সালাফী ইসলামপ্রসঙ্গে

#নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে লিখা তাঁর এই দীর্ঘ প্রবন্ধটি ধৈর্য্য ধরে পড়লেই বুঝবেন সালাফী তথা আহলে হাদীসীদের ভাল ও জঘণ্য দিকগুলো । আরো বুঝবেন তারা যে একই সঙ্গে মোকাল্লিদ ও তাকফিরি । অবশ্যই তাদের ভাল দিকগুলোও লেখক তুলে ধরেছেন । পড়ুন তাহলে……

>>>>সংজ্ঞা<<<<<

১। সালাফী ইসলাম কী?‘সালাফিজম’ বলতে আসলে কী বুঝায়? এর সর্বসম্মত কোনো সংজ্ঞা নাই। আমার প্রস্তাব হলো– আধুনিক সালাফী ধারার একদম শুরুর দিকের রূপরেখা, তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ, সাম্প্রতিককালে এর নানান গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়া এবং ইসলাম ও বর্তমান বৈশ্বিক সমাজে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক অবদানগুলো আলোচনা সাপেক্ষে সালাফিজমকে বিশ্লেষণ করা।
আধুনিক দুনিয়ার প্রেক্ষাপটে, কিংবা আরো স্পষ্ট করে বললে, গত অর্ধশতকে ‘সালাফী’ পরিভাষাটি একটি ইসলামিক মেথডলজি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এর লক্ষ্য হলো ইসলামের প্রথম প্রজন্মের মুসলমানদের ঈমান ও আমলের যে নবুয়তী মানদণ্ড ছিলো, তার সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টা করা। কারণ, নবুয়তী যুগ হলো রাসূলের (সা) সুন্নাহর সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। তারপরের প্রথম তিন প্রজন্ম (সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী) মহানবীর (সা) যুগের সবচেয়ে কাছাকাছি ছিলেন। এই তিন প্রজন্মের সময়কালকে ইসলামের প্রকৃত রূপরেখা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
যেহেতু পরিভাষাটি দ্বারা একটি মেথডলজিকে বুঝায়, তাই এটা বলাই ন্যায়সঙ্গত– সালাফিজম দ্বারা মুসলমানদের বিশেষ বা স্বতন্ত্র কোনো গোষ্ঠী বা দলকে বুঝায় না। এক ডজনেরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ হয় নিজেদেরকে ‘সালাফী মানহাজের’ অনুসারী বলে পরিচয় দেয়, নয়তো নিজেরা পরিভাষাটি ব্যবহার না করলেও কেউ এই পরিচয়ে তাদেরকে পরিচয় দিলে তারা আপত্তি করে না। এই বাস্তবতা পরিভাষাটিকে বুঝতে আমাদেরকে আরো বেশি সহায়তা করেছে। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না – এই প্রত্যেকটি গ্রুপ নিজেদেরকেই একমাত্র সঠিক বলে মনে করে এবং অন্যান্যদেরকে সালাফিজমের সত্যিকারের প্রতিনিধি বলে মনে করে না। এই কারণে ‘সালাফিজম’ সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা পেতে হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট নানান বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন সালাফী গ্রুপগুলোর ঐক্যমত ও দ্বিমতের বিষয়গুলো বুঝতে হবে।
১.১। সালাফী আন্দোলনগুলোর মধ্যে যেসব বিষয়ে ঐক্যমত রয়েছে:
ক্ষুদ্র ব্যতিক্রম বাদে সালাফী ঘরানার প্রচলিত সব গ্রুপের মধ্যে কিছু বিষয়ে সাধারণ ঐক্যমত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো–
১) প্রত্যেকে শুধু নিজেদেরকেই সালফে সালেহীনদের শিক্ষা ও আকীদার সঠিক অনুসারী বলে মনে করে। বিশেষ করে, তারা যে ধর্মীয় আকীদার কথা বলে গেছেন, তা মনেপ্রাণে সমর্থন করে। সাধারণত এটি আছারী আকীদা হিসেবে পরিচিত।
২) আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর (তাওহীদে আসমা ওয়াল সিফাত) যে কোনো প্রকার রূপক বা প্রতীকী ব্যাখ্যাকে তারা সর্বোতভাবে প্রত্যাখ্যান করে। বলাবাহুল্য, আশআরী ও মুতাজিলা গোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধের এটিই ছিলো মূল কারণ।
৩) যে কোনো প্রকার ইবাদত ও ভক্তি প্রদর্শন একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট (তাওহীদে উলুহিয়্যাহ) বলে তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। তাদের এই বিশ্বাসের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আপসের যে কোনো সম্ভাবনাকেই তারা প্রত্যাখ্যান করে। এ কারণে তারা বিশেষ কোনো সুফী ঘরানার রীতিবহির্ভূত বিভিন্ন প্র্যাকটিসের সমালোচনা করে। যেমন– সুফী-দরবেশদের প্রতি অতি ভক্তি, মৃত ব্যক্তিকে ওলী তথা মধ্যস্ততাকারী হিসেবে মানা ইত্যাদি।
৪) তারা সকল প্রকার বিদয়াতের বিরোধিতা করে এবং যারা এগুলোর সাথে সম্পৃক্ত (আহলে বিদয়াত) তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। বিশেষত শিয়া মতবাদের তারা প্রচণ্ড বিরোধী। কারণ, এই মতবাদ সাধারণভাবে সাহাবী বিদ্বেষের দোষে দুষ্ট।
৫) তারা শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াকে (মৃ. ৭৪৮/১৩২৮) শ্রদ্ধা করে এবং তাঁর ফিকহী ও ধর্মতাত্ত্বিক মতামতগুলোকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এটা বলে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, তিনি আধুনিক সালাফী আন্দোলনের জনক নন। তাঁর পক্ষে এটি হওয়া সম্ভবও নয়। কারণ তাদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, মহানবী মোহাম্মদের (সা) পর এর একক কোনো প্রতিষ্ঠাতা থাকতে পারে না।
১.২। সালাফী গ্রুপগুলোর মধ্যে দ্বিমতের বিষয়সমূহ:
যদিও তাদের মধ্যে কিছু সাধারণ ঐক্যমত্য রয়েছে বলে আমরা উপরে দেখেছি, তারপরও বহু ইস্যুতে তাদের মধ্যে প্রচুর দ্বিমত আছে। দ্বিমতের প্রতিটি পয়েন্ট স্ব স্ব পক্ষের আলেমদের বিস্তারিত মতামতে ওঠে এসেছে। এর মধ্যে নিম্নোক্ত ইস্যুগুলো সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য:
১। কোনো একটি মাজহাব অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা ও বৈধতার ব্যাপারে সালাফীদের অবস্থান:
একটি বিশেষ মাজহাবের মতামতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকার ব্যাপারে সালাফী উপদলগুলোর অবস্থান পরস্পরবিরোধী। এটি তাদের মাঝে বিদ্যমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির অন্যতম একটা কারণ।
ক) অনুমোদনযোগ্য নয়: স্থায়ী পদ্ধতি হিসেবে মাজহাবের প্রতিষ্ঠা লাভের বিরোধিতা করা ছিলো ঐতিহাসিকভাবে ইবনে হাজমের (মৃ. ৪৫৬ হিজরী) জাহেরী মাজহাবের বৈশিষ্ট্য। এই ‘মাজহাববিরোধী’ ধারার সাম্প্রতিক প্রবণতার সূচনাকারী বলা যায় মুহাম্মদ হায়াতুল সিন্ধীকে (মৃ. ১১৬৩)। আল-সানানী (মৃ. ১১৮২), আল-শাওকানী (মৃ. ১২৫০), সিদ্দীক হাসান খান (মৃ. ১৩০৭)[সিদ্দিক হাসান খান ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের আহলে হাদীস আন্দোলনের অনুপ্রেরণা।] এবং অতি সাম্প্রতিককালে নাসীর উদ্দীন আল-আলবানী (মৃ. ২০০০) তাঁর দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন।
খ) অনুচিত, তবে অবৈধ নয়: কোনো কোনো সালাফী আন্দোলন সাধারণ মানুষকে বিশেষ প্রয়োজনে কোনো একটি মাজহাব অনুসরণের অনুমতি দেয়। তবে শর্ত হলো, পরবর্তীতে তার কাছে দলীল তুলে ধরা হলে মাজহাবের পরিবর্তে তাকে দলীলই মানতে হবে।[একজন সাধারণ ব্যক্তির পক্ষে ধর্মীয় মতামতগুলো (তারজীহ) থেকে সঠিকটা বেছে নিতে বাধ্য করা হিতে বিপরীত হতে পারে। কারণ, এ ধরনের বিষয়ে এনগেজ হওয়ার জন্য একেবারে প্রাথমিক বিষয়গুলো জানার ঘাটতিও তার রয়েছে।]গ) অনুমোদনযোগ্য: একজন সাধারণ মুসলমানের জন্য একটি নির্দিষ্ট মাজহাবের অনুসরণ বাধ্যতামূলক বা গ্রহণযোগ্য হিসেবে সুন্নী ইসলাম মোটাদাগে মেনে নিয়েছে। সালাফী ইসলামের কোনো কোনো ঘরানাও এটি মেনে নিয়েছে। নজদী দাওয়াতী ধারার পুরোধা মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাব (মৃ. ১২০৬)[3] ধর্মীয় বিষয়ে আল-সিন্ধী দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। কিন্তু তারপরও তিনি হাম্বলী মাজহাবের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। কারণ তিনি মনে করতেন, একটি মাজহাবের আওতায় থেকে ইসলামের ইবাদত ও রীতিনীতিগুলো অনুসরণ করা একইসাথে বৈধ ও উত্তম।
২। আহলে বিদয়াতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা:
তাত্ত্বিকভাবে সকল সালাফী গ্রুপ বিদয়াত, বিদয়াতের অনুসারী ও প্রচারকদের থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে। কিন্তু বাস্তবে এই সম্পর্ক ছিন্ন করার পদ্ধতি কীভাবে কার্যকর করা হবে এবং এর ব্যাপ্তি কতটুকু হবে, তা নিয়ে সালাফী গ্রুপ ও আলেমভেদে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েছে।
এই বিষয়ে সবচেয়ে কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি পোষণকারীগণ স্বভাবতই একজনের জন্য সবাইকে দোষারোপ করে থাকে। যেমন– ‘ক’ একজন বিপথগামী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। ‘ক’ ব্যক্তির সাথে ‘খ’ ব্যক্তির সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং ‘খ’ ব্যক্তিও বিপথগামী। এখন যদি ‘খ’ ব্যক্তির সাথে ‘গ’ ব্যক্তির সম্পর্ক থাকে, তাহলে সেও বিপথগামী। অন্যদের ব্যাপারে এ ধরনের প্রান্তিক অবস্থান গ্রহণ ও বিচ্ছিন্নতার নীতি সালাফী কমিউনিটির মধ্যে আরো বেশি বিভাজন ও দল-উপদলের উদ্ভব ঘটিয়েছে। ব্যাপারটি দুঃখজনক।
এভাবে যারা মানুষকে বিচার করে, তারা ‘মাদখালী’ (সৌদী শায়খ রাবী বিন হাদী আল-মাদখালীর অনুসারী) হিসেবে পরিচিত। এই গ্রুপটি ‘জারাহ ওয়াত তাদীল’ শাস্ত্রকে (এটি হাদীস পর্যালোচনার একটি পদ্ধতি, যেখানে হাদীস বিশারদগণ বর্ণনাকারীর গ্রহণযোগ্যতা বা অগ্রহণযোগ্যতা বিচার করেন) পুঁজি করে তাদের এই ধরনের কার্যকলাপকে বৈধতা দেয়। সাম্প্রতিককালে যদিও মাদখালী ধারার জনপ্রিয়তা বেশ কমে গেছে, তবে মাদখালীদের বাইরেও বহু সালাফী গ্রুপ এই ইস্যুতে এ ধরনের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে। এমনকি নিজেদের বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির কাউকে তারা তাদের আলোচনা সভা বা বৈঠকে আমন্ত্রণ পর্যন্ত জানায় না।
যা হোক, কোনো কোনো সালাফী আলেম ও গ্রুপ এই ইস্যুতে তুলনামূলকভাবে নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে। তারা সালাফীদের বাইরে অন্য ঘরানার কারো কারো সাথেও সহযোগিতা করার মনোভাব রাখে। যেমন– দেওবন্দীদের সাথে কাজ করাকে তারা অনুমোদন দেয়, তবে শিয়াদের সাথে নয়।
৩। ঈমান সম্পর্কে আকীদাগত অবস্থান:
ব্যক্তির আমল ঈমানের অপরিহার্য অংশ নাকি সম্পূরক অংশ? ঈমান ও এর তাৎপর্যগত অর্থ তুলনামূলকভাবে আধুনিক যুগের জিজ্ঞাসা। এ প্রসঙ্গে ৯০ দশকের শেষদিকে শায়খ আলবানী বলেছিলেন যে তিনি আমলকে ঈমানের অপরিহার্য অংশ মনে করেন না।[4] অথচ, এর আগ পর্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড সালাফী পজিশন ছিলো – বিশেষ কিছু কাজ ঈমানের অপরিহার্য অংশ এবং এই কাজগুলো কেউ না করলে তা ঈমানের দাবির সাথে সাংঘর্ষিক হবে। ইবনে তাইমিয়া এবং অন্যান্য আছারী আলেমগণ এ ধরনের সুস্পষ্ট মতামত দিয়েছেন।
৪। ইসলামী শাসকের (উলিল আমর) প্রতি আনুগত্যের মাত্রা এবং রাজনৈতিক তৎপরতার অনুমোদন:
এটি একটি জটিল ও বিস্তৃত বিষয়। সালাফী আন্দোলনের বাইরে অন্যান্যদের সাথে এই বিষয়টি নিয়েই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি দ্বিমত হয়। রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো ও রাজনৈতিক বিরোধিতা করার সুযোগ, মুসলিম শাসকের প্রতি আনুগত্যের অপরিহার্যতা এবং কোনো অবৈধ শাসকের ‘ইসলামী বৈধতা’ ইত্যাদি বিষয়গুলো শরীয়তে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। বিদ্যমান অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নানান মতের সালাফী আলেমগণ বিষয়গুলো সুরাহা করার চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে তাদের অবস্থানগুলোকে নিম্নোক্তভাবে তুলে ধরা যায়:
ক) বৈধ শাসকের সমালোচনা করা ধর্মীয় দৃষ্টিতে একইসাথে বিচ্যুতি ও পাপ কাজ: সালাফীদের কেউ কেউ, বিশেষ করে মূলধারার সৌদি সালাফী ও মাদখালীরা সরকারের কট্টর সমর্থক।[5]
খ) শাসক গোষ্ঠীর কাছে জবাবদিহিতা দাবি করা এবং তাদেরকে সুপারিশ বা পরামর্শ দেয়া ‘আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার’ (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) নীতির অংশ: সরকারী পলিসিরি সমালোচনা করাকে সালাফীদের কেউ কেউ শুধু বৈধই মনে করেন না; বরং একে তারা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ সংক্রান্ত ইসলামী নীতির অপরিহার্য অংশ বলে মনে করেন। এটিকে তারা জালিম শাসকের জুলুম প্রতিরোধের ইসলামী মূলনীতির সমতুল্য বলেও মনে করেন। সৌদি আরবের সাহওয়াপন্থী আলেমগণ এই ঘরানার উদাহরণ।
গ) দুনিয়ার সকল মুসলিম রাষ্ট্রের শাসকদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা: কিছু সালাফী গ্রুপ মুসলিম দেশগুলোর শাসকদেরকে (কিংবা, যেসব মুসলিম রাষ্ট্র শরীয়াহ দ্বারা পরিচালিত নয়) অবৈধ মনে করে এবং তাদেরকে কাফের হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের মতে, এদের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। সম্ভব হলে শক্তি প্রয়োগ করতে হবে।[6]
৫। তাকফীর (কোনো মুসলমানের ঈমান নেই বলে বিবেচনা করা) ইস্যু, বিশেষত যেসব শাসক শরীয়াহ আইন অনুযায়ী শাসন করে না (আল-হুকুম বি গাইরি মা আনযালাল্লাহ):[7]
আবারো বলে রাখি, এ ব্যাপারেও একাধিক মতামত রয়েছে[8]:
ক) মুসলিম দেশের শাসকরা ঈমানদার: সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শায়খ আব্দুল আজীজ বিন বাজ (মৃ. ১৯৯৯) এবং শায়খ আলবানীসহ সালাফী আলেমদের কেউ কেউ মনে করেন, কোনো মুসলিম দেশের শাসক সেক্যুলার আইন মোতাবেক দেশ পরিচালনা করা সত্ত্বেও তারা ঈমানদার (যদি না সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়। বাস্তবে এমন প্রমাণ পাওয়া বেশ কঠিন)। তাঁদের যুক্তি হলো, এটি একটি গোনাহ বটে। তবে এ কারণে তারা ইসলামের আওতা থেকে বের হয়ে যান না।
খ) শাসকরা মুসলিম হলেও শাসনকার্য কুফর: এ জাতীয় শাসকরা মুসলিম, এবং তারা কমিউনিটির বৃহত্তর কল্যাণে নিয়োজিত। তবে তাদের শাসনকার্য আল্লাহর আইন বহির্ভূত হওয়ায় তা বড় ধরনের কুফর। এটি হলো অধিকাংশ মধ্যপন্থী সালাফীর দৃষ্টিভঙ্গি। যেমন– শায়খ মোহাম্মদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন (মৃ. ২০০১)।
গ) শাসকরা কাফের: সেুক্যলার আইনে দেশ পরিচালনার মাধ্যমে মুসলিম দেশের শাসকগণ কুফরে নিপতিত হন। তাদের শাসন অবৈধ এবং তাদের ঈমান নেই। তাই তাদের প্রতি আনুগত্য করার শরয়ী বাধ্যবাধকতা আর থাকে না। এই গ্রুপটি কট্টরপন্থী। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আবু মোহাম্মদ আল-মাক্বদিসি এবং আবু মুসআব আল-সুরি। এ দুজনের লেখা জিহাদপন্থী সালাফী আন্দোলনকে উজ্জীবিত করেছে।
৬। জিহাদের ব্যাপারে অবস্থান:
শীর্ষ সালাফী গ্রুপগুলোর অধিকাংশই শান্তিবাদী। তবে সালাফী আন্দোলনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে তুলনামূলকভাবে সংখ্যালঘু একটি গ্রুপ ‘সশস্ত্রপন্থী’। তারা মনে করে, উম্মাহর নির্দিষ্ট কিছু অংশের উপর সশস্ত্র জিহাদ বাধ্যতামূলক। অন্যথায় উম্মাহর সক্ষম প্রত্যেকের উপরই সশস্ত্র জিহাদের বাধ্যবাধকতা বলবৎ হবে। নিচের যে কোনো একটি বা উভয়টির উপরই তারা গুরুত্ব দেয়:
ক) মুসলিম ভূখণ্ড থেকে সেক্যুলার শাসকদের অপসারণ করা।
খ) যেসব মুসলিম ভূখণ্ডে কোনো অমুসলিম সরকার সামরিক হস্তক্ষেপ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই চালিয়ে যাওয়া।
শেষ তিনটি পয়েন্ট (যথা– আল্লাহর আইন বহির্ভূত শাসনের বৈধতা, শরীয়াহ বহির্ভূত শাসনকার্য পরিচালনা করলে মুসলিম শাসকের ঈমান থাকে কিনা এবং জিহাদ ইস্যু) যে আসলে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত, এটি সহজেই বুঝা যায়। শাসনকার্যের বৈধতা এবং সেক্যুলার মুসলিম শাসকের ঈমান সম্পর্কে যারা কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন, তারা অনিবার্যভাবেই সবচেয়ে কট্টর অবস্থানটি নিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ, অন্যদেরকে কাফের ঘোষণা দিয়ে থাকেন। আর এভাবেই সশস্ত্র জিহাদের ভিত রচিত হয়।
১.৩। উল্লেখযোগ্য কিছু সালাফী গ্রুপ:[9]
১। মূলধারার সৌদি সালাফী: সালাফী গ্রুপগুলোর মধ্যে এটিই সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গ্রুপ। সৌদি ধর্মীয় নেতাদের অধিকাংশই এই ঘরানার। এই ঘরানার আলেমগণ সাধারণত একটি মাজহাব অনুসরণ করে থাকেন। ব্যতিক্রম বাদে সেটি হলো হাম্বলী মাজহাব। এরা নির্বিবাদী এবং শাসকের প্রতি অনুগত। সৌদি আলেমদের প্রতিনিধিত্বশীল এই গ্রুপটি ‘তাকফীর’ করাকে এড়িয়ে চলে এবং চরমপন্থী জিহাদী গ্রুপগুলোর সমালোচনা করে থাকে।
২। শায়খ আলবানীর জর্ডানী সালাফিজম: অনুসারী বিবেচনায় এটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রুপ। এরা কট্টর মাজহাববিরোধী এবং শুধুমাত্র দলিলভিত্তিক ফিকাহর সমর্থক ও প্রচারক। রাজনৈতিকভাবে একান্ত নির্বিবাদী। শাসকগোষ্ঠী কিংবা জিহাদপন্থী সালাফীদের এড়িয়ে চলার ব্যাপারে সদাসতর্ক। যদিও জিহাদীদের ব্যাপারে তাদের সমালোচনা সৌদি সালাফীদের মতো ততটা স্পষ্ট নয়। এই দলটিও ফিকাহর ক্ষেত্রে চরম অক্ষরবাদী (literalist)। এই কঠোর অক্ষরবাদী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে তারা বিদয়াত নির্ধারণ করে। যদিও অন্যান্য সালাফীরা একে দোষণীয় মনে করে না। যেমন– মসজিদের ভেতরে দাঁড়িয়ে আজান দেয়া, কার্পেটের উপর কাতারের চিহ্ন দেয়া, কিংবা মিম্বরে তিনটি ধাপের কমবেশি না হওয়া ইত্যাদি।
৩। সাহওয়াপন্থী সালাফী: সৌদি আরবের সাহওয়া আন্দোলন একটি একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কারের আন্দোলন। স্বভাবতই শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতাচ্যুত করা তাদের লক্ষ্য নয়। শায়খ সালমান আল-আওদাহ, তাঁর আগে শায়খ সফর আল-হাওয়ালী প্রমুখ আলেম এই ধারার প্রতিনিধি। বেশিরভাগ সময় দেখা গেছে, এই গ্রুপটির রাজনৈতিক কাণ্ডজ্ঞান চমৎকার এবং এরা সোশ্যাল মিডিয়ায় অত্যন্ত সক্রিয়। ফলে তারা তুলনামূলকভাবে শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের দাবিগুলো সহজে বুঝতে পারে। মুসলমানদের সামাজিক সমস্যাগুলোর সমাধানে তাঁদের দৃশ্যমান সক্রিয় তৎপরতা থেকেই বুঝা যায় মুসলমানদের নিয়ে তাঁরা সত্যিকার অর্থে ভাবেন।
৪। মাদখালী সালাফী: মাদখালী ধারা মূলত সৌদি সালাফীদের একটি ছোট উপগ্রুপ। এরা সাধারণ সালাফী গ্রুপগুলোর চেয়ে অনেকটা ভিন্ন ধাঁচের। তাদের কার্যধারা অন্তর্গতভাবেই বিভেদমূলক। বলতে গেলে এই উপগ্রুপটির পূর্ণ মনোযোগ হলো– অন্যরা ‘সঠিক’ সালাফী লাইনে আছে কি নাই, তা যাচাই করা। কে সঠিক মানহাজে আছে বা নাই – এই বিতর্কে মাদখালীরা নিজেরাও দিন দিন বিভক্ত হয়ে পড়ছে। প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় মানুষের নিকট তাদের গুরুত্ব দিন দিন কমছে। অন্যদেরকে খারিজ করার ব্যাপারে তাদের উগ্র ও বেপরোয়া কথাবার্তা এবং সমাজে এসবের তেমন একটা প্রভাব না থাকাই তাদের গুরুত্বহীনতার প্রমাণ।[10]
৫। মিশরীয় সালাফিজম: এই ধারাটির মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অস্তিত্ব রয়েছে। এই ধারাটির বড় একটি অংশ আরব বসন্তের সময় থেকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। মিশরীয় সালাফীরা শায়খ আলবানীর জর্ডানী সালাফিজম দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত। এ কারণে তারা ফিকাহর ক্ষেত্রে চরম অক্ষরবাদী। মিশরীয় সালাফীদের মধ্যেও মাদখালীদের মতো উপদল রয়েছে। অন্যান্য দেশের মতো এখানেও রাজনৈতিক ব্যাপারে তারা চরম বিভক্ত। মিশরীয় সালাফীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল ‘নূর পার্টি’ সিসির পক্ষে কট্টর অবস্থান নিয়েছে, যেখানে অন্যরা রাজনীতি-নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকেছে, এমনকি কেউ কেউ বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর সমালোচনাও করছে। আমরা দেখছি, মিশরীয় সালাফিজম এখন একটা ব্যাপক ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় বিভিন্ন উপদলের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান ও যেসব পার্থক্য সামনে দেখা যাবে, সেসব ব্যাপারে চূড়ান্ত কথা বলে ফেলার সময় এখনো হয়নি।[11]
৬। তাকফীরি সালাফী: কাউকে তাকফীর করা এই গ্রুপের মুখ্য বৈশিষ্ট্য। বিশেষত যেসব শাসক শরীয়াহ আইনে দেশ পরিচালনা করে না, তাদেরকে এরা তাকফীর করে। তবে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে না। তাদের দৃষ্টিতে যেহেতু এটি জিহাদ করার সঠিক সময় নয় এবং পারিপার্শ্বিকতাও অনুকূলে নেই। এই দলটি সাধারণত মুসলিম জনগণ ও তাদের ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের প্রতারণাপূর্ণ ফরেন পলিসি এবং মুসলিম শাসকগোষ্ঠীর ভণ্ডামিপূর্ণ অবস্থানের সমালোচনা করে থাকে। এদের মনমগজ সর্বদা ‘ওয়ালা ওয়াল বারা’ (আনুগত্য ও বিদ্রোহ) সংক্রান্ত ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। ফলে পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বৈধ কিংবা অবৈধ যে কোনো মুসলিম গ্রুপের পক্ষে এরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমর্থন দিয়ে থাকে। তারা তাদের সমালোচকদের বিরুদ্ধে হরহামেশা নিফাক ও কুফরের অভিযোগ আরোপ করে। এটিই তাদের তাকফীরি বৈশিষ্ট্যের বহিঃপ্রকাশ। আচার-আচরণ ও কঠোরতার দিক থেকে মাদখালীদের সাথে এই গ্রুপটির অনেক মিল রয়েছে। কিন্তু মুসলিম সরকার প্রসঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকায় তারা মাদখালীদের সম্পূর্ণ বিরোধী। আবু মুহাম্মদ আল-মাক্বদিসি এবং আবু মুসআব আল-সুরিসহ সমসাময়িক কয়েকজন ব্যক্তিত্ব এই বিশেষ সালাফী ধারার সমর্থক। সংখ্যায় স্বল্প হলেও পাশ্চাত্যে তাদের একনিষ্ঠ সমর্থক রয়েছে। প্রাথমিকভাবে আমেরিকান ধর্মীয় নেতা আনওয়ার আল আওলাকীর (২০১২ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত) দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে তরুণরা[12] এই মতবাদের সমর্থক হয়। এই গ্রুপের বেশিরভাগ সদস্য সরাসরি ‘জিহাদ’ না করলেও তাদের লেখালেখি জিহাদী গ্রুপ তৈরির ভিত রচনা করে দেয়।
৭। উগ্রপন্থী জিহাদী সালাফী: উগ্র ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সালাফী মতবাদের উপর ভর করে জিহাদপন্থী সালাফী মতবাদও গড়ে ওঠেছে। আল কায়েদা ও আইএসআইএসের মতো সশস্ত্র সংগঠন এই ধারার অন্তর্ভুক্ত। এই গ্রুপ দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলে আমি মনে করলেও অনেকের মতে– এ দুটিকে সহজে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায় না, এরা একটি আরেকটির ধারাবাহিকতা। তাদের এই অভিমত কার্যত সঠিক। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন– আকীদাগত বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এরা সালাফী মেথডলজির কিছু বিষয় গ্রহণ করলেও তাদের সশস্ত্র তৎপরতার কারণে অন্যসব সালাফী গ্রুপ সাধারণত তাদের নিন্দা করে। আরেকটা কথা হলো, এই গ্রুপগুলো এমনসব বিষয়ের উপর জোর দেয়, যা অন্য সালাফীদের বেশিরভাগই দেয় না (যেমন– জিহাদ সম্পর্কে তাদের নিজস্ব ধ্যানধারণা)। এবং মূলধারার সালাফীরা যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, তারা সেসব বিষয় এড়িয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলে রাখা দরকার বলে মনে করছি। এই গ্রুপগুলোর জন্ম হয়েছে মূলত আশির দশকের প্রথমদিকে সৌদি সালাফী ও মুসলিম ব্রাদারহুড থেকে বেরিয়ে যাওয়া ছোট ছোট উপগ্রুপগুলোর এক জোট থেকে। তাই টেকনিক্যালি বলা যায়, এরা ‘পিউর’ সালাফী ঘরানার নয়।
এই গ্রুপগুলোর যে কোনো একটিকে ‘সালাফী’ হিসেবে অভিহিত করার সমস্যাটি আমরা উপরে উল্লেখিত এই ভাসাভাসা ও অসম্পূর্ণ তালিকা থেকে বুঝতে পারবো। বিভিন্ন ঘরানার সালাফীদের মধ্যকার এত এত বিতর্কের উপস্থিতি থেকে আমরা বুঝতে পারি যে উপরে উল্লেখিত যে কোনো একটি ধারার কর্মকাণ্ডকেই শুধু ‘সালাফী’ ধারার কাজ হিসেবে গন্য করা হলো বাস্তবতার বিপরীত। কেননা, এই গ্রুপগুলোর কোনোটিই এককভাবে সালাফী আন্দোলনের সার্বিক প্রতিনিধিত্ব করে না।
২. সালাফী মতবাদের ইতিবাচক দিক
ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি নির্দিষ্ট মেথডলজির আলোকে শুরু হওয়া সালাফিজম একটি ইতিবাচক শক্তি। নব্বইয়ের দশকে আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় ইংরেজিভাষী ধর্মীয় নেতাদের প্রচারণার কারণে পাশ্চাত্যের তরুণদের বড় একটি অংশ সালাফী আন্দোলনের ব্যাপারে আকৃষ্ট হয়।
সালাফী আন্দোলনের কিছু ইতিবাচক দিক:
১। কোরআন-হাদীসের মূল ভাষ্যের প্রাধান্য: নিছক আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি নয়, বরং মুসলমানরা যেন সরাসরি কোরআন ও সুন্নাহ থেকে ইসলামের নির্দেশনা ও বুঝজ্ঞান লাভ করতে পারে, সালাফী আন্দোলন সেই উদ্যোগ নিয়েছে। এটি প্রচলিত অন্য ফিকহী মাজহাবগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত। বিভ্রান্তির আশংকায় প্রচলিত মাজহাবগুলো কোরআন-হাদীস থেকে সরাসরি কোনো নির্দেশনা কিংবা ফতোয়া বের করার ব্যাপারে অনুসারীদেরকে নিরুৎসাহিত করে। এ কারণে কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী দৃঢ়ভাবে মনে করে, বিশেষজ্ঞ ব্যতীত অন্য কারো কখনোই হাদীসের কিতাব পড়া উচিত নয়। এমনকি কোরআনের একাডেমিক অধ্যয়নকেও ক্ষেত্রবিশেষে তারা নিরুৎসাহিত করে।
২। লোক-ইসলামের বিরোধিতা: কোরআন-হাদীসের আলোকে আধুনিক সংস্কৃতি ও রীতিনীতির ভালোমন্দ পর্যালোচনা করাকে উৎসাহিত করে। এক্ষেত্রে তারা অমুক বিশিষ্ট শায়খ কী বলেছেন, কিংবা বাপ-দাদারা এতদিন কী পালন করে এসেছেন – সেসবের পরিবর্তে শক্ত দলীল-প্রমাণের উপর গুরুত্ব দেয়। এই হিসাবে সালাফিজম ‘লোক ইসলামের’ শৃঙ্খল থেকে মুসলমানদেরকে মুক্ত করতে চলেছে বলে মনে হয়। তারা স্থান-কালের সীমাবদ্ধতামুক্ত এক নিখাঁদ বৈশ্বিক ইসলামের দিকে আহ্বান করছে। এবং এটা সত্য যে নবুয়তী যুগে এমন ইসলামই পালিত হতো।
৩। কুসংস্কার ও বিকৃতি রোধে ভূমিকা: বিভিন্ন ধর্মের নানান কুসংস্কার মিলে যে ধরনের লোক-ইসলামের প্রচলন ঘটেছে, সালাফিজম সেগুলো বর্জন করেছে। যেমন– অলী-আউলিয়াদের ভক্তি-পূজা করা, কোনো প্রয়োজনে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকা ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার– ইবাদত পালনের যে নির্দিষ্ট পদ্ধতি ইসলাম বাতলে দিয়েছে, সালাফিজম মানুষকে সেই আদি ও অবিকৃত পদ্ধতির দিকে নিয়ে যেতে চায়।[13]
৪। হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরূপণ: এটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা যে, অধিকাংশ ইসলামী আন্দোলনে হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে সালাফিজমের অবদান রয়েছে। এমনকি যারা সালাফিজমের বিরোধিতা করে, তারাও এখন তাদের বইয়ে হাদীস উল্লেখ করতে গিয়ে সুস্পষ্ট এবং হুবহু উদ্ধৃতি দেয় এবং ক্লাসিক্যাল ও মধ্যযুগের আলেমদের মতামত অনুযায়ী সেগুলো যাচাই করে। এটি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি অবদান। শায়খ আলবানী ও তার লেখনীকে এ জন্য ক্রেডিট দেয়া যায়।
৫। মৌলিক জ্ঞান অর্জনে সাধারণ অনুসারীদের সচেতনতা: সাধারণভাবে তো বটেই, ইসলামের বিভিন্ন একাডেমিক শাখায়ও সামগ্রিকভাবে সচেতনতা বেড়েছে। উসূলে ফিকাহ, মুসতালাহাতুল হাদীস, উলুমুল কোরআনের মৌলিক বিষয় ইত্যাদি সম্পর্কে একজন সাধারণ সালাফীরও জানা থাকার কথা। এটা বলা বোধহয় অত্যুক্তি হবে না– অন্য ঘরানার সাধারণ অনুসারীদের চেয়ে সালাফিজমের একজন সাধারণ অনুসারী ইসলামের বিভিন্ন শাস্ত্রীয় শাখা সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে বেশি সচেতন।
৬। বিশুদ্ধ আকীদা: সালাফীদের রয়েছে চমৎকার একটি বিশুদ্ধ আকীদা। যে কোনো নিরপেক্ষ গবেষক অনুসন্ধান করলে দেখবেন, আছারী আকীদা হচ্ছে সুন্নীদের আকীদার সবচেয়ে প্রাচীন সংকলন। এটি আশআরী ও মাতুরিদীদের কালামভিত্তিক আকীদারও আগের সংকলন।[14] হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষ দিক থেকে শুরু করে তৃতীয় শতাব্দীর শুরুর দিক পর্যন্ত এসব বিষয় নিয়ে কয়েক ডজন ধর্মীয় গ্রন্থ লেখা হয়েছে (এর কিছু কিছু ‘আকীদায়ে তাহাবী’রও আগে রচিত), যেগুলো এখনো বিদ্যমান। হিজরী চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে আছারী আকীদাই ছিলো সুন্নী ইসলামের প্রধান ধারা।[15] অবশ্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরিণতিতে ষষ্ঠ শতাব্দীতে এটি
শুধু হাম্বলী মাজহাবের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ে। তবে ইবনে তাইমিয়ার ক্ষুরধার লেখনীর ফলে এটি নতুন জীবন লাভ করে। সেই থেকে দিন দিন আছারী আকীদা শক্তিশালী হচ্ছে।[16]
৭। ইসলামী জ্ঞানের বিস্তার ও ইসলামী পাঠাগারের পুনরুজ্জীবন: ইসলামের সকল শাখার বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করে হাজার হাজার কপি ছাপিয়ে বিতরণ করার ক্ষেত্রে সালাফিজমের ব্যাপক অবদান রয়েছে। এমনকি সালাফিজমের বিরোধীরাও সালাফী প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত বইগুলোর সহযোগিতা নিয়ে থাকে। একাডেমিশিয়ানরা তো প্রতিনিয়ত তাদের অনলাইন প্রকাশনা, ইলেক্ট্রনিক আর্কাইভ ও ফোরামগুলো থেকে উপকৃত হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের যে কোনো ইসলামী পাঠাগারের বইপত্রের একটা বড় অংশ সালাফীদের দ্বারা সম্পাদিত ও মুদ্রিত। এর কারণ হলো, সালাফীদের নিকট ইসলামের ক্ল্যাসিকাল ট্র্যাডিশন খুব গুরুত্বপূর্ণ।
৮। শিরক ও বিদয়াত পরিহার: ভুলশুদ্ধ যাই হোক না কেন, সামগ্রিকভাবে সালাফী আন্দোলন বিভিন্ন ধরনের শিরক থেকে বেঁচে থাকতে পেরেছে এবং বিদয়াত সম্পর্কে চরম সতর্কতা তাদের জন্য সেফগার্ড হিসেবে কাজ করেছে। ফলে ইবাদতের ক্ষেত্রে তারা ঈর্ষনীয় বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে পেরেছে। অতিরিক্ত সতর্কতা ক্ষেত্রবিশেষে বাড়াবাড়ি পর্যায়ের হলেও বিপথগামী হওয়া থেকে সালাফী আকীদাকে এটি রক্ষা করেছে। যদিও তাদের দৃষ্টিতে এই বাড়াবাড়ি মোটেও কোনো সমস্যা নয়।
এই সবকিছু মিলিয়ে সালাফী ধারা একটি গতিশীল আন্দোলন। যার লক্ষ্য হলো প্রত্যেক মুসলমানকে কোরআন ও সুন্নাহ সরাসরি অধ্যয়নের সুযোগ করে দেয়া। এভাবে একজন ব্যক্তি জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে কর্তৃত্ববাদকে চ্যালেঞ্জ করা, অন্ধ-আনুগত্যের ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা এবং অতি রক্ষণশীল ধর্মীয় গুরুদের অসততা ও অনৈতিকতা রোধে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই একটি মেথডলজি হিসেবে সালাফী মতবাদের প্রতি কোনো যুক্তিবাদী ও কৌতূহলী মানুষ আকৃষ্ট হলে এবং মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্যের কারণে এর সাথে একমত হলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
৩. সালাফী আন্দোলনের কিছু সমালোচনা
অন্য যে কোনো আন্দোলনে যেমনটা হয়, তেমনিভাবে সালাফী আন্দোলনও ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। প্লেটোনিক ইউনিভার্সালের মতো মানুষের বাস্তব ও বোধগম্য জগতের বাইরে ‘সালাফিজম’ ধারণাটির কোনো বিমূর্ত রূপ নেই। যেহেতু মানুষ মাত্রই ভ্রান্তিপ্রবণ, সেহেতু ইসলামের প্রাথমিক যুগের সালফে সালেহীনদের অনুসরণের দাবিদার সালাফী আন্দোলনেরও কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি ও অসঙ্গতি রয়েছে।
‘সালাফ’ বলতে আসলে কী বুঝায়, এটি সহ আরো কিছু মৌলিক বিষয় তাদের নিকট অনেকটা অবহেলিত। এমনকি সাম্প্রতিককালের সালাফী গ্রুপগুলোর কাজকর্ম তাদের দ্বারা উপেক্ষিত এসব মৌলিক বিষয়ের শিক্ষার বিপরীত। উপরন্তু, সালাফগণ যেসব সমস্যার মুখোমুখি কখনোই হননি, সেসব সমসাময়িক বিষয়ে সালাফীদের মতামত প্রদানের প্রক্রিয়াটিই পদ্ধতিগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ। জাতিরাষ্ট্রে নাগরিকত্বের ধারণা, গণতন্ত্র, সমকালীন পরিস্থিতিতে নারীদের ভূমিকা, ভোটপ্রদানের অধিকার এবং আধুনিক এই সময়ে জিহাদসহ প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয়ে সালাফীদের অবস্থান (অর্থাৎ, আধুনিক সালাফী আন্দোলনের কিছু আলেমের অবস্থান) নিছক একজন আলেমের ব্যক্তিগত মতামত (ফতোয়া) মাত্র। এসব মতামত ইসলামের প্রথম তিন যুগের সালফে সালেহীনদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করে না।
সালাফী আন্দোলনের সমালোচনাগুলোর একটি তালিকা দেয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিসক্নেইমার দিয়ে রাখতে চাই। নিচে যে তালিকাটি দিয়েছি, কেউ হয়তো ব্যক্তিগত পর্যায়ে, কিংবা কোনো কোনো সালাফী ধারায় এসবের মোটামুটি ব্যতিক্রম অভিজ্ঞতা পেয়ে থাকতে পারেন। এর কারণ হলো, আমি বিষয়গুলো বিবেচনা করেছি সামগ্রিকভাবে। যদিও বুঝি, এ ধরনের সরলীকরণের কিছু সহজাত সমস্যা আছে। ইতোপূর্বে আমি সামগ্রিকভাবে সালাফী ধারার ইতিবাচক দিকগুলোর একটি তালিকা দিয়েছি। সে প্রসঙ্গে এখানে এটুকু বলে রাখি, তাদের যেসব নেতিবাচক দিকের কথা এখন বলবো, সেগুলো ইতিবাচক দিকগুলোর তুলনায় ততটা ব্যাপকতর নয়। এসব বিষয়ের উপর তারা সবিশেষ গুরুত্বারোপ করে, এমনও নয়।
যাহোক, আমার বক্তব্য হলো– এই সমালোচনাগুলো বেশিরভাগ সালাফী আন্দোলনের ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে প্রযোজ্য। যারা এর ব্যতিক্রম রয়েছেন, তারা নিজেদেরকে ব্যক্তিগতভাবে এই সমস্যা থেকে মুক্ত রাখতে পেরেছেন। অর্থাৎ, তারা সালাফী আন্দোলনকে পুরোপুরি গ্রহণ করেননি।
আরেকটা কথা আমাকে বলতেই হবে। সেটি হলো, এই সমালোচনামূলক তালিকা করার প্রাথমিক কারণ হলো, এর ফলে সালাফীরা হয়তো নিজেরাই নিজেদের ব্যাপারে ভাববে। এমনকি এসব সমস্যা যথাসম্ভব দূর করার জন্য হয়তো কাজও শুরু করবে। আমার আশা, এক পর্যায়ে এই সমস্যাগুলো ব্যতিক্রমে পরিণত হবে। যদিও এখন পর্যন্ত এইসব সমস্যা অধিকাংশ সালাফী ধারার মধ্যে ব্যাপকভাবে বিদ্যমান।
সালাফী আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য সমস্যাগুলো হলো:
১। জীবনবোধ ও আধ্যাত্মিকতা থেকে বিচ্ছিন্নতা: সালাফী আন্দোলন ইসলামের জীবনঘনিষ্ঠ মর্মবাণীকে মূলত একটি বিমূর্ত ও তাত্ত্বিক মতবাদে পরিণত করেছে। বিমূর্ত ধর্মতত্ত্ব ও মানবরচিত ধর্মবিশ্বাস, উভয়ই দিনশেষে ইসলামের প্রত্যেকটি দৃষ্টিভঙ্গিকে গৌণ করে ফেলে।
অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর পরিবর্তে সালাফীরা সর্বদা অন্য মুসলমানদেরকে নানান ক্যাটাগরিতে ফেলতে ব্যস্ত থাকে। আছারী আকীদার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা। আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সংক্রান্ত তাওহীদের ধারণা আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহর হাত আছে কিনা, বা আল্লাহর আরশ আসলে কেমন – এসব নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়া উচিত নয়। আল্লাহর নাম ও গুণসমূহ আলোচনার মৌলিক উদ্দেশ্যই তো হলো আল্লাহর স্মরণ বৃদ্ধি করা, তাঁর প্রতি ভক্তি বাড়ানো, সঠিক ও আন্তরিকভাবে তাঁর ইবাদত করা। এইসব সুন্দর সুন্দর নাম ও গুণাবলী যেসব কাজের দিকে ইঙ্গিত করে, সেগুলোর প্রতি অনুপ্রাণিত করাই তাওহীদের মূল কাজ। আকীদার ব্যাপারে সঠিক তাত্ত্বিক ধারণা থাকলেই শুধু ভালো মুসলমান হওয়া যায়, এমন ধারণা সঠিক নয়। আমাদের জেনে রাখা উচিত, একজন সাধারণ মুসলমানকে আল্লাহ ধর্মতত্ত্বের বিমূর্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন না। তিনি বরং ফরজ ইবাদতগুলো সে পালন করেছে কিনা এবং তার মধ্যে কী পরিমাণ আধ্যাত্মিকতা ছিলো, এটি দেখবেন।
২। আত্মার পরিশুদ্ধির ঘাটতি: তাজকিয়ায়ে নফস (আত্মার পরিশুদ্ধি) গ্রহণ করার ব্যাপারে ভিত্তিহীন দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির ব্যাপারে তাদের মাঝে আগ্রহের ঘাটতি রয়েছে। সামগ্রিক অর্থে সালাফী আন্দোলন যে তাজকিয়ায়ে নফস কিংবা আধ্যাত্মিকতার উপর যথাযথ গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে, এটি অকাট্য বাস্তবতা। অথচ হাদীসে জিবরাইলের মূলকথা হলো তাজকিয়ায়ে নফস। এমনকি এটি আল-কোরআনেরও অন্যতম মর্মবাণী। এ ব্যাপারে কোনো বিতর্ক নেই। সালাফীরা আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির মৌলিক প্রয়োজনীয়তার পরিবর্তে ‘জারাহ ওয়াত তাদীলের’ মতো উচ্চতর বিষয়ে অতিরিক্ত গুরুত্বারোপ করার কারণেই ‘সালাফী-বার্নআউট’ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। ‘সালাফী-বার্নআউট’ বলা হয় তাদেরকে, যারা সালাফী মতবাদ পরিত্যাগ করে অন্য কোনো ইসলামী ধারার অনুসরণ করে। এ ক্ষেত্রে তারা সাধারণত সুফিজমের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সালাফিজমে তারা যেসব বিষয় থেকে ‘বঞ্চিত’ ছিলো, সুফিজমে এসে তারা সেগুলো খুঁজে পায়। আবার, কেউ কেউ ইসলামের প্র্যাকটিসই একদম ছেড়ে দেয়।
৩। কঠোরতা প্রদর্শন: নিজেদের বাইরে তারা অন্যদের ব্যাপারে কঠোরতা প্রদর্শন করে। দৃশ্যত নিজেদের নাজাতের ব্যাপারে তারা এক প্রকার নিশ্চয়তা বোধ করে।[17] এ ধরনের বিশ্বাস স্পষ্টতই সাধারণ সালাফীদেরকে উদ্ধত ও অহংকারী করে তোলে। এটি আমাদেরকে অনুরূপ চরিত্রের খারেজীদের কথা মনে করিয়ে দেয়। অবশ্য আমি সালাফীদেরকে খারেজী মনে করি না।
বিপথগামী ও বিপথগামিতা সম্পর্কেও সালাফী ধারার চিন্তাভাবনা স্ববিরোধী। যার ফলে কোনো কোনো সাধারণ সালাফী সঠিক বিশ্বাসের চেয়ে বিপথগামিতা সম্পর্কে বেশি জানে। মাদখালীরা হলো এর উপযুক্ত উদাহারণ। মাধখালী ধারার যে কোনো নওমুসলিম সালাফী মানহাজের একদল আলেমের নাম তোতা পাখির মতো মুখস্ত বলে দিতে পারবে। কিন্তু কয়েকজন সাহাবীর নাম বলতে তাদের খবর হয়ে যাবে। কোনো ‘ফাসেক’ ব্যক্তিকে সালাম দেয়ার মাসয়ালা সম্পর্কে তারা ‘জানলেও’ সকাল-সন্ধ্যা জিকির-আযকার করার ব্যাপারে গাফেল থেকে যায়। দুঃখজনকভাবে এটি শুধু মাদখালীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাই সালাফী আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের আত্মজিজ্ঞাসা থাকা উচিত: ইসলাম মানে কি খেয়ে না খেয়ে অন্যদের দোষত্রুটি বের করা? নাকি সমাজে কল্যাণ প্রতিষ্ঠার একটি রোল মডেল হয়ে ওঠা? “ভাগ্যবান হলো সেই ব্যক্তি, যে অন্যের দোষত্রুটি ধরার পরিবর্তে নিজের দোষত্রুটির সংশোধন নিয়ে ব্যস্ত থাকে” (মুসনাদে বাযার)।
৪। বিদয়াতের ব্যাপারে বাড়াবাড়িমূলক অবস্থান: বিদয়াত ও বিদয়াতকারীদের ব্যাপারে বেশিরভাগ সালাফী ধারার অবস্থান অনেক বেশি কট্টর। এ বিষয়ে বাড়াবাড়ির ফলে অন্য মুসলমানদের নিকট তারা হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছে। মসজিদে কাতারভিত্তিক কার্পেট বিছানোকে বিদয়াত (!) হিসেবে গণ্য করে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মুসলমানরা তাদেরকে অতি-অক্ষরবাদী হিসেবে বিবেচনা করে।
সাধারণ ‘ফাসেক’ ব্যক্তিদের ব্যাপারে তাদের নীতি প্রশ্নসাপেক্ষ। ভ্রান্ত গোষ্ঠীসমূহের ব্যাপারে সালাফদের বক্তব্যকে সালাফীরা এমনভাবে গ্রহণ করে, যেন এগুলো কোরআন-হাদীসেরই কথা। বিদয়াতকারীদের প্রতি সালাফদের কোনো কোনো বক্তব্যকে অবশ্যই কোরআন-হাদীস ও তৎকালীন পরিস্থিতির আলোকে বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ কোনো আলেমের বক্তব্যের চেয়ে ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধের অধিকার (যার রূপরেখা মহানবী (সা) দিয়ে গেছেন) বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সত্যবিরোধীদের ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য অবস্থান কী হবে, তা নির্ভর করবে স্থান, কাল, ব্যক্তি, সংশ্লিষ্ট বিচ্যুতি ও পরিস্থিতির উপর। ইসলাম একতরফাভাবে মানুষকে দোষী সাব্যস্ত করতে চায় না।
সালাফদের মতামতকে বুঝতে হবে তাদের ইজতিহাদ, তৎকালীন পরিস্থিতিতে এর ন্যায্যতা ও প্রয়োগযোগ্যতা যাচাই সাপেক্ষে। আধুনিক সালাফীদেরকে বুঝতে হবে একবিংশ শতাব্দীর আমেরিকা (কিংবা, ইংল্যান্ড – এবং হ্যাঁ, বার্মিংহাম শহরও!) সপ্তম শতাব্দীর বাগদাদ নয়। ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ রক্ষা করার জন্য কোরআন-হাদীসের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এর পরিবর্তে সালাফদের ফতোয়ার অপব্যহার করা অবিবেচনাপ্রসূত এবং ইসলামী মূলনীতির খেলাফ। বিভিন্ন কমিউনিটির মধ্যে বিভাজন তৈরি করা, বিশেষ কোনো গোষ্ঠীকে চোখ বুজে তাকফীর করা এবং তাদের সাথে যারাই দ্বিমত পোষণ করে, তাদের থেকে নিজেদেরকে আলাদা রাখার ব্যাপারে সালাফীদের বদনাম রয়েছে। এটি দুঃখজনক একটি বাস্তবতা।
৫. অগ্রাধিকার নির্ণয়ে বিভ্রান্তি: মহানবী মোহাম্মদ (সা) বলেছেন, “সেটিকেই গুরুত্ব দাও, যা তোমার জন্য উপকারী!” কোনো কোনো সালাফীর নিকট ‘ডেভিয়েন্টদেরকে’ খারিজ করাই যেন সফলতা। মানুষকে খারিজ করা সংক্রান্ত লেখাজোকা, ‘ডেভিয়েন্টদের’ সংশ্রব থেকে দূরে থাকার সতর্কবার্তা এবং মানুষকে সংশোধন করতে গিয়ে অত্যন্ত কর্কশ ও অশোভন ভাষা ব্যবহার করে তারা মজা পায়।
উম্মাহ এখন যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে, তার সাথে আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর ভুল ব্যাখ্যা কিংবা মিলাদ পালনের বৈধতার সম্পর্ক নেই।[18] হ্যাঁ, মিলাদ, আল্লাহর গুণাবলী কিংবা ঈমানের অন্যান্য বিষয় নিয়ে কিছু মানুষকে একটা পর্যায় পর্যন্ত কথাবার্তা বলতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এগুলো আমাদের সময়ের মূল সমস্যা নয়। এমনকি আমাদের তরুণ-তরুণীরা ঈমান নিয়ে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে, এগুলো তাও নয়। অথচ এসব বিষয় নিয়ে যুগ যুগ ধরে বিতর্ক চলে আসছে। সালাফী ও আশআরীগণ চাইলে নিজেদের মধ্যে এসব বিষয় নিয়ে বিতর্কে বসতে পারেন। একজন ধর্মতাত্ত্বিক হিসেবে আমিও উপযুক্ত ফোরাম ও শ্রোতা সাপেক্ষে এ ধরনের বিতর্কের মজলিশে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলে কৃতার্থবোধ করবো। কিন্তু আমাদের তরুণ প্রজন্ম সাধারণত এ ধরনের অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনার খুব একটা ধার ধারে না। তারা বরং তাদের ধর্মে বিশ্বাস বজায় রাখা নিয়ে সংকট মোকাবেলা করছে। ডারউইনবাদ, সেক্যুলারিজম, উত্তরাধুনিকতাবাদ, মানবতাবাদ, উদারতাবাদ এবং এ ধরনের শত শত মতবাদ তাদের বিশ্বাসের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, সালাফীরা (একইসাথে দেওবন্দী, আশআরী এবং সুফীরাও) নিজেদের সার্কেলে এখনো যেসব বিষয় নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত, সেগুলো মাত্র ০.১ % লোকের আগ্রহের বিষয়।
এই মুহূর্তে কট্টর সেক্যুলারিজমের নজিরবিহীন মতাদর্শিক আক্রমণ ইসলাম মোকাবেলা করছে। এসব আক্রমণ সাধারণত ধর্মকে, বিশেষত ইসলামকে, আধুনিক সমাজে অবজ্ঞার পাত্রে পরিণত করেছে। নব্য নাস্তিক্যবাদ ও সেক্যুলারিজম দিন দিন পাবলিক ইন্টেলেকচুয়্যালদের ফ্যাশনে পরিণত হচ্ছে। আধুনিক সংস্কৃতি এখন বস্তুবাদ, আত্মসুখবাদ, পর্নোগ্রাফি এবং যৌন নিপীড়নের বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে। এর সাথে যোগ হয়েছে উগ্র নারীবাদের মতো কট্টর সব মতাদর্শ। একটা কথা সোজাসুজিই বলি– নিছক খারিজ করা ব্যতীত এসব ইস্যু নিয়ে কথা বলার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন একজন সালাফী আলেম খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। আর যদি কোনো আলেমকে পাওয়া যায়ই, তাহলে তাঁর এই যোগ্যতার পেছনে সালাফী প্রশিক্ষণের কোনো ভূমিকা নেই। বরং সালাফী প্রশিক্ষণের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে তিনি এসব চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে সক্ষম বলেই তা পেরেছেন।
যুগ যুগ ধরে বিদ্যমান যে সকল সামাজিক সমস্যা দূর করার উদ্দেশ্য ইসলামের আগমন ঘটেছিলো, সেসব সমস্যা নিজেই এখন ‘মুসলিম বিশ্বে’ মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। ক্রমবর্ধমান সামাজিক সমস্যা, পারিবারিক ও যৌন নিপীড়ন, শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন, ঘুষ ইত্যাদি দিন দিন ব্যাপকতা লাভ করা সত্ত্বেও এসব সমস্যা নিয়ে কথাবার্তা বলা হয় না। যে সমাজের সর্বত্র বিদেশী শ্রমিকদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার ও শোষণ করা হয়, নারী গৃহকর্মীদের উপর যৌন নিপীড়ন চালানো হয়, ঘুষ ও দালালচক্র ব্যাপকভাবে সক্রিয়, আরো সব নেতিবাচক প্রবণতা সমাজে বিদ্যমান; সেখানে এসব বাদ দিয়ে নারীদের ড্রাইভিংয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য নিজের ব্যক্তিগত মতামতকে আবেগপূর্ণভাবে প্রচার করা, কিংবা দিনরাত মিলাদ উদযাপনের সমালোচনা করা আলেমদের জন্য অমার্জনীয় অপরাধ।[19]
আমাদের প্রতি প্রিয় নবীর (সা) সর্বশেষ আহ্বান ছিলো সমাজের সবচেয়ে দুর্বল সদস্যদের অধিকারগুলো পূরণ করা সংক্রান্ত। তাই যে আন্দোলন স্বপ্রণোদিত হয়ে নিপীড়িত মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলে না, তাদের অবস্থান নবীজির (সা) সুন্নত থেকে অনেক দূরে।
৬. নারীদের ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব: আধুনিক সালাফী আন্দোলন মোটের উপর নারীদেরকে এমন এক সত্তা হিসেবে তুলে ধরে, যাকে অমানবিক বললেই সম্ভবত সঠিক বলা হবে। এই বাস্তবতার একটি সহজ উদাহরণ হলো– নিজ স্ত্রীর নাম বা সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর স্ত্রীর নাম উচ্চারণ করাকে পর্যন্ত আপত্তিকর মনে করা হয়।[20] একজন নারীর নাম উচ্চারণ করাকেই যদি নিষিদ্ধ মনে করা হয়, তাহলে সমাজে আদতে নারীদের ভূমিকা কী? অথচ উগ্র নারীবাদী ব্যাখ্যার বিপরীতে ইসলামের প্রকৃত বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম স্পষ্টভাষী ও বুদ্ধিমান বোনদেরকে মুসলিম সমাজের প্রয়োজন।
নারীদের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু কথাবার্তায় সীমাবদ্ধ নয়; সৌদি নারীদের তো গাড়ি চালাতে পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো, সৌদি ধর্মীয় নেতাদের বেশিরভাগই এখন পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞাকে ধর্মের অংশ বলে মনে করেন। দুঃখজনক বিষয় হলো, পাশ্চাত্য সালাফিজমের কিছু অংশ একের পর এক বিবাহ ও তালাক প্রদানের জন্য কুখ্যাতি অর্জন করেছে, সিঙ্গেল মায়েদের সংখ্যা বাড়ছে, শিশুরা পরিত্যক্ত হচ্ছে এবং ব্যভিচার বেড়েই চলছে। এ বিষয়ে ভুল বুঝাবুঝি এড়ানোর জন্য আমার পরিষ্কার কথা হচ্ছে– এরা আমেরিকান ও ব্রিটিশ সালাফিদের মাঝে ক্ষুদ্র একটি অংশ। অথচ এটি এমন এক বাস্তবতা, যাকে কোনো ধর্মীয় নেতাই ইসলামের দিক থেকে ন্যায্যতা দিতে পারেন না। কিন্তু এই আলামত এত স্বাভাবিক হয়ে পড়ছে, যা উপেক্ষা করা যায় না। নারীদের ব্যাপারে সালাফীদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সঠিক তরবিয়তের অভাবই যে এই সমস্যার মূল কারণ, তা পরিষ্কার।
৭. সকল বিষয়ে চূড়ান্ত মতামত প্রদানকারী ‘মুরুব্বী আলেমদের’ একটি গ্রুপের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য: স্বাধীনভাবে চিন্তাভাবনা করা ও অন্ধ-আনুগত্য পরিহার করার দাবিদার আন্দোলনটির বেশিরভাগই সেক্টেরিয়ান ও ‘কিবার’ তথা মুরুব্বী আলেমদের অনুসরণ করার ব্যাপারে অত্যন্ত গোঁড়া দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা অত্যন্ত দুঃখজনক। বাস্তবতা হলো এই ‘কিবারগণ’ সাধারণত একটি বিশেষ জাতীয়তা ও সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত। কোনো সুস্থ আলোচনায় তাদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত বিরল। অথচ ইসলাম, কিংবা আছারী আকীদার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট মানবীয় কর্তৃপক্ষ হতে পারে না, যারা ঐশী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত। ফলত একদল আলেমের সাথে দ্বিমত করা, তাঁরা যত সিনিয়রই হোন না কেন, কোনোভাবেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) সাথে দ্বিমত করার সমতুল্য নয়।
মহানবী (সা) বলেছেন, “আলেমরা হলো নবীর উত্তরসূরী।” আল্লাহ মাফ করুন, স্বয়ং ইসলামিক স্কলারশিপের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমি তর্ক করছি না। অনেক জ্ঞানীগুণী কোনো আলেমকে কোনো তুচ্ছ তালেবে ইলম শর্তহীনভাবে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়তে পারবে, তেমনটিও আমি বলছি না। বরং আপত্তির বিষয় হলো– একটি নির্দিষ্ট, সমমনা ও একই জাতীয়তার আলেমদেরকেই শুধু আলেম মনে করার ব্যাপারটি। অথচ সকল নৃগোষ্ঠীর মধ্যেই ইসলামের অসংখ্য আলেম রয়েছেন। প্রত্যেক আলেমের ইজতিহাদ থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য সালাফীদের যথেষ্ট উদার মনমানসিকতা থাকা উচিত।
সালাফীদের এটা মনে রাখা উচিত, ইবনে তাইমিয়ার জীবদ্দশায় তাঁর সমালোচকদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি সরব ছিলেন, তারা তাঁরই অনুসৃত হাম্বলী মাজহাবের আলেম ছিলেন (অর্থাৎ, তারা ছিলেন অষ্টম শতাব্দীর দামেস্কের ‘কিবার’)। কেন তিনি প্রচলিত শিক্ষাদান পদ্ধতি ও লেখার ধরনের পরিবর্তন করতে চাচ্ছিলেন, এসব আলেমগণ তখন তা বুঝতে পারতেন না।
৮. আধুনিক রাজনৈতিক ব্যাপারগুলো বুঝার নিদারুণ অক্ষমতা: ইবনে তাইমিয়াকে সরাসরি অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, তিনি তৎকালীন শাসকদেরকে নিয়মিতই প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করতেন। আর এখন তাঁকে অনুসরণের দাবিদাররা কীভাবে বর্তমান শাসকদের প্রতি চরম অনুগত ও নতজানু হয়ে থাকে, যেখানে এই শাসকদের অপরাধগুলো ইবনে তাইমিয়ার সময়ের যে কোনো শাসকের চেয়ে বহুগুণ বেশি!
আলেমদের উচিত বর্তমান শাসকদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধের ডাক দেয়া, এমনটি আমি বলছি না। আমার কথা হলো, মাঝামাঝি একটি অবস্থান গ্রহণ করা জরুরি, যেন শাসকদের দৃশ্যমান অন্যায়গুলোর প্রকাশ্য সমালোচনা করা যায়। ইসলামের দাবি হলো, আলেমগণ সব সময় শাসকদেরকে ক্ষমতার অপব্যবহার করা থেকে সংযত রাখবেন। এর অন্য কোনো বিকল্প নেই। অথচ অধিকাংশ সৌদি সালাফী বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর যে কোনো ধরনের সমালোচনা করাকে ধর্মীয় বিচ্যুতির সমতুল্য বলে মনে করে। এই লেখাটি আমি যখন লিখছি, ঠিক তখন এসব অঞ্চলের শাসকগোষ্ঠী মুসলিম ব্রাদারহুড ও এর সমর্থকদের ব্যাপারে জুলুমের পন্থা বেছে নিয়েছে। এসব সুস্পষ্ট অন্যায়ের ব্যাপারে সালাফী আলেমদের নিরবতা দেখে মনে হয় যেন তারা বধির হয়ে গেছে। মিশরীয় সালাফীদের মূলধারার প্রতিনিধি নূর পার্টির কথাই বলা যাক। তারা হলো স্বৈরশাসক সিসির একনিষ্ঠ সমর্থক। যা শুধু দুঃখজনক ব্যাপারই নয়, বরং এই সমর্থন সিসির শাসনকে এক ধরনের বৈধতা প্রদান করেছে। এই ধরনের অন্যায় অবস্থানের তালিকা করতে থাকলে সংখ্যাটি শুধু বাড়বেই।
৪. উপসংহার
রশিদ রিদা (মৃ. ১৯৩৫) হলেন প্রথম আলেম, যিনি তার পরিচালিত আন্দোলনের পরিচয় তুলে ধরতে সর্বপ্রথম ‘সালাফী’ পরিভাষাটি জনপ্রিয় করে তোলেন। সেই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিলো মাজহাবের অন্ধ অনুসরণকে প্রত্যাখ্যান করা এবং ফিকাহ ও আধুনিকতার সমন্বয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করা। এ কারণে তখনকার সালাফী আন্দোলন ছিলো তুলনামূলকভাবে উদারপন্থার অনুসারী। একজন উদীয়মান তরুণ আলেম আলবানী একদিন রশিদ রিদার একটি নিবন্ধ পড়লেন। সেখান থেকে তিনি ‘সালাফী’ পরিভাষাটি গ্রহণ করেন এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি আন্দোলনকে বুঝাতে এটি ব্যবহার করেন। মজার ব্যাপার হলো, রশিদ রিদার আন্দোলন ক্রমেই মডার্নিস্ট ইসলামে পরিণত হয় এবং এক পর্যায়ে ‘সালাফী’ লেবেল পরিত্যাগ করে। অন্যদিকে, আলবানী সমর্থিত লিগ্যাল মেথডলজি পন্থীরা (ইসলাম সম্পর্কে রশিদ রিদার চিন্তার সাথে যাদের মিল খুব কম) ‘সালাফী’ লেবেল আঁকড়ে ধরে।
এরই ধারাবাহিকতায় আলবানী কর্তৃক গৃহীত এই লেবেল নজদীপন্থীরাও গ্রহণ করে। তারপর একে একে এই আন্দোলনের অন্যান্য ধারার মাঝেও পরিভাষাটি ছড়িয়ে পড়ে। অন্যথায়, এই শতাব্দীর আগে ‘সালাফী’ পরিভাষাটি একটি কমন লেবেল ও প্রপার নাউন হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিলো না।[21] তাই বলা যায়, ‘সালাফী’ পরিভাষাটি এমন একটি আধুনিক পরিভাষা, যা নিজেকে আছারী আকীদার মতো একটি প্রাচীন ধর্মীয় গোষ্ঠীর সাথে সংযুক্ত করেছে।
আমি মনে করি, ইসলামের অন্য সকল আন্দোলনের মতো সালাফী আন্দোলনও কিছু মানুষের গড়ে তোলা একটি আন্দোলন, যার মধ্যে ভালো-মন্দ দুটি দিকই আছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের নিকট ‘সালাফী আন্দোলন’ নাজিল করেননি। তিনি বরং কোরআন নাজিল করেছেন এবং একজন রাসূল (সা) পাঠিয়েছেন। সালাফী আন্দোলন যেহেতু মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলন, তাই এর ভুলত্রুটি মূলত মানুষেরই ত্রুটিবিচ্যুতি। এই বিষয়টি থেকেই বুঝা যায়, কেন ‘একক’ কোনো সালাফী আন্দোলন নেই। এর পরিবর্তে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন স্বতন্ত্র উপধারাসমূহের সমষ্টি হলো সালাফিজম। আমি মনে করি, নির্দিষ্ট একটি আন্দোলন ইসলামের একক ও যথার্থ বুঝজ্ঞান থাকার দাবি করতে পারে না। তবে বিশেষ কিছু বিষয়ে বিশেষ কোনো আন্দোলন অন্যদের চেয়ে সত্যের অধিক নিকটবর্তী হতে পারে। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি আন্দোলনই মানবীয়। তাই কেউই ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। আমি আবারো বলছি, হকের ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট দল, গোষ্ঠী বা ধর্মতত্ত্বের একচেটিয়া অধিকার থাকতে পারে না।
সামগ্রিক দৃষ্টিতে সালাফী আন্দোলনের চমৎকার কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলো বজায় রাখার ব্যাপারে তারা সচেষ্ট। তবে এর পাশাপাশি আন্দোলনটির কিছু ত্রুটিবিচ্যুতিও উপেক্ষা করার মতো নয়। কেউ হয়তো জানতে চাইতে পারে, “নেতিবাচক বিষয়গুলো পরিহার করে এবং ইতিবাচক বিষয়গুলো বজায় রেখে সালাফী আন্দোলনকে সুন্দরভাবে পরিচালিত করা কি সম্ভব নয়?” অবশ্যই সম্ভব। এই আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত অনেকে এই কাজটিই করতে চান। সালাফিজম কিংবা ইসলামের অন্যান্য ধারার এ ধরনের অভ্যন্তরীণ প্রচেষ্টাকে আমি সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে সমর্থন করি। যা হোক, প্রশ্ন হলো: উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদ্ধতিগত ভুল থাকা থাকা সত্ত্বেও, ‘সালাফী’ লেবেলটির সাথে নানান নেতিবাচকতা সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়লেও এবং ‘সালাফী’ পরিভাষাটি দিয়ে প্রকৃতপক্ষে যা বুঝাতে চাওয়া হয়েছিলো, তার কোনো প্রতিফলনই এতে না থাকা সত্ত্বেও কেন কেউ এর সাথে নিজেকে জড়াবে? বিশেষ করে যখন কেউ বুঝতে পারে যে, এই লেবেলটির স্বয়ং কোনো ধর্মীয় মাহাত্ম্য নেই। বাস্তবতা হলো ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসের নিরীখে একেবারে সাম্প্রতিককালে এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে।
এসব কারণেই পূর্ববর্তী সেকশনে আলোচিত সালাফী ধারাগুলোর কোনো ধারার সাথেই আমি নিজেকে আর সংশ্লিষ্ট রাখি না। তবে যারা তারপরও নিজেকে এর সাথে সংশ্লিষ্ট রাখতে চায় তাদের জন্য আমার পরামর্শ হলো: তারা যেন সালাফীদের ভুলত্রুটি সংক্রান্ত উপর্যুক্ত পর্যালোচনাটি বিবেচনায় নিয়ে আত্মসংশোধনের কাজে ব্রতী হয়। আর কেউ এই পরিচয় ত্যাগ করতে চাইলে, সে ব্যাপারে তার পূর্ণ অধিকার তো রয়েছেই। অন্য যে কোনো লেবেল বা পরিচয়ের তুলনায় শুধুমাত্র ‘ইসলাম’ পরিচয়ই অনেক বেশি প্রশস্ত।
বিগত দুই দশক লাগাতার গবেষণার পর আমি আছারী আকীদা গ্রহণ করেছি। আমি মনে করি, এটি সবচেয়ে নিরাপদ ও সবচেয়ে বিশুদ্ধ আকীদা। ইসলাম নিছক কতগুলো গৎবাঁধা বিশ্বাসের চেয়েও বেশি কিছু। আমার চূড়ান্ত আনুগত্য মানুষের তৈরি কোনো আকীদার প্রতি নয়। বরং আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি। তারপর খাঁটি ঈমানদার ও তাকওয়াবানদের প্রতি। তাই, আমি একজন মধ্যপন্থী-দেওবন্দী-তাবলীগী-মাতুরিদীর সাথে তুলনামূলকভাবে বেশি মিল পাই ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অনুভব করি। এই ধারার কোনো ব্যক্তি ফিকাহ, ধর্মতত্ত্ব ও পদ্ধতিগত জায়গা থেকে আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করা সত্ত্বেও তার ধার্মিকতা ও উম্মাহর জন্য চিন্তাভাবনার সাথে আমি নিজেকে রিলেট করতে পারি। অন্যদিকে, একজন হার্ডকোর সালাফীর একমাত্র চিন্তা হলো আমার প্যান্টের দৈর্ঘ্য এবং তার দেখা মতে, আমার কথাবার্তায় ‘কিবারদের’ উদ্ধৃতি না থাকা নিয়ে।
এছাড়া কোনো মধ্যপন্থী সুফীর দৃষ্টিতে আমি তার মতোই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি বিশ্বাসী, যদিও কিছু ছোটখাটো মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু একজন স্ট্যান্ডার্ড গোঁড়া সালাফী পূর্বধারণার বশবর্তী হয়ে শুরুতেই আমাকে একটা ছঁকে ফেলে দেবে এবং তারপর আমার ব্যাপারে তার একমাত্র কাজ হবে ‘আমার বিরুদ্ধে সাবধান করা’। আল্লাহ নিশ্চয় তাঁর মতো করেই আরশে সমুন্নত রয়েছেন (ইসতাওয়া আলাল আরশ) – এই ব্যাপারে একজন হার্ডকোর সালাফীর সাথে আমি হয়তোবা একমত হতে পারবো; কিন্তু উম্মাহর বর্তমান সমস্যাগুলো সম্পর্কে তাদের সংকীর্ণতাসুলভ অদূরদর্শিতা, স্বীয় ধার্মিকতার দম্ভ এবং কাল্ট মানসিকতা আমার বিরক্তির কারণ। সামগ্রিকভাবে উম্মাহর জন্যও এসব ক্ষতিকর। তাই, কথায় কথায় আকীদার প্রসঙ্গ তোলা ও ‘পথভ্রষ্টদের’ খারিজ করা ছাড়া যেসব ফ্যানাটিক সালাফীর আর কোনো ধার্মিকতা চোখে পড়ে না; তার থেকে বরং আমি এমন একজন মধ্যপন্থী সুফীর সাথে বেশি একাত্মবোধ করবো, যিনি আমার চেয়ে বেশি কোরআন পড়েন এবং হালাল উপার্জন সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি সচেতন থাকেন। এর মানে আবার সুফি ব্যক্তিটি তার ধর্মতাত্ত্বিকভাবে ‘সঠিক’ অবস্থানে রয়েছেন, তা নয়। দুই-চারটা মত-দ্বিমতের চাইতে ইসলাম ও ইসলামী চেতনা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সর্বশেষ কথা: সালাফিজমের সাথে যাদের দীর্ঘদিনের শত্রুতা রয়েছে, তারা এর বিপক্ষে এই প্রবন্ধটিকে ব্যবহার করবে, এটি সহজেই অনুমেয়। প্রগতিশীল ও আধুনিকতাবাদী থেকে শুরু করে শিয়া, সুফী এবং আশআরী ধারাসহ ইসলামের সকল ধারার ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটে। বাস্তবতা হলো, আমার মতো কেউ যদি একটি নির্দিষ্ট সময় কোনো আন্দোলনে যুক্ত থাকে, তারপর এর ভুলত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেয়, তখন স্বভাবতই অন্যান্য গ্রুপগুলো উল্লসিত হয়ে ওঠে। এই ক্ষেত্রে তাদের স্মরণ রাখা দরকার– আমার আকীদাগত অবস্থান দুই দশক আগে যা ছিলো, এখনো তাই আছে। আপনাদের আন্দোলনগুলোও সালাফিজমের মতো নিছক কিছু মানুষের গড়ে তোলা আন্দোলনই মাত্র।
অন্যভাবে বললে– আমি মনে করি, ইসলামের অনুসারী প্রতিটি আন্দোলনই মানুষের গড়া আন্দোলন। যার কারণে এসব আন্দোলনে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই থাকে। কোনো আন্দোলন হয়তো অন্যদের চেয়ে কোনো কোনো দিক থেকে রাসূলের (সা) সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী। কিন্তু কোনো আন্দোলনই নিজেদেরকে সুন্নতে রাসূলুল্লাহর (সা) একমাত্র প্রতিনিধি, কিংবা এই পৃথিবীতে আল্লাহর মনোনীত দ্বীনের সোল এজেন্ট দাবি করতে পারে না। এসব আন্দোলনের মধ্যে সালাফী আন্দোলন আকীদার ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রেখেছে, এটি ঠিক। কিন্তু এই কারণে তাদেরকে ইসলামের সকল বিষয়ে সর্বেসর্বা বলা যায় না। আমাদের উচিত তাদের ভালো কাজগুলো গ্রহণ করা এবং সম্ভব হলে ভদ্রতা ও প্রাজ্ঞতার সাথে তাদের ভুলত্রুটিগুলো সংশোধন করে দেয়া। আন্দোলনের ভেতর থেকে যিনি বা যারাই সংস্কার সাধন করতে চান, তিনি বা তাদের জন্য আমার দোয়া ও পরামর্শ থাকবে। প্রত্যেকেরই যার যার মতো নিজস্ব অবস্থান ও কর্মপদ্ধতি রয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বৃহত্তর উম্মাহর খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত করাকে অধিক কল্যাণকর বলে মনে করছি।
ডিসক্লেইমার: আমার গড়ে ওঠার পেছনে যে আন্দোলনের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে, যে আন্দোলনের আলেমদের নিকট থেকে আমি উপকৃত হয়েছি, সে আন্দোলনটির প্রতি আমি অবশ্যই সর্বদা সম্মান বজায় রাখবো। তাদের পদ্ধতিগত কিছু বিষয়ে দ্বিমত করলেও আমি আন্তরিকভাবেই তাদের প্রশংসা করি। তাই কেউ যদি মনে করে, এই নিবন্ধের কোথাও অযৌক্তিক কঠোরতা প্রকাশ পেয়েছে, তাহলে আমি আন্তরিক ক্ষমাপ্রার্থী। কারণ, অপমান বা কুৎসা রটনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার কথা যদি কঠোর লাগে, তাহলে এর কারণ বোধহয় এটি– যে আন্দোলন উম্মাহর সালাফদের অনুসারী বলে নিজেকে দাবি করেছিলো, তাদের কাছে আমার প্রত্যাশা ছিলো আরো বেশি। কিন্তু তারা তাদের মহৎ লক্ষ্য থেকে অনেকখানি বিচ্যুত হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আমার আন্তরিক চাওয়া হলো– সব ঘরানার ইসলামী আন্দোলন, বিশেষ করে সালাফী আন্দোলন, আমাদের দ্বীনের নীতিমালাসমূহকে শুদ্ধভাবে তুলে ধরবে।
সালাফী হই কিংবা না হই, ঈমানদার হিসেবে আমরা প্রত্যেকেই আমাদের সবটুকু বুঝজ্ঞান, সামর্থ্য, আমাদের কণ্ঠস্বরের সবটুকু ক্ষমতা এবং সকল রিসোর্সকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিয়োজিত। যেহেতু আমরা জানি– আল্লাহর কথাই হলো চূড়ান্ত এবং তাঁর রাসূলের (সা) দেখানো পথই হলো একমাত্র সঠিক পথ।
সমালোচকদের প্রতি: এই নিবন্ধ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে একটি বাক্যের উদ্ধৃতি দিয়ে সেটিকেই আমার সম্পূর্ণ মতামত হিসেবে চিত্রিত করা ইসলামসম্মত কাজ নয়। প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একে বিবেচনা না করলে এমনকি কোরআন ও সুন্নাহকে পর্যন্ত সহজেই ভুল বুঝা সম্ভব। দ্বিমত করুন নির্দ্বিধায়; তবে দয়া করে পুরো নিবন্ধের লিংক উল্লেখ করবেন এবং পাঠকরা যেন পুরো নিবন্ধটি পড়ে নিজেরাই আমার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতে পারে, সেই সুযোগ দেবেন। সালাফী আন্দোলনের সমালোচনার পাশাপাশি যেসব প্রশংসা করেছি এবং সর্বশেষ যে ডিসক্লেইমার দিয়েছি, দয়া করে সেগুলোও বিবেচনায় রাখবেন।
[মূল: ড. ইয়াসির ক্বাদী, অনুবাদ: মাসউদুল আলম]
*****নোট:
[1] সিদ্দিক হাসান খান ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের আহলে হাদীস আন্দোলনের অনুপ্রেরণা।
[2] একজন সাধারণ ব্যক্তির পক্ষে ধর্মীয় মতামতগুলো (তারজীহ) থেকে সঠিকটা বেছে নিতে বাধ্য করা হিতে বিপরীত হতে পারে। কারণ, এ ধরনের বিষয়ে এনগেজ হওয়ার জন্য একেবারে প্রাথমিক বিষয়গুলো জানার ঘাটতিও তার রয়েছে।
[3] ‘ওয়াহাবী’ শব্দটিকে একটি গালি হিসেবে সালাফী আন্দোলনের সমালোচকরা প্রায়শ ব্যবহার করে থাকে। এটি মর্যাদাহানিকর। তাই এই নিবন্ধে শব্দটি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তাছাড়া, আল্লাহ তায়ালার একটি নাম (আল-ওয়াহহাব) থেকে কোনো অবমাননাকর শব্দচয়ন করা মুসলমানদের জন্য উচিত নয়।
[4] এই বক্তব্য তখন প্রচণ্ড বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলো। বিশেষ করে সাহওয়াপন্থী আলেম শায়খ সফর আল-হাওয়ালী যখন আলবানীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে ‘যাহিরাতুল ইরজা’ শিরোনামে বই লিখেন, তখন বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। আলবানী মুরজিয়াদের (ইসলামের প্রাথমিক যুগের একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী, যারা আমলকে ঈমানের অংশ মনে করতো না) মতামতের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন বলে এই বইয়ে তিনি অভিযোগ করেন। এই ঘটনা তখন দুটি সালাফী গ্রুপের সম্পর্কের মধ্যে মারাত্মক ফাটল ধরায়। একটি হলো সৌদিভিত্তিক মূলধারার সালাফী গ্রুপ, অপরটি জর্ডানভিত্তিক শায়খ আলবানীর নেতৃত্বাধীন গ্রুপ। এখন পর্যন্ত এই দ্বন্দ্বের অবসান না ঘটলেও তাদের মধ্যে আগের মতো বৈরিতা আর নেই।
‘সাহওয়া’ শব্দটির মানে হলো রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণ। ৯০ দশকের প্রথম দিকে উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা এবং প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রেক্ষিতে সৌদি সালাফীদের সক্রিয় রাজনৈতিক অবস্থানকে বুঝাতে মূলত এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। সাহওয়াপন্থী আলেমগণ যুদ্ধ ও মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, আলেমদের আরেকটি পক্ষ শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক বিদেশী সেনাদেরকে ডেকে আনার সিদ্ধান্তের পক্ষে ছিলেন। এভাবে সৌদি আরবের মূলধারার সালাফী আলেমদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়।
সৌদি সালাফী গ্রুপগুলোর মধ্যে মাদখালীরা হলো সাহওয়াপন্থী আলেমদের বিরোধিতাকারী সর্বশেষ গ্রুপ। তারা সাহওয়াপন্থী আলেমদেরকে সাইয়েদ কুতুব ও তাঁর ভাই মুহাম্মদ কুতুবের রাজনৈতিক চিন্তার অনুগামী অভিহিত করে ‘কুতুবপন্থী’ বলে ট্যাগ দেয়। মুহাম্মদ কুতুব ছিলেন সফর আল-হাওয়ালীর থিসিস সুপারভাইজর। কেউ কেউ শায়খ হাওয়ালীকে সাহওয়া আন্দোলনের ‘প্রতিষ্ঠাতা’ মনে করতে পারে।
[5] অনেকে এর পেছনের কারণটা বুঝতে পারে না। ফলে তাদের দাবি হলো, সৌদি সরকার টাকাপয়সা দেয় বলেই তারা সরকারের প্রতি অনুগত। টাকাপয়সার একটা ভূমিকা আছে বটে। তবে সৌদির বাইরে সালাফীদের মধ্যে যারা এই মতের সমর্থক, তাদের বেশিরভাগই সৌদি পেট্রোডলারের সুবিধাভোগী নয়। তাই সালাফী আন্দোলন সম্পর্কে ন্যায্য কথাটি হলো– মূলত ‘বৈধ শাসকের আনুগত্য’ সংক্রান্ত ক্লাসিক্যাল সুন্নী মতবাদের উপর ভিত্তি করে তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড়িয়ে আছে। বলে রাখা ভালো, আমার মতে তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মীয়ভাবে সমর্থনযোগ্য নয় এবং এটি নৈতিকতারও পরিপন্থী; বিশেষ করে এ মূলনীতি যখন কোনো বৈধ শাসকের প্রকাশ্য সমালোচনার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। উপরন্তু, বেশিরভাগ সালাফী গ্রুপের অনুসারীদের মধ্যে একটি স্থূল আবেগ দেখা যায়। সেটা হলো– সমস্ত ভুলত্রুটি সত্ত্বেও সৌদি রাজতন্ত্রই কেবল ‘তাওহীদ ও সুন্নাহর রক্ষক’; তাই সৌদি রাজতন্ত্রের অন্য সব দোষত্রুটি উপেক্ষা করে যেতে হবে। তাই, তাদের দৃষ্টিতে সরকারের সমালোচকরা আসলে তাওহীদ রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের সমালোচক।
[6] এই ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থানটির পরিণতিই হলো তাকফীর করা, যা পরবর্তী পয়েন্টে বলা হয়েছে।
[7] আমার একটি একাডেমিক পেপারে এ বিষয়ে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। লিংক: https://www.youtube.com/watch?v=RZoAzlnpIgk
[8] এই প্রত্যেকটি মতামত এবং এর পক্ষের আলেমদের চিন্তায় পার্থক্য খুব সামান্যই। এরা প্রত্যেকেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে সদাসতর্ক। তাদের দৃষ্টিভঙ্গির এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো সম্পর্কে আমি ভালো করেই জানি। অবশ্য সবার ব্যাপারে এখানে আলোচনা করা সম্ভব নয়। কারণ, এটি কোনো গবেষণামূলক নিবন্ধ নয়। একটি সংক্ষিপ্ত সাদামাটা বর্ণনা তুলে ধরাই এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য। আগ্রহী পাঠকগণ চাইলে এই গ্রুপগুলোর মধ্যকার দৃষ্টিভঙ্গিগত সূক্ষ্ম পার্থক্য সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিলে বিস্তারিত জানতে পারবেন।
[9] এখানে একটি কথা বলে রাখা জরুরি: এই গ্রুপগুলো ও তাদের দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ একটা আরেকটা থেকে পুরোপুরি পৃথক কিংবা বিচ্ছিন্ন নয়। বরং কোনো কোনো বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির মিল থাকতে পারে। এবং বিশেষ কোনো আলেম বা ব্যক্তির মধ্যে একাধিক উপদলের বৈশিষ্ট্য থাকাও অসম্ভব নয়।
[10] মাদখালী ধারার সালাফিজমের গুরুত্ব কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে: (১) তারা অত্যন্ত অসহিষ্ণু হিসেবে পরিচিত হয়ে গিয়েছিলো এবং তাদের এই পরিচিতি পুরো সালাফী আন্দোলনের এত বেশি ক্ষতিসাধন করেছে যে অন্যান্য সালাফী ধারার অধিকাংশ ধর্মীয় নেতা (এমনকি মাদখালী ধারারও কোনো কোনো আলেম) বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, এই ধারাটির মধ্যে চরমপন্থার সহজাত উপাদান রয়েছে। (২) মাদখালীদের জনপ্রিয়তার হুজুগে পড়ে যারা তখন গা ভাসিয়েছিলো, পরবর্তীতে তারা হয় এই গ্রুপ ত্যাগ করেছে, নয়তো সালাফিজম ত্যাগ করেছে। কেউ কেউ এমনকি ধর্মীয় প্র্যাকটিস থেকেই সরে গেছে। এই ঘটনা এত বেশি ঘটেছে যে এ ধরনের লোকদের বুঝাতে ‘সালাফি বার্নআউট’ বলে একটা পরিভাষা চালু হয়ে গেছে। (৩) সরকারের কট্টর সমর্থক হওয়ার কারণে কিছু সময়ের জন্য (৯০ দশকের শেষ থেকে শূন্য দশকের প্রথম পর্যন্ত) সৌদি সরকার মাদখালী মতবাদ প্রমোট করেছিলো। কিন্তু এই মতবাদের নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব বেড়ে গেলে সরকার নিজেই মাদখালী ধর্মীয় নেতাদের উপর থেকে কৌশলে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। তারপর সৌদি আরবের বাইরে এটি শুধু পাশ্চাত্যের মুসলিম সমাজে সক্রিয় থাকে। বিশেষ করে ধর্মান্তরিত কিংবা স্বল্প শিক্ষিত নন-প্র্যাকটিসিং অভিবাসী মুসলিমদের মধ্যে। এদের হাবভাব দেখে মনে হয় যেন তারা প্রসিদ্ধ ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য হঠাৎ করে একটি অস্ত্র হাতে পেয়ে গেছে।
[11] এখানে মিশরের নাম এসেছে নিছক উদাহরণ হিসেবে। অন্য দেশগুলোর নাম না নিলেও পাশ্চাত্যসহ প্রায় সব দেশের অবস্থাই সম্ভবত একই রকম। কখনো কখনো প্রাচ্যের সালাফীদের রাজনৈতিক অবস্থান পাশ্চাত্যের সালাফীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়– দুজন ধর্মান্তরিত আমেরিকান মুসলিম হয়তো সৌদি আরবের কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সহীহ আকীদাগত অবস্থান নিয়ে তীব্র বাদানুবাদে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। এ রকম চিত্র একেবারে অপরিচিত নয়।
[12] ব্যক্তিগতভাবে আমাকে মাদখালী ও তাকফীরি – উভয় ঘরানার সালাফীদের ক্ষোভের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাই স্পষ্টতই এই ঘরানা দুটোর ব্যাপারে আমি নিরপেক্ষ কেউ নই। তারপরও এই গ্রুপ দুটোর মধ্যে তাকফীরিদের ব্যাপারে আমার কথা হলো: পদ্ধতিগত দিক থেকে মাদখালীদের তুলনায় তারা বেশি বুদ্ধিমান। তাদের ঈমানের তেজও বেশি। কিন্তু তাদের কাজকর্ম ও যাদেরকে তারা সমর্থন করে, এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব বুঝার মতো প্রজ্ঞার অভাব তাদের রয়েছে। তাদের সাথে দ্বিমত পোষণকারীদেরকে মূল্যায়ন করার ব্যাপারে তারা মাদখালীদের মতোই কঠোর ও অসহিষ্ণু। অথচ নিছক দ্বিমত পোষণের কারণেই কেউ ইসলামের শত্রুদের কাতারে চলে যায় না। তাছাড়া আপনার বয়স, অভিজ্ঞতা, সার্বিক দক্ষতা বিবেচনা করাটাও আপনার জন্য বিচক্ষণতার কাজ হবে। তুলনামূলকভাবে বয়স্ক ও প্রাজ্ঞ লোকেরা কেন আপনাদের আন্দোলনে খুব একটা নেই? চল্লিশ, পঞ্চাশ বা ষাটের কোটায় যাদের বয়স, যারা ইসলামের জন্য সারাটা জীবন ব্যয় করেছেন, তাদের ঈমান ও ইসলামের জন্য তাদের খেদমতকে কি সন্দেহ করা যায়? আপনি কি আসলেই মনে করেন– একজন টিনেজার বা বিশ-পঁচিশ বছর বয়সের তরুণ পাশ্চাত্যের মুসলমানদের এগিয়ে নেয়ার জন্য তার চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি বয়সের লোকদের থেকে বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন?
এ ব্যাপারে আমার সর্বশেষ পরামর্শ হলো, অন্যান্য ধর্মীয় নেতা ও মানুষজন সম্পর্কে আপনার অন্ধবিশ্বাস ও পূর্বানুমান সম্পর্কে সচেতন থাকুন। আপনি হয়তো কোনো ব্যক্তির এমন ভুলত্রুটি বা মতামতের সমালোচনা করছেন, আদতে যার অস্তিত্বই নেই। এটি হতেই পারে। সেক্ষেত্রে মিথ্যা অপবাদের জন্য আপনাকে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। যারা আপনার শত্রু নয়, তাদেরকে শত্রু বানানো বোকামি। এ ধরনের কাজ আপনার জন্য ক্ষতিকর। খুব সম্ভবত পরকালেও আপনি এ ধরনের কাজের জন্য ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।
[13] অনেকের মতে, ক্যাথলিকদের সাথে নিয়ে প্রটেস্ট্র্যান্টরা যেভাবে সংস্কার আন্দোলন করতে চেয়েছিলো সালাফীরাও একইভাবে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে সুফিবাদ ও লোক-ইসলামের সাথে কাজ করতে চায়।
[14] এটি হলো ইগনাজ গোল্ডজিহের থেকে শুরু করে রিচার্ড এম. ফ্রাঙ্ক, জর্জ ম্যাকডিসি এবং জোসেফ ভ্যান অ্যাস পর্যন্ত প্রায় সকল অমুসলিম ইসলামী ধর্মতাত্ত্বিকের অভিমত। যদিও এটা সত্য যে, এই গবেষকদের বেশিরভাগ আছারী আকীদাকে তেমন পাত্তা দেননি। কারণ তাদের মতে, এই ধারাটি অতিসরলীকরণের দোষে দুষ্ট। অবশ্য তারা স্বীকার করেছেন, আদি সুন্নী মতবাদের এই ধারাটি আশআরীদের কালাম ধারারও আগে প্রচলিত ছিলো।
কিন্তু আধুনিক আশআরীদের কেউ কেউ এই বাস্তবতাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে। অথচ সমস্ত তথ্য-প্রমাণ তাদের বিপরীত। তাদের অভিযোগ, ইবনে তাইমিয়া ইসলামের একটি নতুন ধারণা ‘চালু’ করে গেছেন। অথচ, যেখানে বসে আমি এখন এই কথাগুলো লিখছি, অর্থাৎ আমার ব্যক্তিগত পাঠাগারে ধর্মতত্ত্বের উপর অন্তত এক ডজন গবেষণামূলক বই দেখতে পাচ্ছি। এগুলোর সবই আবুল হাসান আল-আশআরীর সময়কালের আগে লেখা। এই বইগুলোতে আল্লাহর গুণসমূহের সুস্পষ্ট ও পরিপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে এবং এর পাশাপাশি কালাম শাস্ত্রকে প্রত্যাখান করা হয়েছে। ইবনে তাইমিয়ার সাথে কেউ দ্বিমত করতেই পারেন, কিন্তু এই ঐতিহাসিক সত্যকে কেউ অস্বীকার করতে পারেন না যে, তিনি যা প্রচার করে গেছেন, তা তাঁর সময়কালের অন্তত পাঁচ শতাব্দী আগে থেকেই সাধারণ আকীদা হিসেবে প্রচারিত হয়ে আসছিলো।
[15] ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পিএইচডি থিসিসের বিষয় ছিলো ইবনে তাইমিয়ার শ্রেষ্ঠ রচনা ‘Averting the Conflict Between Reason and Revelation’ (ওহী ও যুক্তিবুদ্ধির বিরোধ মীমাংসা) শীর্ষক বইয়ের উপর একটি বিশ্লেষণমূলক গবেষণা। থিসিসের শুরুতে শ’খানেক পৃষ্ঠার সূচনা অধ্যায়ে আমি আশআরী ঘরানার উত্থানের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যপ্রমাণ উল্লেখ করেছি। সেখানে সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছি, এই ঘরানাটি শুরুতে ছিলো ক্ষুদ্র ও সমাজের কাছে অপাঙক্তেয় একটি আন্দোলন। অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠী এদেরকে নানাভাবে হয়রানী করতো। কিন্তু কিছু ঐতিহাসিক কারণে (কারণগুলো আমি সেখানে বিস্তারিত উল্লেখ করেছি) তৎকালীন প্রভাবশালী আছারী আকীদার স্থলে আশআরী আকীদা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এটি সেলজুকদের অফিসিয়াল আকীদায় পরিণত হয়, যা পরবর্তী রাজবংশগুলোও বহাল রাখে। তাই সুন্নী ধারায় আশআরী আকীদাই সবসময় মূলধারা ছিলো – আধুনিক আশআরীদের এই দাবি ঐতিহাসিকভাবে সত্য নয়।
[16] আমার ধারণা– আল্লাহ তায়ালা যদি আছারী আকীদার পৃষ্ঠপোষক ও প্রচারক হিসেবে ইবনে তাইমিয়ার মতো ক্যালিবারসম্পন্ন কাউকে না পাঠাতেন, তাহলে এটি হয়তো অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও ক্ষীণকায় একটি আন্দোলনে পরিণত হয়ে পড়তো। একটি ব্যক্তিগত বিষয় বলি, আমার নিজের চিন্তাভাবনার উপর ইবনে তাইমিয়ার মতো বড় মাপের ও তীক্ষ্ম অন্তদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের গভীর প্রভাব রয়েছে। উম্মাহর জ্ঞানীদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ হোন বা না হোন, সর্বশ্রেষ্ঠদের মধ্যে তিনি নিঃসন্দেহে অন্যতম। দুর্ভাগ্যবশত, সালাফীদের প্রায় সকলে ইবনে তাইমিয়ার লেখালেখি পড়াকেই শুধু যথেষ্ট মনে করে (যদিও তাঁর কিছু লেখা, বিশেষ করে হেলেনীয় চিন্তা ও দর্শন সংক্রান্ত লেখাগুলো, বুঝার যোগ্যতাই তাদের নেই)। কিন্তু তাঁর দেখানো পথ অনুসরণের হিম্মত তাদের নেই। ইবনে তাইমিয়া তখন যা লিখেছিলেন, এখন বেঁচে থাকলে খুব সম্ভবত তা লিখতেন না। বরং বর্তমানে উম্মাহ যেসব বুদ্ধিবৃত্তিক হুমকি মোকাবেলা করছে, সেসব বিষয়ে মনোযোগী হতেন। তিনি তখন আসলে তার সময়কার চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবেলায় কলম ধরেছিলেন। অন্যদিকে, আধুনিক সালাফীদের অধিকাংশই বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা তো দূরে থাক, ইবনে তাইমিয়ার লেখা সাতশ বছর আগের চিন্তাভাবনা ও এর সীমানা পর্যন্ত ডিঙ্গানোর সাহস করে না।
[17] ৭৩ ফিরকা সংক্রান্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। অনেকেই যে ফিরকার ব্যাপারটিকে আসলে ভুল বুঝেছে, সেটি ব্যাখ্যা করেছি। এ ধরনের একটি আলোচনা পাওয়া যাবে এখানে: https://www.youtube.com/watch?v=6fDXifZ5jnY
[18] এ বিষয়ে আমি আরো বিস্তারিত বলেছি এখানে– https://muslimmatters.org/2009/03/11/the-birth-date-of-the-prophet-and-the-history-of-the-mawlid-part-i-of-iii/
[19] এসব ইস্যুতে এখানে-সেখানে অনিয়মিত ও বিচ্ছিন্ন দুয়েকটা খুতবা দেয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে না। এসব ইস্যু সালাফীদের আলোচনার মূল পয়েন্ট নয়, যদিও সংশ্লিষ্ট সমাজে এসব সমস্যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে।
এর মানে এই সমালোচনা যে শুধু সৌদি ধর্মীয় নেতাদের জন্য, তা নয়। বরং এর পাশাপাশি অন্যান্য সমাজের জন্যেও এসব কথা প্রযোজ্য।
[20] পুরুষ ও নারী সাহাবীদের সবাই সবার নাম ভালো করেই জানতেন। দরকার হলে তারা পরস্পর কথাবার্তাও বলতেন। অথচ নারীদের অস্তিত্ব পর্যন্ত মুছে দেয়ার এই সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা থেকে আপাতভাবে মনে হতে পারে, সালাফদের জীবনে যেন এ ধরনের কোনো দৃষ্টান্ত ছিলো না। অন্যদিকে, এ ব্যাপারে প্রকৃত ইসলামী আদব হলো– শুধু বৈধ প্রয়োজনে, যথাযথ শিষ্টাচার রক্ষা করে এবং ন্যূনতম মাত্রায় বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে সরাসরি কথাবার্তা বলা যেতে পারে। এটি কেউ অস্বীকার করে না। কিন্তু কিছুটা অনুমোদন দেয়া হলেও প্রথমে তা বিপথগামিতা এবং পরবর্তীতে লাগামহীন বিকৃতির দিকে নিয়ে যাবে বলে সালাফীদের বদ্ধমূল ধারণা।
[21] হ্যাঁ, প্রাচীন ও ক্লাসিক্যাল ইসলামের হাতেগোনা কিছু বর্ণনায় এর অস্তিত্ব পাওয়া যায় বটে। তবে এটি যে প্রচলিত কোনো পরিভাষা ছিলো না; কিংবা বর্তমানে যে অর্থে ব্যবহৃত হয়, সে অর্থে ব্যবহৃত হতো না – সেই সত্য অস্বীকার করার জো নেই।

কীভাবে বুঝবো কোনো কিছু ‘ইসলামিক’ কিনা?

কয়েক বছর আগে আমি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গিয়েছিলাম। একদল মুসলিম তরুণ একদিন খুব উৎসাহ নিয়ে আমাকে ইতিহাসের প্রথম ‘ইসলামিক মুভি’ দেখার আমন্ত্রণ জানালো। আমি জানতে চাইলাম, ‘ইসলামিক মুভি’ বলতে তারা কী বুঝাচ্ছে? তারা বললো, তাদের শরিয়াহ কমিটি ঠিক করে দিয়েছে – সিনেমায় কোনো নারী চরিত্র এবং বাদ্যযন্ত্র আছে এমন গান থাকতে পারবে না। তাই মুভিটিতে নারীর পরিবর্তে পুরুষরাই মাথায় ওড়না পরে নারী চরিত্রে অভিনয় করেছে এবং কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই গান তৈরি করা হয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মুভির গল্পটা কী? তারা বললো, এখানে গল্প তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। সহীহ বর্ণনা থেকে প্রাপ্ত সাহাবীদের কথোপকথন নিয়ে মুভিটা বানানো হয়েছে। তখন আমি জানতে চাইলাম, এই মুভির কোনো দর্শক আছে? তারা জানালো, গত এক মাস ধরে এর প্রতিটি প্রদর্শনীর সব টিকেট বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এবং শেষ পর্যন্ত আমার জন্যও তারা একটি টিকেটের ব্যবস্থা করতে পারেনি।
আরেকবার আমি গিয়েছিলাম ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে। সমুদ্র সৈকতের পাশে একটি জনপ্রিয় ‘ইসলামী’ হোটেলে আমাকে থাকতে দেয়া হয়েছিলো। হোটেল রুমে ঢুকে দেখি, কোনো জানালা নেই। শুধু চারটি দেয়াল ও একটি দরজা! পরে রিসেপশনিস্ট আমাকে জানালো, ডিজাইন করার সময় হোটেলটির মুসলিম মালিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সৈকতের একদম সামনে হওয়া সত্ত্বেও অতিথিদের প্রাইভেসি রক্ষার স্বার্থে পুরো হোটেলে কোনো জানালা না রাখাই ভালো। আমাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিলো, এখানকার সকালের নাস্তাও ‘হালাল’। নাস্তা করতে গিয়ে একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার খেয়াল করলাম। নাস্তার আইটেম ছিলো কেবল ফলমূল, ডিম, পাউরুটি, দুধ ও চা। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, প্রত্যেকটা খাবারে ‘হালাল’ লেবেল আঁটা। ডিম, দুধ, চা ইত্যাদি কীভাবে হালাল না হয়ে পারে, সেটি ভেবে হয়রান হচ্ছিলাম! হ্যাঁ, এই হোটেলটিও যথারীতি অতিথিদের আগমনে কানায় কানায় পূর্ণ ছিলো!
‘ইসলামিক’ ও ‘হালাল’ প্রজেক্টের যে দুটি ‘সফল’(!) উদাহরণ দিলাম, এগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এই পদ্ধতিতে আজকাল অনেক কিছুকেই ‘ইসলামী’ ও ‘হালাল’ মোড়ক দেয়া হচ্ছে। কোনো সিনেমায় যদি নারী ও বাদ্যযন্ত্র না থাকে, তাহলেই ‘শরীয়াহ কমিটির’ সদস্যদের মতে সেটি ‘ইসলামী’ চলচ্চিত্র। সিনেমার গল্পটি যতই অপ্রাসঙ্গিক হোক না কেন, তাতে কী আসে যায়! হোটেল রুমে জানালা না থাকলেই বা কী আসে যায়। ডিম ও দুধে ‘হালাল’ কথাটি লেখা থাকলেই তো সেটি ‘ইসলামী’ হোটেল!
নিতান্ত অপ্রসাঙ্গিকভাবে আজকাল অনেক কিছুর উপর ‘ইসলামিক’ লেবেল এঁটে দেয়া হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও এটি ঘটছে। অনেক ‘ইসলামী ব্যাংক’ বৈষম্যপূর্ণ, একচেটিয়া ও বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থারই একটি অংশ মাত্র। তারপরও এগুলোকে ‘ইসলামী’ ব্যাংক বলা হয়, কারণ একটি ‘শরীয়াহ কমিটি’ এদের গায়ে ‘ইসলামী’ লেবেল এঁটে দিয়েছে। কিছু ঐতিহাসিক লেনদেনের সাথে ভাসাভাসা সাদৃশ্য পেলেই এসব কমিটি এমনসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর ‘হালাল’ সিল মেরে দেয়, যেগুলো হালাল হওয়ার মানদণ্ডে যথাযথভাবে উত্তীর্ণ নয়। ম্যাক্রো-ইকোনোমিক লেভেলে ইসলামের নৈতিক মূল্যবোধ ও দর্শন তথা ইসলামের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে তারা বিবেচনায় নেয়ার প্রয়োজন মনে করে না। এই ফাঁকে আরেকটা কথা বলে রাখি, এসব শরীয়াহ কমিটিতে নারীদের কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকে না।
অনেক ‘ইসলামী কসাইখানা’ অন্য আর দশটা সাধারণ কসাইখানার চেয়ে ব্যতিক্রম কিছু নয়। তাদের নামের শুরুতে ‘ইসলামী’ শব্দটা রয়েছে নিছক এ জন্যই যে, প্রাণীগুলো জবাই করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলার জন্য তারা একজন মুসলমানকে নিয়োগ দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তো পশু জবাইয়ের সময় শুধু রেকর্ড করা ‘বিসমিল্লাহ’ উচ্চারণ কম্পিউটারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেজে ওঠে। পশু-পাখিদের খাবার-দাবার, পানি পান, কিংবা উপযোগী আবাসস্থলের ব্যাপারে ইসলামের নৈতিক নীতিমালার কোনো কিছুই এখানে মানা হয় না। গত বছর এ ধরনের একটি ‘হালাল কমিটিতে’ অংশগ্রহণ করতে আমি অস্বীকৃতি জানিয়েছি। তাদেরকে বলেছি, নিছক কম্পিউটার জেনারেটেড ‘বিসমিল্লাহ’ উচ্চারণ পশু জবাইকে ‘হালাল’ বা ‘ইসলামী’ করে দিতে পারে না।
একইভাবে, অনেক ‘ইসলামী রাজনৈতিক দল’ রাজনীতিতে অন্যদের মতোই ম্যাকিয়াভেলিয়ান নীতি, বিভেদমূলক ও নীতিবর্জিত উপায় অবলম্বন করে। তারপরও তারা ‘ইসলামী’ লেবেল ব্যবহার করে। অজ্ঞ ভোটারদের কাছে টানার জন্য যে কোনো কিছু করা, কিংবা নির্বাচনে জেতার জন্য রাজনীতিতে আইডেন্টিটি পলিটিক্স করার নিঃশর্ত অনুমোদন ‘শরীয়াহ কমিটি’ তাদেরকে দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ‘ইসলামী দলের’ অগ্রাধিকার তালিকায় যদি জনগণের সামষ্টিক কল্যাণের বিষয়টি না থাকে, যদি তারা নিরাপত্তাহীন, গৃহহীন, ক্ষুধার্ত, গরীব ও অশিক্ষিত মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনে কোনো ভূমিকা পালন না করে, তাহলে তাদের নামের মধ্যে ‘ইসলামী’ শব্দটা থাকার মানে কী?
যে কোনো বিষয়কে ‘ইসলামী’ দৃষ্টিকোণ থেকে ডিল করার আগে ‘ইসলামী’ বলতে আসলে কী বুঝায়, তা বুঝে নেয়াটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের প্রাথমিক উৎস হলো আল্লাহর বাণী তথা কোরআন এবং দ্বিতীয় মৌলিক উৎস হলো রাসূলের (সা) সুন্নাহ, যিনি ছিলেন কোরআনের জীবন্ত রূপায়ণ। কোনো কিছু ‘ইসলামী’ কিনা, তা বুঝার জন্য এ দুটো উৎসই কেবল প্রকৃত মানদণ্ড।
এখন প্রশ্ন হলো, কোরআন ও সুন্নাহকে আমরা কীভাবে পাঠ করবো? এখানেই উসূলের প্রয়োজনীয়তার প্রশ্ন চলে আসে। কোরআন ও সুন্নাহকে অধ্যয়ন করার সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করার ফলে অনেকেই উপরে উল্লেখিত উদাহরণগুলোর মতো কিছু ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে থাকে। যা হোক, মেথডলজি নিয়ে একটি স্বতন্ত্র ও দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন, যা এই বইয়ের সীমিত পরিসরে সম্ভব নয়।[ইজতিহাদের উপর ইসলামী ফিকাহ শাস্ত্রের বিস্তারিত আলোচনা সম্পর্কে জানতে দেখুন, Jasser Auda, Maqasid al-Sharl’ah as Philosophy of Islamic Law: A Systems Approach, International Institute of Islamic Thought, London-Washington, 2008]
তারপরও প্রসঙ্গ বিবেচনায় কোরআন ও সুন্নাহ অধ্যয়নের প্রচলিত তিনটি ভুল পদ্ধতির উপর সংক্ষেপে কিছু বলছি। কোরআন অধ্যয়নের ব্যাপারে স্বয়ং কোরআন যে মানদণ্ড ঠিক করে দিয়েছে এবং রাসূলের (সা) সুন্নাহকে যেভাবে বুঝা দরকার, তার সাথে এই পদ্ধতিগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
১। খণ্ডিত অধ্যয়নের সমস্যা:
কোরআনকে ‘খণ্ডিতভাবে’ অধ্যয়ন করা এবং ‘কিছু অংশে বিশ্বাস রাখা, আর কিছু অংশকে অবিশ্বাস করার’ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন।[যেমন, আল্লাহ বলেছেন: “যারা কোরআনকে খণ্ড খণ্ড করেছে। আপনার পালনকর্তার কসম, আমি অবশ্যই ওদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করবো।” (সূরা হিজর: ৯০-৯১); “তবে কি তোমরা গ্রন্থের কিয়দংশ বিশ্বাস করো এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস করো? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দুর্গতি ছাড়া তাদের আর কোনোই পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে।” (সূরা বাকারা: ৮৫); এ ধরনের আরো আয়াত রয়েছে।] কোরআনের কিছু আয়াত, বা রাসূলের (সা) কিছু হাদীসকে খণ্ডিতভাবে অধ্যয়ন করা, কিংবা এ সম্পর্কে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণের ফলে কী ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়, পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আমরা তা দেখতে পাবো। কোনো বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অনেকে কেবল দুয়েকটি আয়াত বা হাদীসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত পৌঁছে যান, একই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আয়াত বা হাদীসগুলোর দিকে তারা নজর দেন না। কিংবা, সংশ্লিষ্ট আয়াত বা হাদীসটির প্রেক্ষাপট বা তৎকালীন পরিস্থিতিকে বিবেচনায় রাখেন না। নিজেদের সিদ্ধান্তকে ‘ইসলামী’ মনে করলেও তারা যে ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছান, তা শেষ পর্যন্ত ইসলামী মূলনীতির বিরুদ্ধে চলে যায়।
খণ্ডিত অধ্যয়নের আরেকটি উদাহরণ হলো রাসূলের (সা) সুন্নাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কোরআন অধ্যয়ন করা। এ ধরনের লোকদের বিভ্রান্তি হলো – তারা মনে করে, সুন্নাহ হলো ইসলামী জ্ঞানের এমন একটি বিকল্প বা সমান্তরাল উৎস, যেটি কখনো কখনো কোরআনের স্পষ্ট নির্দেশকে অকার্যকর করতে পারে। অথচ, কোরআন নিজেই সুন্নাহকে কোরআনের ব্যাখ্যা হিসেবে বলেছে। আল্লাহ বলেছেন, “আমি তোমার প্রতি কোরআন নাজিল করেছি, যাতে তুমি তা মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করতে পারো, যা তাদের জন্য নাজিল করা হয়েছে। আশা করা যায়, তারা চিন্তাভাবনা করবে।” [সূরা নাহল: ৪৪]
২। ইতিহাসনির্ভর অধ্যয়নের সমস্যা:
একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কালপর্বে ফিকাহর কিতাবগুলোতে কোরআন-সুন্নাহর একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা হয়তো দেয়া হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে সেটাকেই একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা হলো ইতিহাসনির্ভর অধ্যয়নের সমস্যা। সামনের অধ্যায়গুলোতে আমরা দেখবো, সমসাময়িক কেউ কেউ কীভাবে ইসলামের প্রকৃত উৎস তথা কোরআন-সুন্নাহর নতুন কোনো ব্যাখ্যা মানতে অস্বীকার করেন, পুরাতন ব্যাখ্যাকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন ও সেগুলো আঁকড়ে থাকার ব্যাপারে গোঁ ধরে থাকেন। অথচ দলীল-প্রমাণ ও স্বাধীন বিচার-বিবেচনা ব্যতীত কাউকে ‘অন্ধ অনুসরণ’ না করতে কোরআন ও হাদীসে অসংখ্য নির্দেশ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ‘ইজতিহাদ’ নতুন কোনো পরিভাষা নয়। রাসূল (সা) নিজেই এ পরিভাষাটি ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতের জন্য প্রতি একশ বছরে এমন কিছু মানুষ পাঠাবেন, যারা এই দ্বীনের সংস্কার করবে।”[এটি আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে (হাদীস নং-৪২৯১)। ‘মাকাসিদ আল-হাসানাহ’ গ্রন্থে (হাদীস নং-১৪৯) আল-শাখায়ী এবং আল-সিলসিলাহ আস-সহীহাহ গ্রন্থে (হাদীস নং-৫৯৯) শায়খ আলবানী একে সহীহ হিসেবে প্রত্যায়ন করেছেন।]
৩। ইতিহাসবাদী (Historicist) অধ্যয়নের সমস্যা:
স্থবিরতা ও অন্ধ অনুকরণের বিরোধিতা করতে গিয়ে কিছু লোক ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোর বুঝজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক ধরনের ইতিহাসবাদী অবস্থান গ্রহণ করে। ইতিহাসবাদী অবস্থান হলো মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী কিংবা হাদীসের কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থকে অথরিটি হিসেবে গ্রহণ না করা। অপরাপর মানবীয় সাহিত্য ও কথাবার্তার মতো কোরআ-হাদীস নিছক বিদ্যমান সাংস্কৃতিক পরিবেশের ফসল নয়। এ বিষয়টি তারা বুঝতে পারে না। আমরা জানি, কোরআন ও সুন্নাহ হলো সর্বকাল ও স্থানের উপযোগী ঐশী জ্ঞান।
এই গ্রন্থে আমরা কোরআন ও সুন্নাহর একটি উদ্দেশ্যভিত্তিক ও সমন্বিত অধ্যয়ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছি। সংশ্লিষ্ট সকল মতামত, প্রেক্ষাপট ও সূত্রগুলোকে সামগ্রিকভাবে পাঠ করেছি। খণ্ডিত অধ্যয়ন থেকে দূরে থেকেছি। আমরা জানি, ‘কেন’ প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা হলো যুক্তিবুদ্ধির সর্বোচ্চ স্তর। এর মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট মতবিরোধসমূহের মধ্যকার সমাধান এবং বিচ্ছিন্ন দলীলগুলোর সমন্বয় সাধন সম্ভব। আমরা অতীতের ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকিনি। বরং সেসব মতামতকে পুনর্পাঠ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটের আলোকে ব্যাখ্যা করেছি। তারপর সেগুলোকে সমসাময়িক মতামতের সাথে মিলিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করেছি। সবশেষে, আমরা দুটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য দেখিয়েছি। (ক) ইসলামের কিছু বিষয় আছে, যা কখনোই পরিবর্তন হওয়ার নয়। (খ) আবার কিছু বিষয় আছে, যা সময় ও পরিস্থিতির আলোকে পরিবর্তিত হতে পারে এবং হওয়া উচিতও বটে।
—মূল: ড. জাসের আওদা, অনুবাদ: জোবায়ের আল মাহমুদ]

মসজিদে_নববীর গঠনকাঠামো যেমন ছিলো

#মসজিদে_নববীর গঠনকাঠামো যেমন ছিলো মদীনায় রাসূল (সা) কর্তৃক নির্মিত মসজিদটির নকশা বর্তমানে বিশ্বের কোথাও নেই। এমনকি স্বয়ং মদীনাতেও নেই। বর্তমানে আরব বিশ্বে সাধারণত পুরুষদের নামাজের কক্ষ নারীদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকে, বিশেষত পার্ক ও পাবলিক স্পেসগুলোতে। এমনকি একই ভেন্যুতে নারী-পুরুষের পৃথক দুটি নামাজের কক্ষ পাশাপাশি থাকে না, হেঁটে যাওয়ার মতো বেশ দূরত্ব বজায় রাখা হয়। আর বড় মসজিদগুলোতে পৃথক স্থান, পার্শ্ববর্তী ছোট কক্ষ কিংবা মূল বিল্ডিংয়ের সাথে লাগোয়া বারান্দায় নারীরা নামাজ আদায় করে। নারী ও পুরুষের নামাজের স্থানের ব্যবধান কড়াকড়িভাবে মেনে চলা হয়। মসজিদের মূল কক্ষে নারীদের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত, যদিও বা থেকে থাকে।
পাশ্চাত্যের যেসব #মসজিদে_নারীদের_নামাজ পড়ার সুযোগ রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে খুব কম মসজিদেই একই কক্ষে সরাসরি পুরুষদের পেছনে নারীদেরকে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়; যেমনটা রাসূলের (সা) সময়ে এবং তাঁর ওফাতের পর শতাব্দীকাল ধরে প্রচলিত ছিলো। পাশ্চাত্যের মসজিদগুলোতে নারীদের নামাজ আদায়ের জন্য সাধারণত একটি বিশেষ কক্ষ থাকে। বেজমেন্ট, ছোট একটি কক্ষ, বারান্দা বা মসজিদের বাইরে, কিংবা মসজিদের সাথে লাগোয়া আরেকটি বিল্ডিংয়ে সাধারণত এ ধরনের ব্যবস্থা থাকে। নারীদের নামাজের স্থানে ইমামের কণ্ঠ শোনার জন্য সাধারণত লাউডস্পিকার ব্যবহার করা হয়। নারীদের নামাজের স্থানে ইমামকে দেখানোর জন্য সম্প্রতি ক্যামেরা ও স্ক্রিনের ব্যবহার বাড়ছে। এসব মসজিদে নারীদের অংশে প্রবেশের দরজা মসজিদের মূল প্রবেশপথ তথা ‘পুরুষদের’ দরজা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকে।
ভারতীয় উপমহাদেশে সাধারণ মসজিদগুলোতে নারীদের কোনো প্রবেশাধিকার তো নেই-ই, এমনকি তাদের জন্য পৃথক কোনো মসজিদের ব্যবস্থাও নেই। ফলে নারীদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে ঘরে নামাজ আদায় করতে হয়। তবে চীনের মুসলমানদের মধ্যে শুধুমাত্র নারীদের জন্য মসজিদের প্রচলন রয়েছে। সেসব মসজিদে নারী ইমামগণ নামাজ পড়ান।
আফ্রিকায় উপরে বর্ণিত সবকটি মডেলের মসজিদই রয়েছে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীদেরকে পৃথক স্থানে নামাজ আদায় করতে হয়।
‘পুরুষদের নামাজের স্থান’ থেকে ‘নারীদের নামাজের স্থানকে’ বিচ্ছিন্ন করে ফেলার কারণে সাতটি সমস্যা তৈরি হয়:
১) মসজিদের মূল কক্ষ, যেটি সবসময় পুরুষদের জন্য বরাদ্দ থাকে, সেটির তুলনায় নারীদের অংশটি সবসময় অনেক ছোট থাকে। নারীদের অংশে স্থান সংকুলান না হওয়াটা সাধারণ ঘটনা, বিশেষত জুমার নামাজ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময়। পক্ষান্তরে, পুরুষদের নামাজের স্থান অর্থাৎ মূল কক্ষটি ফাঁকা থেকে যায়। অথচ, বিভিন্ন ইসলামী কার্যক্রমে বর্তমানে নারীরা পুরুষদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি লক্ষ করা যায়।
২) কার্পেট, লাইট, সাউন্ড ডিভাইস এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা করলে দেখা যায়, নারীদের নামাজের কক্ষটি পুরুষদের কক্ষের তুলনায় সাধারণত ততটা সজ্জিত থাকে না। ফলে, ব্যতিক্রম বাদে প্রায় সব মসজিদে পুরুষদের তুলনায় কম সমাদৃত হওয়া এবং কম মর্যাদা লাভের অনুভূতি নারীদের মধ্যে তৈরি হয়।
৩) শিশুরা সাধারণত মা-বোনদের সাথে নারীদের নামাজ পড়ার স্থানেই থাকে। এ কারণে পুরুষদের তুলনায় নারীদের অংশে বেশি শোরগোল থাকে। ফলে নামাজ পড়তে আসা নারীদের মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটে।
৪) মূল দরজা তথা ‘পুরুষদের প্রবেশপথ’ দিয়ে নারীদেরকে কখনোই মসজিদে ঢোকার অনুমতি দেয়া হয় না। মসজিদের এক পাশ বা পেছন দিকে তাদের জন্য নির্ধারিত বিকল্প প্রবেশপথটি সাধারণত সংকীর্ণ হয়ে থাকে।
৫) নারীরা মসজিদের ইমামকে সামনাসামনি দেখতে না পাওয়ায় ইমামের সাথে নারীদের সরাসরি সংযোগ থাকে না। এ কারণে নামাজে ইমামকে ঠিকমতো অনুসরণ করা সম্ভব হয় না। সেজদার আয়াত তেলাওয়াত করে ইমাম সাহেব যদি সরাসরি সেজদায় চলে যান, তাহলে নারীরা বুঝে উঠতে পারেন না। তারা যেহেতু কখনোই ইমামকে দেখেন না, তাই অধিকাংশ নারী মুসল্লী জানেনও না যে কে তাদের ইমাম!
৬) নারীদের অংশে কখনো সাউন্ড সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে জুমার খুতবা শোনা কিংবা নামাজে ইমামকে অনুসরণ করা আর সম্ভব হয় না। ফলে তারা নামাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
৭) এই পয়েন্টটি সর্বশেষ হলেও বিষয়টি ছোট নয়। সেটি হলো– উপরের সমস্যাগুলো সবাইকে, বিশেষত অমুসলিম ও নতুন প্রজন্মের মুসলিম তরুণদেরকে পরিষ্কারভাবে এই ধারণাটি দেয়– “ইসলাম” নারীদেরকে বিচ্ছিন্ন এবং একঘরে করে রাখে। এ কারণে মসজিদে কিছুটা আসা-যাওয়া থাকলেও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ কম থাকে।
শুরুতে আমরা ‘কোনো কিছু ‘ইসলামিক’ হওয়া বলতে কী বুঝায় এবং কীভাবে এ সম্পর্কে জানতে পারবো?’ এই প্রশ্নটি তুলেছিলাম। এর সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে– যেহেতু রাসূল (সা.) ছিলেন কোরআনের সর্বোত্তম ব্যাখ্যাকারী এবং মুসলিম সমাজের নেতা, তাই তাঁর সুন্নাহ ও কার্যক্রম দেখেই কোনো কিছু ‘ইসলামিক’ কিনা, তা জানতে হবে।
রাসূলের (সা) জীবদ্দশায় মদীনায় যে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিলো, সেই মসজিদের নকশা নিচে তুলে ধরা হলো। প্রথম হিজরীর (৬২২ খ্রি.) রবিউল আওয়াল মাসে মহানবী (সা) মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। এটির দৈর্ঘ্য ছিলো প্রায় ৩৫ মিটিার, প্রস্থ ছিলো ৩০ মিটার, আর উচ্চতা ছিলো আনুমানিক আড়াই মিটার। কাঁদামাটির ইট দিয়ে দেয়াল তৈরি করা হয়েছিলো। মসজিদটির ছাদ দাঁড়িয়েছিলো গাছের কয়েকটি গুঁড়ির উপর। এর উপর বিছিয়ে দেয়া হয়েছিলো খেজুর গাছের ডাল-পাতা।
মসজিদে নববীতে তখন ছিলো তিনটি দরজা। একটি ছিলো পূর্বদিকে রাসূলের (সা) হুজরা তথা স্ত্রীদের কক্ষসমূহের বারান্দার সাথে সংযুক্ত। আর অন্য দুটি ছিলো মসজিদের বাইরের খোলা জায়গার দিকে। নারী-পুরুষ উভয় শ্রেণীর উপস্থিতি সত্ত্বেও মসজিদের মাঝখানে কোনো ধরনের দেয়াল, পর্দা বা পার্টিশন ছিলো না। উম্মুল মুমিনীনদের প্রাইভেসি রক্ষার জন্য রাসূলের (সা) হুজরাগুলো পর্দা দিয়ে পৃথক করা ছিলো, কিন্তু মসজিদে নববীর ভেতর পর্দা টেনে নারী-পুরুষের নামাজের স্থান পৃথক করা হয়নি।—ওয়াফা আল-ওয়াফা: বি আখবার দারুল মোস্তফা, ১/৭৫-২৪৯।
নামাজে কাতারবদ্ধ হওয়ার জন্যে সাহাবীরা নিচে অঙ্কিত চিত্রের মতো করে দাঁড়াতেন। রাসূলের (সা) ঠিক পেছনে থাকতো পুরুষদের প্রথম কাতার। অন্যদিকে, নারীদের কাতার শুরু হতো মসজিদের পেছনের দেয়াল থেকে। এভাবে একের পর এক কাতার যোগ হয়ে পুরুষদের দিকে যেতো। যেমনটা চিত্রে দেখানো হয়েছে। এটাই ছিলো রাসূলের (সা) জীবনকালে প্রতিষ্ঠিত সুন্নত।মসজিদে আগত শিশুরা পুরুষ ও নারীদের কাতারের মাঝখানে কাতারবদ্ধ হয়ে নামাজ পড়তো। কোনো পৃথক কক্ষ, দেয়াল বা পর্দার মাধ্যমে পুরুষ ও নারীদের কাতার পৃথক করা হতো না। যদিও তেমনটা করা তখন সম্ভব ছিলো। বরং বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায়, নারীদের সামনের কাতারের ঠিক সামনেই থাকতো পুরুষদের সর্বশেষ কাতার। এমন বর্ণনা সংবলিত দুটি হাদীস তুলে ধরা হলো:
আসমা (রা) থেকে উরওয়াহ ইবনে জুবাইর বর্ণনা করেছেন। আসমা (রা) বলেন:
“রাসূল (সা) আমাদের সামনে উঠে দাঁড়ালেন এবং আমাদের উদ্দেশ্যে কথা বলা শুরু করলেন। কবরে মৃত ব্যক্তির অবস্থা কেমন হবে, সে বিষয়ে তিনি বলছিলেন। এমন সময় লোকদের হট্টগোলের কারণে আমি রাসূলের (সা) শেষের কথাগুলো শুনতে পারিনি। এরপর লোকেরা শান্ত হলে আমার সামনে বসা পুরুষটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন! রাসূল (সা) বক্তব্যের উপসংহারে কী বলেছিলেন?’ পুরুষ ব্যক্তিটি আমাকে বললেন, ‘আমাকে ওহীর মাধ্যমে জানানো হয়েছে– তোমরা কবরে এমন পরীক্ষার সম্মুখীন হবে, যা অনেকটা দাজ্জালের ফিতনার মতোই।হট্টগোল’ শব্দটি পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে সহীহ বুখারীর জানাজা অধ্যায়ে, ৩/৪৭৯, এবং বাকি অংশ বর্ণিত হয়েছে সুনানে নাসায়ীতে, ৭/২০০, নাসায়ীতেও বুখারীর সনদ অনুযায়ী বর্ণিত হয়েছে।
ফাতিমা বিনতে কায়েস (রা) বর্ণনা করেন:
“জামায়াতে নামাজ আদায়ের জন্য মানুষদেরকে আহবান করা হলো। অন্যদের সাথে আমিও নামাজ আদায় করতে গেলাম। আমি ছিলাম নারীদের সামনের কাতারে, যা ছিলো পুরুষদের সর্বশেষ কাতারের ঠিক পেছনে। নামাজ শেষে আমি শুনলাম নবীজি (সা) মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, তামীম আদ-দারীর চাচাতো ভাইয়েরা একবার নৌকায় করে সমুদ্রে সফর করছিলো…।সহীহ মুসলিম, ফিতনা অধ্যায়, ৮/২০৫।নারীরা তখন সামনাসামনি বসে ইমামের খুতবা শুনতে পারতেন। ফলে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হতো এবং ইমামের সাথে সহজে যোগাযোগ করা যেতো। এ কারণে আমরা দেখি, রাসূলের (সা) মজলিশে অংশগ্রহণকারী অনেক নারী হাদীস বর্ণনা করেছেন, কেউ কেউ সরাসরি রাসূলের (সা) নিকট থেকে শুনে কোরআনের কোনো আয়াত বর্ণনা করেছেন।
উম্মে হাশিম বিনতে হারিস ইবনে নোমান (রা) বর্ণনা করেছেন:
“আমি কেবল রাসূলের (স) মুখ থেকে শুনে শুনেই সূরা কাহাফ মুখস্থ করে ফেলেছি। প্রত্যেক জুমার খুতবায় রাসূল (সা) সম্পূর্ণ সূরাটি তেলাওয়াত করতেন।সহীহ মুসলিম, জুমার নামাজ অধ্যায়, ৩/১৩।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন:“আমি ‘ওয়াল মুরসালাতি উরফা’ (সূরা মুরসালাত, ৭৭ নং সূরা) তেলাওয়াত করার সময় উম্মে ফজল তা শুনলেন এবং বললেন, “হে বৎস! আল্লাহর কসম, তোমার তেলাওয়াত শুনে মনে পড়ে গেলো, এটিই ছিলো সেই সূরা, যেটি আমি আল্লাহর রাসূলের (সা) নিকট থেকে সর্বশেষ শুনেছি। কোনো এক মাগরিবের নামাজে তিনি এটি তেলাওয়াত করছিলেন।সহীহ বুখারী, আযান অধ্যায়, ২/৩৮৮; সহীহ মুসলিম, নামাজ অধ্যায়, ২/৪০।রাসূলের (সা) স্ত্রী উম্মে সালামা বলেছেন:
“আখেরাতে হাউজে কাউসার সম্পর্কে লোকজনকে বলাবলি করতে আমি শুনেছি। কিন্তু রাসুলুল্লাহর (সা) নিকট থেকে এ ব্যাপারে কিছু শুনিনি। একদিন একটি মেয়ে আমার চুল আঁচড়িয়ে দিচ্ছিল, এমন সময় রাসূলুল্লাহর (সা) আহ্বান শুনলাম– ‘হে লোক সকল!’ এই আহ্বান শুনে মেয়েটিকে বললাম, ‘আমাকে যেতে দাও, রাসূল (সা) কী বলেন শুনে আসি।’ সে আমাকে বললো, ‘রাসূল (সা) তো পুরুষদের ডেকেছেন, নারীদের ডাকেননি।’ আমি বললাম, ‘তিনি মানুষদেরকে ডেকেছেন, আর আমিও তো তাদের একজন।’ তারপর আমি গেলাম এবং রাসূলকে (সা) বলতে শুনলাম: ‘আমি হাউজের নিকট তোমাদের জন্য আগাম অভ্যর্থনাকারী হিসেবে উপস্থিত থাকবো। তাই সাবধান! আমার কাছে তোমাদের এমন কেউ যেন না আসে, যাকে আমার নিকট থেকে এমনভাবে দূরে সরিয়ে দেয়া হবে, যেভাবে হারানো উটকে (উক্ত উটের মালিক নয়, এমন ব্যক্তির মালিকানাধীন উটের পাল হতে) তাড়িয়ে দেয়া হয়। তখন আমি জানতে চাইবো, কেন তাদের তাড়ানো হচ্ছে? আমাকে বলা হবে, আপনি তো জানেন না, আপনার পরে তারা কী কী নতুন বিষয়ের (বিদয়াত) উদ্ভাবন করেছে। তখন আমিও বলবো– দূর হয়ে যাও!সহীহ মুসলিম, ফাযায়েল অধ্যায়, ৪/১৭৯৫।

আবু উসমান (রা) থেকে বর্ণিত:“আমি জানতে পেরেছি, একবার নবীজীর (সা) কাছে জিবরাইল (আ) এসেছিলেন। উম্মে সালামা (রা) তখন তাঁর সাথেই ছিলেন। জিবরাইল (আ) রাসূলের (সা) সাথে কথা বলতে শুরু করলেন। রাসূল (সা) উম্মে সালামাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি এই লোকটাকে চেনো?’ উম্মে সালামা (রা) জবাব দিলেন, ‘ইনি দাহইয়া কালবী (রা)।’ জিবরাইল চলে যাওয়ার পর উম্মে সালামা (রা) বললেন, ‘আল্লাহর কসম! নবীজী (সা) খুতবায় আমাদেরকে জিবরাইলের আগমনের খবরটা জানানোর আগ পর্যন্ত আমি তাঁকে দাহইয়া বলেই মনে করছিলাম।সহীহ বুখারী, ফাযায়িলুল কোরআন অধ্যায়, ৭/২৪৪; সহীহ মুসলিম, সাহাবীদের মর্যাদা অধ্যায়, ৭/১৪৪।

আসমা বিনতে আবু বকর (রা) থেকে আরেকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন:
“রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় একবার সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। … তখন আমি এসে মসজিদে ঢুকলাম। দেখতে পেলাম, রাসূলুল্লাহ (সা) নামাজে দাঁড়িয়ে আছেন। আমিও তাঁর সাথে অংশগ্রহণ করলাম। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে কিয়াম করলেন।সহীহ মুসলিম, সূর্যগ্রহণ অধ্যায়, ৩/৩২।
তাই বলা যায়, মসজিদের সর্বোত্তম নকশা হলো রাসূলের (সা) নকশা, যা উপরে প্রদত্ত চিত্র এবং উপর্যুক্ত হাদীসগুলোতে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল (সা) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মসজিদের কাঠামো অনুসারে বর্তমানে প্রচলিত মসজিদগুলোর কাঠামোকে পুনর্বিন্যাস করা হলে প্রচলিত মসজিদগুলোতে সৃষ্ট সমস্যাগুলো অনেকখানি দূরীভূত হবে। পাশাপাশি, বৃহত্তর সামাজিক অঙ্গনে এর গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নারী, পুরুষ ও শিশুদের নামাজের স্থান নির্ণয়ের সুবিধার্থে মসজিদের মেঝেতে দাগ টানা, কিংবা স্বল্প-উঁচু দেয়াল দেয়া যেতে পারে। সংশয়, বিতর্ক ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে এটি একটি সমাধান হতে পারে। কিন্তু নারীদেরকে আলাদা কক্ষে বিচ্ছিন্ন করে রাখা, পর্দার আড়ালে রাখা, কিংবা ইমামকে দেখা ও তার কথা সরাসরি শুনতে বাধা দেয়াটা রাসূলের (সা) সুন্নতের বিরোধী। যথেষ্ট দলীল-প্রমাণ দ্বারা এটি প্রমাণিত যে নারীরা মসজিদে রাসূলকে (সা) দেখতেন এবং সরাসরি তাঁর কথা শুনতে পেতেন। এটি তাদের নিজেদের শিক্ষা অর্জন এবং অন্যদেরকে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিলো।মূল: জাসের আওদা, অনুবাদ: জোবায়ের আল মাহমুদ

কলম আল্লাহর এক বিরাট নিয়ামত!!!

#কলম আল্লাহর এক বিরাট নিয়ামত!!!কথায় বলে ‘তরবারির চেয়ে কলমের শক্তি বেশি’। কথাটি যে বর্ণে বর্ণে সত্যি তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। ইতিহাস ঘেঁটে কলমের বলে স্মরণীয় ব্যক্তিত্বের নজির পাওয়া যায় ভুরিভুরি। কিন্তু শুধু তরবারির ব্যবহারে ইতিহাস খ্যাত হয়েছে এমন ব্যক্তির নজির সম্ভবত একটিও পাওয়া যাবে না। অবশ্য আগেকার দিনে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে দক্ষতার সাথে তরবারি চালিয়ে অনেকে অসামান্য সফলতা অর্জন করেছেন। তবে তাতে যে তারা ইতিহাস খ্যাত হয়েছেন এমন দৃষ্টান্ত সম্ভবত নেই। অপর দিকে এ যাবৎ পৃথিবীতে যত জ্ঞানী, বিজ্ঞানী, পণ্ডিত, সাহিত্যিক, কবি, লেখক নিজের জ্ঞান গরিমায় স্মরণীয় ও বরণীয় হয়েছেন তাদের প্রত্যেককেই কলমের আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছে। তা ছাড়া বাস্তব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা কলমের সীমাহীন গুরুত্বের প্রমাণ পাই। কলমই মানুষকে দান করে অন্যান্য জীব থেকে স্বাতন্ত্র্য। কেন না যেকোনো ধর্মের শাস্ত্রবিধি এমনকি গবেষণালব্ধ কল্যাণকর বিধিনিষেধ, নিয়ম-কানুন সবই কলমের মাধ্যমেই লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। আর সেই সব বিধিবিধান পালন করেই মানুষ সম্মানের, সফলতার অধিকারী হয়। পবিত্র কুরআন মজিদে অবতীর্ণের সূচনাপর্বের পাঁচটি বাণীর একটি বাণীই ছিল কলমকে কেন্দ্র করে। তাতে বলা হয়েছে”যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন” (সূরা আলাক : ৪)
বিদ্বানগণ গবেষণা চালিয়ে কলমের তিনটি প্রকার নির্ধারণ করেছেন। ১// আল্লাহ তায়ালার স্বহস্তে সৃজিত সর্বপ্রথম কলম, যাকে তিনি তাকদির বা ভাগ্য লেখার আদেশ করেছিলেন। যেমন হাদিসে বর্ণিত হয়েছেÑ ‘আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন এবং তাকে লেখার নির্দেশ দেন। সে মতে কলম কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু হবে, সব লিখে ফেলে। এ কিতাব আল্লাহর নিকট আরশে রক্ষিত আছে’ (কুরতুবি)। ২// ফেরেশতাদের কলম দ্বারা তারা ভবিতব্য ঘটনা, তার পরিণাম এবং মানুষের আমলনামা লিপিবদ্ধ করেন। এ সম্পর্কেই আল্লাহ বলেনÑ ‘কিয়ামতের দিন আমি তাকে একটি কর্মলিপি বের করে দেবো এবং সে তা খোলা অবস্থায় পাবে এবং বলা হবে, তোমার আমলনামা পড়ে দেখো, আজ তুমিই তোমার নিজের হিসাবের জন্য যথেষ্ট’ (সূরা বনি ইসরাইল : ১৩-১৪)।
৩//সাধারণ মানুষের কলম দিয়ে তারা তাদের কথাবার্তা লিখে এবং নিজেদের অভীষ্ট কাজে ব্যবহার করে। লিখন প্রকৃতপক্ষে এক প্রকার বর্ণনা এবং বর্ণনা মানুষের বিশেষ গুণ (কুরতুবি)।
হজরত কাদাতাহ রা: বলেন, ‘কলম আল্লাহ তায়ালার একটি বড় নিয়ামত। কলম না থাকলে কোনো ধর্ম প্রতিষ্ঠিত থাকত না এবং দুনিয়ার কাজ-কারবারও সঠিকভাবে পরিচালিত হতো না।’
হজরত আলী রা: বলেন, ‘এটা আল্লাহ তায়ালার একটি বড় কৃপা যে, তিনি তাঁর বান্দাকে অজ্ঞাত বিষয়সমূহের জ্ঞানদান করেছেন এবং তাদের মূর্খতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোর দিকে বের করে এনেছেন। তিনি মানুষকে লিখন বিদ্যায় উৎসাহিত করেছেন। কেননা এর উপকারিতা অপরিসীম। আল্লাহ ছাড়া কেউ তা গণনা করে শেষ করতে পারে না। যাবতীয় জ্ঞান বিজ্ঞান, পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের ইতিহাস, জীবনালেখ্য ও উক্তি, আল্লাহ তায়ালার অবতীর্ণ কিতাবসমূহ সমস্তই কলমের সাহায্যে লিখিত হয়েছে এবং পৃথিবীর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অক্ষয় হয়ে থাকবে। কলম না থাকলে ইহকাল ও পরকালের সব কাজকর্মই বিঘ্নিত হবে’ (তাফসিরে মা’আরিফুল কুরআন; অষ্টম খণ্ড; পৃষ্ঠা : ২৪-২৫)।
বাস্তবতা সাক্ষীদের কলম ব্যবহারে অক্ষম মানুষের তুলনায় কলম ব্যবহারকারী মানুষের মানমর্যাদা বেশি। বলা বাহুল্য, সৃষ্টির মানমর্যাদা বৃদ্ধির জন্য যে মাধ্যমটি অতুলনীয় প্রশংসার বা গুরুত্ব লাভের দাবিদার তাকে স্বয়ং আল্লাহই এ যোগ্যতা দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এর শপথ করে বলেছেন ‘”শপথ কলমের এবং সেই বিষয়ের, যা তারা (ফেরেশতারা) লিপিবদ্ধ করে’ (সূরা কলম; আয়াত-১)। আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা যেমন মানুষের আলমনামা লিখে রাখেন, তেমনি তিনি মানুষকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি লিখে রাখার তাগিদ দিয়ে বলেছেন ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যখন একে অন্যের সাথে নির্ধারিত সময়ের জন্য ঋণের কারবার করো তখন তা লিখে রেখো। তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক যেন ইনসাফের সাথে লিখে দেয়’ (সূরা বাকারা; আয়াত-২৮২)।এ বাণী ঈমানদারদের ওপর গুরুত্বপূর্ণ কাজের লিখিত দলিল প্রমাণ সংরক্ষণকে অত্যাবশ্যক করে দেয়। সেই সাথে শর্ত রাখা হয়, লেখক যেন কারো পক্ষপাতিত্ব না করে ন্যায়সঙ্গতভাবে তার দায়িত্ব পালন করে। স্রষ্টার এ নির্দেশ যদি প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় (যেমন বিচারকার্য, দেশ পরিচালনা, সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা তথা কলমকে পুঁজি করে বা কলমকে সম্বল করে যারা নিজের উপার্জন ও পরের কল্যাণে নিয়োজিত, তারা যদি কারো পক্ষপাতিত্ব বা স্বার্থ হাসিলের জন্য তা ব্যবহার না করে বরং প্রকৃত সত্য লিপিবদ্ধ করার কাজে ব্যবহার করে) তাহলে বিশৃঙ্খলা বলতে সম্ভবত কিছুই থাকত না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বেশির ভাগ কলম ব্যবহারকারীর দুর্নীতির কারণে বিশ্বে আজ ঘটে চলেছে নানা অঘটন। এক দিকে কেউ কলমের ন্যায়সঙ্গত একটি আঁচড় আটকে রেখে হাতিয়ে নিচ্ছে অবৈধ অর্থসম্পদ আর অপরকে ফেলছে বিপন্ন অবস্থায়। অপর দিকে এই কলমকে ব্যবহার করেই কোনো কোনো অকালকুষ্মাণ্ডকে বা অপদার্থকে রাতারাতি পৌঁছে দেয়া হচ্ছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে, আবার প্রকৃত প্রশংসার দাবিদারকে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে দুর্নামের অতল গহ্ববরে।‘#কলম’ নামক জড়বস্তুকে ব্যবহারের সময় সবারই মনে রাখা উচিত আল্লাহর অন্যতম এক মহৎ উদ্দেশ্যে এ বস্তুটির অস্তিত্ব বিদ্যমান রেখেছেন। যে ব্যক্তি কলমের অতুলনীয় ক্ষমতা যথাযথ প্রয়োগে সফল, সেই সমাজে যথার্থ সম্মানিত ব্যক্তি বলে পরিচিতি পায়। কেননা কলমকে স্বয়ং আল্লাহই স্বীয় কাজে এবং বাণীতে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। সমাজে যারা এ বস্তুটিকে অবলম্বন করে টিকে আছেন তা উপার্জন বা পরিচিতি লাভ যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক না কেন, তাদের এটি ব্যবহারে সৎ ও সচেতন থাকা একান্ত আবশ্যক। অন্যথায় কলম সৃষ্টির মহৎ উদ্দেশ্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে এবং লেখককে ইহকাল ও পরকালে লাঞ্ছিত-অপমানিত হতে হবে। কারণ একজনের লেখা বর্ণনা বা তথ্যের সাথে অপর অনেকের শিক্ষা বা উপকার লাভ জড়িত থাকে। সুতরাং সবার মঙ্গলের কথা চিন্তা করে লেখকের নিজের খ্যাতি অর্জনের মোহের মুখে লাগাম টানাই সমীচীন। তা না হলে অবশ্যম্ভাবী কুখ্যাতি এড়ানো দুষ্কর। অতএব, স্রষ্টা প্রদত্ত শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে ‘কলম’ ব্যবহারে ব্যবহারকারীর যথেষ্ট সতর্ক থাকা পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং ঈমানের দাবিও বটে!
এ পর্যায়ে আমরা কলমের অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করবো । এখন কলমের আধুনিক সংজ্ঞা ও প্রকারভেদগুলো নিয়ে আলোচনা করবো ।
#কলমের_সংজ্ঞাঃ কলম বা লেখনী বা #Pen প্রধানত লেখালেখির কাজে ব্যবহৃত একটি উপকরণ। কলম দিয়ে কাগজ বা কোন পৃষ্ঠতলের উপরে কালি লেপনের কাজ করা হয়। বেশ কয়েক রকমের কলমের মধ্যে #বলপয়েন্ট_কলম, #ঝর্ণা_কলম (ফাউন্টেন পেন), #ফেল্ট_টিপ_কলম, #জেল_কলম, #পালকের_কলম (কুইল), #খাগের_কলম ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
#আধুনিক_কলমঃ কলমের আধুনিক প্রকারভেদগুলো প্রধানত কলমের নিবের উপরে ভিত্তি করে করা হয়েছে।#বলপয়েন্ট_কলম – এই কলমের ডগায় বা নিবে ০.৭-১.২ মি.মি. আকারের পিতল, স্টীল বা টাংস্টেন কার্বাইডের তৈরি একটি ছোট্ট শক্ত বল বা গোলক থাকে যা কলমের ভেতরে থাকা কালিকে কাগজ বা যার উপরে লেখা হচ্ছে তাতে মাখাতে সাহায্য করে[১]। বলপয়েন্ট কলমে যে কালি ব্যবহার করা হয় তা একটু ঘন প্রকৃতির এবং তা কাগজের সংস্পর্শে আসতে না আসতেই শুকিয়ে যায়। এই নির্ভরযোগ্য কলমগুলির দামও খুব কম। ফলে সহজেই নিত্যদিনের লেখালেখির কাজে বলপয়েন্ট কলম সবচেয়ে জনপ্রিয় উপকরণ হয়ে উঠেছে।#রোলারবল বা #জেল_কলম – এই কলমের ডগায়ও বলপয়েন্ট কলমের মত বল থাকে। কিন্তু এই কলমের কালি বলপয়েন্ট কলমের কালির চেয়ে পাতলা বা কম ঘন। এই কম ঘন কালি সহজেই কাগজ শুষে নিতে পারে, এবং কলমও অনেক মসৃণভাবে চলতে পারে। বলপয়েন্ট কলমের সুবিধা এবং ঝর্ণা কলমের কালির ভাবটাকে একত্রিত করার উদ্দেশ্যে জেল কলমের সূত্রপাত হয়েছিল। জেল কালি বিভিন্ন রঙের হয়, এমনকি ধাতব পেইন্ট ও ঝিকিমিকি রঙেরও জেল কালি পাওয়া যায়।#ঝর্ণা_কলম – এই কলমে পানি ভিত্তিক তরল কালি দিয়ে নিবের সাহায্যে লেখা হয়। কলমের ভেতরে কালিদানিতে থাকা কালি কৈশিক পরিচলন প্রক্রিয়ায় এবং অভিকর্ষের সাহায্যে নিবের মাধ্যমে বাইরে আসে। এই নিবে কোন নড়নক্ষম অংশ থাকে না, একটা চিকন ফাটল দিয়ে কালি বেরিয়ে আসে। ভেতরের কালিদানিতে কালি শেষ হয়ে গেলে দোয়াত থেকে আবার কালি ভরা যায়। #ফেল্ট_টিপ_কলম বা #মার্কার_কলম – এই কলমে আঁশ জাতীয় পদার্থের তৈরি স্পঞ্জের মত ডগা থাকে। সবচেয়ে ছোট এবং চিকন ডগার মার্কার কলম দিয়ে কাগজের উপরে লেখা হয়। মাঝারি আকারের ডগা সমৃদ্ধ মার্কারগুলো বাচ্চাদের আঁকাআঁকির জন্য ব্যবহৃত হয়। বড় আকারের ডগার মার্কারগুলো অন্য মাধ্যমে (যেমন কার্ডবোর্ডের বাক্স বা হোয়াইটবোর্ডে) লেখার কাজে ব্যবহার হয়। উজ্জ্বল এবং স্বচ্ছ কালিসহ চওড়া ডগার মার্কার লেখা দাগানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। এদেরকে “হাইলাইটার”ও বলা হয়। বাচ্চাদের জন্য বা হোয়াইটবোর্ডে লেখার জন্য যে মার্কারগুলো তৈরি করা হয়, সেগুলোর কালি সাধারণত অস্থায়ী ধরনের হয়। কিছু মার্কার যেগুলো প্যাকেজিং এবং চালানের বাক্সের গায়ে লেখার কাজে ব্যবহার করা হয় তাদের কালি হয় স্থায়ী।#প্রাচীন_কলমঃ#নিব_কলম – সাধারণত কাঠের হাতলের সাথে একটি ধাতব নিব লাগিয়ে এই কলম তৈরি করা হয়। নিবটি ঝর্ণা কলমের নিবের মতই, তবে এই কলমে কোন কালি জমা রাখার উপযোগী কালিদানি নেই এবং লেখার সময়ে বারবার এটিকে কালিতে চুবিয়ে নিতে হয়। ঝর্ণা কলমের তুলনায় এই কলমে সুবিধা হল এই কলমে ঘন কালি (যেমন পিগমেন্ট) এবং ধাতব কালি ব্যবহার করা যায় যা ঝর্ণা কলমে জমে গিয়ে আটকে যায় অথবা মরিচা ধরে যায়। নিব কলম এখন প্রধানত অলংকরণ, ক্যালিগ্রাফি এবং কমিকস আঁকার কাজে ব্যবহার হয়।
#কালির_কলম – পূর্ব এশিয়ার লিপিবিদরা ঐতিহ্যগতভাবে এ ধরনের কলম ব্যবহার করতেন। এদেরকে ব্রাশ বা বুরুশও বলা হয়। কলমের মূল দেহটি সাধারণত বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হত। এছাড়াও বিশেষ ক্ষেত্রে কিছু দুর্লভ উপকরণ যেমন – লাল চন্দন গাছ, কাচ, হাতির দাঁত, সোনা, রূপা প্রভৃতিও ব্যবহার করা হত। কলমের শীর্ষভাগটি বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর (যেমনঃ বেজি, শুকর, বাঘ, মোরগ) পাখা ও লোম হতে তৈরি করা হত।এককালে চীন এবং জাপান উভয় স্থানেই নতুন জন্ম নেওয়া শিশুর চুল দিয়ে এ ধরনের কলম তৈরি করার রেওয়াজ ছিল, যাদেরকে সারা জীবনের জন্য স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দেখা হত।#কুইল বা #পালকের_কলম – সাধারণত রাজহাঁস বা বড়সড় পাখির পালকেরতৈরি কলমকে কুইল (quill) বলে। ডিপ কলম, ঝর্ণা কলম ইত্যাদি আসার আগে কুইল ব্যবহৃত হত। পালকের ফাঁপা অংশ কালিদানি হিসেবে কাজ করত এবং কৈশিক পরিচলন প্রক্রিয়ায় কালির পরিচলন হত। মধ্যযুগে পার্চমেন্ট বা চামড়ার কাগজের উপরে কুইল দিয়ে লেখা হত। পালকের কলম বা কুইল এসে খাগের কলমকে প্রতিস্থাপিত করেছিল।#খাগের_কলম – খাগ বা নলখাগড়া, বাঁশ ইত্যাদির একদিক সরু করে কেটে মাথাটা সূক্ষভাবে চিরে এই কলম তৈরি করা হত। এর যান্ত্রিক প্রক্রিয়া কুইলের মত।
#স্টাইলাস বা #ব্রোঞ্জের_শলাকা- ব্রোঞ্জের শলাকার পোশাকি নাম স্টাইলাস। স্বয়ং জুলিয়াস সিজার এই কলমটি ব্যবহার করতেন যার দ্বারা তিনি কাসকাকে আঘাত করেছিলেন।

শিশুকালীন যৌন হয়রানি রোধে মায়েদের জন্য ১৩টি করণীয়

শিশুকালীন যৌন হয়রানি রোধে মায়েদের জন্য ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ ও যৌন হয়রানি থেকে কিভাবে সচেতন করবেন শিশুদেরঃবাংলাদেশে গড়ে ১৫ দিনে কমপক্ষে ৪৭ টি শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণ চেষ্টা ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। উন্নয়ন সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এই তথ্য দিচ্ছে।
শিশুদের প্রতি এমন নির্যাতনের সংখ্যা হঠাৎ করে বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা।
১. সন্তানের সামনে নিজেরা কাপড় পরা/বদলানো থেকে বিরত থাকুন।জাগ্রত শিশু সন্তানের সামনে যৌন মিলন থেকেও বিরত থাকুন এবং যত্র-তত্র উলঙ্গ অবস্থায় যেতে নিষেধ করুন। ইসলাম নির্দেশিত সতর ঢেকে রাখুন এবং শিশুদের সতর সম্পর্কে জ্ঞান দান করুন। [ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুপরিপালন-নীতিমালা]
২. আপনার মেয়ে শিশুকে অন্য কারো (অপরিচিত লোক) কোলেবসতে দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, এমনটি নিজস্ব আত্মীয়-স্বজনদের ব্যাপারেও সতর্ক থাকুন। ছোটবেলা থেকে পর্দার ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করুন। [আদাবুল মোয়াশারাত]
৩. বিশেষভাবে মেয়ে সন্তানকে খেলাধুলায় সঙ্গী নির্বাচন করারক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন। খেয়াল রাখুন আপনার সন্তান যখন বন্ধুদেরসাথে খেলতে যায় তখন তারা কি ধরনের খেলা খেলছে? নিছকবিনোদন বা সময় কাটানো জাতীয় খেলাধুলা ছাড়া অন্য সব ধরনেরখেলাধুলা থেকে বিরত রাখুন। লক্ষ্য রাখুন শিশুদের খেলাধুলারবিষয় যেন, বিয়ে-শাদি বা সংসার না হয়। [আদাবুল মোয়াশারাত]
৪. খেয়াল রাখবেন কেউ যেন দুস্টামি করেও আপনার মেয়েসন্তানকে কখনো আমার বউ বা আমার ছেলের বউ ইত্যাদি কথা নাবলে। কারণ এতে করে সন্তানের মাঝে অপরিনত বয়সেই বিয়েরমানসিকতা সৃষ্টি হতে পারে। ইসলাম বৈধ উপায়ে যথার্থ সময়েবিয়ের আদেশ দিয়েছে। আগেও নয় এবং খুব পরেও নয়।[আদাবুল মোয়াশারাত]
৫. অন্য প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ কিংবা মহিলার কাছে আপনারমেয়ে সন্তানকে পাঠানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন এবং জোরকরে এমন কোথায় তাকে পাঠানো থেকে বিরত থাকুন- যেখানে সেযেতে চায় না।। এমনকি আপনি যদি কখনো খেয়াল করেন, কেউ আপনারমেয়ে সন্তানকে খুব বেশি আদর- সোহাগ করছে, তাতেও সতর্ক থাকুন।কারণ মানুষ মাত্রই ভুলকারী। শয়তান যে কোনো সময় যে কোনোমানুষকে ধোকায় ফেলতে পারে, তাই সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা উচিত।[আদাবুল মোয়াশারাত]
৬. সাবধানতা এবং সতর্কতার সাথে আপনার মেয়েকে বয়ঃসন্ধীকালীনসঠিক যৌন শিক্ষা প্রদান করুন এবং তাকে এই সময়কালীন বিভিন্নঅপকারিতা সম্পর্কে সচেতন করুন। আপনার মেয়ে সন্তানকে জানতেসাহায্য করুন, ইসলাম কেন এই সময় ইবাদত-বন্দেগি করতে নিষেধ করেছে। [আদাবুল মোয়াশারাত]
৭. যদি কখনো দেখেন হঠাৎ করে আপনার মেয়েটি কেমন নিশ্চুপ হয়েগেছে, সতর্কতার সাথে কারণ আবিস্কার করার চেষ্টা করুন এবংকারণ দূর করুন। আপনার কাছে কারণ যদি যৌন হয়রানি আবিস্কৃত হয় তাহলে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন এটা ভুলএবং এই ভুল থেকে দূরে থাকা উচিত। আর সাথে সাথে ইসলামি বিধি নিষেধগুলো তাকে জানান। ইসলাম নির্দেশিত যৌনহয়রানির শাস্তি ও পরিণামে কথা তাকে জানান। [আদাবুল মোয়াশারাত]
৮. অনেক মায়েদের দেখা যায় বাচ্চাদের ঠাণ্ডা রাখার জন্যবিভিন্ন কার্টুন ও মুভি দেখান- এটা কখনোই করবেন না। কারনছোটবেলাতেই এসব জিনিস বাচ্চাদের মানসিকতায় বিশেষপ্রভাব বিস্তার করে। আর ইসলাম তো এসব কার্টুন ও মুভিদেখানোকে কখনোই সমর্থন করে না। বরং এ ক্ষেত্রে বিভিন্নভালো গল্প শোনানো যেতে পারে। [আদাবুল মোয়াশারাত]
৯. মেয়ে সন্তানের বয়স ৩ বছর হলেসন্তানকে টয়লেট শেষে নিজেনিজে গোপনাঙ্গ পরিষ্কার করতে শিখান এবং তাকে ইসলামেরপবিত্রতার গুরুত্বের কথা জানান। তাকে শিখতে সহযোগিতা করুনইসলাম কীভাবে পবিত্রতা অর্জন করার নিয়ম-পদ্ধতি বাতিয়েছে।[আদাবুল মোয়াশারাত]
১০. আরেকটা ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকুন- প্রয়োজন ছাড়া মেয়েকেসন্তানের গোপনাঙ্গ স্পর্শ করাথেকে তাকে বিরত রাখুন এবং নিজেরা বিরত থাকুন। এতে করেলজ্জাহীনতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। [আদাবুল মোয়াশারাত]
১১. খারাপ কাজ, মন্দ ব্যক্তি, কুরুচিপূর্ন বিষয় এবং নিন্দনীয়আচরণের তালিকা তৈরি করুন এবং মেয়েকে সেগুলো শিক্ষা দিন। এই ক্ষেত্রে আপনাকে মনে রাখতে হবে, তাকে যা কিছু জানাবেন বাবুঝাবেন সবগুলোর কারন ব্যাখা করতে হবে। [আদাবুল মোয়াশারাত]
১২. আপনার সন্তান কখনো কারো বিরুদ্ধে নালিশ করলে তা হেলায়উড়িয়ে দেবেন না- তাতে সেই ব্যক্তিটি যেই হোক না কেন? মনোযোগ দিয়ে তার নালিশ শুনুন এবং যৌক্তিকতা বিচার করুন এবংমেয়েকে জানান নালিশ ও বিচারের ক্ষেত্রে ইসলাম কী বলেছে।[আদাবুল মোয়াশারাত]
১৩. শিশুবেলা থেকেই আপনার সন্তানকে প্রতিকুল পরিবেশে প্রতিবাদকরার জন্য অনুপ্রেরনা দিন। কীভাবে বাজে পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষাকরবে তার ধারনা ও শিক্ষা প্রদান করুন।
#যৌন_হয়রানি থেকে কিভাবে সচেতন শিশুদের করবেনঃশিশুদের যৌন নির্যাতন কাকে বলে, আর তাদের নিজের প্রতি তা ঘটছে কিনা, সেটি শিশুরা কীভাবে চিহ্নিত করবে? এমন স্পর্শকাতর বিষয় অভিভাবকেরা ছোট শিশুদের কীভাবে শেখাতে পারেন?বিষয়টা জানানো দরকার কিন্তু তা কতটা মুশকিল?
কয়েকজনের মায়ের কথা:
কর্মজীবী এক মা। অফিসে থাকলেও মাথার মধ্যে সারাদিন ঘুরতে থাকে তার সাত আর দশ বছর বয়সী দুটি কন্যা শিশুর কথা। কি করছে তারা সারাদিন? বলছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মা।
সেই উদ্বেগের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলছিলেন, ‘চারপাশে আজকাল যা ঘটে তা খুবই ভীতিকর। যেমন কিছুদিন আগে ডেমরায় দুটো বাচ্চা খেলা করছিল। ওদের লিপস্টিক কিনে দেবার কথা বলে নিয়ে গিয়েছে। তারপর রেপ করে মেরে ফেলেছে। এই খবরটা যখন দেখলাম তখন সাথে সাথেই আমার নিজের বাচ্চা দুটোর চেহারা ভেসে উঠলো। এইগুলোর কারণেই আমি সবসময় একটা টেনশনে থাকি।’
এই মা বলছেন সন্তানকে তিনি সেভাবেই প্রস্তুত করছেন। তাদের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছেন।
কিন্তু যৌন নির্যাতন কাকে বলে, সেটি শিশুরা কীভাবে চিহ্নিত করবে, সাত ও দশ বছর বয়সী ছোট শিশুদের এমন জটিল বিষয় তিনি কীভাবে জানাচ্ছেন?
তিনি বলছেন, ‘আমি ওদের শিখিয়েছি কোন স্পর্শটা ভালো আর কোনটা খারাপ। আমি আমার বাচ্চাদের সাথে একটা ওপেন রিলেশনশিপ তৈরি করার চেষ্টা করেছি। যাতে ওরা আমাকে সব কিছু বলতে পারে। তারা নিজেরাই নিচে খেলতে যায়। তাদের শিখিয়েছি কেউ যদি তোমাকে বলে আমার সাথে আসো, তোমাকে খেতে দেবো, তোমার মা বলেছে। তুমি কখনোই যাবে না।’
ছেলে বাচ্চাকে নিয়েও ভাবা দরকার:
নানা উদ্বেগের কারণে সাত বছর বয়সী ছেলের দেখভালের জন্য মাহিন চৌধুরী তার চাকরিটাই ছেড়ে দিয়েছেন। বলছিলেন তাকে চোখের আড়াল হতে দেন না প্রায় কখনোই। কিন্তু ছেলে সন্তান বলে তার প্রতি যৌন নির্যাতনের কোন ঘটনা যে ঘটতে পারে তিনি সেটা ঠিক ভাবেন না।
তিনি বলছেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি আমার যদি মেয়ে বাচ্চা হতো তাহলে অনেক বেশি এ ব্যাপারে চিন্তিত হতাম। কিন্তু যেহেতু আমার ছেলে বাচ্চা, তুলনামূলকভাবে কিন্তু ওই চিন্তাটা একটু কমই আসে। টেনশনটা কম হয়। কিন্তু তারপরও বাচ্চার কথা চিন্তা করেই আমি চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি।’
বিষয়টি নিয়ে কথা বলা কঠিন:
কিন্তু তিনিও তার বাচ্চাকে এই বিষয়টি বোঝাতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু একটি শিশুর মাথায়, যৌন নির্যাতনের ধারণাটা অনুপস্থিত। আপত্তিকর বিষয়টিও সে বোঝে না। তাদের কাছে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা কঠিন বলে জানালেন মাহিন চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘একটি ছোট বাচ্চাকে বিষয়টি বোঝানো খুব কঠিন। আর সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ তো আমাদের নেই। দেশের বাইরে দেখি মা বা অভিভাবকদের ট্রেইন করা হয়। সচেতনতামূলক অনেক বার্তা থাকে। আমি ছেলেকে ভালো আদর, খারাপ আদর বিষয়টির পার্থক্যটা বোঝানোর চেষ্টা করেছি।’
বাবাদের জন্য বিষয়টি কি বেশি কঠিন?:
তামিম হাসানের স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন দুই বছর আগে। এই ঘটনার কারণে তিনি একজন ‘সিঙ্গেল প্যারেন্ট।’ তবে এরপর থেকে সাড়ে তিন বছরের সন্তানকে বড় করতে তিনি তার পরিবারের সহায়তা পাচ্ছেন। মায়ের উপরে তিনি অনেকটাই নির্ভরশীল। কিন্তু শিশুটির প্রতি তিনি বাড়তি মনোযোগ দেন, কারণ তার মা নেই। তাই ছেলের ব্যাপারে তার উদ্বেগ আরও বেশি।
তবে তার মতে বাবাদের জন্য শিশুদের এই বিষয়ে শেখানো বেশ কঠিন, কারণ বাংলাদেশের সমাজে বাবাদের সেভাবে তৈরি করা হয় না। সন্তানের সাথে তার ঘনিষ্ঠতার ধরন ভিন্ন।
শিশুরা এমন প্রসঙ্গ বোঝার ক্ষমতা রাখে না। কিন্তু তবুও তাকে জানাতে হবে।
তিনি বলছেন, ‘একজন মা যেভাবে বাচ্চাদের সাথে মিশতে পারে, একজন বাবা সেভাবে পারেন না। বাবাদের সাথে ছেলেমেয়েদের একটু দূরত্ব থাকে। বাবারা অফিসের কাজে বাইরে থাকেন বেশি। তাই ততটা সময় দিতে পারেন না। আর সিঙ্গেল মায়ের থেকে সিঙ্গেল বাবাদের জন্য বিষয়টাতো আরও কঠিন।’
একজন চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীর দেয়া টিপস:
শিশুদের এরকম একটি বিষয়ে কীভাবে জানানো যায় সে প্রসঙ্গে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী ডা. ইশরাত শারমিন রহমান বলছেন, একটি শিশু এমন প্রসঙ্গ বোঝার ক্ষমতা রাখে না।
কিন্তু তবুও তাকে জানাতে হবে। আর তার জন্য কি করা যেতে পারে সে ব্যাপারে তিনি কয়েকটি টিপস দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘একটি শিশুকে তার শরীরের তিনটি জায়গা সম্পর্কে জানাতে হবে। তার ঠোঁট, গোপনাঙ্গ ও পায়ুপথ। তাকে জানাতে হবে এই তিনটা তার বিশেষ জায়গা। এখানে বাবা মা গোসল করানো বা পরিষ্কার করার সময় ছাড়া অন্য কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। কেউ সেটি করলে সে কি করবে সেটিও তাকে জানানো। সেটা বাবা মাকে যে জানাবে সেটি শেখাতে হবে। এতে বাচ্চারা সচেতন থাকবে।’
শিশুদের কি ভয় বাড়িয়ে দেয়া হবে?:
ডা. ইশরাত শারমিন বলছেন, বিষয়টি জানানোর কাজ সঠিকভাবে করার জন্য অভিভাবকদের আগে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। জিনিসটা করতে হবে একটু খেলার ছলে, ছবি এঁকে অথবা গল্প করে ধীরে ধীরে ধারণাটা তার মাথায় দিয়ে দিতে হবে। বড় বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মুখে বলা যেতে পারে। কিন্তু শিশুরা সবকিছু ভুলে যায়। তাদের মধ্যে সন্দেহ কম, তাই তাদের বিষয়টি মনে করিয়ে দিতে হবে।
তিনি বলছেন, ‘শিশুর আচরণ পরিবর্তন খেয়াল করতে হবে। বাচ্চার আচরণ থেকেও অনেক সময় অনেক কিছু বোঝা যায়। সে যদি কাউকে দেখে ভয় পায়, কারো কোলে যেতে না চায়, তাকে জোর করা উচিৎ নয়। যে বাচ্চা বিছানা ভেজানো বন্ধ করে দিয়েছে, সে যদি হঠাৎ আবার তা করে। সে যদি ভয় পেয়ে চমকে ওঠে বা রাতে দু:স্বপ্ন দেখছে, এমন পরিবর্তন খেয়াল করতে হবে।’
শিশুর কথা শুনতে হবে ও তাকে বিশ্বাস করতে হবে, বাংলাদেশে শিশুদের কথা না শোনার একটি প্রবণতা রয়েছে।এটা এক ধরণের মূর্খতা ।সম্পাদিত

আইরিশ সংগীত শিল্পী সিনেড ও’কনর বলেছেন, ‘আমি সারাজীবন ধরেই একজন মুসলমান ছিলাম

‘আমি সারাজীবনই মুসলামন ছিলাম, তবে বুঝতে পারি নি’ ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯,

জনপ্রিয় আইরিশ সংগীত শিল্পী সিনেড ও’কনর বলেছেন, ‘আমি সারাজীবন ধরেই একজন মুসলমান ছিলাম, তবে আগে কখনও উপলব্ধি করতে পারি নি।’ শুক্রবার রাতে একটি আইরিশ টিভি চ্যানেলে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এই কথা বলেন। প্রায় একবছর আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন ও’কনর। সাক্ষাৎকারে তিনি প্রথমবার পবিত্র কুরআন শরীফ পড়ার অনুভূতি পরবর্তীতে মুসলমান হওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।
লেট লেট শো নামের এক অনুষ্ঠানে দেয়া সাক্ষাৎকারে ও’কনর বলেন, ‘আপনি যদি পবিত্র কোরআন পড়েন তাহলে বুঝতে পারবেন যে, আপনি সারা জীবনই মুসলমান ছিলেন কিন্তু এটি কখনো উপলব্ধি করতে পারেন নি। আমার সাথেও এমনটি ঘটেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার বয়স ৫২ বছর। আমি যে আয়ারল্যান্ডে বেড়ে উঠেছি তা এখনকার তুলনায় আলাদা ছিল। ধর্মীয়ভাবে বলতে গেলে তখন এটি একটি বাজে দেশ ছিল। সবাই ছিল হতভাগ্য, কারণ কেউ ইশ্বরের বিশ্বাসে শান্তি পাচ্ছিল না।’
আইরিশদের জীবন নিয়ে গান গেয়ে দীর্ঘ সময় শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখা এই গায়িকা জানান, তিনি ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পড়েছেন এবং পরে ইশ্বর সম্পর্কে জানতে আরো সত্যের সন্ধান করেছেন। ইসলাম গ্রহণ করতে তিনি এতো দেরি করেছেন কারণ, এই ধর্ম সম্পর্কে তার মনে কিছু কুসংস্কার ছিল।
অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক রায়ান টুব্রিডি এই গায়িকার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি ৫২ বছর বয়সে তিনি জীবন উপভোগ করছেন কিনা। উত্তরে ও’কনর জানান, তিনি এখন ১৭ বছরের বয়সের মতো অনুভব করছেন। তিনি বলেন, ‘আমার বার্ধক্যের অভিজ্ঞতা হল, আমার শরীরের বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমার মনের বয়স আরো কম হচ্ছে।’
উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে ‘নাথিং কমপেয়্যার টু ইউ’ গানটির মাধ্যমে তিনি বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন। তার অসংখ্য গানের অ্যালবাম প্রকাশ হয়েছে এবং আয়ারল্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পীদের মধ্যে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। চলতি মাসের শেষ দিকে কো টিপ্পেরিতে ফেইল’১৯ শোতে পারফর্ম করতে চলেছেন। সূত্র: আইরিশ টাইমস।

উসমানি খিলাফায় বিয়ের কিছু চমৎকার আইন ছিল।

উসমানি খিলাফায় বিয়ের কিছু চমৎকার আইন ছিল।
.
(এক) ঐচ্ছিক বিয়ের বয়েস শুরু হতো আঠার থেকে। শেষ হতো পঁচিশে। এর মধ্যে বিয়ে না করলে, তাকে বাধ্য করে বিয়ে করানো হতো।
.
(দুই) যদি কেউ অসুস্থতার অজুহাত দেখাতো, তদন্ত করে দেখা হতো, বক্তব্যটা সঠিক কি না। রোগটা নিরাময়যোগ্য হলে, সুস্থ্য হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় চাপ স্থগিত রাখা হতো। আর দুরারোগ্য ব্যধি হলে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই বিয়ে করতে বাধা দেয়া হতো।
.
(তিন) পঁচিশ হয়ে যাওয়ার পরও যদি কেউ বিনা কারণে বিয়ে না করে থাকতো, তার আয়/ব্যবসা বা সম্পদের এক চতুর্থাংশ কেটে রাখা হতো। জব্দকৃত অর্থ নিয়ে বিবাহোচ্ছুক গরীবদের বিয়ের বন্দোবস্ত করা হতো।
.
(চার) পঁচিশের পরও বিয়ে না করলে, তাকে রাষ্ট্রীয় কোনও চাকুরিতে নেয়া হতো না। কোনও সংগঠনেও ভুক্তি দেয়া হতো না। আর চাকুরিতে থাকলে, ইস্তেফা দেয়া হতো।
.
(পাঁচ) কোনও ব্যক্তির বয়েস যদি পঞ্চাশ হয়ে যায়, ঘরে বিবি থাকে একটা, কিন্তু তার আর্থিক সংগতি ভালো, তখন তাকে সামাজিক কোন কাজে অর্থ দিয়ে অংশগ্রহণ করতে বলা হতো। গ্রহণযোগ্য কোনও কারণ দেখিয়ে অপারগতা প্রকাশ করলে, সামর্থ্য অনুসারে অন্তত এক থেকে তিনজন এতীমের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়ে বাধ্য করা হতো।
.
(ছয়) আঠার থেকে পঁচিশের মধ্যে যদি কোনও গরীব যুবা বিয়ে করতো, তাকে হুকুমতের পক্ষ থেকে ১৫৯ থেকে শুরু করে ৩০০ দুনমা পরিমাণের জমির বন্দোবস্তি দেয়া হতো। চেষ্টা করা হতো জমিটা যেন তার বাড়ির কাছাকাছি কোথাও হয়। এক দুনমা সমান: ৯০০ মিটার।
.
(সাত) গরীব বর যদি কারিগর বা ব্যবসায়ী হয়, তাকে পূঁজিপাট্টা দেয়া হতো। কোনও বিনিময় ছাড়াই। তিন বছর মেয়াদে।
.
(আট) ছেলে বিয়ে করার পর, বাবা মায়ের সেবা করার জন্যে আর কোনও ভাই না থাকলে, বরকে বাধ্যতামূলক সেনাকার্যক্রম থেকে রেহাই দেয়া হতো। তদ্রƒপ মেয়ের বিয়ের যদি বাবা মায়ের সেবার জন্যে ঘরে কেউ না থাকে, মেয়ের জামাইকেও বাধ্যতামূলক সেনা কার্যক্রম থেকে রেহাই দেয়া হতো।
.
(নয়) পঁচিশের আগেই বিয়ে করে তিনসন্তানের বাবা হলে, নৈশস্কুলে বিনামূল্যে তাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দেয়া হতো। সন্তান তিনজনের বেশি হলে, তিনজনের লেখাপড়ার ব্যবস্থা বিনামূল্যে করা হতো। বাকী সন্তানদের জন্যে দশ টাকা করে বরাদ্দ করা হতো। তের বছর বয়েস হওয়া পর্যন্ত।
.
কোনও মহিলার ঘরে চার বা তার চেয়ে বেশি ছেলে সন্তান থাকতো, তাকে মাথাপিছু ২০ টাকা করে বরাদ্দ দেয়া হতো।
.
(দশ) কোন ছাত্র লেখাপড়ার কাজে ব্যস্ত থাকলে, লেখাপড়া শেষ হওয়া পর্যন্ত বিয়ে স্থগিত রাখার অনুমতি দেয়া হতো।
.
(এগার) কোনও কারণে স্বামীকে অন্য এলাকায় থাকতে হলে, বাধ্য করা হতো সাথে করে স্ত্রীকেও নিয়ে যেতে! যুক্তিসঙ্গত কোনও কারণে স্ত্রীকে সাথে নিতে না পারলে, স্বামীর যদি আরেক বিয়ে করার সামর্থ থাকতো, তাকে কর্মস্থলে আরেক বিয়ে করতে বাধ্য করা হতো। তারপর চাকুরি শেষে নিজের এলাকায় ফিরলে, দুই স্ত্রীকেই সমান অধিকারে রাখতে বাধ্য করা হতো।
.
বর্তমানের প্রেক্ষাপটে আইনগুলো হয়তো বেখাপ্পা শোনাবে, কিন্তু সমাজে প্রচলিত সব ধরনের অনাচার রোধে, আইনগুলো বেশ কার্যকর বলেই মনে হয়।

‘ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান’

#গাজীপুরের_ঐতিহ্যঃ
দেশের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক উদ্যান হল গাজীপুর জেলার ‘#ভাওয়াল_জাতীয়_উদ্যান
দেশের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উদ্যান ‘ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান’। ঢাকা থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে এই উদ্যানের অবস্থান। গাজীপুর জেলার সদর ও শ্রীপুর উপজেলায় এ উদ্যানের বিস্তৃত।

পৃথিবীর অন্যান্য জাতীয় উদ্যানের আদলে ৫০২২ হেক্টর জমিতে ১৯৭৩-৭৪ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন (১৯৭৪) অনুযায়ী এই উদ্যান সরকারিভাবে গড়ে তোলা হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয় ১৯৮২ সালে।

ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে একসময় বাঘ, কালোচিতা, চিতাবাঘ, মেঘলা চিতা, হাতি, ময়ূর, মায়া হরিণ ও সম্বর হরিণ দেখা যেত। ১৯৮৫ সালে এ বনে খেঁকশিয়াল, বাঘডাস, বেজী, কাঠবিড়ালী, গুঁইসাপ আর কয়েক প্রজাতির সাপ দেখা গেছে। একটি হিসাব অনুযায়ী, ভাওয়াল গড়ে ৬৪ প্রজাতির প্রাণী রয়েছে যার মধ্যে ৬ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ১০ প্রজাতির উভচর ও ৩৯ প্রজাতির পাখি রয়েছে। বনবিভাগ এ বনে অজগর, ময়ূর, হরিণ ও মেছোবাঘ ছেড়েছে। এছাড়া ২০১২ সালে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে ১৬টি তক্ষক ছাড়া হয়।

ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান মূলত ক্রান্তীয় পতনশীল পত্রযুক্ত বৃক্ষের বনভূমি। ২২১ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে এই বনে; যার মধ্যে ২৪ প্রজাতির লতা, ২৭ প্রজাতির তৃণ, ৩ প্রজাতির পামজাতীয় বৃক্ষ, ১০৫ প্রজাতির ঔষধি, ১৯ প্রজাতির গুল্ম, ৪৩ প্রজাতির বৃক্ষ। এই উদ্যানের মূল বৃক্ষ শাল (Shorea robusta)। অন্যান্য বৃক্ষের মধ্যে কাঁঠাল, আজুলি, কুম্ভী, গান্ধী গজারি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া এ বনে কৃত্রিমভাবে ইউক্যালিপটাস আর রাবারের বনায়ন করা হয়েছে।

ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের আকর্ষণীয় একটি পর্যটন কেন্দ্রও। এখানে বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পট রয়েছে। স্পটগুলোর হলো: আনন্দ, কাঞ্চন, সোনালু, অবকাশ, অবসর, বিনোদন। এখানকার কটেজগুলো হলো: বকুল, মালঞ্চ, মাধবি, চামেলী, বেলী, জুঁই ইত্যাদি। এখানে ১৩টি কটেজ ও ৬টি রেস্টহাউজ রয়েছে। রাত্রি যাপনের জন্য এখানে অনুমতি দেওয়া হয় না। পিকনিক স্পট কিংবা রেস্ট হাউস ব্যবহার করতে হলে বন বিভাগের মহাখালী কার্যালয় থেকে আগাম বুকিং দিতে হয়।

নির্ধারিত প্রবেশ মূল্য দিয়ে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে ঢুকতে হয়। এছাড়া গাড়ি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে নির্দিষ্ট হারে মূল্য পরিশোধ করতে হয়। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান প্রতিদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খোলা থাকে। ভ্রমণের সময়ে উদ্যানের ভেতরে মাইক কিংবা উচ্চ শব্দ তৈরি করা কোনো যন্ত্র বাজানো নিষেধ। এছাড়া বন্যপ্রাণীরা বিরক্ত হয় এমন কোনো আচরণ করাও নিষেধ।

বনের ভেতরে পাখি শিকার কিংবা লেকে মাছ ধরা দণ্ডনীয় অপরাধ। বনের ভেতরে কিছু এলাকা বেশ নির্জন। এসব জায়গায় যাওয়া বিপজ্জনক।
ইদানিং ওসব স্থানে দেদারসে দেহ ব্যবসা চলে । আর ছিনতাইকারীরতো অভাব ই নেই ।

কিভাবে যেতে হবেঃ

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহগামী যে কোনো বাসে চড়ে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের গেটের সামনেই নামা যায়। এছাড়া ঢাকার গুলিস্তান থেকে প্রভাতী বনশ্রী পরিবহনসহ বেশ কয়েকটি বাস চলে এই পথে। আর নিজস্ব বাহনে গেলে জয়দেবপুর চৌরাস্তা ছাড়িয়ে ময়মনসিংহের দিকে কিছু দূর এগিয়ে গেলে হাতের ডানে পড়বে এর প্রধান প্রবেশপথ।

কুকুরের উপদ্রব

রাস্তায় চলার পথে অনেক সময় কুকুরের উপদ্রব দেখা যায়। এই কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্কের মতো মরণ ব্যাধি রোগ হতে পারে। তাই কুকুর আপনার দিকে তেড়ে এলে কি করা উচিত, তা অবশ্যই জেনে রাখা উচিত।


কুকুর তাড়া করলে বাঁচার জন্য ৮টি পথ অবলম্বন করুন:

১। ভয় পাবেন না। অযথা আতঙ্কিত হবেন না। মানুষের ভয়-ভীতি কুকুর কিন্তু টের পায়। কাজেই যথাসম্ভব নির্বিকার থাকুন। তাহলে কুকুরটিও ক্রমে আপনার প্রতি আগ্রহ হারাবে।

২। একেবারেই দৌড়ানোর চেষ্টা করবেন না। কেননা তাতে কুকুরটি আরও উত্তেজিত হবে। গতিশীল বস্তু দেখলে কুকুরের আক্রমণের প্রবণতা বাড়ে। তা ছাড়া আপনি উসেইন বোল্ট না হলে দৌড়ে কুকুরটির সঙ্গে পেরে ওঠার চান্সও কম! কুকুর তাড়া করলে ছুটবেন না।

৩। হাঁটার গতি কমিয়ে দিন। দরকারে একদম থেমে যান। কুকুরটি শান্ত হলে ফের ধীরে ধীরে আগান।

৪। মুখোমুখি নয়, কুকুরের দিকে পাশ ফিরে দাঁড়ান। তাতে কুকুরটির দৃষ্টিতে আপনাকে পাতলা লাগবে। কুকুরটির মনে আপনাকে নিয়ে ভয় তৈরি হবে কম।

৫। কুকুরটির সঙ্গে সরাসরি চোখাচোখি করবেন না। আড়চোখে দেখুন। নইলে কুকুরটি আরও হিংস্র হয়ে উঠতে পারে।

প্রসঙ্গঃ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন ছাত্র-ছাত্রীদের টুপি ও গাউন

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন ছাত্র-ছাত্রীরা লেখাপড়া সমাপন করে, তখন সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মাথায় চারকোণাবিশিষ্ঠ ছাতাওয়ালা একটি টুপি পরে। গায়ে জুব্বার মতো ঢিলেঢালা গাউন পরে। এগুলো পশ্চিমা অনুকরণ। শিক্ষার ক্ষেত্রে যেহেতু মুসলিম দেশগুলো পাশ্চাত্যরীতি অনুসরণ করে, সেহেতু মুসলিম দেশেও সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এভাবে টুপি ও গাউন পরার প্রচলন ঘটে গেছে। পশ্চিমারা তো এককভাবে দাবি করে, এই রীতি তাদের খ্রিষ্টধর্মের সভ্যতার সাথে জড়িত। প্রাচীনকালে ক্যাথলিক যাজকরা এই ধরণের টুপি ও আলখাল্লা পরতেন।

কিন্তু বিষয়টা কি আসলে তা-ই?! না, বিষয়টা আসলে তা নয়। এটিকে একতরফাভাবে পশ্চিমা সভ্যতা বললে চলবে না। এই সভ্যতার ইতিহাস একটি মতানৈক্যপূর্ণ ইতিহাস। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই টুপি ও গাউন পরার ইতিহাস মুসলিমসভ্যতার সাথে জড়িত। স্বয়ং পশ্চিমা ঐতিহাসিকদের কলমেও এর তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়। এর প্রচলন ঘটেছে আন্দালুসে। আজ থেকে শত শত বছর পূর্বে। কিন্তু কীভাবে? তাহলে জানুন–

যখন ইউরোপ ছিল অজ্ঞতার অতল সমুদ্রে নিমজ্জিত, তখন আন্দালুস ছিল শিক্ষা ও সভ্যতার স্বর্গরাজ্য। টলেডো, সেভিল ও গ্রানাডার বিদ্যালয়গুলো ছিল জ্ঞানের আলোকবর্তিকা। কুরআন-সুন্নাহর বিদ্যাধরদের পাশাপাশি চিকিৎসা, রসায়ন, জ্যামিতি, ফিলোসফি, পদার্থ ও অন্যান্য আধুনিক শিক্ষার জ্ঞানতাপসদের তীর্থস্থান ছিল আন্দালুস। তদুপরি আন্দালুসের ঘরে ঘরে ছিল শিক্ষিতা নারী। এজন্য স্বয়ং ইউরোপের সম্রাটরা তাদের শাহজাদা-শাহজাদিদের প্রেরণ করত আন্দালুসে। ইউরোপ থেকে দলে দলে শিক্ষার্থীরা আগমন করত আন্দালুসে। একসময় তাদের ভাষা মিশ্রিত হয়ে যেত! ইউরোপে ফিরে যেত ঢিলেঢালা আজানুলম্বিত পোশাক পরে। আরব্য শিক্ষিত হওয়ার বেশধারণ করে। শুধু তাই নয়; কথায় কথায় তারা আরবি বুলি আওড়াতো। শিক্ষার ঘ্রাণ শুঁকাতে!

আন্দালুসের মুসলিম পণ্ডিতরা যখন স্বীয় ছাত্রদের শিক্ষাদান শেষ করতেন, তখন সমাবর্তন উনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। এই অনুষ্ঠানে ছাত্রদের মাথায় চারকোণাবিশিষ্ট ছাতাওয়ালা টুপি পরিয়ে দিতেন। যাতে সেখানে এককপি কুরআনুল কারিম রাখা যায়। ছাত্রদেরকে সুরা ইউসুফের আল্লাহ তা’আলার সেই বাণী স্মরণ করিয়ে দিতে– {فوق كل ذي علم عليم}, অর্থাৎ প্রত্যেক জ্ঞানীর ওপর মহাজ্ঞানী রয়েছেন।

ছাত্ররা সেই টুপির ওপর এককপি কুরআন রাখত। আর বুঝত যে, তারা যতোই জ্ঞান হাসিল করুক না কেন; তাদের ওপর স্বয়ং আল্লাহ মহাজ্ঞানী রয়েছেন। এছাড়াও সাথে তারা জ্ঞানের সাক্ষ্যস্বরূপ একখানা শাহাদাহ বা সার্টিফিকেট লাভ করত। উস্তাদরা নিজ হাতে লিখে এই শাহাদাহ দান করতেন।

উপরের তথ্যগুলোর সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় স্বয়ং পশ্চিমা ঐতিহাসিকদের লিখনীতে। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক জ্যাক গোডি তাঁর লিখিত বই ‘Islam In Europe’-এর মধ্যে বলেন, আজও পর্যন্ত আরবদের ইসলামি পোশাক জ্ঞানগর্বমূলক মর্যাদায় অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে শিক্ষাবিষয়ক উপলক্ষগুলোতে। যেমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিতর্ক-অনুষ্ঠান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমাবর্তন অনুষ্ঠানমালায়।

১৪৯২ সালে ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের হাতে আন্দালুসের পতন ঘটে। উজাড় হয়ে যায় আমাদের এ বাগান। কিন্তু আন্দালুসি সভ্যতা হারায়নি। বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন রুপে ও নানা ঢঙে জীবিত আছে আজও। আন্দালুসের মুসলিম শিক্ষানবিসদের সমাবর্তনীয় এই রীতি ক্যাথলিকরা পুরোপুরি গ্রহণ করে। এরপর তা গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপ থেকে পুরো বিশ্বে। এভাবেই আন্দালুসি মুসলিমদের প্রচলনকৃত এই সভ্যতা আজ এককভাবে পশ্চিমাদের সভ্যতা হয়ে যায়!

আহ! আন্দালুস!!
আমাদের হারানো ফিরদাউস!!!
——
সূত্রাবলি:
(১) المسلمون في الأندلس (আন্দালুসের ইতিহাস-গবেষক ড. মাহির মাহমুদ পরিচালিত ফেসবুক পেইজ)
(২) الإسلام في أوروبا: ১৫৩, জ্যাক গোডি। (Islam In Europe-এর আরবি অনুবাদ)
(৩) صفحة روايتي الثقافية (নির্ভরযোগ্য আরবি সাইট)