেষভাবে বলে দেয়া হয়েছিলো যেন তাদের চুল ও চোখের রঙের সাথে শয্যাসঙ্গীর চুল ও চোখের রঙ সর্বোচ্চ পরিমাণে মিলে যায়। বলাবাহুল্য, সেই অফিসারদের কারো নামই তাদেরকে জানানো হয় নি। সবই ছিলো কঠোর গোপনীয়তার অংশ।

একসময় সঙ্গী পছন্দ করা হয়ে গেলে আরো কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয় তাদের। তখন সেই নারীদের আরো কিছু মেডিকেল টেস্টের ভেতর দিয়ে যাওয়া লাগে। এরপরই একদিন জানিয়ে দেয়া হয় সেদিনই তাদেরকে শয্যাসঙ্গীর সাথে রাত কাটাতে হবে। ট্রুট্‌জের ভাষ্যমতে, সেদিন তিনি এতটাই উত্তেজিত ও আনন্দিত ছিলেন যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এতে একদিকে যেমন শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি ছিলো, তেমনি অ্যাডলফ হিটলারের জন্য কিছু করতে পারার গর্বও মিশে ছিলো! তাদের সেই সঙ্গমকে তারা দেশের জন্য, ভালোবাসার ফুয়েরারের জন্যই মনে করেছিলেন। এজন্য তাদের মাঝে কোনো লজ্জাবোধ কিংবা অনুশোচনাও কাজ করে নি। প্রথম সপ্তাহে সেই লোকটি তিন রাতে ট্রুট্‌জের শয্যাসঙ্গী হয়েছিলো। পরের সপ্তাহে তাকে অন্যান্য নারীদের সাথে ডিউটি পালন করতে হয়েছিলো!

মিলনের পর অল্প কিছুদিনের মাঝেই গর্ভধারণ করেন ট্রুট্‌জ। এরপরই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আলাদা এক মাতৃসেবা কেন্দ্রে। বাচ্চা জন্মানোর আগপর্যন্ত নয়টি মাস তিনি সেখানেই কাটান। এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন ট্রুট্‌জ। তবে মাত্র দু’সপ্তাহই জীবনের প্রথম মাতৃত্বের স্বাদ উপভোগ করতে পেরেছিলেন তিনি। এরপরই বাচ্চাটিকে আলাদা আরেকটি এসএস হোমে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে তাকে পুরোপুরি নাৎসি পরিবেশে বড় করা হবে। এরপর আর কোনোদিনই নিজের গর্ভের সন্তান দেখতে পান নি তিনি, খোঁজ পান নি তার সেই শয্যাসঙ্গীরও।

পরবর্তী বছরগুলোতে আরো সন্তান নেয়ার জন্য বলা হয়েছিলো ট্রুট্‌জকে। কিন্তু ততদিনে তিনি আরেকজন অফিসারের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাই আর ওদিকের কথা ভাবেন নি তিনি। একসময় তাদের বিয়েও হয়ে যায়। বিয়ের পরে একদিন আনন্দে গদগদ হয়ে ট্রুট্‌জ তার স্বামীকে লেবেন্সবর্ন প্রোগ্রামে নিজের সংযুক্তি এবং বাচ্চা জন্মদানের কথাটি জানিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, হিটলারের প্রতি এমন ভালোবাসা ও আনুগত্য দেখে নাৎসি বাহিনীতে চাকরিরত তার স্বামী বোধহয় খুশি হবেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটলো ঠিক তার উল্টোটা! অমন প্রোগ্রামে ট্রুট্‌জের জড়ানোর বিষয়টি একেবারেই স্বাভাবিকভাবে নেন নি তার স্বামী। তবে স্ত্রী কাজটি হিটলারের জন্য করেছে দেখে তিনি তাকে কিছু বলতেও পারছিলেন না!

আল-খাত্তাবি: আধুনিক গেরিলাযুদ্ধের জনক

চীনের মাও সে তুং, ভিয়েতনামের হো চি মিন, কিংবা কিউবার চে গুয়েভারার নাম আমরা সবাই জানি। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মরক্কোর রিফ অঞ্চলে এমন একজন বিপ্লবী নেতা ছিলেন, যার গেরিলা যুদ্ধের কৌশল এবং সাফল্য অনুপ্রাণিত করেছিল এই তিন নেতাকেই! অনেকেই তাকে আধুনিক গেরিলাযুদ্ধের জনক হিসেবে অভিহিত করে থাকে। তার নাম মোহাম্মদ বিন আব্দুল করিম আল-খাত্তাবি।
কে এই খাত্তাবি?খাত্তাবির জন্ম ১৮৮২ সালে মরক্কোর উত্তরে রিফ অঞ্চলের আজদির শহরের এক বার্বার (Berber) তথা আমাজিঘ আদিবাসী পরিবারে। তার বাবা আব্দুল করিম ছিলেন রিফ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এবং প্রভাবশালী আমাজিঘ গোত্র আইত ওয়ারিয়াগালের অত্যন্ত সম্মানিত একজন কাজি। বাবার উৎসাহে খাত্তাবি প্রথমে স্থানীয় মাদ্রাসায় কুরআন এবং আরবি ভাষার উপর পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি এবং তার ভাই কয়েক বছর স্প্যানিশ স্কুলেও পড়াশোনা করেন। এরপর তার ভাই মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনার জন্য মাদ্রিদে চলে যান, অন্যদিকে খাত্তাবি ফেজের বিখ্যাত কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আরবি এবং ইসলামি আইনশাস্ত্রের ওপর পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।সে সময় মরক্কোর অংশবিশেষ ছিল ঔপনিবেশিক স্প্যানিয়ার্ডদের নিয়ন্ত্রণে। পড়াশোনা শেষ করে খাত্তাবি প্রথমে স্প্যানিয়ার্ডদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মেলিলা এলাকায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি শিক্ষক এবং অনুবাদক হিসেবে চাকরিজীবন শরু করেন। তিনি স্প্যানিশ পত্রিকা এল তেলিগ্রামা দেল রিফের হয়ে কয়েক বছর সাংবাদিক এবং কলামিস্ট হিসেবে চাকরি করেন। মেলিলার স্প্যানিশ মিলিটারি প্রশাসনের অধীনে তিনি কিছুদিন অনুবাদক এবং সেক্রেটারি হিসেবেও চাকরি করেন। তার ধর্মীয় এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা বুঝতে পেরে ১৯১৫ সালে তারা তাকে মেলিলার কাজি হিসেবে নিয়োগ করে।
প্রথম জীবনে খাত্তাবি এবং তার বাবা স্প্যানিয়ার্ডদের সাথে ঝামেলায় না গিয়ে তাদের সহায়তা নিয়ে নিজেদের অবস্থার উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন। তারা স্প্যানিশ মাইনিং কোম্পানীগুলোকে সাহায্য করেছিলেন এই আশায় যে, এতে রিফের জনগণও ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হবে এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছলতার মুখ দেখবে। তাদের সহায়তার প্রতিদান হিসেবে স্প্যানিশ প্রশাসন খাত্তাবির বাবাকে ক্রস অফ মিলিটারি মেরিট পুরস্কারে ভূষিত করে এবং তার জন্য মাসিক ৫০ পেসেতা ভাতা বরাদ্দ করে।
খাত্তাবির উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামপ্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই খাত্তাবি এবং তার বাবার কাছে ধীরে ধীরে স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসনের প্রকৃত দিকগুলো ফুটে উঠতে শুরু করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় খাত্তাবি তুরস্কের পক্ষে তার অবস্থান প্রকাশ করলে এবং স্প্যানিশ শাসনকে ইসলামবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করলে তার সকল সুযোগ-সুবিধা বাতিল করে উপনিবেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাকে আটক করা হয়। দীর্ঘ ১১ মাস আটক করে তার বাবার উপর চাপ সৃষ্টি করে তাকে স্প্যানিয়ার্ডদের সাথে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।বিশ্বযুদ্ধ শেষে খাত্তাবি আজদিরে নিজ শহরে ফিরে যান। ততদিনে স্প্যানিয়ার্ডদের দখলদারিত্ব তাদের শহর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। তারা স্থানীয় জনগণের উপর অত্যাধিক কর আরোপ করছিল, তাদের জায়গা-জমি দখল করে নিচ্ছিল এবং কিছু সুবিধাভোগী গোত্রপ্রধানকে ঘুষ দিয়ে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিচ্ছিল। খাত্তাবি, তার ভাই এবং বাবা নিজেদের অঞ্চলকে স্প্যানিয়ার্ডদের দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। স্বাধীন রিফ প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে তারা স্থানীয় গোত্রগুলোর সাথে যোগাযোগ করেন এবং সংঘবদ্ধ হতে শুরু করেন।১৯২০ সালে খাত্তাবির বাবার মৃত্যু হলে খাত্তাবি এলাকার নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। শত শত বছর ধরেই তাদের পরিবার ছিল রিফের সবচেয়ে সম্মানিত পরিবারগুলোর মধ্যে একটি। যুগ যুগ ধরে তারা পুরুষানুক্রমে কাজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সে হিসেবে এমনিতেই স্থানীয় সমাজে তাদের বিশাল প্রভাব ছিল। সেই সাথে যুক্ত হয়েছিল ঔপনিবেশিক ফরাসি এবং স্প্যানিয়ার্ডদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং খাত্তাবির অসামান্য মেধা, যোগ্য নেতৃত্ব, বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর এবং মানুষকে প্রভাবিত করার অকল্পনীয় দক্ষতা। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি স্প্যানিয়ার্ডদেরকে রিফ থেকে উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে রিফের বিচ্ছিন্ন গোত্রগুলোকে নিয়ে একটি সশস্ত্র গেরিলাদল তৈরি করে ফেলেন।
খাত্তাবির রিফ বিদ্রোহ এবং আনুয়াল যুদ্ধখাত্তাবির নেতৃত্বে শুরু হওয়া রিফ বিদ্রোহে প্রথম বড় ধরনের জয় আসে ১৯২১ সালের জুন মাসে। সে সময় মাওলায়ে আহমেদ আর-রাইসুনি নামে স্থানীয় এক গোত্রপ্রধানের দুর্ধর্ষ গেরিলাবাহিনীকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে স্প্যনিশ বাহিনী রিফের কাছাকাছি এসে উপস্থিত হয়। খাত্তাবি স্প্যানিশ বাহিনীর প্রধান জেনারেল ম্যানুয়েল ফার্নান্দেজ সিলভেস্ত্রেকে হুঁশিয়ার করে দেন, তার বাহিনী যদি নদী পার হয়ে রিফে প্রবেশ করে, তাহলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে। সিলভাস্ত্রে হেসেই খাত্তাবির হুমকি উড়িয়ে দেন।
জেনারেল সিলভাস্ত্র ছিলেন স্পেনের রাজা ত্রয়োদশ আলফঁনসোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যুদ্ধযাত্রা শুরুর আগে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি খাত্তাবির বাহিনীকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিবেন। এরপর খাত্তাবির বাড়িতে প্রবেশ করে সেখানে চা পান করবেন। কিন্তু তার সে অভিযান স্থায়ী হয়েছিল কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত। চা পান তো দূরের কথা, খাত্তাবির বাহিনীর গেরিলা আক্রমণে তার বিশাল বাহিনী যখন ধরাশায়ী, তখন পান করার মতো পানিও তাদের ছিল না। অনেককেই নিজেদের মূত্র পান করে তৃষ্ণা মেটাতে হয়েছিল।জুন মাসের শেষের দিকে সিলভাস্ত্রের বাহিনীর সাথে খাত্তাবির রিফিয়ান গেরিলাদের প্রথম সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রথম দিনেই গেরিলাদের আক্রমণে স্প্যানিয়ার্ডদের ৩০০ সৈন্যের মধ্যে ১৭৯ জন নিহত হয়। বাকিরা কোনো রকমে প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরে যায়। পরবর্তী দিনগুলোতে অনেকগুলো ছোট ছোট যুদ্ধ সংগঠিত হয়, কিন্তু অধিকাংশ যুদ্ধেই স্প্যানিয়ার্ডরা খাত্তাবির গেরিলা বাহিনীর কাছে পর্যুদস্ত হয়। সিলভাস্ত্রে সর্বশক্তি নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেন। খাত্তাবিকে পরাজিত করার জন্য তিনি ৬০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী জড়ো করেন। এর বিপরীতে খাত্তাবির সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র তিন থেকে চার হাজার।
১৯২১ সালের ২২ই জুলাই সংঘটিত হয় রিফ বিদ্রোহের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে স্মরণীয় যুদ্ধ, যা ব্যাটেল অফ আনুয়াল নামে পরিচিত। পাঁচ দিন বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের পর সেদিন ৩,০০০ রিফি গেরিলা একযোগে স্প্যানিশ বাহিনীর উপর চূড়ান্ত আক্রমণ করে। মাত্র একরাতের মধ্যে স্প্যানিশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। তাদের ১৬,০০০ থেকে ২২,০০০ এর মতো সৈন্য নিহত হয়। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় তারা পেছনে ফেলে যায় অন্তত ১৫টি কামান, ৪০০টি মেশিনগান, ২৫,০০০ রাইফেল, ২,০০০ ঘোড়া এবং অন্তত ৭০০ বন্দী। আর এই জয় অর্জিত হয় মাত্র ৮০০ রিফি গেরিলার প্রাণের বিনিময়ে!আনুয়াল যুদ্ধ ছিল যেকোনো ঔপনিবেশিক শক্তির জন্য এক বিশাল পরাজয়। জেনারেল সিলভাস্ত্রে নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মহত্যা করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। নিজেদের পরাজয়ের গ্লানি মুছে ফেলার জন্য স্প্যানিশ বাহিনী ফরাসি বাহিনীর সাথে মিলে মরক্কোতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। তারা ১৯১৯ সালের ভার্সেই চুক্তি ভঙ্গ করে রিফের জনগোষ্ঠীর উপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করতে শুরু করে। শেষপর্যন্ত ১৯২৬ সালের ২৬ মে প্রায় আড়াই লাখ ঔপনিবেশিক বাহিনীর বিশাল অভিযানের মুখে খাত্তাবি পরাজয় স্বীকার করে নিতে বাধ্য হন। তিনি ফরাসি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ফরাসিরা খাত্তাবিকে লা রিইউনিয়ন দ্বীপে নির্বাসন দেয়। ১৯৪৭ সালে সেখান থেকে পালিয়ে তিনি মিসরে গিয়ে আশ্রয় নেন। এরপর সেখানেই ১৯৬৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আনুয়াল যুদ্ধের এবং খাত্তাবির প্রভাবখাত্তাবির আত্মসমর্পণের পরপরই রিফ বিদ্রোহ স্তিমিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তার আগেই তিনি শুধু মরক্কো না, সমগ্র উত্তর আফ্রিকার শোষিত জনগণের মধ্যে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে গিয়েছিলেন। আনুয়াল যুদ্ধে খাত্তাবির বিজয়ের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ঐ যুদ্ধে অপমানজনক পরাজয় স্প্যানিশ সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ এবং হতাশার সৃষ্টি করে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯২৩ সালে মিগুয়েল প্রিমো দে রিভেরার সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, যা পরবর্তী ১৩ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তার দুঃশাসন স্পেনে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে আসে এবং পরবর্তীতে স্পেনকে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।
মোহাম্মদ বিন আব্দুল করিম আল-খাত্তাবি নিজে শেষপর্যন্ত ঔপনিবেশিক শক্তির বিশাল বাহিনী এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের কাছে পরাজিত হলেও তিনি দেখিয়ে গিয়েছিলেন কীভাবে গেরিলাযুদ্ধের মাধ্যমে হালকা অস্ত্রশস্ত্র দিয়েও বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করা যায়। তার গেরিলা যুদ্ধের অসামান্য সাফল্য এবং কৌশল যুগ যুগ ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিপ্লবী যোদ্ধাদেরকে অনুপ্রাণিত করে এসেছে।
কিউবার বিপ্লবী নেতা চে গুয়েভারাও খাত্তাবির গেরিলা কৌশল দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। গুয়েভারার সামরিক প্রশিক্ষক আলবার্তো বাইয়ো রিফ বিদ্রোহের সময় খাত্তাবির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তার কৌশলগুলোর সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি গুয়েভারাকে সেসব কৌশলের উপর প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। গুয়েভারা যখন ১৯৫৯ সালে মিসর সফরে গিয়েছিলেন, তখন তিনি খাত্তাবির সাথে সাক্ষাৎ করে তার লড়াইয়ের পেছনে খাত্তাবির অনুপ্রেরণার কথা স্বীকার করেছিলেন বলেও অনেক ইতিহাসবিদ দাবি করে থাকেন।
খাত্তাবির রণকৌশল অনুপ্রাণিত করেছিল ভিয়েতনামের হো চি মিন এবং চীনের মাও সে তুংকেও। ১৯৭১ সালে ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী সংগঠন ফাতাহ’র কয়েকজন নেতা যখন চীনের বিপ্লবী নেতা মাও সে তুংয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন, তখন মাও সে তুং তাদেরকে বলেছিলেন, “আপনারা আমার কাছে এসেছেন মানুষের স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে আমার কথা শোনার জন্য, কিন্তু আপনাদের নিজেদেরই সাম্প্রতিক ইতিহাসে আব্দুল করিম নামে এমন একজন নেতা আছেন, যিনি হচ্ছেন অনুপ্রেরণার সবচেয়ে বড় উৎসগুলোর মধ্যে একটি। তার সংগ্রামের ইতিহাস থেকেই আমি শিখেছি জনগণের স্বাধীনতা যুদ্ধ আসলে কী!”
মাও সে তুং কথাটা ১৯৭১ সালে বললেও এটা এখনও সত্য। আমরা দেশ-বিদেশের অনেক সফল সামরিক নেতার, বিপ্লবী নেতার নামই জানি, তাদের আন্দোলনের ইতিহাস পড়ে মুগ্ধ হই। কিন্তু মাত্র এক রাতের মধ্যে স্পেনের বিশাল বাহিনীকে ধ্বংস করে দেওয়া এই “রিফের সিংহ” সম্পর্কে আমরা খুব কমই আলোচনা করি।সূত্রঃ https://roar.media/bangla/

আসহাবে কাহাফ: ঘুমন্ত সেই গুহাবাসীদের কাহিনী ।

আসহাবে কাহাফ: ঘুমন্ত সেই গুহাবাসীদের কাহিনী । জনাকয়েক পলাতক যুবক, একটি গুহা আর তিন শতাব্দীর নিদ্রা- আসহাবে কাহাফের কাহিনী কেবল মুসলিমদের কাছেই প্রবল জনপ্রিয় একটি ঘটনা নয়, বরং খ্রিস্টানদের কাছেও ছিল খুব জনপ্রিয় ও অলৌকিক ঘটনা। কুরআনে বর্ণিত এই কাহিনীর সাথে সাথে সেই সিরিয়ান উপাখ্যান এবং যে নগরীতে এই ঘটনা ঘটেছিল- সবই আমরা এ লেখায় আলোচনা করার চেষ্টা করব।শুরুতেই বলে রাখা দরকার, এই ঘটনাটি কুরআনে বর্ণিত বিধায়, মুসলিমদের বিশ্বাস ওতপ্রোতভাবে এর সাথে জড়িত। অনেক পাঠকই অভিযোগ করে থাকেন বিধায়, কুরআনের আয়াত বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করার সময় কেবল ইসলামিক সূত্র ব্যবহার করা হবে, এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে তাফসির ইবনে কাসিরের বঙ্গানুবাদের চতুর্দশ খণ্ড। তবে কুরআনে যে ঘটনার বর্ণনা করা হয়েছে, সেটি কুরআন অবতরণের কয়েক শতাব্দী আগের ঘটনা এবং সেটার বিস্তারিত বিবরণও দেওয়া হবে, সেজন্য আমরা ব্যবহার করব ৫ম শতকের স্থানীয় সিরীয় উপকথা, ঠিক যেমনটা লিপিবদ্ধ ছিল। কাহিনীগুলোর পার্থক্য তখনই প্রতীয়মান হবে। তাহলে প্রথমে শুরু করা যাক কুরআনে বলা ঘটনাটি দিয়ে।
কুরআনের ১৮ নম্বর সুরা ‘সুরা কাহাফ’ মক্কাতে অবতীর্ণ হয়; অর্থাৎ তখনও নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) ও তাঁর অনুসারীরা মদিনায় চলে যাননি। কিন্তু মক্কাতে তখন তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে দেখে কুরাইশরা খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ে। যেহেতু নবী (সা) এমন ধর্ম প্রচার করে চলেছিলেন, যেখানে আগের নবীদের সাথে ইহুদি-খ্রিস্টানদের নবীরা মিলে যায়, তাই কুরাইশ নেতারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তাঁরা ইহুদি র‍্যাবাইদের (আলেম) সাথে পরামর্শ করবে। নাযার ইবনে হারিস এবং উকবা ইবনে মুয়িত নামের দুজনকে তাঁরা মদিনার ইহুদি র‍্যাবাইদের কাছে প্রেরণ করে এই বলে যে, তাঁরা যেন মুহাম্মাদ (সা) এর ব্যাপারে তাদের মতামত জানায়।
তারা মদিনা পৌঁছালে ইহুদি আলেমরা তাদের কথা শুনে মীমাংসা করার জন্য একটি উপায় বাতলে দেন,“দেখো, আমরা তোমাদের মীমাংসা করার জন্য একটি কথা বলছি। তোমরা ফিরে গিয়ে তাঁকে তিনটি প্রশ্ন করবে। তিনি যদি উত্তর দিতে পারেন, তবে তিনি যে সত্য নবী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর না দিতে পারলে তিনি মিথ্যেবাদী। প্রথম প্রশ্ন: পূর্বযুগে যে যুবকেরা বেরিয়ে গিয়েছিলেন তাদের ঘটনা বর্ণনা করুন তো? এ এক বিস্ময়কর ঘটনা…”এরকম আরো দুটি প্রশ্ন তাঁরা করতে বলেন। বাকি ঘটনা এখানে আমরা লিখছি না, তবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হিসেবেই অবতীর্ণ হয় সুরা কাহাফ (‘গুহা’)।


‘আসহাবে কাহাফ’ অর্থ ‘গুহাবাসী’। এ ঘটনা ঘটেছিল প্রাচীন গ্রিক শহর আনাতোলিয়া বা এফিসাসে (Ephesus)। কাছেই ছিল গ্রিক দেবী আরটেমিসের বিখ্যাত মন্দির। বর্তমানে ভৌগোলিকভাবে শহরটি তুরস্কে পড়েছে। তবে কুরআনে অবশ্য নাম-ঠিকানা উল্লেখ করা নেই।প্রথমে কুরআনের ভাষ্যতেই কাহিনী শুনে নেয়া যাক।
তুমি কি ধারণা করো যে, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর ছিল? যখন যুবকেরা পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করে তখন দোয়া করে: “হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে নিজের কাছ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজ সঠিকভাবে পূর্ণ করুন।” তখন আমি কয়েক বছরের জন্য গুহায় তাদের ঘুমন্ত অবস্থায় রাখলাম। অতঃপর আমি তাদেরকে পুনরুত্থিত করি, একথা জানার জন্যে যে, দুই দলের মধ্যে কোন দল তাদের অবস্থানকাল সম্পর্কে অধিক নির্ণয় করতে পারে। আপনার কাছে তাদের ইতিবৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। তারা ছিল কয়েকজন যুবক। তারা তাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমি তাদের মন দৃঢ় করেছিলাম, যখন তারা উঠে দাঁড়িয়েছিল। অতঃপর তারা বলল: “আমাদের পালনকর্তা আসমান ও যমীনের পালনকর্তা, আমরা কখনও তার পরিবর্তে অন্য কোনো উপাস্যকে আহবান করব না। যদি করি, তবে তা অত্যন্ত গর্হিত কাজ হবে। এরা আমাদেরই স্ব-জাতি, এরা তাঁর পরিবর্তে অনেক উপাস্য গ্রহণ করেছে। তারা এদের সম্পর্কে প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থিত করে না কেন? যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা উদ্ভাবন করে, তার চাইতে অধিক পাপী আর কে?” তোমরা যখন তাদের থেকে পৃথক হলে এবং তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের এবাদত করে তাদের থেকে, তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ কর। তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্যে দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজকর্মকে ফলপ্রসু করার ব্যবস্থা করবেন। তুমি সূর্যকে দেখবে, যখন উদিত হয়, তাদের গুহা থেকে পাশ কেটে ডান দিকে চলে যায় এবং যখন অস্ত যায়, তাদের থেকে পাশ কেটে বাম দিকে চলে যায়, অথচ তারা গুহার প্রশস্ত চত্বরে অবস্থিত। এটা আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্যতম… তুমি মনে করবে তারা জাগ্রত, অথচ তারা নিদ্রিত। আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাই ডান দিকে ও বাম দিকে। তাদের কুকুর ছিল সামনের পা দুটি গুহাদ্বারে প্রসারিত করে। যদি তুমি উঁকি দিয়ে তাদেরকে দেখতে, তবে পেছন ফিরে পলায়ন করতে এবং তাদের ভয়ে আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়তে। আমি এমনিভাবে তাদেরকে জাগ্রত করলাম, যাতে তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের একজন বলল: “তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ?” তাদের কেউ বলল: “একদিন অথবা একদিনের কিছু অংশ অবস্থান করছি।” কেউ কেউ বলল: “তোমাদের পালনকর্তাই ভালো জানেন তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ। এখন তোমাদের একজনকে তোমাদের এই মুদ্রাসহ শহরে প্রেরণ কর; সে যেন দেখে কোন খাদ্য পবিত্র। অতঃপর তা থেকে যেন কিছু খাদ্য নিয়ে আসে তোমাদের জন্য; সে যেন নম্রতা সহকারে যায় ও কিছুতেই যেন তোমাদের খবর কাউকে না জানায়। তারা যদি তোমাদের খবর জানতে পারে, তবে পাথর মেরে তোমাদেরকে হত্যা করবে, অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নেবে। তাহলে তোমরা কখনই সাফল্য লাভ করবে না।” এমনিভাবে আমি তাদের খবর প্রকাশ করে দিলাম, যাতে তারা জ্ঞাত হয় যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং কেয়ামতে কোনো সন্দেহ নেই। যখন তারা নিজেদের কর্তব্য বিষয়ে পরস্পর বিতর্ক করছিল, তখন তারা বলল: “তাদের উপর সৌধ নির্মাণ কর।” তাদের পালনকর্তা তাদের বিষয়ে ভালো জানেন। তাদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হল, তারা বলল: “আমরা অবশ্যই তাদের স্থানে উপাসনালয় নির্মাণ করব।” অজ্ঞাত বিষয়ে অনুমানের উপর ভিত্তি করে এখন তারা বলবে: তারা ছিল তিন জন, তাদের চতুর্থটি তাদের কুকুর। একথাও বলবে, তারা পাঁচ জন। তাদের ছষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর। আরও বলবে, তারা ছিল সাত জন। তাদের অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর। বলুন: আমার পালনকর্তা তাদের সংখ্যা ভালো জানেন। তাদের খবর অল্প লোকই জানে। সাধারণ আলোচনা ছাড়া তুমি তাদের সম্পর্কে বিতর্ক করবে না এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে তাদের কাউকে জিজ্ঞাসাবাদও করবে না… তাদের উপর তাদের গুহায় তিনশ বছর, অতিরিক্ত আরও নয় বছর অতিবাহিত হয়েছে। বল: তারা কতকাল অবস্থান করেছে, তা আল্লাহই ভালো জানেন। নভোমণ্ডল ও ভুমণ্ডলের অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই কাছে রয়েছে।” [আল কুরআন ১৮:৯-২৬]
এটুকুই কুরআন কাহিনীটি সম্পর্কে জানায়। এ বিষয়ে তাফসিরে রয়েছে অনেক অনেক বক্তব্য। যেমন- ইবনে কাসিরে একটি মতবাদ লিখিত আছে যে, উপরে আয়াতে লিখা ‘রাকীম’ বলতে ফলকে লেখা বোঝায়, গুহার বাইরে কি কোনো ফলকে করে লিখে দেওয়া হয়েছিল? আমরা কিছুক্ষণ পরেই সেটা জানতে পারব। ইবনে কাসিরে এ-ও লিখা আছে যে, যে অত্যাচারী শাসকের তাড়ায় যুবকেরা পালিয়ে যায়, তার নাম ছিল দাকইয়ানুস। তাছাড়া, যে কুকুরটি তাদের সাথে ছিল, সেটি রাজবাবুর্চির কুকুর ছিল, কুকুরের নাম কিতমির। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) নিশ্চিত করে বলেন যে, গুহাবাসীর সংখ্যা সাতজনই ছিল। কোনো কোনো মত অনুযায়ী, তাদের নাম ছিল মুকসালমিনা, তামলিখা, মারতুনিস, সানুনিস, সারিনুনিস, যুনিওয়াস, কাস্তিতিউনিস। নামগুলো দেখে বোঝা যায়, রোমান নামের আরবিকরণ করা হয়েছে।এবার চলুন আমরা শুনে আসি সেই সিরিয়ার উপকথাটি। পঞ্চম শতকের সিরিয়ান বিশপ জ্যাকব অফ স্যারাগ এর কাছ থেকে আমরা এই ঘটনার বর্ণনা পাই, তিনি আবার সেটা সংগ্রহ করেছেন আরো আগের গ্রিক কোনো সূত্র থেকে, সেই সূত্র কালের বিবর্তনে আজ হারিয়ে গিয়েছে। এছাড়াও আরো কয়েক জায়গায় আমরা এর দেখা পাই।
এ কাহিনী অনুযায়ী, আড়াইশ সালের দিকে রোমান সম্রাট ডিসিয়াস এর শাসনকালে (২৪৯-২৫১) সাতজন তরুণ ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান যুবককে ধর্মত্যাগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পৌত্তলিক রোমান সাম্রাজ্যে তাদের জোর করা হয় পুরনো দেবদেবীদের বিশ্বাসে ফিরে যেতে। তাদের সময় দেওয়া হয় পুরনো বিশ্বাসে ফেরত আসতে, কিন্তু তাঁরা তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাদের সকল সম্পদ গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেন। এরপর তাঁরা পালিয়ে যান অক্লন পাহাড়ের এক গুহায়। সেখানে প্রার্থনা শেষে তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েন। বলা আছে, গুহার খবর পাবার পর সম্রাট তাদের সেই গুহা সিলগালা করে দেন, যেন তাঁরা ক্ষুধায় মারা যান।ডিসিয়াস মারা যান ২৫১ সালে। পৌত্তলিক রোমান সাম্রাজ্যের অত্যাচারিত খ্রিস্টানদের ধর্ম এক সময় রাজ্যের প্রধান ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তবে সে অনেক অনেক বছর পরের কাহিনী। কাহিনীর একটি বর্ণনা মোতাবেক, সম্রাট দ্বিতীয় থিওডোসিয়াস (৪০৮-৪৫০) এর আমলে, গুহার সিলগালা ধ্বংস করা হয়। যিনি খুলেছিলেন, তিনি ভাবছিলেন ওটাকে গোয়ালঘর বানাবেন, তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি ভেতরে সাত জন যুবক ঘুমিয়ে। যুবকেরা ঘুম ভেঙে উঠলেন, তাঁরা ভাবলেন এক দিন পুরো ঘুমিয়ে উঠেছেন। তাদের একজনকে বাজারে পাঠানো হলো, সাবধানে বাজার করতে বলা হলো যেন কেউ চিনে না ফেলে তাদের, চিনে ফেললে অত্যাচারী রাজার পৌত্তলিক অনুসারীরা তাদের গ্রেফতার করবেন। কিন্ত শহরে গিয়ে তো যুবক ম্যাল্কাস তো অবাক! আশপাশে ক্রুশ লাগানো দালানকোঠা, লোকে প্রকাশ্যেই যীশুর নাম করছে! আবার দোকানি তাঁর মুদ্রাও নিচ্ছে না, এটা নাকি অনেক পুরনো ডিসিয়াসের আমলের মুদ্রা।
বিশপ তাদের কাছ থেকে ঘটনা শুনলেন। ধর্মপ্রাণ সম্রাট নিজে এসে তাদের সাথে কথা বললেন। সম্রাট তাদের জন্য অনেক কিছু করতে চাইলেন, কিন্তু তাঁরা না করে দিয়ে সেই গুহায় গিয়েই ঘুমালেন এবং এক সময় মারা গেলেন। অর্থোডক্স খ্রিস্টান চার্চ এই সাত মহাপ্রাণকে বছরে দুদিন স্মরণ করে ভোজ করবার রীতি করে- আগস্ট ৪ এবং অক্টোবর ২২ তারিখে।

গুহাটির আরেকটি ছবি; source:Wikimedia Commons


কুরআনে যে এফিসাস শহরের এই ঘটনাই বলা হচ্ছিল সে ব্যাপারে স্কলারগণ একমত। তবে ট্রাডিশনের জায়গায় জায়গায় রয়েছে কিছু পার্থক্য, কিন্তু অধিকাংশই মিলে যায়। দুটো ঘটনাই নিশ্চিত করে যে, একজন অত্যাচারী শাসক ছিলেন। সিরিয়ার উপাখ্যানে তো নামই বলে দেওয়া আছে। এও বলা আছে, ডিসিয়াসের শাস্তি এত ভয়ংকর ছিল যে, বন্ধু বন্ধুকে ভুলে যেত, পিতা ছেলেকে এবং ছেলে পিতাকে ভুলে যেত!
সিরিয়ান কাহিনীতে বলা আছে, গুহার বাইরে সম্রাট সিলগালা করার পাশাপাশি ফলকে লিখেও দিয়েছিলেন এই বিপথগামীদের কথা। ইবনে আব্বাস (রা) এই মতবাদ সমর্থন করেন।তবে কুরআনে বলা হয়েছে তাদের ঘুমন্ত থাকবার সময় ৩০০ বছর, সাধারণ সৌর হিসেবে। তবে চান্দ্র হিসেবে অতিরিক্ত ৯ বছর ধরলে, সেটি ৩০৯। তৎকালীন চান্দ্র ক্যালেন্ডার ব্যবহারকারীগণ প্রতি একশ সৌর বছরের তিন বছর যোগ করে নিত। কিন্তু সিরিয়ার কাহিনীতে নিশ্চিত করে সময় বলা নেই। কোনো কোনো মতে সেটি ১৮৪ বছর, কোনো কোনো মতে দু’শো বছরের বেশি, কেউ কেউ বলেন ২০৮ বছর। তবে তাঁরা যে যুবক ছিলেন, সে ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই কোথাও। তাঁরা মনে করেছিলেন, তাঁরা মাত্র একদিনের মতো ঘুমিয়েছেন- এটাও সিরীয় কাহিনীতে বলা আছে। যে যুবক খাবার কিনতে গিয়েছিলেন, তাঁর নাম ম্যাল্কাস এবং তিনি একটি রুপার মুদ্রা নিয়ে গিয়েছিলেন।
তাদের নামগুলো ছিল Maximian, Malchus, Marcian, John, Denis, Serapion ও Constantine। ভিন্ন উচ্চারণ ও বানানে তাদের নামগুলো Maximilian, Jamblichus, Martin, John, Dionysius, Antonius এবং Constantine।
এফিসাস শহরের বাইরের সেই গুহার এলাকায় ১৯২৭-১৯৩০ সালের দিকে প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান চালানো হয়, সেখানে ২,০০০ টেরাকোটা ল্যাম্প পাওয়া যায়, যেগুলো চার্চের জন্য উৎসর্গ করা ছিল। কার্বন ডেটিংয়ে সেগুলো চতুর্থ বা পঞ্চম শতকের বলে নির্ধারিত হয়। এর মানে, সেখানে চার্চ বানিয়েছিল স্থানীয়রা। ল্যাম্পগুলোর গায়ে ছিল ক্রুশের ছবি, কোনো কোনোটার গায়ে ছিল আদম-হাওয়া থেকে শুরু করে তাওরাতের মহারথীদের ছবি- যেমন ইব্রাহিম (আ), ইসহাক (আ) এবং সিংহের গুহায় দানিয়েল (আ)। এছাড়াও সামাজিক ছবিও ছিল, যেমন জেলেদের কাজ বা সবাই মিলে কোনো অনুষ্ঠান উপভোগের ছবি। কিন্তু এগুলোর পাশে হারকিউলিস ও সিংহ, জিউস ও আফ্রোদিতি, মন্দিরের ছবি ও দেবতা আত্তিসের মাথার ছবিও ছিল। অর্থাৎ এগুলোর নির্মাতারা নব্য খ্রিস্টান হলেও আদি রোমান সংস্কৃতি ফেলে আসেনি। ঐতিহাসিক বিশ্লেষকগণ অবশ্য এ ঘটনার কোনো নিশ্চয়তা দেন না এবং রিপ ভ্যান উইংকেলের শত বছরের ঘুমের সাথে সাদৃশ্য দেখিয়ে থাকেন। উল্লেখ্য, আসহাবে কাহাফ নিয়ে ইরানে জনপ্রিয় একটি টিভি সিরিজ ‘দ্য মেন অফ অ্যাঞ্জেলোস’ নির্মাণ করা হয়।তুরস্কের এই শহরটির বাইরে গেলে গুহাটি দেখতে পাওয়া যায়। তবে জর্ডানের আম্মানের কাছেও ১৯৬৩ সালে বের করা আরেকটি জায়গাকে আসহাবে কাহাফের জায়গা বলে দাবি করা হয়। এ জায়গাকে আল রাকীম ডাকা হয়। তবে স্থানীয় বর্ণনা ছাড়া আর কোনো ঐতিহাসিক সূত্র এটির ব্যাপারে পাওয়া যায় না, যার সাথে কোনোভাবে সেভেন স্লিপার্স (খ্রিস্টানরা এ নামেই ডাকে এ ঘটনাকে) এর ঘটনার মিল করা যায়। দাবি করা হয়, এখানে নাকি সাতজনের কঙ্কাল এবং একটি কুকুরের কঙ্কালও পাওয়া গেছে, আর সাথে ছিল কিছু তামার মুদ্রা। তবে সেগুলোর কার্বন ডেটিং করে সময়ের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। সেই গুহায় চারজনের কবর করবার জায়গা পাওয়া গেছে, যার দ্বারা বোঝা যায়, ওটা সাতজনের কিছু ছিল না।

ইরানের সেই টিভি সিরিজ, যেটি বাংলাতে ডাবিং করে প্রচার করা হয়; source: YouTube


এসব ছাড়াও অনেক মুসলিম দেশের অনেক স্থানকেই আসহাবে কাহাফের জায়গা বলে দাবি করা হয়েছে- যেমন, তুরস্কের আম্মুরিয়াগ হায হামজা, টারসাস, মিসরের কায়রোতে, এমনকি উত্তর আফ্রিকা কিংবা চীনেও! মূলত পেছনের কাহিনী না জেনে হরহামেশা ধর্মীয় রেলিক পাবার দাবিদাওয়া করবার কারণেই পৃথিবীর নানা প্রান্তে এরকম দেখা যায়। অথচ কুরআনের বর্ণনা মতেই জানা যায় যে, এই ঘটনাটি আরবদের কাছে অজানা হলেও বিদেশি লোকদের অজানা ছিল না, অন্তত যে এফিসাসে কাহিনী হয়েছিল, সেখানে যে সেটি খুবই জনপ্রিয় ছিল, তা তো বলবার অপেক্ষা রাখে না।সূত্রঃ https://roar.media/bangla/main/history/cave-of-the-seven-sleepers-ashabe-kahaf/

দেশেবিদেশে ফসল বাঁচাতে কাকতাড়ুয়া!

জেনে নেই কাকতাড়ুয়া ইতিহাস ।কাকতাড়ুয়া। পশুপাখির জন্য আদতে ভয় পাওয়ার মতো একটা জিনিস হলেও, মানুষের জন্য এটা একটা মজার বিষয় বটে। আমরা প্রায়ই কাউকে নিয়ে মজা করে বলে ফেলি, “কাকতাড়ুয়ার মতো লাগছে!” কারণ কাকতাড়ুয়া শুনলেই আমাদের মনে পড়ে, কাঠের গায়ে জামা পরিয়ে, মাথায় উল্টো করে হাঁড়ি বসানো একটা হাস্যকর কাঠামো। কারণ আমাদের গ্রামবাংলায় এরকম চেহারার কাকতাড়ুয়া দেখতেই আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু শুধু গ্রামবাংলা নয়, সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এত রকমের কাকতাড়ুয়া আছে, এত বৈচিত্র্য তাদের চেহারায়, জানলে অবাক হতে হয়!
কাকতাড়ুয়া নাম শুনে মনে হতে পারে, কাক তাড়ানোর সঙ্গে এর একটা সম্পর্ক আছে। তবে শুধু কাক তাড়ানোই নয়, যেসব পশুপাখি ফসলের ক্ষতি করে, তাদের ভয় দেখানোর জন্যই চাষজমিতে কাকতাড়ুয়া বসার প্রচলন। তাই গ্রামের কৃষিনির্ভর জীবনে কাকতাড়ুয়া মোটেই মজার জিনিস নয়, বরং খুবই প্রয়োজনীয় একটা জিনিস।ইতিহাস বলছে, ৩১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশর সভ্যতায় প্রথম কাকতাড়ুয়ার ব্যবহার শুরু হয়। নীলনদের অববাহিকার উর্বর পলিমাটিতে মিশরীয়রা চাষাবাদ করত। গম থেকে শুরু করে নানা রকমের শস্য খুব পরিশ্রম করে ফলাত তারা। কিন্তু পাখির উৎপাতে সে সব ফসল রক্ষা করায় দায় হয়ে পড়েছিল মিশরীয়দের। ফসল রক্ষার জন্যে ফসলের উপরে জাল বিছিয়ে, পাখি ধরত তারা। ফসলও বাঁচত, পাখির মাংসও খাওয়া হতো। কিন্তু এই ভাবে পশুদের আটকানো যাচ্ছিল না। তখনই পাথর দিয়ে ভয়ালদর্শন কিছু কাঠামো সাজিয়ে খেতে দাঁড় করিয়ে রাখা শুরু হয়। সভ্যতার প্রথম কাকতাড়ুয়া সম্ভবত সেটাই ছিল।এর পরে ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক কৃষকেরা তাঁদের ফসল রক্ষার জন্য কাঠের তৈরি কাকতাড়ুয়া ফসলের মাঠে স্থাপন করতে শুরু করে। ইতিহাস বলছে, এই কাকতাড়ুয়াগুলি অনেকটা দেবতা ডায়োনিসাসের ছেলে প্রিয়েপাস দেব এবং জিউসের কন্যা আফ্রোদিতি দেবীর আদলে তৈরি হতো। গ্রিকদের বিশ্বাস ছিল, ফসলের খেতে এই সব দেবতার প্রতিমূর্তি রাখলে পশুপাখিরা ফসলের ক্ষতি করতে পারে না। এবং দেবতাদের আশীর্বাদে প্রচুর পরিমাণে ফসলও উৎপাদিত হবে। গ্রিকরা এই কাঠের কাকতাড়ুয়াগুলোকে লাল রং করে দিত বলে জানা যায়। তাদের একটি হাতে থাকত লাঠি বা মুগুর জাতীয় কোনও অস্ত্র।রোমান সভ্যতার কাকতাড়ুয়ায় আবার ছাপ পড়ে যায় গ্রিকদের অনুকরণে। কারণ রোমান সৈন্যরা যখন ইউরোপ অভিযানে বেরিয়েছিল, তখন তারা প্রিয়েপাসের আদলে তৈরি কাকতাড়ুয়া দেখতে পায় বিভিন্ন ফসলের খেতে। পরবর্তী কালে রোমের কৃষকদের ফসলের মাঠেও এই ধরনেরই কাকতাড়ুয়া স্থাপন করা হয়।
কিন্তু মধ্যযুগে, ব্রিটেন ও ইউরোপে আবার কোনও কাঠামো নয়, ছোট ছোট বাচ্চাদের কাকতাড়ুয়া হিসেবে ব্যবহার করা হতো! তাদের কাজ ছিল লাঠি দিয়ে টিনের বাক্স বাজিয়ে, ফসলের মাঠগুলোয় ছুটে বেড়ানো। যাতে সেই শব্দ শুনে পাখিরা পাকা ফসল খেতে আসতে না পারে। কিন্তু ১৩৪৭ থেকে ১৩৫১ সালে সারা ইউরোপ জুড়ে ভয়াবহ প্লেগ রোগের মহামারী দেখা দেয়। বহু মানুষ মারা যান। মারা যায় বাচ্চারাও। ফসলের মাঠে পাখি তাড়ানোর জন্য আর পাওয়া যাচ্ছিল না কোনও বাচ্চাকে। তখন কৃষকেরাই পুরনো কাপড় ও খড় দিয়ে বাচ্চা ছেলের আদলে কাকতাড়ুয়া তৈরি করতে শুরু করে। সেগুলোকে খেতের মাঝে উঁচু লাঠির মাথায় দাঁড় করিয়ে পাখি তাড়ানোর ব্যবস্থা করে। এতে আশাতীত সাফল্য পাওয়া যায়। ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কাকতাড়ুয়া।এশিয়ার মধ্যে প্রথম কাকতাড়ুয়ার প্রচলন জাপানে শুরু হয় বলে জানা যায়। সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল ‘কাকাসি’ নামের কাকতাড়ুয়া। কাকাসি কাকতাড়ুয়াকে জাপানি মানুষের আদলে তৈরি করা হতো। সেই কাকতাড়ুয়ার গায়ে থাকত বর্ষাতি, মাথায় থাকত টুপি আর হাতে থাকত তির-ধনুক।
আমেরিকার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে আবার কাকতাড়ুয়া এসেছে অনেক পরে। শেতাঙ্গদের দখলের আগে বর্তমানের ভার্জিনিয়া এবং ক্যারোলিনার বেশ কিছু অঞ্চলে শস্যখেতের আশপাশে কোনও পশুপাখি দেখলে নেটিভ আমেরিকানরা জোরে জোরে আওয়াজ করে তাদের তাড়াত। কেউ কেউ পাখি তাড়ানোর জন্য শস্য বীজের সঙ্গে এক ধরনের ওষধি গাছের রস মিশিয়ে ছড়িয়ে দিতেন ফসলের খেতের আশপাশে। পাখি আসত না তাতে। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে আবার আমেরিকান শিশুদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত, কে কত ভয়ঙ্কর কাকতাড়ুয়া সাজতে পারে!পরবর্তী কালে আমেরিকায় অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে ফসলের খেতে ব্যাপক পরিমাণে কাকতাড়ুয়ার ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, সে দেশে আচমকাই প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার শুরু হয় কীটনাশকের। এর ফলে ফসলে পোকামাকড়ের উপদ্রব কমে যায় এবং পশুপাখিরাও কীটনাশক থেকে দূরে থাকে। কিন্তু ১৯৬০ সালের পরে মার্কিন কৃষকেরা বুঝতে পারে, এত কীটনাশক পাখিদের জন্য যেমন ক্ষতি করে, তেমনই মানুষেরও ক্ষতি করে। তখন ধীরে ধীরে কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে কাকতাড়ুয়ার প্রচলন শুরু হয় ফের।
বাংলাদেশে কাকতাড়ুয়াঃআমাদের গ্রামবাংলায় যে সব কাকতাড়ুয়া চোখে পড়ে, সেগুলোর আদল প্রায় একই রকম। কালো মাটির হাঁড়ির ওপর সাদা চুন দিয়ে মুখ-চোখ এবং বড়-বড় দাঁত এঁকে, লম্বা লাঠির ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়। কখনও ছেঁড়া জামা আর খাটো লুঙ্গিও পরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে দূর থেকে কিম্ভূতকিমাকার এক জন রাক্ষস পাহারাদার বলে মনে হয়। ব্রিটিশ কাকতাড়ুয়া
ইংল্যান্ডের এক বিশেষ অঞ্চলে নৃত্যরত কাকতাড়ুয়া চোখে পড়ে। এগুলির পোশাক-আশাক এবং দাঁড়ানোর ভঙ্গি এমনই, যাতে দূর থেকে মনে হয়, একটি মেয়ে নাচছে। কখনও কখনও এই কাকতাড়ুয়াগুলির হাতে ছেঁড়া ছাতাও ধরিয়ে দেওয়া হয়।পর্তুগিজ কাকতাড়ুয়া
এপ্রন পড়া পর্তুগিজ কাকতাড়ুয়া দেখতে অনেকটা মেয়েদের মতো হলেও, এদের মাথায় থাকে ঝলমলে বড় টুপি।
স্প্যানিশ কাকতাড়ুয়া
ঈগলের হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য স্পেনের কাকতাড়ুয়াগুলিকে ভয়ঙ্কর মূর্তির মতো করে তৈরি করা হয়। ছেঁড়া প্যান্ট, শার্ট, টুপি, জুতো ইত্যাদি পরিয়ে এমন ভাবে মাঠের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, যে শুধু ঈগল নয়, যে কেউই ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে। কাকতাড়ুয়াকে ভূতের সঙ্গেও তুলনা করা হয় সেখানে।ফরাসি কাকতাড়ুয়া
ফ্রান্সে আবার ঠিক উল্টো। এ দেশে কেউ কাকতাড়ুয়াকে ভূত বলে তো মনে করেই না, বরং এরা কাকতাড়ুয়াকে সাজিয়ে তোলে একেবারে নিজেদের আদলে। যতটা সম্ভব নিখুঁত ভাবে কোর্ট-প্যান্ট-টাই পরিয়ে দেওয়া হয়। কখনও কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে, সাইকেলের ওপর এমন ভাবে খেতের বেড়ার পাশে বসানো হয়, যাতে পশুপাখি তো বটেই, মানুষও জ্যান্ত পাহারাদার বলে ভুল করে।পোলিশ কাকতাড়ুয়া
পোল্যান্ডের চাষিরা অবশ্য খড়, শুকনো পাতা ইত্যাদি দিয়ে তৈরি মোটাসোটা কাকতাড়ুয়া পছন্দ করে। কখনও-কখনও এদের চোখে চশমাও পরিয়ে দেওয়া হয়।কাকতাড়ুয়া উৎসবও হয় নানা দেশে
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাকতাড়ুয়াদের নিয়ে আয়োজিত হয় কাকতাড়ুয়া উৎসব। স্কটল্যান্ডে প্রথম কাকতাড়ুয়া উৎসব পালিত হয়েছিল ২০০৪ সালে।ইংল্যান্ডে প্রতি বছর মে ডে-তে ‘আর্চফন্ট স্কেয়ারক্রো ফেস্টিভ্যাল’ আয়োজিত হয়। ব্রিটেনের বিভিন্ন অঞ্চলে বছরের বিভিন্ন সময়ে কাকতাড়ুয়া উৎসব পালন করা হয়। এর মধ্যে ল্যাঙ্কাশায়ারের ‘ওয়েরি ফেস্টিভ্যাল’ উল্লেখযোগ্য। কাকতাড়ুয়া উৎসব উপলক্ষে পৃথিবীর বৃহত্তম জমায়েত হয় ইংল্যান্ডের স্টেফোর্ডশায়ারে। ফিলিপাইনের ইসাবেলা প্রদেশে যে কাকাতাড়ুয়া উৎসব পালিত হয়, স্থানীয় ভাষায় সেই উৎসবের নাম ‘বামবান্তি ফেস্টিভ্যাল’।কাকতাড়ুয়া রোবোট
আজকাল অবশ্য কাক তো বটেই, অন্য পাখিরাও কাকতাড়ুয়াকে আর তেমন ভয় পায় না। বরং তাদের মাথার ওপর বসেই দিব্যি কিচিরমিচির করে। এই দেখে জাপানিরা কাকতাড়ুয়ার কাজে লাগিয়েছে রোবোটকে। জ্যান্ত মানুষের মতো কাকতাড়ুয়ারা ‍দিনরাত লাঠি হাতে সমস্ত মাঠ ঘুরে-ঘুরে ফসল পাধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।হারা দেয়। আর এভাবেই, প্রযুক্তির গ্রাসে গ্রাম্য কাকতাড়ুয়ার সেই বৈশিষ্ট্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

ফেসবুক হ্যাকড হলে বুঝবেন যেভাবে ।হ্যাকার থেকে ফেসবুক একাউন্ট নিরাপদ রাখার যত উপায়ঃ


দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা ফেসবুক আইডি হ্যাক করে অঘটন ঘটানোর অপচেষ্টা চলছে বারবার। এতে বিপাকে পড়ছেন যাঁর ফেসবুক আইডি হ্যাক করা হয় তিনিও। ফলে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে। কেউ যদি আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে আপনার ক্ষতি করতে চায়, তাহলে আপনার অ্যাকাউন্টে আপনি পাসওয়ার্ড দিয়েও ঢুকতে পারবেন না। কিন্তু আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে ই-মেইল বা পোস্ট যেতে থাকবে। তখন আপনি বুঝবেন আপনি আপনার অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন।আবার এমনও হতে পারে, আপনি আপনার অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারছেন কিন্তু আপনার নামে আপত্তিকর মেইল বা পোস্ট দেয়া হচ্ছে; সে ক্ষেত্রে আপনি ধরে নিতে পারেন আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে।

#ফেসবুক একাউন্ট নিরাপদ রাখার যত উপায়ঃ

কখনো কি আপনার ফেসবুক একাউন্ট হ্যাকিংয়ের চেষ্টা হয়েছে? অথবা অপরিচিত কোন এলাকা বা কম্পিউটার থেকে লগইন হয়েছে, যা আপনি মনে করতে পারছেন না? আপনার একাউন্ট থেকে আপনার অজান্তেই কারো কাছে বার্তা চলে যাচ্ছে?
এরকম হলে আপনার একাউন্টে হয়তো অযাচিত প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে।
সাইবার হামলা, একাউন্ট হ্যাকিংয়ের চেষ্টা নতুন নয়। ইন্টারনেটের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতা অনেক বেড়েছে। কিছুদিন আগে এরকম একটি হামলায় পাঁচ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য চুরি হয়েছে।
ফেসবুকের জনপ্রিয়তা যেমন বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে বিভিন্ন একাউন্টে ব্যক্তিগত তথ্য থাকা এবং সামাজিক বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ থাকার কারণে একাউন্টগুলো অনেক ক্ষেত্রেই হ্যাকারদের লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে।
সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন।
বিটিআরসি জানিয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তারা সামাজিক মাধ্যম সম্পর্কিত ১২১টি অভিযোগ পেয়েছে। মূলত ফেসবুক ব্যবহার করে গুরুতর অপরাধ বা সমস্যা তৈরি করার অভিযোগ বিটিআরসি পর্যন্ত গড়ায়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার নাজমুল ইসলাম বলছেন, “প্রতিদিন ফেসবুক সম্পর্কিত গড়ে প্রায় পাঁচশো অভিযোগ আমরা পাই। এর বেশিরভাগই একাউন্ট হ্যাক হয়ে গেছে, প্রবেশ করা যাচ্ছে না এ ধরণের।”
তবে হ্যাকিং বা সমস্যার শিকার হলেও অনেক অভিযোগই কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত যায়না।
ফেসবুকের নিরাপত্তা পাতা Security and Login একাউন্ট নিরাপদ রাখার বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে:
পাসওয়ার্ড: ফেসবুকের পাসওয়ার্ড অন্য কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা উচিত নয় বা এটি কারো সঙ্গে শেয়ার করা ঠিক না। পাসওয়ার্ড হতে হবে ছোটবড় অক্ষর ও নম্বর মিলিয়ে, অন্ততপক্ষে আট সংখ্যার, যা সহজে কেউ ধারণা করতে না পারে। যেমন নিজের বা ঘনিষ্ঠ কারো নাম, জন্মতারিখ, বিয়ে বার্ষিকী, পরীক্ষার বছর ইত্যাদি পাসওয়ার্ড হিসাবে সবসময়েই ঝুঁকিপূর্ণ।
#লগইন: কখনোই ফেসবুকের লগইন তথ্য ফেসবুক ছাড়া আর কোথাও প্রবেশ করানো যাবে না। অনেক সময় স্ক্যামাররা ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে ফেসবুকের আইডির লগইন ইমেইল বা পাসওয়ার্ড চাইতে পারে। এরকম ক্ষেত্রে আগে সেই ওয়েবসাইটের ইউআরএল দেখে নিন। ফেসবুকের বাইরে আরো কোন শব্দ সেখানে থাকলে বা কোন সন্দেহ হলেই http://www.facebook.com টাইপ করে একাউন্ট খুলুন।
যেখানে অনেক ব্যক্তি একই কম্পিউটার ব্যবহার করেন, সেখানে অবশ্যই ফেসবুক ব্যবহার শেষে লগআউট করুন। যদি ভুলে যান, তাহলে ফোন বা অন্য কোন কম্পিউটারে ফেসবুকে লগইন করে সিকিউরিটি এন্ড লগইন সেটিংয়ে গিয়ে দেখতে পাবেন, সর্বশেষ কোথায় আপনি লগইন করেছিলেন। সেখানে ডিভাইস সনাক্ত করে লগআউট করে দিতে পারেন।বন্ধু গ্রহণে সতর্কতা: ফেসবুকের পরামর্শ, কখনোই এমন কাউকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ না করা, যাকে আপনি চেনেন না। এক্ষেত্রে হ্যাকাররা হয়তো মিথ্যা পরিচয়ে আপনার বন্ধু হয়ে আপনার টাইমলাইনে স্প্যাম ছড়াতে পারে, আপনাকে বিব্রতকর পোস্টে ট্যাগ করতে পারে বা হ্যাকিংয়ের মেসেজ পাঠাতে পারে।
দূষিত সফটওয়্যার বা কম্পিউটার: অনেক সময় আপনার ফোন, ট্যাব, কম্পিউটার, এমনকি ক্রোম বা ফায়ারফক্সের মতো ব্রাউজিং সফটওয়্যার বিশেষ কোড দ্বারা আক্রমণের শিকার হতে পারে। যদি আপনার একাউন্ট থেকে নিজে নিজেই অন্যদের কাছে বার্তা যেতে থাকে, বা একাউন্ট ব্যবহারের ভুল ইতিহাস দেখায় অথবা অ্যাকটিভিটি লগে এমন সব পোস্ট দেখতে পান, যা আপনি মনে করতে পারছেন না, তখন আপনার সতর্ক হওয়া উচিত।
কম্পিউটার বা মোবাইল খুব আস্তে কাজ করছে, এমন সফটওয়্যার দেখতে পাচ্ছেন যা আপনি ইন্সটল করেননি, আপনার সার্চ ইঞ্জিন পাল্টে গেছে কিন্তু আপনি তা করেননি,তখনো বুঝতে হবে হয়তো আপনি আক্রান্ত হয়েছেন।
এ ধরণের ক্ষেত্রে ESET বা TrendMicro সফটওয়্যার ব্যবহার করে কম্পিউটার বা মোবাইল পরিষ্কার করার পরামর্শ দিয়েছে ফেসবুক। ক্রোম ক্লিন আপ টুল ব্যবহার করে ব্রাউজার দূষণ মুক্ত করা যেতে পারে। এছাড়া ওয়েব ব্রাউজার নিয়মিত আপডেট করা উচিত।কখনোই সন্দেহজনক কোন লিংকে ক্লিক করবেন না: যদি ঘনিষ্ঠ কোন বন্ধু বা ফেসবুক বন্ধুর কাছ থেকে কোন ইমেইল, মেসেঞ্জারে বার্তা, বা পোস্ট পান, যা হয়তো তার স্বাভাবিক আচরণের সঙ্গে মেলে না, সবচেয়ে ভালো হবে সেটায় ক্লিক না করা বা সাড়া না দেয়া। যেমন কেউ হয়তো লিখতে পারে যে, সে কোথাও বেড়াতে গিয়ে বিপদে পড়েছে অথবা আপনার মেসেঞ্জারে এমন একটি লিংক পাঠিয়েছে, যার কোন কারণ নেই। এক্ষেত্রে তাকে আলাদাভাবে একাউন্টে নক করে বা বার্তা পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারেন। এ ধরণের সন্দেহজনক কিছু দেখলে রিপোর্ট করার পরামর্শ দিয়েছে ফেসবুক।
তবে আইটি বিশেষজ্ঞ জাকারিয়া স্বপন বলছেন, বাংলাদেশে কোন ফেসবুক একাউন্ট পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কারণ যখন একাউন্ট করার সময় একটি ফোন নম্বর দেয়া হয়, সেসব ফোনের ওপর যে কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি থাকে, তারা চাইলে সেসব বার্তা দেখতে পারে। তখন এর মাধ্যমে তাদের পক্ষে ফেসবুকের প্রবেশ বা নিয়ন্ত্রণ নেয়া সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাছে এমন কিছু প্রযুক্তি রয়েছে, যা দিয়ে বিভিন্ন বাহিনী বা সংস্থার সদস্যরা যেকোন ফেসবুক একাউন্ট সনাক্ত বা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন।কিভাবে অতিরিক্ত সতর্ক ব্যবস্থা নেয়া যায়?এডিসি নাজমুল ইসলাম বলছেন, “নিরাপদ রাখার ব্যাপারে ফেসবুকে যেসব পরামর্শ দেয়া হয়েছে, আমিও সেগুলোই সবাইকে অনুসরণ করতে বলবো।”
“তবে সমস্যা হলো, যখন কাউকে টার্গেট করা হয়,তখন হ্যাকাররা নানা পদ্ধতি অনুসরণ করে তাদের বিপদে ফেলে। আমরা বিষয়টি ফেসবুককে জানিয়েছে। তবে নিজে সতর্ক থাকলে বা প্রতিটি মন্তব্য বা লিংকে ক্লিক করার আগে সতর্ক হলে অনেকাংশে নিরাপদ থাকা সম্ভব।”


একাউন্টের নিরাপত্তার জন্য বাড়তি কিছু ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে ফেসবুক। এর সবগুলোই রয়েছে আপনার একাউন্টের সিকিউরিটি এন্ড লগনই পাতায়। ফেসবুকের একবারে ডানদিকে যে চিহ্নটি রয়েছে, সেখানে ক্লিক করে সিকিউরিটি এন্ড লগইনে প্রবেশ করুন।অপরিচিত লগইনের বিষয়ে তথ্য: একটু নীচের দিকে দেখতে পাবেন, যেখানে বলা হয়েছে, অপরিচিত লগইনের বিষয়ে সতর্ক বার্তা গ্রহণের ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে। ডানদিকে এডিট বাটনে ক্লিক করে একাউন্ট এবং মেসেঞ্জারের লগইনের বিষয়ে সতর্ক বার্তা পাবার বিষয়টি চালু করে দিন। এরপর সেভ বাটনে ক্লিক করলে আপনার পাসওয়ার্ড চাইবে। এরপর থেকে কোথাও আপনার একাউন্ট লগইন হবে,তখন আপনাকে একটি বার্তা বা মেসেজ দিয়ে জানাবে ফেসবুক।
দ্বি-স্তর যাচাই: এই পাতার একটু নীচের দিকে টু-ফ্যাক্টর ভেরিফিকেশন বা দ্বি-স্তর যাচাই ব্যবস্থা প্রথমে আপনাকে চালু করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে কেউ আপনার পাসওয়ার্ড পেলেও এই কোড না থাকার কারণে লগইন করতে পারবে না। এজন্য মোবাইল নম্বর বা ফোনে একটি অ্যাপলিকেশন ব্যবহার করতে পারেন। সিকিউরিটি এন্ড লগইন পাতায় গিয়ে আপনার মোবাইল ফোনের নম্বরটি যোগ করে দিকে পারেন। এরপর থেকে প্রতিবার ফেসবুকে প্রবেশের সময় বিনামূল্যে একটি এসএমএস আসবে এবং সেটি প্রবেশ করিয়ে লগইন করতে হবে।অথবা আপনি গুগল থেকে অথেনটিকেটর অ্যাপ মোবাইলে ডাউন লোড করে নিতে পারেন। এরপর ফেসবুকে এই পাতায় নতুন অ্যাপ সংযুক্ত করার বাটনে ক্লিক করলে যে কিউআর কোড আসবে, সেটা স্ক্যান করে নিলেই অ্যাপটি ফেসবুকের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যাবে। এরপর প্রত্যেকবার ফেসবুকে প্রবেশ করতে হলে এই অ্যাপ থেকে পাওয়া কোডটি আপনার পাসওয়ার্ডের সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে দিতে হবে।
এই দুইটি পদ্ধতি বেশিরভাগ মানুষ ব্যবহার করেন। এছাড়া পেন ড্রাইভের মাধ্যমে ইউনিভার্সাল সেকেন্ড ফ্যাক্টর বা রিকভারি কোড ব্যবহারেরও সুযোগ আছে।
একজন বন্ধুকে নির্বাচন: আপনার ফেসবুক একাউন্ট যদি কখনো আটকে যায়, তখন একজন নির্বাচিত বিশ্বস্ত বন্ধুর সহায়তা সেটি পুনরুদ্ধার করতে পারেন। নিরাপত্তার এই পাতাতেই নীচের দিকে তিন থেকে পাঁচজন বন্ধুকে নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছে, যারা একাউন্ট লক হয়ে গেলে বা হ্যাকিংয়ের শিকার হলে আপনাকে ফিরে পেতে সহায়তা করবে। সেখানে এডিট বাটনে ক্লিক করে তিন থেকে পাঁচজন বন্ধুকে সিলেক্ট করে দিন।
তবে কম্পিউটারটি যদি আপনি নিয়মিত ব্যবহার করেন, তাহলে ব্রাউজারটি সেভ করে রাখলে পরবর্তীতে আর এই ব্যবস্থা অনুসরণ করতে হবে না।
নিরাপদ থাকতে ফেসবুকে আরো কিছু ব্যবস্থাঃফেসবুকে কারো অনধিকার প্রবেশে হয়েছে মনে হলেই আইডি ও পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া প্রতি দুই মাসে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা উচিত বলে তারা মনে করেন।
কখনো যদি মনে করেন কারো পোস্ট বা বক্তব্য আপনার জন্য ক্ষতিকর বা হুমকি, তখন আপনি রিপোর্ট বাটনে ক্লিক করে ফেসবুকের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন।
ফেসবুকে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার, শিশুদের জন্য নির্যাতনমূলক ভাষা বা পোস্ট ঠেকাতে বিভিন্ন দেশের সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে ফেসবুক। এই পাতায় এ সংক্রান্ত বিস্তারিত রয়েছে, যেখানে অভিযোগ জানালে ফেসবুক ব্যবস্থা নেবে।

বিনামূল্যে বাংলা বই পড়তে ৬টি দারুণ ওয়েবসাইট

কাগজের বইয়ের সময় কি ফুরিয়ে আসছে ক্রমশ! না, একটি তরতাজা বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে উল্টিয়ে পড়া আর নতুন বইয়ের ঘ্রাণ এর আবেদন কখনোই ফুরাবে না। তবে ই-বুক বা পিডিএফ ফরমেটের বইয়ের চাহিদাও বেড়েছে। বই রাখা নিয়ে ঝামেলা যেমন নেই— তেমন মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ বা পিসিতে বসে পড়ে ফেলা যায় সহজেই। একটা মেমোরি কার্ডে রাখা যায় হাজার হাজার বই। যারা ই-বুক, পিডিএফ ফরমেটে বই পড়তে ভালোবাসেন। সেইসব বইয়ের পোকাদের জন্য দিচ্ছি ফ্রি-বইয়ের খোঁজ। ঘুরে আসুন অনলাইন বইয়ের জগৎ থেকে। ডাউনলোড করে নিন প্রিয় বই, প্রয়োজনীয় বই। আর সমৃদ্ধ করুন জ্ঞানের পরিধি।
১। বইয়ের দোকান: (www.boierdokan.com)২০০৯ সালে প্রথম চালু হলেও টেকনিক্যাল কারণে খুব একটা বেশি বই আপলোড হয়নি । ২০১১ সালে পুনরায় নতুন আঙ্গিকে শুরু হয় বইয়ের দোকান। বইয়ের দোকানের উঠানে গিয়ে দাঁড়ালে উপন্যাস, কবিতা, গল্প, সমালোচনা, নাটক, নন-ফিকশন প্রভৃতি বইয়ের দরজাগুলো দেখাবে। দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেই অজস্র বই। ফ্রি ডাউনলোড করে করতে পারবেন বইগুলো। আর ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো বইয়ের দোকান ই-বইমেলার আয়োজন করেছিলো।
২। আমার বই: (www.amarboi.com)এই সাইটে ফ্রি বই থাকলেও সব বই ফ্রিতে পাওয়া যায় না। প্রতি বছরের জন্য ২৪.৯৯ ডলার ফি দিয়ে প্রিমিয়াম সদস্য হওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রিমিয়াম সদস্যদের বই ডাউনলোডের সুযোগ-সুবিধা একটু বেশিই।
৩। সোভিয়েট বইয়ের অনুবাদ: (www.sovietbooksinbengali.com)তলস্তয়, দস্তোয়ভস্কি, নিকোলাই অস্ত্রভস্কি, আর্কিদি গাইদার কিংবা ম্যাক্সিম গোর্কি সহ আর আর রুশ লেখকদের বইয়ের অনুবাদ পাবেন এই সাইটে। রুশ উপকথা বা কিশোর সাহিত্যের দুষ্প্রাপ্য বইগুলোও ইলেকট্রনিক ফরমেটে ডাউনলোড করে নিতে পারেন।
৪। অলবাংলাবুকস: (www.allbdbooks.com/viewbook/B/1182/)এই সাইটে হাজার খানিকের মতো বই রয়েছে। ফ্রি ডাউনলোড করতে পারবেন গল্প, উপন্যাস, ম্যাগাজিন, রহস্যপত্রিকা এবং সেবা প্রকাশনীর প্রিয় বইয়ের কিছু।
৫। বাংলা ইন্টারনেট: (www.banglainternet.com)বাংলা ইন্টারনেট বইয়ের পাশাপাশি লেখকদেরও সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল যুক্ত করা রয়েছে। ফলে শুধু বই-ই না, লেখক সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় তথ্য আপনি পেতে পারেন বাংলা ইন্টারনেট থেকে।
৬। দ্য বাংলাবুক: (www.thebanglabook.com)দেড় হাজারের মতো বই রয়েছে এই সাইটে। লেখক অনুসারে সাজানো বইগুলো থেকে ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। এ ছাড়া আছে বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও পত্রিকা।
এগুলো ছাড়াও আরো অনেক সাইট রয়েছে যেখান থেকে আপনি ফ্রিতে ডাউনলোড করে নিতে পারবেন প্রয়োজনীয় বাংলা বই। তবে একটা বইয়ের পেছনে লেখকের যেমন মেধা ও শ্রমের বিনিয়োগ থাকে তেমন প্রকাশকের থাকে অর্থের বিনিয়োগ। তাই অবশ্যই বই কিনে পড়া উচিত।