মরুসিংহ ওমর আল-মুখতার: ইতালির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিবিয়ার মহানায়ক এর জীবনী।



বিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব জুড়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নিজ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যে কয়জন নেতা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বীরদর্পে লড়াই করে গেছেন, তাদের মধ্যে সেনুসী আন্দোলনের নেতা ওমর আ‌ল-মুখতার অন্যতম। অকুতোভয় এই বীর দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ইতালিয়ান শাসনের বিরুদ্ধে লিবিয়ান মুজাহিদদের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন।

সমসাময়িক অন্যান্য নেতার মতো ইতালিয়ানদের প্রস্তাব করা সুযোগ সুবিধার কাছে নিজেকে বিকিয়ে না দিয়ে, ৭৩ বছর বয়স পর্যন্ত লড়াই করে অবশেষে তিনি ইতালিয়ানদের হাতে ধরা পড়েন। প্রহসনের এক বিচারের মাধ্যমে ইতালির ফ্যাসিস্ট সরকার ১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যদণ্ড দেয়।

ওমরের বাল্যকাল এবং তার উপর সেনুসি আন্দোলনের প্রভাব

ওমর আল-মুখতারের জন্ম ১৮৫৮ সালে (মতান্তরে ১৮৬২ সালে), লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের তবরুক শহরের নিকটবর্তী জাওইয়াত জাঞ্জুর নামক গ্রামে, মানফি নামক এক আরব বেদুইন গোত্রে। ওমরের বয়স যখন ১৬ বছর, তখন তারা বাবা হজ করতে গিয়ে ইন্তেকাল করেন। বাবার ইচ্ছে অনুযায়ী, এতিম ওমরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন স্থানীয় সেনুসি শেখ শেরিফ আল-গারিয়ানি।

সে সময় লিবিয়াতে সেনুসি আন্দোলনের বেশ প্রভাব ছিল। এই আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয় মক্কায়, ১৮৩৭ সালে। এর প্রবর্তক ছিলেন দ্য গ্র্যান্ড সেনুসি, মোহাম্মদ বিন আলি আস্‌-সেনুসি, যিনি ছিলেন পরবর্তীতে লিবিয়ার রাজা মোহাম্মদ ইদ্রিস আল-সেনুসির দাদা। দাবি করা হয়, তারা ছিলেন হযরত ফাতিমা (রা) এর দিক থেকে রাসূল (সা) এর বংশধর। সেনুসি আন্দোলন মূলত সুফি এবং সালাফির মাঝামাঝি দর্শনের একটি ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক সংস্কারমূলক আন্দোলন। মক্কায় যাত্রা শুরু করলেও সেনুসি আন্দোলন সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে লিবিয়া, সুদান, মরক্কো সহ উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে।

লিবিয়াতে সেনুসি দর্শনের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন শেরিফ আল-গারিয়ানির চাচা হুসেন আল-গারিয়ানি। তিনি সর্বপ্রথম ১৮৪৪ সালে আল-বেইদাতে গ্র্যান্ড সেনুসির ছেলে মোহাম্মদ আল-মাহদির সাথে মিলে সেনুসি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ছোটবেলা থেকেই ওমর আল-মুখতার সেনুসিদের প্রতিষ্ঠিত মসজিদ এবং মাদ্রাসায় শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন। বাবার মৃত্যুর পর শেরিফ আল-গারিয়ানির তত্ত্বাবধানে তিনি আল-জাগবুবের সেনুসি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮ বছর ধর্মীয় বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এ সময় তিনি পবিত্র কুরআন শরিফ মুখস্ত করেন। শিক্ষা জীবন শেষ করার পর, তাকে স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কুরআনের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

ওমর আল-মুখতার অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামাতের সাথে আদায় করতেন। রাতে তিনি তিন-চার ঘণ্টার বেশি ঘুমুতেন না। রাত গভীর থাকতেই তিনি ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করতেন। প্রতি সপ্তাহে তিনি একবার কুরআন শরিফ খতম করতেন। তার ধর্মজ্ঞান এবং শিক্ষক হিসেবে সুনামে মুগ্ধ হয়ে সেনুসি কর্তৃপক্ষ তাকে কুরআনের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে সুদানে প্রেরণ করে।

ফরাসীদের বিরুদ্ধে চাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ

১৮৯৪ সালে ওমর আল-মুখতার সুদানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এ সময় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর আগ্রাসন চলছিল। ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তি যখন চাদ দখল করে আরো উত্তরে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করতে থাকে, তখন সেনুসিরা তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করে। ১৮৯৯ সালে ওমর আল-মুখতার তৎকালীন সেনুসিদের প্রধান, মোহাম্মদ আল-মাহদির নির্দেশে সেনুসি যোদ্ধাদের সাথে যোগ দিয়ে চাদে যান। ১৮৯৯ সাল থেকে ১৯০০ সালে চাদের নেতা রাবিয়া আজ-জুবায়েরের পতনের পূর্ব পর্যন্ত এই দু’বছর ওমর চাদে ফরাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ওমর এবং তার সেনুসি সহযোদ্ধারা পরবর্তীতে অল্প কিছুদিন মিসরে ব্রিটিশদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেন।

১৯০২ সালে মোহাম্মদ আল-মাহদি মৃত্যুবরণ করেন। তার ছেলে ইদ্রিসের বয়স তখনও কম থাকায় সেনুসীদের প্রধানের দায়িত্ব নেন তার ভাই আহমেদ শেরিফ আস্‌-সেনুসি। তিনি ওমরকে আবারও কুরআনের শিক্ষক হিসেবে পাহাড়ি এলাকা জাবাল আল-আখদার তথা দ্য গ্রিন মাউন্টেইন্সের জাওইয়াত আল-কুসুরে নিযুক্ত করেন। এ সময় শিক্ষক এবং ধর্ম প্রচারক হিসেবে ওমরের সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি অটোমান সুলতানের কাছ থেকেও প্রশংসাপত্র অর্জন করেন।

ইতালো-তার্কিশ যুদ্ধে অংশগ্রহণ

১৯১১ সালে ইতালিয়ানরা লিবিয়া আক্রমণ করে। সেসময় লিবিয়া ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে তিনটি প্রদেশে বিভক্ত- পশ্চিমের ত্রিপলীতানিয়া, পূর্বের সাইরেনাইকা বা বারকা এবং দক্ষিণের ফেজ্জান। অটোমান সাম্রাজ্যের শক্তি তখন ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছিল। কাজেই ইতালিয়ানরা যখন লিবিয়ার উপকূলে এসে অটোমান সাম্রাজ্যের কাছে লিবিয়াকে হস্তান্তর করার নির্দেশ দেয়, তখন তারা যুদ্ধ না করে ইতালিয়ানদের সাথে সমঝোতায় গিয়ে লিবিয়ার আংশিক নিয়ন্ত্রণ ইতালির হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল।

কিন্তু এতেও সন্তুষ্ট না হয়ে ইতালিয়ানরা ত্রিপলী এবং বেনগাজীতে আক্রমণ শুরু করে। টানা তিন দিন ধরে তারা ত্রিপলী এবং বেনগাজীতে জাহাজ থেকে বোমা বর্ষণ করে। ফলে বাধ্য হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে অটোমান সৈন্যরা। আর তাদের সাথে যোগ দেয় স্থানীয় লিবিয়ানরা, বিশেষ করে চাদ যুদ্ধ অভিজ্ঞতা অর্জনকারী সেনুসি সৈন্যরা।

ইতালিয়ানদের আক্রমণের সময় ওমর আল-মুখতার ছিলেন জালো উদ্যানে। সংবাদ পেয়েই সাথে সাথে তিনি জাওইয়াত আল-কুসুরে যান এবং সেখানকার স্থানীয় আল-আবীদ গোত্রের সক্ষম সকল পুরুষকে দখলদার ইতালিয়ান বাহিনীর বিরুদ্ধে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করেন। তাদেরকে সাথে নিয়ে ওমর বীরদর্পে ইতালিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং পূর্বাঞ্চলীয় সাইরেনাইকার অধিকাংশ এলাকাকে ইতালির কাছে পতনের হাত থেকে রক্ষা করেন। ইতালিয়ানদের সাথে স্থানীয় লিবিয়ান এবং অটোমান তুর্কি সেনাদের এ যুদ্ধ ইতিহাসে ইতালো-তার্কিশ যুদ্ধ নামে পরিচিত।

এক বছর ধরে চলমান এ যুদ্ধে ইতালিয়ানদের বিশাল বাহিনী তুলনামূলকভাবে অনেক কম স্থানীয় বেদুইন আরব এবং তুর্কি যোদ্ধাদের অল্পস্বল্প অস্ত্রশস্ত্রের কাছে বারবার নাস্তানাবুদ হতে থাকে। এক বছর পরেও সমুদ্র উপকূলের অল্প কিছু স্থান ছাড়া লিবিয়ার বিশাল এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হওয়ায় ইতালিয়ানরা অটোমান সাম্রাজ্যের সাথে একাধিক চুক্তি করে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইতালিয়ানরা লিবিয়ার বাইরের কিছু এলাকা এবং দ্বীপের দখল ছেড়ে দেয়, বিনিময়ে অটোমান সৈন্যরা লিবিয়া ছেড়ে চলে যায়।

সেনুসিদের প্রধান আহমেদ শেরিফ আস্‌-সেনুসি এবং তার ভ্রাতুস্পুত্র মোহাম্মদ ইদ্রিস প্রথম দিকে ইতালির বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধে নেতৃত্ব দিলেও, অটোমানরা চলে যাওয়ার পর তারাও লড়াইয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ১৯১৩ সালে আহমেদ শেরিফ অবসর নিলে মোহাম্মদ ইদ্রিস সেনুসিদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তিনি ইতালিয়ানদের সাথে যুদ্ধের পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের সমঝোতা এবং ব্রিটিশদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালিয়ানরা অন্যান্য এলাকায় যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে গিয়ে লিবিয়া থেকে তাদের অধিকাংশ সৈন্য সরিয়ে নেয়। এ সুযোগে ইদ্রিস তাদের সাথে একাধিক সমঝোতা চুক্তি করে পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকার উপর সেনুসিদের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২০ সালে ইতালিয়ানরা তাকে সাইরেনাইকার আমির হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট সরকারের রিকনকুইস্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব

পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে ১৯২২ সালে, যখন ইতালিতে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায় আসে। তারা ক্ষমতায় এসেই অটোমানদের সাথে এবং ইদ্রিস আল-সেনুসির সাথে করা বিভিন্ন সমোঝতা চুক্তি বাতিল করে। ১৯২৩ সালে মুসোলিনির সরকার ‘রিকনকুইস্তা’ বা পুনর্বিজয় নামে একটি প্রকল্প শুরু করে, যার উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো উপায়ে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের অধীনস্থ ত্রিপলী এবং বেনগাজীর কলোনিগুলোকে পুনরায় ইতালির অধীনস্থ করা। জেনারেল পিয়েত্রো বাদুলিওর নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ট ইতালীয় বাহিনী নতুন করে সম্পূর্ণ লিবিয়া দখলের জন্য অভিযান শুরু করে।

প্রতিরোধ সৃষ্টি না করে আমির ইদ্রিস এ সময় মিসরে চলে যান। ওমর আল-মুখতারের ছোটবেলার পৃষ্ঠপোষক, আরেক গুরুত্বপূর্ণ সেনুসি নেতা শেরিফ আল-গারিয়ানিও ইদ্রিসের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, অল্প সংখ্যক যোদ্ধা নিয়ে বিশাল ইতালিয়ান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয় লাভ করা যাবে না। বরং এতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী আরও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ফলে তিনিও ইতালিয়ানদের আধিপত্য মেনে নিয়ে তাদের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে যতটুকু পাওয়া যায়, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে আগ্রহী হন। এ সময় এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে ওমরের সাথে শেরিফ এবং ইদ্রিসের দূরত্ব তৈরি হয়।

ইদ্রিস আল-সেনুসি এবং শেরিফ আল-গারিয়ানির অনুপস্থিতিতে ওমর আল-মুখতার ঔপনিবেশিক ইতালির বিরুদ্ধে সেনুসি আন্দোলনের প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। চাদে, মিসরে এবং ইতালির বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে তার সামরিক জ্ঞান বেশ ভালো ছিল। তাছাড়া শিক্ষক হিসেবে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করার কারণে, এ অঞ্চলের ভৌগলিক গঠন সম্পর্কেও তিনি জ্ঞাত ছিলেন। তার নেতৃত্বে মুজাহিদরা নতুন করে সংগঠিত হতে থাকে এবং একের পর এক ইতালিয়ানদের ঘাঁটি আক্রমণ করতে থাকে। তাদের রাত্রিকালীন গেরিলা আক্রমণগুলোর কারণে তারা লিবিয়ানদের কাছে ‘নিশাচর সরকার’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

১৯২৩ সালে ওমর আল-মুখতার মিসরে যান তার যোদ্ধাদের জন্য খাবার এবং অস্ত্রশস্ত্র আনার জন্য। সেখানে তিনি ইদ্রিস আল-সেনুসির সাথে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু তার কাছ থেকে তেমন কোনো সাহায্য না পেয়ে তিনি লিবিয়াতে ফিরে আসেন। সেখানে অবস্থানকালে এক ইতালিয়ান কর্মকর্তা তাকে ইতালিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করার বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং লিবিয়াতে ফিরে এসে যুদ্ধের পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি তুরস্কে অবস্থানরত অবসরপ্রাপ্ত সেনুসি নেতা আহমেদ আল-শেরিফ আল-সেনুসিকে একটি চিঠি পাঠিয়ে তাদের নীরবতার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং জানান যে, তাদেরকে নেতৃত্বশূন্য করে রেখে গেলেও, তারা তাদের যুদ্ধ ঠিকই চালিয়ে যাবেন।

ওমরের মুজাহিদ বাহিনীকে দমন করতে না পেরে ইতালিয়ান বাহিনী স্থানীয় লোকালয়ের উপর আক্রমণ শুরু করে। স্থানীয় জনগণ যেন ওমরকে সাহায্য না করতে পারে, সেজন্য ইতালিয়ানরা জনগণ এবং তাদের গবাদিপশুর উপর বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করত, লোকালয়ে বিষাক্ত গ্যাস ছিটিয়ে দিত, পানির কূপগুলোতে বিষ ঢেলে দিত, বন্দীদেরকে নির্যাতন করার পর প্লেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিত এবং রাজবন্দীদেরকে জনসমক্ষে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করত।

ইতালিয়ানরা ধীরে ধীরে জাগবুব, জালো, ঔজেলা এবং ফেজ্জানের সবগুলো মরুদ্যান দখল করে নিলে ওমর আল-মুখতার জাবাল আল-আখদার তথা গ্রিন মাউন্টেইন্স এলাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তখন তিনি দারনায় ইতালিয়ান বাহিনীর উপর আক্রমণ করেন। দারনায় দুদিনের প্রচণ্ড যুদ্ধে ওমর আল-মুখতারের অসাধারণ রণকৌশলের কাছে ইতালিয়ানরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। তারা তাদের কামান, অস্ত্রশত্র এবং গাড়ি-ঘোড়া ফেলে পালিয়ে যায়। দখলকৃত অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ওমরের বাহিনী নব উদ্যমে ইতালিয়ানদের বিভিন্ন ক্যাম্পে গেরিলা আক্রমণ চালাতে শুরু করে। ধূসর মরুভূমির দিগন্ত ভেদ করে হঠাৎ করে তারা আবির্ভূত হতো, তাদের গেরিলা আক্রমণে হতভম্ভ ইতালিয়ানরা নিজেদেরকে গুছিয়ে ওঠার আগেই আবার তারা নিরুদ্দেশ হয়ে যেতো।

১৯২৪-২৫ সালে কয়েকটি যুদ্ধে ওমর আল-মুখতারের বাহিনী ইতালিয়ানদের হাতে পরাজিত হলেও, শীঘ্রই তিনি তার রণকৌশলে পরিবর্তন আনেন। ১৯২৭-২৮ সালের দিকে ওমর সেনুসি যোদ্ধাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পুনর্গঠিত করেন। তিনি বিভিন্ন এলাকায় পৃথক পৃথকভাবে যুদ্ধরত দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় স্থাপন করেন। তারা অকস্মাৎ ইতালিয়ান বাহিনীর বিভিন্ন চেকপয়েন্টে, তাদের রসদ বহনকারী গাড়ির বহরে এবং তাদের স্থাপিত টেলিগ্রাফ লাইনে আক্রমণ করেই আবার আত্মগোপন করতেন। সে সময়ের ইতালিয়ান জেনারেল তেরুজ্জি ওমরকে ব্যতিক্রমধর্মী, অধ্যাবসায়ী এবং কঠোর ইচ্ছাশক্তির অধিকারী বলে বর্ণনা করেন।

ওমর আল-মুখতারকে গ্রেপ্তার করে লিবিয়ার বিদ্রোহ চূড়ান্তভাবে দমন করার জন্য ইতালির ফ্যাসিস্ট নেতা বেনিতো মুসোলিনি ১৯২৮ সালে রুডলফ গ্র্যাজিয়ানিকে দায়িত্ব দিয়ে লিবিয়াতে পাঠান। গ্র্যাজিয়ানি লিবিয়াতে আসেন এই শর্তে যে, তিনি লিবিয়া শাসনের ব্যাপারে কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন মেনে চলবেন না। বিদ্রোহ দমনের জন্য যা করা প্রয়োজন, তা-ই করবেন।

১৯২৯ সালে শেরিফ আল-গারিয়ানির মধ্যস্থতায় ইতালি কর্তৃক নিযুক্ত লিবিয়ার গভর্নর পিয়েত্রো বাদুলিও ওমর আল-মুখতারের সাথে একটি বৈঠকে বসেন। প্রথমে তিনি তাকে প্রস্তাব দেন যে, যুদ্ধ বন্ধ করলে তাকে সরকারি উচ্চপদে দায়িত্ব দেওয়া হবে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ দেওয়া হবে। কিন্তু ওমর রাজি না হওয়ায় তিনি ওমরের সাথে লিবিয়ানদের অনুকূলে যায় এমন কিছু শর্তাবলি সহ শান্তিুচুক্তি স্থাপন করেন। কিন্তু পরবর্তীতে ইতালিয়ানরা এই চুক্তিনামার ধারাগুলো পরিবর্তন করে ফেলে এবং প্রচার করে যে, ওমর আল-মুখতার লিবিয়ার পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। এ সংবাদ শোনার পর ওমর সমঝোতা চুক্তি বাতিল করেন এবং পুনরায় যুদ্ধের ময়দানে ফিরে গিয়ে গ্র্যাজিয়ানির বাহিনীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য প্রস্ততি গ্রহণ করতে থাকেন।

ওমরের সেনুসি যোদ্ধারা যেন মিসর এবং সুদান থেকে কোনো অস্ত্র সাহায্য না পায়, সেজন্য গ্র্যাজিয়ানি লিবিয়ার সীমান্ত বরাবর প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করেন। স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে পাওয়া সাহায্য বন্ধ করার জন্য তিনি পুরো লিবিয়া জুড়ে বিশাল বিশাল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প স্থাপন করেন এবং জাবাল আল-আখদারের প্রায় সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীকে এসব ক্যাম্পে স্থানান্তর করেন। প্রচণ্ড অত্যাচারে এবং অনাহারে এসব কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের এক লাখ বন্দীর প্রায় অর্ধেকই মৃত্যুবরণ করে।

গ্রেপ্তার, বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড

১৯৩১ সালের শুরু থেকেই গ্র্যাজিয়ানির নেওয়া কঠোর পদক্ষেপগুলো ওমরের নেতৃত্বাধীন মুজাহিদ বাহিনীর উপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তাদের খাবার-দাবার এবং অস্ত্রশস্ত্রের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তাদের উপর বিমান হামলা অব্যাহত থাকে। স্থানীয় রাজাকারদের সাহায্যে ইতালিয়ানরা তাদের অবস্থানের সংবাদ পেয়ে তাদের উপর উপর্যুপরি আক্রমণ করতে থাকে।

ওমর আল-মুখতার প্রতি বছরই অন্তত একবার তার নিজের প্রতিরোধ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে অন্যান্য প্রতিরোধকেন্দ্রগুলোতে যেতেন তাদের অবস্থা পরিদর্শনের জন্য। তাদের সাথে প্রতিবারই শতাধিক যোদ্ধা থাকত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু গ্র্যাজিয়ানির আক্রমণে পরিস্থিতি দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছিল। তাই ১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বরে মাত্র ৪০ জন সঙ্গী নিয়ে যাত্রা শুরু করেন ওমর। ১১ সেপ্টেম্বরে তারা যখন আল-বেইদার নিকটবর্তী জাবাল আল-আখাদরের সোলোন্তা নামক এলাকায় একটি খাল পার হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন স্থানীয় আরব রাজাকারদের কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে ইতালিয়ান বাহিনী তাদেরকে চারদিক থাকে ঘিরে ফেলে এবং তাদের উপর আক্রমণ শুরু করে।

যুদ্ধে ওমর আল-মুখতারের ঘোড়া আহত হলে তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যান। উঠে দাঁড়ানোর আগেই এক সৈন্য তাকে দেখে ফেলে। সে ওমরকে চিনতে না পেরে তাকে গুলি করতে উদ্যত হয়, কিন্তু আরেকজন সৈন্য নাম জিজ্ঞেস করলে ওমর যখন নিজের পরিচয় দেন, তখন তারা তাকে ঘিরে ফেলে। যুদ্ধে আহত ৭৩ বছর বয়সী এ বৃদ্ধকে ইতালিয়ানরা হাতে-পায়ে ভারী শিকল পরিয়ে বন্দি করে নিয়ে যায়।

ওমরের বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড প্রত্যক্ষ করার জন্য জেনারেল গ্র্যাজিয়ানি রোম থেকে ছুটে আসেন। তিনি ওমরকে জিজ্ঞেস করেন, তারা আসলেই ইতালির মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করার আশা করত কিনা। উত্তরে ওমর বলেন, “যুদ্ধ করাটা আমাদের কর্তব্য, আর বিজয় আসবে আল্লাহ্‌র কাছ থেকে।”

বন্দী ওমর আল-মুখতারকে দেখে ইতালিয়ান কর্মকর্তারা অবাক হয়ে যান। তারা ভেবেছিলেন ওমর হয়তোবা শক্ত-সমর্থ মাঝবয়েসী এক ব্যক্তি। কিন্তু তারা দেখতে পান, যে দুর্ধর্ষ যোদ্ধার হাতে তাদের বিশাল বাহিনী বারবার পর্যুদস্ত হয়েছে, তিনি সত্তোরোর্ধ এক বৃদ্ধ, বার বার যুদ্ধে আঘাত পেয়ে যার শরীর ছিল জর্জরিত, বেশ কিছু হাড় ছিল ভাঙ্গা। কিন্তু তার কণ্ঠ ছিল দৃঢ়, ব্যক্তিত্ব ছিল আকর্ষণীয়। জেনারেল গ্র্যাজিয়ানি ওমরের বর্ণনা দেন এভাবে যে, তিনি ছিলেন মাঝারি উচ্চতার, বলিষ্ঠ গড়নের, সাদা চুল এবং দাড়ি-গোঁফ বিশিষ্ট। তার চেহারায় ছিল বুদ্ধিদীপ্ততা, তিনি ছিলেন ধর্মীয় বিষয়ে জ্ঞানী। তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাসী, নিঃস্বার্থ এবং আপোষহীন। তিনি ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেনুসি নেতাদের একজন, অথচ অত্যন্ত দরিদ্র।

ইতালিয়ানরা ওমরের জন্য এক প্রহসনমূলক বিচারের আয়োজন করে। মাত্র তিন দিনের মধ্যে তার বিচার সম্পন্ন করে তারা তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। রায় শুনে ওমর আল-মুখতার পবিত্র কুরআন শরিফ থেকে উচ্চারণ করেন, “নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহ্‌র জন্য, এবং তার কাছেই আমরা ফিরে যাব।”

১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর, বুধবার, বেনগাজীর নিকটবর্তী সুলুক শহরে ওমর আল-মুখতারের ফাঁসির আয়োজন করা হয়। লিবিয়ানদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য ইতালিয়ানরা প্রায় ২০,০০০ মানুষকে ফাঁসির ময়দানে উপস্থিত করে। সকাল নয়টার সময় প্রকাশ্য ময়দানে জনসমক্ষে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। শহীদ হন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম এক বীর যোদ্ধা, যিনি পরাজয় নিশ্চিত জেনেও অন্যায়ের কাছে কখনও মাথা নত করেননি। ৭৩ বছর বয়সে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত যিনি লড়ে গেছেন দখলদার বাহিনীর হাত থেকে নিজের দেশকে মুক্ত করার জন্য।

ওমর আল-মুখতারের স্মরণীয় গাঁথা

ওমরকে ফাঁসি দেওয়ার মধ্য দিয়ে ইতালিয়ানরা সেনুসি আন্দোলন এবং লিবিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম দমন করতে সক্ষম হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতিহাস ওমরের নামই শ্রদ্ধা সহকারে স্বর্ণের অক্ষরে লিখে রেখেছে। গ্র্যাজিয়ানি সহ ইতালিয়ান জেনারেলদের নামই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গ্র্যাজিয়ানি সহ অনেকেরই যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচার এবং শাস্তি হয়েছে। অন্যদিকে ওমর আল-মুখতার পরিণত হয়েছেন শুধু লিবিয়া না, পুরো আরব এবং মুসলিম বিশ্বের সংগ্রামের প্রতীকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫১ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় লিবিয়া যখন ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে, তখন লিবিয়া যুক্তরাজ্যের রাজা হিসেবে অধিষ্ঠিত হন ইদ্রিস আল-সেনুসি। কিন্তু ইদ্রিসের শাসনামলে ওমর আল-মুখতারের অবদানকে যথেষ্ট সম্মান করা হয়নি। ১৯৬৯ সালে এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যখন তরুণ ক্যাপ্টেন মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফী ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি পুনরায় ওমর আল-মুখতারকে জাতীয় বীর হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরেন।

গাদ্দাফী ক্ষমতা দখল করেন ১ সেপ্টেম্বর। কিন্তু তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে প্রথম ভাষণ দেন ১৬ সেপ্টেম্বর, ওমর আল-মুখতারের শাহাদাত দিবসে। এবং ভাষণটি তিনি দিয়েছিলেন বেনগাজীতে ওমর আল-মুখতারের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে। গাদ্দাফী ওমর আল-মুখতারের ইতালি বিরোধী যুদ্ধের নেতৃত্বকে জনগণের সামনে তুলে ধরার মাধ্যমে নিজের পশ্চিমাবিশ্ব বিরোধী অবস্থানকে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন।

ওমর আল-মুখতারের নাম লিবিয়ার প্রতিটি জায়গায় ছড়িয়ে আছে। লিবিয়ার ১০ দিনারের নোটে তার ছবি আছে। আল-বেইদাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে তার নামে। এছাড়াও ত্রিপলী সহ বিভিন্ন স্থানে তার নামে বিভিন্ন রাস্তা, গ্রাম এবং মসজিদের নাম আছে। শুধু লিবিয়া না, ওমর আল-মুখতারের নামে রাস্তা আছে মিসর, তিউনিসিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, জর্ডান, ফিলিস্তিন সহ আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাতেও ওমর আল-মুখতারের নামে একটি মসজিদ আছে।

গাদ্দাফীর উদ্যোগে সিরীয়-আমেরিকান পরিচালক ওমর আল-মুখতারের শেষ বছরগুলো নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ‘লায়ন অফ দ্য ডেজার্ট’ নামে এ চলচ্চিত্রটি আরব বিশ্বে ক্লাসিক হিসেবে পরিচিত হয়। ২০১০ সালে গাদ্দাফী যখন ইতালি ভ্রমণে যান, তখন তিনি ঔপনিবেশিক ইতালির লিবিয়ার উপর শোষণের প্রতিবাদ হিসেবে ওমর আল-মুখতারের বন্দী অবস্থায় শিকল পরা ছবিটি তার জামার বুকে ধারণ করেন। ইতালির প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বার্লুসকোনি সে সময় ইতালির অতীতের ভূমিকার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

২০১১ সালে গাদ্দাফী বিরোধী বিদ্রোহ শুরু হলে বিদ্রোহীরা ওমর আল-মুখতারের ছবি ব্যাপকভাবে তাদের প্রচারণায় ব্যবহার করে। ওমর আল-মুখতারের একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল “নাহনু লান্‌ নাস্তালেম; নান্‌সোর, আও নামুত” অর্থাৎ, “আমরা আত্মসমর্পণ করব না, আমরা বিজয় লাভ করব, অথবা মৃত্যুবরণ করব।” বিদ্রোহের সময় উক্তিটি বিদ্রোহীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এই উক্তি সহ ওমর আল-মুখতারের ছবি সম্বলিত ব্যানার এবং বিলবোর্ডে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো ছেয়ে যায়। এ সময় ওমর আল-মুখতারের একমাত্র জীবিত বংশধর, তার ছেলে মোহাম্মদ আল-মুখতারও বিদ্রোহীদের পক্ষে তার সমর্থন ব্যক্ত করেন।

গাদ্দাফীর মৃত্যুর পর লিবিয়ার পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত সহ সবকিছু আমূল পরিবর্তিত হয়ে গেলেও ওমর আল-মুখতারের প্রতি লিবিয়ানদের শ্রদ্ধা আগের মতোই আছে। তিনি সকল প্রকার রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে। যতদিন লিবিয়া থাকবে, যতদিন আরব বিশ্ব থাকবে, যতদিন বহিঃশক্তির আগ্রাসন এবং তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম থাকবে, ততদিন পর্যন্ত ওমরের স্মৃতি মানুষের হৃদয়ে অটুট থাকবে।

সেনুসিদের নেতা মোহাম্মদ আল-মাহদি আস্‌-সেনুসি ওমর আল-মুখতার সম্পর্কে ঠিকই বলেছিলেন, “বিশ্বে নির্যাতিত মুসলমানদের বিজয়ের জন্য ওমরের মতো শুধু দশ জন নেতা দরকার।”

https://l.facebook.com/l.php?u=https%3A%2F%2Froar.media%2Fbangla%2Fmain%2Fbiography%2Flion-of-the-desert-omar-al-mukhtar%2F&h=AT3yN3JPWB8pA2DfLFsWxLupVH_sjJBgaynR2bSoNum0t6YcOXlbD5rHJ-BZudmDIYA0-b8nFmA_MS5URqd_f2y4a5GGWTKP5GcVyazcYn2FV1ZYYRVRKlZrUlssb4HMGe4ixrgksfRUJVE&s=1

শায়খ মতিউর রহমান মাদানীর চক্র

তিনি যখন অনলাইনে এলেন, সাঈদী নিয়ে কথা বললেন, জামায়াতের বিরুদ্ধে অগ্নি উদ্গীরণ করলেন, বাংলাদেশের আপামোর উলামায়ে কিরাম নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের হাড়ি বাজালেন, তখন আমি একজন গুণমুগ্ধ শ্রোতা মাত্র। দু’ বছরের মধ্যে দেখলাম আমার সতীর্থরা সবাই শিবির ও জামায়াতের ভীষণ ও তীর্যক সমালোচক হলেন, এবং তথা কথিত এই দুষ্ট চক্রের একনিষ্ঠ মুক্বাল্লিদ হয়ে গেলেন। যারা ক’দিন আগে জামায়াতের পক্ষে হয়ে তাগুতের বিরুদ্ধে জান দিতে প্রস্তুত ছিলেন, তারাই হয়ে গেলো এখন এই মাদানী সাহেবের একটু সমালোচনা হলেই অনলাইনে সমালোচনাকারীকে মুন্ড কাটা সীমার।
আমি এই মাদানীদের চিনি। এদের মূল গুলোকে দেখেছি কাছে থেকে। ফলে আমার খুব কষ্ট লেগেছে যখন এদের দিয়ে বাংলাদেশের দ্বীনী আন্দোলন ধ্বংশ করে তার স্তুপ থেকে সেক্যুলারদের চারাগাছে সার সহ পানি ঢালা হচ্ছে।
১৯৮৮ এর দিকে হঠাৎ শুনলাম মাওলানা আব্দুল মতীন আব্দুর রহমান আস সালাফী বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। তিনি ছিলেন পশ্চিম বংগের মানুষ এবং এই শায়খ মতিউর রহমান মাদানীর পরিবারের তিনি মুরুব্বি। তিনি মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করে সাউদী সরকারের দায়ী ইলাল্লাহর চাকুরি নিয়ে বাংলাদেশের নামকরা মাদ্রাসা তা’মীরুল মিল্লাতে পড়াতেন বিনা বেতনে। খুব ভালো আলিম ছিলেন তাতে কেও সন্দেহ করবেনা, তবে তাকে পাঠানো হয়েছিলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মারাত্মক ষড়যন্ত্রের বীজ বপন করতে। সে বীজটা ছিলো ভারতের র’ এর কিছু কাজের ধর্মীয় সাপোর্ট দিতে। তিনি পাগল ছিলেন না, কোথায় কিভাবে কাজ করতে হবে তা নিখুঁত ভাবে করে যেতে থাকলেন। তিনি তিনটি কাজ অত্যন্ত সফল ভাবে দেখাতে সক্ষম হনঃ
১। বাংলাদেশ আহলে হাদীসকে কার্যত দ্বিখন্ডিত করে শুব্বান বা যুব সংঘের ধারাকে বেগবান করে একদিকে ডঃ আসাদুল্লাহিল গালিবের নেতৃত্বে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক শুব্বান গ্রুপ তৈরী করেন, অন্য দিকে তার বন্ধু ও সাগরেদ শায়খ আব্দুর রহমান কে সামনে নিয়ে তৈরী করেন জামায়াতি আদলে একটা আন্দোলনী গ্রুপ যারা রাস্ট্র ক্ষমতা দখলের চেষ্টায় জামায়াতে ইসলামির বিকল্প শক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
২। যেহেতু সাউদী সরকারের মৌলিক ঝামেলা ছিলো এই সব ইসলামি আন্দোলনের সাথে। না পারতেছিলো তাদের অর্থায়ন করে তাদের বাগে আনতে, আর না পারতেছিলো তাদের ইগনোর করে ইরানী ও সুফী চেতনার বিপরীতে তাদের হেল্প পায়ে ঠেলতে। কাজেই আব্দুল মতিন সালাফীরা যখন এই মোর্চা শক্তিশালী করে তোলে, তারা সাঊদীদের কাছে প্রমান করতে পারে তারাই হবে জামায়াতের বিকল্প। এ করতে যেয়ে ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে তারা সাউদী আরবের জামায়াতের অর্থায়ন কারীদের কাছে সাঈদী সাহেবের ভিডীও দিখিয়ে বুঝাতে সক্ষম হয় এই সব জামায়াতী আলিমরা বেদআতী। এবং ১৯৯১ সালেই সরকারের পক্ষ থেকে সাঈদী সাহেবের যে ক্যাসেট সাউদী সরকার বাংলাদেশি হাজিদের নিকট বিলি করতে সিদ্ধান্ত নেয় তা এদের প্রচারণায় বন্ধ হয়। ঐ একই বছর তারা গোলাম আযমের ক্যসেট ও সংবাদ মাধ্যমে দেয়া তার এক বিবৃতি সাউদী নীতি নির্ধারণীদের হাতে পৌঁছাতে সক্ষম হয় যাতে গোলাম আযম সুস্পষ্ট বলেছিলেনঃ “জামায়াত ক্ষমতায় গেলে হানাফী ফিক্বহ অনুযায়ী দেশ চালাবে”। এতে তারা জামায়াত যে খাঁটি ইসলামি দল নয় বরং একটা মুতাআসসিব হানাফী দল তা প্রমান করতে সক্ষম হয়।
৩। যে মাওলানা ইউসুফ ও তার অফিস দারুল আরাবিয়্যাহ ছিলো আরব ডোনার ও বুদ্ধিজীবিদের আস্থার স্থল। তা নড়বড়ে করে দিয়ে আব্দুল মতিন সালাফীরা হয়ে ওঠেন অনেক আস্থা ভাজন।
শায়খ আব্দুল মতিন সালাফীর এই উত্থান ডঃ আব্দুল বারী গ্রুপ ভালো ভাবে নেয়নি। কারণ ডঃ আব্দুল বারী ছিলেন গোলাম আযম সাহেবের আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু, এতে করে জমইয়্যতে আহলে হাদীসের একনিষ্ঠ সমর্থন জামায়াতে ইসলামি লাভ করতো। এবং সে সময় উত্তর বংগই বলা যায় জামায়াতের বেশ বড় জন সমর্থন গড়ে ওঠে।
ডঃ আব্দুল বারীর প্রভাব থেকে আহলে হাদীসকে আব্দুল মতিন সাহেব যখন আলাদা করে মিশরের আলনূরের আদলে একটা আন্দোলন সফল ভাবে সম্পন্ন করে ফেলেছেন তখন আব্দুল বারী সাহেব এইটার উদ্দেশ্য বিধেয় নিয়ে জানা বুঝার চেষ্টা করেন। এবং প্রেসিডেন্ট এরশাদের সরকারী সাহায্য নেন। তখন ডঃ বারী সাহেব ছিলেন সম্ভবত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। সরকার এই ব্যপারের খোঁজ নিতে যেয়ে কেঁচো খুড়তে কাল শাপ দেখতে পায়। আব্দুল মতিন সালাফীকে র’ এর বংগভূমি আন্দোলনের এজেন্ট হিসেবে পেয়ে যায়, এবং কয়েক ঘন্টার নোটিসে বাংলাদেশ থেকে বের করে দেয় সরকার। তার বাসার জিনিষ পত্র গুলোরও কোন ব্যবস্থাও তিনি করতে পারেননি।
তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে ছিলেন তবে তার গড়া আন্দোলন দু’টোই হয়ে যায় মিশরের আলনূর সালাফীর মত সুন্দর এক বিকল্প আন্দোলন, যারা জামায়াতের শেকড় উপড়ানোর পেছনে তৎপর হয় মারাত্মক ভাবে। একদিকে ডঃ আসাদুল্লাহিল গালিবের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন ওন্য দিকে শায়খ আব্দুর রহমানের জিহাদী আন্দোলন যখন বিপুল বেগে এগিয়ে যাচ্ছে তখন কাছ থেকে আমরা দেখতে পাই দুটো ভয়াবহ অবস্থা।
১। ব্যাপক সংখ্যক ছাত্ররা তাদের দলে যোগ দেয়, এমন কি দূর্বল মনা ছাত্র শিবিরের অনেক কর্মীদের ও তাদের দলে যুক্ত করে। চিটাগাং ও উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু স্থানে তারা শায়খ আব্দুর রহমান ও বেশ কিছু আফগান ফেরত যোদ্ধা এবং কিছু অজ্ঞাত যোদ্ধাদের মাধ্যেমে সরাসরি অস্ত্র প্রশিক্ষন দিতে থাকে। তাদের কথা ছিলো গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলাম কায়েম সম্ভব নয়, বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে সরাসরি যুদ্ধের মাধ্যমে। ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্টে যে বোমা হামলা সরাসরি প্রত্যক্ষ করি তা এই গ্রুপের, এবং দুঃখের সাথে আমরা লক্ষ্য করি তারা যা বোমা গুলো ব্যবহার করে তা ছিলো ভারতের তৈরি করা।
২। এদের একটা বড় গ্রুপ মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পাঠান আব্দুল মতিন আসসালাফীরা। এই সালাফী সাহেবের বোনের ভাই হলেন তথা কথিত শায়খ মতিউর রহমান মাদানী, এদের দলেই হলো শায়খ আকরামুজ্জামান ও তার আরো তিন ভাই, শায়খ আমানুল্লাহ, শায়খ শাহীদুল্লাহ, শায়খ এনামুল হক ইত্যাদিগণ যারা মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী নিয়ে এক যোগে কাজ করতেন। এমনকি ডঃ আব্দুল বারী সাহেবের আস্থা ভাজন ও জামায়াতের এক কালীন রোকন ডঃ মুসলিহুদ্দীনের মত শায়খগণ ও এই গ্রুপে যোগ দেন। এই গ্রুপ কেই সামনে নিয়ে আসে সালাফীদের নব্য গ্রুপ মাদখালীরা। যারা সকল ইসলামি দল ও গ্রুপ কে ইসলামের শত্রু ও ইসলামের খাওয়ারিজ বলে আখ্যা দেয়। এরাই হয়ে ওঠেন সাউদীর সবচেয়ে বেশি আস্থা ভাজন ব্যক্তিত্ব এবং এদেরকেই নানা মুখি চাকরি দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হয় কাওকে, আর অধিকাংশকে আরব বিশ্বের যেখানে যেখানে বাংলাদেশী আছে সেখানে সেখানে দায়ী ইলাল্লাহ বানায়ে মগয ধোলায়ে সহায়তা করে।
এরা শুধু সাউদী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে তা নয়, সাউদীদের বড় বড় ডোনার যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগে জামায়াতের হাত দিয়ে বা শায়খ ইউনুস কিংবা শায়খা সুলতান যাওক্ব অথবা ডঃ আব্দুল বারীর মাধ্যমে চালাতো, তা একচেটিয়া এদেরকে দেয়া হয়। বিশাল বই ভান্ডার, এমন কি বড় বড় ওয়েব পেইজের সহায়তা এদের জন্য অবারিত হয়ে যায়।
বাংলাদেশে এই কাজে তারা ৪টা সহায়তা পেয়েছে।
১। যেহেতু বাংলাদেশ আওয়ামিলীগের কয়েকজন বড় বড় নেতা ছিলেন আহলে হাদীসের। যেমন ঢাকার মেয়র মোহাম্মাদ হানিফ এবং উত্তর বংগের বেশ কয়েকজন নেতা। এমন কি শায়খ আব্দুর রহমানের শ্যালকও। ফলে এরা আওয়ামিলীগের ছত্র ছায়াকে জামায়াতের বিপরীতে দাঁড়াবার প্লাট ফরম হিসেবে গ্রহন করে। যেহেতু শায়খ আব্দুর রহমান ও ডঃ গালিব কে চার দল শেষ করে বা জেলে পোরে, কাজেই তাদের বিপরীত সরকারই হলো এদের প্রিয় সরকার যাদের বিরোধিতা করা ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক বলে তারা ফতোয়া দেয়। তারা এখন সরকারের কাছে অত্যন্ত সহনীয় মাত্রার।
২। আওয়ামি ঘরাণার ব্যবসায়িক শ্রেনীও এদের প্রিয়পাত্র হেতু তাদের মিডীয়াতে তারা গ্রহনযোগ্য ব্যক্তিত্ব হয়েছেন। ডঃ যাকির নায়েক যখন পীস টিভির বাংলা ভার্সন শুরু করেন, তার চিন্তা ছিলো উর্দু ও ইংলিশের আদলে এটাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। এ্টাকে রাখবেন বিভিন্ন মতের লোকদের মিলন মেলা বানায়ে। কিন্তু তিনি এর দ্বায়িত্বে বসান ভারতের আরেক শায়খ আব্দুর রহমান নামে মদীনা বিশেবিদ্যালয়ের আরেক শায়খকে যিনি ঐ আহলে হাদীসের শুব্বান গ্রুপের শায়খদের বন্ধু ছিলেন। এদেরকেই এই ভারতীয় শায়খ আব্দুর রহমান পীস টিভির প্লাটফর্ম দিয়ে দেন। এবং তাদের রিকমেন্ডেশান পাওয়া শায়খরাই এখানে যেতে পারতেন। এই পীস টিভিতেই সালমান এফ রহমানের মত দাতা গণ শত শত কোটি টাকা দান করে বাংলাদেশের সালাফিয়্যাত প্রসারে সাহায্য করেছেন।
৩। বিগত দশ এগারো বছরে মতিউর রহমান মাদানী সহ একটা সংঘবদ্ধ গ্রুপ জামায়াতে ইসলামীর মর্মমূলে আঘাত করে একে শেষ করার চেষ্টা করেছেন। তারা দুটা বিষয়ে অত্যন্ত সফলতার সাথে পরিস্কার করতেছেন যে, এই জামায়াতে ইসলামি একটা ইসলামি দল নয়, এর গোড়া থেকে শুরু করে সবই খাঁটি ইসলাম থেকে দূরে। কাজেই দল যদি করতেই হয় সহীহ আক্বীদার দলে থাকতে হবে। দুই, যারা জামায়াতের সাথে কাজ করবে তারা আহলুস সুন্নাহ থেকে খারিজ হয়ে কুতুবি, ইখওয়ানি বা খাওয়ারিজ হয়ে গেছে। তাদের এই এক্সট্রীম প্রচারণায় বলীর পাঠা হয় বাংলাদেশ জামায়াতের জনশক্তি। যারা এক দিকে সরকার দ্বারা নিষ্পেশিত। অন্য দিক দিয়ে এই সব শায়খদের দ্বারা নির্যাতিত এবং দেশবাসীর কাছে তাদেরকে সন্দেহের বধ্য ভূমিতে এমন ভাবে তারা রেখেছে যে, এদের হত্যা করাও যেন সওয়াবের কাজ বলে মনে করা হচ্ছে। এই নিকৃষ্ট মানসিকতা তৈরিতে তারা ইবনে যিয়াদের চেয়ে মারাত্মক হিসেবে আবির্ভূত।
৪। বাংলাদেশে ইসলামের প্লাটফর্ম গুলো বন্ধ করা্তে তারা ভূমিকা রেখেছে অনেক। ফলে জামায়াতের বেশ কিছু বুদ্ধিজীবি উলামাকে তারা তাদের দলে ভিড়িয়ে তাদের মতবাদকে প্রচারে বেগ তৈরি করেছে মারাত্মক ভাবে। ডঃ মাঞ্জুরে ইলাহী, ডঃ সায়ফুল্লাহ মাদানী, ডঃ আবু বাকার মুহাম্মাদ যাকারিয়া, মুফতি ইব্রাহীম এরা সবাই জামায়াতের নেতৃস্থানীয় ছিলেন। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি তে তারা এদেরকে সুযোগ করে দিয়ে তাদের সালিফিয়্যাত প্রচারে দারুণ এগিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশকে আরেক মিশর বানানোর সৌদি প্লানের সাথে যুক্ত এই আহলে হাদীস ভায়েরা যেভাবে একটা ইসলামি দলকে শেষ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তা ইতিহাসে বিরল। যে সব মাসআলাতে তারা মাওলানা মাওদূদীকে অমুসলিম বলে তা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। মাওদূদীর চিন্তা দর্শনে যে সব ভুল আছে তা একটাও ইসলাম বিরোধী নয়। তার সময়ের যে সমস্ত উলামায়ে কিরাম যে সব ভুল তার ধরেছেন কোনটাতেই তাকে কাফির বলেননি। তবে তার ভুল ধরা হয়েছে, আর পৃথিবীতে নবী ও রাসূল ছাড়া কেও ভুলের উর্ধে নন। এ সব এই গ্রুপরা ভালোভাবেই জানে। জেনেও তারা এক এজেন্ডা নিয়ে সামনে যাচ্ছে, আমার কথা হলো ঐখানেই। শেরে বাংলা বলতেনঃ আমার কোন কথায় যদি হিন্দু দাদারা সন্তোষ হয়, বুঝবা আমি আমার কওমের সাথে গাদ্দারি করছি।
এখন আমি দেখি এই চক্রের কথায় উপকৃত হলো কারা?

ভারত পুরোটাই যেন এক টুকরো গুজরাট; মানবাধিকার থাকতেও নেই মুসলমানদের!

পুরো ভারত যেন এক টুকরো গুজরাট; মানবাধিকার থাকতেও নেই মুসলমানদের!

ভারত ক্রমেই অসভ্যতার দিকে ধাবমান হচ্ছে। তাদের থেকে মানবিক গুণাবলী হ্রাস পাচ্ছে। উগ্র হিন্দুদের হাতে একের পর এক ধর্মীয় বিদ্বেষের শিকার হচ্ছে সেখানকার মুসলমানরা। সম্প্রতি মুসলিম যুবক তাবরেজ আনসারী’র উপর র্নিমম নির্যাতনের চিত্রটি দেখেছে বিশ্ববাসী। হতবাক হয়ে সবাই দেখেছে একটি উগ্র জাতীর কর্মকান্ড।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী হয়েও সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর শুধুমাত্র ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। বিনা দোষে নিরপরাধ মুসলমানদের নির্যাতনের মাধ্যমে ভারত তাদের হীনমন্যতার পরিচয় দিচ্ছে। এমনটি তারা সেখানে রায়টের পরিবেশ তৈরি করছে। তাদের এই জুলুম-নির্যাতন বন্ধ না হলে সামগ্রিকভাবে যদি উপমহাদেশের রাজনীতিতে কোন বৈরি পরিবেশের সৃষ্টি হয় সেজন্য ভারতকে এর দায়ভার গ্রহণ করতে হবে। ভারতে নির্যাতিত মুসলমানদের বোবা কান্না নতুন নয়। দুর্দশার শেষপ্রান্তে নিক্ষিপ্ত ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে অনুপস্থিত। তাদের বোবা কান্নার আওয়াজ মানবতাবাদীদের কর্ণকুহরে কখনো পৌঁছে না।

দেশটিতে ধর্মীয় সহিংসতা বলতে মূলত মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বোঝানো হয়। ১৯৪৭ সালে ভারতের বিভাজনের সময়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় সহিংসতার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল, প্রায়শই হিন্দু জনতা দ্বারা মুসলমানদের উপর সহিংস হামলার আকারে ছিল, যা সংখ্যাগুরু হিন্দু ও সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার একটি নকশা গঠন করে। ১৯৫০ সালের পর থেকে ১৯৫৪ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ৬৯৩৩ টি ঘটনায় হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ১০,০০০ এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। (সূত্র : উইকিপিডিয়া) যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে।

কেবল ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গায় প্রায় ৫০০০ হাজার মুসলমানদের শহীদ করে দেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিলো। সেই গুজরাট দাঙ্গায় উগ্র হিন্দুরা মুসলমানদের সাথে এমন কোনো অমানবিকতা নেই যা করেনি। মুসলিম নারীদের পেট কেটে ভ্রুণ থেকে সন্তান বের করে খুন করার মতো অমানবিকতাও তারা দেখিয়েছে। প্রায় ১০০০ হাজার নারীকে সে সময় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিলো। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তখনকার গুজরাটের মূখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় এই নারকীয় হত্যাকান্ড চালানো হয়েছিলো।
সেই নরেন্দ্র মোদিই এখন ভারতের প্রধান ক্ষমতায় আরোহন করে আছেন। পুরো ভারত যেন তিনি এক টুকরো গুজরাটে পরিণত করেছেন। ভারতের মুসলমানদের বর্তমান অবস্থা যেন ২০০২ সালের সেই গুজরাটের মতো। তবে কেবল গুজরাটেই নয়; ভারতে মুসলিম নির্যাতনের এই ধারা অব্যাহত ছিলো ধারাবাহিকভাবেই।

ভারতের পুলিশরা ব্যাপকহারে মুসলিম বিদ্বেষী। মুসলমান হত্যায় তারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। ২০০২ সালের গুজরাটে দাঙ্গা তার অব্যর্থ প্রমাণ। ১৯৯৬ সালে ৩১৩ জন মুসলমানকে সিমি সদস্য বলে আটক করা হয়। অথচ তখন সিমির সদস্য সংখ্যা ছিল ১৩২ জন। ভারতের সংবাদ মাধ্যম সংবাদ সংগ্রহ করে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সূত্র থেকে।
সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ বলা হয় সাংবাদিক প্রবীণ স্বামীকে। এদের প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয় হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বভাবত তা হয়ে ওঠে ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী।

২০০৬ সালে সাচার কমিটির রিপোর্টে বলা হয়, পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্য আইনজীবীর অভাবে ভুগছেন মুসলিম জনগণ। সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের ওপর অবৈধ পন্থায় বর্বর নির্যাতনের সংবাদ মাধ্যমে কোনোকালে ফুটে ওঠে না। সন্দেহভাজনদের জন্য টর্চার সেল কায়েম করা হয়। আইনবহির্ভূত কয়েদখানা তৈরি হয় তাদের জন্য। পুলিশ এনকাউন্টারের নামে তাদের হত্যা করা হয়। বেআইনী পুলিশ বর্বরতায় সাক্ষ্য-প্রমাণ লোপাট করে দেয়া হয়। এভাবেই বেপরোয়া হত্যা-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন ভারত জুড়ে নির্দোষ মুসলিম জনগণ শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে। কথিত মুসলিম সন্ত্রাসীদের নিয়ে ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সংবাদ মাধ্যমে গল্প রচনার জোয়ার দেখা দিয়েছে। অথচ ভারতের আনাচে-কানাচে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গণমাধ্যমে সেসব নির্যাতনের কোনো চিত্র পাওয়া যায় না। তারপরও আলোচিত কিছু ঘটনার দ্বারা বিশ্বব্যাপী মানুষরা বুঝতে পেরেছে ভারতের মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের ভয়াবহতা। তেমন কয়েকটি ঘটনা উল্ল্যেখ করা হলো ;
(১) মে ২০০৮-এ ১৪ বছরের এক মুসলিম কিশোরকে তুলে নিয়ে যায় গুজরাট পুলিশ। বন্দুকের ডগায় গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়ে বন্দি-শিবিরে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। ছেলেটির মায়ের দরখাস্তে সাড়া দিয়ে কোর্ট তার মুক্তির আদেশ দেয় এবং দশদিন পর ওই কিশোর মুক্তি পায়। আদালতে মোকদ্দমা এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে ভয়াবহ পরিণতি ভুগতে হবে বলে ছেলেটির পরিবারকে পরে পুলিশ শাসিয়ে দেয়। ভারতীয় আইনজীবীরা মুসলিমদের পক্ষে মোকদ্দমা চালাতে প্রায়শই ইতস্ততঃ করেন। অবলম্বনহীন একটি জনসম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়।
(২) কর্ণাটক রাজ্যের সালেগাঁওয়ে একটি মুসলিম কবরস্থানে ২০০৬ সেপ্টেম্বরে বিস্ফোরণে নিহত হয় ৩৫ ব্যক্তি। হত্যাকান্ডের দোষ সংবাদ মাধ্যম মুসলমানদের ঘাড়ে চাপায়। হায়দরাবাদের মক্কা মসজিদে বোমা বিস্ফোরণে মারা যান ১০ জন মুসলমান। প্রবীণ স্বামী নির্বিচারে দোষ চাপিয়ে দেয় কথিত মুসলিম সন্ত্রাসীদের ওপর। ভারতীয় শহরগুলো ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীদের খপ্পরে চলে গেছে- এমন মন্তব্যও ছড়িয়ে দেন প্রবীণ স্বামী। কিন্তু পরবর্তীতে তদন্তে প্রকাশ পায় সালেগাঁওয়ে ও মক্কা মসজিদে হামলা চালিয়েছিলো উগ্র হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদীরা।
(৩) তাবরেজ আনসারী নামের ২৪ বছরের এক মুসলিম যুবক, ভারতের বনাখন্ডের জামশেদপুরের খার সাওয়ান্দ সারাই বেলাতে তার নিবাস। ‘স্থানীয়রা রোববার চোর সাব্যস্ত করে ওই যুবককে। তাকে বেদম মারপিট করা হয়। এরপর তাকে রোববার সকালে ভর্তি করা হয় সদর হাসপাতালে। সেখান থেকে তাকে স্থানান্তর করা হয় জামসেদপুরের টাটা মেইন হাসপাতালে। তার পরিবারের দাবি, তার ওপর যে হামলা হয়েছে তা সাম্প্রদায়িক। তাকে জয় ‘শ্রী রাম’ এবং ‘জয় হনুমান’ স্লোগান দিতে বাধ্য করা হয়েছে। পরিবার আরো বলছে, কিছু মানুষ তাবরেজকে প্রচন্ড মারপিট করে। পরে তাকে তুলে দেয় পুলিশে। চুরির সন্দেহে তার সঙ্গে এমন আচরণ করা হলেও সে সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার। তাকে মরপিট করা হয়েছে সে একজন মুসলিম বলে।“বারবার তাবরেজকে ‘জয় শ্রীরাম’ ও ‘জয় হনুমান’ স্লোগান দিতে বাধ্য করা হয়েছে। তাকে হাসপাতালে দেখতে যেতে চাইলেও আমাদের (আত্মীয়দের) অনুমতি দেয়া হয়নি।
“ভিডিওতে দেখা গেছে, তিনি কাতর কণ্ঠে বলতে থাকেন, আমার মা মারা গেছেন। তার নামে শপথ করে বলছি, আমি এমন কাজ করিনি।”
(৪) “একটি মাইক্রোবাস থামিয়ে নিরীহ একজন দাড়ি-টুপিওয়ালা লোককে সাম্প্রদায়িক যুবকরা চর-থাপ্পর মারছে। বলছে, বল, জয় শ্রীরাম। লোকটি প্রাণের ভয়ে ভয়ে ‘শ্রী রাম’ বললেও কিল, চড় ও গালি থামছে না। অপর এক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেখানে সত্তর বছরের এক বৃদ্ধকে এমনভাবে সাম্প্রদায়িক যুবকরা মারধোর করছে যেমনটি মানুষ সন্ত্রাসী চোরকেও করে না। একপর্যায়ে রক্তাক্ত ও আহত এ বৃদ্ধকে শূকরের মাংস খেতে বাধ্য করা হয়।’
(৫) “ত্রিপুরায় সবচেয়ে ধনী মুসলমানের বাড়িটিকে শত শত সাম্প্রদায়িক লোক লুটপাট করে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। প্রতিদিন বহু বাড়িঘর ও দোকান হয় জ্বালিয়ে দেয় হচ্ছে, নয়তো ভেঙে তছনছ করে দেয়া হচ্ছে। দু’তিনজন শ্রমিক শ্রেণীর লোককে বিজেপির কর্মী, আরএসএস এবং বজরাঙ্গী ইত্যাদি নামধারী কিছু যুবক নির্মমভাবে জুতাপেটা, কিলঘুষি, লাথি এমন কি লাঠিপেটা করছে। তাদের অপরাধ- এসব হতদরিদ্র ভুখা নাঙ্গা শ্রমিকরা নাকি গরুর গোশত খেয়েছে।’ (সূত্র : ইনকিলাব)
দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার বরাতে লেখা হয়েছে- “ভারতের গত নির্বাচনের বহু আগ থেকে যে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা কিছু নেতা সৃষ্টি করেছিলেন নির্বাচনের পরেও তা যথারীতি চলছে। ….এসব নেতার ইঙ্গিত আছে বলেই পরিস্থিতি নির্বাচন চলে যাওয়ার এত পরেও শান্ত না হয়ে দিন দিন বরং আরও উত্তপ্ত হচ্ছে।’ স্যোশাল মিডিয়ায় দেখবেন, কোনো মুসলিম বাড়িতে বজরং দল কিংবা আর এস এস নামধারী যুবকরা প্রবেশ করে বাড়ির নারী-পুরুষ-শিশুকে নির্মমভাবে পেটাচ্ছে। ঘরের দরজা এঁটে দিনে-দুপুরে শ্লীলতাহানি করছে নারীদের। ঠিক গুজরাতের নৃশংসতার মতো, সেখানে হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল। মুসলিম এমপিকে তাঁর বাসায় গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক গুন্ডারা প্রকাশ্যে রাজপথে মুসলিম নারীদের ধর্ষণ করে। নিজেদের লোক দিয়েই ভিডিও ধারণ করেছিল। আজকের প্রধানমন্ত্রী মোদি তখন গুজরাটের দায়িত্বে ছিলেন। যে পুলিশ কর্মকর্তা গুজরাটের ঘটনার জন্য দায়ীদের চিহিৃত করে রিপোর্ট দিয়েছিলেন তিনি এখন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি।”
‘আমরা ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র দাবি করি’। আমাদের কথা ভারতের বিরুদ্ধে নয়, ভারতের মুসলমানদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন তাদের ধর্মীয় অধিকার মানবাধিকার দলন, হরণের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি ভারত সফরে এসে দেশটিতে সংখ্যালুদের উপর নির্যাতন ও সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও। তিনি বলেন, ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে আপস করা মানে বিশ্বকে খারাপ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া। ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে দেয়া পম্পেওর এই বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কারণ গত সপ্তাহে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বার্ষিক আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা শীর্ষক রিপোর্টে বলা হয়, ভারতে বিশেষত মুসলমানরা চরমপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। গরুর মাংস খাওয়া ও রাখা নিয়েও হিংসার বলি হতে হচ্ছে তাদের। এই পরিস্থিতিতে ভারতের অন্যতম বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিবের এই বার্তা হালকা করে নেয়ার কোন সুযোগ নেই। যদিও, রিপোর্ট প্রকাশের পরই ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল।
আর এবার পম্পেও খোদ ভারতে এসে ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলে বুঝিয়ে দিলেন, ভারত ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও ধর্মীয় সহিংসতার বিষয়ে তারা কঠোর অবস্থানেই থাকবেন। পম্পেওর এর এই বক্তব্যকে আমরা সাধূবাদ জানাই। তার কথায়, ‘বিশ্বের ৪টি বহুল প্রচলিত ধর্মের জন্মভূমি ভারত। আসুন সবাই মিলে ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে একজোট হই। সবাই মিলে ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য উঠে দাঁড়াই। না হলে এ বিশ্ব সুন্দর থাকবে না।’
প্রতিবেশি এই রাষ্ট্রটির জন্য আরেকটি ভয়ানক তথ্য হলো নারীর জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান। ভারত যে ক্রমেই মানুষ বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে এর প্রমাণ হলো : “নারীর জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ভারত’’ সংবাদটি। নারীর জন্য বিপজ্জনক দেশের তালিকায় সবার উপরে রয়েছে দেশটি। সম্প্রতি নারীর জন্য বিপজ্জনক ১০টি দেশের তালিকা প্রকাশ করেছে লন্ডনভিত্তিক চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান থমসন রয়টর্স ফাউন্ডেশন। ছয়টি মানদণ্ড নির্ধারণ করে জাতিসংঘের ১৯৩ দেশে এই জরিপ চালনো হয়। এশিয়ার ছয়টি, আফ্রিকার তিনটি এবং উত্তর আমেরিকার একটি দেশের নাম তালিকায় আসে। জরিপে এ বছরের ২৬ মার্চ থেকে ৪ মে পর্যন্ত পৃথিবীজুড়ে নারীদের পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা মোট ৫৪৮ জন বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। অনলাইনে, ফোনে এবং সরাসরি কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
যেসব বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছে তারা দীর্ঘ দিন থেকে ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া এবং প্রশান্ত এলাকায় নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। এদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষক, সরকারের নীতি-নির্ধারক, স্বাস্থ্যকর্মী, এনজিও কর্মী, উন্নয়ন ও সহায়তাকর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধি।জরিপে মানদন্ডগুলো ছিল— স্বাস্থ্যসেবা; অর্থনৈতিক অবস্থান বা সম্পদের পরিমাণ; সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী কাজে অংশগ্রহণ; যৌন সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন; সহিংসতা (যৌন নির্যাতন ছাড়া) ও মানবপাচার। বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নারীদের জন্য সবচেয়ে বিপদজনক দেশ ভারত। এখানে নারীদের ওপর সবচেয়ে বেশি যৌন নির্যাতন হয়। ক্রীতদাস হিসেবে নারীর ব্যবহারও এখানে বেশি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নারীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি যৌন সহিংসতা।
২০১২ সালের নির্ভয়া কাণ্ডের কথাই মনে করিয়ে দেয় নারীর জন্য কতটা বিপদজনক এই দেশটি। ২৩ বছরের তরুণীকে রাতে বাসে একা পেয়ে চালক এবং অন্যান্য যাত্রীরা ধর্ষণের পর হত্যা করে। নারীর প্রতি অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলেছে দেশটিতে।
সরকারি হিসাব অনুয়ায়ী, ২০০৭ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত নারীর সঙ্গে হওয়া অপরাধের মাত্রা আগের বছরগুলোর তুলনায় শতকরা ৮৩ ভাগেরও বেশি বেড়েছে। যার অর্থ দাঁড়ায়, এই বছরগুলোতে ভারতে প্রতি ১৫ মিনিটে একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ভারতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বিপক্ষে সচেতনতা বাড়লেও খুব একটা লাভ হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর কারণ হলো প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা বদ্ধমূল নানা প্রথার চর্চা। এসবের মধ্যে রয়েছে কন্যা শিশুহত্যা, গৌরি দান, যৌনদাসত্ব, পারিবারিক ক্রীতদাসত্ব বা অধীনতা, মানবপাচার এবং সাম্প্রদায়িক হত্যা।
ভারতের নির্যাতিত নিপিড়িত মুসলমানদের পাশে দাড়ানো দায়িত্ব আমাদের। রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের সোচ্চার হওয়া উচিত ভারতের এই অন্যায় অবিচার ও মুসলমানদের মানবাধিকার লঙ্ঘণসহ ধর্মীয় স্বাধীনতা বিনষ্ট করার বিপরিতে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘ইন্নামাল মুমিণূনা ইখ্ওয়াহ-ফআস্লিহু বাইনা আখ্ওয়াইকুম’ (মুসলমানরা পরস্পরে ভাই ভাই। তোমরা তোমাদের ভাইদের পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ্য স্থাপন করে দাও) বিশ্বনবী (সা.) বলেন, মুসলমানরা পরস্পরে ভাই। সে তার প্রতি জুলুম করবে না এবং তাকে শত্রুর নিকট সমর্পণ করবে না। যে মুসলিম অপর মুসলিম ভাইয়ের বিপদ-দূর করার চেষ্টা করে আল্লাহতায়ালা তার বিপদ দূর করে দেন। যে মুসলিম অপর কোন মুসলিম ভাইয়ের একটি কষ্ট দূর করে দেন আল্লাহপাক কিয়ামতের কষ্টসমূহের তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। (বুখারী ও মুসলিম)
প্রিয়নবী (সা.) আরও বলেন, দুনিয়ার মুসলমান মিলে একজন মানুষের মত। যদি তার চক্ষু যন্ত্রণাপ্রাপ্ত হয় তবে তার সর্বশরীর যন্ত্রণা প্রাপ্ত হয়। এরূপ যদি তার মাথা আক্রান্ত হয় তবে তার সর্বশরীর যন্ত্রণায় অধীর হয়। অর্থাৎ দুনিয়ার প্রায় দুইশ কোটি মুসলমান কেবলমাত্র একটি জাতি, মিল্লাত বা উম্মাহ নয়। সবমিলে একটি দেহ। এই দেহের কোন একটি অঙ্গ যদি আঘাত প্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ দুনিয়ার কোথাও একটি মুসলমানও যদি আক্রান্ত হয়, আঘাত প্রাপ্ত হয় তবে দুনিয়ার প্রতিটি মুসলমানেই সে যন্ত্রণা অনুভব করবে এবং সেই যন্ত্রণা, সেই কষ্ট দূর করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। যতক্ষণে না সেই যন্ত্রণা দুরীভূত হয় সে চেষ্টা চালিয়ে যাবে। অব্যাহত রাখবে। এই হলো মুসলমানের সংজ্ঞা বা পরিচয় প্রশ্ন হল সেই পরিচয় আমরা কি দিতে পারছি।’ যেখানে আমাদের ভাইয়েরা লাঞ্ছিত হচ্ছে, অপমানিত হচ্ছে, মার খাচ্ছে, খুন হচ্ছে, প্রাণ হারাচ্ছে, আমাদের মা বোনরা নরপিচাশদের হাতে নিগৃহিত হচ্ছে, আব্রু ইজ্জত হারাছে, ধর্ষণ, গণধর্ষনের শিকার হচ্ছে। তা প্রতিহত করার জন্য উম্মাহ হিসাবে আমরা কি সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করছি? এ সমস্যা ও প্রশ্ন দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে যা ঘটছে তাতে আবার নতুন করে এ জিজ্ঞাসা তীব্র আকারে সম্মুখে এসেছে।

হজ্জ্বে নিয়মাবলী

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি পবিত্র হজ। ইসলাম ধর্মে হজ পালনে সামর্থ্যবান মুসলমানদের উপর অন্তত একবার হজকে ফরজ করা হয়েছে। তাই প্রতিবছর জিলহ্বজ মাসে পবিত্র মক্কায় লাখ লাখ মুসলমান হজ পালন করে থাকেন। কিন্তু অনেকেই হজ পালনের সঠিক নিয়ম কানুন জানেন না। ফলে সৌদি আরবে হজ করতে গিয়ে অনেকেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। তাই জেনে নিন পবিত্র হজ পালনের সঠিক নিয়ম।

১। হজ কি?

হজ আরবি শব্দ। অর্থ নিয়ত করা, দর্শনকরা, সঙ্কল্প করা, এরাদা করা, গমনকরা, ইচ্ছা করা, প্রতিজ্ঞা করাসহ কোনো মহৎ কাজে ইচ্ছা করা। শরীয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট দিনে নিয়তসহ ইহরামরত অবস্থায় আরাফার ময়দানে অবস্থান করা এবং বায়তুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ করা।

হজ কাদের উপর ফরজ?

(১) মুসলিম হওয়া।

(২) বালিগ হওয়া।

(৩) স্বাধীন হওয়া।

(৪) বিবেকবান হওয়া।

(৫) নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক যে ব্যক্তির এ পরিমাণ ধনসম্পদ আছে যে, সে হজের সফর (পথ খরচ) বহন করতে সক্ষম এবং তার অনুপস্থিতিকালীন তার পরিবারবর্গের প্রয়োজন মেটানোর মতো খরচও রেখে যেতে সক্ষম, এমন ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ। অথবা এমন ব্যক্তি যিনি হজের মৌসুমে অর্থাৎ শাওয়াল মাস শুরু হওয়া থেকে সৌদি আরবে অবস্থানরত ছিল এবং জিলহজ মাস পর্যন্ত সৌদি আরবে অবস্থান করতে থাকে এবং তার ওপর যদি কোনো বিধি-নিষেধ, ওজর ও অসুবিধা না থাকে তাহলে তার ওপরও হজ পালন করা ফরজ ইত্যাদি।

(৬) যাতায়াতে নিরাপত্তা।

(৭) মহিলাদের সাথে মাহরুম থাকা।

হজের ফরজ তিনটি-

১. ইহরাম বাঁধা অর্থাৎ হজ্বের নিয়ত করা। আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল হজওয়াল উমরাতা ওয়াজ জিয়ারাতা ফাইয়াস সিরহুলি ওয়াতা ক্কাব্বালহুমিন্নি-অর্থ ‘ হে আল্লাহ! আমি হজ উমরা এবং কাবা গৃহ তাওয়াফের জন্য নিয়ত করলাম।তুমি তা কবুল কর।

ইহরাম বাঁধার নিয়ম : হজ ও ওমরাহর আমলগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম আমল হলো ইহরাম বাঁধা। ইহরাম বাঁধার নিয়ম হলো-হজ অথবা ওমরাহর নিয়তে সেলাইকৃত কাপড় খুলে সেলাই বিহীন দুটি চাদর পরিধান করে ‘তালবিয়াহ্’ পাঠ করা, শরীয়তের পরিভাষায় একেই ‘ইহরাম’ বলা হয়।

ইহরাম বাঁধার উত্তম পদ্ধতি হলো-যখন ইহরাম বাঁধার ইচ্ছা করবে তখন প্রথমে গোসল অথবা অজু করবে, নখ কাটবে, বগল ও নাভীর নিচের চুল পরিষ্কার করবে এবং মাথা ও দাড়ি চিরুনি করে সর্ব বিষয়ে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করবে।

ইহরামের জন্য দুটি নতুন অথবা ধোলাই করা পরিষ্কার চাদর হওয়া সুন্নত। একটি চাদর দিয়ে লুঙ্গি বানাবে। অন্যটি দিয়ে চাদর বানাবে। ইহরামের কাপড় পরিধান করার পর নামাজের মাকরুহ সময় না হলে মাথা ঢেকে দুই রাকাআত নফল নামাজ আদায় করা মুস্তাহাব। নামাজ পড়ে মাথার কাপড় খুলে ফেলবে এবং যেই হজের ইচ্ছা করবে মনে মনে সেই হজের নিয়ত করে ইহরামের ‘তালবিয়াহ্’ পাঠ করবে।

তালবিয়াহ উচ্চারণ : ‘লাব্বাইকাআল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা-শারীকালাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদাওয়ান নি’মাতা, লাকা ওয়াল মুল্ক লা-শারীকালাক।’

২. জিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখ ফজরের পর থেকে সূর্যাস্ত যাওয়া পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা।

৩. তাওয়াফে জিয়ারাত অর্থাৎ মক্কা শরীফ পৌঁছার পর সর্ব প্রথম কাজটি হলো চারবার কাবা গৃহটি প্রদক্ষিণ করা আবার হজ্বের কাজ শেষ করে বাড়িতে ফিরার সময় সর্বশেষ কাজ হলো তিনবার কাবা গৃহ প্রদক্ষিণ করে রওনা হওয়া।

হজের ওয়াজিব কাজ সাতটি-

১. সাফা ও মারওয়া উভয় পাহাড় সাত বার প্রদক্ষিণ করা।

২. মুজদালিফায় রাত যাপন করা।

৩. মিনায় তিনটি জামরাতে তিনদিনে প্রত্যেক জামরাতে ৭টি করে ৪৯টি পাথর শয়তানের উদ্দেশে নিক্ষেপ করা।

৪. মিনার ময়দানে কোরবানি করা।

৫. মাথা মুণ্ডন করা।

৬. ফরজ তাওয়াফ শেষে ৩ চক্কর দেয়া।

৭. বিদায়ী তাওয়াফ করা।

প্রথম দিনের করণীয় কাজঃ (৮ই যিলহাজ্জ)

১. যিনি মক্কা মুকাররামাহ ও তার আশেপাশের স্থান থেকে আগমন করবেন তিনি নিজ অবস্থান থেকে হজের জন্যে ইহরাম বাঁধবেন, গোসল করে সুগন্ধী ব্যবহার করবেন এবং ইহরামের পোশাক পরিধান করবেন। এরপর হজের নিয়তে এ তালবিয়া পাঠ করবেনঃ লাইব্বাইকা হাজ্জান, লাইব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’ মাতা লাকাওয়াল মুলক লা শারিকা লাক (আমি হজের জন্যে হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির-আমি হাজির, আপনার কোনো শরীক নেই, আমি হাজির, নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা ও নিয়ামত আপনারই, আর সকল বাদশাহী আপনার, আপনার কোনো শরীক নেই)।

০২. মিনা অভিমুখে রওয়ানা করবেন এবং মিনায় গমন করে যিলহাজ্জ মাসের নয় তারিখ ভোরে সূর্যোদয় পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করবেন। মিনাতে আট তারিখ যোহর, আসর, মাগরীব ও ইশার নামাজ, এবং নয় তারিখ ফজরের নামাজ যথাসময়ে আদায় করবেন এবং চার রাকআত বিশিষ্ট নামাজ কসর করে আদায় করবেন।

দ্বিতীয় দিনের করণীয় কাজঃ (৯ ইযিলহাজ্জ)

১. সূর্যোদয়ের পরে আরাফাতের ময়দানের অভিমুখে রওয়ানা করবেন। আরাফাতের ময়দানে যোহরের সময় ও আসর নামাজ একত্রে কসর করে আদায় করবেন এবং মধ্যাহ্নের পূর্বে (পৌঁছা)সম্ভব পর হলে মসজিদে নামিরায় যাবেন।

২. নামাযের পর হাত উঠিয়ে কিবলামুখী হয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দোয়া ও যিকির করবেন।

৩. সূর্যাস্তের পর মুযদালিফা অভিমুখে রুওয়ানা করবেন, ওখানে পৌঁছার পর ইশার সময় মাগরীব ও ইশার নামাজ আদায় করবেন। কিন্তু ইশা কসর করে দু’ রাকাআত নামাজ আদায় করবেন এবং মুযদালিফায় ফজর পর্যন্ত রাত্রি যাপন করবেন।

৪. ফজরের ওয়াক্ত হলে ফজরের নামাজ আদায় করবেন, অতঃপর আলো উদ্ভাসিত হওয়া পর্যন্ত দোয়া ও যিকির করবেন।

৫. সূর্যোদয়ের পূর্বে মিনা অভিমুখে রওয়ানা হবেন।

তৃতীয় দিনের করণীয় কাজঃ (১০ই যিলহাজ্জ ঈদের দিন)

যখন মিনায় পৌঁছাবেন, জামারা আকাবায় যাবেন এবং তাতে পর্যায়ক্রমে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করবেন, একটির পর অন্যটি এবং প্রত্যেক কঙ্কর নিক্ষেপের সময় তাকবীর বলবেন।

২. যদি সাথে হাদী (কোরবানীর পশু) থাকে তাহলে তা যবাই করবেন।

৩. মাথা মুণ্ডন করবেন অথবা চুল খাটো করবেন এবং এর মাধ্যমে প্রাথমিক হালাল হবেন। অর্থাৎ ইহরামের কাপড় খুলে তার সাধারণ পোশাক পরিধান করবেন এবং সুগন্ধী ব্যবহার করবেন।আর তার জন্য স্ত্রী সহবাস ব্যতীত ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ সমস্ত কাজ হালাল হয়ে যাবে।

৪. মক্কায় গিয়ে কা’বা শরীফে “তাওয়াফে ইফাদ্বাহ” করবেন। আর এটাই হচ্ছে হজ্জের (ফরয) তাওয়াফ। অতঃপর তামাত্তু হজকারী সাফামা এওয়াহতে হজের সা’য়ী করবেন। অনুরূপ যদি তামাত্তু হজকারী না হয়ে থাকেন কিন্তু তাওয়াফুল ক্বুদুমের পরসা ’ইয়ো করেন নি, তাহলে এখন সা’য়ী করবেন। আর এভাবে দ্বিতীয় বার হালাল হবেন এবং স্ত্রী সহবাসসহ ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ সমস্ত কাজ হালাল হয়ে যাবে।

৫. মিনায় ফিরে আসবেন এবং সেখানে (যিলহাজ্জ মাসের) একাদশ রাত যাপন করবেন।

চতুর্থ দিনের করণীয় কাজঃ (১১ই যিলহাজ্জ)

১. তিনটি জামারায় গিয়ে কংকর নিক্ষেপ করবেন। শুরুতে প্রথম জামারাতে, তারপর মধ্যবর্তী তারপর জামারা আকাবাতে (বড়টি)। প্রত্যেকটিতে সাতটি করে একটির পর আরেকটি কংকর নিক্ষেপ করবেন। প্রত্যেক কঙ্কর নিক্ষেপের সময় তাকবীর বলবেন। এ দিনের কংকর নিক্ষেপ করতে হবে মধ্যাহ্নের পর।

মধ্যাহ্নের পূর্বে নিক্ষেপ জায়েয নয়, এবং প্রথম জামারায় ও মধ্যবর্তী জামারায় কংকরে নিক্ষেপের পর দোয়া করার বিষয়টি বিশেষ ভাবে খেয়াল রাখবেন।

২. এগার তারিখ দিনগত অর্থাৎ (দ্বাদশ)রাত্রটি মিনায় যাপন করবেন।

পঞ্চম দিনের করণীয় কাজঃ (১২ই যিলহাজ্জ)

১. চতুর্থ দিনের নিয়মে তিন জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করবেন।

২. এই তারিখে (আগে আগে) মিনা ত্যাগ করতে চাইলে সূর্যাস্তের পূর্বে মিনা থেকে চলে আসবেন, আর দেরী করে আসতে চাইলে সেখানে রাত্রিযাপন করবেন।

ষষ্ঠ দিনের করণীয় কাজঃ (১৩ই যিলহাজ্জ)

বিশেষভাবে মিনা ছাড়তে যারা বিলম্ব করেছেন এই দিনটি তাদের জন্যে। এই দিনেঃ

১. তিন জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করবেন যেভাবে পূর্বের দু’দিন করেছেন।

২. এরপর মিনা ছেড়ে চলে যাবেন।

হজের সর্বশেষ করণীয় কাজ হচ্ছে বিদায়ী তাওয়াজ করা। আর আল্লাহই সবচেয়ে অধিক জ্ঞাত।

হজের গুরুত্ব এবং ফযীলত

আল্লাহর নির্দেশ পালন: হজ একটি অন্যতম ফরজ ইবাদাত। হজ পালনের মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশ পালন হয়ে থাকে। আল্লাহ তায়ালা সামর্থবান মুসলিমের উপর হজ ফরজ করেছেন। কুরআনে এসেছে, ‘এবং সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ করা ফরয। আর যে কুফরী করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয় সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী’।(সূরাআলে ইমরান-৯৭)

যিকরুল্লাহ প্রতিষ্ঠা : হজ এমন একটি ইবাদাত যার প্রত্যেকটি কাজে আল্লাহর যিকর করা হয়। তাওয়াফ, সাঈ, রমঈলজিমার (পাথরনিক্ষেপ),মিনা, মুযদালিফাহ, আরাফাহসহ প্রত্যেকটি নির্দেশনায় আল্লাহর যিকরে ধ্বনিত, প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারপর যখন তোমরা তোমাদের হজের কাজসমূহ শেষ করবে, তখন আল্লাহকে স্মরণ কর, যেভাবে তোমরা স্মরণ করতে তোমাদের বাপ-দাদাদেরকে, এমনকি তার চেয়ে অধিক স্মরণ। আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে যে বলে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়াতেই দিয়ে দিন। বস্তত আখিরাতে তার জন্য কোনো অংশ নেই।(সূরা আল বাকারাহ-২০০)।

হজ জাহান্নামের আগুন থেকে পরিত্রান দান করে। মহানবী (সঃ) বলেন; মহান আল্লাহ আরাফাতের দিন যত মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন অন্য কোনো দিনে এত লোককে মুক্তি দেন না।(মুসলিম)

হজ পালনকারী সদ্যজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়:

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (সঃ) কে বলতে শুনেছি; যে ব্যক্তি হজ করে এবং হজকালে যৌন সংযম ও কোনো পাপাচারী কাজে লিপ্ত হয় না, সেই ব্যক্তি সদ্য মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ট শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়। (বুখারী ও মুসলিম)।

এক হাদীসে এসেছে, ‘তোমরা পর-পর হজ ও উমরা আদায় করো। কেননা তা দারিদ্র্য ও পাপকে সরিয়ে দেয়। যেমন সরিয়ে দেয় কামারের হাপর লোহা-স্বর্ণ-রুপার ময়লাকে। আর হজে মাবরুরের প্রতিদান তো জান্নাত ভিন্ন অন্য কিছু নয়। (সহিহ নাসায়ী)

হজ্জের এক মাত্র প্রতিদান জান্নাত:

হজের বিনিময় জান্নাত ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত; মহানবী(সঃ)বলেন, এক উমরাহ হতে অন্য উমরাহ পর্যন্ত সময় গুনাহের কাফ্ফারা হয়। হজের একমাত্র প্রতিদান হল জান্নাত। (বুখারী ও মুসলিম)

বিধর্মী হওয়া থেকে মুক্তিঃ

যাদের উপর হজ ফরজ হওয়ার পর হজ না করে মৃত্যুবরণ করবে তাদের ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারী দেওয়া হয়েছে।

রাসূল(সাঃ) বলেন, ‘যার উপর হজ ফরজ হল অথচ সে যদি হজ না করে মৃত্যুবরণ করে তাহলে সে কি ইয়াহূদী হয়ে মরল নাকি খ্রিষ্টান হয়ে মরল তাতে আমার কিছু যায় আসে না।’

উত্তম নেক আমলঃ

যারা সঠিকভাবে হজ সম্পাদন করবে তারা ইসলামের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করবে।

রাসূল (সাঃ)বলেন, ‘উত্তম আমল কি এই মর্মে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হল। উত্তরে তিনি বললেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান। বলা হল, ‘তারপর কী?’ তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ। বলা হল তারপর কোনটি? তিনি বললেন, মাবরুর হজ । (বুখারী)

একদা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে প্রশ্ন করে আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি আপনাদের সাথে জিহাদে ও অভিযানে যাব না? তিনি বললেন, ‘তোমাদের জন্য উত্তম ও সুন্দরতম জিহাদ হল ‘হজ ’, তথা মাবরুর হজ ।” (বুখারী)

আল্লাহর উদ্দেশ্য পূর্ণঃ

আল্লাহ পাক মানুষকে এই উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন যে, তারা কেবলমাত্র এক আল্লাহর ইবাদত করবে। যারা হজ করবে তাদের সেই উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে।

মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ লাভঃ

যারা হজ পালন করবে তারা আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য অর্জন করবে। এই ব্যাপারে মুহাম্মদ(সাঃ) বলেন, ‘আমার মৃত্যর পর যে হজ করল আর আমার কবর যিয়ারত করল সে যেন আমার সাথে জীবিত অবস্থায় সাক্ষাৎ করল।’

আল্লাহর নৈকট্য লাভঃ

হজ ব্রত অবস্থায় আল্লাহর একজন প্রিয়বান্দা বিভিন্ন ধরনের আমল পালন করে। আল্লাহর যিকির করে থাকে। কাবা শরীফ প্রদক্ষিণ করে থাকে। এসকল আমলের মধ্য দিয়ে একজন বান্দা অতি সহজে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে।

চারিত্রিক বিশুদ্বতাঃ

হজব্রত অবস্থায় মানুষ সহজে তার চারিত্রিক বিশুদ্ধতা অর্জন করতে পারে। কারণ হজ অবস্থায় ঝগড়া করা, হাঙ্গামা সৃষ্টি করা, গীবত করা, হিংসা করা, কৃপণতা প্রদর্শন করা, অপচয় করা সম্পূর্ণরুপে নিষিদ্ব।

তাই হাজীগণ এই সময় এসকল খারাপ কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখার জন্য চেষ্টা করেন এবং এর দ্বারা সে তার চরিত্রকে পূত-পবিত্র করতে পারে।

সামগ্রিক ইবাদত পালনঃ

নামাজ এবং সাওম হল কেবল দৈহিক ইবাদত আর যাকাত হল আর্থিক ইবাদত। আর হজ এমন একটি ইবাদত যা কিনা দৈহিক এবং আর্থিক উভয় ইবাদতের সমন্বয়ে সাধিত হয়।

তাই রাসূল (সাঃ) বলেন, “উত্তম জিহাদ হল হজ ”।

আখিরাতের কথা স্মরণঃ

হজের প্রত্যেকটি কাজ মানুষকে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ১. এহরামের কাপড় গায়ে জড়িয়ে আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে হজের সফরে রওয়ানা হওয়া কাফন পরে আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে আখেরাতের পথে রওয়ানা হওয়াকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

হজের সফরে পাথেয় সঙ্গে নেয়া আখেরাতের সফরে পাথেয় সঙ্গে নেয়ার প্রয়োজনয়ীতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এহরাম পরিধান করে পুত-পবিত্র হয়ে আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেয়ার জন্য ‘লাব্বাইক’ বলাসমস্ত গুনাহ-পাপ থেকে পবিত্র হয়ে পরকালে আল্লাহর কাছে হাজিরা দেয়ার প্রয়োজনীয়তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আরো স্মরণ করিয়ে দেয় যে এহরামের কাপড়ের মতো স্বচ্ছ-সাদা হৃদয় নিয়েই আল্লাহর দরবারে যেতে হবে।

বদলী হজ

যে সকল মুসলিম নর-নারীর উপর হজ ফরজ ছিল, তাদের মধ্যে যদি কেউ মৃত্যুবরণ করে অথবা জীবিত কিন্তু শারিরীক দুর্বলতা ও অসুস্থতা ও অমতার কারণে হজ করতে অপারগ হয়, তাহলে অন্য কাউকে দিয়ে বিশেষ করে বিজ্ঞ আলেম বা হজে পারদর্শী ব্যক্তি দ্বারা তার বদলী হজ করাতে পারবে। অর্থাৎ যার জন্য বদলী হজ করা হবে তারই নামে ইহরাম পরিধান ও নিয়্যাত করে অন্য একজন হজ আদায় করতে পারবে।

হিযবুত তাওহীদ : ঈমান বিধ্বংসী এক ফিরকা

১৯৯৫ সালে হোমিও ডাক্তার খ্যাত বায়াজীদ খান পন্নী নামক জনৈক ব্যক্তির দ্বারা টাঙ্গাইল করটিয়ায় হিযবুত তাওহীদ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
এটি নামধারী একটি ইসলামিক দল হলেও মূলত এটি ইসলাম ধ্বংস করার গোপন ষড়যন্ত্র।

খুব অল্প সময়ে উদ্ভট সব থিউরী দিয়ে বেশ কিছু ভক্ত যুগিয়ে ফেলে পন্নী। ইসলামের মৌলিক বিধানাবলীর নতুন সব অপব্যাখ্যা করে পুরো দ্বীনটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে রাখার দুষ্কর্ম সে আমরণ করে যায়।

● তাদের দাবী হলো যে ধর্মটি ইসলাম বলে প্রচলিত আমাদের সমাজে এটা আসল ইসলাম নয়। বরং অন্যন্য ধর্মের মত একটি ধর্ম শুধু।

হেযবুত তওহীদের অন্যতম দাবী হচ্ছে-
৬০/৭০ হিজরীর পর থেকে ১৩০০ হিজরির পর পুরো ইসলাম ধর্মটি বিকৃত হয়ে গিয়েছে এবং সমস্ত মুসলমান কাফের এবং মুশরিক হয়ে গিয়েছে। সুতরাং প্রচলিত ইসলামটি আসল ইসলাম নয় বরং আল্লাহর প্রেরিত ইসলামের বিপরিত এটা।

● টুপি, দাড়ী, পাগড়ি, জুব্বা এগুলোর সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জোর দাবী তুলেছে তারা। অথচ বিধর্মীদের মত দাড়ীতে স্টাইল করা তারা রুচিসম্মত কাজ মনে করে থাকে।

● তাদের দাবী হলো “হেযবুত তওহীদ’ই হলো আল্লাহর পাঠানো আসল দ্বীনুল হক। তাদের এমামুযযামান খ্যাত বায়াজীদ খান পন্নীকে নাকি আল্লাহ পাক মো’জেজার মাধ্যমে বলেছেন যে, “হেযবুত তওহীদ” – এ দলটি দিয়ে পুরো বিশ্বে সহীহ ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে।

এজন্য তারা ঘোষণা দিয়ে তাদের বইয়ের মধ্যে লিখেছে-
“যারা হেযবুত তওহীদ করবে তাদের জন্য নিশ্চিত জান্নাত। এনকি যদি কেউ হেযবুত তওহীদে থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে তাহলে সে দুই শহিদের মর্যাদা পাবে। আর যারা পন্নী সাহেবের মোজেজা বিশ্বাস করবে না তারা মোনাফেক। তাদের কোনো মুক্তি নাই, তারা জাহান্নামী।” [লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।]

অবশেষে ১৬ ই জানুয়ারী ২০১২ ইং সনে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু এতদিনে তার ভ্রান্ত দলের কর্মী হাজার ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে তাদের কথিত এমাম হলো নারীলোভী সেলিম।

বায়জীদ খান পন্নীর এ নতুন ফেরকা হেযবুত তাওহীদ ভ্রান্ত হবার ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ।
এই ভ্রান্তবাদী ইসলাম ধ্বংসকারী দল থেকে সবাইকে দূরে থাকার অনুরোধ করছি।

এই ভান্তবাদী মানুষের ঈমান ধ্বংসকারী এই হিজবুত তাওহীদ কে আইনের আওতায় আনে কঠিন শাস্তি দেয়ার দাবি করছি। সামাজিকভাবে সকল মুসলমানকে সতর্ক করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

ব্রিটিশ পতাকা ছুঁড়ে সর্বপ্রথম লালকেল্লায় তিরঙ্গা উত্তোলনকারী শাহনাওয়াজ কে মনে রাখেনি কেউ

লালকেল্লার শিয়রে পতপত করে উড়তে থাকা “তিরঙ্গা” দেশের গৌরবের প্রতীক। ১৯৪৭ সালের আগে ঐ স্থানে বৃটিশ পতাকা উড়তো। কিন্তু জানেন কি? ব্রিটিশ পতাকা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, সর্বপ্রথম ঐ লালকেল্লায় তিরঙ্গা উত্তোলন করেছিলেন কোন ভাগ্যবান?

তিনি হলেন মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিশিষ্ট জননেতা, দেশের বীর সন্তান, আজাদ হিন্দ মেজর, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের নয়নমণি “জেনারেল শাহনওয়াজ খান।” ইনি ছিলেন বর্তমান জনপ্রিয় বলিউড বাদশা শাহরুখ খান এর দাদু। যার জন্ম, ২৪ জানুয়ারি ১৯১৪, আর মৃত্যু ৯ ডিসেম্বর ১৯৮৩।

দেশের জন্য যারা নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলেন, জেনারেল শাহনেওয়াজ
তাঁদের অন্যতম। তিনি দারুণ বক্তৃতা দিতে পারতেন। লালকেল্লায় প্রতিদিন
সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত “লাইট-এন্ড সাউন্ড শো”-তে নেতাজী-র সঙ্গে সঙ্গে, শাহনেওয়াজ খান এর কন্ঠে বক্তৃতা শোনা যেত।

তিনি ছিলেন অবিভক্ত ভারতের বাসিন্দা, পার্টিশন এর সময়, পাকিস্তানে গোটা পরিবারকে ছেড়ে, একাই ভারতে চলে এসেছিলেন, পাকাপাকি ভাবে। কারণ তাঁর পরিবার চেয়েছিল পাকিস্তানে থাকতে, কিন্তু তিনি চাননি। স্বাধীনতা পরবর্তীতে উত্তর প্রদেশের “মেরঠ” থেকে নির্বাচনে চারবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, প্রতিবার বিজয়ী হন। এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় জায়গা করে নিয়েছিলেন।

১৯৬৫ সালের ভারত -পাকিস্তান যুদ্ধ, শাহনওয়াজ খান এর কাছে এক মর্মান্তিক ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত। তিনি নিজে ছিলেন ভারতের মন্ত্রী, এবং তাঁর পূত্র কর্নেল মেহমুদ আলী ছিলেন, পাকিস্তান সেনাদলের গুরুত্বপূর্ণ অফিসার। সেই সময় বেশকিছু অতি দেশভক্ত মানুষ, তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। কিন্তু লাল বাহাদুর শাস্ত্রী তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে, সম্পূর্ণ সমর্থন করেছিলেন। মেহমুদ এই যুদ্ধে নিহত হন, এবং দেশভক্তির প্রমাণ হিসাবে নিজের সন্তানের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে তিনি পাকিস্তানে পর্যন্ত যাননি।

তিনি বলেছিলেন, “দেশের শক্রু, আমার শক্রু, সেটা পূত্র হোক অথবা পিতা।” প্রতি বছর ২৪ এ জানুয়ারি আসে এবং চলে যায়। আমরা জানতেই পারিনা, এই মহান মানুষটি এই দিনেই জন্মেছিলেন। মহান মানুষটিকে শ্রদ্ধা জানানোর মতো সৌভাগ্য আমাদের হয়ে ওঠেনি।

#কোরআন ও #হাদীস থেকে #জান্নাতের সঠিক বর্ননা ।

#কোরআন ও #হাদীস থেকে #জান্নাতের সঠিক বর্ননা ।(অনেকেই জান্নাতের বিবরণ দিতে গিয়ে অতিরঞ্জিত বা বাড়াবারি করে ফেলে আবার অনেকে জাল হাদীস রচনা করে বয়ান করে)জান্নাত (আরবি: جنّة‎‎) হল ইসলামিক পরিভাষা অনুযায়ী, পার্থিব জীবনে যে সকল মুসলিম আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলবে এবং পরকালীন হিসাবে যার পাপের চেয়ে পুণ্যের পাল্লা ভারী হবে ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবে তাদের জন্য আল্লাহ যে সকল স্বর্গ প্রস্তুত রেখেছেন। এটি একটি আরবি শব্দ, যার শাব্দিক অর্থ হল “বাগান” বা “উদ্যান”| প্রচলিত বাংলা ভাষায় একে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বেহেশত বলা হয়ে থাকে । জান্নাতের প্রশস্ততাকোরআনে কারিমে বর্ণিত জান্নাতের বিশেষত্বগুলো হচ্ছে- ‘এর নেয়ামত, সুশীতল ছায়া, আপ্যায়ন, পানীয়, সঙ্গী-সাথী, পোশাক-পরিচ্ছদ, পরিবেশকগণ, সুউচ্চ বহুতলবিশিষ্ট প্রাসাদ, বাগান ও ঝরণা, সব ইচ্ছাপূরণ, জান্নাতিদের প্রতি অভিবাদন ও মোবারকবাদ এবং সবকিছুর ওপরে আল্লাহর সন্তুষ্টি। কোরআনে কারিমে জান্নাতকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সেসব সংজ্ঞায় বলা হয়েছে-উত্তম আবাস (সূরা আলে ইমরান: ১৪), আল্লাহর রহমতের আশ্রয় (সূরা আলে ইমরান: ১০৭), সম্মান ও মর্যাদার জায়গা (সূরা আন নিসা: ৩১), নিয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাত (সূরা আল মায়িদা: ৬৫), শান্তির আবাস (সূরা আল আনআম: ১২৭), শান্তির ভুবন (সূরা ইউনুস: ২৫), ক্ষমা এবং বিরাট প্রতিদান (সূরা হুদ: ১১), শুভ পরিণাম (সূরা আর রা’দ: ২৯), বাগান ও নির্ঝরিণী (সূরা আল হিজর: ৪৫), বড় ভালো আবাস (সূরা আন নাহল: ৩০), বিরাট প্রতিদান (সূরা বনি ইসরাইল: ৯), ভালো প্রতিদান (সূরা আল কাহফ: ২), ভালো প্রতিদান (সূরা আল কাহফ: ৮৮), সম্মানজনক জীবিকা (সূরা আল হজ: ৫০), নিয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাত (সূরা আল হজ: ৫৬), উৎকৃষ্টতর জিনিস (সূরা আল ফোরকান: ১০), চমৎকার আশ্রয় এবং আবাস (সূরা আল ফোরকান: ৭৬), মাগফিরাত ও সম্মানজনক রিজিক (সূরা সাবা: ৪), মাগফিরাত ও বড় পুরস্কার (সূরা আল ফাতির: ৭), মাগফিরাত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিদানে (সূরা ইয়াসিন: ১১), নৈকট্যের মর্যাদা ও উত্তম প্রতিদান (সূরা আস সোয়াদ: ২৫), নৈকট্যের মর্যাদা ও শুভ পরিণাম (সূরা আস সোয়াদ: ৪০), যেমন উত্তম তেমনি চিরস্থায়ী (সূরা আশ শূরা: ৩৬), উত্তম প্রতিদান (সূরা আন নাজম: ৩১), সর্বোত্তম প্রতিদান (সূরা আল হাদিদ: ১১), সর্বোত্তম প্রতিদান (সূরা আল হাদিদ: ১৮), পুরস্কার ও ‘নূর’ (সূরা আল হাদিদ: ১৯), বিরাট প্রতিদান (সূরা আত তাগাবুন: ১৫), বিরাট পুরস্কার (সূরা আল মুলক: ১২), নিয়ামত ভরা জান্নাত (সূলা আল কলম: ৩৪), প্রতিদান ও যথেষ্ট পুরস্কার (সূরা আন নাবা: ৩৬), অফুরন্ত পুরস্কার (সূরা আল ইনশিকাক: ২৫), এমন পুরস্কার যা কোনোদিন শেষ হবে না (সূরা আত ত্বীন: ৬)।
১// #জান্নাতের_প্রশস্ততা সম্পর্কে কুরআনুল কারীমে আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,“ তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে ও সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি হচ্ছে আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, যা মুত্তাকীদের জন্য তৈরী করা হয়েছে। (সূরা আল ইমরান- ১৩৩) ”জান্নাত দেখার পরই সঠিকভাবে বোঝা যাবে যে জান্নাত কত বিশাল এবং তার নেয়ামত কত অসংখ্য। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,“ তুমি যখন দেখবে তখন দেখতে পাবে ভোগ বিলাসের নানান সামগ্রী আর এক বিশাল রাজ্য। (সূরাহ আদ্‌-দাহ্‌রঃ ২০জান্নাতে শত স্তর আছে আর প্রত্যেক স্তরের মাঝে এত দূরত্ব আছে যতটা দূরত্ব আছে আকাশ ও যমিনের মাঝে। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘জান্নাতে শত স্তর আছে। প্রত্যেক স্তরের মাঝে দূরত্ব হল আকাশ ও যমীনের দূরত্বের সমান। আর ফেরদাউস তার মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে আছে। আর সেখান থেকেই জান্নাতের চারটি ঝর্ণা প্রবাহমান। এর উপরে রয়েছে আরশ। তোমরা আল্লাহ্‌র নিকট জান্নাতের জন্য দু’আ করলে জান্নাতুল ফেরদাউসের জন্য দু’আ করবে’। (তিরমিজী- কিতাবুল জান্নাহ)
জান্নাতে একটি বৃক্ষের ছায়া এত লম্বা হবে যে কোন অশ্বারোহী ঐ ছায়ায় শত বছর পর্যন্ত চলতে পারবে। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘জান্নাতে এমন একটি বৃক্ষ আছে যার ছায়ায় কোন আরোহী শত বছর পর্যন্ত চলতে পারবে। আর তোমরা ইচ্ছা করলে তিলাওয়াত করতে পার ‘এবং দীর্ঘ ছায়া”। আর জান্নাতে তোমাদের কারও একটি ধনুকের পরিমাণ জায়গাও ঐ জায়গা অপেক্ষা উত্তম যেখানে সূর্য উদিত হয় আর সূর্য অস্তমিত হয় (অর্থাৎ পৃথিবীর চেয়ে)”। (সহীহ বুখারী, হাদীস সংখ্যা- ৩২৫২, ৩২৫৩)
সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারীকে এ দুনিয়ার চেয়ে দশগুণ বড় জান্নাত দান করা হবে। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন’, জাহান্নামে থেকে সবশেষে বের হয়ে আসা ব্যক্তিকে আমি চিনি। সে হামাগুড়ি দিয়ে জাহান্নাম থেকে বের হয়ে আসবে। তাকে বলা হবে, “যাও জান্নাতে প্রবেশ কর”। নবী সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “সে গিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সে দেখবে, লোকেরা স্ব স্ব স্থান অধিকার করে আছে। অতঃপর তাকে বলা হবে, “আচ্ছা সে যুগের (জাহান্নামের শাস্তি) কথা তোমার স্মরণ আছে কি?” সে বলবে, “হ্যাঁ, মনে আছে”। তাকে বলা হবে, “তুমি কি পরিমাণ জায়গা চাও তা ইচ্ছা কর”। সে ইচ্ছা করবে। তখন তাকে বলা হবে, “তুমি যে পরিমাণ ইচ্ছা করেছো তা এবং দুনিয়ার দশগুণ জায়গা তোমাকে দেয়া হল”। একথা শুনে সে বলবে, “আপনি আমার সাথে ঠাট্টা করছেন? অথচ আপনি হলেন সর্ব শক্তিমান”। বর্ণনাকারী ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন, “এ সময় আমি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমনভাবে হাসতে দেখেছি যে, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত প্রকাশ হয়ে পড়েছে’। (সহীহ মুসলিম – কিতাবুল ঈমান)
জান্নাতে সর্বশেষ ব্যক্তি প্রবেশ করার পরও অনেক জায়গা বাকী থাকবে যা পূর্ণ করার জন্য আল্লাহ্‌ তা’আলা নতুন জীব সৃষ্টি করবেন। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন’, জান্নাতে যতটুকু স্থান আল্লাহ্‌ চাইবেন ততটুকু স্থান খালি থেকে যাবে। অতঃপর আল্লাহ্‌ তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী অন্য এক জীব সৃষ্টি করবেন’। (সহীহ মুসলিম – কিতাবুল জান্নাহ)
২// #জান্নাতের_অট্টালিকাসমূহকুরআন মাজীদে আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,“মু’মিন পুরুষ আর মু’মিন নারীর জন্য আল্লাহ্‌ অঙ্গীকার করেছেন জান্নাতের যার নিম্নদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত, তাতে তারা চিরদিন থাকবে, আর জান্নাতে চিরস্থায়ী উত্তম বাসগৃহের; আর সবচেয়ে বড় (যা তারা লাভ করবে তা) হল আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি। এটাই হল বিরাট সাফল্য। (সূরা তওবা ”
জান্নাতের অট্টালিকাসমূহ সোনা-রূপার ইট দিয়ে নির্মিত হবে। সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরাইরাহ রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ইয়া রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম! সৃষ্টিকে কী দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে?” রাসূলুল্লাহ্‌ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “পানি দিয়ে”। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “জান্নাত কী দিয়ে নির্মিত?” তিনি বললেন, “একটি ইট রৌপ্যের এবং আরেকটি ইট স্বর্ণের। তার গাঁথুনি হল সুগন্ধিযুক্ত মেশক আম্বর। তার কংকর মোতি ও ইয়াকুতের। তার মাটি জাফরানের। যে ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করবে সে জীবন উপভোগ করবে, তার কোন কষ্ট হবে না। চিরকাল জীবিত থাকবে, মৃত্যু হবে না। জান্নাতীদের কাপড় কখনো পুরানো হবে না। আর তাদের যৌবন কখনো বিনষ্ট হবে না”। (তিরমিজী- কিতাবুল জান্নাহ)
জান্নাতের কোন কোন অট্টালিকায় স্বর্ণের বাগান থাকবে। আবার কোন কোনটিতে রূপার বাগান থাকবে। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন’, দুইটি জান্নাত এমন রয়েছে যে, এর যাবতীয় পাত্রসমূহ ও তার মধ্যে যা কিছু আছে সবই রৌপ্য নির্মিত। আবার দুইটি জান্নাত এমন আছে যে এর সমস্ত আসবাবপত্র এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে সবই স্বর্ণ নির্মিত। জান্নাতে আদনের অধিবাসীদের মধ্যে এবং তাদের প্রতিপালককে দর্শনের মধ্যে কেবল তাঁর বড়ত্ব ও মহানত্বের চাদরখানা ব্যতীত আর কোন আড়াল থাকবে না’। (সহীহ মুসলিম – কিতাবুল ঈমান)
জান্নাতের অট্টালিকাসমূহে সাদা মোতির নির্মিত বড় বড় সুন্দর গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছে। আনাস বিন মালেক রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে মেরাজের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন’, অতঃপর আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হল, যাতে সাদা মোতির নির্মিত গম্বুজ আছে। আর তার মাটি হল মেশক আম্বরের’। (সহীহ মুসলিম – কিতাবুল ঈমান)৩// #জান্নাতের_তাঁবুসমূহজান্নাতীদের প্রত্যেকের অট্টালিকায় তাঁবু থাকবে যেখানে হুরেরা অবস্থান করবে। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,“ তাঁবুতে সুরক্ষিত থাকবে সুলোচনা সুন্দরীরা। (আর রাহমান – ৭২) ”জান্নাতের তাঁবু ষাট মাইল প্রশস্ত হবে। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন’, জান্নাতের মধ্যে ফাঁপা মোতির একটি তাঁবু থাকবে। এর প্রশস্ততা হবে ষাট মাইল। এর প্রতি কোণে থাকবে হুর-বালা। এদের এক কোণের জন অপর কোণের জনকে দেখতে পাবে না। ঈমানদার লোকেরা তাদের কাছে যাবে। এতে থাকবে দু’টি বাগান, যার সকল পাত্র এবং ভেতরের সকল বস্তু হবে রূপার তৈরি’। (সহীহ বুখারী, হাদিস সংখ্যা- ৪৮৭৯)৪// #জান্নাতের_বৃক্ষসমূহজান্নাতের বৃক্ষসমূহ কাঁটা বিহীন হবে ও তাদের ছায়া অনেক লম্বা হবে। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,“ আর ডানদিকের দল, কত ভাগ্যবান ডানদিকের দল! তারা থাকবে কাঁটা বিহীন বরই গাছগুলোর মাঝে। কলা গাছের মাঝে যাতে আছে থরে থরে সাজানো কলা, বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছায়া, অবিরাম প্রবাহমান পানির ধারে, আর পর্যাপ্ত ফলমূল পরিবেষ্টিত হয়ে। (সূরাহ আল-ওয়াক্বি’আহঃ ২৭-৩২)]”জান্নাতের বৃক্ষসমূহ সর্বদা শস্য-শ্যামল থাকবে। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,“ ঘন সবুজ এ বাগান দু’টি। (সূরা আর রাহমান ৬৪)”জান্নাতের বৃক্ষসমূহের শাখাগুলো লম্বা ও ঘন হবে। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,“ দু’টোই শাখা পল্লবে ভরপুর। (সূরা আর রাহমান ৪৮)”’রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, জান্নাতের প্রতিটি বৃক্ষের মূল হবে স্বর্ণের’। (তিরমিজী- কিতাবুল জান্নাহ)
৫// #জান্নাতের_ফলসমূহ
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,“ তাতে আছে ফলমূল, আর খেজুর আর ডালিম । (সূরা আর-রহমান – ৬৮)”জান্নাতের প্রত্যেক জান্নাতীর পছন্দমত সর্ব প্রকার ফলমূল মজুদ থাকবে। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,“মুত্তাকীরা থাকবে ছায়া আর ঝর্ণাধারার মাঝে, আর তাদের জন্য থাকবে ফলমূল-যেটি তাদের মন চাইবে। (তাদেরকে বলা হবে) তোমরা তৃপ্তির সাথে খাও আর পান কর, তোমরা যে কাজ করেছিলে তার পুরস্কারস্বরূপ। সৎকর্মশীলদের আমি এভাবেই প্রতিফল দিয়ে থাকি। (সূরাহ আল-মুরসালাতঃ ৪১-৪৪)”জান্নাতের ফল সর্বদা জান্নাতীদের নাগালের মধ্যে থাকবে। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,“ জান্নাতের বৃক্ষরাজির ছায়া তাদের উপর থাকবে, আর ফলের গুচ্ছ একেবারে তাদের নাগালের মধ্যে রাখা হবে। (আদ-দাহর ১৪)”জান্নাতের ফলের ছড়া অনেক বড় হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে সূর্য গ্রহণের সলাত সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসে এসেছে যে, সাহাবাগণ রাসূলুল্লাহ্‌ সল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করল, “ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌ সল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম! আমরা আপনাকে দেখলাম, আপনি এ স্থানে দাঁড়িয়ে কোন কিছু হাত বাড়িয়ে নিতে যাচ্ছেন। আবার একটু পরে দেখলাম হাত ফিরিয়ে নিলেন”। রাসূলুল্লাহ্‌ সল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আমি জান্নাত দেখতে পেলাম। অতএব জান্নাতে থেকে ফলের একটা ছড়া নিতে যাচ্ছিলাম। যদি তা নিয়ে নিতাম তবে তোমরা তা পৃথিবী কায়েম থাকা পর্যন্ত খেতে পারতে”। (সহীহ মুসলিম)
৬// #জান্নাতের_নদীসমূহজান্নাতের নদীসমূহের পানির রং ও স্বাদ সর্বদা একই রকমের থাকবে। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,“ মুত্তাক্বীদেরকে যে জান্নাতের ও’য়াদা দেয়া হয়েছে তার উপমা হলঃ তাতে আছে নির্মল পানির ঝর্ণা, আর আছে দুধের নদী যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়, আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু মদের নদী আর পরিশোধিত মধুর নদী। (সূরাহ মুহাম্মদঃ ১৫) ”
আবু হুরাইরাহ রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সাইহান, জাইহান, ফোরাত ও নীল জান্নাতের নদী”। (সহীহ মুসলিম- কিতাবুল জান্নাত)
হাকীম বিন মোয়াবিয়া তার পিতা থেকে তিনি নবী সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “জান্নাতে পানির সাগর, মধুর সাগর, দুধের সাগর ও শরাবের সাগর রয়েছে। এগুলো থেকে পরে আরো নহরের শাখা-প্রশাখা বের হবে”। (তিরমিজী)
আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ্‌ স্বীয় দয়ায় যাকে খুশি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। (অতঃপর দীর্ঘদিন পর বলবেন) দেখ যে ব্যক্তির অন্তরে বিন্দু পরিমাণ ঈমান আছে তাকে জাহান্নাম থেকে বের কর। তখন তারা এমন অবস্থায় বের হবে যে তাদের শরীর কয়লার ন্যায় জ্বলে গেছে। তখন তাদেরকে হায়াত বা হায়া নামক নদীতে নিক্ষেপ করা হবে। তখন তারা এমনভাবে সজীব হয়ে উঠবে, যেমন বন্যার আবর্জনার মাঝে চারাগাছ সজীব হয়ে উঠে। তোমরা কি কখনো দেখনি যে কেমন হলুদ রং বিশিষ্ট হয়ে ওঠে”। (সহীহ মুসলিম- কিতাবুল ঈমান)কাওসার নদী
আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু সূত্রে নবী সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, “আমি জান্নাতে ভ্রমণ করছিলাম, এমন সময় এক নহরের কাছে এলে দেখি যে তার দু’ধারে ফাঁপা মুক্তার গম্বুজ রয়েছে। আমি বললাম, “হে জিব্‌রীল! এটা কী?” তিনি বললেন, “এটা ঐ কাউসার যা আপনার প্রতিপালক আপনাকে দান করেছেন”। তার ঘ্রাণে অথবা মাটিতে ছিল উত্তম মানের মিশ্‌ক এর সুগন্ধি”। (সহীহ বুখারী, হাদীস সংখ্যা-৬৫৮১)
আবদুল্লাহ বিন ওমর রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কাওসার জান্নাতের একটি নদী। যার উভয় তীর স্বর্ণ নির্মিত। তার পানি ইয়াকুত ও মোতির উপর প্রবাহমান। তার মাটি মেশকের চেয়েও বেশি সুগন্ধময়। তার পানি মধুর চেয়ে অধিক মিষ্টি এবং বরফের চেয়ে অধিক সাদা”। (তিরমিজী)
আনাস বিন মালেক রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কাওছার কি? তিনি বললেন, “এটি একটি নদী, যা আল্লাহ্‌ তা’আলা আমাকে জান্নাতে দান করবেন। তা দুধ অপেক্ষা সাদা এবং মধু থেকেও সুমিষ্ট। এর মাঝে রয়েছে বহু পাখি। এগুলোর গর্দান হবে উটের গর্দানের মত”। উমর রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বললেন, “এগুলো তো খুব মোটা-তাজা হবে”। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “এগুলোর আহারকারী আরো সুখী হবে”। (তিরমিজী- কিতাবুল জান্নাহ
৭// #জান্নাতের_ঝর্ণাসমূহকুরআনুল কারীমে আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,“ তাদের সামনে ঘুরে ঘুরে রুপার পাত্র পরিবেশন করা হবে আর সাদা পাথরের পানপাত্র। সেই সাদা পাথরও হবে রুপার তৈরি। তারা এগুলোকে যথাযথ পরিমাণে ভর্তি করবে। তাদেরকে পান করানোর জন্য এমন পাত্র পরিবেশন করা হবে যাতে আদার মিশ্রণ থাকবে। সেখানে আছে একটা ঝর্ণা, যার নাম সালসাবীল। (সূরাহ আদ্‌-দাহ্‌রঃ ১৫-১৮)”মহান আল্লাহ্‌ বলেন,“ অপরদিকে) নেক্‌কার লোকেরা এমন পানপাত্র থেকে পান করবে যাতে কর্পুরের সংমিশ্রণ থাকবে। আল্লাহ্‌র বান্দারা একটি ঝর্ণা থেকে পান করবে। তারা এই ঝর্ণাকে (তাদের) ইচ্ছেমত প্রবাহিত করবে। (সূরাহ আদ্‌-দাহ্‌রঃ ৫-৬)”সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ বলেন,“ পুণ্যবান লোকেরা থাকবে অফুরন্ত নি’মাতের মাঝে। উচ্চ আসনে বসে তারা (চারদিকের সবকিছু) দেখতে থাকবে। তুমি তাদের মুখে আরাম আয়েশের উজ্জ্বলতা দেখতে পাবে। তাদেরকে পান করানো হবে সীল-আঁটা উৎকৃষ্ট পানীয়। তার সীল হবে মিশ্‌কের, প্রতিযোগীরা এ বিষয়েই প্রতিযোগিতা করুক। তাতে মেশানো থাকবে ‘তাসনীম, ওটা একটা ঝর্ণা, যা থেকে (আল্লাহ্‌র) নৈকট্যপ্রাপ্তরা পান করবে। (সূরাহ আল-মুতাফ্‌ফিফীনঃ ২২-২৮)
আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,“ তাদের জন্য আছে নির্ধারিত রিয্‌ক- ফলমূল; আরা তারা হবে সম্মানিত। (তারা থাকবে) নি’য়ামাতের ভরা জান্নাতে উচ্চাসনে মুখোমুখী হয়ে তাদের কাছে চক্রাকারে পরিবেশন করা হবে স্বচ্ছ প্রবাহিত ঝর্ণার সুরাপূর্ণ পাত্র। নির্মল পানীয়, পানকারীদের জন্য সুপেয়, সুস্বাদু। নেই তাতে দেহের জন্য ক্ষতিকর কোন কিছু, আরা তারা তাতে মাতালও হবে না। (সূরাহ আস্‌-সা-ফ্‌ফাতঃ ৪১-৪৭) ”আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,“ দু’টো বাগানেই আছে অবিরাম ও প্রচুর পরিমাণে উৎক্ষিপ্তমান দু’টো ঝর্ণাধারা। অতএব (হে জ্বিন ও মানুষ!) তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নি’মাতকে অস্বীকার করবে? (সূরাহ আর্‌-রহমানঃ ৬৬-৬৭)”এছাড়া জান্নাতের ঝর্ণা সম্পর্কে কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে,“ সেখানে থাকবে প্রবাহমান ঝর্ণা (সূরাহ আল-গাশিয়াহঃ ১২)”মহান আল্লাহ্‌ বলেন,“ নিশ্চয়ই মুত্তাকীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে, বাগান আর ঝর্ণার মাঝে (সূরাহ আদ্‌-দুখানঃ ৫১-৫২)”মহান আল্লাহ্‌ বলেন,“ মুত্তাকীরা থাকবে ছায়া আর ঝর্ণাধারার মাঝে, আর তাদের জন্য থাকবে ফলমূল-যেটি তাদের মন চাইবে। (সূরাহ আল-মুরসালাতঃ ৪১-৪২)৮// #জান্নাতীদের_গুণাবলীঃ জান্নাতীরা ষাট হাত লম্বা হবেঃআবু হুরাইরাহ রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “জান্নাতে প্রবেশকারী প্রত্যেক ব্যক্তি আদম আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালামের ন্যায় ষাট হাত লম্বা হবে। (প্রথমে মানুষ ষাট হাত ছিল) পরবর্তীতে তারা খাট হতে লাগল, শেষে বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে”। (সহীহ মুসলিম)জান্নাতীদের চেহারা ও বয়সঃমোয়াজ বিন জাবাল রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশের সময় তাদের চেহারায় কোন দাড়ি-গোঁফ থাকবে না। চক্ষুদ্বয় লাজুক হবে। বয়স হবে ত্রিশ থেকে তেত্রিশ এর মাঝামাঝি”। (তিরমিজী)
জান্নাতীদের খাবার হজম প্রক্রিয়াঃজাবের বিন আবদুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “জান্নাতীরা পানাহার করবে কিন্তু থুথু ফেলবে না এবং পায়খানা-প্রস্রাবও করবে না। নাকে পানি আসবেনা”। সাহাবাগণ আরয করলেন, “তাহলে তাদের খাবার কোথায় যাবে?” তিনি উত্তরে বললেন, “ঢেকুর ও ঘামের মাধ্যমে তা হজম হবে। জান্নাতীরা এমনভাবে আল্লাহ্‌র প্রশংসা ও তাসবীহ্‌ পাঠ করবে যেমন তারা শ্বাস গ্রহণ করে”। (সহীহ মুসলিম)
৯// #জান্নাতীদের_খাবার_ও_পানীয়রাসূলুল্লাহ্‌ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গোলাম সাওবান রাযিয়াল্লাহু তা’আলা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট দাঁড়িয়ে ছিলাম। ইতোমধ্যে ইহুদীদের পাদ্রীদের মধ্য থেকে একজন পাদ্রী আসল এবং জিজ্ঞেস করল, “যে দিন আকাশ ও যমিন প্রথম পরিবর্তন করা হবে তখন মানুষ কোথায় থাকবে?” রাসূলুল্লাহ্‌ সল্লল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “পুলসেরাতের নিকটবর্তী এক অন্ধকার স্থানে”। অতঃপর ইহুদী আলেম জিজ্ঞেস করল, “সর্ব প্রথম কে পুলসিরাত পার হবে?” তিনি বললেন, “গরীব মুহাজিরগণ (মক্কা থেকে মদীনার হিযরতকারী)”। ঐ ইহুদী পাদ্রী আবার জিজ্ঞেস করল, “জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশ করার পর সর্ব প্রথম তাদেরকে কী খাবার পরিবেশন করা হবে?” রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “মাছের কলিজা”। ইহুদী জিজ্ঞেস করল, “এর পর কী পরিবেশন করা হবে?” রাসূলুল্লাহ সল্লল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “এরপর জান্নাতীদের জন্য জান্নাতে পালিত গরুর গোশত পরিবেশন করা হবে”। এরপর ইহুদী জিজ্ঞেস করল, “খাওয়ার পর পানীয় কী কী পরিবেশন করা হবে?” রাসূলুল্লাহ সল্লল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “সালসাবীল নামক ঝর্ণার পানি”। ইহুদী পাদ্রী বলল, “তুমি সত্য বলেছ…”। (সহীহ মুসলিম- কিতাবুল হায়েজ)
এ পৃথিবী হবে জান্নাতীদের রুটিআবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ্‌ সল্লল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেনঃ কিয়ামতের দিন এ পৃথিবী একটি রুটির ন্যায় হবে। আল্লাহ্‌ স্বীয় হস্তে তা এমনভাবে উলট পালট করবেন যেমন তোমাদের কেউ সফররত অবস্থায় তার রুটিকে উলট পালট কর। আর ঐ রুটি দিয়ে জান্নাতীদেরকে মেহমানদারী করা হবে”। (সহীহ মুসলিম)
সকাল সন্ধ্যায় জান্নাতীদের খাবার পরিবেশন করা হবেকুরআনুল কারীমে আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,“ এবং সকাল সন্ধ্যায় তাদের জন্য রিযিকের ব্যবস্থা থাকবে। (সূরাহ মারইয়ামঃ ৬)”জান্নাতের শরাব পান করার পর কোন প্রকার মাতলামি ভাব দেখা দিবে না। (সূরাহ আস্‌-সা-ফ্‌ফাতঃ ৪১-৪৭) জান্নাতীদেরকে এমন শরাব পান করানো হবে যার মধ্যে আদার স্বাদ থাকবে। (সূরাহ আদ্‌-দাহ্‌রঃ ১৫-১৮) জান্নাতীদের পানের জন্য সুস্বাদু পানি, সুমিষ্ট দুধ, সুস্বাদু শরাব, পরিষ্কার স্বচ্ছ মধুর নদীও জান্নাতে বিদ্যমান থাকবে। (সূরাহ মুহাম্মদঃ ১৫) জান্নাতীদের মেহমানদারীর জন্য অন্যান্য ফল ব্যতীত খেজুর, আঙ্গুর, আনার, বরই, আনজীর ইত্যাদি ফলও থাকবে। (সূরাহ আর-রহমানঃ ৬৮)[, (সূরাহ আল-ওয়াক্বি’আহঃ ২৭-৩২) জান্নাতীদের সেবায় ‘শারাবান ত্বাহুরা’ (পবিত্র পরিচ্ছন্ন পানীয়) পেশ করা হবে। (সূরাহ আদ্‌-দাহ্‌রঃ ২১) উটের গর্দানের মত পাখির গোশত জান্নাতীদের পরিবেশন করা হবে। (তিরমিজী- কিতাবুল জান্নাহ
১০// #জান্নাতের_সুসংবাদ_প্রাপ্ত_ব্যক্তি#আবু_বকর ও ওমর রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুআলী ইবনে আবু তালিব রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি একদা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলাম। হঠাৎ করে আবু বকর ও ওমর রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুও চলে আসলেন। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তারা উভয়ে বৃদ্ধ বয়সে মৃত্যুবরণকারী মুসলমানদের সর্দার হবে – তারা পূর্ববর্তী উম্মতের লোক হোক আর পরবর্তী উম্মতের। তবে নবী ও রাসূলগণ ব্যতীত। হে আলী! তুমি এ সংবাদ তাদেরকে দিও না”। (তিরমিজী- আবওয়াবুল মানাকেব)
#হাসান_হুসাইন রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুআবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সল্লল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “হাসান ও হুসাইন রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু জান্নাতী যুবকদের সর্দার হবে”। (তিরমিজী- আবওয়াবুল মানাকেব)
#আশারা_বাশ্‌শারারাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম দশজনকে দুনিয়াতেই তাদের জান্নাতী হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন। তাদেরকে আশারা মুবাশ্‌শারা বলা হয়। আবদুর রহমান বিন আওফ রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আবু বকর জান্নাতী, ওমর জান্নাতী, ওসমান জান্নাতী, আলী জান্নাতী, তালহা জান্নাতী, যুবাইর জান্নাতী, আবদুর রহমান আওফ জান্নাতী, সা’দ বিন আবূ ওক্কাস জান্নাতী, সাঈদ বিন যুবাইর জান্নাতী, আবু ওবাইদা ইবনুল জার রাহ জান্নাতী”। (তিরমিজী- আবওয়াবুল মানাকেব)
#খাদীজা রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহাআয়েশা রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ্‌ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদিজা রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহাকে জান্নাতে একটি ঘরের সুসংবাদ দিয়েছেন”। (সহীহ মুসলিম)
#উম্মে_সুলাইম ও বেলাল রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুজাবের বিন আবদুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ আমাকে জান্নাত দেখানো হল, আমি আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর স্ত্রীকে (উম্মে সুলাইম) সেখানে দেখতে পেলাম। অতঃপর আমি সামনে অগ্রসর হয়ে কোন মানুষের চলার আওয়াজ পেলাম। হঠাৎ দেখলাম বেলাল রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু কে”। (সহীহ মুসলিম)
#তালহা রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু
যুবায়ের রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “উহুদের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই জোড়া কাপড় পরিধান করে ছিলেন। তিনি একটি পাথরের উপর আরোহণ করতে ছিলেন কিন্তু তিনি তাতে চড়তে পারছিলেন না। তখন তিনি তালহা রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে তাঁর নিচে বসালেন এবং তার ওপর আরোহণ করে তিনি তাতে চড়লেন। যুবায়ের বলেন, এসময় আমি নাবী সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেনঃ তালহার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে”। (তিরমিজী- আবওয়াবুল মানাকেব)
#আবদুল্লাহ_বিন_সালাম রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু
সা’দ রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোন জীবিত ব্যক্তির ব্যাপারে একথা বলতে শুনি নাই যে সে জান্নাতী, তবে শুধু আবদুল্লাহ বিন সালামকে একথা বলেছেন”। (সহীহ মুসলিম) ১১// #জান্নাতের_দরজাসমূহ
বাব আস-সালাহ বাব আল-জিহাদ বাব আস-সাদাকাহ বাব আর-রাইয়ান বাব আল-হাজ্জ বাব আল-কাদিমিন আল-গায়িধ বাব আল-ইমান বাব আয-যিকির১২ #কুরআনে_বর্ণিত_জান্নাতের_নামসমূহ ফিরদাউস – জান্নাতের সর্বচ্চো বাগান (আল-কাহফ আল-মু’মিনূন দারুস সালাম – শান্তির নীড় (ইউনুস, আল আনআম) জান্নাতুল মাওয়া –বসবাসের জান্নাত (আন-নাজম[ দারুল খুলদ – চিরস্থায়ী বাগান (আল-ফুরকান জান্নাতুল আদন – অনন্ত সুখের বাগান (আত-তাওবাহ্‌: 72,আর-রাদ[১০]) জান্নাতুল আখিরাহ – আখেরাতের আলয়(আল-আনকাবূত) জান্নাতুন নাঈম –নেয়ামত পূর্ণ কানন/বাগান (সূরা আল-মায়িদাহ ইউনুস,,[১৩] al-Ḥajj দারুল মুকামাহ – বাড়ি (ফাতির) জান্নাত–সবচেয়ে সাধারণভাবে ব্যবহৃত কুরআন ও হাদীসে শব্দ(আল-বাকারা,[১৬] আল ইমরান আল -মায়িদা) আল-হুসনা আল-গুফরা

মাদখালী দলের জন্মের ব্যাপারে শায়খ বাকর আবু যায়েদের ভবিষ্যদ্বাণী

ডঃ রাবী ইবন হাদী আলমাদখালী যখন তার দল তৈরির প্রথম পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন, তখন সাইয়েদ কুতুবের বিরুদ্ধে এক বই লিখেন। এই বই টা কেমন হলো তা জানতে চিঠি লেখেন সাঊদী আরবের সেরা আলিমদের সংস্থা “হাইয়াতু কিবারিল উলামা” এর প্রখ্যাত শায়খ ডঃ বকর আবু যায়দের কাছে।

তিনি ওই পান্ডুলিপি পড়ে খুব কষ্ট পান। সেই কষ্টের কথা গুলো তিনি তার এই চিঠিতে লিখে দেন। এই চিঠিকে “আল খিতাব আয যাহাবী” বা সোনালী চিঠি বলে সবাই চেনে।

মাদখালীর এই সব বই উম্মাতের কি ক্ষতি করবে তার একটা ভবিষ্যদ্বাণী তিনি এখানে করে গিয়েছিলেন।

আপনারা যারা মুতিউর রহমান মাদানী ও তার বশংবদের কথা শুনে অভ্যস্ত চিঠির আয়নায় তাদের চেহারা টা একটু দেখুন, অনেক কিছু বুঝতে পারবেন।

চিঠিটার আরবী ভার্সনটা নিচের লিংক্স এ ক্লিক করলে পেয়ে যাবেনঃ

“সম্মানিত ভাই শায়খ রাবী’ বিন হাদী আলমাদখালী
আসসালামু আলাইকুম ওয়রাহমাতুল্লাহ ওয়াবারাকাতুহু

পরবার্তা, এতদস্ংগে পাঠানো “আদওয়া ইসলামিয়্যাহ আলা আক্বীদাতি সাইয়েদ ক্বুতুব ওয়া ফিকরিহি” শীরোনামের বইটা পড়ে দেখার আশা আপনি করছেন। জানতে চেয়েছেন এতে আমার কোন মন্তব্য আছে কিনা। আমি জানতে চাচ্ছি, আমার মন্তব্য পেয়ে কি এই প্রজেক্টটাকে বন্ধ করে গুটিয়ে নেয়া হবে? কিংবা এই সবের বর্ণনা করা বাদ দেয়া হবে? নাকি এর আলোকে বইটা সংশোধন করে বইটা প্রকাশ ও প্রচার করবেন? অথবা এই কিতাব কি আপনার আখেরাতের জন্য একটা সঞ্চয় মনে করবেন? কিংবা দুনিয়াতে আল্লাহর বান্দাহদের জ্ঞানের চোখ এতে খুলবে?

যাহোক, আপনার বই সম্পর্কে আমি আমার মন্তব্য বলছিঃ

১। আমি বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় সূচিপত্র দেখেছি, এতে যে শীরোনাম গুলো পেলাম তা সাইয়েদ ক্বুতুবের (র) ব্যাপারে এইভাবে বলা হয়েছেঃ (কুফর, নাস্তিকতা ও যিন্দিকতা মূলক বক্তব্য, তার সর্বেশ্বরবাদের বক্তব্য, তার “কুরআন সৃষ্ট হওয়ার” অভিমত, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো আইন প্রনয়নের অধিকার থাকা বৈধ হওয়া, আল্লাহ তাআলার সিফাতের ব্যপারে তার বাড়াবাড়ি, মুতাওয়াতির হাদীস গ্রহন করা যাবেনা বলে তার মত, আক্বীদায় যেসব বিষয়ে দৃঢ়তার প্রয়োজন সে সব বিষয়ে সন্দেহবাদিতা, সমাজকে কাফির বলা ইত্যাদি)

এমন সব শীরোনাম ব্যবহার করা হয়েছে যা মুমিনদের রোমকূপ খাড়া দিয়ে ওঠে। আফসোস হচ্ছে সারা দুনিয়ার‍ ঐসব আলিমদের জন্য, যারা সাইয়েদ কুতুবের এত বড় ঈমান বিধ্বংশী বিষয়গুলোতে সতর্ক হননি… অথচ সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ার মত সাইয়েদ কুতুবের কিতাব সারা দুনিয়ার ছড়িয়ে পড়েছে। এতো সর্বজন গ্রাহ্যতার সাথে আপনার পাওয়া ভুলের সামঞ্জস্য আমি মিলাতে পারছিনা। অথচ সাধারণ মুসলিমগণ এই বই সমূহ থেকে উপকৃত হয়েছে। এমনকি আপনিও কিছু কিছু লেখনীতে তার থেকে উপকৃত হয়েছেন। এই ক্ষেত্রে আমি আপনার দেয়া শীরোনামের সাথে বইয়ে লেখা বিষয়বস্তু মিলিয়ে দেখেছি। দেখলাম আপনি যা বলেছেন, বাস্তব তা নয়। শেষে বুঝেছি, আপনার দেয়া শীরোনামগুলো মূলতঃ সাধারণ মানুষের মনোযোগ সাইয়েদের ভুলের প্রতি আকর্ষণ করার জন্য উত্তেজনা ছড়াবার লক্ষ্যেই প্রণীত। আমি আপনার জন্য, আপনাদের জন্য এবং প্রতিটি মুসলিম নাগরিকের জন্য এই ধরণের পাপ ও একদেশদর্শিতাকে অপছন্দ করি। আর এটা নির্লজ্জ প্রতারণা যে, আপনি একজন মানুষের ভালো দিক গুলোকেও তার শত্রু ও অপছন্দকারীদের হাতে খারাপ ভাবে তুলে ধরছেন।

২- আমি দেখলাম, বইটাতেঃ
একাডেমিক গবেষণার মূলনীতি মেনে চলা হয়নি। জ্ঞানগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হয়নি। সমালোচনা সাহিত্যের প্রয়োগ ও পদ্ধতি অনুসৃত হয়নি। কোন বক্তব্য উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে আমানত রক্ষা হয়নি। বাস্তবতা ও সত্য হযম করার মানসিকতা এখানে দেখানো হয়নি।
এছাড়াও আপনার লেখায় ডায়লগের আদব রক্ষা পায়নি। উন্নততর লেখনী কিংবা সাবলীল উপস্থাপনার সাথে আপনার বই এর সামান্যতম সম্পর্কও নেই।

প্রমান নিনঃ
প্রথমতঃ আপনি জেনে শুনে সাইয়দের ” ফী যিলালুল কুরআন” ও “ইসলাম ও সামাজিক সুবিচার” বইদ্বয়ের পুরনো প্রকাশনা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন, যেমন আপনার বইএর পৃষ্ঠা ২৯, আপনি জানেন এই বই গুলোর পরবর্তি সংস্করণ ছিলো। এ ক্ষেত্রে আপনার সমালোচনার মূলনীতি ও জ্ঞানের আমানাত রক্ষা করা উচিত ছিলো। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি বইয়ের সর্বশেষ সংস্করণে লেখার টেক্সটকেই মূল ধরতে হয়। কারণ পরে যে পরিবর্তন আনা হয়, তা আগের সংস্করণের বক্তব্যকে রহিত করে দেয়। আর এই প্রাথমিক জ্ঞানটা, আল্লাহ চাইলে, আপনার অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু হয়ত আপনার যে ছাত্র এইসব তথ্যগুলো আপনার কাছে এনে দিয়েছে, সে আসলে ভুল করেছে এবং সে এটা বুঝেনি। এই সব ব্যপার যে ঘটে তা জ্ঞানীদের কাছে অজানা নয়।

যেমন ধরুনঃ ইমাম ইবনুল কায়্যিম এর কিতাব “ আল-রূহ”, কেও কেও এই ব্যাপারে অভিমত রেখেছেন এটা তার প্রথম জীবনের কিতাব। অনুরূপ ভাবে “ইসলাম ও সামাজিক সুবিচার” ও সাইয়েদ কুতুবের ইসলামের বিষয়ে প্রথম দিককার লেখা। আল্লাহুল মুসতাআন।

দ্বিতীয়তঃ আমার রোমকূপ খাড়া হয়েছে যখন দেখেছি আপনি বইয়ের সূচিপত্রে লিখেছেন, “সাইয়েদ কুতুব আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো আইন প্রনয়ন বৈধ বলেন”।
আমি তক্ষুনি তার বক্তব্যের দিকে দ্রুত পাতা উল্টালাম, দেখলাম তার বই “ইসলামে সামাজিক সুবিচার” এর কয়েক লাইনের একটা উদ্ধৃতি। অথচ তার বক্তব্য মোটেই এই ধরণের উত্তেজনা সৃষ্টিকারী অর্থ দেয়না। ধরে নেই তার বক্তব্যে কিছু দূর্বোধ্য বাক্য বা অনির্দিষ্ট কিছু বাক্য আছে, সেইটাকে কিভাবে আপনি কুফরি হবার বক্তব্যে পরিণত করবেন? এর দ্বারা আপনি সাইয়েদ কুতুব যে সত্যের উপর ভিত্তি করে আপন জীবন বানিয়েছেন, তার কলমকে আল্লাহর সার্বভৌমত্যের এবং আইন প্রনয়নের তাওহীদের দিকে দাওয়াতের জন্য ব্যবহার করেছেন, মানব রচিত আইনকে অগ্রাহ্য করে এই ধরণের আইন রচয়িতাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন – তাকে আপনি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন। আল্লাহ অবশ্যই ইন্সাফ পছন্দ করেন, অথচ আপনাকে এ ক্ষেত্রে ইন্সাফের বিপরীতে দখতে পেয়েছি।

তৃতীয়তঃ এই ধরণের আরেক উত্তেজনাকর শীরোনাম হলোঃ “সাইয়েদ কুতুব সর্বেশ্বরবাদের পক্ষে মত দিয়েছেন”। আসলে সাইয়েদ সূরা হাদীদ ও সূরা ইখলাস এর তাফসীর করতে যেয়ে নিজস্ব পদ্ধতিতে কিছু রহস্যপূর্ণ কথার মালা গেঁথেছেন। যা থেকে তিনি সর্বেশ্বরবাদে বিশ্বাসী এমন কথা বলা হয়।

তবে আপনি খুব ভালো করেছেন সূরা বাক্বারায় সাইয়েদের সর্বেশ্বরবাদ সম্পর্ক স্পষ্ট বিরোধিতা উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেনঃ “এখানেই ইসলামের সঠিক সন্দর্শন সর্বেশ্বরবাদি দর্শনকে তিরোহিত করে দেয়”। আমি আরো বলি, তার বই “মুক্বাওয়ামাত তাসওয়ূরুল ইসলামি” গ্রন্থে সাইয়েদ সর্বেশ্বরবাদিতার জোরালো বিরোধিতা করে বিস্তারিত জওয়াব দিয়েছেন। এই জন্য বলি, আল্লাহ সাইয়েদ কুতুবের রহস্যপূর্ণ এমন কথা ক্ষমা করে দিন যা বক্তব্যের মারপ্যাঁচে তিনি হয়ত কিছু একটা বুঝাতে চেয়েছেন। তবে সর্বেশ্বরবাদিতা ভুলের ব্যাপারে স্পষ্ট বক্তব্য থাকলে এই ধরণের হেঁয়ালি কথার টানাটানি করতে হবে কেন? আমি আশা করবো তাড়াতাড়ি আপনি সাইয়েদকে কাফির বানানো বক্তব্য প্রত্যাহার করুন, মনে রাখবেন, আমি আপনাদের কল্যানকামী।

চতূর্থতঃ এখানে আমি আপনার সদয় অবগতির জন্য স্পষ্ট করে বলতে চাই, আপনি যে শীরোনাম দিয়েছেনঃ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুর ব্যখ্যায় সাইয়দে কুতুব অন্যন্য উলামায়ে কিরাম ও ভাষা তাত্ত্বিকদের বিপরীতে গেছেন, এবং তার কাছে রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের বিষয় স্পষ্ট হয় নি”………

প্রিয়ভাজন, আপনাকে বলি, আপনি প্রমান ছাড়াই সাইয়েদের তাওহীদ ও তাওহীদ সংক্রান্ত বিষয়াবলীর আলোচনা, এবং তাওহীদের সম্পূরক ঐ সব বিষয়, যা তার সারা জীবনে প্রমান করে গেছেন- তা ভেঙে দিয়ে শেষ করেছেন।

সাইয়েদ বলেছেন, “তাওহীদের কালিমার দাবী হলো, আইন ও আইন প্রণয়নের ব্যাপারে আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি দেয়া” তার এই একটা কথা ই আপনার সমস্ত কথা অন্তসার শুন্য করে দেয়। এই ব্যাপারে সাইয়েদ (র) অনেক বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন। কারণ তিনি দেখেছেন আল্লাহর আইনের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে বিচারালয় বা অন্যান্য আইনী সংস্থা। আল্লাহর আইন বাতিল করার মত ধৃষ্টতাও তারা দেখাচ্ছে। বরং তারা আল্লাহর আইনের পরিবর্তে মানব রচিত আইনকে হালাল সাব্যস্ত করতে উঠে পড়ে লেগেছে। আর সত্যি বলতে কি, ১৩৪২ হিজরীর আগে মুসলিম জাতির সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এমন মারাত্মক ধৃষ্টতা আর দেখানো হয়নি।

পঞ্চমতঃ আপনি সূচিপত্রের আরেকটা শীরোনাম দিয়েছেনঃ “সাইয়েদ বলেছেন, “কুরআন সৃষ্ট”। তিনি নাকি বলেছেনঃ “আল্লাহর কথা মানে হলো আল্লাহর ইচ্ছা”…… আমি যখন আপনার বই এর মূল পৃষ্ঠায় গেলাম, পড়ে একটা অক্ষরও পেলামনা যাতে বুঝা যায় সাইয়েদ (র) এই শব্দ “কুরআন সৃষ্ট” টা স্পষ্ট ব্যবহার করেছেন। কিভাবে এত সহজে আপনি তাকে এই ধরণের কুফরি কথার তোহমাত দিতে পারলেন? আমি শেষে যা দেখলাম তা হলো, তার লেখার স্টাইলে এই ধরণের একটু ইংগিত পাওয়া যায়। যেমন সাইয়েদ কুতুব বলেছেনঃ “কিন্তু তারা (কাফিররা) এই সব অক্ষর সমূহ (হুরুফে মুকাত্তাআত) দিয়ে কুরআনের মত রচনা করতে পারেনা। কারণ কুরআন হলো আল্লাহ কৃত, মানুষকৃত নয়”…… এই “কৃত” শব্দটা, সন্দেহ নেই, একটা ভুল প্রয়োগ, কিন্তু এই শব্দের কারণেই কি আমরা বলতে পারবো সাইয়েদ এই শব্দ দিয়ে ঐ “কুরআন সৃষ্ট” এমন কুফরী কথা বলেছেন? না, আমি ঐ প্রকার অর্থে নিশ্চিত হতে পারিনা…… আপনার এই কথা শায়খ আব্দুল খালেক্ব উদ্বায়মাহ (র) এর “দিরাসাত ফী উসলূবিল ক্বুরআন” নামক বিশ্বকোষের ভূমিকায় এই ধরণের একটা কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এই গ্রন্থটা আলইমাম ইউনিভার্সিটি প্রকাশ করে ধন্যবাদার্হ হয়েছেন। তিনিও এই শব্দ ব্যবহার করেছেন, এই ধরণের শব্দ প্রয়োগের কারণে কি আমরা সবাইকে বলবো “আপনি কুরআন সৃষ্ট” আক্বীদাহ পোষণ করেছেন? না, কক্ষনোই না। আমি আপনার গবেষণায় এই “অব্জেক্টিভিটি”এর দিকে দৃষ্টি দিতে পরামর্শ দেব। এই উদাহরণ ই এ ব্যাপারে যথেষ্ঠ, মনে রাখবেন, গবেষণায় এটা খুবই জরুরি।

আমার আরো কিছু বক্তব্য আছে, যা নিচে বর্ণনা করা হচ্ছেঃ
১। কিতাবটার মুসাবিদা হাতে লেখায় ১৬১ পৃষ্ঠা হয়েছে। কিন্তু দেখলাম এর হাতের লেখার ধরণ বিভিন্ন। সাধারণতঃ যা হয়, তার ব্যতিক্রম মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে এর একটা পৃষ্ঠাও আপনার লেখা না। অবশ্য হতে পারে আপনার হাতের লেখা পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে, অথবা আমারই মতিভ্রম হয়েছে। অথবা হতে পারে সাইয়েদ কুতুব (র) এর বই গুলোকে কিছু ছাত্রের উপর ভাগ করে দেয়া হয়েছিলো, তারাই আপনার তত্বাবধানে সেই সব কিতাব থেকে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করেছে, অথবা আপনার ডিক্টেশান নিয়ে তারা লিখেছে। এই জন্য আমার কাছে এটা আপনার লেখা প্রমান করা কষ্ট হচ্ছে। অবশ্য আপনি ফ্রন্ট পেইজে লিখেছেন এই বই আপনার লেখা, কাজেই আমি মেনে নিচ্ছি এটা আপনার লিখিত বই।

২। হাতের লেখা বিভিন্নতা সত্বেও বইয়ের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এইটাই স্রোতধারা বহমান, তা হলো এর ভেতর থেকে আমরা অনুভব করি এক উত্তেজিত মন, সেখানে ভরা অনিরুদ্ধ ক্ষোভ, ও এমন আক্রমন যা লেখকের বক্তব্যকে সংকুচিত করে বড় বড় ভুল বের করার চেষ্টা করা হয়েছে। যেখানে সংশয়ের স্থান, বা অনুক্ত বক্তব্যকে বানানো হয় যেন সংশয়াতীত ভাবে বলা এমন কোন কথা, যাতে কোন দ্বিমতের সুযোগ নেই…… এটা “নিরপেক্ষতা” নামক সমালোচনা সাহিত্যের স্বতঃসিদ্ধ পদ্ধতির বরখেলাপ।

৩। সাইয়েদের লেখার স্টাইলের সাথে এই বই যে কেও তুলনা করলে দেখতে পাবে কত নিম্ন মানের আপনার লেখা। সাইয়েদের লেখার মান কত উঁচু। আপনার পাঠানো এই বই যদি মেনে নেই আপনারই, তা হলে বলবো এটা একজন প্রি-ইউনিভার্সিটি ছাত্রের মানে হতে পারে। একজন বিশ্বমানের সার্টিফিকেটধারীর জন্য এ লেখা মানায় না। সাইয়েদের সমালোচককে সাহিত্য রুচির দিক দিয়ে, ভাষার অলংকার ও বর্ণনা শৈলীতে এবং সুন্দরতম উপাস্থাপনার ঢংঙে অন্ততঃ তার পাশে যাবার যোগ্যতা থাকতে হবে। তা না হলে কলম ভেঙে ফেলা উচিৎ।

৪। আপনার লেখার মধ্যে অযাচিত উত্তেজনার আধিক্য আছে যেমন, তেমনই দেখা যায় “সমালোচনার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির” উপর আপনার ভীতি……… এইজন্য “ডায়লগের” আদব রক্ষা পায়নি।

৫। এই বই এর প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আক্রমন, জলাতংকের সংক্রমন, এবং ভাষার ব্যবহারে মারাত্মক কাঠিণ্য। কেন এটা………?

৬। আপনার এই কিতাব বের হলে নতুন একটা “দলের” উদ্ভব হবে, যার যুবক সদস্যদের মন ভরা থাকবে চিন্তার ভ্রষ্টতা দিয়ে। যারা কথায় কথায় এটা ওটা হারাম বলবে, যে কোন জিনিষের খামাখা বিরোধিতা করবে। কথায় কথায় তাদের উক্তি হবে এটা বেদআত, ঐটা বেদআতী, এটা পথভ্রষ্টতা, ঐটা পথভ্রষ্ট …………

যারা তাদের বক্তব্য প্রমানের জন্য যথেষ্ঠ দলীলের পরোয়া করবেনা। “নিজেরা বেশি দ্বীনদার” এই অহংকার ও দাম্ভিকতা তাদের দিলে জন্ম নেবে। এদের কাজ দেখে মনে হবে এদের একেক জন যেন এই সব করে তাদের ঘাড়ের বোঝা ঝেড়ে ফেলতে চাচ্ছে। এরা একেকজন যেন সমগ্র উম্মাতকে গর্ত থেকে ঊঠানোর ত্রাতা হয়ে এসেছে। পবিত্র শারীয়াতের সম্মান বাঁচাতে অন্যদেরকে তারা মনে করবে জাত্যাভিমানহীন বা তাক্বওয়াহীন। এটা তাদের বাস্তব বিবর্জন, বরং এটা আসলেই ধ্বংশ, যদিও এটাকে মনে করা হবে উঁচু ব্যালকনী দেয়া বিল্ডিং বিনির্মান, কিন্তু আসলে এটা ভেঙে ফেলা, এর পরে মাতাল ঝড়ের কোন এক সোপানে একসময় ঠান্ডা হয়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া।

এই ৬টা বৈশিষ্ট্য দিয়ে সাজানো বইটা আসলেই সুখপাঠ্য নয়। আপনারই আকাংক্ষা আমি বইটা পড়ি। তবে বইটা পড়ে এটাই আমার কাছে মনে হয়েছে। জওয়াব দিতে দেরি হওয়ায় আমি দুঃখিত, কারণ ইতিপূর্বে এই লোকের (সাইয়েদ কুতুবের) কোন লেখা যত্ন সহকারে পড়া আমার হয়নি। যদিও মানুষ সেগুলো পড়ে।
আপনার লেখার ভয়াবহতা আমাকে তার প্রায় বই গুলো কয়েক মর্তবা পড়তে আগ্রহী করেছে। আমি তার গ্রন্থে অনেক কল্যান পেয়েছি, দীপ্যমান ঈমান পেয়েছি, উজ্জ্বল হক্ব পেয়েছি, বুঝতে পেরেছি ইসলামের শত্রুদের মারাত্মক পরিকল্পনাসমূহ ফাঁস করে দেয়া ব্যাখ্যা।

যদিও তার বক্তব্যের মাঝে, এবং কিছু বাক্যের মাঝে কিছু ভুল পেয়েছি। মনে হয়েছে যদি তিনি এগুলো না উচ্চারণ করতেন! অবশ্য এর অনেক গুলোর ব্যাপারে তিনি অন্যত্র স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন তাতে আগের কথা অপনেয় হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে কোন ব্যাক্তির পরিপূর্ণতা সহজ বিষয় নয়। আর তিনি একজন সাহিত্যিক ও সাহিত্য সমালোচক ছিলেন। এরপর তিনি কুরআন কারীম, হাদীস শরীফ ও সীরাতুন্নাবী (সা) অধ্যায়নের মাধ্যমে ইসলামের খিদমাতের দিকে মুখ ফেরান। ফলে তার যুগের বিভিন্ন বিষয়ে তাকে অবস্থান নিতে হয়, এবং আল্লাহর পথে তার অবস্থানে তিনি অনড় ছিলেন।

একসময় তার আগের লেখা বিষয়গুলো প্রকাশ করা হয়। এক সময়ে এমনকি তাকে এমন কিছু লিখতে বলা হয় যাতে মাফ চাওয়া বুঝায়। তিনি তখন তার সেই প্রসিদ্ধ বক্তব্য প্রদান করেনঃ যে অঙ্গুলি আমি শাহাদাত উচ্চারণের জন্য উঁচু করি, তা দিয়ে আমি এমন একটা শব্দও লিখতে পারবোনা, যা সেই শাহাদাতেরই বিপরীতে দাঁড়ায়”……

আমাদের সবার উচিৎ তার মাগফিরাতের জন্য দুয়া করা, তার জ্ঞান থেকে উপকৃত হওয়া, এবং তার যে সব ভুল আমাদের কাছে প্রমানিত হয়েছে তা পরিস্কার করা। তার করা ভুল যেন তার জ্ঞান থেকে উপকার বঞ্চিত না করে আমাদের। এই ভুলের কারণে তার বইগুলোকে আমাদের ত্যাগ করতে বাধ্য না করা হয়।

আল্লাহ আপনাকে হিফাযাত করুন, আপনি তার অবস্থা আমাদের অতীত হওয়া সালাফদের অবস্থার মত মনে করুন। যেমন আবু ইসমাঈল আলহারাওয়ী, এবং আব্দুল কাদির জিলানী। শায়খুল ইসলাম ইবন তায়মিয়্যাহ কিভাবে তাদের পক্ষ নিয়ে কথা বলেছেন, অথচ কত মারাত্মক ভুল তাদের ছিলো। শায়খুল ইসলাম তাদের পক্ষপাতিত্ব করেছেন, কারণ এই দুইজনের মূল কাজ ছিলো ইসলাম ও সুন্নাহকে সাহায্য করা। আপনি আলহারাওয়ীর (র) “মানাযিল আল সাই রীন” বইটা দেখুন। দেখবেন সেখানে এমন কিছু রোমকূপ শিউরে দেয়া কথা আছে যা মেনে নেয়া সম্ভব নয়। এতদসত্বেও ইবনুল কায়্যিম (র) এই বই এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ “মাদারিজুস সালেকীন” এ তার পক্ষ থেকে কত কাকুতি করে মাফ চেয়েছেন, এবং তাকে এ ব্যাপারে অপরাধী বানাননি। আমি এই ব্যাপারে আমার বইয়ে “তাসনীফ আন নাস বায়না আল যান্ন ওয়াল ইয়াক্বীন” (ধারণা ও বিশ্বাসের মাঝে মানুষকে শ্রেনীবদ্ধ করা) যতটুকু পেরেছি, মূলনীতি আলোচনা করেছি।

সবশেষে সম্মানিত ভাই, আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি, “আদওয়া ইসলামিয়্যাহ” নামের এই বইটা প্রকাশ করা থেকে নিবৃত্ত হোন। আসলে এটা প্রকাশ ও প্রচার করা বৈধও না। কারণ এতে আছে মারাত্মক আক্রমন। এর দ্বারা আপনি উম্মাতের যুবকদের উলামাদের ভুল খোঁজার জন্য, তাদের কেটে ছিড়ে ফেলার জন্য, তাদের অপমান করার জন্য, এবং তাদের মর্যাদাকে ভূলণ্ঠিত করার জন্য জঘন্যভাবে প্রশিক্ষিত করে তুলবেন।

আল্লাহ আপনাকে বরকত দিন, আপনাকে যদি কঠিন কথা কষ্ট দিয়ে থাকি মাফ করবেন, এটা করেছি কারণ এ বইতে আমি মারত্মক আক্রমন দেখতে পেয়েছি, আমার স্নেহ গ্রহন করুন, আপনার বইয়ের ব্যাপারে আমার মত জানার জন্য বারবার আগ্রহ প্রকাশ কারণে আমার কলম দিয়ে এই কথা গুলো বের হলো।

আল্লাহ আমাদের সকল পদক্ষেপ সোজা করে দিন।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকুতুহু

http://www.nationalkuwait.com/forum/index.php…

যে বইটা সালাফিয়্যাতকে মাদখালী গ্রুপে রূপান্তরিত করেছে

যে বইটা সালাফিয়্যাতকে মাদখালী গ্রুপে রূপান্তরিত করেছে
—————————————————————————

১৯৯৫ সালের দিকে মদীনাতে বড় ধরণের একটা পরিবর্তন আসে। ঐ সময় মদীনা বিশ্যবিদ্যালয়ে ডঃ শায়খ রবী বিন হাদী আলমাদখালীকে অনেক বড় পজিশান দেয়া হয়। এবং তার মাধ্যমে সালফিয়্যাতের একটা নির্দিষ্ট মাযহাব বা চৈন্তিক দল প্রতিষ্ঠার সব পথ পরিস্কার করা হয়।

আমরাও বুঝতেছিলাম ব্যাপারটা। মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশী ছাত্র নিতে মূলত ৪টা স্রোত ব্যবহার করা হতো। জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশ। এদের দ্বায়িত্বে ছিলো মাওলানা ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহ। আহলে হাদীস। এদের দায়িত্বে ছিলেন দুই গ্রুপ। ডঃ আব্দুল বারী রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন একটার মুরুব্বি। আরেকটার মুরুব্বি ডঃ গালিবরা। গালিবরা বললাম, কারণ গালিব সাহেব তখন মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতো স্থান করতে পারেননি, ফলে আব্দুল মতীন সালাফী ও ঢাকার মুহাম্মাদীয়া আরাবিয়্যাহ তখন এই ট্রেন্ড দেখা শুনা করত। আরকেটা স্রোত ছিলো দেওবন্দীদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন দলের আলাদা কোন শক্তি ছিলোনা। কিন্তু ১৯৯৩-১৯৯৫ পর্যন্ত দেখলাম তড়িৎ গতিতে ডঃ আব্দুল বারীর গ্রুপ দূর্বল হয়ে সালাফীদের এমন একদল ছাত্রদের ঐখানে নেয়া হয়, যারা নিজদের যেন মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের সম্পদ মনে করতে লাগলেন। জামাআত, দেওবন্দীদেরকে খুব কোণঠাসা করা শুরু করলেন। এবং তারপরে ১৯৯৫ সনে সেখানে এক আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজিত হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিলো এই সময়ের “খাওয়ারিজ” সনাক্ত করণ।

এই সেমিনারের মধ্যমণি ছিলেন ডঃ রবী বিন হাদী আলমাদখালী। তিনি তার দীর্ঘ প্রবন্ধে প্রমান করেন এই যুগের খাওয়ারিজ হলো হাসানুল বান্না, সাইয়েদ কুতুব, মাওলানা মাওদূদী, ইলিয়াস কান্দেহলভী সহ যারা গত শতাব্দীতে ইসলামী রিভাইভালের জন্য কাজ করেছেন তারা সবাই।

তার প্রবন্ধ পরে বই হিসেবে বের হয়।
এই বইটার নাম দেনঃ منهج الأنبياء في الدعوة إلى الله فيه الحكمة والعدل অর্থাৎ দাওয়াত ইলাল্লাহের ব্যপারে নবীগণের কর্মপদ্ধতি, এতে আছে হিকমাহ এবং ইনসাফ। এই গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন মাওলানা মাওদূদী ইসলামের একজন বিভ্রান্ত দলের প্রতিষ্ঠাতা, দেখিয়েছেন সাইয়েদ কুতুব কতো বড় বিভ্রান্ত।

তিনি তার গ্রন্থের দ্বিতীয় প্রকাশনার ভূমিকায় স্পষ্ট ভাবে এই সব দলের লোকদের কে জাহান্নামের দরোযার দিকে আহবান কারী হিসেবে চিহ্নিত করেন, এবং এদেরকে “মানুষের দেহে শয়তান” বলে মহানবীর (সা) দেখানো একদল বিভ্রান্ত উম্মাতের ই সাক্ষাত গ্রুপ মনে করেন। সেখানে তিনি সালাফিদের ছাড়া আর বাকী দলগুলোকে বিভ্রান্ত বলে উল্লেখ করেন। পৃষ্ঠা ৬।

তিনি এই বইটাতে নবীগণের দাওয়াতী কর্মপদ্ধতির কথাকে তুলে ধরেছেন খুব সহজ ভাষায়। বুঝাতে চেয়েছেন তাদের একমাত্র কাজ ছিলো তাওহীদের প্রতিষ্ঠা করা। নূহ, ইব্রাহীম, ইউসুফ ও মূসা (আলাইহিমুসসালাম) এর কর্মপদ্ধতি তিনি এনেছেন। এরপরে আলোচনা করেছেন আমাদের নবী (সা) এর মাক্কী জীবনে তাওহীদের দাওয়াত ও মাদানী জীবনে তাওহীদের গুরুত্বারোপের মাত্রা। দুঃখ হলো তিনি দাউদ ও সুলাইমান (আঃ) কথা আনেন ই নি।

এরপরে তিনি আলোচনা করেছেন “ইত্তিজাহাতুদ দুআহ” বা দাঈ ইলাল্লাহগণের ট্রেন্ড বা আচরণসমূহ। সেখানে তিনি পৃথিবীর ইসলামের জন্য কাজ করা দলগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। পৃষ্ঠা ১৩৮-১৩৯

একঃ সালাফিয়্যাতের চিন্তাধারার আলোকে চলা দল।

দুইঃ সূফীধারায় চলা দল। নাম না ধরলেও শায়খ আসলাম ও শায়খ তাকীউদ্দীন হেলালীর সমালোচনাকৃত দল বলাতে যে কেও বুঝতে পারে তিনি তাবলীগকে বুঝিয়েছেন।

তিনঃ যারা ইসলামি রাজনীতি নিয়ে কাজ করে এমন দল। এই সব দলের গুরু হিসেবে তিনি মাওলানা মাওদূদীকে দেখিয়েছেন।
তিনি প্রমান করেছেন সালাফি দল ছাড়া আর বাকী দুই ধরণের দল ইসলাম থেকে দূরে সরে গেছে।

তিনি তার আলোচনায় মাওদূদীর উপর অনেক লম্বা চ্যাপ্টার উৎসর্গ করেছেন। যার সার সংক্ষেপ মূলত ১৪১ পৃষ্ঠায় বলেছেন। তন্মধ্যে প্রধান সমালোচনা হলোঃ

১। তিনি তার আন্দোলন নবী রাসূল গণের মতই শুরু করেননি। তাওহীদের আলোচনা তার আন্দোলনের কিছুই না। অথচ তার দেশ শিরকে ভরা।

২। তার আন্দোলনে বিশাল অংশ জুড়েই হলো রাজনীতি। ক্ষমতা দখল, অন্যের হাত থেকে ক্ষমতা গ্রহন ইত্যাদি। এই পয়েন্টে তিনি আলোচনা করে গেছেন বইটির বিশাল অংশ জুড়ে। এর পরে তিনি আলোচনা করেছেন ইখওয়ান নিয়ে। সাইয়েদ কুতুব, আব্দুল কাদের আওদাহ প্রমুখের আলোচনা স্থান পেয়েছে বড় পরিসরে।

তার এই বই বাজারে আসার পর হৈ চৈ পড়ে যায়। অধিকাংশ উলামা তার লেখা পড়ে থমকে যান। এইভাবে এই সব আন্দোলনকারীকে ইসলাম বহির্ভুত দল হিসেবে আগে কেও চিহ্নিত করেনি। তিনিই প্রথম যিনি এদেরকে বিভ্রান্ত বলে আখ্যা দেন। এর পরেই শুরু হয় চারটা বড়বড় পরিবর্তনঃ

১। এদের চিন্তা চেতনাকেই সাঊদী সরকার প্রমোট করা শুরু করেন। এবং মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশ করা নানা দেশের ছেলেদের মধ্যে যারা মাদখালী সাহেবের মতের সাথে মিল দেন, তাদের দাঈ ইলাল্লাহর চাকুরি দিইয়ে বিভিন্ন দেশে পাঠান। তাদের আরামে বসে দাওয়াতী কাজের মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায় মাদখালী মাযহাব প্রমোট করা।

২। এদের একান্ত লক্ষ হয়ে দাঁড়ায় ইসলামি আন্দোলন নামের যত দল আছে তাদেরকে বিভ্রান্ত প্রমানে উঠে পড়ে লেগে যাওয়া। ফলে যুবকদের বিশাল দল এই সব আন্দোলন থেকে ছিটকে পড়ে সালাফিদের দলে যোগদান করে।

৩। দেশে দেশে এর আগে আহলে হাদীস বা আনসারুস সুন্নাহ ইত্যাকার নামের যে দল গুলো ছিলো তাদের মধ্যে ফাটল ধরানো হয়। কারণ তারা মূলত আহলে হাদীস বা সালাফি ভাবধারার মানুষ হলেও ইসলামি আন্দোলন গুলোর সাথে অংগাংগী হয়ে কাজ করতো। বাংলাদেশের উত্তরবংগে একচেটিয়া আহলে হাদীস থাকা সত্ত্বেও তারা জামায়াতে ইসলামিকে সমর্থন করতো। কিন্তু এই মাদখালীদের উত্থানের পর তারা জামায়াত থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে নিজেদের মাঝেও ফাটল তৈরি করে। মুজাফফর ও মুফতি আব্দুর রাযযাকের গন্ডোগোল তারই অংশ।

৪। যেহেতু মাদখালীদের সরকারই প্রমোট করে, সেহেতু এই গ্রুপের লোকেরা যেখানে গেছে সেখানে সরকারের সাথে থেকে সরকার বিরোধী ইসলাম পন্থীদের শেষ করার পেছনে কাজ করে যাচ্ছে। “সরকার” বলতে এরা মনে করে “যে যে দেশে রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে জেঁকে আছে”। মজার ব্যপার হলো এরা মূরসী সরকারকে উৎখাতের চিন্তাও করে এই কারণে যে, মুরসী ছিলেন প্রতিষ্ঠিত সরকার বিরোধী, ও ইখওয়ানের লোক।

এই দলের উত্থানের পর ইসলাম ও মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে, যে তারা ইসলামি আন্দোলনের বড় বড় নেতেদের হত্যা করা “কোন গুনাহ না” ধারণাটা স্বস্ব সরকারের অন্তরে সহীহ আক্বীদার আকরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ফলে আব্দুল কাদের মোল্লার নাক বেয়ে চলা রক্তের নদী ওদের মনে আনন্দের প্রবাহ বাড়িয়েছে, মীর কাসিম, মাওলানা মুতিউর রহমান নিজামি ও আলী আহসানদের কেটে যাওয়া গলা দেখে তাদের মুখ বিজয়ের সাফল্যে স্নিগ্ধ কোমল হয়েছে। রাবেয়া স্কয়ারের রক্ত ওদের বিচলিত করেনা। কারাগারে প্রফেসর গোলাম আজমের লাশ তাদের মাথায় ঘুমের পশরা বিলায়। সারা দুনিয়ার ইসলামি আন্দোলনের নেতা কর্মীরাই হয়ে ওঠে এদের পরম শত্রু, আর দরবেশ বাবারা হয় তাদের “হাফিযাহুল্লাহ” নামক সহীহ হাদীসের দুয়ার পাত্র হবার একান্ত ভাগ্যবান মানুষ।

হলিউডের মুভির মূল থিম হলো ‘Devil Worshipper’ অর্থাৎ ‘শয়তারপূজারী ধর্মের’ প্রচারনা চালানো। শয়তান পূজারী ধর্মে মানুষকে আকৃষ্ট করাই সেই মুভির প্রধান লক্ষ্য! আর দ্বিতীয় লক্ষ্য আমার মত কম ঈমানের মুসলিমদের কনফিউজড করে দেওয়া।
.

যাইহোক, মূল বক্তব্যে আসি। ‘Devil Worshipper’ এর ভক্তরা মনে করে থাকে, আল্লাহ ইবলিস শয়তানের সাথে ন্যায়বিচার করেন নি। তার শুধুমাত্র একটা ভুলের কারণেই আল্লাহ তাকে কোন সুযোগ না দিয়েই শয়তান হতে বাধ্য করেছে। অথচ মানুষকে হাজারবার ক্ষমা করে দেওয়া হচ্ছে। তাকে কোন সুযোগ না দিয়েই শয়তান হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
.
আমি জানি না, শয়তানপূজারীর অনুসারীরা সূরা সাদ পড়েছিল কি না! সূরা সাদ পড়লেই বুঝতে পারবেন, আল্লাহ তাকে ফিরে আসার সুযোগ দিয়েছিল কিনা।

আমি জানি না, শয়তানপূজারীর অনুসারীরা সূরা সাদ পড়েছিল কি না! সূরা সাদ পড়লেই বুঝতে পারবেন, আল্লাহ তাকে ফিরে আসার সুযোগ দিয়েছিল কিনা।
.
সবচেয়ে মজার কথা কি জানেন ? আমাদের মধ্যকার সবচেয়ে বুঝদার এবং প্রাকটিসিং মুসলিমের চেয়েও ইবলিস শয়তানের ঈমানের পারদ অনেক বেশি। বলতে দ্বিধা নেই, এমনকি কাবা শরীফের ইমামের চেয়েও ইবলিস শয়তানের ঈমান অনেক বেশি ছিল। ইবলিস শয়তান আল্লাহর আরসের বিশেষ ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকার সুযোগ পেয়েছিল। এমনকি সে আল্লাহর সঙ্গে কথাও বলেছিল। অতএব আল্লাহর প্রতি ইবলিসের বিশ্বাস এবং আপনার আমার বিশ্বাসের পারদ কখনোই এক হবে না। বরঞ্জ ইবলিসই বেশি ঈমানদার ছিল। কিন্তু সেই ঈমানদার হবার পরও আল্লাহর আদেশকে অমান্য করতে কার্পন্য করেনি।
.
মনে রাখবেন, একজন মা তার স্বামীর হত্যাকারীকে হয়তো ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু একজন মা অবাধ্য সন্তানকে কখনোই ক্ষমা করতে পারেন না। কারণ, সেই সন্তানই কেবল জানে তার মায়ের ত্যাগের পরিমান কতটুকু। তেমনি আল্লাহর আরশে আশ্রয়প্রাপ্তরাই কেবল জানে, আল্লাহর ক্ষমতা কত্তো বিশাল। কিন্তু তারপরও সে আল্লাহর আদেশকে অমান্য করেছিল। সে অহংকার করে বলেছিল, আমি আগুনের সৃষ্টি। অতএব আল্লাহ কখনোই অবিবেচক নন।
.
শয়তান পূজারীরা মনে করে, একসময় আল্লাহ এবং ইবলিস শয়তানের মধ্যকার যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে তারা শয়তানের পক্ষ অবলম্বন করবে। আর সবচেয়ে মজার বিষয়, আমাদের বাংলাদেশেও ইবলিসের পক্ষের কতক সৈনিক তৈরী হয়ে যাচ্ছে !
.
‘Devil Worshipper’ এর উপর হলিউডে ইতোমধ্যে কয়েক ডজন মুভি তৈরী করা হয়েছে। আমাদের তরুনদের সেসব মুভি দেখে মাথা খারাপ করার টাইম থাকলেও কুরআন পড়ে মাথা ঠিক করার টাইম নাই। ভাবখানা এমন, কুরআন তো বুড়ো বয়সে পড়ার জন্য। তরুন বয়স শুধু মুভি,মাস্তি আর হ্যাংআউটের টাইম !


.