
মুসলিম শাসকের আনুগত্য বর্জন করে মৃত্যুবরণ করা কি জাহেলি মৃত্যু?
মনে রাখতে হবে, মুসলিম নাম হলেই সে মুসলীম নয়। আল্লাহর আইন দিয়ে যারা দেশ চালায় শুধু তাদের আনুগত্য করা ফরজ। বরং “”আল্লাহ যা নাজিল করেছেন সে কিতাবের আইন দিয়ে যারা রাষ্ট্রের আইন তৈরী করে না তারা কাফের,ফাঁসের,জালেম” মায়েদা- ৪৪,৪৫,৪৭!
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন,
مَنْ خَرَجَ مِنْ الطَّاعَةِ وَفَارَقَ الْجَمَاعَةَ فَمَاتَ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً.
“যে ব্যক্তি (আমীরের) আনুগত্য বর্জন করে জামায়াত ত্যাগ করল অতঃপর সেই অবস্থায় সে মারা গেল, সে জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল।” (সহীহ মুসলিম হাঃ ১৮৪৮; সুনান নাসায়ী হাঃ ৪১১৪; মুসনাদে আহমদ হাঃ ১৫২৬৬)
এ কথা বলা হয় যে, হাদীসটি ইসলামী রাষ্ট্রের মুসলিম শাসকের ব্যাপারে বলা হয়েছে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইসলামী রাষ্ট্রের মুসলিম শাসকের আনুগত্য বর্জন করে এবং মুসলিম জামায়াত ত্যাগ করে মৃত্যুবরণ করে, তার মৃত্যু জাহেলিয়াতের মৃত্যু। কিন্তু যে শাসক তথাকথিত মুসলিম হওয়ার পরেও ইসলামের বিধান বর্জন করে উল্টো জাহেলী বিধান দ্বারা মুসলিম উম্মাহকে শাসন করে, সেসব শাসকের জন্য এই হাদীস প্রযোজ্য নয়। কেননা, একজন মুসলিম শাসক আল্লাহর বিধান দ্বারা শাসন ফায়সালা করতে বাধ্য, অন্য কোনো বিধান দ্বারা নয়।
আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,
وَأَنِ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ وَاحْذَرْهُمْ أَنْ يَفْتِنُوكَ عَنْ بَعْضِ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ إِلَيْكَ ۖ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَاعْلَمْ أَنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ أَنْ يُصِيبَهُمْ بِبَعْضِ ذُنُوبِهِمْ ۗ وَإِنَّ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ لَفَاسِقُونَ. أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ ۚ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ.
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী শাসন- ফয়সালা কর এবং তাদের প্রবৃত্তির (অর্থাৎ মানব রচিত জাহেলি মতবাদের) অনুসরণ করো না। আর তাদের থেকে সতর্ক থাক যে, আল্লাহ (বিধান হিসেবে) যা অবতীর্ণ করেছেন, তার কিছু থেকে তারা তোমাকে বিচ্যুত করবে। অতঃপর যদি তারা (আল্লাহর বিধান থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে জেনে রাখ যে, আল্লাহ তো কেবল তাদেরকে তাদের কতিপয় পাপের কারণেই (জাহান্নামের) আযাব দিতে চান। আর মানুষের অনেকেই ফাসিক। কি তবে তারা জাহিলিয়াতের বিধান চায়? আর নিশ্চিত বিশ্বাসী জাতির জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে কে অধিক উত্তম? (সূরা মায়িদাঃ ৫/৪৯-৫০)
এখানে জাহেলিয়াত শব্দটি ইসলামের বিপরীত শব্দ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ইসলাম হচ্ছে পুরোপুরি ওহী ভিভিত্তিক জ্ঞানের পথ। কারণ, ইসলামের পথ দেখিয়েছেন আল্লাহ নিজেই। অপরদিকে ইসলামের বাইরের যে কোন মত, পথই জাহেলিয়াতের পথ। আরবের ইসলামপূর্ব যুগকে জাহেলিয়াতের যুগ বলার কারণ হচ্ছে এই যে, সে যুগে নিছক ধারণা, কল্পনা, আন্দাজ, অনুমান বা মানসিক কামনা-বাসনার ভিত্তিতে মানুষেরা নিজেদের জন্য জীবনের পথ তথা মানবরচিত জাহেলি মতবাদ তৈরী করে নিয়েছিল। যেখানেই যে যুগেই মানুষেরা এ কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করবে, তাকে অবশ্যই জাহেলিয়াতের কর্মপদ্ধতি বলা হবে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর উপর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার বিপরীত বিধান প্রদান করাই জাহিলিয়াত। (তাফসীরে ইবন আবি হাতিম, তাফসীরে ইবন কাসীর, তাফসীরে তাফহীমুল কুরআন, তাফসীরে সা’দী)।
হাদীসে এসেছে, রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ
َأَبْغَضُ النَّاسِ إِلَى اللهِ ثَلاَثَةٌ مُلْحِدٌ فِي الْحَرَمِ وَمُبْتَغٍ فِي الإِسْلاَمِ سُنَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ وَمُطَّلِبُ دَمِ امْرِئٍ بِغَيْرِ حَقٍّ لِيُهَرِيقَ دَمَهُ.
আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি হচ্ছে তিনজন। যে ব্যক্তি হারাম শরীফের মধ্যে অন্যায় কাজ করে, যে ব্যক্তি মুসলিম হওয়া সত্বেও জাহেলী রীতি-নীতি, বিবিধি-বিধান অনুসন্ধান করে এবং যে ব্যক্তি কোন অধিকার ব্যতীত কারো রক্তপাত দাবী করে। (সহীহ বুখারী হাঃ ৬৮৮২)
আর যে শাসক মুসলিম হওয়া সত্বেও ইসলামের বিধান বর্জন করে জাহেলী-কুফুরী বিধান দ্বারা শাসন করে এবং যারা জাহেলী শাসন মানতে আহ্বান করে কিংবা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে চলে তাদের পরিণতি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। হারিস আল-আশয়ারী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
وَمَنْ دَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ فَهُوَ مِنْ جُثَاءِ جَهَنَّمَ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَإِنْ صَامَ وَإِنْ صَلَّى قَالَ وَإِنْ صَامَ وَإِنْ صَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ.
“যে ব্যক্তি জাহেলী বিধানের দিকে আহ্বান জানাবে (এবং যে জাহেলী বিধানের আনুগত্য করব) , সে জাহান্নামী হবে। জিজ্ঞাস করা হল, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! সে যদি সাওম পালন করে, সালাত আদায় করে তবুও জাহান্নামী হবে? তিনি বললেন, সে যদি সাওম পালন করে, সালাত আদায় করে এবং নিজেকে মুসলিম বলে দাবী করে তবুও।” (মুসনাদে আহমদ হাঃ ১৬৭১৮, ১৭৩৪৪; জামে তিরমিযী হাঃ ২৮৬৩; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক হাঃ ৫১৪১; সহীহ ইবনে খুযায়মা হাঃ ১৮৯৫; সহীহ ইবনে হিব্বান হাঃ ৬২৩৩; জামিউল আহাদীস হাঃ ৪৪; মিশকাত হাঃ ৩৬৯৪; সহীহুল জামে হাঃ ১৭২৮)
সুতরাং যে মুসলিম শাসক আল্লাহর বিধান ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাতের তোয়াক্কা না করে বিদয়াতী বিধান তথা জাহেলী মানবরচিত মতবাদ কায়েমের মাধ্যমে আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করে, সেই শাসকের আনুগত্য করা জায়েয নেই। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেনঃ
سَيَلِي أُمُورَكُمْ بَعْدِي رِجَالٌ يُطْفِئُونَ السُّنَّةَ وَيَعْمَلُونَ بِالْبِدْعَةِ وَيُؤَخِّرُونَ الصَّلَاةَ عَنْ مَوَاقِيتِهَا فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ إِنْ أَدْرَكْتُهُمْ كَيْفَ أَفْعَلُ قَالَ تَسْأَلُنِي يَا ابْنَ أُمِّ عَبْدٍ كَيْفَ تَفْعَلُ لَا طَاعَةَ لِمَنْ عَصَى اللهَ.
“অচিরেই আমার পরে এমন সব লোক তোমাদের আমীর হবে, যারা আমার সুন্নাতকে বিলুপ্ত করবে, (জাহেলী মানব রচিত মতবাদ) বিদয়াতের অনুসরণ করবে এবং নামায নির্দিষ্ট ওয়াক্ত থেকে বিলম্বে পড়বে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি তাদের (যুগ) পাই, তবে কী করবো? তিনি বলেনঃ হে উম্মু আবদ-এর পুত্র! তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছো যে, তুমি কী করবে? ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করে, তার আনুগত্য করা যাবে না’।” (ইবনে মাজাহ হাঃ ২৮৬৫; আহমাদ ৩৭৮০; আরো দেখুন- সহীহ বুখারী হাঃ ৪৩৪০, ৭১৪৪, ৭১৪৫, ৭২৫৭; সহীহ মুসলিম হাঃ ১৮৩৯, ১৮৪০, ১৮৪৪; জামে তিরমিযী হাঃ ১৭০৭; সুনান নাসায়ী হাঃ ৪২০৫; আবু দাউদ হাঃ ২৬২৫, ৪২৪৮; ইবনে মাজাহ হাঃ ২৮৬৩; মুসনাদে আহমদ হাঃ ৬২৩, ৭২৬, ৭৪০, ১০২১, ১০৯৮, ৩৮৭৯, ১৯৪০৩; মুয়াত্তা মালিক হাঃ ১০; ইবনে আবী শায়বা হাঃ ৩৩৭১৭; মুজামুল কাবীর হাঃ ৩৮১; মুসনাদে শিহাব হাঃ ৮৭৩; জামেউল আহাদীস হাঃ ১৩৪০৫; কানযুল উম্মাল হাঃ ১৪৮৭৫)
মোটকথাঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর উপর আল্লাহ তা’য়ালা যে বিধান নাযিল করেছেন তার বিপরীত বিধান প্রদান করাই জাহিলিয়াত। সুতরাং যে রাষ্ট্র আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হয় না, সেটা কোনো তথাকথিত মুসলিম পরিচালনা করলেও জাহেলি রাষ্ট্র বলে গণ্য। এমন রাষ্ট্রকে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা না করে বরং এ জাহেলিয়াতের উপর সন্তুষ্টি থেকে মৃত্যুবরণ করাই হচ্ছে জাহেলি মৃত্যু।









