তারা সেবা নিয়ে আসে, খৃষ্টান বানিয়ে চলে যায় ।”ডাঃ এড্রিক বেকারের” মূল লক্ষ্য ছিল খৃষ্টীয় মতবাদ প্রচার। স্বাস্থ্য সেবা প্রতীক মাত্র ।ইত্যাদিতে প্রচারকৃত ডাঃ এড্রিক বেকারের টাঙ্গাইল মধুপুর বনে কাইলাকুড়ি স্বাস্থ্য পরিচর্চা কেন্দ্র (ক্রিস্টিয়ান মিশনারি হসপিটাল ) প্রতিবেদন নিয়ে মিডিয়া সরগরম। বাংলাদেশী ডাক্তারদের আবারো ভিলেন বানিয়ে সাদা চামড়ার বিদেশীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হচ্ছে সবাই।যার আড়ালে এই সত্য অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে যে ডাঃ এড্রিক বেকারের প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল ক্রিশ্চিয়ান মিশনারীর মাধ্যমে পরিচালিত হাসপাতাল । যে মিশনারীর মুল লক্ষ্য হল ধর্মান্তরিত করে খৃস্টান বানানো । সেখানে সেবার মাধ্যমে স্থানীয় উপজাতিদের মধ্যে খ্রিস্টান ধর্মের প্রচার লক্ষণীয়।ডাঃ এড্রিক বেকার যে এলাকায় কাজ করত তা ছিল উপজাতি অধ্যুষিত এলাকা। আর মিশনারী চার্চগুলো এসব এলাকাতেই বেশি দেখা যায়। যাদের কাজই হল ধর্মান্তকরন করা।যে হাসপাতাল সে চালাত প্যারামেডিকেল দিয়ে। এমিবিএস ডাক্তারগন স্বেচ্ছায় সেখানে কাজ করতে চেয়েও তার অনুমতি পেতনা।https://tinyurl.com/uc29obuজানি ,অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইবেননা। কিন্তু বাস্তবতা কারো অবিশ্বাসের ধার ধারেনা। সত্য, চিরকাল সত্যই।আপনারা খেয়াল করে দেখবেন খৃস্টান মিশনারীগুলো জনবহুল এলাকায় থাকেনা। থাকে রিমোট এরিয়াতে, শহর থেকে দূরে। বিশেষ করে উপজাতি অধ্যুষিত এলাকা কিংবা দারিদ্রপ্রবন এলাকা। কারন বিভিন্নভাবে সাহায্যের নাম দিয়ে তাদের ক্রিস্টান বানানো সহজ।যার কিছু প্রমান আপনাদের দিচ্ছি-১.১৫৯৯ খৃস্টাব্দে তাদের প্রথম অনুপ্রবেশ ঘটেছিল এ দেশের মাটিতে। সে সময় জেসুইট সম্প্রদায়ভুক্ত পর্তুগীজ খৃস্টাব্দে মিশনারি দের একটি দল যশোর জেলায় আসে।১৬৭৯ খৃ, এর ৪ নভেম্বর গোয়ার অগাস্টিন সম্প্রদায়ের জনৈক সেন্ট(সন্যাসী) তার একটি পত্রে লিখে যে,”যশোরে ২ জন পর্তুগীজ সেন্টের হাতে ৪০০ জন দেশীয় খ্রিষ্টান হয়েছে!!”২. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০ বছরে পাবর্ত্যাঞ্চলে ১২ হাজার উপজাতীয় পরিবার খ্রিস্টান হয়েছে।৩. উত্তরাঞ্চলের ১৫ লাখ উপজাতির মধ্যে ছয় লাখেরও বেশি এরই মধ্যে ধর্মান্তরিত হয়েছে।৪. রোমের ভ্যাটিকান থেকে ১৯৯০ সালের ৯ জুন রাজশাহীকে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ‘ষষ্ঠ ধর্মপ্রদেশ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে এ অঞ্চলে উপজাতিদের ধর্মান্তরের কাজ আরো জোরদার হয়। https://tinyurl.com/twqyru5
এবার আসুন হাসপাতালের আড়ালে তারা কি করে তা জেনে নেই-
১. পার্বতীপুরের ল্যাম্ব হাসপাতালের কথা প্রায় সবাই জানেন। কিন্তু সবাই জানেনা’ হাসপাতালের সেবার আড়ালে সেখানে ধর্মান্তকরনের নীরবে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। রোগীদের কুরআনের আয়াত পড়িয়ে ও বাইবেলের বিভিন্ন কোটেশন পড়িয়ে খ্রিস্টধর্মের দাওয়াত দেয়। এভাবে অনেক মানুষ খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে। বিস্তারিত জানতে পড়ুন- http://archive.is/fzFA4#selection-1513.0-1513.954 , https://www.alkawsar.com/bn/article/1051/
২. দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাসপাতাল ও মাতৃসদন প্রতিষ্ঠা করে কুষ্ঠ রোগ সহ জটিল ব্যাধির চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার চালিয়ে আসছে একটি মাত্র লক্ষ্যকে সামনে রেখে, তা হলো এ দেশে খ্রিষ্ট ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রচার ও প্রসার। এই সব হাসপাতাল হলো মূলতঃ মানুষ ধরার ফাঁদ ও ষড়যন্ত্রের নীল কুঠি।
৩. যশোর জেলায় ফাতেমা হাসপাতাল নামে একটি মিশনারি হাসপাতাল আছে। নাম মুসলমানের হলেও হাসপাতাল কিন্তু খৃস্টান মিশনারীর। https://tinyurl.com/vd5lwvhযে হাসপাতালের ফেজবুক পেজে সুন্দর করে তাদের লক্ষ্য ও উদ্ধেশ্য লেখা আছে এভাবে “ দিনে দিনে বড় হয়ে এখনও এই হাসপাতাল যশোরের বুকে লক্ষ লক্ষ মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে খ্রীষ্টের প্রেম মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিচ্ছে”। http://archive.is/3uAMS#selection-609.182-609.307৪.
চার্চ অব বাংলাদেশ নামে একটি খ্রিষ্টান মৌলবাদী এন,জি, ও সংস্থা ১৯৬৫ সালে কক্সবাজারের মালুমঘাটে খ্রিষ্টান মেমোরিয়াল হাসপাতাল স্থাপন করে। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে অত্র এলাকায় যেখানে এক জন খ্রিষ্টানও ছিলনা সেখানে বর্তমানে দশ হাজার বয়স্ক নাগরিক খ্রিষ্টান হয়েছে এবং তাদের পরিবার সহ এই সংখ্যা বর্তমানে ৪০ হাজারে উন্নীত হয়েছে। (দৈনিক সংগ্রাম, ২৪অক্টোবর, ১৯৯২)।অতএব যারা ডাঃ এড্রিক বেকার কথিত মানবসেবা নিয়ে গদগদ হচ্ছেন তারা বোকার দুনিয়ায় বাস করছে। স্বার্থ ব্যতিত কোন মিশনারী বাংলার যমীনে কাজ করছেনা।ডাঃ এড্রিক বেকার যা করেছে তা তার ধর্মের প্রতি আবেগ, ভালোবাসা আর টান থেকেই করেছে। সে তার খৃস্টীয় মতবাদকে ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে, এই দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসার টানে নয়।এবার বুঝলে বুঝপাতা,না বুঝলে তেজপাতা।শুধু আফসোস এতটুকুই যে ২০০ বছর বৃটিশ গুতা গেয়েও বাংগালীর হুশ হয়নি!!! আজো সাদা চামড়া দেখলেই হুশ হারিয়ে ফেলে!!!
সম্ভবত এ বছরের গোড়ার দিকে একটি আর্টিক্যাল পড়েছিলাম সোহল রানা নামক এক ভদ্রলোক বুক রিভিউ করতে গিয়ে জন পার্কিন্সের লিখা Confessions of an Economic Hit Man (এক অর্থনৈতিক ঘাতকের স্বীকারোক্তি)বই এর সমালোচায় তিনি দরুন কিছু তথ্য তুলে ধরেছিলেন। আমি ওনার পুরো লিখাটা ব্লগে তুলে রেখেছিলাম । আজ আবার মে করিয়ে দেয়াতে Wardpress এ রি-পোষ্ট করলাম ।
তার আগে পাঠক বন্ধুদের জেনে নেয়া দরকার কর্পোরেটোক্রেসি জিনিসটা কি? কর্পোরেটোক্রেসি আসলে পূজিবাদী বা কর্পোরেটদের স্বার্থ। ২০১৭ সালে অক্সফাম বলছে, পৃথিবীর ৩৬০ কোটি লোকের সমান সম্পদ রয়েছে মাত্র শীর্ষ ৮ ধনী ব্যক্তির হাতে। সত্যিই বলতে গরীব লোকদের সম্পদ গুটি কয়েক ধনীদের হাতে তুলে দেয়ার নামই হচ্ছে কর্পোরেটোক্রেসি। কর্পোরেটোক্রেসির অনেক ধাপ আছে। ১৬ থেকে ১৯ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপে যে কালোদের দিয়ে দাসপ্রথা চালু ছিলো- বর্তমান কর্পোরেটোক্রেসি হচ্ছে সেই দাসপ্রথার আধুনিক রূপ। আর একটু সহজ ভাষায় এভাবে বলা যায়, পৃথিবীর প্রায় সকল লোককে ঐ গুটি কয়েক কর্পোরেট মালিকের দাস বানানোর নামই হচ্ছে কর্পোরেটোক্রেসি। জনাব সোহেল রানার লিখাটা এখন পড়ুন তাহলে…….
বুক রিভিউ
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদ কায়েমের করুণ কাহিনী যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে সাম্রাজ্যবাদ কায়েম করেছে সেই করুণ কাহিনী নিয়ে জন পার্কিন্সের বই Confessions of an Economic Hit Man (এক অর্থনৈতিক ঘাতকের স্বীকারোক্তি)। রিভিউ লিখেছেন- সোহেল রানাবইটির বিষয়বস্তু ‘কর্পোরেটোক্রেসি’। লেখক বলতে চেয়েছেন, বর্তমান বিশ্ব সাম্রাজ্যের ভিত্তিই হচ্ছে এই ‘কর্পোরেটোক্রেসি’। কেবল লেখক বলতে চেয়েছেন এই কারনে নয়, এটি এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। কীভাবে? পরাশক্তিগুলো বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল অথচ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রে তার সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ কায়েম করতে ধারাবাহিক কিছু কর্মপ্রক্রিয়া নিয়ে এগোয়। প্রথমত নির্ভর করা হয় অর্থনৈতিক ঘাতকের উপর। এতে ব্যর্থ হলে প্ল্যান-বি। লেখক এই দ্বিতীয় ধাপে শৃগালের (সিআইএ) উপর ভরসা করাকে বুঝিয়েছেন। ১৯৫৩ সালে ইরানের মোসাদ্দেক সরকারকে উৎখাত ও আশির দশকে পানামার ওমর তোরিজের মৃত্যুর পেছনে আছে শৃগাল। প্লান-বি ব্যর্থ হলে প্লান-সি বা চূড়ান্ত পদক্ষেপ। সরাসরি সামরিক আক্রমণ। আমরা প্ল্যান-সি কার্যকর হতে দেখেছি ইরাকের সাদ্দামকে উৎখাত আর পানামার লৌহমানব ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে তুলে নিয়ে এসে ৪০ বছরের কারাদন্ড দেওয়ার ঘটনায়। কর্পোরেটোক্রেসির মত জঘন্যতম পথ কেবল যে যুক্তরাষ্ট্রই অনুসরণ করছে ব্যাপারটা সেরকম নয়। চীন, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জাপান আর রাশিয়াও একইপথে হাঁটছে। এই সময়ে এসে আফ্রো-এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায় চীন যে ধরনের কর্পোরেটোক্রেসি প্র্যাকটিস করছে, তা অন্য যেকোন রাষ্ট্রের তুলনায় ভয়ংকরতম। লেখক জন পার্কিন্স একজন অর্থনীতিবিদ যিনি কাজ করেছেন মেইন নামের একটি কনসালটিং ফার্মে। তার কাজ ছিল অর্থনৈতিক প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা। এই ধরনের কোম্পানিগুলো কাজ করে থাকে মূলত সেই সব দেশে যেখানে রয়েছে বিপুল খনিজ সম্পদ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোন স্থাপনা। তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোই তাদের মূল টার্গেট। জন পার্কিন্স টার্গেট দেশগুলোর নেতাদের কাছে বড় বড় প্রজেক্ট নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরতেন। বোঝাতে চাইতেন অমুক প্রকল্প হাতে নেওয়া হলে জিডিপি হবে ১৭/১৮%। পার্কিংন্সের এই মূল্যায়ণ ছিল অতিরিক্ত। বাস্তবে যা ৫,৬, বা ৭ র্পাসেন্ট। এ কারনে গোপনে তাদের বলা হতো অর্থনৈতিক ঘাতক যাদের কাজই ছিল উন্নয়নের মূলা দেখিয়ে ভিনদেশের অর্থ কৌশলে হাতিয়ে নেওয়া। কোম্পানি থেকে নির্দেশনা ছিল প্রকল্পের সম্ভাব্য ফলাফল বাড়িয়ে দেখাতে হবে যাতে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র বিপুল ঋণ গ্রহণে উদ্ধুদ্ধ হয়। তারপর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেতো মেইনের মত মার্কিন বহুজাতিক বাণিজ্য সংস্থাগুলো। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ করা অর্থ ফিরে যেতো যুক্তরাষ্ট্রেই, অন্যদিকে ঋণগ্রহণকারী দেশগুলো ঋণের ভারে জর্জরিত হতো বা হচ্ছে। এর বাইরেও টার্গেট রাষ্ট্র থেকে বিপুল অর্থ পাচার হতো যুক্তরাষ্ট্রে যেমনটা এখন সৌদি আরব থেকে হচ্ছে। কিন্তু ঋণ যারা পরিশোধ করতে পারতনা বা পারছেনা তাদের পরিণতি কী? লেখক বলছেন- “ঋণের অর্থ হাতে না পেলেও ঋণগ্রহীতা দেশকে সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হয়। যখন একজন অর্থনৈতিক ঘাতক পুরোপুরিভাবে সফল হন তখন ঋণের অংক বিশাল আকার ধারণ করে। তখন কয়েক বছরের মধ্যেই ঋণগ্রহীতা দেশটি ঋণখেলাপীতে পরিণত হতে বাধ্য হয়। যখনই এই ঘটনা ঘটে তখনই আমরা মাফিয়ার মত ঋণখেলাপী দেশটির টুঁটি চেপে ধরে আমাদের স্বার্থ হাসিল করি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘে আমাদের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট প্রদান, ঋণখেলাপী দেশে আমাদের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন, আমাদের বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর হাতে ঋণখেলাপী দেশের প্রাকৃতিক সম্পদকে তুলে দেওয়া অথবা ঋণখেলাপী দেশের উপর দিয়ে অবাধে আমাদের যাতায়াতের অধিকার অর্জন করা। তারপরেও ঋণখেলাপী দেশটি আমাদের কাছে ঋণীই থাকে। সেই সাথে আমাদের বিশ্ব সাম্রাজ্যে আরেকটি দেশ সংযুক্ত হয়। ” যুক্তরাষ্ট্র কর্পোরেটোক্রেসিতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সফলতা দেখিয়েছে সৌদি আরবে। এর শুরু ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর। সে সময় ইসরায়েলকে সহায়তার দায়ে পশ্চিমের বিরুদ্ধে তেল অবরোধ দিয়েছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন সাতটি আরব-অনারব দেশ। এই অবরোধ যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য করেছিল শাটল কূটনীতির মাধ্যমে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে। তখন থেকেই তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরবের প্রতি দুর্বলতা বাড়ে যুক্তরাষ্ট্রের। কারন তেল অবরোধে ব্যারেল প্রতি কয়েকগুণ দাম বাড়ায় প্রচুর পেট্রোডলার জমেছিল সৌদি কোষাগারে। কর্পোরেটোক্রেসির নেতাগণ কীভাবে সেই অর্থ আমেরিকায় নিয়ে আসা যায় তাঁর পরিকল্পনা করতে থাকে। সৌদি ভবিষ্যতে তেল অবরোধ দেবেনা-এমন নিশ্চয়তা চাইল যুক্তরাষ্ট্র, বিনিময়ে রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া হলো বাদশাহ ফয়সালকে। এই সহযোগিতা সউদ পরিবারের শাসন দীর্ঘায়িত করবে- এই ভেবে মেনে নেওয়া হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব। এরপর যা হলো- সৌদিতে মার্কিন কোম্পানিগুলো এলো,বিশাল বিশাল উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হলো। সৌদি অবকাঠামো উন্নত হলো, সেই সাথে পেট্রোডলার পাচার হতে থাকলো আমেরিকায়! কিন্তু সৌদি মডেল কাজ করেনি ইরাকে। সাদ্দাম রাজি হননি। এর প্রতিশোধ প্রথম দফায় ১৯৯১ সালে এবং সবশেষ ২০০৩ সালে সাদ্দামকে উৎখাত করে নেওয়া হয়। লেখক বইটিতে উল্লেখ করেছেন- “যদি সাদ্দাম হোসেন সউদ পরিবারের মত একই ভূমিকা পালন করতে রাজি হতেন তাহলে ইরাকে তার শাসন দীর্ঘায়িত হতো। তখন তিনি তার পছন্দসই মিসাইল ও গণবিধ্বংসী অস্ত্রগুলোকে নির্মাণ করতে পারতেন। তার বিশ্বস্ত আনুগত্যের পুরস্কার স্বরূপ যুক্তরাষ্ট্র তাকে এসব মারণাস্ত্র তৈরির কারখানা উপহার দিতো। এমন কি মার্কিন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা এসব কারখানাকে উন্নয়ন করার ও সচল করে রাখার দায়িত্ব পেতো। সেই সাথে ইরাককে একটি আধুনিক দেশরূপে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হতো। অবশ্য সবই হতো ইরাকের পেট্রো ডলারের বিনিময়ে। এক কথায় সৌদি আরবের মতো ইরাকও হতো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁস। “ মেইনে কাজ করার সুবাদে লেখককে পানামা, ইকুয়েডরসহ বিভিন্ন দেশ সফর করতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ্য হওয়া বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের পরিণতি ফুটে এসেছে তার বর্ণনায়। ইন্দোনেশিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর, পেরু, চিলি, আফগানিস্তান, ইরাক, ইরানসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার নানা চেষ্টার তথ্য আছে বইটিতে। জানা যাবে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ না হয়েও পানামা কেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভের আগুনে পুড়েছিল? মূল বইটি পড়ার সুযোগ হয়নি। অনুবাদ পড়েছি দেবাশিস চক্রবর্তীর। অনুবাদ তুলনামূলক ভালই হয়েছে। অন্যের অর্থনীতি ধ্বংস করে নিজেদের অর্থনীতি শক্তিশালী করার এই ঘৃণ্য আয়োজনে যুক্ত থাকায় লেখক একটা সময় পর অনুতপ্ত হয়েছিলেন। সেই অনুতাপ থেকেই তার মেয়ের পরামর্শে বইটি লেখা। শেষ করবো এক সন্ধ্যায় ওয়াল স্ট্রীটে এক আফগান ভিখারীর সাথে লেখকের কথোপকথন দিয়ে—সে(আফগান) প্রশ্ন করলো, ‘আপনি কি সৈনিক ছিলেন?’ আমি হাসলাম। ‘না, আমি একজন অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা।’ তাকে পরিসংখ্যান বোঝাই কাগজটি দেখিয়ে বললাম, ‘এগুলো আমার অস্ত্র’। সে কাগজটিতে চোখ বুলিয়ে হেসে ফেলল, ‘আমি পড়তে পারিনা’। আমি বললাম, “প্রতিদিন ক্ষুধার কারণে ২৪ হাজার লোক মৃত্যুবরণ করে- এই কথাটিই এই কাগজে লেখা রয়েছে। ” সে হাল্কা সুরে শীষ দিলো। এরপর কতক্ষণ চিন্তা করে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, “আমার পরিণতিও হয়তোবা তাই হতো। কান্দাহারের কাছের একটি গ্রামে আমার একটি ডালিমের খামার ছিল। রাশিয়ানরা এলো। মুজাহেদিনরা গাছের আড়ালে ও পানির নালায় লুকালো। তুমুল গেরিলা যুদ্ধ ঘটল। আমার খামার একেবারে ধ্বংস হয়ে গেলো।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এরপর আপনি কাজ কী করতেন?’ সে আমার হাতের কাগজটির দিকে তাকিয়ে পাল্ট প্রশ্ন করলো, “ওটাতে কি ভিক্ষুকদের কথা লেখা রয়েছে? আমি ওদের একজন ছিলাম। ”এরপর সে কতক্ষণ চিন্তায় ডুবে রইল। তারপর বলল, “আমার সন্তান দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলো। আমি পপির চাষ শুরু করলাম।” আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, ‘আফিম’? সে কাঁধ ঝাঁকালো- “কোন গাছ নেই। পানি নেই এক ফোঁটা।
#নামাজে_হাত_বাঁধার বিষয়ে ইমাম তিরমীজি রহঃ বলেন রাসুল, সাঃ এর সহাবীগণ, তাবেয়ীগণ এবং পরবর্তী সকল আহলে ইলমদের কর্মধারা অর্থাৎ অব্যাহত আমল এই যে, তারা নামাজে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখাকে নামাজের একটি নিয়ম মনে করতেন । তাদের কেউ কেউ নাভীর উপরে এবং কেউ কেউ নাভীর নিচে হাত রাখাকে উত্তম মনে করতেন এবং উভয় পদ্ধতিই তাদের নিকট বৈধ ছিল ।
জামে তিরমিজি ২/৩৩ । হাদীস নং ২ত২ এর তাফসীর । শয়তানের কাজ হলো মানুষকে ফরজ ইবাদত থেকে ফিরিয়ে এনে নফল আর মুস্তাহাব ইবাদতে মশগুল করে দেয়া । যেমন চরমোই জিকির , কওমী খারেজীদর কোরআন খতম , তাবলীগীদের চিল্লা কাশি,আহলে হাদীসীদের আমিন বলা,বুকে হাত বাঁধা,ফাঁক করে দাড়ানো ইত্যাদি নানান ইখতেলাফি বিষয় নিয়ে অহেতুক বাড়াবাড়ি করা ।অথচ পরিবার ও সমাজে নিয়মিত শত শত ফরজ ভঙ্গ হচ্ছে ।সমাজে হিজাব নাই ,হালাল ব্যবসা নাই,দুর্নীতিমুক্ত কোন খাত নাই , মিথ্যামুক্ত নেতা নাই, ভেজালমুক্ত খাদ্য নাই ।অথচ সম্মিলনের ওয়াজে চোখে ঘুম নাই, মসজিদের কোন কমতি নাই, নামাজির বালাই নাই, হাজি সাহেবদের অভাব নাই ।
#তাতছে_বিশ্ব_গলছে_বরফ! #এভারেস্টের হিমবাহ সরতেই উন্মুক্ত বহু অভিযাত্রীর দেহ!১৯৯২ সাল আজ পর্যন্ত থেকে ৪৮০০ অভিযাত্রী গিয়েছে এভারেষ্ট এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে । সরকারী হিসাব মতে এ পর্যন্ত তিন শতাধিক অভিযাত্রী ফ্রস্ট বাইটে {Frost bite–শীত দংশন বা তুষারস্পর্শে দেহের অসাড়তা) আক্রান্ত হয়ে হিমালয়ের বরফের রাজ্যে চাপা পড়ে আছে । কেউ কেউ ৫০ বছর ধরে মরে পড়ে আছে সেখানে ।নেপাল প্রশাসন সূত্রের খবর, এই বছর অসংখ্য নিখোঁজ অভিযাত্রীর দেহ উন্মুক্ত হয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ চুড়ো এভারেস্টের যাত্রাপথে। সৌজন্য, বিশ্ব উষ্ণায়ন।সরকারি তথ্য বলছে, সেই ১৯২২ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত শতাধিক অভিযাত্রীর দেহ থেকে গিয়েছে এভারেস্টের বুকে। কালের হিসেবে তারা চাপা পড়ে গিয়েছে বরফে, হারিয়ে গিয়েছে হিমবাহের অতলে। কিন্তু বিশ্ব জুড়ে উষ্ণতা এত অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে, যে গলে যাচ্ছে এভারেস্টের অনেক বরফ। আর বরফ সরতেই বেরিয়ে আসছে সেই আরোহীদের চাপা পড়া দেহ! অবিকৃত! তুষারের দেশে যে সবই অবিনশ্বর! নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি আং শেরিং শেরপা বলেন, “২০০৮ সালে এক বার এমন হয়েছিল। ১৯৭০ সালে চাপা পড়া সাত জন ব্রিটিশ অভিযাত্রীর দেহ একসঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল। সেগুলো নামানো হয়। কিন্তু তার পর থেকে আর কখনও এত দেহ দেখা যায়নি। এই বছর অস্বাভাবিক রকম গলেছে বরফ। এটা সারা পৃথিবীর জন্য খুবই খারাপ বার্তা। আমরা উদ্বিগ্ন।”বস্তুত, মেরুপ্রদেশ থেকে শুরু করে হিমালয়– বরফ সর্বত্রই গলতে শুরু করেছে কয়েক বছর ধরেই। এর নানা কুফল প্রায়ই সামনে আসে। কিন্তু এ নিয়ে বিশ্ব জুড়ে যতটা প্রচার ও সচেতনতা গৃহীত হওয়া উচিত, তার প্রায় কিছুই হয় না। সেই কারণেই বছর-বছর গলতে গলতে, এই বার যেন মাত্রা ছাড়িয়েছে এভারেস্ট।এভারেস্টে ওঠার পথে অন্যতম বিপজ্জনক জায়গা হল খুম্বু আইসফল। একশো বছর ধরে এই আইনফলেই মারা গিয়েছেন বহু পর্বতারোহী। ২০১৪ সালে এখানে বড় তুষারধস নামায় মারা যান ১৩ জন অভিজ্ঞ শেরপাও। সেই খুম্বুতেই বরফ গলে বেরিয়ে আসছে সব থেকে বেশি মৃতদেহ— গত কয়েক বছরে এমনটাই অভিজ্ঞতা পর্বতারোহীদের।নেপালের পর্বত আরোহণ আয়োজক সংস্থাগুলির তরফে জানানো হয়েছে, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক হলেও, অত উচ্চতা থেকে দেহ নামিয়ে আনা খুবই পরিশ্রমসাধ্য ও খরচসাপেক্ষ। তার উপর অনেক সময়েই দেহের মালিকানা নিতে চান না কেউ। তখন তার দায় সংস্থাকে নিতে হয়, সৎকারের ব্যবস্থা করতে হয়। সে কারণ বেশির ভাগ দেহই শ্রদ্ধা জানিয়ে পাহাড়ের কোলেই ফেলে আসা হয় বলে জানালেন অভিজ্ঞ শেরপারা। ১৯৫৩ সালে প্রথম এডমন্ড হিলারি এবং শেরপা তেনজিং নোরগে এভারেস্টের চুড়ো স্পর্শ করেন। তথ্য বলছে, তার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার পর্বতারোহী নিরাপদে এভারেস্ট সামিট করে ফিরে এসেছেন। কিন্তু অনেকেই আবার পারেননি ফিরতে। পাশাপাশি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এভারেস্টের ফিচারও পাল্টে গেছে। ২০১৫ সালের ভূমিকম্প যেমন নষ্ট করে দেয় সামিটের নীচের ‘হিলারি স্টেপ’ নামের একটি জায়গা। ওই একই বছরের এক গবেষণায় দেখা যায় হিমালয়ের বরফ প্রবল গতিতে গলতে শুরু করেছে। আগামী ১০০ বছরের মাথায় ৭০-৯৯ শতাংশ হিমবাহ গলে যাবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।কিন্তু ভবিষ্যতের কথা তো পরে, অতীতের প্রায় একশো বছর ধরে হিমালয়ের তুষারেরাজ্যে সমাহিত পর্বতারোহীদের মৃতদেহ বেরিয়ে আসায় সমস্যায় পড়েছেন নেপালের পর্বতারোহী সংস্থাগুলো। তথ্য বলছে, এভারেস্ট অভিযানে এ পর্যন্ত মৃত ৩০০ জনের মধ্যে বেশির ভাগেরই দেহ বরফের তলায় চাপা পড়ে যাওয়ার তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি এত দিন। কিন্তু উষ্ণায়ণ বদলে দিয়েছে এই চিত্র। গত কয়েক বছর ধরে সারা পৃথিবীর সঙ্গে বাড়ছে হিমালয়ের তাপমাত্রাও। গলছে এভারেস্টের বিভিন্ন হিমবাহ। তার ফলেই এত দিন ধরে বরফে চাপা পড়ে থাকা পর্বতারোহীদের মৃতদেহ বেরিয়ে আসছে অনেক বেশি সংখ্যায়।নেপাল ন্যাশনাল মাউন্টেন গাইড অ্যাসোসিয়শনের তরফে সবিত কুঁয়ার জানিয়েছেন, ‘‘বিষয়টি খুবই চিন্তার। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে আমাদের। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আমরা মৃতদেহ নামিয়ে আনছি। কখনও আবার শুধুই প্রার্থনা করে পাথর আর বরফ দিয়ে মৃতদেহগুলি চাপা দিয়ে দিচ্ছি।’’এ বিষয়ে আং শেরিং বলছেন, ‘‘কিছু দিন আগেই একটি মৃতদেহ বেরিয়ে এসেছিল পর্বতশৃঙ্গের প্রায় কাছে, আট হাজার ৭০০ মিটার উচ্চতায়। মৃতদেহটি ঠান্ডায় তো জমাট বেঁধে গিয়েছিলই সেই সঙ্গে তার ওজন হয়ে গিয়েছিল প্রায় ১৫০ কেজি। ওই দুর্গম জায়গা থেকে মৃতদেহটি নীচে নামিয়ে আনতে বেশ কষ্টই হয়েছিল আমাদের। সব সময় তা সম্ভব হয় না।’’
ইফা ডিজি শামীম মো. আফজাল হলো জিন্সের প্যান্টের মতো।
জিন্সের প্যান্ট ধোয়ার পর একবার চিপা দিলে মনে হয় সব পানি বের হয়ে গেছে।
কিন্তু না। আবার কড়া করে চিপা দিলে আরো কিছু পানি বের হয়। কিছুক্ষণ পর
দুইজন দুইদিকে ধরে আরো কড়া চিপা দিলে আরো পানি বের হয়। মৌলানা সাহেব
চোরামিকর্মে ধরা খেয়ে বত্রিশ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছেন। দ্বিতীয় চিপা দেয়ার
পর আরো ৪২ কোটি টাকা ফেরত দিলেন। কোন সন্দেহ নাই এবার আরেকটা ডলা দিলে উনার
পাঞ্জাবীর ভেতরের বুকপকেট থেকে আরো কয়েক কোটি টাকা বের হবে। বঙ্গবন্দুর
আদর্শের একজন খাঁটি সৈনিক।
গত ১০ বছরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ১৩৪টি খাতে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার অনিয়ম
হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) সামীম মোহাম্মদ আফজালের
মেয়াদকালে (প্রায় ১০ বছর) এসব অনিয়মের ঘটনা ঘটে বলে সিভিল অডিট অধিদপ্তরের
বিশেষ নিরীক্ষা দলের প্রাথমিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের
বরাত দিয়ে এমন খবর জানিয়েছে যুগান্তর।
খবরে জানানো হয়, ৯০০ কোটি টাকার মধ্যে সরকারের সরাসরি ক্ষতি হয়েছে ৩৭২
কোটি ৬৯ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৭ টাকা। এছাড়াও বিধিবহির্ভূতভাবে ৫১৮ কোটি ৬০ লাখ
৬৯ হাজার ৭৯৮ টাকা খরচ করা হয়েছে। চলতি বছরের ৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত
চালানো অনুসন্ধানে এমন তথ্য পায় সিভিল অডিট অধিদপ্তরের বিশেষ নিরীক্ষা
দল।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) সামীম মোহাম্মদ
আফজালের মেয়াদকালে (প্রায় ১০ বছর) এসব অনিয়মের ঘটনা ঘটে। ইফার কাছে এসব
অনিয়ম সম্পর্কে জানতে চেয়েছে নিরীক্ষা দল।
সূত্র জানায়, গত ১০ বছরে বিধিবহির্ভূত নিয়োগ ও পদোন্নতি, প্রকল্পের
অব্যয়িত অর্থ ফেরত না দিয়ে বিদ্যমান আইন লঙ্ঘন, কেনাকাটায় অনিয়ম, অনুমোদন
ছাড়া পেনশন ফান্ডে টাকা স্থানান্তরসহ ইফার বিভিন্ন কার্যক্রমে নানা
অপকর্মের অভিযোগ ওঠে। এসব নানা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার প্রেক্ষিতে ইফার
যাবতীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করতে চলতি বছরের ৮ জুলাই পাঁচ সদস্যের
একটি বিশেষ নিরীক্ষা দল গঠন করে সিভিল অডিট অধিদপ্তর।
আরো জানা গেছে, বিশেষ অডিট টিমের অনুসন্ধানে ইফার বিভিন্ন অনিয়ম ও
দুর্নীতির তথ্য-উপাত্ত উঠে এসেছে- এমন বিষয়টি আঁচ করতে পেরে সম্প্রতি
তড়িঘড়ি করে কয়েক দফায় মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা প্রকল্পের অব্যয়িত ৭৪ কোটি
টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ফারুক আহম্মেদ জানান, তিনি
দু-তিন মাস হল প্রকল্পে যোগ দিয়েছেন। আগের কর্মকর্তারা কী কারণে অব্যয়িত
অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেননি তা বোধগম্য নয়। তবে তিনি এ ব্যাপারে
সচেতন। নিয়ম মেনে আরো টাকা জমা দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
২০০৯ সাল থেকে ইফার ডিজির দায়িত্ব পালন করে আসছেন বিচার বিভাগের
কর্মকর্তা সামীম মোহাম্মদ আফজাল। এ সময়ে দুই দফায় তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ
দেয়া হয়। উল্লিখিত অনিয়মের বিষয়ে মন্তব্য নিতে মঙ্গলবার ও বুধবার ইফার
ডিজির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। এর মধ্যে মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টা
থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত ইফার প্রধান কার্যালয়ে সশরীরে উপস্থিত থেকেও
তাকে পাওয়া যায়নি। তার দপ্তর থেকে বলা হয়, ‘তিনি (ডিজি) খুব সকালে
এসেছিলেন। কখন আসবেন তা জানা নেই।’
এরপর একই দিন সন্ধ্যায় সামীম মোহাম্মদ আফজালের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল
দেয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এমনকি একই নম্বরে প্রতিবেদকের পরিচয় উল্লেখ
করে কথা বলতে চেয়ে এসএমএস পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া গতকাল ৬ নভেম্বর, বুধবার বিকালে তার মোবাইল ফোনে ফের একাধিকবার
কল করা হলেও তিনি ধরেননি। এরপর সন্ধ্যায় একই নম্বরে আগের দিনের মতো
প্রতিবেদকের পরিচয় দিয়ে বিশেষ নিরীক্ষার ব্যাপারে মন্তব্য চেয়ে এসএমএস করা
হয়। রাতে এ প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত তিনি এসএমএসের জবাব দেননি।
তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর থেকে
সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলছেন ইফার ডিজি। এ ব্যাপারে ডিজির নিকটাত্মীয় বলে
পরিচিত এবং তার (ডিজি) দপ্তরের কর্মচারী মুনিম সিকদার বুধবার বিকাল ৫টার
দিকে টেলিফোনে বলেন, ‘উনি কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেন না।’
তবে ইফার আয়-ব্যয়ের ওপর পরিচালিত সরকারের বিশেষ নিরীক্ষার ব্যাপারে ইফার
সচিব কাজী নুরুল ইসলাম মঙ্গলবার বলেন, ‘অডিট অধিদপ্তরের ৫ সদস্যের একটি
বিশেষ টিম গত ১০ বছরের নিয়োগসহ নানা অনিয়ম ও আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুসন্ধান
করছে। তারা ইতিমধ্যে ১৩৪টি ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয় চিহ্নিত করে
সেই বিষয়ে ইফার জবাব চেয়েছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে প্রায় হাজার কোটি টাকা অনিয়মের কথা বলা
হয়েছে। আমাদের জবাব পাওয়ার পর তারা প্রতিবেদন চূড়ান্ত করবেন। সেখানে এই
অনিয়ম ও দুর্নীতির অঙ্ক কমবেশি হতে পারে। আমরা এসব বিষয়ে কাজ করছি।’
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের
অনুসন্ধানে সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের তালিকায় রয়েছে ইফার ডিজি সামীম
মোহাম্মদ আফজালের নাম। প্রাথমিক তদন্তেতার নামে-বেনামে অঢেল সম্পদের তথ্য
পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
এরপর তার ব্যাংক হিসাব তলব করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সামীম মোহাম্মদ আফজাল,
পিতা : মৃত আবদুর রশিদ, মাতা : মৃত আমেনা খাতুন, জাতীয় পরিচয়পত্র নং :
১৯৫৭২৬৯৫০৪২৭৮ ৪৫৩১, জন্মতারিখ ৩১/১২/১৯৫৭, পাসপোর্ট নং : বিজি ০০০৯৭৬০-এর
ব্যাংক হিসাব এবং অ্যাকাউন্ট খোলার তারিখ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত
বিস্তারিত বিবরণ চেয়ে সব কটি তফসিলি ব্যাংক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চিঠি
পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
সাবেক বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা সামীম মোহাম্মদ আফজাল ১১ বছর ধরে ইসলামিক
ফাউন্ডেশন মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত। গত জুনে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে
ধর্ম মন্ত্রণালয় ডিজিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলে তার অনিয়মের বিষয়টি
আলোচনায় আসে।
ওই শোকজ নোটিশে অনিয়মের অভিযোগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তার চুক্তিভিত্তিক
নিয়োগ বাতিলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়। পরে অবশ্য ইফা বোর্ড
কিছুটা নমনীয় হয় এবং ডিজির কিছু ক্ষমতা কমিয়ে তার চুক্তির মেয়াদ পর্যন্ত
দায়িত্বে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
মহা হিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয় সূত্র জানায়, ইফা ডিজির অনিয়মের বিষয়
সামনে আসার পরই গত জুলাই মাসে বিশেষ নিরীক্ষা কার্যক্রমে হাত দেয়া হয়।
অডিট অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এসএম নিয়ামুল পারভেজের নেতৃত্বে এই টিমের
অন্য সদস্যরা হলেন : অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্স অফিসার মো. রফিকুল ইসলাম, মো.
শফিকুল ইসলাম, অডিটর মো. মফিজুল ইসলাম ও মো. ইমাম হোসেন।
এই অডিট টিম এক মাসের নিরীক্ষায় ইফার বিভিন্ন প্রকল্পসহ ব্যয়ের অনেক
খাতেই অনিয়ম ধরা পড়ে। ১৮৬ পৃষ্ঠার প্রাথমিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ১৩৪টি খাতে
অনিয়মের চিত্র এসেছে।
অনিয়ম পাওয়া গেছে যেসব খাতে : বিশেষ নিরীক্ষা
প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এমন খাতগুলোর মধ্যে
উল্লেখ্যযোগ্য হল : আর্থিক বছরের শেষদিনে প্রকল্পের অব্যয়িত অর্থ
স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে ৬৪ জেলায় অর্থ ছাড় করা হয় ৩১ কোটি ৯৯ লাখ ১৫ হাজার
২২০ টাকা; যা অনিয়ম। আর্থিক বছর শেষে প্রকল্পের অব্যয়িত অর্থ সরকারি
কোষাগারে না দেয়ায় ক্ষতি ১৭ কোটি ৯৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৭৩ টাকা।
গণশিক্ষা কেন্দ্রের জন্য পাঠ্যবই মুদ্রণে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ২০ কোটি ৯৮
লাখ ১৬ হাজার ৪৮৭ টাকা এবং কোরআনুল কারিম মুদ্রণে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে
অতিরিক্ত মূল্যে কার্যাদেশ দেয়ায় ১২ কোটি ৩৫ লাখ ৮১ হাজার ৪১৭ টাকা ক্ষতি
হয়েছে। কার্যাদেশের পরিমাণের চেয়ে কম কোরআন শরিফ নেয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি
৩২ লাখ ৮২ হাজার ৬০০ টাকা। বোগদাদিয়া কায়দায় ক্ষতি এক কোটি টাকা। জিওবির
বরাদ্দের অব্যয়িত টাকা জমা না দেয়ায় ২২ কোটি ৯ লাখ ২৭ হাজার ৫০৯ টাকা ও
সিপিটিইউর ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন ছাড়াই বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানকে ১৬ কোটি ৩০ লাখ
১০০ টাকা দেয়া হয়।
এছাড়া অব্যয়িত পুঞ্জীভূত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দেয়ায় ক্ষতি ৯৯
কোটি এক লাখ ৬ হাজার ৭৪৪ টাকা। প্রকল্পের অব্যয়িত টাকা ইফার স্থায়ী ফান্ডে
আমানত করায় সরকারের ক্ষতি ৪৬ কোটি ৩৩ লাখ ৭ হাজার ৫৬৩ টাকা, বিধিবহির্ভূত
৪৭ জনকে প্রথম শ্রেণির পদে নিয়োগ দেয়ায় ক্ষতি ১৩ কোটি ১৭ লাখ ৯৯ হাজার ৩৬০
টাকা। একইভাবে আরো ১৬৭ জন কর্মচারী নিয়োগ দেয়ায় ক্ষতি প্রায় ৮ কোটি টাকা।
দৈনিকভিত্তিক কর্মচারীদের রাজস্ব পদে স্কেলভিত্তিক নিয়োগ দেয়ায় ৩ কোটি
৮৩ লাখ ৫০ হাজার ৯৯৮ টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং দারুল আরকাম মাদ্রাসার শিক্ষক
নিয়োগ না দিয়ে বরাদ্দের টাকা রেখে দেয়ায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি
টাকা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন খাতে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৫১৮
কোটি টাকা তছরুপ করা হয়েছে। এসব খাতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- বাজেট
বরাদ্দের অতিরিক্ত ১৩৭ কোটি ৬৬ লাখ ২০ হাজার ৮৫৭ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই ইফার পেনশন ফান্ডে ১৪১ কোটি ২৭ লাখ ৭৮ হাজার ৩৮
টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। অন্য একটি খাতে স্থানান্তর করা হয়েছে প্রায়
আড়াই কোটি টাকা।
ডিপিপিতে বরাদ্দের চেয়ে জেলা অফিসগুলোতে অতিরিক্ত অর্থ ছাড় করা হয়েছে ১৪
কোটি ৯৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ডিপিপির অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা হয়েছে ২৬ কোটি
১৪ লাখ ৫ হাজার টাকা। আর্থিক ক্ষমতার অতিরিক্ত প্রেসের কাঁচামাল কেনা
হয়েছে ৪৫ কোটি ১৩ লাখ ৭৭ হাজার ১৮৬ টাকা, বিধি লঙ্ঘন করে দৈনিকভিত্তিক
কর্মচারীদের বেতন দেয়া হয়েছে দেড় কোটি টাকা।
ইফার নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস থাকার পরও বাইরের প্রেস থেকে প্রয়োজনীয়
পুস্তকাদি ছাপানোয় ৩৬ কোটি ৫৬ লাখ ৯১ হাজার ৬৮৬ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচারণার অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়নি এক
কোটি ৩৭ লাখ টাকা। সিডি ভ্যাটের অব্যয়িত দেড় কোটি টাকাও জমা দেয়া হয়নি।
বায়তুল মোকাররমের দোকান ভাড়ার ২ কোটি ৬১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা অনাদায়ী রয়েছে।
অনুমোদন ছাড়া ৩ কর্মকর্তাকে নিয়োগ ও পদোন্নতি দেয়ায় পরিশোধ করতে হয়েছে
এক কোটি ৮৪ লাখ টাকা। বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন খাতে
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা।
অগ্রিম পরিশোধ করা প্রায় দেড় কোটি টাকা সমন্বয় করা হয়নি। এ ছাড়া
ক্রয়সীমার বাইরে খরচ করা হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা। প্রাধিকারবহির্ভূত
একটি ব্যাংকে রাখা হয়েছে ২৯ কোটি ৪৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৯৯ টাকা।
বিধিবহির্ভূতভাবে একটি প্রকল্পের ফিল্ড সুপারভাইজারদের বেতন-ভাতাদি দেয়া
হয়েছে সাড়ে ১১ কোটি টাকা। আর অনুশীলন ও ড্রয়িং খাতা মুদ্রণ বাবদ অব্যয়িত
প্রায় ৬ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়নি।
চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট Xi Jing Ping এর ভাষ্যে; “আমার বাবার দেওয়া তিনটে উপদেশ আমাকে আজ এখানে পৌঁছে দিয়েছে।
ছোটবেলায় আমি খুব স্বার্থপর ছিলাম। সবকিছুতেই নিজের সুবিধে আর লাভটা বুঝে নেবার চেষ্টা করতাম। আমার এই দোষের জন্য আস্তে আস্তে আমার বন্ধুর সংখ্যা কমতে শুরু করল। শেষে অবস্থা এমন হোলো যে আমার আর কোনো বন্ধুই অবশিষ্ট রইল না। কিন্তু, সেই অপরিনত বয়েসে আমি এর জন্য নিজেকে দায়ী না করে সিদ্ধান্ত নিলাম আমার বন্ধুরা আসলে হিংসুটে। ওরা আমার ভাল দেখতে পারে না। আমার বাবা সবই লক্ষ করতেন, মুখে কিছু না বললেও। একদিন রাতে বাড়ি ফিরে দেখি, বাবা আমার জন্য খাবার টেবিলে অপেক্ষা করছেন। টেবিলে রাখা আছে রান্না করা ন্যুডলের দুটি ডিশ। একটা ডিশে সেদ্ধ ন্যুডলের ওপর রাখা একটি খোসা ছাড়ানো সেদ্ধ ডিম। অন্য ডিশটিতে শুধু ন্যুডলসের যে কোনো একটি ডিশ বেছে নিতে বললেন বাবা। স্বাভাবিক ভাবেই আমি ডিম সমেত ডিশটাই উঠিয়ে নিলাম। সেই সব দিনে চীনে ডিম ছিল এক দুস্প্রাপ্য জিনিস। উৎসবের দিন ছাড়া কারো বাড়িতে ডিম খাবার কথা তখন ভাবা যেত না। খাওয়া শুরু করবার পর দেখা গেল বাবার ডিশে ন্যুডলসের তলায় আসলে লুকিয়ে রাখা আছে দুটো ডিম। আমার এত দুঃখ লাগছিল তখন। কেন যে তাড়াহুড়ো করে বাছতে গেলাম। বাবা আমাকে দেখছিলেন। খাবার পর মৃদু হেসে বললেন, “মনে রেখো, তোমার চোখ যা দেখে, সেটা সব সময় সত্যি নাও হতে পারে। শুধু চোখে দেখে যদি মানুষ বা কোনো পরিস্থিতিকে বিচার করে সিদ্ধান্ত নাও, ঠকে যাবার সম্ভবনা থাকবে।”
পর দিন আমার বাবা আবার খাবার টেবিলে ন্যুডলস ভর্তি দুটো ডিশ রেখে আমাকে খেতে ডাকলেন। আগের দিনের মত এবারেও একটাতে ডিম আছে, আর একটাতে নেই। আমাকে যে কোনো একটি ডিশ বেছে নিতে বলা হোলো। আমি আগের অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি, চোখ যা দেখে তা সত্যি নাও হতে পারে। আমি ডিম ছাড়া ডিশটিই বেছে নিলাম। কিন্তু খেতে গিয়ে দেখলাম, ভেতরে কোনো ডিমই নেই। বাবা আমার দিকে তাকিয়ে আবার হাসলেন। “অভিজ্ঞতা সব সময় সঠিক পথ দেখায় না। জীবন বড় বিচিত্র। জীবনে চলার পথে বহুবার আমাদের মরীচিকার সামনে পরতে হয়। এর থেকে উত্তরন অসম্ভব। জীবন যেটা তোমাকে দিয়েছে, সেটা মেনে নিলে কষ্ট কম পাবে। তোমার অভিজ্ঞতা এবং বুদ্ধিমত্তা তুমি অবশ্যই কাজে লাগাবে, কিন্তু শেষ কথা জীবনই বলবে।” তৃতীয় দিনে আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। আগের দিনের মতই এবারেও একটাতে ডিম আছে, আর একটাতে নেই। তবে একটা ব্যাপার এবার একটু অন্য রকম হলো। এবার আমি বাবাকে বললাম, আগে তুমি নাও। তার পর আমি। কারন তুমি বাড়ির সবার বড়, এই সংসার তোমার রোজগারে চলে। তোমার অধিকার সবার আগে। শুনে বাবার মুখে উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল, মুখে কিছু বললেন না যদিও। খাওয়া শুরু করবার পর আমি দেখলাম ন্যুডলসে র নীচে আমার ডিশে দুটো ডিম। খাবার পর বাবা আমাকে কাছে ডাকলেন। সস্নেহে আমার হাত ধরে বললেন, “মনে রেখো, কৃতজ্ঞতা এবং ঋণ স্বীকার করা মানুষের শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তুমি জীবনে যদি অন্যের জন্য ভাব, অন্যকে দাও, জীবনও তোমার কথা ভাববে, তোমাকে আরো বহুগুণে ফিরিয়ে দেবে।
বাবার এই তিনটে উপদেশ আমি আজীবন মনে রেখেছি, এবং মেনে চলেছি। কি আশ্চর্য , সত্যি জীবন আমাকে বহু গুণ ফিরিয়ে দিয়েছে। আমি আজ যেখানে আছি, সেটা জীবনের দান ছাড়া আর কি?”
(উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতিতে আল্লামা ইকবাল গুরুত্বপূর্ণ নানা কারণে প্রাসঙ্গিক। এ ভূখণ্ডে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের স্বপ্ন সর্বপ্রথম তিনিই দেখেছিলেন। কবিতা ও দর্শনে যেমন তিনি অনন্য, রাজনীতিতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর কবিতা ও দর্শনে উপমহাদেশের মুসলমান তো বটেই, বিশ্ব মুসলিমও নানাভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছে। সেই ধারা আজও চলমান।) ১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে এক উত্তাল, অশান্ত সময়। শুক্রবার ফজরের আজানের পর বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোট নগরীতে এক মধ্যবিত্ত সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আল্লামা ইকবাল। একতলা একটি জীর্ণ বাড়ির যে প্রকোষ্ঠে তাঁর জন্ম হয়েছিল, তা এখনও পাকিস্তান সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের জন্য এটি একটি দর্শনীয় বাড়ি। ইকবালের পূর্ব-পুরুষগণ কাশ্মীর থেকে হিজরত করে শিয়ালকোটে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর পিতার নাম শেখ নুর মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন শিয়ালকোটের অন্যতম টুপি-ব্যবসায়ী এবং অত্যন্ত আল্লাহভীরু ও ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ একজন সৎ মানুষ৷ আল্লামা ইকবালের পিতার হৃদয়ে পবিত্র ইসলামের প্রতি কতটা ভালবাসা ও আঁকুতি ছিল, তা দুইটি ঘটনার মধ্য দিয়ে জানা যায়। আল্লামা ইকবালের জন্মের পর প্রথম যখন তাঁকে পিতার কোলে দেয়া হয়, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘যদি তোমার এই জীবন ইসলামের কোনো উপকারে আসে তাহলে দীর্ঘজীবী হও, অন্যথায় এ জীবন মূল্যহীন।’ শিয়ালকোটের সেই জরাজীর্ণ ঘরের মেঝেয় পিতার কোলে বসে ইকবাল কি বুঝতে পেরেছিলেন জীবনের মূল্য? সেই মূল্যবোধই কি মুসলিম হোমল্যান্ডের স্বপ্নদ্রষ্টা আল্লামা ইকবালকে তাড়া করে গেছে সারাজীবন? মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশু ইকবাল মাওলানা গোলাম হাসান ও সৈয়দ মীর হাসানের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। স্কচ মিশন স্কুলের শিক্ষক সৈয়দ মীর হাসান মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তনে খুব আগ্রহী ছিলেন। পিতা শেখ নুর মুহাম্মদের অনুমতিক্রমে ইকবালকে তিনি স্কচ মিশন স্কুলে ভর্তি করেছেন। ইকবালের সঙ্গে তাঁর বাবার ঐতিহাসিক দ্বিতীয় ঘটনাটি এখানে ঘটে। বাবা বললেন, ‘যদি স্কুল থেকে ফেরত এসে অবশিষ্ট জীবনে ইসলামের খেদমত করতে পারো, তাহলে আমি তোমাকে স্কুলে যাওয়ার অনুমতি দেব।’ ইকবাল কথা রেখেছিলেন। পিতার সঙ্গে কৃত ওয়াদা ইকবাল জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছেন। প্রাথমিক স্তর থেকে এফএ পর্যন্ত দশ বছরকাল তিনি সৈয়দ মীর হাসানের তত্ত্বাবধানে শিক্ষাগ্রহণ করেন। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সৈয়দ মীর হাসান অভিনব পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণ ইকবালের মনে ঐকান্তিক পিপাসা জাগিয়ে তোলেন। ১৮৮৮ সালে প্রাথমিক, ১৮৯১ সালে মিডল এবং ১৮৯৩ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বৃত্তি ও মেডেলসহ উত্তীর্ণ হন। ১৮৯৫ সালে ইকবাল ঐ কলেজ থেকে এফএ পাস করেন এবং একই বছর ১৮ বছর বয়সে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে লাহোর গমন করেন। লাহোর সরকারি কলেজ থেকে ১৮৯৭ সালে স্নাতক ও ১৮৯৯ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। একই বছর তিনি লাহোরের ওরিয়েন্টাল কলেজে ইতিহাস ও দর্শন শাস্ত্রে অধ্যাপনার চাকরি গ্রহণ করেন। আল্লামা ইকবালের জীবন ছিল আপাদমস্তক কীর্তিমান এক মহাপুরুষের জীবন৷ জীবনের প্রতিটি লক্ষ্য ও দর্শনকে তিনি ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও তৎপরতার মাধ্যমে সফলতার মুখ দেখান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থা বিশেষ করে মুসলমানদের দুঃখজনক চিত্র তাঁকে ব্যথিত করে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন, রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়া ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুসলমানদের উত্তরণ আর সম্ভব নয়। মুসলমানদের প্রতিটি সমস্যায় গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে আমৃত্যু ভারতীয় রাজনীতির কঠিন মাঠে বিচরণ করেন তিনি। ১৯২৬ সালে পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৭ সালে বৃটিশ সরকার ভবিষ্যৎ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের পটভূমি তৈরির জন্য ‘সাইমন কমিশন’ প্রেরণ করলে কংগ্রেস দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে আল্লামা ইকবাল নওয়াব জুলফিকার আলি খান ও মাওলানা মোহাম্মদ আলির সাথে যৌথভাবে এক বিবৃতি প্রকাশ করে কমিশনকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি মুসলমানদের লক্ষ্য করে বলেন, যদি আমরা কমিশনকে সহায়তা না করি তবে বৃটিশরা মুসলমানদের স্বার্থকেই বিঘ্নিত করবে। আল্লামা ইকবালের এই ধারণা বৃটিশদের শাসন পরিচালনায় মুসলমানরা হারে হারে টের পেয়েছিল। বৃটিশরা সবসময় মুসলমানদের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করার কারণে মুসলমানদেরকেই প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করছে। যা তাদের দীর্ঘ দিনের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। মুসলমান শাসনের অবসানের পর কাশ্মীরের মুসলমানরা নানাবিধ নির্যাতন ও লাঞ্চনার শিকার হয়। অসহায় কাশ্মীরি মুসলমান ভাই-বোনদেরকে সহযোগিতা করার জন্য লাহোরে চলে আসা কাশ্মীরিরা আঞ্জুমান নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর আল্লামা ইকবাল এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। যেহেতু তিনিও ছিলেন মূলত কাশ্মীরি। তাঁর পূর্বপুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়েই কাশ্মীর ছেড়ে চলে আসেন। ১৯৩০ সালের দিকে মুসলমানদের প্রতি জুলুম-নির্যাতন অত্যধিক পরিমাণে বেড়ে যায়। ডোগরা মহারাজার ক্রমবর্ধমান জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদে লাহোরে সর্বভারতীয় কাশ্মীর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে কাশ্মীর প্রশাসনের অন্যায় নির্যাতনের সমালোচনা করে প্রস্তাব গৃহীত হয়। আল্লামা ইকবাল এই প্রস্তাবের প্রতি একাত্মতা পোষণ করেন। এ সময় তিনি মুসলিম কনফারেন্সের সভাপতি ছিলেন। তিনি কাশ্মীরিদের সার্বিক সমস্যার কথা সরকারের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরেন। এর প্রেক্ষিতে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কাশ্মীরিদের সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধান হয়। ১৯৩২ সালে আলোয়ার রাজ্যের মহারাজা কর্তৃক নির্যাতিত মুসলমানগণ ‘খাদেমুল মুসলিমিন’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করালে মহারাজার সরকার এটিকে বেআইনি ঘোষণা করে। এ অন্যায় আদেশের প্রতিবাদে মুসলমানরা বিক্ষোভ করলে তাদের উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে শহিদ হন প্রায় এক শত মুসলমান। এরপর শুরু হয় গণ-গ্রেফতার। বাড়ি-ঘরে ছেড়ে পালাতে থাকে মুসলমানগণ। এই অন্যায় আচরণের প্রতিকার চেয়ে আল্লামা ইকবাল ভাইসরয় লর্ড ওয়েলিংটনের নিকট একটি স্মারক লিপি পেশ করেন। পরিণতিতে মুসলমানগণ ফেরারি জীবন ছেড়ে বাড়ি ফেরার সুযোগ পায়। ১৯৩৬ সালে আল্লামা ইকবাল পাঞ্জাব মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি বোর্ডের সভাপতি নিযুক্ত হন। একই সালে পাঞ্জাব মুসলিম লীগ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ঘোষণা করা হয় তাঁকে। ১৯৩৮ সালে লাহোরে মসজিদের দখল নিয়ে শিখ-মুসলমান দাঙ্গার সময় আল্লামা ইকবাল মসজিদ পুনরুদ্ধারে শাহাদাত প্রত্যাশী মুসলমান যুবকদের উৎসাহ যোগান। এক কথায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে আল্লামা ইকবাল মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এরপরও কেউ কেউ আল্লামা ইকবালের রাজনৈতিক কার্যকলাপের সমালোচনা করেন। কিন্তু তৎকালীন পরিস্থিতির বিচারে একজন মুসলমানের এরচেয়ে কতটুকু বেশি করার সুযোগ ছিল তা কিন্তু প্রশ্ন সাপেক্ষ। সার্বিক বিবেচনায় ভারতীয় মুসলমানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণে আল্লামা ইকবালের অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। তিনিই সর্বপ্রথম মুসলিম লীগের অধিবেশনে ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করেন। এই দাবিই পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনের সূচনা করে। আজকের ক্ষমতাধর মুসলিম পাকিস্তান রাষ্ট্রটির স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন আল্লামা ইকবাল। একজন নেতা, লেখক কিংবা একজন দার্শনিকের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন হয়তো সেটাই, যেদিন তিনি দেখতে পান, তাঁর মস্তিষ্ক-নিসৃত একটি চিন্তা পৃথিবীর বুকে বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে। আল্লামা ইকবালের জীবনে সেই মহানন্দের দিনটি তাঁর জীবদ্দশায় আসেনি৷ যেদিন দক্ষিণ-এশিয়ায় তাঁর স্বপ্নের স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন বস্তবে রূপ নেয়, দিনটি ছিল ১৯৪৭ সালের পয়লা আগস্ট। ইকবাল সে দিনটি পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারেননি। ১৯৩০ সালের ২৪ মার্চ লাহোরের মিন্টু পার্কে জনসমুদ্র এসে হাজির হয়েছিল ইকবালের ‘মুসলিম হোমল্যান্ড’ ধারণাকে স্বাগত জানাতে। এই ধারণা কবি ইকবাল দিয়েছিলেন ১৯৩০ সালের ৩০ ডিসেম্বর, এলাহাবাদে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনে। তাঁর এই ধারণা এই সম্মেলনে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। এই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার দুই বছর আগেই তিনি এই জাগতিক দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। তাঁর জীবনে একটি স্মরণীয় দিন ছিল সেটি, যখন জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণ বিদ্রোহ করেছিল বর্বর সামন্ত স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। তিনি সেই দিনটিতে দেখতে পেয়েছিলেন, তাঁর আলাদা ‘মুসলিম হোমল্যান্ডের’ স্বপ্ন একদিন বাস্তবায়িত হবে। একাধারে কবি, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ ও আইন বিশেষজ্ঞ আল্লামা ইকবাল ছিলেন প্রচণ্ড শিকড়-আকড়ে-থাকা মানুষ। যৌবনকাল কাটিয়েছেন ইউরোপের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে৷ কঠোর অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে জ্ঞানের রস নিংড়ে এনেছেন৷ কিন্তু ইউরোপের জীবনধারায় গা ভাসাননি। ১৯২৩ সালে বৃটিশ সরকার ইকবালকে নাইট খেতাব দিয়ে সম্মানিত করে। তাঁর এই নাইটপ্রাপ্তিতে ভক্ত-অনুরাগীদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। বিরুদ্ধবাদী কবিরা ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা লিখে তাঁকে আক্রমণ করেন। এমনকি তাঁর বন্ধুরা চিঠি লিখে তাঁর মতামত জানতে চান এবং আশ্বস্ত হতে চান ঘটনা যেন কোনো ক্রমেই তাঁর স্বাধীন মতামত প্রকাশে কিংবা কওমের প্রতি খেদমতে বাধার সৃষ্টি না করে। আল্লামা ইকবাল বাকি জীবন কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন যে, তিনি কখনো দুর্দশাগ্রস্থ মুসমানদের কথা ভুলেননি। সকল বিবাদ-বিসংবাদের ঊর্ধ্বে গিয়ে নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষগ্রহণ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদের চিন্তা তাঁকে কখনো স্বার্থপর ও বিলাসী হয়ে উঠতে দেয়নি। তিনি সারাজীবন একজন দুঃখী মানুষ ও একটি অবরুদ্ধ পাখির বেদনায় কেঁদেছেন। হিন্দুস্তানের মাটির পক্ষে গেয়ে গেছেন নিষ্কলুষ প্রেমের গান। এজন্যই তিনি ইউরোপমুখী প্রফেসর ইকবাল না হয়ে হয়ে উঠেছেন আমাদের আল্লামা ইকবাল। আল্লামা ইকবালের কিছু বিখ্যাত গ্রন্থ১. ইলমুল ইকতিসাদ : অর্থনীতির উপর লেখা উর্দুভাষার প্রথম গ্রন্থ। তিনি এটি লাহোর সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক থাকাকালে রচনা করেন।২. তারিখ-ই-হিন্দ : বইটির মূল কপির সন্ধান পাওয়া যায় না এখন। এর একটি সংস্করণ অমৃতসর থেকে প্রকাশিত হয়।৩. আসরার-ই-খুদি : আল্লামা ইকবালের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। এটি ১৯১৫ সালে প্রকাশিত হয়। এ বই প্রকাশের পর সাড়া পড়ে যায় সর্বত্র। কিন্তু সুফি তরিকার অনুসারীরা এ পুস্তক প্রকাশকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে গ্রহণ করেননি। কেননা ইকবাল এ গ্রন্থে সুফি কবি হাফিজ শিরাজির তীব্র সমালোচনা করে ৩৫টি কবিতা লিখেছিলেন। উত্তেজনা এতই চরম আকার ধারণ করেছিল যে, ইকবালের চিন্তাধারার সমালোচনা করে খানবাহাদুর পীরজাদা মোজাফফর আহমদ ‘ফজলে রাজ-ই-বেখুদি’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতা প্রকাশ করেন। ইকবাল পরবর্তী সংস্করণে উল্লেখিত ৩৫টি কবিতা বাদ দিয়ে দেন। প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ আর এ নিকলসন ১৯২০ সালে এর ইংরেজি তর্জমা প্রকাশ করেন।৪. রমুজে বেখুদি : আসরার-ই-খুদিরই ক্রম সম্প্রসারিত এই সংকলনটি ১৯১৮ সালে রমুজে বেখুদি নামে প্রকাশিত হয়। আর্থার জন আর্বারি এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন।৫. পায়াম-ই-মাশারিক : এ বইটি প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে। এ সময় ইকবাল কবি হিসেবে অর্জন করেছেন সর্বজন স্বীকৃতি। তাঁর কবিতা এগিয়ে চলেছে পূর্ণ-পরিণতির দিকে। তিনি এ কাব্যে পাশ্চাত্য দর্শনের পাশাপাশি প্রাচ্যের কোরআনি চিন্তার ফসলকেও তুলে এনেছেন। এ কাব্যাটি গ্যেটের চিন্তাধারার অনুসরণে রচনা করেন। এতে মোট ৮০টি কবিতা সংকলিত হয়েছে।৬. বাঙ্গ-ই-দারা : ইকবালের কবিজীবনের শুরু উর্দু কবিতার হাত ধরে। আর এই কাব্যটি উর্দু কবিতা সংকলন। উর্দুতেই তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর শ্রেষ্ঠ দেশাত্মবোধক এবং জনচিত্তে আগুন ধরানো কবিতাগুলো। ১৯২৪ সালে তিনি বাঙ্গ-ই-দারা নামে এসব উর্দু কবিতার সংকলনটি প্রকাশ করেন। এ কাব্যের কবিতাগুলো দেশাত্মবোধক, প্রকৃতি প্রীতি ও ইসলামি অনুভূতি–এ তিনটি অংশে বিভক্ত।৭. জবুর-ই-আজম : ইকবালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফার্সি কবিতা সংকলন জবুর-ই-আজম। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয়। এর দুইটি অংশের প্রথম অংশে কবিতা ও গীত এবং দ্বিতীয় অংশের নাম গুলশান-ই-রাজ-ই-জাদিদ। ব্যক্তিগত জীবনে আল্লামা ইকবাল ছেলে ড. জাবেদ ইকবাল ও মেয়ে মুনীরার জনক। ১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল ভোর ৫টা ১৪ মিনিটে চতুর্দিকে ফজরের আজান ধ্বনিত হবার মুহূর্তে ৬০ বছরের কিছু বয়েস নিয়ে এই মহান মুসলিম মনীষী ইন্তেকাল করেন।
মুসলিম বাংলার কিংবদন্তী ভাষাতাত্ত্বিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্মবার্ষিকী। ১৮৮৫ সালের এ দিনে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন তুমুল আনন্দোচ্ছল। হাসি ও আনন্দ দিয়ে আশপাশের সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন সারাক্ষণ। বন্ধু-বান্ধবরা এজন্য তাঁর নাম দিয়েছিল সদানন্দ। স্কুলের মাস্টার মশাই চলনে বলনে মুনশিয়ানা দেখে ডাকতেন সিরাজুদ্দৌলা নামে। আর আকিকার সময় আত্মীয়-স্বজনের পছন্দে নাম রাখা হয়েছিল ইবরাহিম। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় মায়ের রাখা শহিদুল্লাহ নামটা সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। শহিদে কারবালার চাঁদে মায়ের গর্ভে এসেছিলেন তিনি। মা ভাবলেন, ছেলের নাম ‘শহীদুল্লাহ’ রাখলে নামের বরকতে একসময় হয়তো স্মরণীয় মনীষীদের তালিকায় নাম উঠবে তাঁর ছেলের। মায়ের এ আশা ও ভাবনা পরবর্তীকালে ষোল আনাই পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল। মায়ের রাখা নাম অনুযায়ী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনি বরণীয় হয়ে আছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নামে। পড়াশোনায় সর্বদা নিমগ্ন থাকতে ভালোবাসতেন, অধ্যয়ন আর জ্ঞান-গবেষণায় ছিল তাঁর সমস্ত আনন্দ। এজন্য নিজে নিজের নাম দিয়েছিলেন জ্ঞানানন্দ। নামের যেমন বাহার ছিল তাঁর, কর্মের বাহার ছিল তারচেয়ে ঢের বেশি। কর্মের বাহারে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মুসলিম বাংলার কিংবদন্তী ভাষাবিদ, ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। ভাষা ও ভাষাতত্ত্বে অর্জন করেছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্য। আঠারোটি ভাষায় বিস্তৃত ছিল তাঁর এ পাণ্ডিত্য। বাংলা, ইংরেজি তো রয়েছেই, সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি, উর্দু, হিন্দিতে যথেষ্ট জ্ঞান ছিল তাঁর। এ ছাড়া তিনি রপ্ত করেছিলেন গ্রিক, তামিল, আর ল্যাটিন ভাষাও। আসামি, পাঞ্চাবি, গুজরাটি, মারাঠি, ওড়িয়া, কাশ্মীরী, নেপালি, তিব্বতি ইত্যাদি ভাষাও শিখেছিলেন। ভাষাশিক্ষার এ আগ্রহ বলতে গেলে পারিবারিক সূত্রে অর্জন করেছিলেন তিনি। তাঁর পিতাও চার-পাঁচটা ভাষা জানতেন। সেই সুবাদে প্রাথমিক পর্যায়ে পারিবারিকভাবে এবং পরে ব্যক্তি উদ্যোগে তাঁর ভাষাশিক্ষা জ্ঞানার্জনের শুরু। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পিতার নাম মফিজুদ্দীন আহমদ আর মাতা হুরুন্নেসা খাতুন। তাঁর বংশ পরিচয় সম্পর্কে জানা যায়, সৈয়দ আব্বাস আলি মক্কি নামে এক কামিল দরবেশ চতুর্দশ শতকে দক্ষিণ বাংলায় ইসলাম প্রচার করেন। পীর গোরাচাঁদ নামেও তিনি পরিচিত। ১২৬৫ সালে পবিত্র মক্কানগরে এই সাধকের জন্ম। কারো কারো মতে তিনি হজরত শাহজালাল রহমতুল্লাহি আলায়হির ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম। হাড়োয়ায় পীর গোরাচাঁদের মাজার অবস্থিত। শহীদুল্লাহর আদি পুরুষ শেখ দারা মালিক এই দরবেশ সাহেবের প্রধান খাদেমরূপে হিন্দুস্তান থেকে এ দেশে আগমন করেন এবং তাঁর দরগাহের বংশানুক্রমিক খাদেমরূপে বহাল হন। ইনিও একজন কামেল দরবেশ ছিলেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর রক্তে এই কামেল দরবেশের রক্তধারা এবং পীর গোরাচাঁদের রুহানি ফায়েজ প্রবাহিত হয়েছিল। চার ভাই ও তিন বোনের সংসারে ভাইদের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। ১০ বছর বয়সে তাকে ভর্তি করানো হয়েছিল হাওড়ার মধ্য ইংরেজি স্কুলে। সেখানে চার বছর পড়াশোনার পর ১৮৯৯ সালে ভর্তি হলেন হাওড়া জেলা স্কুলে। পড়াশোনায় যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন আর স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। হাওড়া জেলা স্কুলে ভর্তির পর প্রথমবারই বার্ষিক পরীক্ষায় লাভ করলেন রৌপ্য পদক। ছাত্রাবস্থায়ই ভাষা শেখার প্রতি ছিল তাঁর ভীষণ ঝোঁক। স্কুলে পড়া অবস্থায় তিনি সংস্কৃত আর ফার্সি কবিতা বাংলায় অনুবাদ করতেন। ১৯০৪ সালে প্রবেশিকা বা এনট্রান্স পাস করে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে ১৯০৬ সালে এফএ পাস করেন। সংস্কৃতে অনার্স নিয়ে বিএ ভর্তি হন হুগলি কলেজে। অসুস্থতার জন্য বিএ পরীক্ষায় পাস করা হয় না, ফলে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন যশোর জেলা স্কুলে। পরবর্তীকালে ১৯১০ সালে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে বিএ অনার্স ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন সংস্কৃতে এমএ পড়বেন বলে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। ফলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পরামর্শক্রমে তিনি ভর্তি হন তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব নামে নতুন একটি বিষয়ে। সে বছরই এ বিষয়টি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের ন্যায় যুক্ত হয় এবং শহীদুল্লাহ এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ের প্রথম ছাত্র হিসেবে ১৯১২ সালে এমএ পাস করেন। জার্মানিতে সংস্কৃত বিষয়ে পড়াশোনার জন্য সরকারি বৃত্তি লাভ করলেও স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে যেতে পারেননি। পরবর্তীকালে ফ্রান্সের প্যারিসের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে ডিপ্লোমা করেন। এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিলিট ডিগ্রি লাভের গৌরব অর্জন করেন। অসামান্য প্রতিভাধর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন সুপণ্ডিত ও বহু ভাষাবিদ। ছিলেন মুক্তবুদ্ধির অধিকারী। প্রাচীন ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে দুরূহ ও জটিল সমস্যার যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে অসামান্য পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। ১৯১৪ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর রুটি-রুজির তাগিদে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু এক বছরের বেশি চাকরি করলেন না। শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দিয়ে ১৯১৫ সাল থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত ওকালতি ব্যবসা শুরু করলেন। এ সময় তাঁর সাহিত্য চর্চাও চলল সমান তালে। ১৯১০ সালে বিয়ে করেন। তাঁর স্ত্রী মারগুবা খাতুন। দাম্পত্যজীবনে দুই ছেলের জনক তিনি। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তৎকালীন স্বনামখ্যাত পত্রিকা ‘ভারতী’তে ‘মদনভস্ম’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। কোহিনুর পত্রিকায় কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন। প্রতিভা পত্রিকায় লিখেছিলেন প্রবন্ধ। সেই সঙ্গে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন বেশকিছু দিন। ‘আল-এসলাম’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করতেন, পাশাপাশি এর সহ-সম্পাদকও ছিলেন। সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় তার বাংলা ভাষা সম্পর্কে গবেষণাপত্র ছাপা হয়েছিল। তিনি বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সম্পাদক ছিলেন। শহীদুল্লাহ নিজেই ছোটদের জন্য ‘আঙ্গুর’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ ড. দীনেশচন্দ্র সেন এ পত্রিকার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। প্রথম সংখ্যায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘রথযাত্রা’ নামক ছোটদের জন্য গল্প লিখেছিলেন। ৩য় সংখ্যায় নজরুল কবিতা লিখেছিলেন। শহীদুল্লাহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শরৎকুমার লাহিড়ী গবেষণা সহায়ক পদে চাকরিতে যোগদান করলেও ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকা চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম এবং একমাত্র শিক্ষক হিসেবে ওই বছরের জুন মাসে যোগদান করেন। ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত টানা তেইশ বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছিলেন। পরবর্তীকালেও বিক্ষিপ্তভাবে আরও কয়েক বছর এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৩৭ সালে সংস্কৃত থেকে বাংলা বিভাগ আলাদা হয়ে গেলে তিনি বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪০ সালে ফজলুল হক মুসলিম হল নির্মিত হলে তিনি এর প্রভোস্টের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে তিনি বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে চার বছর কাটিয়ে ১৯৪৮ সালে আবার ফিরে এলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ১৯৫২-৫৪ সাল পর্যন্ত বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষরূপে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি কলা অনুষদের ডিন ছিলেন এক বছর। ১৯৫৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি সেখানকার বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষরূপে যোগদান করেন। ১৯৫৫ সালে সেখানেও তিনি কলা অনুষদের ডিন ছিলেন। উর্দু উন্নয়ন সংস্থার উর্দু অভিধানের সম্পাদক হিসেবে করাচিতে কাটিয়েছেন দু’বছর। পড়াশোনার খাতিরে তিনি ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। ঘুরেছেন চীন, সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশে ও শান্তি নিকেতনে গিয়েছেন বেশ কয়েকবার। প্যারিসের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। বাংলা ভাষার সবচেয়ে পুরনো কবিতা সম্পর্কে গবেষণা করে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৩১ সালে তার প্রথম প্রবন্ধের বই ‘ভাষা ও সাহিত্য’ প্রকাশিত হয়। ১৯৩২ সালে ‘রকমারি’ নামক একটি গল্পের বই প্রকাশ করেন। ১৯৫৩ সালে ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’ প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। এ সময় ‘আমাদের সমস্যা’ নামে একটি বইও প্রকাশ করেন। আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ আর ‘বিদ্যাপতি-শতক’ নামে দুটি গ্রন্থের সম্পাদনা করেন। বাংলা একাডেমিতে থাকাকালীন তিনি একাডেমির হয়ে বাংলা আঞ্চলিক ভাষার অভিধান ও ইসলামী বিশ্বকোষ সম্পাদনা করেন। ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’ (২য় খণ্ড) ও ‘বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত’ নামক বইগুলো প্রকাশিত হয় এ সময়ে। তিনি ওমর খৈয়ামের বাংলা অনুবাদ করেন। তাঁর রচিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। আশি বছর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে দেশবাসীর পক্ষ থেকে তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা দেয়া হয়। ধীরে ধীরে তাঁর শরীর খারাপ হয়ে আসতে থাকে। একসময় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন রোগভোগের পর হাসপাতালেই ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর অত্যন্ত পছন্দের স্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই তাঁকে দাফন করা হয়। মুসলিম বাংলার কিংবদন্তী ভাষাতাত্ত্বিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মাতৃভাষা আর মাতৃভূমির ভালোবাসায় আজীবন বেঁচে থাকবেন।
অনেকে চেনেন না তাঁকে। যাঁরা চেনেন তাঁরাও প্রায় ভুলতে বসেছেন। একটি নাম যখন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় তখন অনেক কথা বলা উচিত। তেমন কোনো কথা নয়। শুধু এটুকুই, আবদুস সাত্তার ইদি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান ছিলেন না, ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠানবিরোধী প্রতিষ্ঠান। তাঁকে কিংবদন্তি বললে ছোট করা হবে, সে কথা বলছি না। তিনি ছিলেন আরো একটু বড়, আরো খানিকটা বেশি। তিনি শুধু একটি দেশের ছিলেন না, ছিলেন গোটা বিশ্বের। আসুন, এবার তাঁর সম্পর্কে কিছু জেনে নিই। জন্ম ব্রিটিশ ভারতের গুজরাটের বান্তভায়। ১৯২৮ সালের আজকের দিনে। বিখ্যাত মেমন পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, তাঁর মা তাঁকে ১ পয়সা দিতেন খাবার খাওয়ার জন্য আর ১ পয়সা দিতেন গরিব কোনো শিশুকে দেওয়ার জন্য। মা তাঁর ১১ বছর বয়সে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন আর মারা যান তাঁর বয়স যখন ১৯। মাকে প্রাণপণ সেবা করেন তিনি আর এটাই তাঁকে বয়োঃজ্যেষ্ঠদের প্রতি সাধারণ সেবাদানের প্রতি আকৃষ্ট করে। ১৯৪৭ সালে তাঁর পরিবার মাইগ্রেট করে পাকিস্তানে। এরপর শুরু হয় তাঁর সংগ্রামপর্ব। করাচিতে শুরু হয় নতুন জীবন, নতুন সংগ্রাম। করাচির জোদিয়া বাজারের কাছে একটি ছোট্ট ঘর ভাড়া নিয়ে মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেন তিনি। প্রথমেই মিথাদারের কাছাকাছি সারফা বাজার থেকে কয়েকজন ডাক্তারকে নিয়ে আসেন এবং ১১টি মোবাইল ডিসপেনসারি খোলেন শহরের ফুটপাতে। আজ সেই একই স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইদি সেন্টার। অন্যের কষ্ট লাঘবে ইদির নেয়া ছোট্ট একটি মানবহিতৈষী কাজ তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় বিশাল এক প্রান্তিক জনগোষ্ঠির সঙ্গে এবং ধীরে ধীরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চ্যারিটি নেটওয়ার্ক হয়ে যায় এই উদ্যোগ, যার নাম ইদি ফাউন্ডেশন। ইদি ফাউন্ডেশন এখন বিশাল এক সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানজুড়ে শত শত বিনামূল্যের নার্সিং হোম, বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, এতিমখানা, নারীদের আশ্রয় ও পুনর্বাসনকেন্দ্র, বৃদ্ধনিবাস, প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন কেন্দ্র, মাদক নিরাময় কেন্দ্র, স্কুল ও হাসপাতাল পরিচালনা করে থাকে। সংস্থাটি কবরস্থান এবং মর্গগুলোও পরিচালনা করে থাকে। গত কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানে সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন তিনি। ইদি ফাউন্ডেশনের জন্য নিজেই ভিক্ষে করতেন আব্দুস সাত্তার ইদি উল্লেখ করার মতো ব্যাপার হলো, পাকিস্তানের অস্থিতিশীল সমাজে যে কোনো হামলা বা সংঘর্ষের স্থানে সর্বপ্রথম যে অ্যাম্বুলেন্স দেখতে পাবেন সেটা হলো ইদি ফাউন্ডেশনের। সন্ত্রাসী হামলা থেকে শুরু করে দাঙ্গা পরিস্থিতির ভেতরেও ইদির সদস্যরা বুদ্ধিমত্তা এবং সাহসিকতার সঙ্গে মানুষের লাশ সংগ্রহ করে। ১৯৫১ সালে তিনি প্রথম ক্লিনিক খোলেন। কখনো কখনো রাষ্ট্র যেসব সেবা দিতে ব্যর্থ হয় সেগুলোও দিয়ে থাকে এই ইদি ফাউন্ডেশন। তিনি পাকিস্তানের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং অনেকেই তাকে সাক্ষাৎ দেবদূত জ্ঞান করত। কোনোদিন স্কুলের বারান্দা না মাড়ালেও ২০০৬ সালে করাচির ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে তাকে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধিতে ভূষিত করে। এছাড়াও ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের বেডফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ও তাকে ডিলিট দেয়। অবসর এমনিতেই খুব কম পেতেন তিনি, তবে যাও পেতেন তখন তার নেশা ছিল বই পড়া। ২০১৪ সালে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইদি জানিয়েছিলেন, সাধারণ জীবনযাপন, সততা, কঠোর পরিশ্রম ও সময়ানুবর্তিতা তার কাজের মূল বিষয়। তিনি বলেছিলেন, অন্যদের সেবা করা প্রত্যেকের কর্তব্য, মানুষের জীবনের অর্থও তাই। বেশি বেশি মানুষ এমনভাবে চিন্তা করতে শুরু করলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একেবারে শ্রমিকদের মতো করে ইদি ফাউন্ডেশনের কাজ নিজের হাতেই করতেন তিনি সাধারণ জীবনযাপনের জন্যও তিনি পরিচিত ছিলেন। জানামতে, তার মাত্র দুইপ্রস্থ পোশাক ছিল। ফাউন্ডেশনের কার্যালয়ের পাশে একটি ছোট ও প্রায় আসবাবপত্রহীন ঘরে তিনি বসবাস করতেন। ২০১৩ সালে তার কিডনি অকেজো হয়ে যায়। বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে পাকিস্তানের সরকারি কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। বিলকিস বেগম নামের এক নারীকে ১৯৬৬ সালে বিয়ে করেন ইদি। দু’জনে মিলেই শুরু করেছিলেন তাদের সকল কাজ। যুদ্ধ সংঘাতময় অঞ্চলে অনেক সময় নিজেও গাড়ি নিয়ে ছুটে গেছেন আহত নিহতদের সংগ্রহে। আহতদের যতটা সম্ভব দ্রুত হাসপাতালে আনার জন্য অনেক সময় নিজেও গাড়ি চালিয়েছেন। তবে অধিকাংশ সময়ই তিনি গাড়ির সামনে চালকের ঠিক পাশের চেয়ারটিতে কালো পাগড়ি পরিধান করে বসে থাকতেন এবং নিজে বিভিন্ন প্রকল্প পরিদর্শন করতেন। একেবারে জীবনের শেষদিনটি পর্যন্ত তিনি একই কাজ করে গেছেন, একদিনের জন্যও অলসতাকে কাছে আসতে দেননি। শিশুদের তিনি ভালোবাসতেন দারুণ ২০০৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান ভারত যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তৎকালীন করাচির কিছু অংশে বোমা হামলা চালানো হয়েছিল। সেসময় ইদি এবং তার স্ত্রী বিলকিস শিশু এবং নারীদের শরীরের বিভিন্ন অংশ কুড়িয়ে সংগ্রহ করেছিলেন। স্ত্রী বিলকিস নারীদের শরীর ধোয়ার কাজটি করেন এবং বাকিদের ধোয়ান ইদি নিজে। ওই ঘটনার পর ইদির বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষত বিক্ষত, ছিন্ন বিচ্ছিন্ন দেহগুলো দেখে আমার হৃদয় কঠিন হয়ে যায় সেদিন। মানবতার কাছে এবং ধর্মের কাছে সেদিন থেকেই আমি আমার জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলাম। কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের দুঃস্থ শিশুদের সহযোগিতা করে আসছে ইদি ফাউন্ডেশন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, পাকিস্তানে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে খুব কড়াকড়ি হয়ে থাকে। এর মধ্যেও যেসব সন্তান তাদের পিতা-মাতা না থাকায় নাগরিকত্ব কার্ড তৈরি করতে পারে না, তাদের পিতা হয়ে নাগরিকত্ব পাওয়ারও বন্দোবস্ত করতেন তিনি। এই কাজের জন্য সিন্ধুর উচ্চ আদালত তাকে একবার তলবও করেছিলেন। গোটা জীবন মানুষের জন্য করতে গিয়ে বিভিন্ন বৈরী পরিবেশে কাজ করতে হয়েছে তাকে। কখনও পচা লাশের মাঝে আবার কখনও বোমা হামলার মাঝে ক্ষতিকারক গ্যাস মুখোমুখি করে নিরপরাধ মানুষকে বাঁচাতে গিয়েছিলেন তিনি। আজও তাই শত্রু-মিত্র, ভালো-মন্দ, ইতিবাচক-নেতিবাচক সবার কাছেই আবদুস সাত্তার ইদি এক চিরস্মরণীয় ব্যক্তিত্বের নাম। যার আলোয় আলোকিত বহু মানুষ। ইদি ফাউন্ডেশন পাকিস্তান ছাড়াও বিশ্বের অন্য দেশেও সেবামূলক কাজ করে। আবদুস সাত্তার ইদির স্ত্রী বিলকিস ইদি বিলকিস ইদি ফাউন্ডেশনের প্রধান। ১৯৮৬-তে ইদি দম্পতিকে যুগ্মভাবে রামন ম্যাগসাসে পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়েছিল। প্রসঙ্গত, কোনওক্রমে পাকিস্তানে ঢুকে পড়া ভারতের মূক ও বধির তরুণী গীতা এই ইদি ফাউন্ডেশনের আশ্রয়েই ছিল। ২০০৩-০৪ সালে লাহোরে গীতাকে উদ্ধার করে পাকিস্তান বর্ডার গার্ডস। তারা গীতাকে ইদি অনাথ আশ্রমে নিয়ে যায়। এরপর গীতার দেখভাল করে ইদি ফাউন্ডেশন এবং বিলকিস ইদি। গত বছরে গীতাকে ভারতে ফেরানো হয়। সেই সময় ইদি ফাউন্ডেশনের সদস্যরাও ভারতে এসেছিলেন। গীতাকে এক দশকেরও বেশি সময় দেখভালের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইদি ফাউন্ডেশনকে এক কোটি রুপী দেয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সেবামূলক কাজের জন্য ওই অর্থ গ্রহণ করতে রাজি হননি আবদুস সাত্তার ইদি। মৃত্যুর পর তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল ২০১৩ সালের ২৫ জুন আবদুস সাত্তার ইদির কিডনি অকেজো হয়ে পড়ে। ২০১৬ সালের ৮ জুলাই কিডনির নিষ্ক্রিয়তার জন্য পৃথিবীকে চিরবিদায় জানান মানবতার বন্ধু কিংবদন্তিতুল্য এ মানুষটি। করাচির ইদি পল্লীতে তাঁকে দাফন করা হয়।
বর্তমান মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত এবং সমাদৃত সফল রাষ্ট্রনায়ক তুরস্কের রজব তাইয়্যেব এরদোগান। তুর্কি জনগণের কাছে তাঁদের প্রেসিডেন্ট কতটা প্রিয়, ২০১৬ সালে সেখানকার সেনাবাহিনীর ব্যর্থ অভ্যূত্থান-চেষ্টায় পুরো বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে। এরদোগানের এক আহ্বানেই শক্তিশালী সেনাবাহিনীর সেই অপচেষ্টাকে তুর্কি জনগণ জানবাজি রেখে রুখে দিয়েছিল। আজকের এরদোগানের এই যে জনপ্রিয়তা, এই যে সফলতা, তা এম্নি এম্নি অর্জিত হয়নি। দীর্ঘ একটা সময় তিনি কঠোর পরিশ্রম এবং বহু বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে এই পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছেন। এরদোগানের জন্ম, শৈশব এবং বেড়ে ওঠা নিতান্ত সাদা-মাটা দরিদ্র এক তুর্কি পরিবারে। সেখান থেকেই তিনি নিজেকে তিলে তিলে গড়ে আজকের বিশ্বনন্দিত এরদোগান হয়েছেন। ইস্তাম্বুলের কাসিমপাশায় ১৯৫৪ সালের ২৬ শে ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্ম। বাবা ছিলেন একজন ফলবিক্রেতা। বাবার ফলবিক্রির সূত্রে পরিবারের সাথে এরদোগানের শৈশব কেটেছে কৃষ্ণ সাগরের পাড়ে। ১৩ বছর বয়েসে পরিবারের সাথেই আবার ফিরে আসেন ইস্তাম্বুলে। ভর্তি হন একটি মাদরাসায়। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার সঙ্গে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় রাস্তায় লেবু বাদাম ইত্যাদি ফেরি করতে থাকেন। কিশোর বয়েস থেকেই শুরু হয় এরদোগানের জীবন-সংগ্রাম। বাবার কাজে সহায়তা, পাশাপাশি মাদরাসার পড়াশোনা–এভাবে একদিন পবিত্র কুরআন হিফজ করে ফেলেন তিনি। ইস্তাম্বুলের একটি সংবর্ধনা-অনুষ্ঠানে এরদোগান তাঁর শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘ছেলেবেলা আমি যখন প্রতিদিন সকালে বই বগলদাবা করে মাদরাসায় যেতাম, পথে মুরব্বি কিসিমের অনেকেই উপদেশ দিতেন–বেটা, মাদরাসায় পড়াশোনা করে কী লাভ বল! পড়াশোনা শেষ করে তো তুমি মুর্দা কাফন-দাফনের কাজ ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না। আমি তাদের কথা শুনে কেবল মুচকি হাসতাম। কোনো জবাব দিতাম না। আপন মনে হেঁটে যেতাম মাদরাসায়। আমার পরিবার নিতান্ত অসচ্ছল ছিল, অভাবের কারণে কোনো কোনো সময় রুটির সঙ্গে তরকারির পরিবর্তে আমরা তরমুজ খেতাম। গরিব হলেও আমার বাবা-মা ছিলেন খুব ধার্মিক। তাঁদের স্বপ্ন ছিল আমি বড় হব। মুসলিম জাতির জন্য কিছু করব। আমিও সেই স্বপ্ন বুকে লালন করে সামনের পথে এগোতে থাকি।’ ১৯৭৩ সালে এরদোগান মাদরাসা-শিক্ষা সমাপ্ত করে তুরস্কের প্রসিদ্ধ মারমারাহ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। সেখান থেকে ব্যবসায় এবং প্রশাসন শিক্ষায় মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। সত্তরের দশকেই নাজিমুদ্দিন আরবেকানের হিজবুল খালাসিল ওয়াতানি সংগঠনে যোগদানের মাধ্যমে এরদোগান রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৮০ সালের সেনা অভ্যূত্থানের পর সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। এরদোগান তখন হিজবুল খালাসি থেকে নিস্ক্রিয় হয়ে যান। পরে ১৯৮৩ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে তিনি হিজবুর রাফাহ-এ যোগদান করেন। হিজবুর রাফাহ থেকে ১৯৯৪ সালে ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচনে মনোনয়ন পান এরদোগান। বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন সে নির্বাচনে। মেয়র নির্বাচিত হবার পর তিনি ইস্তাম্বুল শহরকে সম্পূর্ণ নতুন করে সাজিয়ে তোলেন। দেড় কোটি মানুষের শহরটি তখন নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। জীবনমান ছিল খুব নিম্নমানের। বিশুদ্ধ পানির সংকট, বায়ুদূষণ, যানজট–সব রকম সমস্যার যেন কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইস্তাম্বুল। এরদোগান এসে অল্প দিনের ভেতর এসব সমস্যার সমাধান করে নাগরিক সেবাকে গতিময় করে তোলেন। ফলে ইস্তাম্বুল পরিণত হয় অত্যাধুনিক এক নগরীতে। এভাবেই জনমনে আলাদা একটা জায়গা করে নেন তিনি। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ইস্তাম্বুলের মেয়র পদে থেকে জনগণের সেবা করেন। ৯৭-তে সেনা অভ্যূত্থান হয় তুরস্কে। নতুন সেনা-শাসক দেশটিতে সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দেয়। এর প্রতিবাদে তুর্কি জনগণ খেপে ওঠে। দেশ জুড়ে শুরু হয় প্রতিবাদী মিছিল-মিটিং-সমাবেশ। এমনই এক সমাবেশে এরদোগান একদিন বক্তৃতাকালে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন–‘মসজিদ আমাদের ক্যান্টনমেন্ট, গম্বুজ আমাদের হেলমেটমিনার আমাদের বেয়নেট, মুসল্লিরা সৈনিক।’ কবিতাটি আবৃত্তির কারণে ক্ষমতাসীন স্বৈরশাসক ধর্মীয় উস্কানির অভিযোগ তুলে এরদোগানকে গ্রেপ্তার করে নেয়। ১০ মাস কারাভোগের পর তিনি মুক্তি পান কারাগার থেকে। ২০০১ সালে তুরস্কের আরেক নেতা আবদুল্লাহ গুলকে নিয়ে গঠন করেন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট পার্টি (একেপি)। ২০০২ সালে তুরস্কের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে একেপি। প্রায় ৫০০টি আসনের মধ্যে ৩৬৩টি আসনে বিজয় লাভ করে তারা ক্ষমতায় আরোহন করে। আইনি জটিলতার কারণে এরদোগান তখন প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। পরের বছর, ২০০৩ সালে, সংসদে আইন সংশোধন করে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়। টানা ১১ বছর তিনি তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা করেন। মাঝখানে ২০০৭ এবং ১১ সালে দুই বার নির্বাচন হলেও উভয় নির্বাচনে একেপিই জয় লাভ করে। তাই প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার থেকে তাঁকে আর নড়তে হয়নি। এরপর পার্লামেন্টারি সরকারব্যবস্থা পরিবর্তন করে এরদোগান তুরস্কে প্রেসিডেন্সিয়ালি রাষ্ট্রব্যবস্থা চালু করেন। ২০১৪ সালে ২৮ আগস্ট দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১১ বছরের সফল প্রধানমন্ত্রী জনপ্রিয় এরদোগান বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রধানমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট–দুই পদ মিলিয়ে এরদোগান তুরস্কের শাসন ক্ষমতায় আরোহনের ১৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই ১৫ বছরে তলাবিহীন তুরস্ককে উন্নতির অনন্য এক শিখরে নিয়ে গেছেন তিনি। তাঁর ক্ষমতায় আরোহনের পূর্বে টার্কিশ মুদ্রার তেমন একটা মূল্য ছিল না বিশ্ববাজারে। ব্রিটিশ মুদ্রা ১ পাউন্ড দিয়ে একশ’রও বেশি টার্কিশ লিরা পাওয়া যেত। এরদোগান ক্ষমতায় এসে টার্কিশ মুদ্রার মান বাড়ানোতে মনোযোগ দেন। যার ফলে বর্তমান বিশ্ববাজারে ৪ লিরা টার্কিশ মুদ্রার দাম ১ পাউন্ড। রাষ্ট্রপ্রদান হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা। তাঁর শাসনামলের শুরু থেকেই দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ভেতরে আছে এবং দিনকে দিন মানুষের গড় আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরদোগানের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হচ্ছে তিনি জনগণের সাথে মিশতে পারেন, তাঁদের হৃদয়ের আকুতি সহজেই বুঝতে পারেন। তুরস্কের জনগণ এজন্যই বারবার তাঁকে ক্ষমতায় বসায়।