
দাজ্জালের আলোচনা-১
হযরত ইমরান বিন হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘হযরত আদম (আঃ) এর জন্ম থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দাজ্জালের ফিতনার চেয়ে বড় ফিতনা আর কোনো কিছুই হবে না। (সহীহ মুসলিম)
দাজ্জালের আলোচনা উম্মতের জন্য একটি অতিব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রায় সকল মুসলমানই জাহিলী সভ্যতা-সংস্কৃতিতে মজে সেই আলোচনা থেকে উদাসীন। দাজ্জাল আবির্ভাবের যতগুলো আলামত রয়েছে, তন্মধ্যে এটিও একটি যে, সে সময় মানুষ দাজ্জালের আলোচনা ভুলে যাবে।
সুতরাং আপনি যদি নিজেকে ও পরিবারের লোকজনকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা করার ইচ্ছে রাখেন, এর জন্য মুসলমানদেরর ঘরে ঘরে এর আলোচনা খুবই জরুরী। যাতে আপনার কোলে বেড়ে ওঠা শিশুটি তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুশমন দাজ্জাল সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করতে পারে।
দাজ্জাল সম্পর্কে ইহুদিদের দৃষ্টিভঙ্গিঃ
সে ইহুদিদের সম্রাট হবে। সকল ইহুদীকে বাইতুল মুকাদ্দাসে আবাদ করবে। সমস্ত পৃথিবীর উপর ইহুদিদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। পৃথিবীতে ইহুদিদের কোনো ভয় থাকবে না। সকল সন্ত্রাসবাদীকে নির্মূল করে ফেলবে এবং সর্বত্র শান্তি ও সুবিচারের রাজত্ব কায়েম হয়ে যাবে। সমগ্র পৃথিবীর সকল ইহুদিদেরকে ইসরায়েলে এনে জমায়েত করবে।।
দাজ্জালের ফিতনা-২
দাজ্জালের ফিতনা কতটা ভয়ংকর একটি বিষয় দ্বারাই অনুমান করা যায় যে, স্বয়ং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন এবং তিনি যখন সাহাবায়ে কেরামের সামনে এই ফিতনার আলোচনা করতেন, তখন তাঁদের চেহারায় ভয়ের ছাপ পরিলক্ষিত হত। প্রশ্ন হলো, দাজ্জালের ফিতনায় সেই বিষয় কোনটি, যেটি সাহাবিদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল? সেটা কি ভয়াবহ যুদ্ধ নাকি মৃত্যু? কিন্তু সাহাবাগণ এ বিষয়গুলোকে ভয় পাওয়ার মতো মানুষ ছিলেন না।
সেই বিষয়টা হচ্ছে, দাজ্জালের ধোঁকা এবং প্রতারণা। সে সময়টা এত ভয়াবহ হবে যে, বাস্তব অবস্থাটা আসলে কি তা বুঝাই সম্ভব হবে না। মানুষকে বিভ্রান্তকারী নেতার ছড়াছড়ি থাকবে। অপপ্রচারের হালচাল এমন হবে যে, মূহুর্তের মধ্যে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যা বানিয়ে পৃথিবীর কোনায় কোনায় পৌঁছে দেওয়া হবে। মানবতার শত্রুকে মুক্তিদাতা আর মুক্তিদাতাকে সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করা হবে।
এ কারনেই প্রিয়নবী (সাঃ) দাজ্জালের ফিতনাকে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। তার গঠন, আকৃতি ও আত্মপ্রকাশের স্থান পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, সাধারণ মানুষ তো বটে, বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও এই ফিতনার আলোচনা একদম ছেড়ে দিয়েছেন। অথচ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার এই ফিতনার আলোচনা করে বলেছেন, “আমি বিষয়টি তোমাদেরকে বারবার আলোচনা এজন্য করছি, যাতে তোমরা বিষয়টি ভুলে না যাও। তোমরা বিষয়টি উপলব্ধি করো, তাতে গবেষণা করো এবং অন্যদের কানে পৌঁছে দাও।”
পর্ব-৩
দাজ্জালের গঠন-প্রকৃতিঃ
হযরত উবাদাহ বিন সামেত, আব্দুল্লাহ বিন ওমর ও আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদের কাছে দাজ্জাল সম্পর্কে বারবার আলোচনা করেছি, তবুও আশংকা করছি যে, তোমরা তার প্রকৃত অবস্থা হয়ত নাও বুঝতে পারো। জেনে রাখ, মাসীহে দাজ্জাল হবে খাট ও মোটা, পায়ের নলা লম্বা লম্বা এবং হালকা বাঁকা। মাথার চুলগুলো খুব ঘন, কোঁকড়ানো এবং জটবাঁধা। তার বাম চক্ষু কানা, দেখতে যেন ফোলা আঙুরের মতো। আর ডান চক্ষু সমান। চোখ সিসার মতো সবুজ হবে। এরপরও যদি সন্দেহে পড়ে যাও, তবে একথা মনে রাখবে যে, তোমাদের রব অবশ্যই কানা নন। তার দুচোখের মাঝখানে (আরবীতে) ‘কাফের’ লিখা থাকবে। যেটি লেখাপড়া জানা অজানা সব মুমিন পড়তে পারবে। তার সঙ্গে জান্নাত ও জাহান্নাম থাকবে। কিন্তু মূলত তার জাহান্নাম হল জান্নাত আর জান্নাত হল জাহান্নাম। [ সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬৫৯৮/ সহীহ মুসলিম, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২২৪৮] দাজ্জাল সুনির্দিষ্ট এক ব্যক্তি হবে। কারণ হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে। কাজেই কোনো রাষ্ট্রকে দাজ্জাল মনে করা ঠিক নয়। যেমনটি খাওয়ারিজ ও জাহমিয়া প্রভৃতি ভ্রান্ত দলগুলো মনে করে থাকে।।
আলোচ্য হাদিসে ‘কাফের’ লেখাটি সব মুমিনই পড়তে পারবে। প্রশ্ন জাগে, সবাই যখন পড়তে পারবে তখন মানুষ তার ফিতনায় আক্রান্ত হবে কেন?
এর উত্তর হল সেই হাদিস, যাতে বলা হয়েছে পরিচয় পাওয়া সত্ত্বেও বহু মানুষ জাগতিক স্বার্থের খাতিরে দাজ্জালের সঙ্গ দিবে। আরেকটি উত্তর এই হতে পারে, পড়তে পারা আর লেখার মর্ম অনুযায়ী আমল করা এক নয়। বর্তমান যুগেও বহু মুসলমান এমন আছে যারা কুরআনের বিধানাবলী পড়ে, কিন্তু সেই অনুযায়ী আমল করে না।সবাই জানে সুদী ব্যবস্থা সরাসরি আল্লাহর সাথে যুদ্ধ। কিন্তু বহু মানুষ তার সাথে জড়িত।
দাজ্জালের যুগেও বহু মানুষ ধন-দৌলত ও জাগতিক সৌন্দর্যের বিনিময়ে নিজদের ঈমান বিক্রি করে ফেলবে। তারা ঈমান পরিত্যাগ করে দুনিয়াকে বরণ করে নিবে। যারা দাজ্জালের বিরুদ্ধে লড়াই করবে তাদেরকে এরা বিভ্রান্ত বলবে। নিজেদেরকে তারা মুসলিম বলেই দাবি করবে। অধচ ইসলামের সাথে এদের কোনোই সম্পর্ক থাকবে না।।
(পর্ব-৪)
দাজ্জালের সঙ্গে তামীম দারী (রাঃ) এর মোলাকাতঃ
হযরত ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোষককে এই ঘোষণা দিতে শুনলাম, “আসসালাতু জামি’আতুন’ (নামাজ প্রস্তুত)। সুতরাং আমি মসজিদে চলে গেলাম এবং প্রিয়নবীর পিছনে নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে তিনি মিম্বরে বসলেন এবং মৃদু হেসে বললেন, প্রত্যেকে নিজ নিজ নামাজের স্থানে বসে থাক। অতঃপর বললেন, তোমরা কি জান আমি কেন তোমাদেরকে একত্র করেছি? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।
তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তোমাদেরকে কিছু দেওয়ার জন্য বা ভয়-ভীতি দেখানোর জন্য সমবেত করিনি। বরং আমি তোমাদেরকে একটি ঘটনা শোনাবো।
তামীম দারী নামে এক খৃস্টান ছিল। সে আমার নিকট এসে মুসলমান হয়েছে। সে আমাকে একটি ঘটনা বলেছে, যেটি আমি দাজ্জাল সম্পর্কে আগে যা বলেছি তার অনুরূপ। সে আমাকে বলেছে,
আমরা বনু লাখম ও বনু জুযামের ত্রিশজন লোক নিয়ে সমুদ্রে নৌকা ভ্রমনে বের হয়ে ছিলাম। সমুদ্রের তরঙ্গ একমাস যাবত আমাদেরকে দিকবিদিক ঘুরাতে লাগলো। অবশেষে একদিন সন্ধ্যাবেলা আমাদের নৌকাটি একটি অজানা দ্বীপে গিয়ে উপনীত হল। অতঃপর আমরা ছোট ছোট ডিঙিতে করে দ্বীপটির ভেতরে ঢুকে গেলাম। ওখানে আমরা একটি বিস্ময়কর প্রাণীর সাক্ষাৎ পেলাম। যার সারা দেহ বড় বড় পশমে ঢাকা। চুলের আধিক্যের কারণে আমরা তার অগ্র-প্রশ্চাত নির্ণয় করতে পারিনি। আমরা বললাম, তোর ধ্বংস হোক, কে তুই?
প্রাণীটি বলল, আমি জাসসাসা। (গুপ্ত সংবাদ অন্বেষণকারিণী) তোমরা গীর্জায় আবদ্ধ সেই লোকটার কাছে যাও, যে তোমাদের সংবাদ নিয়ে খুবই বিচলিত।
তামীম দারী বলেন, আমরা ঐ প্রাণীটির কথা শুনে ভয় পেয়ে গেলাম যে, ওটা ভূত-পেত্নী কিনা! আমরা খুব তাড়াতাড়ি গির্জায় চলে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, ভেতরে বৃহদাকার এমন এক লোক বসে আছে যে, এমন ভয়ংকর মানব এর আগে আমরা কখনো দেখিনি। লোকটার হাত দু’টো কাঁধ অবধি আর পা দুটি হাঁটু পর্যন্ত লোহার শৃঙ্খল দিয়ে বাঁধা। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, তোমার ধ্বংস হোক, কে তুমি?
সে বলল, নিশ্চয়ই তোমরা আমার সম্পর্কে জানতে পারবে। তবে প্রথমে বলো, তোমরা কারা? আমরা বললাম, আমরা আরবের লোক। আমরা সমুদ্রে একটি নৌকায় আরোহী ছিলাম, দীর্ঘ একমাস সাগরের ঢেউ আমাদেরকে এদিক সেদিক ঘুরিয়ে এখানে পৌঁছে দিয়েছে।
পর্ব-৫
সে জিজ্ঞেস করল, বায়সান এলাকার খেজুর বাগানে ফল আসে কি? আমরা বললাম, হ্যাঁ আসে। সে বলল, অদূর ভবিষ্যতে সেই বাগানে ফল ধরবে না।
অতঃপর সে জিজ্ঞেস করল, তাবারিয়া নদীতে পানি আছে কি? আমরা বললাম, সেই নদীতে প্রচুর পানি আছে। সে বলল, সেই সময়টি নিকটে, এই নদীর পানি শুকিয়ে যাবে।
তারপর সে বলল, যোগার ঝর্ণায় পানি আছে কি? সেখানকার লোকেরা সেই পানি দ্বারা কৃষিকাজ করে কি? আমরা বললাম, হ্যাঁ।
অতঃপর জিজ্ঞেস করল, উম্মীদের নবীর সংবাদ কি? আমরা বললাম, তিনি মক্কা থেকে হিযরত করে ইয়াসরিবে (মদিনায়) চলে গেছেন।
সে জিজ্ঞেস করল, আরবরা তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে কি? আমরা বললাম, হ্যাঁ, করেছে।
সে বলল, তিনি আরবদের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করেছেন? আমরা বললাম, তাঁর আশেপাশের আরবদের উপর তিনি বিজয়ী হয়েছন এবং তাঁর আনুগত্য মেনে নিয়েছেন। সে বলল, তাঁর আনুগত্য মেনে নেওয়াই এদের জন্য উত্তম।
এবার আমি তোমাদেরকে আমার অবস্থা বলছি, আমি মাসীহে দাজ্জাল। অদূর ভবিষ্যতে আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। আমি বাইরে বের হয়ে চল্লিশ দিনের মধ্যে সারা পৃথিবী বিচরণ করব। (একটি পাড়া বা মহল্লাও বাদ যাবেনা আমার ভ্রমন থেকে) কিন্তু মক্কা ও মদিনা যাব না। ওখানে যেতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। আমি যখন তার কোনটিতে ঢুকতে চেষ্টা করব, তখনই একজন ফেরেশতা তলোয়ার হাতে নিয়ে আমাকে প্রতিহত করবে। ওই শহরগুলোর প্রতিটি সড়কে ফেরেশতা মোতায়েন থাকবে।
এই ঘটনা শোনানোর পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতের লাঠি দিয়ে মিম্বরে আঘাত করে বললেন, এই হল তাইবাহ, এই হল তাইবাহ, এই হল তাইবাহ অর্থাৎ মদীনা। তারপর তিনি বললেন, শোন আমি তোমাদেরকে এই বিষয়টিই বলতাম। মনে রেখো, দাজ্জাল শাম কিংবা ইয়ামেনের কোন সাগরে নেই। সে পূর্বদিকের কোন একস্থানে রয়েছে। এই বলে তিনি হাত দ্বারা পূর্বদিকে ইশারা করলেন। [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-৫২৩৫]
পর্ব-৬
দাজ্জালের পূর্বে পৃথিবীর হালাতঃ
দাজ্জালের আবির্ভাবের আগের বছরগুলোতে পৃথিবীতে বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও গণহত্যা চলতে থাকবে। বেকারত্ব, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অস্থিতিশীলতা, উচ্চমূল্য ও সামাজিক অবিচারের রাজত্ব চলবে। পরিবারে শান্তি ও নিরাপত্তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। সর্বত্র পাপ ও মন্দের জয়জয়কার হবে। কোথাও কোথাও সামান্য সৎকর্ম ও সচ্চরিত্র চোখে পড়বে। মানুষ এমন লোকেরও প্রশংসা করবে, যে ৯৯ভাগ পাপ-অন্যায় ও জুলুমে লিপ্ত; মাত্র ১ভাগ সৎকাজ করছে। নেতাদের থেকে নিরাশ হয়ে মানুষ এমন কোন মুক্তিদাতার সন্ধানে থাকবে যাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরণ করা হবে।
হযরত আসমা বিনতে ইয়াযিদ (রাঃ) বলেন, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমার ঘরে অবস্থানরত ছিলেন এবং দাজ্জাল সম্পর্কে বলেনঃ দাজ্জাল আবির্ভাবের আগের তিন বৎসর এমন হবে যে, প্রথম বৎসর আসমান একতৃতীয়াংশ বৃষ্টি আটকে রাখবে এবং যমীন একতৃতীয়াংশ ফসল উৎপাদন বন্ধ রাখবে। দ্বিতীয় বৎসর আকাশ দুই-তৃতীয়াংশ বৃষ্টি আটকে রাখবে আর যমীন দুই-তৃতীয়াংশ ফসল উৎপাদন বন্ধ রাখবে। আর শেষ তৃতীয় বৎসর আসমান সম্পূর্ণ বৃষ্টি আটকে রাখবে আর যমীন পূর্ণ ফসল উৎপাদন বন্ধ রাখবে। অর্থাৎ কোন গাছে ফল ধরবে না, তরুলতা-শাকসবজি উৎপন্ন হবে না। সব ধরনের গবাদিপশু ধ্বংস হয়ে যাবে। [আল মুজামুল কাবীর, হাদিস নং-৪০৬]
হযরত আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল আবির্ভাবের আগের কয়েকটি বছর হবে প্রতারণার বছর। এই সময়ে সত্যবাদীকে মিথ্যাবাদী আর মিথ্যাবাদীকে সত্যবাদী আখ্যায়িত করা হবে। দুর্নীতিবাজকে আমানতদার আর আমানতদারকে দুর্নীতিবাজ মনে করা হবে। [মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং-১৩৩২]
হযরত উমায়ের বিন হানী বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একটি সময় আসবে যখন মানুষ দুটি তাঁবুতে (দলে) বিভক্ত হয়ে যাবে। একটি তাঁবু হবে ঈমানের, যেখানে যেখানে কোন মুনাফেকি থাকবে না। আরেকটি তাঁবু হবে নিফাকের, যেখানে কোন ঈমান থাকবে না। যখন এমন পরিবেশ তৈরি হয়ে যাবে সেদিন থেকে অথবা তার পরেরদিন থেকে দাজ্জালের অপেক্ষা করো। [আবু দাউদ, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৯৪]
হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলাম। আমি তাঁকে বলতে শুনলাম, আমি আমার উম্মতের জন্য একটা বিষয়ে দাজ্জালের থেকে বেশি ভয় করছি। এটা শুনে আমি ভয় পেলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, সেটা কি? তিনি বললেন, পথভ্রষ্ট এবং ধ্বংসযোগ্য আলেমরা। [মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং-২১৩৩৪]
হযরত আবু দারদা (রাঃ) এর হাদিসে রয়েছে, বিভ্রান্তকারী নেতৃবৃন্দের কথা।
দাজ্জালের সময়ে এই চরিত্রের আলেম ও নেতার ছড়াছড়ি থাকবে। দাজ্জালী শক্তির চাপ বা প্রলোভনে এসে তারা নিজেরাও সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে এবং তাদের অনুগত অনুসারীদেরকেও সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখার কারণ হবে।।
পর্ব-৭
দাজ্জাল কোন দেশ থেকে আত্মপ্রকাশ করবে।
এ বিষয়ে দুটি বর্ণনা পাওয়া যায়।
হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দাজ্জাল ইস্পাহানের ইহুদিয়া অঞ্চল থেকে আত্মপ্রকাশ করবে। ইস্পাহানের ৭০হাজার ইহুদী দাজ্জালের অনুসারী হবে। তাদের দেহে সবুজ রঙের চাদর বা জুব্বা থাকবে। [সহীহ মুসলিম, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২২৬৬]
হযরত আবু বকর (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল পৃথিবীর এমন একটি অঞ্চল থেকে বের হবে, যেটি পূর্বদিকে অবস্থিত এবং যাকে খোরাসান বলা হয়। তার সঙ্গে বহু দল মানুষ থাকবে। তাদের একটা দলের লোকদের চেহারা স্ফীত ঢালের মতো হবে। [সুনানে ইবনে মাজাহ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৩৫৩]
এই হাদিসে খোরাসানকে দাজ্জাল আবির্ভাবের স্থান বলা হয়েছে। এর আগের হাদিসে বলা হয়েছে ইস্পাহান। এই দুই বর্ণনায় আসলে কোন বৈপরীত্য নেই। কেননা ইস্পাহান ইরানের একটি প্রদেশ আর ইরান একসময় খোরাসানের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
খোরাসান সম্পর্কে সেই বাহিনীর বিবরণ হাদিসে রয়েছে, যারা ইমাম মাহদীর সাহায্যে এগিয়ে আসবে। সুতরাং আমরা যদি মাহদী বাহিনীর আলামত সমূহ সমগ্র খোরাসানে তালাশ করি, আফগানিস্থানের সেই অঞ্চলটি পরিদৃষ্ট হবে, যেখানে সম্প্রতি পাখতুন বসতি অধিক। তাই লক্ষণদৃষ্টে অনুমান হয় ইমাম মাহদীর সাহায্যকারী বাহিনীটি খোরাসানের সেই এলাকা থেকে গমন করবে যেটি বর্তমানে তালেবান আন্দোলনের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
অন্য এক হাদিসে দাজ্জালের আত্মপ্রকাশের স্থান ইরাক ও শামের মাঝামাঝি একটি জায়গার কথা বলা হয়েছে। যেকারণে বাহ্যত এখানে বিরোধ পরিলক্ষিত হয়। এই বিরোধের সমাধান হচ্ছে, দাজ্জালের আবির্ভাব ইস্পাহান থেকেই হবে। তবে তার প্রচার ও খোদায়ী দাবী হবে ইরাকে। এই হিসেবেও একে আবির্ভাব নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
আল ফিতানে একটি হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল দুই বছর ইরাক শাসন করবে। তাতে তার সুশাসন প্রশংসিত হবে এবং মানুষ তার দিকে আকৃষ্ট হবে। দুই বছর পর একদিন সে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণে জনতাকে লক্ষ্য করে বলবে, এখনো কি সময় আসেনি, তোমরা তোমাদের প্রভুর পরিচয় লাভ করবে? এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করবে, আমাদের প্রভু কে? দাজ্জাল বলবে, আমি। আল্লাহর এক বান্দা তার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করবে। দাজ্জাল তাকে হত্যা করে ফেলবে। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৩৯]
পর্ব-৮
দাজ্জালের বাহন, গতি ও অবস্থানঃ
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল একটি ফকফকে সাদা বর্ণের গাধায় সওয়ার হয়ে বের হবে। গাধার উভয় কানের মধ্যবর্তী স্থানটি ৭০ বা’আ চওড়া হবে। [মিশকাত, হাদিস নং ৫২৫৯]
উভয় হাতকে প্রশস্ত করলে যে পরিমাণ লম্বা হয় তাকে বা’আ বলে। দুই হাত প্রশস্ত করলে কমপক্ষে চার হাত হয়। এ হিসেবে প্রায়, ২৮০ হাত চওড়া হবে বুঝা যায়।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, দাজ্জালেে গাধার কানগুলো এত বড় হবে যে, সত্তর হাজার মানুষ তার তলে ছায়া গ্রহণ করতে পারবে। [আল ফিতান]
হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জালের গাধার এক একটি পদক্ষেপ তিনদিনের ভ্রমনের সমান হবে। সে তার গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে সাগরে এমনভাবে ঢুকে যাবে যেমন তোমরা ঘোড়ার পিঠে চড়ে পানির ছোট নালায় ঢুকে থাক (এবং নালা পার হয়ে থাক)। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৩]
দাজ্জালের একেকটি পদক্ষেপ তিনদিনের সফরের সমান হবে। হিসাব করলে দেখা যায় এই পরিমাণটা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৮২ কিলোমিটার। ঘন্টায় ২ লক্ষ ৬৫ হাজার ২ শত কিলোমিটার। হিসাবটা যেভাবে বের করা হয়েছে, তিনদিনের শরয়ী সফর হচ্ছে ৪৮ মাইল। ৪৮ মাইলে ৮২ কিলোমিটার।
হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাজ্জালের আলোচনা করছিলেন, আমরা জিজ্ঞেস করলাম সে কতদিন যমীনে অবস্থান করবে? তিনি বললেন চল্লিশ দিন। তবে তার প্রথম দিনটি হবে এক বছরের সমান। দ্বিতীয় দিনটি এক মাসের সমান। তৃতীয় দিনটি এক সপ্তাহের সমান। আর বাকি (৩৭টি) দিন অন্যান্য স্বাভাবিক দিনের মতই হবে।
আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, সেই একদিন যা এক বছরের সমান হবে সেদিন কি আমাদের একদিনের নামাজই যথেষ্ট হবে? তিনি বললেন, না। বরং সেদিন একেকদিনের পরিমাণ হিসাব করে (এক বছরের) নামাজ আদায় করতে হবে।
আমরা জিজ্ঞেস করলাম, যমীনে তার চলার গতি কেমন হবে? তিনি বললেন, সেই মেঘমালার মত যাকে প্রবল বায়ু হাঁকিয়ে নিয়ে যায়। [ সহীহ মুসলিম ]
হযরত কা’ব (রাঃ) বর্ণনা করেন, দাজ্জাল যখন উর্দুনে (জর্ডানে) আসবে, তখন তূর পাহাড়, ছাওড় পাহাড় ও জুদি পাহাড়কে ডাকবে। এমনকি এই তিনটি পাহাড় পরস্পর এমনভাবে সংঘাতে লিপ্ত হবে যেমন দুটি ষাঁড় বা ছাগল পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। [আল ফিতান]
পর্ব-৯
দাজ্জালের ফিতনার সরূপ!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের সামনে যখনই দাজ্জালের আলোচনা করতেন তখনই তাঁদের মধ্যে ভীতি সঞ্চারিত হয়ে যেত এবং কান্না শুরু করতেন। কিন্তু এর কারণ কি যে, আজ মুসলমানরা এই বিষয়ে কোনো চিন্তাই করছে না?
সম্ভবত এর কারণ, আজ মানুষ এই ফেতনাটিকে সেই অর্থে বুঝবার চেষ্টা করে না, যে অর্থে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝিয়েছেন। আজ যদি কোন মুসলমান এই হাদিসটি শুনে, দাজ্জালের কাছে খাদ্যের পাহাড় ও পানির নহর থাকবে। তখন সে হাদিসটি এমন অবস্থায় শুনে যে, তার পেট খাবারে পূর্ণ থাকে এবং পানির কোন তৃষ্ণাই থাকে না। ফলে সে দাজ্জালের সময়কার পরিস্থিতিকেও নিজের ভরা পেট ও ভেজা গলার সময়কার উপর অনুমান করে। এই হাদিসগুলো শোনার সময় তার চোখের সামনে এ দৃশ্যটি মোটেও ভাসেনা যে, তখনকার পরিস্থিতি এমন হবে যে-
দিনের পর দিন নয় বরং সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে যাবে রুটির একটা টুকরোও জুটবে না। অনাহার মানুষকে কাহিল করে তুলবে। পানির অভাবে কন্ঠনালীতে কাঁটা বিঁধবে। খাদ্য ও পানির তালাশে কয়েক দিন যাবত পথে পথে ঘুরে নিরাশ হয়ে আপনি যখন ঘরে ফিরে আসবেন তখন দেখতে পাবেন আপনার কলিজার টুকরো যে সন্তানটির একটিমাত্র ইশারাতে তার প্রতিটি বাসনা ও দাবি পূরণ হয়ে যেত, আজ তীব্র ক্ষুধা ও পিপাসায় তার জীবনটা বের হয়ে গেছে। ছেলের মরা মুখটি দেখে আপনার অন্তর খাঁ খাঁ করে উঠল। কিন্তু আপনি অসহায়, অক্ষম। কষ্ট সহ্য করতে না পেরে সন্তানের দিক থেকে আপনার মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু যেদিকে তাকালেন অদিকে পড়ে আছে আক্ষেপ আর যন্ত্রণার আরেকখানি প্রতিচ্ছবি -মা, হ্যাঁ আপনার গর্ভধারিণী আম্মাজান। সেই মা যিনি আপনাকে ক্ষুধার্ত পেটে কোনদিন ঘুমুতে দেননি। যিনি আপনার ইঙ্গিতেই আপনার পিপাসার কথা বুঝে ফেলতেন। যিনি নিজের সমস্ত সুখ-আহ্লাদকে আপনার জন্য কুরবান করে দিয়ে ছিলেন। আজ আপনার সেই মা চোখের দৃষ্টিতে হাজারো প্রশ্ন ভরে নিয়ে যুবক পুত্রের দিকে তাকিয়ে আছেন এই আশায় যে, বাছা আমার আজ এক টুকরো রুটি এক কাতরা পানি কোথাও থেকে সংগ্রহ করে এনেছে। কিন্তু পুত্রের মুখের লেখা পড়তে সক্ষম মা আপনার মুখাবয়বের লেখা জবাবটা পড়ে নিলেন। পুত্রের অসহায়ত্বের ফলে মায়ের চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আপনার কলিজাটা মুখে বেরিয়ে আসবার উপক্রম হলো। আপনি ভেতরে ভেতরেই ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে লাগবেন।।
পর্ব-১০
দাজ্জালের ফিতনার সরূপ!
কষ্টটা সহ্য করতে না পেরে এবার আপনি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এই আশায় যে, সম্ভবত ওদিকে কেউ নাই। কিন্তু না, আছে। ওখানে একজন পড়ে আছে- আপনার জীবন সফরের সঙ্গিনী। পরীক্ষার প্রতিটি মুহূর্তে যে আপনাকে সাহস যুগিয়েছেন। কিন্তু আজ ঠোঁট দুটো তার শুকনো। আর দেখতে না দেখতেই প্রেম আপনার অশ্রুতাপে গলে যেতে শুরু করল। অবশেষে আপনিও তো মানুষ। আপনার বুকেও তো গোশত পিণ্ডই ধুকধুক করে। সন্তানের স্নেহ, মায়ের মমতা ও স্ত্রীর প্রেম সবাই মিলে আপনার হৃদয়টাকে তামার মতো গলিয়ে দিল। কোথাও কোনো আশ্রয় নেই। কেউ নেই আপনার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াবার। কিভাবে থাকবে, প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি দরজায় এই একই দৃশ্য। কেউ নেই সাহায্য করবার- সকলেরই সাহায্য দরকার।
এমন সময় বাইরে থেকে সুস্বাদু খাবারের সুঘ্রাণ আর সুমিষ্ট পানির কলকল শব্দ কানে ভেসে এল। আপনি ও আপনার পরিজন সবাই দৌড়ে বাইরে গেলেন। মনে হল কষ্টের দিন বুঝি শেষ হয়ে গেছে। মানুষের এই বনে কোন মাসিহা এসে পড়েছেন। আগত মাসিহা ঘোষণা করেছে, ক্ষুধা পিপাসায় কাতর লোকেরা! এই সুঘ্রাণযুক্ত সুস্বাদু খাবার তোমাদেরই জন্য।
ঘোষণাটি শোনামাত্র আপনার, আপনার পরিজন ও নগরীর অন্যান্য বাসিন্দাদের আধা জীবন যেন এমনিতেই ফিরে এসেছে। মাসিহা আবার বলতে শুরু করল, এই সবকিছুই তোমাদের জন্য। কিন্তু তোমরা কি বিশ্বাস কর যে, এই খাবার ও পানির মালিক আমি? তোমরা কি এই বাস্তবতাকে স্বীকার করছ যে, এই সবকিছু আমার অধীনে?
এই দ্বিতীয় ঘোষণাটি শোনার পর খাবার পানির প্রতি অগ্রসরমান আপনার পা কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল। আপনি কিছু ভাবতে শুরু করলেন। আপনার স্মৃতি বলল, এই শব্দগুলো তো চেনা চেনা মনে হচ্ছে। আপনার মনে পড়ে গেল এই মাসিহাটা কে? কিন্তু সেই মুহূর্তে পেছন থেকে আপনার সন্তানের কান্না তীব্র হতে লাগল। মায়ের আর্তনাদ কানে এসে বাজল। স্ত্রীর করুণ আহাজারিতে কান ভারী হতে লাগল। আপনি ছুটে গেলেন। আপনার কলিজার টুকরো- আপনার সন্তানটি মৃত্যু ও জীবনের মাঝে ঝুলছে। যদি কয়েক ফোঁটা পানি জুটে যায় তাহলে শিশুটির জীবন বেঁচে যেতে পারে।
এখন একদিকে আপনার সন্তান, মা ও স্ত্রীর ভালোবাসা, অপরদিকে ঈমান বিধ্বংসী একটি প্রশ্নের জবাব। একদিকে আনন্দপূর্ণ ঘর, অন্যদিকে বিলাপের আসর। যেন একদিকে আগুন, অন্যদিকে মনমাতানো ফুল বাগান।
বলুন, বিবেকের বন্ধ জানালাগুলো খুলে দিয়ে ভাবুন, বিষয়টি কি এতই সহজ, যতটা আপনি মনে করছেন? বরং তখনকার পরিস্থিতি হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ফেতনা।
পর্ব-১১
দাজ্জালের ফিতনা সমূহ!
হযরত আসমা বিনতে ইয়াযীদ (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে অবস্থানরত ছিলেন। তখন তিনি দাজ্জাল সম্পর্কে কিছু কথা বললেন। তিনি বলেছেন, তার ফেতনাসমূহের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ফেতনাটি এই হবে যে, সে এক গ্রাম্য লোকের নিকট আসবে এবং বলবে, তোমার খেয়াল কি; আমি যদি তোমার মৃত উটটি জীবিত করে দেই তাহলে কি তুমি মেনে নিবে আমি তোমার রব? গ্রাম্য লোকটি বলবে, হ্যা। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তারপর শয়তানরা তার মৃত উটটিকে ঠিক আগের মত বরং তার চেয়েও উত্তম- যেমন দুগ্ধদায়িনী ভরাপেট ছিল বানিয়ে দিবে।
অনুরূপভাবে দাজ্জাল এমন এক ব্যক্তির নিকট আসবে যার পিতা ভাই মারা গেছে। তাকে বলবে, তোমার ধারণা কি; আমি যদি তোমার বাপ ও ভাইকে জীবিত করে দেই তাহলে কি তুমি মেনে নিবে আমি তোমার রব? উত্তরে সে বলবে, কেন নয়? ফলে তারপর শয়তানরা লোকটির পিতা ভাইয়ের আকৃতিতে এসে হাজির হবে। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৩৫]
আবু উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল এক গ্রাম্য লোকের কাছে এসে বলবে, আমি যদি তোমার মৃত পিতা-মাতাকে জীবিত করে দেই তাহলে আমাকে প্রভু বলে মেনে নিতে তোমার কোন আপত্তি থাকবে? গ্রাম্য লোকটা বলবে, না। অতঃপর দুটি শয়তান তার মা বাবার রূপ ধারণ ধরে তাকে বলবে, হে সন্তান! একে অনুসরণ কর, সেই তোমার প্রভু। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৪০৬৭)
হযরত হুযায়ফা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি দাজ্জালের বিষয়টি বারবার এজন্য বর্ণনা করছি, যেন তোমরা বিষয়টিতে গভীর মনোযোগ দিয়ে চিন্তা ভাবনা কর, সচেতন হও, সে অনুযায়ী কাজ কর এবং বিষয়টি তোমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আলোচনা কর। কারণ, দাজ্জালের ফিতনা ভয়াবহতম একটি ফিতনা।।
পর্ব-১২
হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল দাবি করবে আমি বিশ্বজগতের রব এবং আকাশের সূর্যটা আমার কথামতই চলছে। তোমরা কি চাও আমি একে থামিয়ে দেই? তার কথায় সূর্য থেমে যাবে। এমনকি একটি দিন মাস ও সপ্তাহের সমান হয়ে যাবে। এবার সে বলবে তোমরা কি চাও আমি এটিকে আবার চালিয়ে দেই? লোকেরা বলবে, হ্যা দিন। তখন দিন ঘন্টার সমান হয়ে যাবে।
তার কাছে এক মহিলা এসে বলবে, হে আমার রব, আপনি আমার পুত্র এবং স্বামীকে জীবিত করে দিন। তখন শয়তানরা তার পুত্র ও স্বামীর আকৃতিতে এসে হাজির হবে। মহিলা শয়তানকে গলায় জড়িয়ে ধরবে এবং তার সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হবে। মানুষের ঘরগুলো শয়তানদের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে যাবে।
এক গ্রাম্যলোক দাজ্জালের নিকট আসবে এবং বলবে, হে আমাদের রব, আপনি আমাদের জন্য আমাদের বকরীগুলোকে জীবিত করে দিন। দাজ্জাল তাদেরকে বকরীর আকৃতিতে কতগুলো শয়তানকে দিয়ে দিবে। এই পশুগুলো ঠিক সেই বয়স ও সেই শরীর স্বাস্থ্যের হবে যেমনটি তাদের মৃত বকরিগুলো ছিল। এসব দেখে গ্রামের লোকজন বলবে, সে যদি আমাদের রব না হত তাহলে আমাদের মৃত বকরিগুলোকে কোনোভাবেই জীবিত করতে পারতো না।
দাজ্জালের সঙ্গে ঝোল ও গোশতওয়ালা হাড়ের পাহাড় থাকবে। যেগুলো সবসময় গরম থাকবে, কখনো ঠান্ডা হবে না। প্রবাহমান নদী থাকবে। একটি পাহাড় থাকবে ফল ও সবজির বাগানের। একটি পাহাড় থাকবে আগুন ও ধোঁয়ার। (এগুলো তার সাথে সাথে চলবে।) সে বলবে এটি আমার জান্নাত আর এটি আমার জাহান্নাম। এগুলো আমার খাদ্য এবং এগুলো আমার পানীয়। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৩]
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাজ্জাল আবির্ভাব করবে। তখন কিছু মানুষ তার অনুসারী হয়ে যাবে। তারা বলবে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি দাজ্জাল নিঃসন্দেহে কাফের। তবে তার খাদ্য ভান্ডার থেকে খেতে এবং তার বাগানে পশুপাল চড়াতে তার অনুসারী হয়েছি। পরবর্তী সময়ে যখন আল্লাহর গজব নাজিল হবে, তা তাদের সকলের উপর নাজিল হবে। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৬]
আজ মুসলমান এই হাদিসগুলোতে চিন্তা করে না। যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে গোটা সুরতহাল স্পষ্ট হয়ে যাবে। আজও কি এমনটি হচ্ছে না যে, বাতিলের জালিমের পরিচয় জানা সত্বেও অর্থনৈতিক বা অন্য কোন স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মুসলমান এদের সঙ্গ দিচ্ছে, সহযোগিতা দিচ্ছে কিংবা নীরব দর্শকের ভুমিকা পালন করছে?
পর্ব-১৩
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- দাজ্জাল মক্কা ও মদিনার কাছে গিয়ে বিকট শব্দে চিৎকার দিবে। ফলে সেখানে তিনবার ভুমিকম্প হবে। এই ভুমিকম্পের কারণে মক্কা ও মদিনায় বসবাসরত সকল মুনাফিক পুরুষ ও নারী নিজেদের জান বাঁচাতে সেখান থেকে বেরিয়ে যাবে। তারা দাজ্জালের সঙ্গী হয়ে যাবে।
এক তথ্য সংগ্রহকারী মুসলমান মুসলমানদের এই দলটির কাছে আসবে, যারা কস্তুনতুনিয়া (বর্তমান ইস্তাম্বুল) জয় করেছে এবং যাদের সঙ্গে বাইতুল মুকাদ্দাসের মুসলমানদের সম্প্রীতি থাকবে। বলবে অচিরেই দাজ্জাল তোমাদের কাছে এসে পৌঁছাবে। শুনে মুজাহিদগণ বলবে, আসুক আমরা তার সাথে যুদ্ধ করব। তুমিও আমাদের সঙ্গে থাকো। দূত বলবে, না। বরং আমাকে অন্যদেরও সংবাদটা পৌঁছাতে হবে। কিন্তু এই লোকটি যখন রওনা হবে দাজ্জাল তাকে ধরে ফেলবে এবং করাত দ্বারা চিড়ে টুকরো টুকরো করে মেরে ফেলবে।
তারপর দাজ্জাল জনতাকে লক্ষ্য করে বলবে, আমি যদি এই লোকটিকে তোমাদের সামনে জীবিত করে দেই তাহলে কি তোমরা বিশ্বাস করবে আমি তোমাদের রব? জনতা বলবে, আমরা তো আগে থেকেই জানি আপনি আমাদের রব। তারপরও এই বিশ্বাসটিকে পাকাপোক্ত করার জন্য দাজ্জাল লোকটিকে জীবিত করে তুলবে। লোকটি আল্লাহর ইচ্ছায় দাঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু মহান আল্লাহ এই লোকটি ছাড়া আর কারো ক্ষেত্রে দাজ্জালকে এই শক্তি দেবেননা যে, কাউকে হত্যা করে সে আবার জীবিত করবে।
তারপর দাজ্জাল মুসলিম দূতকে বলবে, আমি কি তোমাকে হত্যা করে জীবিত করিনি? কাজেই আমি তোমার রব। উত্তরে দূত বলবে, এখন তো আমি আরও নিশ্চিত হয়েছি যে, আমিই সেই ব্যক্তি যার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুসংবাদ দিয়েছেন যে, তুমি আমাকে হত্যা করবে এবং পরে আল্লাহর ইচ্ছায় জীবিত করবে। আর আল্লাহ আমাকে ছাড়া আর কাউকে জীবিত করবেন না। তারপর উক্ত দূতের গায়ে তামার চাদর জড়িয়ে দেওয়া হবে, যার ফলে দাজ্জালের কোন অস্ত্র তার উপর ক্রিয়া করবে না। না তরবারি, না ছুরি, না পাথর, না অন্য কোন অস্ত্র। ফলে দাজ্জাল বলবে একে আমার জাহান্নামে নিক্ষেপ করো। আল্লাহ দাজ্জালের আগুনের পর্বতটাকে সবুজ শ্যামল বাগানে পরিনত করে দেবেন। (কিন্তু লোকজন মনে করবে ওকে আগুনের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে।) মানুষ সংশয়ে নিপতিত হবে। [আল ফিতান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৩]
চলবে



























