#ইসমাইল_হোসেন_সিরাজী : বাংলার রাজনীতি ও সাহিত্যের উত্তম পুরুষ

একাধারে কবি, লেখক, বাগ্মী ও তুখোড় রাজনীতিবিদ ছিলেন সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী। ছিলেন বাংলার মুসলিম রাজনীতি ও সাহিত্যের উত্তম পুরুষ। উপমহাদেশের খ্যাতিমান দুই মুসলিম মনীষী আল্লামা শিবলি নোমানি (১৮৫৭-১৯১৪) ও আল্লামা ইকবালের (১৮৭৬-১৯৩৮) ভাবশিষ্য ছিলেন। এই দুই চিন্তানায়কের ভাবাদর্শে উজ্জীবিত হয়ে মুসলিম বাংলার ঝিমিয়ে পড়া চেতনার পুনরুজ্জীবনে অসামান্য অবদান রেখেছেন তিনি।
১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ জুলাই সৈয়দ ইসমাইল হোসেনের জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলায়। সিরাজগঞ্জ নিজের জন্মস্থান হবার কারণে নামের শেষে ‘সিরাজী’ ব্যবহান করতেন।
আর্থিক সংকট এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে তৎকালীন মুসলিম সমাজের পিছিয়ে থাকার কারণে সৈয়দ সিরাজীর পড়াশোনা স্কুলের গণ্ডি টপকাতে পারেনি। কিন্তু ব্যক্তিগত অধ্যবসায় আর নিবিড় পাঠের কারণে কৈশোরকালেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন দারুণ চিন্তার অধিকারী। ব্রিটিশদের শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট বাংলার পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজের দুর্দশা তাঁকে তখন থেকেই ভাবিয়ে তোলে।
কৈশোর পেরিয়ে যখন তারুণ্যে নামেন, পরিচয় ঘটে বাংলার আরেক সংগ্রামী সাধক মুন্সী মুহাম্মদ মেহেরুল্লাহর সঙ্গে। মুন্সী মেহেরুল্লাহর সাহচর্যে একই সঙ্গে তাঁর লিখনী ও বাগ্মিতার প্রতিভা বিকশিত হয়। মেহেরুল্লাহ ছিলেন তার্কিক এবং বাগ্মী, কবিও। তাঁর সঙ্গে ইসমাইল হোসেন সিরাজী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জাগরণী বক্তৃতায় অংশগ্রহণ করতেন। মুন্সী মেহেরুল্লাহর সহযোগিতায় ১৮৯৯ সালে, সিরাজীর বয়স যখন সবে ১৯ বছর, তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অনল প্রবাহ প্রকাশিত হয়। অনল প্রবাহ ছিল জাগরণী কবিতা-সমৃদ্ধ। প্রথম প্রকাশের সময় বইটি ব্রিটিশদের চোখে না পড়লেও ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে যখন এর দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়, ব্রিটিশদের নজরে আসে কাব্যগ্রন্থখানি। সিরাজীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়। অনল প্রবাহ করা হয় বাজেয়াপ্ত।
মামলার সূত্র ধরে ১৯১০ সালে তরুণ সিরাজীকে সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে জেলে পাঠায় ব্রিটিশ আদালত। আর এর মধ্য দিয়ে তিনি উপমহাদেশে জাগরণের কবিতা লিখে কারাভোগকারী প্রথম কবি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান।
দু’বছর কারাভোগের পর সিরাজী যখন মুক্তিলাভ করেন, তুরস্কে উসমানি খেলাফতের তখন টালমাটাল অবস্থা। মুসলমানদের সর্বশেষ সাম্রাজ্য চতুর্মুখী আক্রমণে পর্যুদস্ত হবার জোগাড়। সাম্রাজ্য জুড়ে চলছে যুদ্ধ আর সংঘাত। মুসলিম মিল্লাতের কল্যাণপ্রত্যাশী সিরাজী সিদ্ধান্ত নেন তিনি তুরস্ক যাবেন। খেলাফত রক্ষার জন্য লড়াই করবেন।
১৯১২ সালে জেল থেকে বেরোনোর পরপরই তিনি পাড়ি জমান তুরস্কের উদ্দেশ্যে। বছর খানেক সেখানে অবস্থান করে খেলাফতের পক্ষে লড়াই করেন অসীম বীরত্ব আর সাহসিকতার সাথে। উসমানি খেলাফতের পক্ষ থেকে লাভ করেন ‘গাজি’ উপাধি। কিন্তু সিরাজী লক্ষ করলেন আভ্যন্তরীণ কোন্দল, অপরাজনীতি আর স্বার্থবাদিতার কারণে খেলাফতের যে অধঃপতন শুরু হয়েছে, তা টেকানোর আপাত কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই তুরস্কের লড়াই বাদ দিয়ে স্বদেশের মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করাটাকেই তিনি উত্তম মনে করলেন। ফিরে এলেন মাতৃভূমিতে।
আবার শুরু হলো ব্রিটিশ বেনিয়া আর তাদের আজ্ঞাবহ দেশীয় জমিদার শ্রেণির বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। স্থানীয় জমিদারদের বিরুদ্ধে একদিকে যেমন তিনি কৃষকদেরকে সংগঠিত করছিলেন, অপরদিকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এবং মুসলিম বাংলার জাগরণের জন্য লিখে যাচ্ছিলেন অনবদ্য কবিতা আর জাগরণী রচনা। পাশাপাশি বিভিন্ন সভা-সেমিনারে রাখছিলেন বাগ্মিতাসূলভ বক্তব্য।
সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর এসব কর্মতৎপরতায় ব্রিটিশ সরকার এতটা ভীত হয়েছিল যে, তাঁর সভা-সেমিনারে ৮২ বার জারি করেছিল ১৪৪ ধারা। ১৯৩০ সালে রাষ্ট্রীয় আইন অমান্যের অভিযোগে আবারও গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে। তিন মাস কারান্তরীণ থেকে মুক্তিলাভ করেন।
বাংলার মুসলমানদের জাগরণের জন্য জীবনভর কাজ করে গেছেন সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী। সমসাময়িক পত্রিকা আল-এসলাম, ইসলাম প্রচারক, প্রবাসী, প্রচারক, কোহিনূর, সোলতান, মোহাম্মদী, সওগাত, নবযুগ, নবনূর প্রভৃতিতে সিরাজীর লেখা প্রকাশিত হতো। তাঁর অধিকাংশ লেখায় ইসলামি ঐতিহ্য সংস্কৃতি ও উত্তরাধিকারকে উদ্দীপ্ত করে তোলার প্রয়াস ছিল।
লেখালেখির পাশাপাশি সরাসরি রাজনীতিতেও অবিচ্ছিন্ন সম্পৃক্তি ছিল সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, আঞ্জুমান-ই-উলামা-ই-বাঙ্গালা, জামিয়াত-ই-উলামা-ই-হিন্দ, স্বরাজ পার্টি ও কৃষক সমিতির সঙ্গে নানা সময়ে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তিনি।
মুসলিম বাংলার জাগরণ ও মুক্তির মুয়াজ্জিন এ মহান মনীষী কবি ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

কায়কোবাদ : আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি ছিলেন কায়কোবাদ। অজপাড়া গ্রামে পোস্টমাস্টারির চাকরি করেছেন জীবনভর, আর লিখেছেন কবিতা। এই কাব্যচর্চাই তাঁকে এনে দিয়েছে মহাকবির খ্যাতি। আজ ২১ জুলাই তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী, ১৯৫১ সালের এ দিনে প্রায় ৯৪ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
কালের লিপিতে ‘মহাকবি কায়কোবাদ’ নামে তিনি উৎকীর্ণ হয়ে থাকলেও তাঁর পিতৃপ্রদত্ত নাম কাজেম আল-কোরায়েশি। ১৮৫৭ সালে, ঐতিহাসিক সিপাহি বিপ্লবের বছর বর্তমান ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জের আগলা-পূর্বপাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা শাহামতুল্লাহ আল-কোরায়েশি ছিলেন ব্যারিস্টার, ঢাকা জেলা জজকোর্টে আইন ব্যবসা করতেন। সেই সুবাদে কায়কোবাদের পড়াশোনা ঢাকাতেই হয়েছিল।
সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে পড়াশোনা কালে পিতার মৃত্যু হয়, কায়কোবাদ স্কুলের বদলে তখন ভর্তি হন মাদরাসায়, ঢাকা মাদরাসা, যেটা বর্তমানে নজরুল কলেজে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু মাদরাসায় প্রবেশিকা পর্যন্ত পড়াশোনার পর পরীক্ষার আগ মুহূর্তে পোস্ট মাস্টারির চাকরি পেয়ে যান তিনি, পিতৃহীন পরিবারের ঘানি টানতে প্রবেশিকা পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি কায়কোবাদের। পোস্টমাস্টারির চাকরি নিয়ে ফিরে যান আপন গ্রামে। এবং অবসরগ্রহণ অবধি গ্রামেই থাকেন পোস্টমাস্টারির চাকরি নিয়ে। আর করেন কাব্যসাধনা।
অতি অল্পবয়সে কায়কোবাদের সাহিত্য-প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। মাত্র তেরো বছর বয়সে তাঁর প্রথম কাব্য বিরহবিলাপ (১৮৭০) প্রকাশিত হয়। তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে কুসুম কানন (১৮৭৩), অশ্রুমালা (১৮৯৫), মহাশ্মশান (১৯০৪), অমিয়ধারা (১৯২৩), মহরম শরীফ (১৯৩২), প্রেমের বাণী (১৯৭০), প্রেম-পারিজাত (১৯৭০), গওছ পাকের প্রেমের কুঞ্জ (১৯৭৯) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি বাংলা একাডেমী কায়কোবাদ রচনাবলী (৪ খন্ড, ১৯৯৪-৯৭) প্রকাশ করেছে।
কায়কোবাদের মহাশ্মশান একটি বিখ্যাত মহাকাব্য। তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ অবলম্বনে রচিত এ কাব্যে জয়-পরাজয় অপেক্ষা ধ্বংসের ভয়াবহতা প্রকট হওয়ায় এর নাম হয়েছে ‘মহাশ্মশান’। এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা এবং এর দ্বারাই মহাকবিরূপে খ্যাতি অর্জন করেন। কাব্যটি তিন খন্ডে বিভক্ত। প্রথম খন্ডে ঊনত্রিশ সর্গ, দ্বিতীয় খন্ডে চব্বিশ সর্গ, এবং তৃতীয় খন্ডে সাত সর্গ। মোট ষাট সর্গে প্রায় নয়শ’ পৃষ্ঠার এই মহাকাব্য বঙ্গাব্দ ১৩৩১ মুতাবেক খ্রিষ্টাব্দ ১৯০৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়; যদিও গ্রন্থাকারে প্রকাশ হতে আরও ক’বছর দেরি হয়েছিল। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধযজ্ঞকে রূপায়িত করতে গিয়ে কবি বিশাল কাহিনি, ভয়াবহ সংঘর্ষ, গগনস্পর্শী দম্ভ, এবং মর্মভেদী বেদনাকে নানাভাবে চিত্রিত করেছেন এ মহাকাব্যে।
কায়কোবাদের গীতিকবিতায় প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ পেয়েছে।
তাঁর কাব্যসাধনার মূল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চাৎপদ মুসলমান সম্প্রদায়কে তার অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করা এবং তা পুনরুদ্ধারে উদ্বুদ্ধ করা। তিনি ছিলেন সাম্প্রদায়িক সমন্বয়ে বিশ্বাসী, যার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর বিভিন্ন রচনায়। তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন।
বাংলা মহাকাব্যের অস্তোন্মুখ এবং গীতিকবিতার স্বর্ণযুগে মহাকবি কায়কোবাদ মুসলিমদের গৌরবময় ইতিহাস থেকে কাহিনি নিয়ে ‘মহাশ্মশান’ মহাকাব্য রচনা করে যে দুঃসাহসিকতা দেখিয়েছেন তা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের গৌরবময় আসনে স্থান করে দিয়েছে।
সেই গৌরবের প্রকাশে ১৯৩২ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের মূল অধিবেশনে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা কাব্যসাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য নিখিল ভারত সাহিত্য সংঘ তাঁকে ‘কাব্যভূষণ’, ‘বিদ্যাভূষণ ও ‘সাহিত্যরত্ন’ (১৯২৫) উপাধিতে ভূষিত করে।

খাইরুদ্দিন পাশা : উছমানি খেলাফতের মহান সংস্কারক

#খাইরুদ্দিন_পাশা : উছমানি খেলাফতের মহান সংস্কারক
উছমানি খেলাফতের পতনোন্মুখ সময়ে সাম্রাজ্যের কাঠামো, নীতি এবং জনগণের জীবনমানের সংস্কারে যে কজন মহান ব্যক্তিত্ব আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন, তাঁদের অন্যতম খাইরুদ্দিন পাশা আত-তিউনিসি। একদিকে যেমন ছিলেন আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের একান্ত অনুরাগী, অন্যদিকে ছিলেন ইসলামি আইন শাস্ত্র ও ইলমে শরিয়াহ’র ওপর অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপ যখন জীবনমানের উন্নয়ন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনে সফলতার স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করছিল, উছমানি সাম্রাজ্য তখন আভ্যন্তরীণ সংঘাত, স্বার্থবাদিতা আর নানা রকম দুর্নীতিতে জর্জরিত। খাইরুদ্দিন পাশা এই সময়টায় খেলাফতের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে থেকে শাসনব্যবস্থা থেকে নিয়ে জনগণের জীবনমানের উৎকর্ষ সাধন ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি সাম্রাজ্যের প্রজাসাধারণকে উদ্বুদ্ধকরণে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। নিজের সাধ্যানুযায়ী বৈষয়িক নানা কাজে এনেছেন সংস্কার।
ভাগ্য বিড়ম্বনা : যোদ্ধার সন্তান থেকে ক্রিতদাস
ককেশাস পর্বতমালার একটি গ্রামে ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম খাইরুদ্দিন পাশা আত-তিউনিসির। অতি অল্পবয়সে মর্মান্তিকভাবে পিতাকে হারান। রাশিয়ার বিরুদ্ধে উসমানিদের একটি যুদ্ধে পিতা নিহত হন। পিতার মৃত্যুর পর ঘটনাচক্রে শিশু খাইরুদ্দিনকে অপহরণ করা হয় এবং ইস্তাম্বুলের ক্রীতদাস বেচাকেনার বাজারে গোলাম হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
তাহসেন বেগ আল কাবরিসি নামক এক ব্যক্তি তাঁকে কিনে নিয়ে যান। তাহসেন বেগ শিশু খাইরুদ্দিনের মেধা ও বুদ্ধিমত্তা দেখে সন্তানের মতো তাঁকে লালন-পালন করেন। ইস্তাম্বুলের অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরবি, তুর্কি ও ফ্রেঞ্চ ভাষার ওপর পড়াশোনা করেন খাইরুদ্দিন।
ক্রিতদাস থেকে রাজপ্রাসাদে
তারপর ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি যখন ১৭ বছরের টগবগে তরুণ, তাহসেন বেগ তাঁকে উছমানি খেলাফতের অধীন তিউনিসিয়া অঞ্চলের শাসনকর্তার প্রাসাদে প্রেরণ করেন। তিউনিসিয়া শাসনকর্তা তখন আহমদ পাশা। তিনিও খাইরুদ্দিনের মেধা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দেখে নিজের ছেলের মতো তাঁকে গ্রহণ করেন এবং নিজের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর পড়াশোনার সুযোগ করে দেন।
তিউনিসিয়ার তৎকালীন উচ্চতর শিক্ষাগার মা’হাদুয যাইতুনায় ভর্তি হন খাইরুদ্দিন এবং ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্বের ওপর অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্যারিস গমন করেন এবং সেখানে তিনবছর অবস্থান করে প্রশাসনিক জ্ঞান ও আধুনিক আইন শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন।
প্যারিসে থাকাকালে ইউরোপের জীবনমানের উৎকর্ষতা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে তাদের ক্রমশ উন্নতির কৌশল পর্যবেক্ষণ করেন। তিন বছর পর তিউনিসিয়ায় ফিরে এসে বহুল সমস্যায় জর্জরিত উছমানি সাম্রাজ্যকে কীভাবে আধুনিক পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাইয়ে এগিয়ে নেওয়া যায়, সেই চিন্তা থেকে নিজের সাধ্যমাফিক বেশ কিছু সংস্কার কাজে হাত দেন খাইরুদ্দিন।
প্রশাসনে : রাষ্ট্রক্ষমতায়
১৮৫৭ সালে তিনি তিউনিসিয়ার যুদ্ধমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলে তিউনিসিয়ার নৌবন্দরের আধুনিকায়ন করেন। ঢেলে সাজান সামরিক বাহিনীকেও।
কয়েক বছর পর তাঁকে তিউনিসিয়ার কৃষি ও শিক্ষা বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ সময় তিনি তিউনিসিয়ার কৃষিখাতকে আধুনিকরূপে দাঁড় করান। জনগণকে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করেন খেজুর ও জলপাই চাষে। শিক্ষাখাতেও আনেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ইসলামি শিক্ষাদীক্ষার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সমান গুরুত্বের সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্লাস চালু করেন।
প্রশাসনিক কাঠামোকেও ঢেলে সাজাবার চেষ্টা চালান এ সময়ে। কিন্তু খেলাফতের স্তরে স্তরে দুর্নীতি আর স্বার্থবাদিতা এতটাই প্রকট হয়ে ছিল যে, খাইরুদ্দিন পাশার পক্ষে এখানে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভবপর ছিল না।
এই রাগ থেকে ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে প্রশাসনিক সব রকমের দায়িত্ব থেকে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন। কয়েক বছর রাজনীতি ও দর্শন নিয়ে একাগ্রচিত্তে পড়াশোনা করেন। ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে তিউনিসিয়ার বায়তুল মালের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। তার দুবছর পর দেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব। এইসব দায়িত্বে থাকাকালে তিউনিসিয়ার অর্থনৈতিক কাঠামোকে আধুনিকরূপে দাঁড় করাবার চেষ্টা করেন তিনি। কৃষিখাতের অসম্পূর্ণ কাজও সম্পূর্ণ করেন। পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদেন উৎকর্ষ সাধনে প্রতিষ্ঠা করেন উচ্চতর বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাদরাসা আস সাদিকিয়্যাহ। এটা পরিচালিত হতো তাঁর সরাসরি তত্ত্বাবধানে। যেখানে ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমান পারদর্শিতা অর্জন করত শিক্ষার্থীরা।
মাদরাসাপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জ্ঞানপিপাসুদের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য তৈরি করেছিলেন বিশালায়তেনের লাইব্রেরি। মাকতাবায়ে আবদালিয়া নামের এ লাইব্রেরিতে ইসলাম ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান বিষয়ক বইয়ের দুর্লভ ও বিপুল সংগ্রহ ছিল।
খেলাফতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দায়িত্বে
১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে খেলাফতের পক্ষ থেকে তুরস্কে ডেকে নেওয়া হয় এবং খেলাফতের প্রধান নির্বাহী বা সদরে আজম হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়৷ উছমানি খেলাফতের মসনদে তখন ছিলেন সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ। ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সদরে আজম পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
একই বছর খাইরুদ্দিন পাশা খেলাফতের উচ্চতর বিশেষ কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং মৃত্যু অবধি এ দায়িত্বে বহাল থাকেন।
খাইরুদ্দিন পাশা উসমানি খেলাফতের কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদই ছিলেন না, ছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী একজন অনন্য ব্যক্তিত্বও৷ উলুমে শরিয়াহর ওপর তাঁর যেমন দখল ছিল, তেমনি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কেও ছিলেন পুরোপুরি ওয়াকিবহাল।
উছমানি খেলাফতের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেও তিনি প্রশাসনিক সংস্কার ও জনগণের অধিকারের পক্ষে কাজ করে গেছেন অকপটে। তবে খেলাফত ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতেও তিনি সচেষ্ট ছিলেন।
অবদান
তাঁর সংস্কারবাদিতার মূল লক্ষ্য ছিল, শরিয়াহর গণ্ডির ভেতরে থেকে সাম্রাজ্যের প্রজাসাধারণকে আধুনিকরূপে গড়ে তোলা এবং শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়াহর পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে শিক্ষার্থীদেরকে সমানভাবে পারদর্শী করে তোলা। তাছাড়া তুর্কি জনগণ এবং অতুর্কি জনগণের মধ্যে একটা বৈষম্য গড়ে উঠেছিল উছমানি সাম্রাজ্যে, খাইরুদ্দিন চাইতেন তুর্কি-অতুর্কির মধ্যকার এ বৈষম্য দূর করে সবাইকে ইসলামের মাপকাঠিতে মূল্যায়ন করতে।
আধুনিক সভ্যতার পর্যালোচনা বিষয়ে তিনি ‘আকওয়ামুল মাসালিক ফী মারিফাতি আহওয়ালিল মামালিক’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ বই লেখেন। এর পাশাপাশি ‘ইলা আওলাদি : মুজাক্কারাতু হায়াতিল খাসসাহ ওয়াস সিয়াসিয়াহ’ নামে আত্মজীবনীও লেখেন।
ইন্তেকাল
১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে উছমানি খেলাফতের রাজধানী ইস্তাম্বুলে মহান এ সংস্কারক ইন্তেকাল করেন। ইস্তাম্বুলের জামে আইয়ুব মসজিদের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। কিন্তু ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মরদেহকে তিউনিসিয়ায় স্থানান্তর করা হয় এবং সেখানকার বিখ্যাত কবরস্তান মাকবারাতুল জালাযে পুনরায় দাফন করা হয়।
আল-জাজিরা অবলম্বনে

সাইয়েদ কুতুব : মহান শহীদ চিন্তাবিদ


মিশরের আসয়ুত অঞ্চলের মুশা নামক গ্রামে ৯ অক্টোবর ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে মহান শহীদ চিন্তাবিদ সাইয়েদ কুতুবের জন্ম। গ্রামেই কেটেছে তাঁর বাল্যকাল। কুরআনও হিফজ করেছেন এখানে। ১৯১৯ সালের ব্রিটিশবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের ঠিক একবছর পর তিনি কায়রো আসেন। তখন তাঁর বয়স ছিল চৌদ্দ বছর।
কায়রোতে এসে তিনি শিক্ষক সমিতি পরিচালিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। এখানে পড়াশোনা শেষে ১৯২৮ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন কায়রোর দারুল উলুম ইউনিভার্সিটিতে। চারবছর পড়াশোনার পর দারুল উলুম থেকে তিনি সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষ হবার এক বছর পর মিশরের শিক্ষামন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্তি পান।
বলে রাখছি, সাইয়েদ কুতুব যে বছর জন্মগ্রহণ করেন মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা শাইখ হাসানুল বান্নার জন্মও সে বছরে। এই দুই মনীষীর উভয়ই একই ভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন। তবে সাইয়েদ কুতুব কোনো কারণে শায়েখ হাসানুল বান্নাহ থেকে একবছর পিছিয়ে ছিলেন। তাই বলে সাইয়েদ কুতুব ভার্সিটি থাকাকালীন সময়েই যে শায়েখ হাসানুল বান্নার সাথে পরিচিত হয়েছেন এবং তাঁর চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়েছেন, এমন কিন্তু না। তাঁরা উভয়ে ছিলেন নিজ নিজ জগত নিয়ে। অর্থাৎ তাঁদের চিন্তাচেতনা ছিল একদম আলাদা। সাইয়েদ কুতুব ছিলেন সাহিত্যিক আব্বাস মাহমুদ আক্কাদের লেখায় অত্যন্ত প্রভাবিত। সাথে বেশ কিছুদিন জড়িত ছিলেন সাআদ জগলুলের হাতে প্রতিষ্ঠিত লিবারেল রাজনৈতিক দল হিজবুল ওয়াফদ-এর সঙ্গে।
অল্প বয়সেই সাইয়্যেদ কুতুবের লেখালেখির প্রতিভা বিকশিত হয়েছিল। তাঁর প্রশংসা করে মিশরের সাবেক রেডিও-প্রধান ফারুক শুশাহ বলেন, ‘সাইয়েদ কুতুব ছিলেন একজন রোমান্টিক কবি। সাহিত্যিক আব্বাস মাহমুদ আক্কাদের হাতেগড়া প্রথম ছাত্র তিনি। নোবেলজয়ী মিশরী লেখক নাজিব মাহফুজের লেখার উপর বিশ্বে সর্বপ্রথম সমালোচনাপত্র প্রকাশ করেছেন যুবক সাইয়েদ কুতুব। এর অর্থ কী? তিনি ছিলেন প্রতিভাবান অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন একজন সমালোচক।’ ফারুক শুশার এই কথার মাধ্যমে বুঝে আসে, মুসলিম ব্রাদারহুডের থেকে তাঁর চিন্তাচেতনার বেশ দূরত্ব ছিল। তখন অবধি তাঁর সব রচনাই ছিল শিল্পসাহিত্য নিয়ে। তাঁর দেশপ্রেম ও ভালোবাসার ব্যাপারে কারও কোনো বিরোধমত ছিল না।
১৯৩৯ শালে তিনি التصوير الفني في القرآن শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন সাইয়্যেদ কুতুব। এটাকে ধরা যায় তাঁর সর্বপ্রথম ইসলামী সাহিত্যকর্ম। তবে এই প্রবন্ধ এবং একই শিরোনামে প্রকাশিত তাঁর পরবর্তী বইয়ের মাঝে বেশ তফাৎ রয়েছে। প্রবন্ধ এবং বই–দুটো আলাদা আলাদা কাজ।
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের বিশেষ এক মিশনের সদস্য হয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। মিশনের উদ্দেশ্য ছিল, সেখানকার উন্নত শিক্ষার হালচাল জানা। যাতে করে আমেরিকান শিক্ষাপদ্ধতি মিশরেও চালু করা যায়। সাইয়েদ কুতুব সেখানে চার বছর কাটান। আমেরিকা অবস্থানকালেই তিনি ব্রাদারহুডের চিন্তাধারার সঙ্গে প্রথমবারের মতো ঘনিষ্ঠ হন এবং এর দ্বারা প্রভাবিত হন।
১২/২/১৯৪৯ সালে শায়েখ হাসানুল বান্নাকে শহীদ করা হয়। তাঁর শাহাদাতের খবর সবখানে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে তাঁর শাহাদাতের খবরকে বিশাল জয় হিসেবে উদযাপন করা হয়। এ ঘটনায় সাইয়েদ কুতুব যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বসে অপমানবোধ করেন। তবে প্রথমদিকে তাঁর এই অনুভূতি ধর্মীয় আবেগ থেকে ছিল না, ছিল নিরেট দেশাত্মবোধ ও আরববাদী চেতনা থেকে।
তখন থেকে তিনি ভাবতে লাগেন, কে এই হাসানুল বান্না, কী তাঁর ইতিহাস? মুসলিম ব্রাদারহুডের ইতিহাস ও তাদের নিয়ে গবেষণা শুরু করেন সাইয়্যেদ কুতুব। যুক্তরাষ্ট্রে বসেই লিখে ফেলেন ‘العدالة الاجتماعية في الإسلام’ নামের বইটি। ধরা যায় নিরেট ইসলামকে গবেষণা করে লেখা এটাই তাঁর প্রথম বই। এই বইয়েই তাঁর ইসলামী ব্যক্তিত্বের প্রথম প্রকাশ ঘটে। তাঁর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য একদম স্পষ্ট হয়ে যায়। বইয়ের শব্দে শব্দে পাঠককে তিনি তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবে এই বইয়ের সব চিন্তা গ্রহণযোগ্য, এটাও বলা যায় না।
যাইহোক, ২৩/৮/১৯৫২ সালে তিনি আমেরিকা থেকে দেশে ফেরেন। সময়টা ছিল সেনা অভ্যুত্থানের ঠিক একমাস পর। এর দুমাস পরেই শিক্ষামন্ত্রণালয় থেকে আনুষাঙ্গিক কারণে তিনি অব্যাহতি নেন।
পাঠকের জানা থাকা দরকার যে, সাইয়েদ কুতুব ছিলেন সেনাবাহিনীর একদম ঘনিষ্ঠ লোক। বিশেষ করে অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী সেনা অফিসারদের। তিনি তাদের এতটাই কাছের ছিলেন যে, অভ্যূত্থান-পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুন নাসের তাঁকে বিপ্লবী নেতৃত্বের উপদেষ্টা নির্বাচন করেন। শুধু তাই না, তাঁর লিখিত العدالة الاجتماعية في الإسلام নামক বইটি বিপ্লবী সেনা অফিসারদের মাঝে নিজ দায়িত্বে প্রচার করেছিলেন তিনি।
জামাল আব্দুন নাসের جبهة التحرير নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে তিনি রাষ্ট্রের বিশেষ ব্যক্তিবর্গ ও নেতৃবৃন্দকে সমবেত করার চেষ্টা করেছেন। যাদের দিয়ে তিনি পরবর্তীতে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিরোধ করবেন। কারণ, জামাল আব্দুন নাসেরের সামনে ব্রাদারহুড ছিল বিশাল পাহাড় স্বরূপ। সবচেয়ে বড় বিপদ ছিলো, মুসলিম ব্রাদারহুডের অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি। এসব বিষয়ের প্রতি খেয়াল করেই তাঁর এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠা। جبهة التحرير-এর পক্ষ থেকে সাহিত্যিক ও গবেষক সাইয়েদ কুতুবকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য ১৯৫৩ সালে একটি কনফারেন্স ডাকা হয়। উক্ত কনফারেন্সে সাইয়েদ কুতুব তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট বলেছেন যে, তিনি তাঁর যাত্রাপথে সকল বাধা সইতে রাজি আছেন। সাইয়্যেদ কুতুবের এ কথার প্রেক্ষিতে তখন আব্দুন নাসের প্রতিজ্ঞা করে বলেন, যেকোনো মূল্যে হোক তিনি সাইয়েদ কুতুবকে রক্ষা করবেন। শেষে সেই আব্দুন নাসেরই তাঁকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছিলেন।
উক্ত কনফারেন্সে সাইয়েদ কুতুব ঠিক ধরে ফেলেন জাবহাতুুত তাহরীরের লক্ষ্য কী? জামাল আব্দুন নাসের কী করতে যাচ্ছেন তাও তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। সাইয়েদ কুতুব তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। দেরি না করে মুসলিম ব্রাদারহুডের পৃষ্ঠপোষক হাসান হুদাইবী’র কাছে চলে যান। মতামতের পরই হাসান হুদাইবী তাঁকে প্রধান আহ্বায়ক নির্বাচন করেন। এসবের কোনো কিছুই আব্দুন নাসের জানেন না। সেনাপ্রধানদের অগোচরেই সব হয়েছে।
মাসকয়েক বাদে আব্দুন নাসের তাঁর অফিসে جماعة الإخوان المسلمين নামে একটি সংবাদপত্রের লাইসেন্সের আবেদনপত্র পান। পত্রিকাটির সম্পাদক সাহিত্যিক ও গবেষক সাইয়েদ কুতুব। আব্দুন নাসের আকাশ থেকে পড়লেন যেন। কীভাবে সম্ভব! সাথে সাথে লোক পাঠালেন সাইয়েদ কুতুবের তলবে। তারা হৈচৈ করে প্রশ্ন করল, আপনি কি আসলেই মুসলিম ব্রাদারহুড করেন? তিনি সরাসরি হ্যাঁ বলে দিলেন। এসময় আব্দুন নাসের বিরাট ধাক্কা খেলেন। তাদের সম্পর্ক দুদিকে ছিটকে পড়ল।
যাইহোক, ১৯৫৪-এর ২৬ অক্টোবর আলেকজান্দ্রিয়ার মানশিয়া নামক এলাকায় বক্তব্য প্রদানকালে জামাল আব্দুন নাসেরের উপর আক্রমণের চেষ্টা করা হয়। এই ব্যর্থ আক্রমণের দায়ভার চাপানো হয় ব্রাদারহুডের উপর। একই সাথে রাষ্ট্রীয় আদেশ মতে ব্রাদারহুডের جماعة الإخوان المسلمين নামক পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ব্রাদারহুডের নেতাদের আটক শুরু হয়। আটকের কাতারে সাইয়েদ কুতুবও ছিলেন। আদালত তাঁকে ১৫ বছর কারাদণ্ডের হুকুম দেয়।
দশবছর চলে যায় বন্দীখানায়। তারপর ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুস সালাম আরেফ-এর মধ্যস্থতায় ব্রাদারহুডের অনেক নেতাকে আদালত মুক্তি দান করে। মুক্তিপ্রাপ্তদের মাঝে সাইয়েদ কুতুবও ছিলেন। জেল থেকে মুক্তি পেলেও চিকিৎসার অভাবে তাঁর শরীর একদম ভেঙে পড়েছিল।
শরীরের এই দুরবস্থা সত্ত্বেও তিনি চুপসে থাকেননি। معالم في الطريق নামের আলোড়ন-জাগানো বইটি লেখেন তখন। বইটির শক্ত ভাষা সেনাবাহিনীর উপর পরামাণু হয়ে অবতীর্ণ হলো। কেনই-বা হবে না, ক্ষুব্ধ সাহিত্যক ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন একজন বন্দী দশবছর স্বচক্ষে বন্দীশালার পাশবিকতা দেখেছেন। কে পারবে শব্দ গেঁথে অনুভূতির সুন্দর-অসুন্দরকে তাঁর মতো তুলে ধরতে?
যাইহোক, সাইয়েদ কুতুব মাত্র একবছর ছিলেন জেলের বাইরে। أعضاء التنظيم السر অর্থাৎ গোপন সংস্থার সদস্য বলে আবার ধর-পাকড় শুরু হয়। এখনকার জঙ্গি অপবাদের মতো অনেকটা। প্রায় বিশ হাজারের মতো আটক করা হয়। পঁচাত্তর জনকে সরকার উৎখাতের অপবাদে ফাঁসানো হয়। যাদের বেশির ভাগই ছিলেন ভার্সিটির প্রফেসর, ইঞ্জিনিয়ার ও ডাক্তার। তাদের মাঝে ছিলেন সাহিত্যিক ও গবেষক সাইয়েদ কুতুবও।
আদালতে সরকারের ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তা সাইয়েদ কুতুবকে বলেন, আপনি তো ব্রাদারহুডের সাথে নতুন যুক্ত হয়েছেন, বিচারপতির সামনে দুটি তুষ্টকথা উচ্চারণ করুন, আপনাকে মুক্তি দিয়ে দিবেন তিনি।
তাঁর কথার উত্তরে সাইয়েদ কুতুব বলেন, আকিদার ক্ষেত্রে গোপনকরণ শোভা পায় না। আর একজন নেতার জন্য তুচ্ছতা গ্রহণও অসম্মানজনক।
শেষমেশ ফাঁসির রায় শোনানো হয়। মূলত আব্দুন নাসের চেয়েছিলেন সাইয়েদ কুতুবকে আগে অপদস্ত করবেন, পরে মুক্তি দেবেন অথবা তাঁর ফাঁসির আদেশ রহিত করে সাজা কমিয়ে আনবেন। কিন্তু কে চায় কার রহমত? সাইয়েদ কুতুব হলেন আত্মমর্যাদার উপর সুদৃঢ় একজন ব্যক্তি। শুরু থেকেই সবাই এ ব্যাপারে জ্ঞাত।
আহমাদ ফাররাগ নামের এক অফিসার এক সাক্ষাতে তাঁকে বলেন, যেন তিনি ছোট করে একটি ওজরনামার মতো কিছু লিখে দেন, অফিসার নিজ দায়িত্বে তাঁর মুক্তির ব্যবস্থা করবেন। অফিসারের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সাইয়্যেদ কুতুব তখন বলেছিলেন, যেই শাহাদাত আঙুল আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকার করে আসমানের দিকে উত্থিত হয়, স্বেচ্ছাচারীর সমর্থনে ওজরনামা লিখতে সে আঙুল কোনোভাবেই ব্যবহৃত হবে না।
সাইয়েদ কুতুবকে ফাঁসির কাষ্ঠে ওঠানোর আগে ওখানে ফুয়াদ আল্লাম নামে এক অফিসার ছিলেন। ফুয়াদ আল্লামও একই প্রস্তাব রেখেছিলেন সাইয়েদ কুতুবের কাছে। বলেছিলেন, জনাব, আসলেই আপনাকে মুক্তি দানের অভিপ্রায় ছিল, আপনি মুখে একটু ক্ষমাপ্রার্থনা করবেন মাত্র। তখনও কুতুবের প্রত্যাখানমূলক সুদৃঢ় জবাব ছিল। বলেছিলেন, আল্লাহর রাস্তায় কাজ করে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলছি, এ তো সৌভাগ্য, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে কেন আমার এ সৌভাগ্যকে আমি বিনষ্ট করব?
অফিসার আবার বলেন, জনাব, শুধু মিনতি করবেন একটু, আমি এখনই সরকারকে জানিয়ে দেবো। সাইয়েদ কুতুব উত্তরে বলেন, কেন মিনতি করব? যদি আমি সৎভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকি, তাহলে আমি এই সিদ্ধান্তেই সন্তুষ্ট। আর যদি অন্যায়ভাবে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে থাকি, তাহলে বাতিলের কাছে মিনতি করার নীচুতা থেকে আমি অনেক ঊর্ধ্বে!
২৯ আগস্ট ১৯৬৬ সালে ফজরের সময় সাইয়েদ কুতুবকে ফাঁসি দেওয়া হয়। রহিমাল্লাহু। ফাঁসির আগে তিনি বলে গেছেন, ‘রক্তে সিঞ্চিত না হলে কোনো চেতনার স্থায়িত্ব আসে না।’
সামরিক শাসন তাঁকে ফাঁসি দিয়ে তাঁর দেহ বিদায় করেছে ঠিকই, কিন্তু হাজার বছরের জন্য তাঁর চেতনায় প্রাণ সঞ্চার করেছে। তাঁকে ছেড়ে দিলে আজ হয়তো বিশ শতকের আর দশজন লেখকের মতো তাঁকেও মানুষ ভুলে যেত। কিন্তু জীবনের বিনিময়ে তিনি পৃথিবীর সচেতন সত্যপন্থী প্রতিটা মানুষের হৃদয়ে চেতনার মিনার হিসেবে বেঁচে আছেন পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে। তাঁর নাম উচ্চারণের সাথে সাথে মানুষের দিল ফুঁড়ে আরেকটি বাক্য বেরিয়ে আসে–রাহিমাহুল্লাহ–আল্লাহ রহম করুন তাঁর এ বান্দার প্রতি।

মুহাম্মদ_কুতুবঃ বিশ শতকের এই মহান চিন্তাবিদকে কতটুকু চেনেন?


মুহাম্মদ কুতুব। মিশরের একজন প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ। ইসলামি চিন্তাধারা নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা-পত্র রয়েছে তাঁর। ভাই সাইয়েদ কুতুবের সাথেই একটা অভিজ্ঞতাপূর্ণ সময় পার করেছেন তিনি। রাষ্ট্রীয় শত বাধা-প্রতিবন্ধকতা সত্বেও তাদের শক্ত যুক্তি এবং স্পষ্ট দর্শন ও পর্যবেক্ষণ সর্বদাই অনড় ও অবিচল ছিল।
জন্মকাল
মিশরের আসয়ুতের মুশা নামক গ্রামে ২৬ এপ্রিল ১৯১৯ সালে মুহাম্মদ কুতুব জন্মগ্রহণ করেন। যে বছরের গণজাগরণ ইংরেজ দখলদারকে মিশরের মাটি ছাড়তে বাধ্য করেছে। শুধু মিশর না, এই গণজাগরণের ফলে আরব জাহান থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে হয়েছিল তারা। তাই বলা যায়, মুহাম্মদ কুতুবের দুনিয়ায় আগমন এবং তাঁর শৈশব-কৈশোর পার হয়েছে আরব গণজাগরণের কালে। আরবভূখণ্ডে ইউরোপিয়ান ঔপনিবেশিক শাসনামলের শেষ যুগ ছিল এটা।
ভাইয়ের ছায়ায়
পিতার মৃত্যুর পর মা সিদ্ধান্ত নেন পড়াশোনার জন্য সন্তানদের কায়রো পাঠাবেন। বড় ভাই সাইয়েদ কুতুব এবং বোন আমিনা ও হামিদার সাথে মুহাম্মদ কুতুবও রাজধানী কায়রো পাড়ি জমান। নিম্নমাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে কায়রো ভার্সিটিতে ভর্তি হন। এখানেই ইংলিশ ভাষা-সাহিত্যের উপর ডিগ্রী অর্জন করেন। পরে এডুকেশন ইনিস্টিটিউট থেকে শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞানের উপর ডিপ্লোমা করেন। এরপর চারবছর শিক্ষকতা করেন। এক সময় শিক্ষকতা ছেড়ে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের ট্রান্সলেশন অফিসে কাজ শুরু করেন। পরে দুই বছরের জন্য শিক্ষকতায় ফিরলেও আবার শিক্ষামন্ত্রণালয়ের ‘আলফ কিতাব’ নামক প্রজেক্টে অংশ নেন।
তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে অবদান রয়েছে তিন মহাপুরুষের। সাইয়েদ কুতুব, সাহিত্যিক আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ এবং তাঁর মামা আহমাদ হুসাইন আল মুশী। আহমাদ হুসাইন ছিলেন সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ। যার সাহিত্যিক প্রতিভা এবং কাব্যচর্চা বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। তবে সবার থেকে আলাদা করে ভাইয়ের প্রশংসা করেছেন তিনি। স্বীকার করেছেন যে, তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা ও ব্যক্তিসত্তা উন্নায়নে সাইয়েদ কুতুবের দিক-নির্দেশনা মূল ভূমিকা পালন করেছে। সাইয়েদ কুতুবের সাথে তাঁর সম্পর্ক বয়ান দিতে গিয়ে তিনি বলেন- ‘শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে আমার সাথে সাইয়েদের সম্পর্ক ছিল কখনো নমনীয়, আবার কখনো কঠিন। এতোটা নরম হতেন না, যাতে আমি বিগড়ে যাই। আবার এতটা কঠোর হতেন না, যাতে আমি তাঁর কাছে না ভিড়ি। তিনি নিজে তো বইপোকা ছিলেনই, অন্যদিকে সবসময় আমাকেও বিভিন্ন বিষয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাঁর এই উদ্বুদ্ধকরণ শৈশব থেকেই পাঠের প্রতি আমার ভিন্ন ভালোবাসা যুগিয়েছে।’
নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ব্যাপারে মুহাম্মদ কুতুব বলেন, ‘বুঝমান হওয়ার পর থেকে সাইয়েদ কুতুবের সকল দৃষ্টিভঙ্গী ও চিন্তাভাবনার সেই বিশাল রাজ্যে অন্তরঙ্গভাবে বাস করেছি। আর যখন উচ্চমাধ্যমিক পার করি, তখন তিনি নিজ থেকেই তাঁর বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আমার সাথে শেয়ার করতেন। সেসব বিষয়ে আমাকেও আলোচনা করার সুযোগ করে দিতেন। এজন্যই আমাদের আত্মা ও চিন্তাধারার মাঝে বড় একটা মিল রয়েছে। সাথে ভ্রাতৃত্ব ও একই পরিবারে বেড়ে ওঠার সম্পর্ক আরো অন্তরঙ্গ হওয়ার পথ করে দিয়েছে।
জেলজীবন
১৯৪৮ সালের ৮ই ডিসেম্বরে মিশরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ ফাহমী ‘সশস্ত্র গোপণ সংস্থা’ ও আরও বিভিন্ন হামলার তোহমতে মুসলিম ব্রাদারহুডের উপর রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষেধাজ্ঞ্য জারি করেন। সাথে মুসলিম ব্রাদারহুডের উচ্চপর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে আটকের হুকুম দেন। তখন ধরপাকড় হলেও খুব একটা জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। একই মাসের ২৮ তারিখ মাহমুদ ফাহমীকে হত্যা করা হয়। যার পুরাপুরি দায়ভার মুসলিম ব্রাদারহুডের উপর অর্পিত হয়। মাহমুদ ফাহমীর হত্যার পর ধরপাকড় খুব আকারে বেড়ে যায়। দুই মাস যেতে না যেতেই ১৯৪৯ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসানুল বান্নাকে হত্যা করা হয়। সাইয়েদ কুতুব এর কিছুদিন পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরত আসেন।
১৯৫২ সালে সেনাঅভ্যুত্থানের পর মিশরের রাজতন্ত্র মিটিয়ে দেয় বিদ্রোহী সেনারা। এখানে একটি বিষয় বলে রাখি, সেনা কর্মকর্তা ও মুসলিম ব্রাদারহুডের মাঝে বেশ সম্পর্ক ছিল। এর পিছনে কারণও আছে। ১৯৪৮ সালে দখলদার ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধকালে ব্রাদারহুডের যুবকরাও সেই যুদ্ধে শামিল হয়। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী জামাল আব্দুন নাসেরও ব্রাদারহুডের উক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু বায়ান্নর পরে সেনাদের অবস্থান একদম পাল্টে যায়। ১৯৫৪ সালে জামাল আব্দুন নাসেরকে হত্যার চেষ্টা করা হলে সেই দোষও গিয়ে চাপে মুসলিম ব্রাদার হুডের উপর। এ সময় হত্যা চেষ্টার অভিযোগে সাইয়েদ কুতুব ও তাঁর ভাই মুহাম্মদ কুতুবকেও আটক করা হয়। দুই ভাইকে সামরিক ভিন্ন দুই কারাগারে বন্দী করা হয়। এতটা দূরত্ব ছিল তাঁদের মাঝে, কেউ কারও অবস্থান সম্পর্কে জানতেন না। জেলের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সাইয়েদ কুতুব বলেন, ‘সামরিক কারাগারের কষ্ট আমার অন্তরে বড় প্রভাব ফেলেছে। কারণ, এটাই ছিল আমার কারাগারের প্রথম অভিজ্ঞতা। শাস্তি এবং নির্দয়তা এতটাই তীব্র ছিল যে, আমি বলতে পারি আমার আত্মাকে একদম বদলে দিয়েছে।’
অল্প কিছুদিন পরমুহাম্মদ কুতুবকে মুক্তি দেওয়া হয়। অন্যদিকে সাইয়েদ কুতুবকে ১৫ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ প্রদান করা হয়। আর এই সময়েই সাইয়েদ কুতুব তাঁর প্রসিদ্ধ বই في ظلال القرآن লেখেন। মুহাম্মদ কুতুব তাঁর কারামুক্তি নিয়ে বলেন, ‘আমাকে জেল মুক্তি দেওয়া হয়েছে পরিবারের বোঝা বহনের জন্য। যেই পরিবারের পুরো দায়িত্বভার ছিল ভাইয়ের উপর। যেমনটি আমরা দেখে এসেছি আগে থেকে। সেই পরিবারের বোঝা নিয়ে দশ বছরের বাস্তব জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতায় আমি নিবিষ্ট হয়েছি।’
১৯৬৪ সালে মে মাসে সাইয়েদ কুতুবকে শারীরিক অবক্ষয়ের কারণে মুক্তি দেওয়া হয়। মুহাম্মদ কুতুব ভাইয়ের মুক্তির কথা ব্যক্ত করেন, ‘তাঁর মুক্তিকে আমরা অনেকটা উদ্বেগের সাথে গ্রহণ করেছি। গভীরভাবে আনুভব করছিলাম, ওরা তাঁকে এত সহজে ছেড়ে দিবে না। এরচেয়ে বড়ো কোনো ষড়যন্ত্রের ফাঁদ আটছে কারাগারে। যা ভেবেছিলাম , তাই হয়েছিল।’ সাইয়েদ কুতুব কারাগার থেকে বের হতে না হতেই রাজ্যে আবার উত্তেজনা বেড়ে যায়। জামাল আব্দুন নাসেরও ধরপাকড় শুরু করে। এবারো তাঁদের দুই ভাইকে কারাবন্দী করা হয়। কিন্ত এবার কিছুটা উল্টো হল। মুহাম্মদ কুতুব ছয় বছরের দীর্ঘ কারাজীবন পার করলেন। এই ফাঁকে সাইয়েদ কুতুবসহ আরো ছয়জনকে ফাঁসি দেওয়া হল। তাঁর বড় বোনের ছেলেকে গোপনে হত্যা করা হয়। তিন বোনকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়।
হিজরত
সত্তর দশকের গোড়ার দিকে মুহাম্মদ কুতুব সৌদি হিজরত করেন। মক্কার উম্মুল কুরা ভার্সিটিতে শরীয়াহ ফ্যাকালটির লেকচারার হিসেবে নিযুক্ত হন। সেখান থেকে পরে জেদ্দার কিং আব্দুল আজীজে নিযুক্ত হন।
মুহাম্মাদ কুতুবের তত্বাবধানে বেশ কিছু থিসিস পেপার প্রকাশিত হয়েছে। যেগুলো শায়েখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাবের চিন্তাচেতনা ও সমসাময়িক চিন্তাধারার মাঝে দৃঢ় সম্পর্কের সৃষ্টি করেছে। প্রসিদ্ধ থিসিস পেপারের মধ্যে ছিল ‘العلمانية.. نشأتها وتطورها وآثارها في الحياة الإسلامية المعاصرة’ গবেষণা পত্রটি লিখেছেন ডঃ সাফর আল হাওয়ালী। আরো ছিল ‘ الولاء والبراء’ লিখেছেন ডঃ মুহাম্মাদ বিন সায়ীদ আল কাহতানী। প্রসিদ্ধের মাঝে আরো ছিল ” أهمية الجهاد” লিখেছেন আলী বিন নাফী আল আলয়ানী। তা ছাড়া সৌদির বিভিন্ন স্তরের সিলেবাস প্রণয়নের ক্ষেত্রেও তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে। ১৯৮৮ শালে তিনি ইসলামি স্টাডিজের জন্য আন্তর্জাতিক কিং ফয়সাল পুরুষ্কার অর্জন করেছেন।
মৃত্যু
২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল জুমার দিন জেদ্দায় মুহাম্মদ কুতুব মৃত্যুবরণ করেন। রহিমাহুল্লাহ।
পরিশিষ্ট
সাইয়েদ কুতুব ও মুহাম্মদ কুতুব গত শতকের সেরা মুসলিম ব্যক্তিত্ব। তাঁদের আবিষ্কার ও গবেষণা পত্রগুলো সাময়িক অনেক ঘটনা সম্পৃক্ত হলেও ইসলামি পবিত্র চেতনার কমতি নেই। তাঁদের ব্যাপারে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মতামত রয়েছে। কেউ বলে তাকফিরী (মন মতো কাফের সাব্যস্ত করেছেন), কেউ বলে সালাফীদের গোঁড়ামির চাদরে বেড়ে উঠেছে তাদের চিন্তাভাবনা। যেই যা বলুক, তাদের আবিষ্কার ছিল যুগ সেরা। তবে বিশেষজ্ঞগণ বলেন, যেকোনো স্থরের ছাত্রদেরকে ব্যক্তিগতভাবে তাদের গ্রন্থ পাঠ না করা শ্রেয়। বরং বিজ্ঞ কোনো ব্যক্তিত্বের তত্ত্বাবধানে এগুলোর পাঠ আবশ্যক। আল্লাহ তাঁদেরকে জান্নাতবাসী করুন।

কলকাতার বাবুরা বলেছেন,”ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় করার কোন দরকার নেই।

কলকাতার বাবুরা বলেছেন,”ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় করার কোন দরকার নেই। ফার্মগেট আছে,ধানমণ্ডি আছে পাশে একটা কৃষি কলেজ করে দাও। “
এই ধরনের কায়েমী স্বার্থবাদী আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিটিশ লর্ডের কাছে গিয়ে শেরে বাংলা ফজলুল হক বোঝালেন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। এবার ব্রিটিশরা কিছুটা নমনীয় হল — কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হল একটু দেরীতে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক ।কলকাতার বাবুরা বলেছেন,”ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় করার কোন দরকার নেই। ফার্মগেট আছে,ধানমণ্ডি আছে পাশে একটা কৃষি কলেজ করে দাও। “
এই ধরনের কায়েমী স্বার্থবাদী আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিটিশ লর্ডের কাছে গিয়ে শেরে বাংলা ফজলুল হক বোঝালেন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। এবার ব্রিটিশরা কিছুটা নমনীয় হল — কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হল একটু দেরীতে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক ।
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯১৬ সালে মুসলিম লীগ এর সভাপতি নির্বাচিত হন । পরের বছর ১৯১৭ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এর সাধারণ সম্পাদক হন । তিনিই ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি যিনি একই সময়ে মুসলিম লীগ এর প্রেসিডেন্ট এবং কংগ্রেস এর জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন । ১৯১৮ -১৯ সালে জওহরলাল নেহেরু ছিলেন ফজলুল হকের ব্যক্তিগত সচিব ।
১৯৩৭ এর নির্বাচনে শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক ঘোষণা দিয়েছেন নির্বাচনে জিতলে তিনি জমিদারি প্রথা চিরতরে উচ্ছেদ করবেন।তিনি যাতে নির্বাচিত হতে না পারেন তার জন্য সারা বাংলাদেশ আর কলকাতার জমিদাররা একত্র হয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেছেন। লাভ হয়নি — কৃষকরা তাদের নেতাকে ভোট দিয়েছেন।
মুসলিম লীগ এর লাহোর অধিবেশনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বক্তব্য দিচ্ছেন । হঠাৎ করে একটা গুঞ্জন শুরু হলো, দেখা গেল জিন্নাহর বক্তব্যের দিকে কারও মনযোগ নাই । জিন্নাহ ভাবলেন, ঘটনা কী ? এবার দেখলেন, এক কোণার দরজা দিয়ে ফজলুল হক সভামঞ্চে প্রবেশ করছেন, সবার আকর্ষণ এখন তার দিকে । জিন্নাহ তখন বললেন — When the tiger arrives, the lamb must give away. এই সম্মেলনেই তিনি উত্থাপন করেছিলেন ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব ।
১৯৪০ সালের ২২-২৪ শে মার্চ লাহোরের ইকবাল পার্কে মুসলিম লীগের কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এই কনফারেন্সে বাংলার বাঘ আবুল কাশেম ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি তার প্রস্তাবে বলেন, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বাস্তবতায় হিন্দু মুসলিম একসাথে বসবাস অসম্ভব। সমাধান হচ্ছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র এবং পূর্বাঞ্চলে বাংলা ও আসাম নিয়ে আরেকটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।
পাঞ্জাবের মওলানা জাফর আলী খান, সীমান্ত প্রদেশের সর্দার আওরঙ্গজেব, সিন্ধের স্যার আব্দুল্লাহ হারুন, বেলুচিস্তানের কাজী ঈসা ফজলুল হকের প্রস্তাব সমর্থন করেন। কনফারেন্সে এই প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়।
লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের সময়ে হিন্দুপ্রধান প্রদেশগুলোতে মুসলিম নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকার কারণে ফজলুল হক খুবই উদ্বিগ্ন এবং কিছুটা উত্তেজিত ছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে একবার বলেন, ‘ আমি আগে মুসলিম, পরে বাঙালী (muslim first, bengali afterwards)’। বক্তৃতার এক পর্যায়ে এসে বলেন, ‘কংগ্রেস শাসিত রাজ্যগুলোতে যদি আর কোনো মুসলিম নির্যাতিত হয় তাহলে আমি বাংলার হিন্দুদের উপর তার প্রতিশোধ নেব।’
যে ফজলুল হক তিন বছর আগে সোহরাওয়ার্দী, নাজিমউদ্দিনকে রেখে শ্যামাপ্রসাদের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছেন সেই ফজলুল হকের মুখে এমন বক্তব্য তখনকার ভারতে ব্যাপক আলোড়ন সৃাষ্ট করেছিল।
বর্তমানে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র তার ভিত্তি হচ্ছে লাহোর প্রস্তাব। তাই ২৩ শে মার্চ কে পাকিস্তানে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
কিন্তু লাহোর প্রস্তাব পাশ হওয়ার কয়েকদিন পরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চালাকির আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবটি টাইপ করার সময়ে ভুল করে muslim majority states লেখা হয়েছে; আসলে হবে state । জিন্নাহর ধারণা ছিল, দেন-দরবার করে দুই পাশে দুইটা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই স্টেটস এর জায়গায় স্টেট লিখে একটা মুসলিম মেজরিটি রাষ্ট্র করতে হবে।
জিন্নাহর এই ধূর্ততার কারণে ফজলুল হক তার সাথে পাকিস্তান আন্দোলনে সম্পৃক্ত হননি। তরুণ শেখ মুজিব যখন জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তখন অভিজ্ঞ ফজলুল হক পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন। ‘তিঁনি অনুমান করতে পেরেছিলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে কী কী দুর্দশা হবে বাংলার মানুষের। তাই তিঁনি পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন…….”বাংলার মাটিও তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেছি, তখনই বাধা পেয়েছি। একদিন আমার মনে আছে একটা সভা করছিলাম আমার নিজের ইউনিয়নে, হক সাহেব কেন লীগ ত্যাগ করলেন, কেন পাকিস্তান চাননা এখন? কেন তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সাথে মিলে মন্ত্রীসভা গঠন করেছেন? এই সমস্ত আলোচনা করছিলাম, হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লোক যিনি আমার দাদার খুব ভক্ত, আমাদের বাড়িতে সকল সময়েই আসতেন, আমাদের বংশের সকলকে খুব শ্রদ্ধা করতেন- দাঁড়িয়ে বললেন,”যাহা কিছু বলার বলেন, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলবেন না। তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাই না। জিন্নাহ কে? তার নামও তো শুনি নাই। আমাদের গরিবের বন্ধু হক সাহেব।” এ কথার পর আমি অন্যভাবে বক্তৃতা দিতে শুরু করলাম। সোজাসুজিভাবে আর হক সাহেবকে দোষ দিতে চেষ্টা করলাম না। কেন পাকিস্তান আমাদের প্রতিষ্ঠা করতেই হবে তাই বুঝালাম। শুধু এইটুকু না, যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কালো পতাকা দেখাতে গিয়েছি, তখনই জনসাধারণ আমাদের মারপিট করেছে। অনেক সময় ছাত্রদের নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি, মার খেয়ে।”
বঙ্গবন্ধু ‘ র বাবা বলেছেন , ” বাবা তুমি যাই করো শেরে বাংলার বিরুদ্ধে কিছু বলো না। শেরে বাংলা এমনি এমনি শেরে বাংলা হয়নি। “
ফজলুল হক জানতেন মাঝখানে ভারতকে রেখে পশ্চিম আর পূর্বে জোড়া দিয়ে এক পাকিস্তান করলে তা কখনো টিকবে না। ‘ জিন্নাহ আমার লাহোর প্রস্তাবের খৎনা করে ফেলেছে -বলে ফজলুল হক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় থাকেননি।
১৯৪৬ এ এসে জিন্নাহ সোহরাওয়ার্দীর দুই বাংলা একত্র করে স্বাধীন যুক্তবাংলার দাবী মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণে শেষ পর্যন্ত বাংলাও ভাগ করতে হল।
ফজলুল হক বলেছিলেন, একটি পাকিস্তান কখনও টিকবে না। বাংলা এবং আসামকে নিয়ে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র করতে হবে।
১৯৭১ সালে এসে দেখা গেল, ফজলুল হকের আশঙ্কা এবং ভবিষ্যতবাণী সঠিক। ১৯৭১ এর মত এমন কিছু যে ঘটবে শেরে বাংলা ফজলুল হক তা আঁচ করতে পেরেছিলেন ১৯৪০ সালেই। তাই তিনি ১৯৪০ সালেই বাংলা আর আসাম নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র করতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক।
১৯৭১ এর যুদ্ধ হল ফজলুল হকের লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন। লাহোর প্রস্তাব ফজলুল হক যেভাবে উত্থাপন করে ছিলেন সেভাবে মানলে একাত্তরে এই দেশে রক্তগঙ্গা বইত না।
পেশাজীবনে ‘কলকাতা হাইকোর্টের নামকরা আইনজীবী ছিলেন। একদিন তাঁর জুনিয়র হাতে একগাদা পত্রিকা নিয়ে এসে বললেন, ” স্যার , দেখুন , কলকাতার পত্রিকাগুলো পাতার পর পাতা লিখে আপনার দুর্নাম ছড়িয়ে যাচ্ছে — আপনি কিছু বলছেন না । ” তিঁনি বললেন, ” ওরা আমার বিরুদ্ধে লিখছে তার মানে হল আমি আসলেই পুর্ব বাংলার মুসলমান কৃষকদের জন্য কিছু করছি। যেদিন ওরা আমার প্রশংসা করবে সেদিন মনে করবে বাংলার কৃষক বিপদে আছে। “
মুহাম্মদ ওয়াজেদ আলী বরিশাল বারের নামকরা উকিল । একবার ওয়াজেদ আলী র প্রতিপক্ষ মামলার ইস্যু জটিল হওয়ার কারণে কলকাতা থেকে তরুণ উকিল ফজলুল হককে নিয়ে আসে ওয়াজেদ আলীকে মোকাবেলা করার জন্য । ফজলুল হক ওই সময়ে কেবলমাত্র ফজলুল হক , শেরে বাংলা তখনও হননি । তিনি মামলা লড়তে এসেছেন , কিন্তু বিপক্ষের উকিল কে সেই খবর জানতেন না ।
কোর্টে এসে দেখলেন বিপক্ষে তার বাবা ওয়াজেদ আলী দাঁড়িয়েছেন । ফজলুল হক স্বাভাবিকভাবে যুক্তিতর্ক শুরু করলেন ।
এক পর্যায়ে ওয়াজেদ আলী আদালতকে উদ্দেশ করে বললেন , “ ইনি যা বলছেন তা আইনসংগত না । আইনটা হল আসলে এরকম এরকম ……. ইনি নতুন উকিল তো আইন কানুন ভালো বোঝেন না । “
উত্তরে ফজলুল হক বললেন , “ তিনি পুরাতন অভিজ্ঞ উকিল হলে কী হবে ? তিনি হচ্ছেন কৃষকের ছেলে উকিল ( প্রকৃতপক্ষে তার দাদা আকরাম আলী ছিলেন ফারসি ভাষার পন্ডিত ) , তিনি আইনের কী আর বোঝেন ? আমি হচ্ছি উকিলের ছেলে উকিল , যুক্তি আমারটাই ঠিক । “
খ্যাতির সাথে ৪০ বছর ধরে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি করেছেন । আইন পাশ করার আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্স কেমেস্ট্রি আর ম্যাথমেটিক্সে ট্রিপল অনার্স করেছেন । মাস্টার্স করেছেন ম্যাথমেটিক্স এ । ছোটবেলায় একবার পড়ে বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলার গল্প রূপকথার মত এদেশের সবার মুখে মুখে ।
বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের বাজেট অধিবেশনে একজন এম পি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে বক্তব্য দিতে লাগলেন । ঐ এম পি শেরে বাংলার বিরুদ্ধে গানও লিখে এনেছেন এবং সংসদের বাজেট বক্তুতা করতে গিয়ে সেই গানটি হেলেদুলে কর্কশ কণ্ঠে গাইতে শুরু করলেন । এরকম পরিস্থিতিতে যে কারও পক্ষে মাথা ঠাণ্ডা রাখা মুশকিল ।
শেরে বাংলা ঐ এমপি র বক্তব্যের মধ্যেই বলে উঠলেন — “Mr Speaker, I can jolly well face the music, but I cannot face a monkey.”
এবার ঘটলো মারাত্মক বিপত্তি । তার মত নেতার কাছ থেকে এরকম মন্তব্য কেউ আশা করেনি । এদিকে , ঐ এম পি স্পিকারের কাছে দাবী জানালেন — এই মুহূর্তে ক্ষমা চাইতে হবে এবং এই অসংসদীয় বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে । স্পিকার পড়লেন আরেক বিপদে — তিনি কীভাবে এত বড় একজন নেতাকে এই আদেশ দেবেন ।
শেরে বাংলা ছিলেন ঠাণ্ডা মাথার বুদ্ধিমান মানুষ । তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন — ” Mr. Speaker, I never mentioned any honourable member of this House. But if any honourable member thinks that the cap fits him, I withdraw my remark.”
‘জ্ঞানতাপস প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক তাঁর জীবনী লিখতে চান জেনে বলেছিলেন, ” রাজ্জাক, সত্যি বলো, তোমার মতলবটা আসলে কী ? ” প্রফেসর রাজ্জাক বললেন, ” আমার এই বিষয়টা খুব ভালো লাগে —- আপনি যখন ইংরেজদের সাথে চলেন তখন মনে হয় আপনি জাত ইংরেজ। যখন বরিশালে আসেন মনে হয় আপনি বহুবছর ধরে নিজেই কৃষিকাজ করেন। আবার যখন কলকাতায় শ্যামাপ্রসাদ বাবুকে ভাই বলে ডাক দেন তখন আপনাকে আসলেই হিন্দু মনে হয়। আবার যখন ঢাকার নবাব বাড়িতে ঘুড়ি উড়ান তখন মনে হয় আপনিও নবাব পরিবারের একজন । নিজেকে কেউ আপনার মত এত পাল্টাতে পারে না। আপনি যাই বলেন, সত্য হোক — মিথ্যা হোক, মানুষ বিনা দ্বিধায় তা বিশ্বাস করে। “
মহাত্মা গান্ধী র নাতি রাজমোহন গান্ধী তার বইতে লিখেছেন — তিন নেতার মাজারে তিনজন নেতা শায়িত আছেন যার মধ্যে দুজন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন । একজনকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দেওয়া হয়নি, অথচ তিনিই ছিলেন সত্যিকারের বাঘ ।
কিন্তু এটা তার জীবনের কোনো অপূর্ণতা নয়, একমাত্র রাষ্ট্রপতি হওয়া ছাড়া সম্ভাব্য সব ধরনের পদে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে । তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী, পূর্ব বাংলার তৃতীয় মুখ্য মন্ত্রী; পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পূর্ব – পাকিস্তানের গভর্নর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ।
সর্বভারতীয় রাজনীতি ছেড়ে শুধু পূর্ববাংলার রাজনীতি কেন করছেন এই প্রশ্নের উত্তরে ফজলুল হক বলেছিলেন — এরোপ্লেন এ উঠলে নিচের জিনিস ছোট আর ঝাপসা দেখাতে পারে, তাই আমি মাটিতেই থাকছি । রাজনীতির এরাপ্লেন এ না চড়লেও সৌদি বাদশাহ সউদ ফজলুল হকের সাথে একটা মিটিং করার জন্য নিজের ব্যক্তিগত বিমান পাঠিয়েছিলেন ফজলুল হককে নিয়ে যাওয়ার জন্য ।
অসীম সাহসী এই মানুষটি আমাদেরকে সকল অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে প্রতিবাদ করার কথা বলেছেন। বাঙালী জাতিকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন অনেক আগেই । তিনি বলেছেন, যে জাতি তার বাচ্চাদের বিড়ালের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ায়, তারা সিংহের সাথে লড়াই করা কিভাবে শিখবে ?
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছিলেন ফজলুল হকের শিক্ষক। আবুল মনসুর আহমদের সাথে আলাপচারিতায় ফজলুল হক সম্পর্কে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মন্তব্য :
“ফযলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাঙ্গালী।সেই সঙ্গে ফযলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি মুসলমান।খাঁটি বাঙ্গালীত্বের সাথে খাটি মুসলমানত্বের এমন অপূর্ব সমন্বয় আমি আর দেখি নাই। ফযলুল হক আমার ছাত্র বলে বলছিনা, সত্য বলেই বলছি।খাঁটি বাঙ্গালীত্ব ও খাটি মুসলমানত্বের সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ বাঙ্গালীর জাতীয়তা।”
রেফারেন্স: আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর।(পৃষ্ঠা ১৩৫-৩৬)
পহেলা বৈশাখের সরকারি ছুটি, বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা এই ফজলুল হকের অবদান । কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে ফজলুল হক মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন কারণ কৃষক–শ্রমিক সংখ্যাগরিষ্ঠ এই উপমহাদেশে মাত্র একজন ব্যক্তি কৃষকদের জন্য রাজনীতি করেছেন । তিঁনি হলেন — শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ।
১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসেছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বললে ছাত্ররা তীব্র প্রতিবাদ করে। জিন্নাহ ছাত্রদের সাথে বৈঠকও করেন। কিন্তু ছাত্ররা ছিল নাছোড়বান্দা। জিন্নাহর ধারণা হলো, ফজলুল হক ছাত্রদেরকে উসকানি দিচ্ছেন। ফজলুল হকের বুদ্ধিতে ছাত্ররা উর্দুর বিরোধিতা করছে। জিন্নাহ এবার ফজলুল হকের সাথে দেখা করতে চাইলেন। কিন্তু ফজলুল হক দেখা করতে রাজি হলেন না। ফজলুল হক জিন্নাহকে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করতেন।
জিন্নাহর পীড়াপিড়িতে শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন ফজলুল হক। বন্ধ দরজার আড়ালে কথা হয়েছিল দুই মহান নেতার। কিন্তু ইংরেজিতে কী ধরনের বাক্য বিনিময় হয়েছিল তাদের মধ্যে পরবর্তীতে তা লিখেছেন ফজলুল হকের একান্ত সহকারী আজিজুল হক শাহজাহান —
জিন্নাহ : পাকিস্তান তো তুমি কোনোদিন চাওনি। সব সময়ে বিরোধিতা করে এসেছো।
হক : প্রস্তাবটি তো আমিই করেছিলাম। পরে ওটার খতনা করা হয়েছে। আমি এটা চাইনি।
জিন্নাহ: পাকিস্তানের এই অংশ বেঁচে থাক তা তুমি চাও না। তাই ভারতের কংগ্রেসের টাকা এনে ছাত্রদের মাথা খারাপ করে দিয়েছ। তারা আমাকে হেস্তনেস্ত করছে।
হক: আমি এখানে কোনো রাজনীতি করি না। হাইকোর্টে শুধু মামলা নিয়ে চিন্তা করি। আইন আদালত নিয়ে থাকি ।
জিন্নাহ : জানো, তুমি কার সাথে কথা বলছো ?
হক: আমি আমার এক পুরোনো বন্ধুর সাথে কথা বলছি।
জিন্নাহ: নো নো, ইউ আর টকিং উইথ দ্য গভর্নর জেনারেল অব পাকিস্তান ।
হক: একজন কনস্টিটিউশনাল গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা আমি জানি।
জিন্নাহ: জানো, তোমাকে আমি কী করতে পারি ?
হক: (ডান হাতের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে) তুমি আমার এ্যাই করতে পারো। মিস্টার জিন্নাহ, ভুলে যাওয়া উচিত নয় এটা বাংলাদেশ এবং তুমি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সাথে কথা বলছ।
(আজিজুল হক শাহজাহানের কলাম,অমরাবতী প্রকাশনী,ঢাকা;পৃষ্ঠা ৪৬-৪৭)
২৬ শে অক্টোবরে শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের ১৪৬ তম জন্মবার্ষিকীো।
জন্ম-২৬ অক্টোবর ১৮৭৩মৃত্যু-২৭ এপ্রিল ১৯৬২ (বয়স ৮৮)

দুনিয়াটাই চলছে #ডাবল_স্টান্ডার্ড থিউরীতে!!!

কলেজ লাইফে “#মাসুদ_রানা” সিরিজের একটি বই পড়েছিলাম #ডাবল_এজেন্ট নামে । পড়ে ভেবেছিলাম এ ও কি সম্ভব??!! এখন দেখছি দুনিয়াটাই চলছে #ডাবল_স্টান্ডার্ড থিউরীতে!!!

দাঙ্গার সময়ে হিন্দুত্ববাদীরা গুজরাটে পাঁচ শতাধিক মসজিদ ও মুসলিম স্কলারদের দরগা ধ্বংস করেছিলো। এর মধ্যে উর্দু কবি ওয়ালি মহম্মদের দরগা দাঙ্গাকারীরা গুঁড়িয়ে দেয়ার পরে, সেখানে রাতারাতি গুজরাট সরকার রাস্তা বানিয়ে ফেলে যেন সেই দরগা কখনো পুননির্মাণ না করা যায়।
আফগানিস্তানে তালিবানরা বিশ্ব ঐতিহ্যের #বামিয়ানা_বৌদ্ধমন্দির ধ্বংস করার পর সারা দুনিয়ায় তালিবানরা “বর্বর” হিসেবে অভিহিত হয়। কিন্তু মোদীর বিজেপি বিশ্ব ঐতিহ্যের #বাবরী_মসজিদ ধ্বংস করার পর কেউ কি তাকে বর্বর বলে??
বিঃদ্রঃ অথচ তালেবানরা যখন বৌদ্ধমন্দির ভেংঙ্গেছে তখন সেখানে কোন বৌদ্ধের অস্তিত্ব ছিলোনা। তারপরও উগ্রবাদী মিডিয়া,মানবতাবাদীদের জ্বালাপোঁড়া।

গান্ধী নয়, প্রথম ভারত ছাড়ো স্লোগান দিয়েছিলেন ইউসুফ মেহের আলী

ইতিহাস কথা বলে। বিশেষ করে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস, ভারতের স্বাধীনতা দিবসে দেশের ইতিহাস নিয়ে বেশি আলোচনা হয়। কিন্তু জানেন কি বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে ‘ভারত ছাড়ো’ (Quit India) এই স্লোগানটি প্রথম কে দিয়েছেন? এই দুটি শব্দ প্রথম ব্যবহার করেছিলেন কংগ্রেস নেতা ইউসুফ মেহের আলি৷ এই স্লোগান পরবর্তী কালে ইংরেজদের কাপুনী ধরিয়ে দিয়েছিলো।
এটা ঠিক ১৯৪২ সালের ৮ অগস্ট গান্ধাজি মুম্বইয়ের গোয়ালিয়া ট্যাঙ্ক ময়দানে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির বৈঠকে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন৷ সেই আন্দোলনের সময়ই তিনি ডাক দেন ‘‘করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে’’৷ শুধু তাই নয় গান্ধীর গ্রেফতারের পরেও কয়েক মাস ধরে গোটা ভারতরবর্ষ জুড়ে ব্রিটিশ বিরোধী এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে দেখা গিয়েছিল৷ কিন্তু এই ‘ভারত ছাড়ো’ স্লোগানটি ইউসুফ মেহের আলি নামে এক কংগ্রেস নেতার উদ্ভাবন৷
‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন শুরুর বেশ কিছু দিন আগে মুম্বইতে গান্ধীর ঘনিষ্ঠদের নিয়ে কংগ্রসের এক বৈঠকে এই শব্দ দুটি ব্যবহার করেছিলেন মেহেরআলি, তিনি সেই সময় মুম্বাইয়ের মেয়র ছিলেন৷ স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য এই ইউসুফ মেহারালি আটবার জেলে যান৷ গান্ধীর সঙ্গে মেহের আলিও ১৯৪২ সালের ৯ আগষ্ট গ্রেফতার হয়েছিলেন৷ পরে ১৯৪৬ সালে তিনি জেল থেকে ছাড়া পান এবং স্বাধীন ভারতে এমএলও হয়েছিলেন৷ তিনিই কংগ্রেস সোশালিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৫০ সালে মুম্বাইয়ে তাঁর মৃত্যু হয়৷
কে গোপালস্বামীর বই ‘Gandhi and Bombay’তে বর্ণনা করেছেন একেবারে পরাধীন ভারতের শেষ কয়েকটা বছর এই ‘ভারত ছাড়ো’ স্লোগানটি দেশজুড়ে আধিপত্য বিস্তার লাভ করেছিল৷ সেখানে বলা হয়েছে, শান্তিকুমার মোরারজির রেকর্ড অনুসারে গান্ধী তাঁর সহকর্মীদের বলেছিলো স্বাধীনতার জন্য শ্রেষ্ঠ স্লোগান তৈরি করতে৷ প্রথমে একজন করেছিলেন ‘বেরিয়ে যাও’( ‘Get out’) ৷ কিন্তু সেটা গান্ধীর পছন্দ হয়নি৷
রাজাগোপালাচারি বলেছিলেন ‘অপসারণ অথবা প্রত্যাহার’ (Retreat’ or ‘Withdraw)৷ কিন্তু সেটাও গান্ধীর মনোমত হয়নি৷ অবশেষে ইউসুফ মেহের আলি দিয়েছিলেন ‘ভারত ছাড়ো’ সেটা গান্ধী অনুমোদন করে৷
মেহের আলির জীবনীকার মধু দন্ডপত ১৯৪২ সালে আন্দোলন শুরুর আগে ‘ভারত ছাড়ো’ নামে একটি বুকলেট প্রকাশ করেন৷ যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিক্রি হয়েগিয়েছিল৷ তাছাড়া ৭ অগস্ট কংগ্রেস কমিটি বৈঠক শুরুর আগেই এই স্লোগানকে জনপ্রিয় করতে ‘ভারত ছাড়ো’ ব্যাচ ছাপানো হয়েছিল-এ কথা জানিয়েছেন ইউসুফ মেহের আলি সেন্টারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জিসি পারেখ৷ এই জিসি পারেখও ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ১৭ বছর ৷

বাবরী মসজিদ ও মুঘল সম্রাট প্রসঙ্গঃ

বাবরী মসজিদ যেসব সাম্প্রদায়িক হিন্দরা ভেঙেছিল তারাইতো এখন ক্ষমতা মসনদে । সুতরাং রায়টা যে তাদের পক্ষে যাবে তা আগেই ধারণা করেছেছল আমার মত অনেকেই।যেখান বিচার বিভাগ যোগীদের কব্জায় সেখানে এরচেয়ে বেশি কি আশা করা যায়??আমি তেমন কষ্ট পাইনি । কারণ আমার এই রায় গ্রহণ করার মানসিক প্রস্তুতি ছিল । তাছাড়া এটা এমন নয় যে এই মসজিদে নামাজ পড়তেই হবে । আমাদের মসজিদ গোয়ালঘর,কবরস্থান ও হাম্মাম ছাড়া সারা দুনিয়া । বরং প্রয়োজনে মন্দিরেও নামাজ হয়ে যাবে ।আজ আমার সকল ক্ষেদ #মোগল_শাষকদের প্রতি যারা ভারতে মুসলীমদের শিক্ষার উন্নয়ন না করে নারী ও মদ নিয়ে মত্ত ছিল । ভারতবর্ষে মুসলীম শাষকদের মধ্যে সর্বোত্তম ছিলেন #সম্রাট_বাবর এবং সর্ব নিকৃষ্ট ছিলেন #সম্রাট_শাহ_জাহান ।আর শাহজাহানের দাদা #সম্রাট_আকবরতো ছিল #কাট্টা_কাফের । আমরা আশা করেছিলাম তাজমহলটা ভাঙ্গবে । এখনো আশা করছি উগ্র হিন্দুরা #তাজমহল ভেঙ্গে ফেলুক ইনশাল্লাহ। কিন্ত এই আশা কখনোই পূর্ণ হবে বলে মনে হয়না । কারণ ওখান থেকে হাজার হাজার কোটি রুপি আয় হচ্ছে যোগীদের ট্যুরিজম খাত থেকে । সম্রাট শাহ জাহান ছিল মূর্খ,গোয়ার,একরোখা ও বেয়াকুফ । সম্রাট শাহ জাহান তার স্ত্রীর মাজার তৈরী করার জন্য সমগ্র ভারতে দীর্ঘ ২০ বছরের সকল ও টেক্সের টাকা দিয়ে শয়তানী এই মাজার বানিয়েছে যেখানে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল ২২হাজার মুসলীম স্থাপত্য ইঞ্জিনিয়ার ও কারিগরদের যারা ছিল তৎকালীন দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ট।এবং কথিত আছে সম্রাট শহ জাহান শত শত ইঞ্জিনিয়ারকে হত্যা করেছিল এই জন্য যে তারা যেন এমন একটি বিল্ডিং আর বানাতে না পারে ।ঐ সময় এই টাকা দিয়ে সে মুসলীমদের শিক্ষা ও বিজ্ঞানের উন্নয়নের জন্য ২০০ বিশ্ববিদ্যালয় বানাতে পারতো ।অথচ তখন মুসলীমরা নেংটি পড়ে থাকতো । আর এই মুসলীমদের পয়সায় শাহজহান তার স্ত্রী মমতাজের মাজার বানাচ্ছিলো আর তার বড় ছেলে দাড়াশিকো ২০০নারী নিয়ে স্ফুর্তীতে মত্ত ছিলো । উল্লেখ্য যে, শাহ জাহান তার আসল নাম নয় । তার আসল নাম শাহবুদ্দিন মুহাম্মদ। শাহ জাহান একটি কুফরী নাম যার অর্থ #জগতের_বাদশা।জগতের বাদশা একমাত্র আল্লাহ । এই নাম সে নিজেই দিয়েছিল।তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং তার হিন্দু #রাজপুত স্ত্রী তাজ বিবি বিলকিস মাকানি-র সন্তান ছিলেন যিনি সিংহাসন আরোজনের পূর্ব পর্যন্ত শাহাজাদা খুররাম নামে পরিচিত ছিলেন।

মহান উসমানি খিলাফতের সকল সুলতানদের নাম ও শাসনকাল-

১) সুলতান প্রথম উসমান (১২৯৯-১৩২৬)ইং [উসমানি সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা]
২) সুলতান প্রথম ওরহান (১৩২৬-১৩৫৯) [ঐতিহাসিক ‘জেনেসারি’ সৈন্যবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা]
৩) সুলতান প্রথম মুরাদ (১৩৫৯-১৩৮৯)
৪) সুলতান প্রথম বায়েজিদ (১৩৮৯-১৪০৩) [The Thunder/বজ্রকড়ক উপাধি খ্যাত]
৫) সুলতান প্রথম মুহাম্মাদ (১৪০৩-১৪২১) [উসমানি সালতানাতের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা]
৬) সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ (১৪২১-১৪৫১)
৭) সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ (১৪৫১-১৪৮১) [The Conqueror/বিজেতা, রাসূল স:-এর ভবিষ্যত বাণীকে বাস্তবায়নকারী]
৮) সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ (১৪৮১-১৫১২)
৯) সুলতান প্রথম সেলিম (১৫১২-১৫২০) [হেজাজ-মিসর-সিরিয়া বিজয় করে খেলাফতের মহান দায়িত্বভার গ্রহণকারী]
১০) সুলতান সুলাইমান আল-কানুনি (১৫২০-১৫৬৬) [The Magnificent-Great. তাঁর যুগকে বলা হতো উসমানিদের স্বর্ণযুগ, তাঁর প্রতিটা অভিযানকে তিনি জিহাদ বলে উল্লেখ করেছেন]
১১) সুলতান দ্বিতীয় সেলিম (১৫৬৬-১৫৭৪)
১২) সুলতান তৃতীয় মুরাদ (১৫৭৪-১৫৯৫)
১৩) সুলতান তৃতীয় মুহাম্মাদ (১৫৯৫-১৬০৩)
১৪) সুলতান প্রথম আহমাদ (১৬০৩-১৬১৭)
১৫) সুলতান প্রথম মুস্তাফা (১৬১৭-তিনমাস)
১৬) সুলতান দ্বিতীয় উসমান (১৬১৭-১৬২৩)
১৭) সুলতান চতুর্থ মুরাদ (১৬২৪-১৬৪০) [বাগদাদ বিজেতা]
১৮) সুলতান প্রথম ইবরাহীম (১৬৪০-১৬৪৮)
১৯) সুলতান চতুর্থ ইবরাহীম (১৬৪৮-১৬৮৭)
২০) সুলতান দ্বিতীয় সুলাইমান (১৬৮৭-১৬৯১)
২১) সুলতান দ্বিতীয় আহমাদ (১৬৯১-১৬৯৫)
২২) সুলতান দ্বিতীয় মুস্তাফা (১৬৯৫-১৭০৩)
২৩) সুলতান তৃতীয় আহমাদ (১৭০৩-১৭৩০) [লিলি ফুল প্রেমি সুলতান]
২৪) সুলতান প্রথম মাহমুদ (১৭৩০-১৭৫৪)
২৫) সুলতান তৃতীয় উসমান (১৭৫৪-১৭৫৭)
২৬) সুলতান তৃতীয় মুস্তাফা (১৭৫৭-১৭৭৩)
২৭) সুলতান প্রথম আবদুল হামিদ (১৭৭৩-১৭৮৯)
২৮) সুলতান তৃতীয় সেলিম (১৭৮৯-১৮০৭)
২৯) সুলতান চতুর্থ মুস্তাফা (১৮০৭-১৮০৮)
৩০) সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ (১৮০৮-১৮৩৯) [ঐতিহাসিক জেনেসারি সৈন্যবাহিনীর বিলুপ্তকারী]
৩১) সুলতান প্রথম আবদুল মজিদ (১৮৩৯-১৮৬১)
৩২) সুলতান আবদুল আযীয (১৮৬১-১৮৭১)
৩৩) সুলতান পঞ্চম মুরাদ (১৮৭১-১৮৭৬)
৩৪) সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ (১৮৭৬-১৯০৯) [মাজলুম সুলতান]
৩৫) সুলতান পঞ্চম মুহাম্মদ রাশাদ (১৯০৯-১৯১৮)
৩৬) সুলতান ষষ্ঠ মুহাম্মদ (১৯১৮-১৯২২)
৩৭) সুলতান দ্বিতীয় আবদুল মজিদ (১৯২২-১৯২৪) [হতভাগা সুলতান]