পান-সুপারী-তামাক-বিড়ি সবই #জাহান্নামীর_খাদ্যঃপান হারাম হওয়ার কোরআন ও হাদীসের ৯টি দলীল । প্রত্যেক খাদ্যের মধ্যে দুটো গুণের কমপক্ষে একটি থাকে। গুণ দুটো হল (ক) #পুষ্টি_জোগান (খ) #ক্ষুধা_নিবারণ। কিন্তু পান ও সিগারেট পুষ্টিও যোগায়না ক্ষুধাও নেভায়না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জাহান্নামীদের খাদ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “জাহান্নামীদের এমন খাদ্য দেয় হবে যা তাদের পুষ্টি যোগাবেনা এবং ক্ষুধা নিবারণ করবেনা। সূরা গাশিয়াহ আয়াত ৭তাই আপনি যে কারণে পান বিড়ি-সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেবেন তা একটু আলোচনা করা যাক….. #পান_খাওয়া মানে পান পাতা চিবানো নয়। চুন, সুপারী, খয়ের, জর্দা ইত্যাদি দিয়ে পান পাতা চিবানোর নাম হল পান খাওয়া। আমার এ প্রবন্ধে পান খাওয়া বলতে প্রচলিত এ তরীকাকে বুঝানো হবে। প্রচলিত এ পদ্ধতিতে পান খাওয়ার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে আমাদের এ উপমহাদেশে। এ ছাড়া বিশ্বের অন্য কোথাও এ ধরনের পান খাওয়ার ব্যাপকতা দেখা যায়না । যারা পান খেয়ে থাকেন তারা তিন ভাগে বিভক্ত। প্রথমতঃ যারা অত্যাধিক পান খেতে অভ্যস্ত পান ছাড়া একটি ঘন্টা কাটানো তাদের জন্য খুব মুশকিল হয়ে পড়ে। এদের মধ্যে শতকরা নিরানব্বই জনের বেশী পান,সুপারী, ও চুনের সাথে তামাক-জর্দা, খয়ের ইত্যাদি খেয়ে থাকেন। দ্বিতীয়তঃ যারা সাড়াদিন পান খেতে অভ্যস্ত নন তবে খাওয়ার পর একটু পান না খেলে চলেনা। এদের মধ্যে শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ পানের সাথে তামাক-জর্দা ও খয়ের গ্রহণ করে থাকেন। তৃতীয়তঃ যারা পেশাদার পানখোর নন তবে কোন বিশেষ দাওয়াত বা অনুষ্ঠানে পান ট্রাই করে থাকেন। আর যারা একে বাড়ে পান দু চোখে দেখতে পারেননা তাদের আলোচনা না-ই করালাম। পান খাওয়া ঠিক কিনা? স্বাস্থ্য বিশারদদের দৃষ্টিতে পান খাওয়া কতটা মন্দ? শরীয়তের দৃষ্টিতে পান খাওয়ার বিধান কি? এ সব প্রশ্নের উত্তর খোজার চেষ্টা করা হবে। আমাদের দেশের সাধারণ শিক্ষিতদের তুলনায় ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত তথা আলেম সমাজে পান খাওয়ার প্রবণতা বেশী দেখা যায়। আমাদের দেশের আলেমগন পান খাওয়াকে জায়েয মনে করেন। কিন্তু আরব দেশের আলেমগন পান খাওয়াকে হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন। এ কারণে সৌদী আরবে পান খাওয়া সরকারী ভাবেই নিষিদ্ধ। যা মানুষের স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর তা খাওয়া ইসলামী শরীয়ত অনুমোদন করেনা। বরং নিষেধ করে। যদিও পান পাতা স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর বলে এখনো প্রমাণিত হয়নি তবে চুন, সুপারী, খয়ের, জর্দা শরীর স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর। এ ব্যাপারে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের কারো দ্বিমত নেই। যখন কোন রোগী ডাক্তারের কাছে যায় তখন ডাক্তার তাকে পান ত্যাগ করার পরামর্শ দেন। কোন ডাক্তার কাউকে পান খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বলে আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি। চুন তো কোন খাদ্য তালিকায় পড়েনা। জর্দা; সে তো তামাক। সুপারী চিবানো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ক্যানসার সৃষ্টিতে সহায়তা করে। সমপ্রতি এক খবরে প্রকাশ মার্কিন গবেষকরা দীর্ঘদিন গবেষণার পর প্রমাণ করেছেন সর্বদা সুপারী চিবানোর ফলে মুখে ক্যানসার হতে পারে। যারা সুপারী খেয়ে থাকেন তাদের মুখে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী – এই অংশটুকু প্রকাশিত (দৈনিক ইনকিলাব ৮ ই আগষ্ট ২০১৮) অবশ্য পানের রস দিয়ে ব্লাড ক্যানসারের প্রতিষেধক উদ্ভাবনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। কিছুটা সফল ও হয়েছেন।(১) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন ঃ “তিনি তোমাদের জন্য পবিত্র ও ভাল ( তাইয়েবাত) বস্তু হালাল করেন আর ক্ষতিকর- নোংড়া ( খাবায়িস) জিনিষ হারাম করেন। সূরা আরাফ আয়াত ১৫৭ সকল চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা বলেছেন পান খাওয়া স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর। ডাক্তার তার রোগীকে পান খেতে বারণ করেন। পান খাওয়ার মধ্যে কোন উপকারিতা থাকলেও থাকতে পারে তবে ক্ষতির দিকটা প্রবল। আল্লাহ তায়ালা মদ ও জুয়া হারাম করতে যেয়ে বলেন ঃ “তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন উভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর তার মধ্যে মানুষের জন্য উপকারিতাও আছে। তবে এগুলোর পাপ উপকারের চেয়ে বড়।” সূরা বাকারা আয়াত ২১৯ আল্লাহ তায়ালার এ বানী দ্বারা বুঝে আসে মদের মধ্যে উপকারিতা থাকা সত্বেও তা হারাম করেছেন। পানের মধ্যে উপকারিতা থাকলেও তার ক্ষতির দিকটা বড় কর দেখা হবে। ফিকাহর মূলনীতিও তাই বলে। (২) প্রত্যেক খাদ্যের মধ্যে দুটো গুণের কমপক্ষে একটি থাকে। গুণ দুটো হল (ক) পুষ্টি জোগান (খ) ক্ষুধা নিবারণ। কিন্তু পান পুষ্টিও যোগায়না ক্ষুধাও নেভায়না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জাহান্নামীদের খাদ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন ঃ “ এটা তাদের পুষ্টি যোগাবেনা এবং ক্ষুধা নিবারণ করবেনা।” সূরা গাশিয়াহ আয়াত ৭ তাই গুণগত দিক দিয়ে পানকে জাহান্নামীদের খাদ্যের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। এ আয়াতের আলোকে এমন খাদ্য গ্রহণ করা ঠিক নয় যা ক্ষুধা নিবারণ করেনা বা পুষ্টি যোগান দেয়না। (৩) পান দাঁত কে কলুষিত করে। আর ইসলামের নবী (সঃ) দাঁতকে সর্বদা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তার উম্মতকে মিছওয়াক করার আদেশ দিয়েছেন খূব গুরুত্ব সহকারে। আর বলেছেনঃ “এ মিছওয়াকের উদ্দেশ্য হল মুখের পরিচ্ছন্নতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি।” যিনি পান খেয়ে থাকেন তিনি শত চেষ্টা করেও দাঁতকে পরিচ্ছন্ন রাখতে পারেননা। তাই পান খাওয়ার মাধ্যমে ইসলামী শরীয়তে মিছওয়াকের যে উদ্দেশ্য রয়েছে তা মারত্নকভাবে ব্যহত হয়। (৪) চুন ছাড়া পান খাওয়ার কথা কল্পনা করা যায়না। আর চুন কোন খাদ্যের মধ্যে পড়েনা। চুন পিত্তথলিতে পাথর তৈরীতে সহায়তা করে। (৫) পানে সুপারী খাওয়া হয়। সুপারী নেশা উদ্রেক করে। যিনি সুপারী খেতে অভ্যস্ত নন তিনি সুপারী খাওয়ার সাথে সাথে কিছুটা বেহুঁশ হয়ে পড়েন। তাই সুপারী কোন উপকারী খাদ্য নয়। (৬) পান-খাদক ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দিয়ে থাকেন। আপনি যদি পান খেতে অভ্যস্ত না হয়ে থাকেন আর আপনার বাসায় এমন একজন মেহমান আসে যিনি পান খেয়ে থাকেন তাহলে তার আচরণে আপনি বিরক্ত হবেন। দেখবেন আপনার পরিস্কার ঘরের এখানে সেখানে পানের চিপটি। বিছানার চাঁদর গুলোতে দাগ পড়ে গেছে। বেসীনগুলো এমন লালচে ময়লাযুক্ত হয়ে পড়েছে যা দেখলে আপনার অসহ্য লাগবে। এমনি ভাবে আপনি যদি এক পানখাদকের কাছে সালাত আদায় করতে দাঁড়ান তাহলে সত্যিই আপনার কষ্ট হবে তার মুখের দুর্গন্ধে। অনেকে বলেন পান খেলে মুখে দুর্গন্ধ হয়না বরং পান মুখের দুর্গন্ধ দূর করে। আমি বলি কথাটি ঠিক তবে তা দুটি অবস্থায়; যতক্ষণ পান খেতে থাকে ততক্ষণ দুর্গন্ধ হয়না আর যদি পার্শের ব্যক্তি অনুরূপ পানখোর হয়ে থাকেন তাহলে তিনি দুর্গন্ধ অনুভব করেননা। এ ছাড়া সর্বাবস্থায় পানখাদকের মুখ থেকে পান সুপারী, তামাক-মিশ্রিত দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। আর প্রতিবেশী বা সহযাত্রীর কষ্ট হয় এমন কোন কাজ করা জায়েয নয়। (৭) অনেক পান খেতে অভ্যস্ত ব্যক্তিকে দেখেছি যে তারা পান খাওয়া সত্বেও দাঁত পরিস্কার রাখার ব্যাপারে অত্যাধিক যত্নবান থাকেন। বার বার মেছওয়াক ও ব্রাশ করেন। বিভিন্ন ধরণের টুথপেষ্ট ও টুথপাউডার ব্যবহার করেন। তবুও তারা দাঁতকে পানের দাগ থেকে মুক্ত রাখতে পারেননি। তাদের দাঁত কালো রং ধারণ করে বিশ্রি হয়ে গেছে। এখন আপনি ভেবে দেখতে পারেন যে, দাঁত ও মুখ এমন এক স্থান যা বার বার পরিস্কার করা হয় ও এ স্থানটা ময়লা আটকে রাখেনা তা সত্বেও দাঁত ও মুখ পান দ্বারা কিভাবে কলুষিত হয়ে থাকে। তাহলে পানের সংস্পর্ষে দেহের ঐ সকল ভিতরের অংশের অবস্থা কেমন হয়ে যায় যা পরিস্কার করা যায়না কখনো ? (৮) একটু বিবেক দিয়ে কল্পনা করুন যে, রাসূলে কারীম (সঃ) এর কাছে এক ব্যক্তি পান চিবাতে চিবাতে আসল। তিনি তার মুখের দিকে তাকালেন। দেখলেন তার মুখ ও জিহবা পানের রংয়ে লাল ও দাঁত গুলো কালো হয়ে গেছে। তখন তিনি তাকে কি বললেন ? তিনি কি বলবেনঃ খুব ভাল জিনিষ খাচ্ছো, তুমি আমাদেরও পান খেতে দাও ? না বলবেন, পান খেলে মুখ ও দাঁতের সৌন্দর্য যা আল্লাহ দান করেছেন তা নষ্ট হয়? এ প্রশ্নটা নিজের বিবেকের কাছে করুন। অতঃপর সিদ্ধান্ত নিন; পান খাবেন, না ত্যাগ করবেন। (৯) পান খেলে সম্পদের অপচয় হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ “তোমরা খাবে ও পান করবে কিন্তু অপচয় করবেনা।” সূরা আরাফঃ ৩১ এ আয়াত দ্বারা বুঝে আসে মানুষ সাধারণত খাওয়া ও পান করার মধ্যে সম্পদের অপচয় করে থাকে। আর যা কিছু মুখে দিয়ে গলধকরণ করা যায় তা উপকারী হোক বা নাে হাক তা খাওয়া বা পান করার অনুমতি দেয়া হয়নি। যদি খাদ্যটা উপকারী না হয় তবে তার পিছনে সম্পদ ব্যয় করার নাম অপচয়। তাই পান খাওয়া একটি অপচয়। (১০) পান খাওয়া একটা অনর্থক কাজ। সকল অনর্থক কাজ পরিহার করা ইসলামের দাবী। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আল-কুরআনে মুমিনদের গুণাবলী আলোচনা করতে যেয়ে বলেছেনঃ “ যারা অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে।” সূরা মুমিনুন ঃ ৩ রাসূলে কারীম সঃ বলেছেন “ যে সকল কথা ও কাজ মানূষের কোন উপকারে আসেনা তা পরিহার করা তার ইসলামের সৌন্দর্য।” মুসলিম তাই পান খাওয়ার মত অনর্থক কাজ সকল ঈমানদার ব্যক্তির পরিহার করা উচিত।
ক্লাসে #শিক্ষকদের পান জর্দা গুল খাওয়াও বারণঃ#দেশের যেকোন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সামনে পান-জর্দা-গুল খেলে অথবা ধুমপান করলে সরাসরি প্রমাণ সহ অভিযোগ করুন । উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নিবে মাউশি বা সংশ্লিষ্ট দপ্তর । মাদ্রাসা শিক্ষকও এর আন্তর্ভূক্ত ।প্রাথমিক,মধ্যমিক,, উচ্চ মধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে এবং শিক্ষার্থীদের সামনে পান, জর্দা ও গুল গ্রহণ না করার এবং ধুমপান না করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বিদ্যালয়ের ভেতরে এবং বিদ্যালয়ের বাইরে শিক্ষার্থীদের সামনে ধূমপান না করারও নির্দেশনা দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক মো. আবদুল মান্নান স্বাক্ষরিত ‘ধূমপান ও তামাকজাতীয় দ্রব্য পরিহার সংক্রান্ত’ নির্দেশনা সব উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকদের পাঠানো হয়েছে।এতে বলা হয়, “কোনো কোনো শিক্ষক বিদ্যালয় কিংবা বিদ্যালয়ের বাইরে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে ধূমপান করেন, বিষয়টি শিক্ষকসুলভ আচরণ ও জনস্বাস্থ্যের পরিপন্থী।“এই মর্মে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নির্দেশনা প্রদান করা যাচ্ছে যে, তারা বিদ্যালয়ের ভেতরে ধূমপান করবেন না এবং বিদ্যালয়ের বাইরে অন্তত শিক্ষার্থীদের সামনে ধূমপান থেকে বিরত থাকবেন।“কোনো কোনো শিক্ষক প্রচুর পরিমাণ পান, জর্দা ও গুল গ্রহণ করে ক্লাসরুমে যান কিংবা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতে কথা বলেন, এতে শিক্ষার্থীদের ভেতর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।“শিখন-শিখানো কার্যক্রম পরিচালনার সময় কিংবা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে শিক্ষকদের পান, জর্দা ও গুল গ্রহণ না করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হল।”শিক্ষার্থীদের পুরস্কার হবে বই বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের পুরস্কার হিসেবে ক্রোকারিজ সামগ্রী না দিয়ে বই অথবা শিক্ষা সহায়ক উপকরণ দিতে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধানদের নির্দেশনা দিয়েছে মাউশি। ‘প্রতিযোগিতায় পুরস্কার হিসেবে বই অথবা শিক্ষা উপকরণ প্রদান’ সংক্রান্ত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, “লক্ষ করা যাচ্ছে যে, বিদ্যালয়গুলোর সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিদের মধ্যে পুরস্কার হিসেবে ক্রোকারিজ সামগ্রী দেওয়া হয়। “এ ধরনের পুরস্কার শিক্ষার্থীদের শিখন-শেখানো কার্যক্রমের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ প্রেক্ষিতে গুণগত শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে সকল অনুষ্ঠানে প্রতিযোগি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুরস্কার হিসেবে বয়স উপযোগী মানসম্মত বই অথবা শিক্ষা সহায়ক উপকরণ দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হল।” স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যতালিকা দিতে হবে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য গঠনের লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী তাদের জন্য খাদ্য তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে জানিয়ে সেই তালিকা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিতরণ করতে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধানদের নির্দেশনা দিয়েছে মাউশি।স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যতালিকা সরবরাহ সংক্রান্ত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, “উক্ত তালিকা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস তৈরির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নির্দেশনা দেওয়া হল। তালিকাটি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে। “স্কুল গেটে এবং আশেপাশে ভ্যানগাড়িতে বা দোকানে যে সকল খাবার বিক্রি করা হয় তাদেরকেও তালিকা সম্পর্কে অবহিত করতে হবে এবং সময়ে সময়ে তদারকি করতে হবে।” স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণের বিষয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতন করতে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষকদের অভিভাবক সমাবেশ ও মতবিনিময় সভা করতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মানুষ ও পরিবেশেরজন্য ক্ষতিকর দ্রব্যের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের সরকারি উদ্যোগে স্বার্থের সংঘাত বাঞ্ছনীয় নয়তামাক এমন একটি পণ্য, যার ব্যবহারে ক্ষতি ছাড়া কোনো উপকার হয় না। তবু এ পণ্য বাজারে আছে এবং রমরমা ব্যবসা করছে। অর্থাৎ মানুষ পয়সা খরচ করে কিনছে। যারা ব্যবহার করে এবং যারা করে না, সবাই জানে এর ক্ষতির কথা। যখন একজন রিকশাওয়ালাকে দেখি সিগারেটে টান দিয়ে রিকশা চালাতে, কিংবা যখন দেখি একজন মহিলা ইট ভাঙার কাজ করছেন আর মুখ লাল করে জর্দা দিয়ে পান খাচ্ছেন, তখন খুব দুঃখ হয়। এসব পণ্য খুচরা কেনার জন্য খুব সস্তা, তাই খাদ্যের পরিবর্তে কয়েকবার তামাক পণ্য সেবন করে ফেলছেন। বাংলাদেশ বিশ্বে উচ্চ তামাক সেবনকারী দেশ, এখানে তামাক পণ্য খুব সস্তা বলেও ‘খ্যাতি’ আছে। বছরে ১ লাখ ৬২ হাজার মৃত্যু ঠেকাতে তামাক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন আছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল, ২০০৩ (এফসিটিসি) অনুযায়ী আইন করে এর ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা দিয়েছে ২০৪০ সালে তামাকমুক্ত করবে নিজেকে। তামাকমুক্ত হতে হলে তামাকের ব্যবহার শূন্য হতে হবে এমন কথা নেই, প্রাপ্তবয়স্ক জনগণের ৫ শতাংশ ব্যবহারকারী হলেই তামাকমুক্ত দাবি করা যাবে। তামাক কোম্পানি প্রায় শত বছর ধরে মানুষের মধ্যে ধোঁয়া এবং নাকে নস্যি দেয়া বা মাড়িতে তামাক লাগানো ইত্যাদি পদ্ধতিতে এক ধরনের নেশা তৈরির ব্যবসা করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় পান খাওয়ার যে সামাজিক সাংস্কৃতিক রীতি আছে, তার মধ্যেও জর্দা হয়ে ঢুকে আছে এ তামাক। সিগারেট খাওয়া ভদ্রলোকের বিষয় বানিয়ে ফেলেছে, শুধু একটু আদব-কায়দা মেনে মুরব্বিদের সামনে না খেলেই হলো। আর এখন? সিগারেট ক্ষতিকর—এটা যত প্রমাণ ও স্বীকৃত হচ্ছে, কোম্পানিগুলো নতুন তামাক পণ্য নিয়ে বাজার ছেয়ে ফেলছে; ই-সিগারেট; ভাপিং ইত্যাদি নামে। তারা দাবি করছে, তামাক নয় নিকোটিন দিয়ে ধোঁয়ার স্বাদ নিচ্ছে মানুষ। তামাক ছাড়তে হলে অন্য একটি পণ্য ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। ‘ই-সিগারেট সেই প্রয়োজন মেটাবে’ এমন মিথ্যা ও খোঁড়া যুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। অবশ্য এরই মধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে এর বিরুদ্ধে মানুষ সচেতন হয়ে উঠেছে; ২৩টি দেশ ই-সিগারেট নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশও ঘোষণা দেবে বলে উচ্চপর্যায়ে কথাবার্তা হচ্ছে। তামাক সেবন ব্যক্তিবিশেষের খারাপ স্বভাব মনে হতে পারে। এতে কোম্পানির কী করার আছে। কিন্তু এটা জানা সত্ত্বেও যে তামাক সেবনের কারণে মানুষ রোগাক্রান্ত হচ্ছে, অকালে মৃত্যুবরণ করছে, তবু কোম্পানিগুলো এ পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে নানা কৌশল অবলম্বন করে। তারা নিজেরাও ধূমপানের ক্ষতি নিয়ে কথা বলে, ধূমপান নিবৃত্তির জন্য নানা পদ্ধতির পরামর্শ দেয়, কিন্তু নতুন ক্রেতা বাড়ানোর জন্য উঠেপড়ে লেগে যায়। যারা এতদিন ব্যবহার করে রোগাক্রান্ত হয়েছে, তাদের রক্ষার কথা বলে নিজেদের ভালো প্রমাণ করতে চায়, অন্যদিকে ফ্রেশ ব্যবহারকারী হিসেবে নতুন প্রজন্মের দিকে হাত বাড়ায়। বর্তমানে এফসিটিসির আলোকে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫, সংশোধিত ২০১৩ অনুযায়ী তামাকজাত দ্রব্য নিয়ে কোনো প্রকার বিজ্ঞাপন, প্রচারণা করা যাবে না। সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে, জর্দা-গুলের কৌটায় সচিত্র সতর্কবাণী ছাপতে হয়, এমনকি সিনেমা-নাটকেও সিগারেট-বিড়ি সেবন দেখানো যাবে না। যদি চরিত্র দাবি করে, তাহলে সেই দৃশ্যের ওপর ‘তামাক মৃত্যু ঘটায়’ কথাটি দৃশ্যমানভাবে লিখতে হবে। এ নিয়ে আইনের লঙ্ঘন নানাভাবে হচ্ছে। কিন্তু তামাক নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত সংগঠনগুলোও যথেষ্ট তত্পর রয়েছে এবং সেই লঙ্ঘন চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিচ্ছে। বিশ্বব্যাপী তামাকের ক্ষতি সম্পর্কে জানাজানি এত বেশি হচ্ছে যে কোম্পানি বুঝে ফেলেছে কেবল আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে ঢুকে বা লঙ্ঘন করে ব্যবসা করে মুনাফার পাহাড় গড়তে পারবে না। কিন্তু ব্যবসা তাদের করতেই হবে। এবং বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশেরও বেশি ২৫ বছরের নিচের বয়সের, সেখানে এত বড় বাজার তারা হাতছাড়া করতে পারে না। বাংলাদেশে ১৫ বছর বয়সের নিচে ছেলেমেয়েদের সংখ্যা ৩৪ শতাংশ এবং ১৫-৬৪ বছর বয়স পর্যন্ত কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৬৫ শতাংশ, মাত্র ৫ শতাংশ ৬৫ বছরের বেশি বয়সের বৃদ্ধ মানুষ রয়েছে। তামাক কোম্পানি এ তথ্য মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করে। তারা শুধু কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর দিকে হাত বাড়ায় না, তাদের চোখ গিয়ে পড়েছে ১৫ বছরের নিচে ৩৪ শতাংশের ওপরও। অথচ তামাক সেবনকারীদের পরিসংখ্যান যারা নেন, তারা ধরে নেন যে তামাক সেবন প্রাপ্তবয়স্কদের ব্যাপার। শিশু-কিশোররা এর সঙ্গে যুক্ত হয় না। তাই যেকোনো সরকারি বা আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান দেখবেন ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে জনগোষ্ঠীর। সর্বশেষ গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (জিএটিএস) ২০১৭ অনুযায়ী, দেশে ৩ কোটি ৭৮ লাখ (৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ) মানুষ তামাক সেবন করে। অবশ্য এখন শিশু-কিশোরের (১২-১৫ বছর) মধ্যে তামাক সেবনের হার দেখা গেছে। এজন্য ভিন্ন একটি সমীক্ষা করা হয়েছে, Global Youth Tobacco Survey (GYTS) 2013 অনুযায়ী ৬ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু-কিশোর রয়েছে (ছেলে ৯ দশমিক ২ শতাংশ, মেয়ে ২ দশমিক ৮ শতাংশ)। এ পরিসংখ্যান যথেষ্ট উদ্বেগের। যদিও প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মধ্যে ধূমপানের হার মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ, অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের মধ্যে ২ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ তামাকের আগ্রাসন শুধু অপ্রাপ্তবয়স্কই খুঁজছে না, তারা মেয়েদের দিকেও হাত বাড়াচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, তামাক কোম্পানিগুলো এত অনায়াসে একটি দেশের জনগোষ্ঠীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, অথচ সরকার তা কি দেখছে না? নিশ্চয়ই দেখছে। কিন্তু তামাক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আইন থাকলেও তামাক কোম্পানির কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আইনের ব্যবহার খুব সীমিত। সরকারের কাছে তামাক কোম্পানি দুধ দেয়া গাই-গরুর মতো, দুয়েকটা লাথি দিলেও সহ্য করতে হবে। তামাক কোম্পানির ব্যবসার কারণে সরকারের রাজস্ব আসে বছরে ২২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। কিন্তু তারা বলে না যে তামাকজনিত বিপুল স্বাস্থ্য ব্যয় হচ্ছে ৩০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। কাজেই তামাক কোম্পানি রাজস্ব প্রদানের যে ধারণা তৈরি করে, তা একেবারে ভিত্তিহীন। তামাক কোম্পানি টিকে থাকার একটি বড় কারণ হচ্ছে, তারা সরাসরি সরকারের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পাচ্ছে, যা এফসিটিসির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এফসিটিসির ধারা ৫.৩ সরকারের ওপর একটি নির্দেশনার মতো, যেন তারা তামাক কোম্পানির কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ/প্রণোদনা গ্রহণ না করে। বিভিন্ন দেশে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ এত বেশি সমস্যা সৃষ্টি করছিল যে, ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এফসিটিসির তৃতীয় কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (কপ-৩)-এ ধারা ৫.৩-এর একটি গাইডলাইনও তৈরি করা হয়। অবশ্য এতে তামাক কোম্পানি মোটেও তাদের কার্যকলাপ থেকে থেমে থাকেনি। সম্প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ নিয়ে SEATCA একটি গবেষণা প্রতিবেদন Global Tobacco Industry Interference Index 2019 প্রকাশিত হয়েছে। এ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ৩৩টি দেশ তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ ঠেকাতে ৫.৩ ধারা ব্যবহার মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে, পাঁচটি দেশ হস্তক্ষেপ ঠেকাতে পেরেছে। বেশকিছু দেশে তামাক কোম্পানি তাদের দেশের নীতিনির্ধারণে হস্তক্ষেপের সুযোগ পেয়েছে। কিছু কিছু দেশে তামাক কোম্পানি রাজনৈতিক চাঁদাও দিয়েছে। নয়টি দেশে তামাক কোম্পানির কাছ থেকে রাজনৈতিক চাঁদা নেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তামাক নিয়ন্ত্রণের আইনটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সনদ ধরে হওয়ার কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মূল দায়িত্ব থাকে আইন বাস্তবায়নের। কিন্তু তামাক কোম্পানি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছাড়াও অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে প্রভাবিত করার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়। তাদের করপোরেট সোস্যাল রেসপনসিবিলিটির (সিএসআর) মাধ্যমে তারা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তবে অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তামাক কোম্পানির কাছে খুব নড়বড়ে অবস্থায় থাকে। ট্যাক্সকেন্দ্রিক নানা সুবিধা তামাক কোম্পানি ভোগ করে। বিমানবন্দরে শুল্কমুক্ত সিগারেট আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের মাধ্যমে করা এক বড় ব্যবসা। শ্রীলংকা ছাড়া পৃথিবীর সব দেশেই এ সুযোগ দেয়া আছে। তামাক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার থাকা এবং কোম্পানির বোর্ডে সরকারের প্রতিনিধি থাকা কোম্পানির ক্ষতিকর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের সরকারি উদ্যোগের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত হয়ে দাঁড়ায়। এ সমস্যা দেখা গেছে বাংলাদেশ, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে তামাকদ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন রয়েছে, সরকারের ইচ্ছাও রয়েছে। কিন্তু আইন বাস্তবায়নে বেশকিছু দুর্বলতা আছে। সংশোধনীর প্রক্রিয়া চলছে। বেশকিছু নীতি প্রণয়নের চেষ্টা চলছে। বলা বাহুল্য, এখানে তামাক কোম্পানি সরাসরি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে বাধা সৃষ্টি করছে। SEATCA প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, নীতিনির্ধারণে তামাক কোম্পানির কৌশল হচ্ছে প্রক্রিয়ার গতি কমিয়ে দেয়া, বাধা সৃষ্টি করা ইত্যাদি। বিড়ির ওপর ট্যাক্স আরোপ করতে গিয়ে বাংলাদেশ বিড়ি শিল্প মালিক সমিতির হস্তক্ষেপে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কর কমিয়ে আনতে হয়েছিল। ফলে এ সময় বিড়ির দাম বাড়েনি। ছবিযুক্ত স্বাস্থ্য সতর্কবাণী (পিএইচডব্লিউ) সিগারেট, বিড়ি, জর্দা-গুলের প্যাকেট ও কৌটায় দেয়া আইন বাস্তবায়নের একটি অন্যতম প্রধান কাজ। নিয়ম হচ্ছে, প্যাকেটের উপরের ৫০ শতাংশজুড়ে এ ছবি দৃশ্যমান থাকতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ সিগারেট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ) এ ছবি নিচের ৫০ শতাংশ ছেপে দেয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে সাময়িক অনুমতি নিয়ে ছবিযুক্ত সতর্কবাণী দিয়েছে। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলছে। এভাবে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে দুই বছর দেরি করিয়ে দিল। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি বাংলাদেশ শ্রম কল্যাণ ফাউন্ডেশনকে (বিএলডব্লিউএফ) ৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে। এটা তারা করেছে সেবামূলক কাজ হিসেবে (সিএসআর)। জাপান টোব্যাকো বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) হিসেবে আকিজ গ্রুপের একটি অংশ ১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার দিয়ে কিনে নিয়ে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, তামাক কোম্পানিতে বাংলাদেশ সরকারের নির্দিষ্ট শেয়ার আছে এবং সচিব পর্যায়ের ব্যক্তিরা বিএটিবির বোর্ডের সদস্য, যা তামাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের স্বার্থ-সংঘাত তৈরি করে। তবে আমরা আশা করছি, সরকার যেহেতু ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়বে বলে অঙ্গীকার করেছে, এসব অসংগতি দূর করেই এগিয়ে যাবে। আর মাত্র ২০ বছর হাতে আছে। আর আমাদের সামনে পড়ে আছে কোটি কোটি নতুন প্রজন্মের জীবন। জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা এবং তরুণদের রক্ষার জন্য তামাক নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি।
#তামাক খাদ্য নয়, অথচ মানুষ খাচ্ছেঃ সার্বিকভাবে তামাকদ্রব্য মূলতঃ একটি মাদকদ্রব্য।এটি সেবন মদের চেয়েও কয়েকগুণ ক্ষতিকর, এই সত্য প্রমাণে আর তর্ক করতে হয় না। জর্দা, গুল ও সাদাপাতা সরাসরি গ্রহণ করা হয় বলে এর স্বাস্থ্য ক্ষতির প্রভাব বিড়ি সিগারেটের চেয়েও অনেক বেশি । কিন্তু এই দ্রব্য সেবনের ক্ষতির দিক চোখে পড়ে না। জর্দা ও গুল ব্যবহার গ্রামের মানুষ এবং গরীব ও শ্রমিকদের মধ্যে বিশেষ করে দেখা যায়। তারা ক্ষুধার মধ্যে যেভাবে খায় তা স্বাস্থ্যের জন্যে মারাত্মক ক্ষতিকর। জর্দা, গুল ও সাদাপাতা গ্রহণ করার কারণে মুখের ক্যান্সার, কন্ঠনালীর ক্যান্সার, মুখের ও দাঁতের ক্যান্সার, মারীর ক্ষত, উচ্চরক্তচাপ ও খাদ্য নালীর ক্যান্সারসহ নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ক্ষতি বিশেষ করে কম ওজনের শিশু জন্ম হওয়া এবং মৃত শিশু জন্ম দানের কারণ হিসেবে পাওয়া যায়।সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, সাদাপাতা বা গুল তামাকজাত দ্রব্য বলেই স্বীকৃত এবং বাজারে অবাধে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে কোনটি ধোঁয়ার মাধ্যমে এবং কোনটি সরাসরি চিবিয়ে খাওয়া হচ্ছে, যাকে আমরা ধোঁয়াবিহীন বলে চিহ্নিত করি। যেটাই হোক না কেন, এই দ্রব্য মুখের মাধ্যমে অন্যান্য খাদ্য দ্রব্যের মতোই খাওয়া হয়। সিগারেট, বিড়ি ইতিমধ্যে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে এবং ক্ষতিকর বলে এর ব্যবহারে আইনী বাধ্যবাধকতা এসেছে। কিন্তু পানের সাথে জর্দা খাওয়া সামাজিক ভাবে খারাপ চোখে দেখে না। পরিবারের বড় ছোট একসাথে বসে পানের সাথে সুপারি, জর্দা, সাদাপাতাও সেবন করে। দাওয়াত অথবা যে কোন উৎসবে বিশেষ করে বিয়ের অনুষ্ঠানে পান, সুপারি জর্দার বিশেষ আয়োজন থাকে। দরিদ্ররা সময় মতো খাবার খাওয়া সম্ভব হয় না বলে, ক্ষুধা চেপে রাখার জন্য পান, জর্দা খেয়ে থাকে। জর্দা দিয়ে পান খেয়ে নিলে অনেকক্ষণ ভাত না খেয়ে থাকা যায়। অর্থাৎ এর সাথে খাওয়ার সম্পর্ক অনেক বেশি, সরাসরি যুক্ত।স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে প্রথম চুক্তি Framework Convention on Tobacco Control (FCTC) প্রণীত হয়, এতে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করে ২০০৩ সালে। তার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালে ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৫ প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে কিছু সংশোধনী এনে ২০১৩ সালে ধোঁয়াবিহীন তামাক যেমন জর্দা, গুল, সাদাপাতা খৈনী সংঙ্গা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তামাক খাদ্য নয়, কিন্তু তামাক ব্যবহারকে আমরা ‘খাওয়া’ বা ‘সেবন’ বলি। ধোঁয়বিহীন তামাক দ্রব্য জর্দা ও সাদাপাতার মুখের মাধ্যমে চিবিয়ে খেলেও এটা জীবনধারণ, পুষ্টি সাধন ও স্বাস্থ্য রক্ষা ব্যবহৃত হচ্ছে না। অথচ মানুষ খাচ্ছে এবং নানা ধরণের স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। তামাক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এই ধারণা বদলাতে হবে। তামাক খাদ্য নয়, বরং তামাক বিষের মতোই ক্ষতিকর। মানুষ বিষ খায় আত্মহত্যার জন্যে, আর তামাক আনন্দের জন্যে খায় কিন্তু বিষের মতোই মানুষকে নীরবে এবং ধীরে ধীরে হত্যা করতে থাকে। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা জানি যে খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য অনেক উদ্যোগ নেয়া রয়েছে।খাদ্য নিরাপত্তাকে বরাবরই প্রধানতম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রেখেছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নানান ধরণের কীটনাশক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ কৃষি কাজে রয়েছে, যদি ৬০ দশকের এ প্রশ্ন আসে নি। অন্যদিকে শিল্পজাত, খাদ্যের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন কারখানায় খাদ্য তৈরীতে ব্যবহৃত কাঁচামাল ব্যবহার এবং প্যাকেজিং ব্যবস্থায় রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার বেড়েছে। মানুষের খাদ্য ব্যবস্থাপনা এ ধরণের অরাজকতা মানুষকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার লংঘন হচ্ছে।দিনে দিনে স্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখিন হচ্ছে। জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল হেলথ রেগুলেশান ২০০৫ আইন পাশ করে। সরকার ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করনের জন্য আন্দোলন গড়ে তোলে এরপর জাতীয় সংসদে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ পাশ হয়। নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ (২০১৩ সনের ৪৩ নং আইন) এর সংজ্ঞা (৩) দেখি সেখানেও ‘খাদ্য’ “অর্থ চর্ব্য, চুষ্য, লেহ্য, পিয়। যেমন খাদ্য শস্য, ডাল, মৎস্য, মাংস, দুগ্ধ, ডিম ভোজ্য তেল, ফলমূল, শাকসবজি ইত্যাদি) বা পেয় যেমন- সাধারণ পানি, বায়ুবায়িত পানি, অঙ্গারিত পানি, এনার্জিড্রিংক, ইত্যাদি)-সহ সকল প্রকার প্রক্রিয়াজাত, আংশিক বা অপ্রক্রিয়াজাত আহার্য উৎপাদন এবং খাদ্য, প্রক্রিয়াকরণ বা প্রস্ততকরণে ব্যবহৃত উপকরণ বা কাঁচামাল ও যাহা মানবদেহের জন্য উপকারী আহার্য হিসাবে জীবন ধারণ, পুষ্টি সাধন ও স্বাস্থ্য-রক্ষা করিতে ব্যবহৃত হইয়া থাকে, উহার আন্তর্ভক্ত হইবে”। এবার আসি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ (২০০৯ সনের ২৬ নং আইন) প্রসঙ্গে। ভেজাল খাবার এর কথা আজকাল আমরা প্রায় শুনে আসছি। অর্থাৎ ভেজাল, নানা ধরণের রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রণ খাবারে পাওয়া যাচ্ছে ।২০০৯ সালে বাংলাদেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করা হয়। এখানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, ভোক্তা অধিকার বিরোধী কার্য প্রতিরোধ এর কথা বলা আছে। আইনের সজ্ঞা ২(৭) ‘খাদ্য পণ্য’ অর্থ মানুষ বা গবাদি পশু- পাখির জীবন ধারণ, পুষ্টি সাধন ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য ফল-মূল এবং পাণীয়সহ অন্য যে কোন খাদ্য দ্রব্য। ধূমপান ও তামাকজাতদ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ আইনের সংজ্ঞায় ২(গ) ধারায় ”তামাক জাত দ্রব্য” অর্থ তামাক, তামাক পাতা বা উহার নির্যাস হইতে প্রস্তুত যে কোন দ্রব্য, যাহা চোষণ বা চিবানোর মাধ্যমে গ্রহণ করা যায় বা ধূমপানের মাধ্যমে শ্বাসের সহিত টানিয়া লওয়া যায় এবং বিড়ি, সিগারেট, চুরুট, গুল, জর্দা, খৈনী, সাদাপাতা, সিগারেট এবং হুক্কা বা পাইপের ব্যবহার্য মিশ্রণও (mixture) ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে। বিএসটিআই (বাংলাদেশ ষ্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন) এর খাদ্য দ্রব্যের তালিকায় তামাকে বাদ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ খাদ্যের মান সংক্রান্ত যতো আইন আছে তামাক তার তালিকাভুক্ত নয়। খাদ্য নামে আমাদের সামনে যা যা আছে সবগুলো কি জীবন ধারণ, পুষ্টি সাধন ও স্বাস্থ্য-রক্ষা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে? এর মধ্যে অনেক খাদ্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত। কিন্তু সেগুলো সংজ্ঞায় খাদ্য বলে বিবেচিত। জর্দা, গুল ও সাদাপাতার বেলায় এই বিষয়ের সুরাহা করা প্রয়োজন। তামাক খাদ্য পণ্য হিসাবে বিবেচিত নয় অথচ তামাক পণ্য জর্দা, সাদাপাতা মানুষের মুখ দ্বারা চিবিয়ে খাদ্য নালীর মাধ্যমে পেটে প্রবেশ করছে। যা খাদ্য বলে বিবেচিত নয় তাও মানুষ খাচ্ছে কি ভাবে। এ পণ্য কোন আইনের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে? এগুলো খাদ্যের আশে পাশেই বা থাকছে কিভাবে?
১. শাহাদাত ও শিরক হতে বিরত থাকাঃ
জান্নাতে প্রবেশের প্রথম উপায় হলো: শাহাদাত অর্থাৎ একথার সাক্ষ্য দেয়া
যে, আল্লাহ ছাড়া আর সত্য কোন ইলাহ নেই, যিনি একক, যার কোন শরীক নেই। আর
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।
সুতরাং যে ব্যক্তি ইসলামের এ সাক্ষ্য প্রদান করবে, এর যাবতীয় আরকান পালন
করবে, আর এক অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদাত করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
‘‘যে ব্যক্তি এ কথার সাক্ষ্য দিবে যে, ‘এক অদ্বিতীয় আল্লাহ ছাড়া আর কোন
প্রকৃত ইলাহ নেই, তাঁর কোন শরীক নেই, আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল, ঈসা আলাইহিস সালাম তাঁর বান্দা ও রাসূল
এবং আল্লাহর কালেমা যাকে তিনি মারিয়ামের নিকট প্রেরণ করেছেন এবং আল্লাহর
পক্ষ থেকে রূহ, আর জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য’। আল্লাহ তাকে জান্নাতে
প্রবেশ করাবেন, তার আমল যাই হোক না কেন’’। [বুখারী ও মুসলিম]
আল্লাহ
বলেন: ‘‘নিশ্চয়ই যারা বলে, আমাদের রব আল্লাহ, অতঃপর এ কথার উপর সুদৃঢ়
থাকে। তাদের কোন ভয় ভীতি নেই, তাদের কোন চিন্তা নেই। তারাই জান্নাতবাসী,
সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এ জান্নাত তারা তাদের কৃত কর্মের ফল স্বরূপ লাভ
করবে”। [সূরা আল আহক্বাফ: ১৩-১৪]
আয়াতে উল্লেখিত الاستقامة শব্দটির
অর্থ হল: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের
আনুগত্য করে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু
আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
‘‘জান্নাত পেতে আগ্রহী নয় এমন ব্যক্তি ছাড়া আমার সকল উম্মাতই জান্নাতে
প্রবেশ করবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কে এমন ব্যক্তি আছে যে
জান্নাতে যেতে অস্বীকৃতি জানায়? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
বললেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করবে সে জান্নাতে যাবে, আর যে আমার
নাফরমানী করবে ও অবাধ্য হবে, সেই জান্নাতে যেতে অস্বীকার করে’’। [বুখারী ]
২. আসমাউল হুসনাঃ
আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নামসমূহ মুখস্থ করা এবং এ নামগুলো সম্পর্কে জ্ঞান
অর্জন করা জান্নাতে প্রবেশের একটি উপায়। আবু হুরায়রা রাদি আল্লাহ আনহু
থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘‘আল্লাহর
নিরানববইটি নাম আছে। যে ব্যক্তি এ নামগুলো গণনা করবে, সে ব্যক্তি জান্নাতে
প্রবেশ করবে’’। [বুখারী ও মুসলিম]
৩. আল কুর’আনঃ আল কুরআনের
অনুসারীগণ, যারা আল্লাহর আহল ও তাঁর খাস বান্দা, কুরআন তাদের জান্নাতে
প্রবেশের উপায় হবে। আবদুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘‘আলকুরআনের সঙ্গীকে বলা হবে: কুরআন পাঠ কর,
আর মর্যাদার উচ্চশিখরে আরোহণ কর। আর তেলাওয়াত করতে থাক। যেমন দুনিয়াতে
তেলাওয়াত করছিলে; কেননা তোমার মর্যাদা হলো কুরআনের শেষ আয়াত পর্যন্ত যা
তুমি পাঠ করবে’’। [তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাযাহ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন,
আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আরো প্রমাণিত রয়েছে যে, কতিপয় সূরা ও আয়াত জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যম।
আবু উমামা থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
বলেছেন: ‘‘যে ব্যক্তি প্রতি ফরয সালাতের পর আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে,
মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সে জান্নাতবাসী হবে’’। [নাসায়ী, তাবারানী, ইবনে
হিববান এটি বর্ণনা করেছেন ও আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন]
আনাস
রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
বলেন: ‘‘৩০ আয়াত বিশিষ্ট কুরআনের একটি সূরা, এর পাঠকের জন্য জান্নাতে না
নেয়া পর্যন্ত সুপারিশ করতেই থাকবে। সূরাটি হল তাবারাকা’’ (তথা সূরা মূলক)।
[তাবারানী এটি বর্ণনা করেছেন এবং আলবানী বিশুদ্ধ বলেছেন]
আনাস
রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি মাসজিদে কোবায় আনসার
সাহাবীদের ইমামতি করতেন। তিনি প্রতি রাকাতেই সূরা ইখলাস পাঠ করতেন। তখন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি কোন
কারণে প্রতি রাকাতে এ সূরাটি পাঠ কর? উত্তরে সে সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর
রাসূল! আমি এ সূরাটি খুব পছন্দ করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম তখন বললেন, এ সূরাটি পছন্দ করার কারণেই তুমি জান্নাতে প্রবেশ করবে।
[ইমাম বুখারী হাদীসটি সনদবিহীন বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী ও আলবানী হাদীসটিকে
উত্তম ও সহীহ বলেছেন]
৪. ইলম অর্জনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর
সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথকে
সহজ করে দেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘‘যে ব্যক্তি ইলম হাসিলের
উদ্দেশ্যে রাস্তায় বের হয়, এর বিনিময়ে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ
সুগম করে দেন’’। [মুসলিম]
৫. আল্লাহ তা’লার যিক্র: আল্লাহর
তাসবীহ (স্তুতি), তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) এবং তাকবীরের ফযীলত
সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি
বলেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
‘‘মেরাজের রাতে ইবরাহীম আলাইহিস্ সালামের সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে তিনি
বললেন, হে মুহাম্মাদ! তোমার উম্মাতকে আমার সালাম বলো এবং তাদেরকে এ সংবাদ
দাও যে, জান্নাতের মাটি সুন্দর, পানি মিষ্টি, আর জান্নাত সমতল এবং এর
বৃক্ষরাজি সুবহানাল্লাহ, আলহামদুল্লিাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু
আকবার’’। [তিরমিযী এটি রেওয়ায়েত করেছেন এবং আলবানী তাকে উত্তম বলেছেন]
৬. প্রতি সালাতের পর আল্লাহর যিক্র পাঠ:
জান্নাতে প্রবেশের উপায়সমূহের মধ্যে আরো একটি হল প্রতি সালাতের পর
আল্লাহর যিক্র পাঠ: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, গরীব
মুহাজিরগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললেন. ধনী ও
বিত্তবান লোকেরা তো আল্লাহর নিকট সুউচ্চ মর্যাদা এবং নানাবিধ নেয়ামত লাভে
ধন্য হয়ে গেল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কীভাবে? তারা
জবাব দিলেন যে, আমরা যেমন সালাত আদায় করি তারাও সালাত আদায় করে। আমরা
যেমন রোযা পালন করি তারাও রোযা পালন করে। কিন্তু তারা দান সদকা করে আমরা তা
করতে পারি না। তারা গোলাম আযাদ করে আমরা তা করি না। তখন রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: আমি কি তোমাদেরকে এমন কিছু শিক্ষা
দেব, যার দ্বারা তোমরা তোমাদের অগ্রবর্তীদের সমকক্ষ হবে, আর তোমাদের
পরবর্তীদের চেয়ে অগ্রগামী হবে? আর তোমাদের চেয়ে উত্তম কেউ হবে না, সে
ব্যক্তি ছাড়া যে তোমাদের মতই এ কাজগুলো করবে। তারা বললেন, হে আল্লাহর
রাসূল! আমাদেরকে সে কাজ শিক্ষা দিন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম বললেন, সালাতের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আল্লাহু আকবার, আর
৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করবে’’। [মুসলিম]
৭. অনুরূপভাবে অযুর পর কালিমায়ে শাহাদাত পাঠও জান্নাতে যাওয়ার উপায়। উকবাহ ইবন আমের বলেন: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমাদের কেউ সুন্দর করে অযু করার পর যদি বলে: أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له وأن محمدا عبده ورسوله তার জন্য জান্নাতের ৮টি দরজাই উন্মুক্ত করে দেয়া হবে, সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা জান্নাতে প্রবেশ করবে। [মুসলিম]
৮. لا حول ولا قوة إلا بالله এ দো‘আ হল জান্নাতের ভান্ডার:
আবু মুসা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম বলেন: আমি কি তোমাকে জান্নাতের ভান্ডার সমূহের একটি ভান্ডার
সম্পর্কে অবহিত করব? আমি বললাম: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বলেন, বলো:
لا حول ولا قوة إلا بالله অর্থ্যাৎ: ‘‘আল্লাহর আশ্রয় ও শক্তি ছাড়া আর
কারো কোন ক্ষমতা নাই’’। [বুখারী, মুসলিম]
৯. জান্নাত লাভের জন্য দো’আ করাঃ
আল্লাহর নিকট জান্নাত চেয়ে দো‘আ করলে জান্নাত তখন আমীন আমীন বলে সমর্থন
করে। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যাক্তি ৩ বার আল্লাহর নিকট জান্নাত চায়, জান্নাত
তখন বলে: হে আল্লাহ্! ঐ ব্যাক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করাও। পক্ষান্তরে যে
ব্যক্তি ৩ বার জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি চেয়ে দো‘আ করে, জাহান্নাম
বলে: হে আল্লাহ্ ঐ ব্যক্তিকে দোযখের আগুন থেকে মুক্তি দাও। [তিরমিযি,
নাসায়ী, ইবনু মাজাহ এটি বর্ণনা করেছেন, আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন]।
১০. গুনাহ মাফের প্রধান দো’আঃ
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাগফেরাত কামনার দো‘আকে
সাইয়্যেদুল্ ইসস্তিগফার বা গুনাহ মাফ চাওয়ার প্রধান দো‘আ বলে অভিহিত
করেছেন এবং জান্নাতে প্রবেশের কারণ বলে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং প্রিয়
পাঠক! দো‘আটি মুখস্থ করুন এবং সকাল সন্ধ্যা পাঠ করুন।
শাদ্দাদ ইবন
আওস রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ননা
করেন তিনি বলেন, ইস্তেগফারের প্রধান দো‘আ হলো: اللهم أنت ربي لا إله
إلا أنت خلقتني وأنا عبدك وأنا على عهدك ووعدك ما استطعت، أعوذ بك من شر ما
صنعت، أبوء لك بنعمتك عليَّ وأبوء لك بذنبي فاغفر لي فإنه لا يغفر الذنوب
إلا أنت ‘আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি লা ইলাহা ইল্লা আনতা খালাকতানি ওয়া
আনা ’আবদিকা ওয়া আন্না ’আলা ’আহদিকা ওয়া ওয়া’দিকা মাস্তাতা’তু আবু’উ
লাকা বিনি’মাতিকা ওয়া আবু’উ লাকা বিযাম্বি, ফাগফিরলী ফা ইন্নাহু লা
ইয়াগফিরুযযুনুবা ইল্লা আনতা। আ’উযুবিকা মিন শাররী মা সানা’তু, আবু’উ লাকা
বিনি’মাতিকা ’আলাইয়া, ওয়া আবু লাকা বিযাম্বি ফাগফিরলী ফা ইন্নাহু লা
ইয়াগফিরুযযুনুবা ইল্লা আনতা।”(বুখারী)
‘‘হে আল্লাহ! তুমি আমার রব।
তুমি ছাড়া আর কোন সত্য মা’বুদ নাই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ, আমি তোমার
বান্দা। আমি তোমার ওয়াদা ও অঙ্গিকারের উপর সাধ্যানুযায়ী প্রতিষ্ঠিত। আমি
অনিষ্টকর যা কিছু করেছি তা থেকে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমার
উপর তোমার যে নেয়ামত আছে তার স্বীকৃতি দিচ্ছি। তোমার নিকট আমার গুনাহের
স্বীকৃতি দিচ্ছি। সুতরাং তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও; কেননা তুমি ছাড়া আর
কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না’’।
যে ব্যক্তি বিশ্বাসের সাথে দিনে এ
দো‘আ পাঠ করে, সন্ধ্যা হওয়ার পূর্বেই যদি তার মৃত্যু হয়, তাহলে সে
জান্নাতবাসী হবে। আর যে ব্যক্তি বিশ্বাসের সাথে রাতে পাঠ করে এবং সকাল
হওয়ার পূর্বেই মারা যায়, সে জান্নাতবাসী হয়’’। [বুখারী]
১১. সালাতের প্রতি যত্নবান হওয়াঃ
সালাত হলো দ্বীনের খূঁটি। আল্লাহ আমাদের উপর দিন রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত
ফরয করেছেন। আল্লাহর নিকট প্রিয় ইবাদাত হলো তাঁর ফরয কাজসমূহ। যে ব্যক্তি
আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ফরয কাজসমূহ আদায় করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
ওবাদা ইবন সামেত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ বান্দাদের উপর পাঁচ
ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি সালাতসমূহের হকে কোন প্রকার
কমতি ও তাচ্ছিল্য না করে সঠিকভাবে সেগুলো আদায় করে, তার জন্য আল্লাহর এ
অঙ্গিকার যে, তিনি তাকে জান্নাত দান করবেন। আর যে এগুলোর ব্যাপারে কমতি ও
তাচ্ছিল্য করে তা আদায় করবে, তার প্রতি আল্লাহর কোন অঙ্গিকার নেই। তিনি
চাইলে তাকে শাস্তিও দিতে পারেন, আবার ক্ষমাও করতে পারেন’’। [হাদীসটি
মোয়াত্তায়ে মালিক, মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে
মাজায় বর্ণিত হয়েছে। আর আলবানী একে সহীহ বলেছেন]।
আল্লাহর রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজর ও আসরের দু’ ওয়াক্ত সালাতের পৃথক
মর্যাদা দিয়ে এগুলোর নাম দিয়েছেন ‘বারাদাইন’ অর্থাৎ দু’টি শীতল ওয়াক্তের
সালাত। আবু মূসা আশআ’রী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: অর্থাৎ ‘‘যে
ব্যক্তি শীতল ওয়াক্তের দুই সালাত (ফজর -আসর) আদায় করবে, সে জান্নাতে
প্রবেশ করবে’’। [বুখারী ও মুসলিম]
১২. কতিপয় সুন্নাত ও নিয়মিত
সালাত আছে যেগুলো দ্বারা ফরয সালাতগুলোর কমতি পূরণ করা হয় এবং এগুলোর
পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ আপনার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করেন। সুতরাং
সেগুলো আদায়ের ব্যাপারে যত্নবান হোন, তাহলে আল্লাহ আপনাকে হেফাযত করবেন।
উম্মে হাবীবা রাদি আল্লাহ আনহা থেকে বর্ণিত যে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন: ‘‘যে মুসলিম ব্যক্তিই ফরযের অতিরিক্ত
প্রতিদিন ১২ রাকাত সুন্নাত সালাত আল্লাহর জন্য আদায় করবে, আল্লাহ তার জন্য
জান্নাতের মধ্যে একটি ঘর নির্মাণ করবেন’’। [মুসলিম]
এ সুন্নাত
সালাতগুলোর বর্ণনা এভাবে এসেছে: ‘‘যোহরের পূর্বে ৪ রাকাআত, পরে ২ রাকাআত,
মাগরিবের পরে ২ রাকাআত, ইশার পর ২ রাকাআত এবং ফজরের পূর্বে ২ রাকাআত’’।
১৩. কোন ব্যক্তি যখন অযু করে, তখন তার জন্য ২ রাকাআত সালাত আদায় করা
সুন্নাত। এ সালাত যখন সে নিষ্ঠার সাথে ও একাগ্রচিত্তে আল্লাহর উদ্দেশ্যে
আদায় করে, তখন তার জন্য জান্নাত অপরিহার্য হয়ে যায়। উকবাহ ইবন আমের
রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম বলেছেন: ‘‘ যে ব্যক্তিই সুন্দর করে অযু করে উপস্থিত মন নিয়ে ও
একাগ্রচিত্তে দু’ রাকাআত সালাত আদায় করবে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে
যাবে’’। [মুসলিম]
১৪. ইসলামের উত্তম দিকগুলোর প্রসারঃ দ্বীন
ইসলামের উত্তম দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে: সালামের প্রসার করা, খাদ্য দান করা
এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। আর সত্যবাদীদের গুণাবলীর মধ্যে রয়েছে
তারা হল রাতের নফল সালাত আদায়কারী। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘‘তারা
রাতের কম অংশই নিদ্রায় মগ্ন থাকে। আর শেষ রাতে তারা আল্লাহর নিকট ক্ষমা
প্রার্থনা করে’’। [সূরা আযযারিয়াত: ১৭-১৮]
যারা উপরোক্ত কাজগুলো
করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। আবদুল্লাহ ইবন সালাম থেকে বর্ণিত, তিনি
বলেন: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘ হে মানব
সকল! সালামের প্রসার কর। খাদ্য দান কর। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখ।
লোকেরা ঘুমিয়ে গেলে রাতে নফল সালাত আদায় কর। তাহলে শান্তির সাথে জান্নাতে
প্রবেশ করবে’’। [তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও আহমাদ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং
আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন]।
১৫. ফজরের সালাতসহ অন্যান্য সালাতের
উদ্দেশ্যে মাসজিদে গমন করার কারণে আল্লাহ তা’লা আপনার জন্য জান্নাতে
মেহমানদারীর ব্যবস্থা করবেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে
বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘‘যে ব্যক্তি সকাল
সন্ধ্যা মাসজিদে যায়, তার জন্য আল্লাহ সকাল বিকাল যখনই সে গমন করে
জান্নাতের মধ্যে মেহমানদারীর ব্যবস্থা করেন’’। [বুখারী ও মুসলিম]
১৬. সালাতের কাতারে ফাঁকা স্থান পূরণঃ
মুসল্লীদের মাঝে যে ফাঁক দেখা যায় তা আপনি পূরণ করলে আপনার জন্য জান্নাতে
একটি ঘর তৈরী করা হয়। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘‘যে ব্যক্তি
সালাতের কাতারের ফাঁকা জায়গা পূরণ করলো, এর দরূন আল্লাহ তার মর্যাদা
বাড়িয়ে দেবেন এবং তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন’’। [তাবারানী
হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং আলবানী একে সহীহ বলেছেন]।
১৭. মাসজিদ নির্মাণ:
আপনি যদি মাসজিদ নির্মাণ করেন অথবা মাসজিদ নির্মাণে সহযোগিতা করেন, তাহলে
আল্লাহ আপনার জন্য জান্নাতের মধ্যে একটি ঘর নির্মাণ করবেন। উসমান ইবন আফফান
রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লামকে বলতে শুনেছেন: ‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য মাসজিদ তৈরী করলো,
আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ ঘর তৈরী করবেন’’। [বুখারী ও মুসলিম]
১৮. আযানের জবাবঃ
দিনরাতে পাঁচবার মুয়াযযিনের আযানের জবাব দেয়া জান্নাতে প্রবেশের আরো
একটি কারণ। উমার ইবন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘‘মুয়াযযিন যখন
আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার (২বার) বলে, তখন তার উত্তরে কেউ যদি অনুরূপ
বলে; অতঃপর মুয়াযযিন (أشهد أن لا إله إلا الله) বললে সে তার মতো (أشهد أن
لا إله إلا الله) বলে। মুয়াযযিন যখন (أشهد أن محمدا رسول الله) বলে, সেও
তাই বলে। তারপর (حي على الصلاة) বললে সে (لا حول ولا قوة إلا بالله) বলে
এবং (حي على الفلاح) বললেও সে (لا حول ولا قوة إلا بالله) বলে। তারপর
মুয়াযযিন আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার বললে সেও আল্লাহু আকবার আল্লাহু
আকবার বলে। এরপর মুয়াযযিন যখন বলে (لا إله إلا الله) তখন সেও (لا إله إلا
الله) আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে বললে জান্নাতে প্রবেশ করবে’’। [মুসলিম]
১৯. আল্লাহর আদেশ পালন ও নিষেধের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকাঃ
প্রিয় পাঠক! আপনি যদি আল্লাহর আদেশ পালন ও নিষেধের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে
আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লামকে নবী হিসাবে মেনে নেন, তাহলে আপনার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হবে। আবু
সাইদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘‘ হে আবু সাইদ! যে ব্যক্তি
আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লামকে নবী হিসাবে গ্রহণ করবে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হবে’’।
[মুসলিম]
২০. রোযাদারদের জন্য জান্নাতে একটি দরজা আছে যার নাম ‘রাইয়ান’, রোযাদার ছাড়া এ দরজা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।
সাহল ইবন সা’দ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘‘জান্নাতের ভেতর ‘রাইয়ান’ নামে একটি দরজা আছে।
কিয়ামতের দিন এখান দিয়ে রোযাদারগণ ঢুকবে। তারা ছাড়া আর কেউ এ দরজা
দিয়ে প্রবেশাধিকার পাবে না। বলা হবে: কোথায় রোযাদারগণ? তখন তারা সেখান
দিয়ে ঢুকবে। তারা ছাড়া সেখান দিয়ে আর কেউ ঢুকবে না। তারা প্রবেশ করার পর
তা বন্ধ করে দেয়া হবে। তারপর আর কেউ ঢুকতে পারবে না’’। [বুখারী ও মুসলিম]
২১. পূণ্যময় হজ্জের প্রতিদান জান্নাতঃ
ইসলামের পঞ্চম রুকন হল আল্লাহর ঘরের হজ্জ করা। এ হজ্জের প্রতিদান হলো
জান্নাত। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘‘এক ওমরাহ থেকে আরেক ওমরাহ
মধ্যবর্তী সকল গুনাহের জন্য কাফ্ফারা স্বরূপ। আর পূণ্যময় হজ্জের প্রতিদান
জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়’’। [বুখারী ও মুসলিম]
২২. আল্লাহর পথে জিহাদঃ
যার মাধ্যমে আল্লাহ তা’লা দ্বীন ইসলামকে বুলন্দ এবং সুউচ্চ করেছেন তা হলো
আল্লাহর পথে জিহাদ। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর বাণীকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে
জিহাদ করে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়।
আবু হুরায়রা
রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘‘আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর দায়িত্ব
নিয়েছেন যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর পথে জিহাদ করা এবং তাঁর কথাকে সত্য
বলে প্রমাণিত করার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়। অথবা তাকে জিহাদের সাওয়াব ও
গণীমত লাভে ধন্য করে গাজী হিসাবে ঘরে ফিরিয়ে আনেন’’। [বুখারী ও মুসলিম]
২৩. আল্লাহর পথে ব্যয়ঃ
আল্লাহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁর মুত্তাকী বান্দাদেরকে এ বলে আখ্যায়িত
করেছেন যে, তারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে। হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে
বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘‘যে
ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দান খয়রাত করে, এর দরূন তাকে
জান্নাতে দেয়া হবে’’। [আহমাদ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং আলবানী হাদীসটিকে
সহীহ বলেছেন]
২৪. কোন ব্যক্তিকে অর্থ ঋণ দিয়ে তাকে তা স্বচ্ছলতার সাথে আদায় করার সুযোগ করে দেয়াঃ
হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম বর্ণনা করেছেন: ‘‘এক ব্যক্তি মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার পর জান্নাতে
প্রবেশ করলো। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো: তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে লোকটি বললো:
আমি মানুষের সাথে কেনাবেচা করতাম। বিপদগ্রস্ত দরিদ্রদেরকে ঋণ পরিশোধের
সময় দিতাম এবং কিছু টাকা পয়সা মাফ করে দিতাম। ফলে আল্লাহ তাকেও মাফ করে
দিয়েছেন’’। [মুসলিম]
২৫. লজ্জাস্থান ও জবানের হেফাযতঃ যে
ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মধ্যস্থিত অঙ্গ(জিহ্বা) এবং দুই উরুর মধ্যস্থিত
অঙ্গের(গোপনাঙ্গ) হেফাযত করবে, আল্লাহর রাসূল তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা
দিয়েছেন।(বুখারী)
লেখক : ইউসুফ ইবন মুহাম্মাদ আল ‘উয়াইয়েদ অনুবাদ : ড. মোহাম্মাদ মানজুরে ইলাহী
৭৯খ্রিস্টাব্দ, আগস্ট মাস। ইটালির ক্যাম্পানিয়া অঞ্চল।.শহরটা ছিল আজকের দিনের নেইপলস-এর কাছাকাছি। ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি সূচনা এই চোখধাধানো নাগরিক সভ্যতাটার। একাধারে ব্যবসা, সংস্কৃতি আর বিনোদনের কেন্দ্র।অ্যাম্পফিথিয়েটার, জিমনেইসিয়াম [আদি অর্থ দ্রষ্টব্য], বন্দর আর তৎকালীন প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের শহর।.তবে এসব ছাপিয়ে উঠে আসে আরেকটা পরিচয়। প্রায় ২০,০০০ অধিবাসীর এই শহরটাতে সময়ের গতি যেন অন্য সব জায়গার চাইতে একটু বেশীই। সব সময় আবেগ, উত্তেজনা আর রোমাঞ্চের উচু তাঁরে বাধা যেন এই জায়গাটা। তারুণ্যের, আনন্দের আর যৌবনের বাধভাঙ্গা উল্লাসের এক কেন্দ্র। নিজেকে হারিয়ে যাওয়ার পর নিজেকে খুঁজে পেয়ে আবার হারিয়ে ফেলার জন্যই যেন এই শহরটা তৈরি। এই শহর মুক্তমনা আর সস্তা শরীরের। এই শহর পতিতাদের, এই শহর পতিতদের। এই শহর সমকামের, শিশুকামের, অযাচারের আর অবাধ যৌনাচারের। মদ, মাংশ আর মাৎসর্যের যতোসব আনন্দ আপনি চিন্তা করতে পারবেন আর যা কিছু চিন্তা করতে পারবেন না, সেই সবকিছু খুজে পাবার শহর হল এই পম্পেই।শুধু চাঁদের বুকে কালিমার মতো একটা উপদ্রবের মতো হল দিগন্ত আড়াল করে থাকা ভিসুভিয়াস পর্বত। প্রায় ১৫ বছর আগে এই ভিসুভিয়াসের উৎপাতেই নেইপলস উপসাগরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ভূমিকম্পের কারণে পম্পেইর ও অনেক ক্ষতি হয়েছিল। তবে পম্পেই আর পম্পেই এর চেতনাকে কোন ভূমিকম্প হারাতে পারবে না। কই কতো ক্ষয়ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও পম্পেই কি ঘুরে দাঁড়ায় নি? আবার কি গড়ে তোলেনি পুরনোর ধ্বংসাবশেষ থেকে নতুন করে? বরং আগের চেয়েও আর আকর্ষণীয় হয়ে, আরো মনোমুগ্ধকর রূপে সেজে পম্পেই উঠে দাঁড়িয়েছে। মেতে উঠেছে আনন্দ আর উচ্ছাসে। গড়ে তুলেছে প্রতিটি গলিতে গলিতে স্বাধীন নারী আর সুশীল কামুকের প্রিয় সেই উপাসনালয়, মুক্তমনা পুরুষ আর মুক্ত শরীরের আলোকিত গণিকাদের পবিত্র আশ্রয়।.আর শুধু এখানেই থেমে থাকা কেন- সত্যিকারের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী পম্পেই স্বাধীনতাকে নারীদেহে আটকে রাখে নি। কেন পুরুষের জন্য পুরুষ, নারীর জন্য নারী, নারী ও পুরুষের জন্য শিশু আর পিতা ও মাতার দেহের জন্য সন্তানের দেহও ক্ষনিকের আনন্দের জন্য উন্মুক্ত হবে না? পম্পেইর স্বাধীনতা, মুক্তদেহ আর মুক্তমনের চেতনায় কোন দ্বিমুখীতা নেই। সব উন্মুক্ত। সব জায়েজ। আনন্দ, বিনোদন আর উত্তেজনা এই শহরের দেবতাবৃন্দ।.পম্পেই ঘুমায় না, পম্পেই জেগে থাকে। পম্পেই ভয় পায় না। পম্পেই আগামী নিয়ে দুশ্চিন্তা করে না, বর্তমান নিয়ে মেতে থাকে। কই গত কয়েক মাস ধরেই তো ভিসুভিয়াস কি কি জানি গাইগুই করছে – হঠাৎ হঠাৎ মধ্যরাতে গর্জে উঠে অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে, মাঝে মধ্যেই হালকা ভূমিকম্প হচ্ছে – পম্পেই কি তাতে ভয় পেয়েছে? কেন গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তো প্রায় পুরো দিনই থেমে থেমে ভূমিকম্প হল, গত চার দিন ধরে ভিসুভিয়াসের উপরটা ধোঁয়া দিয়েই ঢেকে আছে বলা যায়। পম্পেই কি ভয় পেয়েছে? ভিসুভিয়াস কি ভেবেছে পম্পেই ভয় পাবে? পম্পেই চিন্তা করবে? এক পর্বতের হম্বিতম্বিতে পম্পেই থামবে?.হাহ! ভিসুভিয়াসের গর্জন চাপা পরে গেছে মদ আর মাংশের চিৎকারে। পম্পেই আগ্নেয়গিরির ধোঁয়া ছাপিয়ে উঠেছে মুক্তমন আর সস্তা শরীরের আনন্দে। কে হারাবে পম্পেই কে? এই প্রযুক্তিকে? এই উন্নতিকে? এই নিশ্চিন্ত বিশ্বাসকে? পম্পেই কোনদিন হারবে না। হার মানবে না… তাই না?——— প্রচন্ড শক্তিতে প্রতি সেকেন্ডে পনের লক্ষ টন গলিত পাথর, গুড়ো হয়ে যাওয়া আকরিক আর তরল আগুন ছুড়ে দেয়া হয়েছিল মাটী থেকে প্রায় ২১ মাইল উচুতে।নিঃসরিত হয়েছিল হিরোশিমায় ফেলা পারমাণবিক বোমার চাইতে এক লক্ষ গুন বেশী তাপ শক্তি। প্রথম বিস্ফোরণের সময় তাপমাত্রা পৌঁছে গিয়েছিল ৩০০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে যা এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে কেড়ে নিয়েছিল হাজারো মানুষের জীবন। আনন্দ-উচ্ছাসে মত্ত হাজারো মানুষ শুধু প্রচন্ড তাপের কারণে সৃষ্ট হওয়া থার্মাল শকে, তীব্র খিচুনিতে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে শরীর বেঁকে যাবার মত সময়টুকু পেয়েছিল। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যেই প্রকট মৃত্যুযন্ত্রণা অনুভব করার মতো সময়টুকু পেয়েছিল। তারপর আলোকিত গণিকা আর মুক্তমনা সুশীলতার কামুকরা আর তাদের শরীরগুলো চাপা পরে গিয়েছিল ২১ ফিট গভীর আগ্নেয় ছাইয়ের নিচে।.আল্লাহু আকবার !“তিনিই জীবিত করেন এবং মৃত্যু দেন। যখন তিনি কোন কাজের আদেশ করেন, তখন একথাই বলেন, হয়ে যাও”-তা হয়ে যায়।“ [গাফির, ৪৮] “তিনিই নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের উদ্ভাবক। যখন তিনি কোন কার্য সম্পাদনের সিন্ধান্ত নেন, তখন সেটিকে শুধু একথাই বলেন, “হয়ে যাও” আর তৎক্ষণাৎ তা হয়ে যায়। [আল বাকা’রা ১১৭]..——– কওমে লূতকে মানা করা হয়েছিল, সাবধান করা হয়েছিল, কিন্তু তারা তাচ্ছিল্য করে বলেছিল- “তাঁর [লূত আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম-এর] সম্প্রদায় এ ছাড়া কোন উত্তর দিল না যে, বের করে দাও এদেরকে শহর থেকে। এরা খুব পবিত্র থাকতে চায়!” [আল আরাফ- ৮২] হুদ আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম ‘আদ জাতিকে সতর্ক করেছিলেন কিন্তু তারা উদ্ধত হয়ে বলেছিল- “… তারা (‘আদ) পৃথিবীতে অযথা অহংকার করল এবং বলল, আমাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিধর কে?”[ফুসিলাত ১৫] আল্লাহ-র আযাবের আগমনের নিদর্শন দেখেও তারা নিশ্চিন্ত হয়ে বলেছিল – “(অতঃপর) তারা যখন শাস্তিকে মেঘরূপে তাদের উপত্যকা অভিমুখী দেখল, তখন বলল, এ তো মেঘ, আমাদেরকে বৃষ্টি দেবে। বরং এটা সেই বস্তু, যা তোমরা তাড়াতাড়ি চেয়েছিলে। এটা বায়ু এতে রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। [আল আহকাফ, ২৪-২৫]”..সা’মূদকে তিন দিন সময়ের কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন সালিহ আলাইহিস সালাতু ওয়াসসালাম, কিন্তু তারা তাঁকে এবং বিশ্বাসীদেরকে বিদ্রূপ করেছিল। তৃতীয় দিনে রাস্তায় নেমে এসেছিল উৎসব করতে, মেতে ঊঠেছিল নাচে গানে উচ্ছ্বাসে, আর বাড়ি ফিরতে ফিরতে নিজেরা বলাবলি করছিল কোথায় সেই শাস্তি?.কোথায় গেল সালিহ [আঃ] আর তাঁর রাব্ব-এর প্রতিশ্রুতি ! আর তারপর সালিহ [আঃ]-এর রাব্ব এবং তাঁদের রাব্ব, এবং সমগ্র সৃষ্টির রাব্ব – মালিকুল মূলক’ আল্লাহ্ আযযাওয়াজাল তাদের প্রতি প্রেরণ করেছিলেন সেই জিনিষ যার ব্যাপারে তারা প্রশ্ন করেছিল। সেই প্রতিশ্রুতি যা নিয়ে তারা সন্দেহ পোষণ করেছিল। সেই শাস্তি যা তারা সহস্র সতর্কবাণীর পরও উপেক্ষা করেছিল –.“আর ভয়ঙ্কর গর্জন পাপিষ্ঠদের পাকড়াও করল, ফলে ভোর হতে না হতেই তারা নিজ নিজ গৃহসমূহে উপুর হয়ে পড়ে রইল।যেন তাঁরা কোনদিনই সেখানে ছিল না। জেনে রাখ, নিশ্চয় সামুদ জাতি তাদের পালনকর্তার প্রতি অস্বীকার করেছিল…[হুদ ৬৭-৬৮]. আর রাহমাতুললীল আলামীন মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর উম্মাহকে জানিয়েছিলেন তাঁর ﷺ রাব্ব যা নাযিল করেছিলেন তাঁর প্রতি। তিনি ﷺ জানিয়েছিলেন কি ঘটেছিল পূর্ববর্তী জাতিদের। ঘন মেঘ দেখে তিনি ﷺ আল্লাহ-র আযাবের ভয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়তেন, কারণ পূর্ববর্তী জাতির প্রতি আল্লাহ্ আযযাওয়াজাল মেঘের মাধ্যমে আযাব প্রেরণ করেছিলেন। তিনি সতর্ক করেছিলেন, তিনি জানিয়েছিলেন কি ঘটবে যখন পূর্ববর্তী এই জাতিদের অনুসরণ শুরু করবে। আর আজ উম্মাতে মুহাম্মাদী নামধারীরা আল্লাহ্ আযযা ওয়াজালের নিদর্শন দেখেও নির্বিকার থাকে। ফেইসবুকে চেক ইন মারে আর সেলফি আপলোড করে। আল্লাহ-র আযাবের ব্যাপারে গাফেল হয়ে তাঁর নিদর্শন নিয়ে রসিকতা করে।.”(৯৭) এখনও কি এই জনপদের অধিবাসীরা এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত যে, আমার আযাব তাদের উপর রাতের বেলায় এসে পড়বে অথচ তখন তারা থাকবে ঘুমে অচেতন। (৯৮) আর এই জনপদের অধিবাসীরা কি নিশ্চিন্ত হয়ে পড়েছে যে, তাদের উপর আমার আযাব দিনের বেলাতে এসে পড়বে অথচ তারা তখন থাকবে খেলা-ধুলায় মত্ত। (৯৯) তারা কি আল্লাহর পাকড়াওয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে? বস্তুতঃ আল্লাহর পাকড়াও থেকে তারাই নিশ্চিন্ত হতে পারে, যাদের ধ্বংস ঘনিয়ে আসে।”[সুরা আল ‘আরাফ]..—– মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে আর রাহমান – এর রাহমাতের ব্যপ্তি চিন্তা করার ব্যর্থ চেস্টা করি। মাতৃগর্ভ থেকে কবর পর্যন্ত যতো নিয়্যামাত ভোগ করি সেগুলো না, আমাকে সব চাইতে অবাক করে এই সত্যটা যে এই সেলফি তোলা, রসিকতা করা, চেক-ইন মারা, যিনা থেকে শুরু করে সমকামীতাকে মেনে নেওয়া, আল্লাহ-র কালামকে শ্রাগ করে ঝেড়ে ফেলে দেয়ার চেস্টা করা, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির নামে পৌত্তলিকতায় মেতে ওঠা, “চেতনা” আর প্রজন্মের” এই পশুর চাইতেও নিকৃষ্ট বান্দাগুলোর জন্যও আল্লাহ্ আর রাযযাক, রিযক দেন। গাফুরুর রাহীম ক্ষমা করেন।.সামূদ, গোমোরাহ, পম্পেই এর অধিবাসীরা ভুলে ছিল। ‘আদ, সামূদ উপহাস করেছিল। এই ভুলে থাকা এই উপহাস, হাসিঠাট্টা, অন্ধ বিশ্বাস যে সাজানো গোছানো চেনা জীবনটা এক মুহূর্তের মধ্যে উল্টে যাবে না – আল্লাহ-র আযাব, আল্লাহ-র পাকড়াও এর ব্যাপারে এই নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়া কারো কোন কাজে আসে নি। আমাদের ও আসবে না।.“তারা কি আল্লাহর পাকড়াওয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে? বস্তুতঃ আল্লাহর পাকড়াও থেকে তারাই নিশ্চিন্ত হতে পারে, যাদের ধ্বংস ঘনিয়ে আসে।”.“তারা জোর শপথ করে বলত, তাদের কাছে কোন সতর্ককারী আগমন করলে তারা অন্য যে কোন সম্প্রদায় অপেক্ষা অধিকতর সৎপথে চলবে। অতঃপর যখন তাদের কাছে সতর্ককারী আগমন করল, তখন ঔদ্ধত্যের কারণে এবং কুচক্রের কারণে তাদের ঘৃণাই কেবল বেড়ে গেল।পৃথিবীতে কুচক্র কুচক্রীদেরকেই ঘিরে ধরে। তবে তারা [কি] পূর্ববর্তীদের দশা ছাড়া আর কোন পরিণাম আশা করছে? অতএব আপনি আল্লাহর বিধানে পরিবর্তন পাবেন না এবং আল্লাহর রীতি-নীতিতে কোন রকম বিচ্যুতিও পাবেন না। [ফাতির ৪২-৪৩]
হিন্দুদের কাফির বলা যাবেনা’: সাইয়্যেদ আরশাদ মাদানি।মরহুম হোসাইন আহমদ মাদানি (রঃ)-এর সুযোগ্য সন্তান “জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ”-এর প্রেসিডেন্ট এবং “দারুল উলূম দেওবন্দ, ভারত”-এর সিনিয়র আকাবির সাইয়্যেদ আরশাদ মাদানি সাহেব উপরোক্ত উক্তিটি করেছেন। যদিও ইতিপূর্বে “দারুল উলূম দেওবন্দ”-এর আরো একাধিক আকাবির একইরকমের উক্তি করেছিলেন।সম্মানিত শাইখের উল্লেখিত বক্তব্যের বিষয়ে ভারতবর্ষের সচেতন মুসলমানদের স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন থাকতে পারে যে, যেখানে ইসলামের চরম দুশমনদের আতঙ্ক, ইসলামের কালজয়ী কলম সৈনিক, বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের প্রসিদ্ধ একজন পুরোধা এবং বিগত শতাব্দীর ইসলামী রেনেসাঁর অগ্রপতিক “সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মাওদুদী (রঃ) এবং বর্তমান শতাব্দীর অপ্রতিরুদ্ধ ইসলামী ব্যক্তিত্ব ডা: জাকির নায়েক (দাঃ বাঃ)”-কে “দারুল উলূম দেওবন্দ”-এর অতীত ও বর্তমানের প্রসিদ্ধ আকাবিরগণ প্রকাশ্য জন সমাবেশে বারবার কাফির বলে ফতোয়া দিয়েছেন ও দিয়ে যাচ্ছেন, অথচ মূর্তি পুজক হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কেনো কাফির বলা যাবেনা? তাহলে কি ভারতবর্ষের হিন্দুরা-১- “সকল সমস্যার সমাধানকারী জীবন বিধান হিসেবে আল-ক্বোরআনকে গ্রহণ করে নিয়েছে? ২- সর্বশেষ নবী ও একমাত্র আদর্শ নেতা হিসেবে মুহাম্মদ (সঃ) কে মেনে নিয়েছে? ৩- অন্যান্য দেব দেবীর পুজা অর্চনা বাদ দিয়ে ‘মহান আল্লাহ’-কে নিজেদের একমাত্র রব তথা যাবতীয় প্রয়োজন পূরণকারী হিসেবে গ্রহণ করেছে নিয়েছে এবং দেওবন্দের আকাবির ও শাইখদের সাথে তারা একই মসজিদে নিয়মিত সালাত আদায় করতেছে? ৪- যারা ‘মহান আল্লাহ’-র সাথে নিজেদের পচ্ছন্দসই অন্যান্য দেব-দেবী ও বিভিন্ন মূর্তির পুজা করে তাদেরকে মুশরীক বলে। আমার প্রশ্ন হলো; তাহলে কি হিন্দুরা মুশরীক নহে? ৫- যারা যেকোনোভাবে আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করে তারা কি মুশরীক নহে? ৬- মুশরীকদেরকে কি কাফির বলা যাবেনা? ৭- মুশরীকরা কি কাফির থেকেও উত্তম অথবা ভারতীয় হিন্দুরা প্রকৃতি ও নীতিগতভাবে মুশরীক নহে? বাংলাদেশে বসবাসকারী কংগ্রেস পন্থী মোহতারাম আকাবির মহোদয়গণের (যারা ভারতের মাদানি পরিবারের পূতিগন্ধময় আদর্শ বাংলাদেশে অহরহ প্রচার করে বেড়াচ্ছেন) কাছ থেকে আমার উল্লেখিত প্রশ্নগুলোর সঠিক ও নির্ভরযোগ্য জবাব পাওয়ার আশা করছি।
সাধারণত যাদুকর এবং শয়তান এই
কথার উপর ঐক্যবদ্ধ হয় যে, যাদুকর কতক শিরকভুক্ত কাজ করবে অথবা প্রকাশ্য
কুফুরি কাজ করবে। এর পরিবর্তে শয়তান যাদুকরের সেবায় নিয়োজিত হবে বা অন্য
কাউকে তার অধীন করে দিবে যে তার সেবা করবে। আর চুক্তিটি হয়ে থাকে সাধারণত
যাদুকর এবং জ্বিন শয়তানের গোত্র প্রধানের সাথে । সুতরাং থাকে। আর সেই
জ্বিন অথবা শয়তান গোপনীয় তথ্য যাদুকরকে প্রদান করে, দুজনের মাঝে শক্রতা
সৃষ্টি বা উভয়ের মাঝে মুহাব্বাত সৃষ্টি করিয়ে দিয়ে থাকে বা
স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটায়। অনুরূপ আরো অনেক কিছু সম্পাদন করিয়ে
থাকে যা বিস্তারিত বর্ণনা করা হবে ইনশাআল্লাহ ষষ্ঠ অধ্যায়ে। এভাবে যাদুকর
জ্বিন ও শয়তানকে তার অধীনে নিয়ে খারাপ কাজ করে থাকে। অতঃপুর যদি জ্বিন
কখনও আনুগত্য না করে তবে যাদুকর তাবিজের মাধ্যমে সে নেতা জিনের নৈকট্য লাভ
করে এবং তার গুণ কীর্তন ও তার নিকট ফরিয়াদ করে তার (গোত্রের প্রধান জিনের)
কাছে অভিযোগ করে এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা না করে তার কাছেই
সাহায্য চায়। অতঃপর সেই জ্বিন সরদার সেই সাধারণ জিনকে শাস্তি প্রদান করে
এবং যাদুকরের আনুগত্যে বাধ্য করে।
এভাবে যাদুকর আর তার অনুগত জ্বিনের মাঝে বৈরী সম্পর্ক এবং শক্ৰতা ও
সৃষ্টি হয়, আর এই জ্বিন যাদুকরকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে বিন্দুমাত্রও দ্বিধাবোধ
করে না এমনকি তার সন্তান ও ধন-সম্পদে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে থাকে এবং
যাদুকরকেও অনেক কষ্ট দিয়ে থাকে। যেমনঃ স্থায়ীভাবে মাথা ব্যথা, ঘুম না
আসা, রাতে ভয় পাওয়া ইত্যাদি। আর যাদুকরের সাধারণত সন্তানও জন্ম লাভ করে
না। কেননা জ্বিন মাতৃগর্ভে শিশুকে মেরে ফেলে। আর এই বিষয় যাদুকরদের নিকট
প্রসিদ্ধ। এমনকি যাদুকর সন্তানের আশায় যাদু করা থেকে বিরত থাকে। এক্ষেত্রে
আমার একটি স্মরণীয় ঘটনা উল্লেখ করছিঃ
আমি এক যাদুতে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করছিলাম। যখন আমি তার উপর কুরআন
পড়ছিলাম তখন যাদুর হুকুমপ্রাপ্ত জ্বিন সেই মহিলা রোগীর মুখের দ্বারা বলতে
লাগল আমি এই মহিলার ভিতর থেকে বের হব না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কেন? তখন সে
বলল যাদুকর আমাকে মেরে ফেলবে। আমি বললাম তুই এমন স্থানে চলে যা যেখানে
যাদুকর পৌছতে পারবে না। উত্তরে জ্বিনটি বললঃ যাদুকর আমাকে খোজার জন্যে অন্য
জ্বিন প্রেরণ করবে। তখন আমি বললাম তুই সত্য ও নিষ্ঠার সাথে তাওবা করে
শিখিয়ে দিব যা তোমাকে কাফের জিনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবে। তখন সে বললঃ
“আমি মুসলমান কখনও হব না; বরং আমি সব সময় খ্রিস্টান থাকব। আমি বললামঃ
ধৰ্মগ্রহণে কোন বাধ্য করা নেই; কিন্তু তুই এখন এই মহিলা থেকে বের হয়ে যা।
সে বলল কখনও না। আমি বললাম এখন আমি তোর উপর কুরআন পড়ব যে পর্যন্ত তুই
জ্বলে না যাবি। এরপর আমি ওকে অনেক মারলাম। যার ফলে সে কাদতে লাগল এবং বলতে
লাগল যে, যাচ্ছি এখুনি যাচ্ছি।
অবশেষে আল-হামদুলিল্লাহ সেই জ্বিন মহিলা থেকে বের হয়ে চলে গেল। আল্লাহ সব কিছু থেকে পবিত্র ও মহান এটা সত্য যে, যাদুকর যত বেশি কুফুরী করবে জ্বিন তার আনুগত্য ততবেশি করবে। আর তা না হলে আনুগত্য করে না।
যাদুকর কিভাবে জিন হাজির করে?
জিন হাজির করার অনেক প্রকার
রয়েছে। আর প্রত্যেক প্রকারেই স্পষ্ট শিরক বা কুফরী জড়িত রয়েছে। সেগুলির
কতিপয় উল্লেখ করা হবে ইনশাআল্লাহ। নিম্নে আটটি পন্থা ও প্রত্যেক পন্থায়
শিরকের কি ধরণ কিছু সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করা হবে। পরিপূর্ণ বর্ণনা দেয়া
হবে না। যাতে কেউ তা শিখে ব্যবহার না করতে পারে। যার কারণে তার
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিলুপ্ত করে উল্লেখ করা হবে। আর এগুলি এজন্যেই বর্ণনা
হলো, কেননা কোন কোন মুসলমান কুরআনী চিকিৎসা ও যাদুর সাহায্যে চিকিৎসার
পার্থক্য করতে পারে না। অথচ প্রথমটি হলো ঈমানী চিকিৎসা আর দ্বিতীয়টি হলো
শয়তানী চিকিৎসা।
আর বিষয়টি আরো জটিল হয়ে যায় যখন চতুর যাদুকর স্বীয় কুফরী যাদু মন্ত্রকে চুপে চুপে পড়ে; আর যখন এর মাঝে কোন আয়াত হয় তখন তা রুগীকে স্বজোরে পড়ে শুনায় যাতে সে মনে করে তাকে কুরআন দ্বারা চিকিৎসা করা হচ্ছে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটি তা নয়। এজন্যে রুগী যাদুকরের প্রত্যেক কথা বিশ্বাস করে মানা শুরু করে। সুতরাং এখানে এই পন্থাগুলো বর্ণনার এটিই উদ্দেশ্য যাতে মুসলমানগণ ভ্ৰষ্টতা হতে রক্ষা পায় এবং উক্ত ভন্ড অপরাধীদেরকে চিনতে পারে।
যাদুকরের জিন হাজির করার পদ্ধতি – প্রথম পদ্ধতিঃ শপথ করা
যাদুকর একটি অন্ধকার ঘরে প্রবেশ
করে আগুন জ্বালায় । আগুনে তার উদ্দেশ্য মত এক ধরণের ধূপ দেয়। সে যদি
পরস্পর বিভেদ সৃষ্টি বা শক্ৰতা-হিংসা বা এমন কিছু ইচ্ছা পোষণ করে তবে আগুনে
সে দূর্গন্ধযুক্ত ধূপ নিক্ষেপ করে। আর যদি পরস্পর মুহাব্বত সৃষ্টি বা
স্ত্রীর প্রতি স্বামীকে আকৃষ্ট করা বা অন্য যাদু নষ্ট করার ইচ্ছা হয় তবে
সে আগুনে সুগন্ধযুক্ত ধূপ মিশ্রণ করে। তারপর যাদুকর নির্ধারিত শিরকী মন্ত্র
পড়তে থাকে। যাতে সে জ্বিনদের সরদারের দোহায় বা শপথ দেয়, তার মহত্বের
দোহায় দিয়ে চায়; এমন কি তার মন্ত্রে আরো বিভিন্ন ধরণের শিরক অন্তর্ভুক্ত
থাকে যেমনঃ বড় জিনের সম্মান ও বড়ত্বের বর্ণনা, তার নিকট ফরিয়াদ ও
সাহায্য প্রার্থনা ইত্যাদি।
শর্ত হলো এমতাবস্থায় যাদুকরকে নাপাক থাকতে হবে বা নাপাক কাপড় পরে থাকতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
তার কুফী মন্ত্র পাঠ শেষ হওয়া মাত্রই কুকুর বা অজগর বা অন্য কোন
আকৃতিতে ভূত-প্রেতের আবির্ভাব ঘটে। অতঃপর যাদুকর যা তার ইচ্ছা তাকে নির্দেশ
করে। আবার কখনও তার সামনে কোন কিছুই প্রকাশ পায় না। তবে সে তার একটি শব্দ
শুনে। আবার কখনও কোন কিছুই শুনে না, তবে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির কোন চিহ্নতে
যাদুর গিরা লাগায়। যেমনঃ তার চুলে বা তার কাপড়ের টুকরাই যাতে তার গায়ের
গন্ধ থাকে ইত্যাদি। এরপর সে যা ইচ্ছা সে অনুযায়ী জিনকে হুকুম করে ।
উক্তপদ্ধতিহতেনিম্নোক্তবিষয়গুলিফুটেওঠেঃ
১। জিন অন্ধকার কক্ষ পছন্দ করে।
২। জিন ধূপের গন্ধ গ্রহণ করে, যাতে আল্লাহর নাম না নেয়া হয়।
৩। এ পদ্ধতিতে স্পষ্ট শিরক হলো, জিনের দোহায় বা শপথ ও তাদের নিকট ফরিয়াদ ও সাহায্য প্রার্থনা করা।
৪ । জিন নাপাকী পছন্দ করে এবং শয়তান নাপাকের নিকটতম হয়ে থাকে।
দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ যবাই করা
যাদুকর একটি পাখি বা জন্তু বা
মুরগি বা কবুতর বা অন্য কিছু জিনের আবদার অনুযায়ী হাজির করে। সাধারণত যা
কাল রঙের হয়ে থাকে। কেননা জিন কাল রং পছন্দ করে। তারপর আল্লাহর নাম না
নিয়ে তা যবাই করে। অতঃপর কখনও সে রক্ত রুগীকে মাখায়। কখনও এরূপ না করে
পরিত্যাক্ত গৃহে বা কূপে বা মরুভূমিতে নিক্ষেপ করে। যেগুলিতে সাধারণত জিন
বসবাস করে থাকে। নিক্ষেপের সময় আল্লাহর নাম নেয় না। এরপর স্বীয় ঘরে ফিরে
এসে শিরকী মন্ত্র পড়ে। তারপর জিনকে যা ইচ্ছা হুকুম করে ।
উক্তপদ্ধতিরবিশ্লেষণঃ এ পদ্ধতিতে দু’ভাবে শিরক হয়ে থাকে।
প্রথমতঃ জিনের উদ্দেশ্যে যবাই করা। যা পূর্ব ও পরবর্তী
সকল ইমামের ঐক্যমতে হারাম; বরং তা হলো শিরক। কেননা আল্লাহ ব্যতীত কারো
নামে যবাই করা কোন মুসলমানের জন্য খাওয়া জায়েয নয়। আর যবাই করা তো
বহুদূরের ব্যাপার তা সত্বেও কোন কোন অজ্ঞরা প্রত্যেক যুগে প্রত্যেক স্থানে এ
ধরণের জঘন্য কাজ করে থাকে।
এক্ষেত্রে ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া বলেনঃ ওয়াহাব আমাকে বলেনঃ কোন এক
খলিফা একটি ঝর্ণা কাটায়। যখন সে তা প্রবাহিত করাতে চায়। সে জিনের জন্য
সেখানে যবাই করে, যাতে তারা তার পানি ভূ-গর্ভে না নামিয়ে দেয়। অতঃপর তা
লোকদেরকে খাওয়ায় । এ খবর ইবনে শিহাব আয যুহরীকে পৌছিলে তিনি বলেনঃ সে তা
যবাই করেছে তার উদ্দেশ্যে, যার উদেশ্য যবাই করা হালাল নয়; আবার তা
লোকদেরকে আহার করিয়েছে যা তাদের জন্য হালাল নয়; বরং রাসূলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিষেধ করেছেন ঐ জিনিস খেতে যা জিনের
উদ্দেশ্যে যবাই করা হয় ইত্যাদি। (আহকামুল মারজানঃ ৭৮)
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আলী বিন আবু তালেব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তার
বর্ণনায় বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ “যে
ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে যবাই করল আল্লাহ তার প্রতি লা’নত
করুন।”
দ্বিতীয়তঃশিরকীমন্ত্ৰঃ আর তা হলো, ঐ সমস্ত শিরকী কালাম যা জিন হাজির করার সময় সে উপস্থাপন করে থাকে, যা স্পষ্ট শিরক। যেমনঃ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা (রাহেমাহুল্লাহ) তার কিতাবের অনেক স্থানে উল্লেখ করেন। (আল ইবানা ফী উমুমির রিসালা)
তৃতীয় পদ্ধতিঃ নিকৃষ্টতম পদ্ধতি
এটি অতি নিকৃষ্টতম পদ্ধতি। এতে
শয়তানের এক বড় দল অংশ নেয় ও যাদুকরের খেদমত করে এবং তার হুকুম
বাস্তবায়ন করে। কেননা যাদুকর এতে সর্ববৃহৎ কুফরী ও কঠিনভাবে নাস্তিকের
পরিচয় দেয়।
এপদ্ধতিরবিশ্লেষণঃ
যাদুকর (আল্লাহর লা’নত হোক) জুতা পায়ে কুরআন মাজীদ পদদলিত করে তা নিয়ে
পায়খানায় প্রবেশ করে। অতঃপর পায়খানায় কুফরী কালাম পড়ে একটি কক্ষে ফিরে
আসে এবং জিনকে যা ইচ্ছা হুকুম করে। জিন দ্রুত তখন তার অনুসরণ করে ও হুকুম
পালন করে থাকে। আর জিন তা করে থাকে শুধুমাত্র যাদুকরের মহান আল্লাহর সাথে
কুফরী করার জন্য। এভাবে সে শয়তানের ভাইয়ে পরিণত হয় এবং স্পষ্ট
ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। যার ফলে তার প্রতি আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হয়।
এ পদ্ধতির যাদুকরের সাথে বেশ কিছু কবীরা গুনায় পতিত হওয়ার শর্তারোপ করা হয়। যেমনঃ যা কিছু উল্লেখ হয়েছে তা ছাড়াও হারাম কাজ সমূহে পতিত হওয়া, সমকামিতা, ব্যাভিচার, ধর্মকে গালি দেয়া ইত্যাদি। এসবগুলি করে থাকে শয়তানের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে ।
চতুর্থ পদ্ধতিঃ অপবিত্রতার পদ্ধতি
এ পদ্ধতিতে মালাউন যাদুকর
কুরআনের সূরা ঋতুস্রাবের (হায়েজের) রক্ত দ্বারা বা অন্য কোন অপবিত্র কিছু
দ্বারা লিখে; তারপর শিরকী মন্ত্র পড়ে, যার ফলে জিন হাজির হয়। এরপর তার যা
ইচ্ছা তাকে হুকুম করে।
এ পদ্ধতি যে স্পষ্ট কুফরী তাতে কোন সন্দেহ নেই। কেননা কোন সূরা এবং কোন আয়াতকে উপহাস করা আল্লাহর সাথে কুফরী। আর যেখানে তা অপবিত্র জিনিস দ্বারা লিখা হয়, আল্লাহর নিকট আমরা এ অবমাননা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করি এবং তার নিকট প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাদের অন্তরে ঈমানকে সুদৃঢ় করেন ও ইসলামের উপর মৃত্যুদান করেন ও নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাথে হাশর করেন। (আমিন)
পঞ্চম পদ্ধতিঃ উল্টাকরণ পদ্ধতি
মালাউন যাদুকর এ পদ্ধতিতে
কুরআনের সূরাকে উল্টা অক্ষরে লিখে থাকে। অর্থাৎ শেষ হতে প্রথম, অতঃপর শিরকী
কালাম বা মন্ত্র পড়ে, যার ফলে জিন হাজির হয় ও তাকে তার হুকুম প্রদান
করে।
এ পদ্ধতিও তাতে শিরক ও কুফর থাকার কারণে হারাম।
ষষ্ঠ পদ্ধতিঃ জ্যোতিষ পদ্ধতি
এ পদ্ধতিকে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিও
বলা হয়। কেননা যাদুকর নির্ধারিত এক তারকা উদয়ের উপেক্ষায় থাকে। অতঃপর সে
তাকে সম্বোধন করে যাদু মন্ত্র পড়তে থাকে। তারপর অন্যান্য শিরকী ও কুফরী
কালাম পড়তে থাকে। যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। তারপর সে এমনভাবে
নড়া-চড়া করে যাতে সে ধারণা পোষণ করায় যে, সে উক্ত তারকার আধ্যাত্মিকতার
ভিত্তিতে তা করছে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহ ব্যতীত তারকার ইবাদত করছে।
যদিও এ জ্যোতিষী বুঝতে পারেনা যে, তার এ কর্ম আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত ও
অন্যের মহত্ব প্রকাশ হয়। এরপর শয়তানরা তার নির্দেশে সাড়া দেয়; আর সে
মনে করে যে, এ তারকায় তাকে এসবে সাহায্য করে। অথচ উক্ত তারকার এ সম্পর্কে
কিছুই অবগতি নেই।
যাদুকররা মনে করে থাকে যে, এ যাদু আর খুলবে না যে পর্যন্ত দ্বিতীয়বার
প্রকাশ না পাবে। (এ বিশ্বাস একান্তই যাদুকরদের; কিন্তু কুরআনের চিকিৎসা
দ্বারা এ যাদু আল্লাহর ফজলে নষ্ট করা যায়।) আর সত্যই কোন কোন তারকা বছরে
মাত্র একবারই প্রকাশ পায়। সুতরাং যাদুকররা তার প্রকাশের অপেক্ষায় থাকে ও
পরে সে তারকার নিকট ফরিয়াদ ও সাহায্য কামনা করে মন্ত্র পড়তে থাকে যাতে
তাদের যাদু খুলে দেয়।
নিঃসন্দেহে এ পদ্ধতিও আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট সাহায্য প্রার্থনা ও তার বড়ত্বের প্রকাশের জন্য শিরক ও কুফুরী।
সপ্তম পদ্ধতিঃ পাঞ্জা পদ্ধতি
এ পদ্ধতিতে যাদুকর ছোট এমন একটি
বালককে হাজির করে যে, এখনও প্রাপ্ত বয়সে পৌছেনি। আর সে যেন বিনা ওযু হয়
তারপর সে বালকের বাম পাঞ্জা ধরে তার হাতে এরূপ চতুর্ভূজ অংকন করে।
অতঃপর এই চতুর্ভূজের পার্শ্বে শিরকী যাদুমন্ত্র লিখে। আর এ যাদুমন্ত্র
সে তার চার কর্ণারে লিখে থাকে। অতঃপর বালকের হাতের তালুতে চতুর্ভূজের
মধ্যখানে কিছু তৈল, একটি নীল ফুল বা কিছু তৈল ও নীল কালি রাখে । এরপর আবার
অন্য এক মন্ত্র লিখে একক অক্ষর দ্বারা এক লম্বা কাগজে, তারপর সে কাগজ
বালকটির চেহারার উপর ছাতার আকৃতিতে রাখে। তার উপর পরিয়ে দেয় একটি টুপী
যাতে তা ঠিক থাকে। তারপর বালকটিকে মোটা কাপড় দ্বারা পুরোপুরি আবৃত করে
ফেলে। এমতাবস্থায় বালকটি তার তালুর দিকে তাকাতে থাকে; কিন্তু ভিতরে
অন্ধকার হওয়ার কারণে কিছু দেখতে পায় না। এরপর মালাউন যাদুকর কঠিন
প্রকৃতির কুফরী পাঠ করতে থাকে। তারপর বালকটি হঠাৎ করে আলো দেখতে পায় ও
দেখে যে তার হাতের তালুতে একটি ছবি নড়া-চড়া করছে। অতঃপর যাদুকর বালককে
জিজ্ঞাসা করে কি দেখছ? বালক জবাব দেয় আমি আমার সামনে এক ব্যক্তির ছবি
দেখছি।
যাদুকর বলেঃ তাকে বলঃ তোমাকে যাদুকর বা পীর সাহেব এই এই বিষয়ে বলছে।
এরপর ছবিটি হুকুম অনুযায়ী নড়া-চড়া করতে থাকে। এ পদ্ধতি তারা সাধারণত
হারানো বস্তু খোজার জন্য ব্যবহার করে থাকে।
নিঃসন্দেহে এ পদ্ধতিও শিৱক, কুফর ও অবোধগম্য তন্ত্ৰ-মন্ত্রে ভরা।
অষ্টম পদ্ধতিঃ চিহ্ন গ্রহণ পদ্ধতি
এ পদ্ধতিতে যাদুকর রুগীর নিকট
হতে তার কোন চিহ্ন তলব করে। যেমনঃ রুমাল, পাগড়ী, জামা বা এমন কোন ব্যবহৃত
জিনিস যাতে রুগীর গায়ের গন্ধ পাওয়া যায়। তারপর সে রুমালের এক পাশ্বে
গিরা দেয়। এরপর চার আঙ্গুল পরিমাণ পর খুব শক্ত করে রুমালটি ধারণ করে সূরা
কাউসার বা অন্য যে কোন ছোট একটি সূরা স্বজোরে পড়ে চুপি চুপি শিরকী মন্ত্র
পড়ে। তারপর জিনকে ডাকতে থাকে ও বলতে থাকেঃ যদি তার রোগ জিনের কারণে হয়ে
থাকে তবে সে রুমাল (বা কাপড়) টি ছোট করে দাও। যদি তার রোগ বদনজরের কারণে
হয় তবে তা লম্বা করে দাও । আর যদি সাধারণ ডাক্তারী কোন রোগ হয় তবে আপন
অবস্থায় ছেড়ে দাও। এরপর সেটি পুনরায় পরিমাপ করে যদি তা চার আঙ্গুলের
চেয়ে লম্বা পায় বলেঃ তুমি হিংসুকের বদনজরে আক্রান্ত হয়েছো। যদি তা ছোট
পায় তবে বলে যে, তুমি জিনের আসরে পতিত হয়েছ। আর যদি অনুরূপ পায় আঙ্গুলই
থাকে তবে বলেঃ তোমার নিকট কিছু নেই। তুমি ডাক্তারের নিকট যাও।
এইপদ্ধতিরবিশ্লেষণঃ
১। রুগীর মধ্যে সংশয় সৃষ্টি করে দেয়া, জোরে কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে
যে, সে কুরআনের দ্বারা তার চিকিৎসা করছে অথচ সে তখনই চুপে চুপে মন্ত্র
পড়ে থাকে।
২। জিনের নিকট ফরিয়াদ ও সাহায্য কামনা এবং তাদেরকে আহবান করা ও তাদের নিকট প্রার্থনা করা। অথচ এগুলি শিরক।
৩ । জিনদের মাঝে অনেক মিথ্যা পাওয়া যায়। অতএব আপনি কিভাবে বুঝবেন যে, এ ব্যাপারে এই জিনের কথা সত্য না মিথ্যা। আমরা কোন কোন যাদুকরের কথা ও কাজকে কখনও কখনও পরীক্ষা করেছি, তাতে দেখা গেছে, সে কখনও সত্য বলেছে; কিন্তু অধিকাংশই মিথ্যা। এমনও হয়েছে যে, আমাদের নিকট কোন রুগী এসে বলেছে, তাকে যাদুকর বলেছেঃ তোমাকে বদ নজর লেগেছে। অথচ যখন তার উপর কুরআন তেলাওয়াত করা হয়েছে তখন জিন কথা বলে উঠেছে। তা আসলে বদনজর নয়। এমন অনেক অনেক ধরণের পদ্ধতি আরো রয়েছে যা আমরা জানি না।
যাদুকর চেনার উপায় ও আলামত
কোন চিকিৎসক বা কবিরাজের মধ্যে এ
সমস্ত লক্ষণ বা আলামতের কোন একটিও পাওয়া গেলে নিঃসন্দেহে বুঝা যাবে যে সে
যাদুকর। আলামতগুলি নিম্নরূপঃ
১। রুগীর নাম ও মায়ের নাম জিজ্ঞেস করা।
২। রোগীর কোন চিহ্ন গ্রহণ করা। যেমনঃ কাপড়, টুপী, রুমাল ইত্যাদি।
৩। যবাই করার জন্য কোন নির্দিষ্ট জীব-জন্তু চাওয়া, এবং তা আল্লাহর নামে
যবাই না করা। কখনও তার রক্ত ব্যথার স্থানে মাখান বা বিরান ঘর বা জায়গায়
তা নিক্ষেপ করা।
৪। রহস্যময় মায়াজাল বা মন্ত্র লিখা।
৫ । অস্পষ্ট তন্ত্ৰ-মন্ত্র ও মায়াজাল পাঠ করা।
৬। রোগীকে চতুর্ভূজ নক্সা বানিয়ে দেয়া, যাতে থাকে অক্ষর বা নম্বর।
৭। রোগীকে এক নির্ধারিত সময় এক কক্ষে (যাতে আলো প্রবেশ করে না।) লোকদের অন্তরালে থাকার নির্দেশ দেয়া।
৮ । রোগীকে এক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত যা সাধারণত ৪০ দিন হয়ে থাকে পানি
স্পর্শ করতে নিষেধ করা। এ লক্ষণ দ্বারা বুঝা যাবে যে, যাদুকর যে জিন
ব্যবহার করে সে খ্রিস্টান।
৯ । রোগীকে কোন জিনিস পুতে রাখতে দেয়া।
১০ । রোগীকে কিছু পাতা দিয়ে তা জ্বালিয়ে তা থেকে ধোয়া গ্রহণ করতে বলা ।
১১ । অস্পষ্ট কালাম বা কথা দ্বারা তাবীয বানিয়ে দেয়া ।
১২। রোগীর নিজেই নাম, ঠিকানা ও সেই সমস্যা বলে দেয়া।
১৩। ছিন্ন-ছিন্ন অক্ষর লিখে রোগীকে নক্সা বা তবিয বানিয়ে দেয়া । বা কোন সাদা পাথরে লিখে দেয়া ও তা ধুয়ে পানি পান করতে বলা ।
আপনি যদি এসব লক্ষণ জেনে বুঝতে পারেন যে, সে যাদুকর তবে আপনি অবশ্যই তার
নিকট যাওয়া থেকে সতর্ক হয়ে যাবেন নচেৎ আপনার প্রতি নবী (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বাণী প্রযোজ্য হয়ে যাবেঃ
(من أتى كا هنا فصدقه بما يقول فقد كفر بما أنزل على محمد)
অর্থাৎ “যে ব্যক্তি গণকের নিকট এসে সে যা বলল তা বিশ্বাস করল, সে অবশ্যই মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা অস্বীকার করল।” (হাসান সনদে বাজ্জার বর্ণনা করেন এবং আহমদ ও হাকেম বর্ণনা করেন, আলবানী সহীহ বলেছেন )
সূত্রঃ যাদুকর ও জ্যোতিষীর গলায় ধারালো তরবারি গ্রন্থ থেকে
যাদুকরেরা যাদু কিভাবে করে? যাদুকরের শাস্তি হলো গর্দান উড়িয়ে দেওয়া। যাদুকরকে সনাক্ত করা গেলে তাকে বাধ্য করতে হবে যেন সে যে যাদু করেছে সেটা নষ্ট করে ফেলে। তাকে বলা হবে: তুমি যে তদবির (যাদু) করেছ সেটা নষ্ট কর নতুবা তোমার গর্দান যাবে। সে যাদুর তদবিরটি ধ্বংস করে ফেলার পর মুসলিম শাসক তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিবেন। কারণ বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, যাদুকরকে তওবার আহবান জানানো ছাড়া হত্যা করা হবে। যেমনটি করেছেন- উমর (রাঃ)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: “যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তরবারির আঘাতে তার গর্দান ফেলে দেয়া।” যখন হাফসা (রাঃ) জানতে পারলেন যে, তাঁর এক বাঁদি যাদু করে তখন তাকে হত্যা করা হয়। যাদুটোনা থেকে নিরাময়ের উপায় সম্পর্কে জানতে পড়ুনঃ https://islamqa.info/bn/12918
যাদুকরেরা বিভিন্ন মন্ত্র, সংখ্যা, দুর্বোধ্য লেখা, কখনোবা কুরানের আয়াতের অংশ দিয়ে শয়তান কাফের জিনদের সাথে যোগাযোগ করে। ঐ দুর্বোধ্য লেখাগুলোতে মারাত্মক রকমের শিরকি ও কুফুরী কথাবার্তা লেখা থাকে, আর মানুষ শিরক কুফর করে জাহান্নামে যাওয়ার উপযুক্ত হলে শয়তান জিনেরা খুশি হয়। কারণ, শয়তান জিনেরা ইবলিসের অনুসারী, আর ইবলিস ও তার অনুসারীদের সাথে আদম (আঃ) ও তার সন্তানদের চিরদিনের শত্রুতা, যেইদিন থেকে আদম (আঃ) কে সেজদা করতে অবাধ্য হয়ে ইবলিস কাফের ও চির অভিশপ্ত হয়েছে। তাই, শিরক ও কুফর করে কোন মানুষ কাফের হয়ে গেলে, ইবলিস ও তার অনুসারীরা তাকে সাহায্য করে, এই সাহায্যের একটা অংশ হচ্ছে “যাদু”, যা আসলে জিনেরা বিভিন্ন কাজ করে মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করে।
ছবি পরিচিতিঃ পোস্টের ছবিটা আসলে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করার জন্য “যাদুর তাবীজ” এর ছবি, যা একজন রোগীকে রুকিয়া (শরীয়ত সম্মত ঝাড়ফুক) করার সময় জিন স্বীকার করে “যাদুর তাবীজ” কোথায় রাখা আছে বলে দেয়।
বক্স ১ – কুরানের একটা আয়াতের কিছু অংশ নেওয়া হয়েছেঃ “অতঃপর আমি কেয়ামত পর্যন্ত তাদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিয়েছি”। সুরা আল-মায়েদাঃ ১৪।
বক্স ২ – যাদের উপর যাদু করা হয়েছে তাদের নাম
বাকি আকাউকিগুলো আসলে বিভিন্ন মন্ত্র ও নাম্বার যার মাধ্যমে জিনদের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। আউযুবিল্লাহ, এর মাঝে শিরক ও কুফর রয়েছে।
এইজন্য, যাদু যে করে, যাদু যে করায় – উভয়েই কাফের ও মুর্তাদ হয়ে যায়। যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তাকে হত্যা করে ফেলা। http://ansarus-sunnah.blogspot.com/2014/06/blog-post_5.html =============================================== যাদুকরের শাস্তি হলো গর্দান উড়িয়ে দেওয়া। যাদুকরকে সনাক্ত করা গেলে তাকে বাধ্য করতে হবে যেন সে যে যাদু করেছে সেটা নষ্ট করে ফেলে। তাকে বলা হবে: তুমি যে তদবির (যাদু) করেছ সেটা নষ্ট কর নতুবা তোমার গর্দান যাবে। সে যাদুর তদবিরটি ধ্বংস করে ফেলার পর মুসলিম শাসক তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিবেন। কারণ বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, যাদুকরকে তওবার আহবান জানানো ছাড়া হত্যা করা হবে। যেমনটি করেছেন- উমর (রাঃ)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: “যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তরবারির আঘাতে তার গর্দান ফেলে দেয়া।” যখন হাফসা (রাঃ) জানতে পারলেন যে, তাঁর এক বাঁদি যাদু করে তখন তাকে হত্যা করা হয়। যাদুটোনা থেকে নিরাময়ের উপায় সম্পর্কে জানতে পড়ুনঃ https://islamqa.info/bn/12918 ======================================= সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
যাদুটোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে:
এক: যাদুকর কিভাবে যাদু করেছে সেটা আগে জানতে হবে। উদাহরণতঃ যদি জানা যায় যে, যাদুকর কিছু চুল নির্দিষ্ট কোন স্থানে অথবা চিরুনির মধ্যে অথবা অন্য কোন স্থানে রেখে দিয়েছে। যদি স্থানটি জানা যায় তাহলে সে জিনিসটি পুড়িয়ে ফেলে ধ্বংস করে ফেলতে হবে যাতে যাদুর কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়, যাদুকর যা করতে চেয়েছে সেটা বাতিল হয়ে যায়।
দুই: যদি যাদুকরকে শনাক্ত করা যায় তাহলে তাকে বাধ্য করতে হবে যেন সে যে যাদু করেছে সেটা নষ্ট করে ফেলে। তাকে বলা হবে: তুমি যে তদবির করেছ সেটা নষ্ট কর নতুবা তোমার গর্দান যাবে। সে যাদুর তদবিরটি ধ্বংস করে ফেলার পর মুসলিম শাসক তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিবেন। কারণ বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, যাদুকরকে তওবার আহ্বান জানানো ছাড়া হত্যা করা হবে। যেমনটি করেছেন- উমর (রাঃ)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: “যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তরবারির আঘাতে তার গর্দান ফেলে দেয়া।” যখন হাফসা (রাঃ) জানতে পারলেন যে, তাঁর এক বাঁদি যাদু করে তখন তাকে হত্যা করা হয়।
তিন: যাদু নষ্ট করার ক্ষেত্রে ঝাড়ফুঁকের বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে: এর পদ্ধতি হচ্ছে- যাদুতে আক্রান্ত রোগীর উপর অথবা কোন একটি পাত্রে আয়াতুল কুরসি অথবা সূরা আরাফ, সূরা ইউনুস, সূরা ত্বহা এর যাদু বিষয়ক আয়াতগুলো পড়বে। এগুলোর সাথে সূরা কাফিরুন, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়বে এবং রোগীর জন্য দোয়া করবে। বিশেষতঃ যে দুআটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হয়েছে:
(অর্থ- হে আল্লাহ! হে মানুষের প্রতিপালক! আপনি কষ্ট দূর করে দিন ও আরোগ্য দান করুন। (যেহেতু) আপনিই রোগ আরোগ্যকারী। আপনার আরোগ্য দান হচ্ছে প্রকৃত আরোগ্য দান। আপনি এমনভাবে রোগ নিরাময় করে দিন যেন তা রোগকে নির্মূল করে দেয়।)
জিব্রাইল (আঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে দোয়া পড়ে ঝাড়ফুঁক করেছেন সেটাও পড়া যেতে পারে। সে দুআটি হচ্ছে- “বিসমিল্লাহি আরক্বিক মিন কুল্লি শাইয়িন য়ুযিক। ওয়া মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হাসিদিন; আল্লাহু ইয়াশফিক। বিসমিল্লাহি আরক্বিক।”
(অর্থ- আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি। সকল কষ্টদায়ক বিষয় থেকে। প্রত্যেক আত্মা ও ঈর্ষাপরায়ণ চক্ষুর অনিষ্ট থেকে। আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য করুন। আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি।)
এই দোয়াটি তিনবার পড়ে ফুঁ দিবেন। সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস তিনবার পড়ে ফুঁ দিবেন।
আমরা যে দোয়াগুলো উল্লেখ করলাম এ দোয়াগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিতে হবে। এরপর পানি দিয়ে প্রয়োজনমত একবার বা একাধিক বার গোসল করবে। তাহলে আল্লাহর ইচ্ছায় রোগী আরোগ্য লাভ করবে। আলেমগণ এ আমলগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন। শাইখ আব্দুর রহমান বিন হাসান (রহঃ) ‘ফাতহুল মাজিদ শারহু কিতাবিত তাওহিদ’ গ্রন্থের ‘নাশরা অধ্যায়ে’ এ বিষয়গুলো ও আরো কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন।
চার: সাতটি কাঁচা বরই পাতা সংগ্রহ করে পাতাগুলো গুড়া করবে। এরপর গুড়াগুলো পানিতে মিশিয়ে সে পানিতে উল্লেখিত আয়াত ও দোয়াগুলো পড়ে ফুঁ দিবে। পানি দিয়ে গোসল করবে। যদি কোন পুরুষকে স্ত্রী-সহবাস থেকে অক্ষম করে রাখা হয় সেক্ষেত্রেও এ আমলটি উপকারী।
যাদুগ্রস্ত রোগী ও স্ত্রী সহবাসে অক্ষম করে দেয়া ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য বরই পাতার পানিতে যে আয়াত ও দোয়াগুলো পড়তে হবে সেগুলো নিম্নরূপ:
১- সূরা ফাতিহা পড়া।
২- আয়াতুল কুরসি তথা সূরা বাকারার ২৫৫ নং আয়াত পড়া।
(আয়াতটির অর্থ হচ্ছে-“আল্লাহ্; তিনি ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না, নিদ্রাও নয়। আসমানসমূহে যা কিছু রয়েছে ও জমিনে যা কিছু রয়েছে সবই তাঁর। কে সে, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পিছনে যা কিছু আছে সে সবকিছু তিনি জানেন। আর যা তিনি ইচ্ছে করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছুকেই তারা পরিবেষ্টন করতে পারে না। তাঁর ‘কুরসী’ আকাশসমূহ ও পৃথিবীকে পরিব্যাপ্ত করে আছে; আর এ দুটোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। তিনি সুউচ্চ সুমহান।) ৩- সূরা আরাফের যাদু বিষয়ক আয়াতগুলো পড়া। সে আয়াতগুলো হচ্ছে-
(অর্থ- সে বলল, তুমি যদি কোন নিদর্শন নিয়ে এসে থাক, তাহলে তা পেশ কর যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাক। তখন তিনি নিজের লাঠিখানা নিক্ষেপ করলেন এবং তৎক্ষণাৎ তা জলজ্যান্ত এক অজগরে রূপান্তরিত হয়ে গেল। আর বের করলেন নিজের হাত এবং তা সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের চোখে ধবধবে উজ্জ্বল দেখাতে লাগল। ফেরাউনের সাঙ্গ-পাঙ্গরা বলতে লাগল, নিশ্চয় লোকটি বিজ্ঞ-যাদুকর। সে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করে দিতে চায়। এ ব্যাপারে তোমাদের মতামত কি? তারা বলল, আপনি তাকে ও তার ভাইকে অবকাশ দান করুন এবং শহরে বন্দরে সংগ্রাহক পাঠিয়ে দিন। যাতে তারা পরাকাষ্ঠাসম্পন্ন বিজ্ঞ যাদুকরদের এনে সমবেত করে। বস্তুতঃ যাদুকররা এসে ফেরাউনের কাছে উপস্থিত হল। তারা বলল, আমাদের জন্যে কি কোন পারিশ্রমিক নির্ধারিত আছে, যদি আমরা জয়লাভ করি? সে বলল, হ্যাঁ এবং অবশ্যই তোমরা আমার নিকটবর্তী লোক হয়ে যাবে। তারা বলল, হে মূসা! হয় তুমি নিক্ষেপ কর অথবা আমরা নিক্ষেপ করছি। তিনি বললেন, তোমরাই নিক্ষেপ কর। যখন তারা বান নিক্ষেপ করল তখন লোকদের চোখগুলো যাদুগ্রস্ত হয়ে গেল, মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলল এবং মহাযাদু প্রদর্শন করল। তারপর আমি ওহীযোগে মূসাকে বললাম, এবার নিক্ষেপ কর তোমার লাঠিখানা। অতএব সঙ্গে সঙ্গে তা সে সমুদয়কে গিলতে লাগল, যা তারা যাদুর বলে বানিয়েছিল। এভাবে সত্য প্রকাশ হয়ে গেল এবং ভুল প্রতিপন্ন হয়ে গেল যা কিছু তারা করেছিল। সুতরাং তারা সেখানেই পরাজিত হয়ে গেল এবং অতীব লাঞ্ছিত হল। এবং যাদুকররা সেজদায় পড়ে গেল। বলল, আমরা ঈমান আনছি মহা বিশ্বের প্রতিপালকের প্রতি। যিনি মূসা ও হারুনের প্রতিপালক।)[সূরা আরাফ, আয়াত: ১০৬-১২২]
(অর্থ- আর ফেরাউন বলল, আমার কাছে নিয়ে এস সুদক্ষ যাদুকরদিগকে। তারপর যখন যাদুকররা এল, মূসা তাদেরকে বললেন: নিক্ষেপ কর, তোমরা যা কিছু নিক্ষেপ করে থাক। অতঃপর যখন তারা নিক্ষেপ করল, মূসা বললেন, যা কিছু তোমরা এনেছ তা সবই যাদু-এবার আল্লাহ এসব ভণ্ডুল করে দিচ্ছেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ দুস্কর্মীদের কর্মকে সুষ্ঠুতা দান করেন না। আল্লাহ সত্যকে সত্যে পরিণত করেন স্বীয় নির্দেশে যদিও পাপীদের তা মনঃপুত নয়।)[সূরা ইউনুস, আয়াত: ৭৯-৮২]
(অর্থ-তারা বললঃ হে মূসা, হয় তুমি নিক্ষেপ কর, না হয় আমরা প্রথমে নিক্ষেপ করি। মূসা বললেনঃ বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর। তাদের যাদুর প্রভাবে হঠাৎ তাঁর মনে হল, যেন তাদের রশিগুলো ও লাঠিগুলো ছুটাছুটি করছে। অতঃপর মূসা মনে মনে কিছুটা ভীতি অনুভব করলেন। আমি বললামঃ ভয় করো না, তুমি বিজয়ী হবে। তোমার ডান হাতে যা আছে তুমি তা নিক্ষেপ কর। এটা তারা করেছে যা কিছু সেগুলোকে গ্রাস করে ফেলবে। তারা যা করেছে তা তো কেবল যাদুকরের কলাকৌশল। যাদুকর যেখানেই থাকুক, সফল হবে না।)[সূরা ত্বহা, আয়াত: ৬৫-৬৯]
৬- সূরা কাফিরুন পড়া।
৭- সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস ৩ বার করে পড়া।
পূর্বোক্ত আয়াত ও দোয়াগুলো যদি সরাসরি যাদুতে আক্রান্ত ব্যক্তির উপরে পড়ে তার মাথা ও বুকে ফুঁক দেয় তাহলে আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাময় হবে।
[শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বাযের বিবিধ ফতোয়া ও প্রবন্ধ সংকলন সমগ্র (৮/১৪৪)] যাদু কেউ ভালো কাজে করে না। মানুষকে বশ করানো কিংবা মানুষের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো উভয়ই যাদু- যাহা সুস্পষ্ট কুফর। যাদুকরের শাস্তি হলো গর্দান উড়িয়ে দেওয়া। যাদুকরকে সনাক্ত করা গেলে তাকে বাধ্য করতে হবে যেন সে যে যাদু করেছে সেটা নষ্ট করে ফেলে। তাকে বলা হবে: তুমি যে তদবির (যাদু) করেছ সেটা নষ্ট কর নতুবা তোমার গর্দান যাবে। সে যাদুর তদবিরটি ধ্বংস করে ফেলার পর মুসলিম শাসক তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিবেন। কারণ বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, যাদুকরকে তওবার আহবান জানানো ছাড়া হত্যা করা হবে। যেমনটি করেছেন- উমর (রাঃ)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: “যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তরবারির আঘাতে তার গর্দান ফেলে দেয়া।” যখন হাফসা (রাঃ) জানতে পারলেন যে, তাঁর এক বাঁদি যাদু করে তখন তাকে হত্যা করা হয়। আঁকা-উঁকি গুলো আসলে বিভিন্ন মন্ত্র ও নাম্বার যার মাধ্যমে জিনদের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। আউযুবিল্লাহ, এর মাঝে শিরক ও কুফর রয়েছে। এইজন্য, যাদু যে করে, যাদু যে করায় – উভয়েই কাফের ও মুর্তাদ হয়ে যায়। যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তাকে হত্যা করে ফেলা।
লেখাটি
শুরু করা যাক সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাসের একটি ফেসবুক পোস্ট দিয়ে। তিনি
পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী ও দলিত অধিকার আন্দোলনের একজন এক্টিভিস্ট। তিনি
উদ্বাস্তু সংগঠন ‘জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটি ফর বাঙালি রিফিউজিস’ এর সর্বভারতীয়
সভাপতি এবং দেশান্তরিত উদ্বাস্তু মানুষের জন্য দীর্ঘ সময়কাল ধরে লড়াই
করছেন।
তিনি সম্প্রতি বাংলাদেশ ঘুরে এসে পর্যবেক্ষণ করেন এবং তার
Fact Finding Report অনুযায়ী লেখেন “দেশ ত্যাগ করে এসে সহানুভূতি কুড়োতে বা
দেশত্যাগ করার কাজটি জাস্টিফাই করতে অধিকাংশ মানুষ মুসলিম অত্যাচারের গল্প
ফাঁদেন।“
সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস লেখেনঃ
“ভবিষ্যতের কথা ভেবে
বা আশঙ্কায় হিন্দুরা বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে আসেন — এটাই সত্য। ঘর
জ্বালিয়ে দেওয়ায়, কোপ খেয়ে বা ধর্ষিত হয়ে হিন্দুরা বাংলাদেশ ত্যাগ করেন,
এটা স্বাভাবিক ঘটনা নয়, হলে ব্যতিক্রম। তবে হিন্দুদের এই ভয়টা অনেকটাই
ভূতের ভয়ের মতো, অবাস্তব। তবে দেশ ত্যাগ করে এসে সহানুভূতি কুড়োতে বা
দেশত্যাগ করার কাজটি জাস্টিফাই করতে অধিকাংশ মানুষ মুসলিম অত্যাচারের গল্প
ফাঁদেন। ওদেশে প্রিন্সিপাল হিসাবে কাজ করে, অধ্যাপক, শিক্ষক বা চাকুরী জীবন
শেষে মোটা অংকের টাকা গ্যাটে বেঁধে ভারতে পাচার করে, ভারতে বসে মুসলিম
অত্যাচারের গল্প করেন, এটাই স্বাভাবিক চিত্র। ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যা
চলছে, তা এই।
বাংলাদেশের মানুষ ও সরকার সে দেশের হিন্দুদের এই
চরিত্র জানে ও সহ্য করে। হিন্দুরা সংখ্যার অনুপাতে সে দেশে বেশি চাকরি
করেন, অধিকাংশ শিক্ষিত ও বর্ণহিন্দুরা দেশ ছাড়ার পরও এই অবস্থা, তাই
প্রশাসনের তেমন কোনো পক্ষপাত বলা যায় না। কাগজে দেখলাম বার্মায় কয়েক হাজার
রোহিঙ্গার সাথে ৮৬ জন হিন্দুকেও খুন করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের পর থেকে
বাংলাদেশে ১৬ জন হিন্দুকে খুন করার তথ্য কেউ দিতে পারবেন? ভারতে কিন্তু এই
সময়কালে ১৬০০০ মুসলমানকে এবং আরো বেশি দলিতকে খুন করার তথ্য আছে।“
এখানে তিনি ১৬ জন হিন্দু খুন হয়নি বলতে বুঝিয়েছেন ধর্মীয় কারণে বা ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে খুন হয়নি।
এবার আসা যাক, সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস মহাশয়ের আরেকটি ফেসবুকে পোস্ট
সম্পর্কে। এখানে তিনি স্পষ্ট করে লিখেছেন যে “বাংলাদেশের অধিকাংশ হিন্দু হল
মুসলিম বিদ্বেষী।“
সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস লেখেনঃ
“আমি মাস
খানেক আগে বাংলাদেশ থেকে এসেছি। দেড় মাস ছিলাম ওখানে। ঢাকা, যশোর, খুলনা —
নানা জায়গা এবং বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে মিশেছি, কথা বলেছি।
হিন্দু- মুসলমান প্রশ্নে দেশটি ভারত থেকে অনেকটা প্রগতিশীল অবস্থানে এখন।
সামাজিক ক্ষেত্রে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্র — উভয় দিকে তাঁরা এগিয়ে আছে ও আরও
দ্রুত এগোচ্ছে।
অধিকাংশ মুসলমানের মধ্যে হিন্দু বিদ্বেষ কম, নেই
বললেই চলে । আবার উলটো দিকে — অধিকাংশ হিন্দু, বিশেষ করে নিম্নবর্ণীও নমদের
মধ্যকার বেশিরভাগ মানুষ মুসলমান বিদ্বেষী । আরও সঠিকভাবে বললে বলতে হয়
নমদের মধ্যকার শিক্ষিত অংশ — যাদের পরিবারের একাংশ ইতিমধ্যে ভারতে চলে
এসেছেন। তাদের দ্বারা বাকি অংশ প্রভাবিত হছেন।
রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে —
চাকরি ও প্রশাসনে তাঁরা উল্লেখ যোগ্য সংখ্যায় আছেন। নিশ্চিতভাবে জনসংখ্যার
হারের থেকে বেশি এবং যথেষ্ট সংখ্যায় উচ্চ পদেও আছেন। রাষ্ট্র বিরূপ হলে
এটা সম্ভব হতো না।
গণ্ডগোল ও নির্যাতন হয় না, এমন নয়, কিন্তু
মুসলমান দুষ্কৃতির তুলনায় সেখানে হিন্দুদের পাশে দাঁড়ানো মুসলমানের সংখ্যা
অনেক বেশি । আশানুরূপ না হলেও প্রশাসন অনেকটাই নিরপেক্ষ।
ব্যবসা
-বানিজ্য হিন্দুরা ভালই করে। তবে রাজনীতিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব কম। একটা
রক্ষাকবজ দরকার, সে দাবিও সেখানে উঠেছে। মনে হয় সেখানে হিন্দুদের রাজনৈতিক
কৌশলেও ভুল আছে। একটা দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য তাদের গুরুত্বহীন করেছে।
আমার বলার এই যে, সমস্যা থাকলেও তা মোটেই দেশ ত্যাগ করার মত নয় । ভারত সরকার কূটনৈতিক পদ ক্ষেপ নিয়ে এই সমস্যা টুকু মেটাতে পারে।
আমি যখন বাংলাদেশে ছিলাম, তখন বি জে পি-র বর্তমান সভাপতি মিঃ ঘোষ ওখানে
গিয়েছিলেন। আমি কিছু ওখানকার হিন্দু নেতাদের তাঁর সাথে যোগাযোগের তোড়জোড়
দেখেছি এবং শুনেছি। অনেক কথা তাদের বলতে শুনেছি, একটি সংগঠন তৈরি হয়েছে বলে
জানি। তাদের কথা এবং ক্রিয়াকাণ্ড আমার কাছে ভাল লাগেনি। এখন আবার রাহুল
বাবু গেলেন। কলকাতায় বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর নির্যাতন নিয়ে সেমিনার হচ্ছে
বিশেষ বিশেষ বক্তাদের নিয়ে। ফেসবুকেও আর এস এস-এর বাংলাদেশের লোকজনের
প্রতিক্রিয়া দেখছি।
শুনছি পশ্চিমবঙ্গ নাকি বি জে পি-র পরবর্তী
টার্গেট। সেটার জন্য বাংলাদেশে একটা সাম্প্রদায়িক গণ্ডগোল এখানে তাদের জন্য
সুশীতল হাওয়া এনে দিতে পারে। তাই সবাইকে একটু সাবধান থাকলে ভাল হয়।“
এবার দেখা যাক সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস মহাশয়ের ব্লগ “Sukriti Ranjan Biswas’
diary” থেকে “ঢাকায় হিন্দুরা” শীর্ষক একটি পোস্ট, তিনি লেখেনঃ
“ঢাকায় এসে উত্তরায় ছিলাম।এক জামাই-মেয়ে থাকে। জামাই উকিল, ভাইঝি ল‘ এ ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর। বিচারকের চাকরির জন্য লিখিত পরীক্ষায় পাশ
করেছে এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে বললো — চাকরি পেয়ে যাবে। তাদের কর্মজীবন,
সামাজিক জীবন — এসবের মধ্যে হিন্দু বলে সমস্যা হয় কিনা জানতে চাই। তারা
বললো — কোনো সমস্যা নেই, নিজের দেশে আছে, ভালো আছে। বিল্ডিংয়ে ১০টা ফ্লাট, ৩
টি হিন্দু পরিবার থাকে। ভাইঝি সারাদিন একা থাকে, কোনো দুশ্চিন্তা হয় না
বলে জানালো। কলকাতায় একই বিল্ডিংয়ে বাস করা অনেক দূরের ব্যাপার, হিন্দু
পাড়া/এলাকায় কোনো মুসলমানকে কেউ বাড়ি ভাড়া দেবে না।
আরেক মেয়ে-
জামাই থাকে যাত্রাবাড়ী, এখন সেখানেই আছি। জামাই কলেজে পড়ায়, ভাইঝি
হাইস্কুলে। নাতি পড়ে ইঞ্জিনীয়ারিং। বললাম, পাড়ায় আর কতঘর হিন্দু আছে? বললো,
নেই, কাউকে তেমন জানে না। নাতিটা প্রাথমিক থেকে এই অঞ্চলে, আছে, পড়েছে।
ওর দুই যমজ বোনও ১১/১২ ক্লাসে পড়ে। ওরা ৫ জন হিন্দু হিসাবে কোনো সমস্যা
জানে না। ভালো থাকে, ভালো আছে।“
সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস মহাশয়ের লেখা থেকে স্পষ্ট যে হিন্দুরা সেখানে ভালো
আছে এবং সেখানে তাদের ধর্মীয় কারণে কোন সমস্যায় পড়তে হয় না ।
এবার
দেখা যাক সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস মহাশয়ের ব্লগ “Sukriti Ranjan Biswas’
diary” থেকে আরেকটি ব্লগ পোস্ট “পূর্ব বঙ্গের হিন্দুরা কেন দেশত্যাগ করেন
(শেষ কিস্তি)” শীর্ষক একটি পোস্ট এর খানিকটা চুম্বক অংশ, তিনি লেখেনঃ
“আবুল মনসুর আহমদের (সচেতন রাজনীতিক বলে তথাগতবাবু তার বইয়ে পরিচয় উনার
পরিচয় দিয়েছেন) কিছু লেখা তথাগতবাবু উদ্ধৃত করেছেন, ” এটা ঐতিহাসিক সত্য
যে, পূর্ববাংলায় অন্যান্য স্থানের তুলনায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা খুবই কম
হইয়াছিল — একরূপ হয় নাই বলিলেও চলে। কিন্তু একটু তলাইয়া দেখিলেই বোঝা যাইবে
যে, পূর্ব বাংলার হিন্দুদের মধ্যে বাস্তুত্যাগের হিড়িক পড়িয়াছিল।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়ে নয়, অন্য কারণে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রনায়ক ও
মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের অন্তঃসারশূন্য ‘ ইসলামী রাষ্ট্র ‘ ও শরিয়তি শাসনের
ভয়ে হিন্দুরা সত্যিই ঘাবড়ে গিয়েছিলো। জানের ভয়ে নয়, মানের ভয়ে। ধর্ম ও
কালচার হারাইবার ভয়ে। অর্ধ শতাব্দী ধরিয়া যে হিন্দুরা দেশের আজাদীর জন্য
জান-মাল কোরবাণী করিয়াছে স্বাধীন হবার পরে তারাই নিজেদের ধর্ম ও
কৃষ্টি-সংস্কৃতি লইয়া সসম্মানে দেশে বাস করিতে পারিবে না, এটা মনের দিক
হইতে তাদের জন্য দুঃসহ।……… পাকিস্তানের রাষ্ট্রনায়কেরা শুধুমাত্র দাঙ্গা
হাঙ্গামাহীন শান্তি স্থাপন করিয়াই মনে করিয়াছিলেন তাহাদের কর্তব্য শেষ হইলো
“।
অর্থাৎ তথাগতবাবু বাংলাদেশের হিন্দুদের চরিত্রের দুর্বলতা এবং
দেশত্যাগের মূল কারণ জানেন। তা তিনি প্রকাশ করেছেন এবং তাদের ভয় দেখিয়েছেন,
আতংকিত ও সন্ত্রস্ত করার চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ ঘুরিয়ে দেশত্যাগে উৎসাহ
দিয়েছেন। তারা এই ভয়ঙ্কর খেলায় মেতেছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ ক্ষমতা দখলের
স্বপ্ন নিয়ে। এজন্য তারা যে মরীয়া, সে কথা ঘোষণা করে চলেছেন। তারা হয়তো
ভাবছেন বাংলাদেশে দাঙ্গা হাঙ্গামা সৃষ্টি হলে এবং উদ্বাস্তু স্রোত এপার
বাংলায় তাদের পক্ষে সমর্থনের ঢেউ বয়ে আনতে পারে।“
এখানে তথাগতবাবু হলেন তথাগত রায়, একজন উগ্র হিন্দুত্ববাদী ও বিজেপি নেতা।
এখানে তিনি তথাগত রায় এর লেখা “যা ছিল আমার দেশ” নামে নানা অসত্য ও
অর্ধসত্য মুলক বই এর কথা বলছেন।
অবশ্য তথাগত রায় তার বইয়ে স্বীকার
করেছেন যে, বর্তমানকালে সে দেশের হিন্দুদের দেশত্যাগের কারন ‘মনস্তাত্তিক’।
এ বই-য়ের বিকৃত তথ্য ও ব্যাখ্যার বিরোধীতা করে সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস মহাশয়
একটি পুস্তিকা লিখেছেন- ‘বঙ্গভঙ্গ- দেশত্যাগ-দাঙ্গা’।
লেখাটি পড়লে
স্পষ্ট বোঝা যায় যে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখলের জন্য একটি রাজনৈতিক দল
বাংলাদেশের হিন্দুদের ভয় দেখায়, আতংকিত ও সন্ত্রস্ত করার চেষ্টা করে এবং
দেশত্যাগে উৎসাহ দেয়।
এবার আসা যাক শ্রী হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের
আত্মজীবনী ধাঁচের একটি বই থেকে নেয়া চুম্বক অংশ সম্পর্কে, যিনি ১৯৪৭ সালের
পর পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলার জেলা প্রশাসক হিসেবে শরণার্থীদের পূনর্বাসনে
কাজ করেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ‘উদ্বাস্তু’শিরোনামে বিশাল এক বই লিখে
ফেলেছেন। শ্রী হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেনঃ
”পুর্ব অঞ্চলে কিন্তু
স্বাধীনতার পর, যখন দেশ বিভাগ হয়ে গেল, অবস্থা ভিন্ন রূপ নিল। এখানে
দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধল না। বরং পুর্ব হতে যেখানে দাঙ্গার জের চলছিল তা
স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। কলিকাতার অবস্থা এই প্রসঙ্গে বিশেষ
উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে দীর্ঘ এক বৎসরব্যাপী
দাঙ্গার ওপর উভয় সম্প্রদায় যবনিকা টেনে দিয়েছিল। তাই একসময়ে মনে
হয়েছিল পুর্বাঞ্চলে দেশবিভাগ হওয়া সত্ত্বেও হয়ত শান্তি অক্ষুন্ন থাকবে।
অন্তত প্ৰথম দিকে আপাতদৃষ্টিতে শান্তি অক্ষুন্নই ছিল। তাই যদি হয় তবে এত
মানুষ পুর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করে চলে আসে। কেন? এই প্রশ্ন সেদিন আমার মনে
উদয় হয়েছিল। নিজের দেশ ছেড়ে স্বেচ্ছায় এত কষ্ট বরণ করবার কোন সঙ্গত
কারণ আছে কি ? .
আমি গিয়েছিলাম প্রশাসনিক কাজে আলিপুরদুয়ারে। সেটি
জেলার পুর্বপ্রাস্তে অবস্থিত। যে ভদ্রলোক সঙ্গে এসেছিলেন তাকে জিজ্ঞাসা না
করে পারলাম না- এরা দেশত্যাগ করে এমনভাবে চলে আসছেন কেন তার খবর নিয়েছেন
কি ?
তিনি বললেন,- নিয়েছি বৈকি? তবে তার উত্তরটা আমি আর দিই কেন?
এদের মুখেই শুনুন না। এই বলে নিকটে উপবিষ্ট একটি ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয়
করিয়ে দিলেন। তিনি নিজের যে পরিচয় দিলেন, তা হতে জানা গেল, তিনি ছিলেন
বগুড়া জেলার গ্রামাঞ্চলের এক ডাক্তার। বর্ধিষ্ণু পরিবার, প্ৰজাবিলি জমি আর
খাস জমি কিছু ছিল। সব ছেড়ে দিয়ে সম্প্রতি চলে এসেছেন।
আমার সঙ্গী
তাকে উদ্দেশ করে বললেন,-দেখুন, এই ভদ্রলোক জানতে চান, দেশে তো কোন গোলমাল
নেই, তবু কেন আপনারা দেশ ছেড়ে চলে এলেন?… তিনি যে কাহিনী বললেন তা
সংক্ষেপে এই দাড়ায়। বাড়ীতে মোটা চালের অভাব না হলেও এরা সরু চাল বাজার হতে
বরাবর কিনে খেতেন। এই সূত্রেই স্বাধীনতার পরের একদিনের তিক্ত ঘটনার কথা
বললেন।
সেদিন পুরাতন পরিচিত মুদির দোকানে গিয়ে এক বস্তা চাল
কিনলেন। পাওনা মিটিয়ে দিয়ে উঠতে যাবেন, এমন সময় প্রতিবেশী কালু মিঞা এসে
হাজির। তিনি একজন স্থানীয় মোক্তার। তিনিও মুদির দোকানে এসেছেন সরু চালের
খোজে। দুৰ্ভাগ্যক্ৰমে দোকানে তখন এক বস্তা মাত্ৰ মিহি চাল ছিল এবং তা
ইতিমধ্যেই বিলি হয়ে গেছে। তিনি নাকি তখন তাই শুনে মুদিকে বললেনঃ
–তাই নাকি ? তাহলে ওই বস্তাটাই আমাকে দাও।
ভদ্রলোক তখন প্ৰতিবাদ করে বললেন, তিনি যেহেতু বস্তাটা আগেই কিনে ফেলেছেন,
এমন কি দামও মিটিয়ে দিয়েছেন, কাজেই সেটা কি করে হয় ? কিন্তু তাতে কোন ফল
হলো না। হুঙ্কার দিয়ে কালু মিঞা নাকি বললেনঃ
আলবৎ হয়। একি হিন্দুস্থান পেয়েছ? বলে জোর করেই বস্তাটা কেড়ে নিয়ে চলে গেলেন।
এই কাহিনী বলতে বলতে, মনে হল, ভদ্রলোকের উত্তেজনা যেন আরও বেড়ে চলেছে।
তার মনের দুঃখের আবেগে তিনি আরও কিছু কথা বলে চললেন যা আমাদের বর্তমান
আলোচনায় খুব প্রাসঙ্গিক হবে, তাই যতদূর স্মরণ হয় তার নিজের মুখেই সেটা
বলতে চেষ্টা করব। তিনি বলতে শুরু করলেনঃ
–এমনকি আর করেছে বলুন,
মারধোর তো করে নি। তবে কি জানেন, আমার চামড়া একটু পাতলা তাই সেদিন মনে
ভারি আঘাত লেগেছিল। তবু দেশের ভিটেমাটি ত্যাগ করতে মায়া হল। তাই তখনও রয়ে
গেলাম! ভদ্রলোক থামলেন না, আরও বলে চললেনঃ
–কিছুদিন পরে এক সন্ধ্যাবেল বাড়ীর বার হতে জোর গলায় ডাক শুনলাম। –কর্তা, বাড়ী আছ। হে ?
ভাবলাম কে বুঝি চেনাজানা মাতব্বর মুসলমান প্রতিবেশী এসেছে। বাইরে গিয়ে
দেখি, আমারই বহু কালের এক পুরাতন প্ৰজা এসে হাজির। এক গাল হেসে বললঃ
–কর্তা, ইংরেজ চলে গেছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমাদের পাকিস্তান হয়েছে। তাই দোস্তানি করতে এলাম।
তার এই উঁচু সুরে কথা আর গায়ে-পড়া ভাব দেখে আমার মনে মনে বেশ রাগ হল।
আগে দেখা হলে এরাই দশ হাত দূর থেকে “অন্তত দশবার সেলাম ঠুকত। কিন্তু এখন যে
পাকিস্তান। কাজেই মুখে খুশির ভান করে বললাম,
-তা বেশ।
সে
তখন বলল,-তা বাইরে দাড়িয়ে কেন কর্তা, ভিতরে চলো। এই বলে বাড়ীখানা যেন
তারই সম্পত্তি এমন ভাব দেখিয়ে একরকম আমাকে টেনে নিয়ে ভিতরে চলল।
বৈঠকখানায় নয়, একেবারে অন্দরে শোবার ঘরে। দিব্যি আরাম করে বিছানায় বসে
আমাকে একরকম জোর করে পাশে বসিয়ে বললঃ
-কর্তা, এখন পাকিস্তান হয়ে গেছে। মনে রেখ, আমরা আর ছোট নই। ভুলে যেও না, এখন থেকে সমানে সমান আমাদের সঙ্গে মিতালি করতে হবে।
কাহিনী বলা এখানে শেষ হয়ে গেল। এর পর ভদ্রলোক একটু থেমে রীতিমত উত্তেজিত হয়ে, আমাদের দিকে চোখ রাঙিয়ে বললেনঃ
–কি মশাই, এরপরেও কি পাকিস্তানে থাকতে বলেন?”
[শ্রী হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়, উদ্ধাস্তু, সাহিত্য সংসদ, ১৯৬০, পৃ. ১১-১৫]
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে পরিষ্কার যে যারা পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করে আসছিল
তারা পাকিস্তান হবার পর সংখ্যাগুরু মুসলিম সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গির
পরিবর্তন হেতু এখন তাদের সেখানে আগের মত মান-ইজ্জৎ নিয়ে বাস করা সম্ভব
নয়, এই তাদের ধারণা হয়েছে। পূর্বের পরিবেশে সমাজে যে সম্মান পেতে তারা
অভ্যস্ত, সেটা তারা এখন পায় না ।
পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশ থেকে আসা
উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের উত্তরাধিকারদের অনেকেই হয়তো ভুলে গেছেন যে প্রায় ২০০
বছরের পরাধীনতার সময়ে তাদের সমাজের একটা বিরাট প্রভাবশালী একটা অংশ শাসক
ইংরেজের সহযোগী ছিলেন শুরু থেকে। পূর্ববঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের
ওপর জমিদারির মাধ্যমে যে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার, নিপীড়ন ও বেইজ্জতি
তারা চালিয়েছেন সেটার সম্মিলিত ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে জমা হয়ে ছিল তখন। সেই
সব অত্যাচারের প্রতিক্রিয়া যে বিভিন্ন উপায়ে হতে পারে সেটা যারা উপলব্ধি
করেছেন, তারা যে নিজ দায়িত্বে দেশান্তরী হয়েছেন সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
এবার আসা যাক আরেকটি লেখাতে, এই লেখাটি পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক সচিব পি এ
নাজির এর স্মৃতিচারণ মূলক বই থেকে নেয়া। তিনি পাকিস্তান আমলে এসডিও হিসেবে
সরকারী চাকুরীতে জয়েন করে নাটোরে পোস্টিং পান। তার অভিজ্ঞতায় উঠে আসে
শিক্ষিত হিন্দুদের দেশত্যাগের চিত্র। ঘটনা ১৯৫৬ সালের শেষ ভাগ।
পি এ নাজির সাহেব লেখেনঃ
”মহকুমার কার্যভার গ্রহণ করার পর সরকারী কাজের বাইরে প্রথম যে কাজ করব ঠিক
করলাম তা হলো মহকুমা শহরের সবকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন। আছেই মাত্র
তিনটি হাইস্কুল। একটি অতি সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে- জিন্নাহ স্কুল।
দ্বিতীয়টি মহারাজা স্কুল এবং তৃতীয়টি বালিকা স্কুল। জিন্নাহ স্কুল কাছারির
কাছেই। একদিন গেলাম সেখানে। প্রধান শিক্ষক বেশ মার্জিত শিক্ষাবিদ। স্কুলের
পরিবেশ দেখে মনে হলো শিক্ষকমন্ডলী দায়িত্ব-সচেতন।
পরদিন গেলাম
মহারাজা স্কুলে। প্রধান শিক্ষক বেশ ভারিক্কি কিসিমের লোক, একটু যেন
লা-পরওয়া গোছেরও। ক্লাস রুমগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ছেলেদের দু’একটা প্রশ্নও
করলাম। খুব মামুলি ধরনের যেমন- নাম কি, বাড়ী কোথায়, বাপ কী করেন? ইত্যাদি।
দেখলাম শিক্ষকদের মধ্যে একমাত্র আরবী শিক্ষকই মুসলমান, বাকী সবাই হিন্দু।
সবিস্ময়ে একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, সামনে বেঞ্চ খালি থাকা সত্ত্বেও সেখানে
মুসলমান ছাত্রদের বসতে দেয়া হয়নি। যে গুটিকয়েক মুসলমান ছাত্র স্কুলে আছে
তাদের স্থান চতুর্থ ও পঞ্চম সারিতে। প্রতিটি ক্লাসে একই অবস্থা।
বৃথা সময় নষ্ট করতে চাইলাম না। ক্লাস রুম থেকে সরাসরি চলে এলাম শিক্ষকদের
কমন রুমে। কয়েকটি বইয়ের আলমারী। আলমারীগুলোর মাথার উপর দেওয়ালে টাঙ্গান
রয়েছে বেশ কতগুলো লাইফ-সাইজ রঙিন ছবি। এতে ছিলো রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ,
গান্ধী, সুভাস এবং মহারাজা। হেড মাস্টার সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কায়েদে
আজমের ছবি কোথায়? জবাব পেলাম, ‘ওটা আমাদের স্কুলে নেই।’ শুধু মাথাটায় নয়,
সত্যি বলতে কি, সারা শরীরে উষ্ণ রক্ত বহু আগে থেকেই সঞ্চালিত হচ্ছিল
অত্যন্ত দ্রুত গতিতে। কিন্তু সর্বশেষ প্রশ্নের জবাব শুনে রক্তের সে গতি আরো
বহু গুণ বেড়ে গেল। বুঝতে পারলাম আর এখানে থাকা নিরাপদ হবে না। কি থেকে কি
ঘটে যায় কে জানে! চলে এলাম।
কিন্তু আসার সময় হেড মাস্টার সাহেবকে
সংযত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে আমলাতান্ত্রিক কায়দায় বললাম, ‘আমি পরশু আবার আপনার
স্কুলে আসব। বাবায়ে কওমের অর্থাৎ আমাদের সবার বাবার ছবিটা এই রুমে দেখতে
চাই এবং কাল থেকে কওমী ঝান্ডা সমবেত জাতীয় সঙ্গীতের সাথে উত্তোলন করতে
হবে।পরদিন আমাকে একটু অবাক করে দিয়েই মহারাজা স্কুলের হেড মাস্টার সাহেব
আমার বাংলোয় এলেন। কাল তাকে বলে এসেছিলাম যে, পরশু আমি তার স্কুলে যাবো।
তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে সেই দাওয়াত দিতে এসেছেন। তার এই আচরণ আমার খুব
ভালো লাগলো।
পরদিন নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে গেলাম। স্কুল মাঠে ১৯৪৭
সালের পর এই প্রথমবারের মতো জাতীয় পতাকা উড়ছে। আমাকে ছেলেরা অভ্যর্থনা করল
‘ব্রতচারী’ গান শুনিয়ে। শিক্ষক কমন রুমে এলাম। দেখলাম, কায়েদে আজমের ছোট্ট
মানের ছবির ফ্রেমটা খুব উচুতে স্থাপন করে একটা রুমাল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে
এবং একটা রশি লাগিয়ে রুমালটা টানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাকে পর্দা
উন্মোচন করার জন্য অনুরোধ করা হলো। আমি রশি টানলাম। সবাই করতালিতে কামরাটা
মুখর করে তুললো। ফ্রেমের মধ্যে ছবিটা পোস্ট কার্ড সাইজের।
এবার
বক্তৃতার পালা। কিছু বলতে হবে। বললাম, ‘যে গতিতে আপনারা অগ্রযাত্রা শুরু
করেছেন। তাতে আমি খুব খুশী হয়েছি। মনে হলো তারাও খুব বেশী খুশি হয়েছে
এসডিওকে খুশী দেখে। কিন্তু তারা এটা মোটেও আচ করতে পারেনি যে, এই ব্যাটা
এসডিও কাল আবার স্কুল বসার সময় সশরীরে এসে হাজির হবেন।
পরদিন সকাল
ঠিক দশটায় গিয়ে মহারাজা স্কুলে উপস্থিত হলাম। স্কুলের ত্রি-সীমানার কোথাও
জাতীয় পতাকার নাম নিশানা পাওয়া গেল না। এতে অবশ্য আমি অবাক হলাম না।
শিক্ষকদের কমন রুমে গিয়ে ঢুকলাম। ‘কায়েদে আজম’ উধাও। এটাও অপ্রত্যাশিত ছিল
না আমার কাছে। জিজ্ঞেস করলাম হেড মাস্টার সাহেবকে, ‘ছবিটা কোথায় গেল? কোন
উত্তর পেলাম না। কারো মুখে রা নেই। সবাই হতচকিত ও বিহবল হয়ে পড়েছে। এরকম
একটা ঘটনা বাস্তবে ঘটতে পারে এটা যেন তারা কল্পনাও করতে পারেননি।
এই
নীরবতা ভঙ্গ করে আমার এক নতুন আর্দালী এক পানের দোকানদারের হাত ধরে প্রায়
টেনে হেচড়ে আমার সামনে হাজির করলো। ব্যাপার কি? জানতে চাইলাম। সে যা বলল তা
হলো কাল যে ছবিটা এখানে টাঙ্গানো হয়েছিল সে ছবিটা এই ব্যাটা দোকানদার ওর
দোকানে টাঙ্গিয়ে রেখেছে আজ। কত বড় সাহস! পান দোকানদার কাচুমাচু হয়ে যা বলল
তা হলো, এতে ওর কোন অপরাধ নেই। এই ছবিটার প্রকৃত মালিক সেই। স্কুল
কর্তৃপক্ষ কাল কিছুক্ষণের জন্য এই ছবিটা তার কাছ থেকে ভাড়া করেছিলো। কাজ
শেষে কালই আবার তারা ছবিটা তাকে ফেরত দিয়েছে। এমনভাবে এদের হাটে হাড়ি
ভাংঙ্গবে এরা ভাবতেও পারেননি।
একজন শিক্ষক (হেডমাস্টার নন) বিনীত
কণ্ঠে বললেন, ‘স্যার’ যদি অভয় দেন তো একটা কথা বলবো। আমি তার দিকে তাকিয়ে
বললাম, নির্ভয়ে বলুন। তিনি বললেন, স্যার আপনি যা চাচ্ছেন তার সাথে যদি আমরা
একমত না হই তবে কি আমরা বিনা ঝামেলায় পদত্যাগ করতে পারবো?
জবাবে
শান্ত কণ্ঠে বললাম, নিশ্চয়ই পারবেন, খুশী মনে পারবেন। কোন ঝামেলাও হবে না।
এবার হেড মাস্টার মরিয়া হয়ে মুখ খুললেন, স্যার, এই স্কুলের গভর্নিং বোর্ডের
প্রেসিডেন্ট কলকাতাবাসী মহারাজা, এসডিও নন। বললাম, সে আমি খুব ভাল করেই
জানি। এসডিও হিসেবে আমি জানি আমাকে কি করতে হবে এবং আমি আমার দায়িত্ব
সম্পর্কে খুবই সচেতন।
হেড মাস্টার সাহেব আর কিছু বললো না। আমি
পায়চারি করতে করতে হেড মাস্টার সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এ স্কুলটির
এ্যাফিলিয়েশন কি কলকাতার সঙ্গে না ঢাকার সঙ্গে?’ উত্তর পেলাম না। হেড
মাস্টার সাহেবের চেহারা আরো গম্ভীর হলো।হঠাৎ কাচের আলমারীর ভিতর একটা বইয়ের
উপর নজর পড়ল। The Calcutta University Calender 1956 বইটা দেখতে চাইলাম।
একজন শিক্ষক নীরবে বইটা আমার হাতে তুলে দিলেন। পাতা উল্টাতে উল্টাতে
কাঙ্খিত জায়গা পেয়ে গেলাম। নাটোর মহারাজা হাইস্কুল কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের
এ্যাফিলিয়েশন প্রাপ্ত। আগের বছর এই স্কুলের কত জন ছাত্র পাস করেছে তারও
একটা হিসাব এতে আছে।
আমার মনে নানা ধরনের সন্দেহ উকি ঝুকি দিলেও
সত্য বলতে কি, আমি এতোটা ভাবতে পারিনি। ইট ইজ টু মাচ! এই স্কুল সম্পর্কে যা
সিদ্ধান্ত নেবার তা নিয়ে ফেলেছি তৎক্ষণাৎ, নিজের অজান্তেই। চুপচাপ চলে
এলাম নিজের বাংলোয়। সরকারী স্কুলের একজন অবসরপ্রাপ্ত হেড মাস্টার নাটোরের
কানাইখালিতে থাকতেন। তাকে রেক্টর নিয়োগ করে মহারাজা স্কুলে পাঠালাম পরদিন।
এদিকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রাজশাহী থেকে আমার কাছে এক বার্তা পাঠালেন। তাতে
তিনি জানালেন যে, কলকাতায় বসবাসকারী মহারাজা প্রাদেশিক গভর্নর এ কে ফজলুল
হক সাহেবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মহারাজা অভিযোগ করেছেন, এক ছোকরা এসডিও তার
স্কুলটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। সুতরাং হক সাহেব যেন ত্বরিত ব্যবস্থা নেন।
ওই দিন বিকেলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্বয়ং নাটোরে তাশরিফ আনলেন। সোজা নিয়ে
গেলাম তাকে মহারাজা স্কুলে।… জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব তার সদর দফতরে ফিরে
গিয়ে মহারাজা স্কুল সম্পর্কে কি রিপোর্ট দিয়েছিলেন জানি না। তবে সেদিন
স্কুল থেকে ফেরার পথে তিনি আমাকে সবিস্ময়ে বলেছিলেন, ‘এটা কি করে সম্ভব
হলো- যে স্কুলটি এই দেশে অবস্থিত, স্কুলের পাঠ্য বইগুলো এখানকার টেক্সট বুক
বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত অথচ ছেলেরা পরীক্ষা দেয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
সিলেবাস অনুসারে। তাকে এ তথ্যও দিয়েছিলাম যে কটি মুসলমান ছেলে দশম শ্রেণীর
পর্যন্ত পড়ে তারা হয় প্রাইভেটে পরীক্ষা দেয় নতুবা পাশের দিঘাপতিয়া স্কুলের
ছাত্র হিসেবে ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষায় অংশ নেয়। এ স্কুল থেকে যারা মেট্রিক
পরীক্ষা দেয় তারা সবাই হিন্দু ছাত্র এবং পরীক্ষা দেয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
সিলেবাস অনুসারে।
যা হোক, মহারাজা স্কুলের কীর্তিমান হেড মাস্টার
এবং তার চার জন সহকর্মী শিক্ষক হঠাৎ একদিন লাপাত্তা হয়ে গেলেন। খোজ খবর
নিয়ে জানা গেল, তারা সীমান্তের ওপারে চলে গেছেন।”
(উৎসঃ পি এ নাজির,স্মৃতির পাতা থেকে, নতুন সফর প্রকাশনী, ১৯৯৩ পৃষ্ঠা ১০-১৫)
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে স্পষ্ট যে কোন অত্যাচার নয় বরং নিজেদের মুসলিম
বিদ্বেষ ও একপেশে হিন্দুয়ানী বজায় রাখতে ওই পাচজন হিন্দু শিক্ষক দেশ ত্যাগ
করে ভারতে আসেন।
লেখাটা শেষ করা যাক সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস মহাশয়ের আরেকটি ফেসবুক পোস্ট দিয়ে, তিনি লেখেনঃ
“ বাংলাদেশে Amar বাড়ি যেখানে, দুটি গ্রাম পরের গ্রামের আমার পরিচিত একজন
বাংলাদেশ থেকে দেশত্যাগের কারণ নিয়ে আমার লেখায় মন্তব্য লিখলেন, ” বাস্তবে
কি তাই?”
আমি তাকে লিখি “সমীরণ, তোমার বংশের কেউ মুসলমানের হাতে খুন
হয়েছে, চড় খেয়েছে, চোখ রাঙানি? উত্তর না। তোমার বংশের কতজন দেশ ছেড়েছেন।
আগে লেখাপড়া জানা সবাই। তোমার পরিবারের অর্ধেক এপারে। মুসলমানের গুতোয়
দেশত্যাগ হলে আধাআধি এমন হয় না। আসলে তোমরাও আসতে চাও শুধু সুযোগ ও সুবিধা
হলে তবে আসবে, না হলে থাকবে। ওদেশের প্রায় সবাই এমনি।”
এবার সে
জবাবে লিখলেন, ” দাদা, আমরা বা আমার বংশের কেউই মুসলমানের নিকট অপমানিত হয়ে
ভারতে আসে নাই বা যায় নাই। আমাদের নিজ সুবিধার জন্য ভারতবর্ষে নিজ ইচ্ছায়
আগমন ও প্রস্থান করি”।
সাবেক যশোর জেলার মাগুরা মহকুমা থেকে নড়াইল,
অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুর হয়ে খুলনা জেলার দক্ষিণাঞ্চল ডুমুরিয়া,
বৈঠঘাটা, তালা, দাকোপ, রামপাল থানা বা উপজেলা হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল। একটা
অর্ধচন্দ্রের মতো এলাকা যার বিস্তৃতি ১০০ কিলোমিটারের বেশি হবে। এই অঞ্চলে
কোনোদিন বা কোনোকালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলতে যা বোঝায়, তা হয় নি। কিন্তু
এখানকার বহু মানুষ দেশত্যাগ করেছেন।
এই অঞ্চল জুড়ে এখন এমপিরা হলেন–
বীরেন শিকদার (মন্ত্রী), রণজিৎ বাবু, স্বপন ভট্টাচায্য, Narayan চন্দ
(মন্ত্রী), poncha non biswas প্রমুখ।
কেউ কেউ তত্ত্ব হাজির করছেন
যে, দুই পক্ষ সবল নয়, তাই দাঙ্গা নেই। তবে কেন হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায়
দাঙ্গা হলো না? আমি বলি– এসব ব্যাখ্যা ওতো সরল নয়।
যারা দেশত্যাগের
কারণ সম্পর্কে এখনো আমার মতামতের ব্যাপারে সংশয়ে আছেন, তাদের জন্য ২০০/৫০০
পরিবার সম্পর্কে নাম ঠিকানা উল্লেখ করে ও তাদের দেশত্যাগের কারণ উল্লেখ করে
আমি লিখতে পারি। সেটা উচিত হবে না বলে লিখছি না।