সে শুয়ে আছে সার্বিয়ার এক জঙ্গলে।

ওর নাম “লামার”, বয়স ৫ বছর।

সে শুয়ে আছে সার্বিয়ার এক জঙ্গলে। ওর বাড়ি, ছোট্ট পুতুল ও সব খেলনা চুড়মার হয়ে গেছে একটি বোমার আঘাতে। এই ছবিটি তোলা হয়েছে তখন যখন ওর পরিবার দুইবার তুরস্ক সাগড় পাড়ি দেয়ার চেষ্টার পর অবশেষে কোনরকমে সার্বিয়ায় এসে পৌছেছে।

এটা হচ্ছে বহু সংখ্যক ছবি কিবা গল্পের মাঝে মাত্র একটি গল্প যা আপনি পড়বেন, কিন্তু এরপর? এরপর কি হবে? আপনি কি কিছু মুহুর্ত চিন্তা করবেন এরপর ভুলে যাবেন যতক্ষন পর্যন্ত না এমন আরেকটি ছবি আপনার সামনে এসে পড়ে?

আমি আপনাদের একজন খলিফার কথা বলি, যিনি ছিলেন অর্ধ জাহানের শাসক, তিনি একটি ছেড়া জামা পরে জুম্মার খুতবা দিতে মিম্বরে উঠতেন যখন কিনা তার পেট ক্ষুধায় গুড়গুড় শব্দ করত এবং তিনি পেটকে উদ্দেশ্য করে বলতেন-

“ গুড়গুড় কর কিংবা না কর , তোমাকে ভরাট করা হবে না যতক্ষন পর্যন্ত না ক্ষুধার্ত শিশুদের পেট ভরাট হচ্ছে”

এই পশ্চিমা-ইউরোপীয়ানদের বাচ্চাগুলো যখন কোন কাল্পনিক বিপদেও পড়ে তখন সুপারম্যান- স্পাইডারম্যানেরা উড়ে আসে তাদের রক্ষা করতে। অথচ আমাদের শিশুগুলোর সত্যিকার বিপদে কোন সুপারম্যান আসে না!!! 

আমাদের শিশুগুলোর জন্য একজন সুপারম্যান দরকার এবং সে সুপারম্যান খলিফা ওমরের মত খলিফা ছাড়া আর কেউ নন, যিনি অনুভব করবেন আমাদের শিশুগুলোকে, যিনি তার দৌর্দন্ড প্রতাপশালী সেনাবাহিনী প্রেরন করবেন এই শিশুগুলোর রক্ষার্থে যারা আমেরিকা-রাশিয়া নামক সুপার পাওয়ারের স্বার্থের মাঝে পরে আজ জঙ্গলে রাত কাটাচ্ছে, ক্ষুধার্ত অবস্থায় , হৃদয়ে ভয় ও শংকা নিয়ে। যারা চোখ খুলেই দেখেছে তাদের বাবার মৃত লাশ, কান খুলেই শুনেছে ড্রোনের সম্ভাষণ। 

আমাদের এই সুপারম্যান কোন মংগল গ্রহ থেকে উড়ে আসবেন না, কিংবা ল্যাবরেটরিতেও তাকে সৃষ্টি করা যাবে না। তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার গুরু দায়িত্ব আমাদেরকেই বহন করতে হবে, প্রতিষ্ঠা করতে হবে সেই সাম্রাজ্য , সেই খিলাফত রাষ্ট্র, যা ১৪০০ বছর পৃথিবীকে শাসন করেছে, দিয়েছে শান্তি, আমাদের বাচ্চাগুলোও এমন কোন এক জঙ্গলে ঠাই পাবার আগে, কিংবা এই মাসুম বাচ্চাগুলো আমাদের জান্নাত আটকে দেবার আগে…

ভুমিকম্প কেন হয়?

ভুমিকম্প কেন হয়?
আবু হুরাইরা (রা.) কতৃক বর্ণিত, আল্লাহর নবি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যখন অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জিত হবে, কাউকে বিশ্বাস করে সম্পদ গচ্ছিত রাখা হবে কিন্তু তার খিয়ানত করা হবে (অর্থাৎ যার সম্পদ সে আর ফেরত পাবে না), জাকাতকে দেখা হবে জরিমানা হিসেবে, ধর্মীয় শিক্ষা ব্যতীত বিদ্যা অর্জন করা হবে, একজন পুরুষ তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে কিন্তু তার মায়ের সাথে বিরূপ আচরণ করবে, বন্ধুকে কাছে টেনে নিবে আর পিতাকে দূরে সরিয়ে দিবে, মসজিদে উচ্চস্বরে শোরগোল (কথাবার্ত) হবে, জাতির সবচেয়ে দূর্বল ব্যক্তিটি সমাজের শাসক রুপে আবির্ভূত হবে, সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি জনগণের নেতা হবে, একজন মানুষ যে খারাপ কাজ করে খ্যাতি অর্জন করবে তাকে তার খারাপ কাজের ভয়ে সম্মান প্রদর্শন করা হবে, বাদ্যযন্ত্র এবং নারী শিল্পীর ব্যাপক প্রচলন হয়ে যাবে, মদ পান করা হবে (বিভিন্ন নামে মদ ছড়িয়ে পড়বে), শেষ বংশের লোকজন তাদের পূর্ববর্তী মানুষগুলোকে অভিশাপ দিবে, এমন সময় আসবে যখন তীব্র বাতাস প্রবাহিত হবে তখন একটি ভূমিকম্প সেই ভূমিকে তলিয়ে দিবে (ধ্বংস স্তুপে পরিণত হবে বা পৃথিবীর অভ্যন্তরে ঢুকে যাবে)। [তিরমিযি কতৃক বর্ণিত, হাদিস নং – ১৪৪৭] এই হাদিসের মাঝে বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে যে আল্লাহ মহানের পক্ষ থেকে জমিনে কখন ভুমিকম্পের আজাব প্রদান করা হয় এবং কেন প্রদান করা হয়।
আল্লামা ইবনুল কাইয়ুম (রহ.) বলেন, মহান আল্লাহ মাঝে মাঝে পৃথিবীকে জীবন্ত হয়ে উঠার অনুমতি দেন, যার ফলে তখন বড় ধরণের ভূমিকম্প অনুষ্ঠিত হয়। তখন এই ভূমিকম্প মানুষকে ভীত করে। তারা মহান আল্লাহর নিকট তাওবা করে, পাপ কর্ম ছেড়ে দেয়, আল্লাহর প্রতি ধাবিত হয় এবং তাদের কৃত পাপ কর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে মুনাজাত করে। আগেকার যুগে যখন ভূমিকম্প হত, তখন সঠিক পথে পরিচালিত সৎকর্মশীল লোকেরা বলত, ‘মহান আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করেছেন।’
বিজ্ঞান কী বলে?
ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের আলোকে ভূপৃষ্ঠের নীচে একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় রয়েছে কঠিন ভূত্বক। ভূত্বকের নীচে প্রায় ১০০ কি.মি. পূরু একটি শীতল কঠিন পদার্থের স্তর রয়েছে। একে লিথোস্ফেয়ার (Lithosphere) বা কঠিন শিলাত্বক নামে অভিহিত করা হয়। আমাদের পৃথিবী নামের এই গ্রহের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, কঠিন শিলাত্বক (লিথোস্ফেয়ার)সহ এর ভূপৃষ্ঠ বেশ কিছু সংখ্যক শক্ত শিলাত্বকের প্লেট (Plate) এর মধ্যে খন্ড খন্ড অবস্থায় অবস্থান করছে। ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের আলোকে এই প্লেটের চ্যুতি বা নড়া-চড়ার দরুণ ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
ভুমিকম্প বিষয়ক কোরানতত্ত্ব
ভূমিকম্প বিষয়ে পবিত্র কোরানে সূরায়ে ‘যিলযাল’ নামে একটি সূরাই নাযিল করা হয়েছে। মানুষ শুধু কোন ঘটনা ঘটার কার্যকারণ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয় এবং ভূতত্ত্ববিজ্ঞানও এই কার্যকারণ সম্পর্কেই আলোচনা করে থাকে। কিন্তু কুরআনুল কারীম একই সাথে কোন ঘটনা ঘটার কার্যকারণ বর্ণনার পাশাপাশি উক্ত ঘটনা থেকে শিক্ষনীয় বিষয় কি এবং এই ঘটনা থেকে অন্য আরো বড় কোন ঘটনা ঘটার সংশয়হীনতার প্রতি ইংগিত করে। ভূমিকম্প বিষয়ে কুরআনুল কারীমে দু’টি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। একটি হল ‘যিলযাল’, যার অর্থ হল একটি বস্তুর নড়াচড়ায় অন্য আরেকটি বস্তু নড়ে ওঠা। দ্বিতীয় শব্দটি হল ‘দাক্কা’, এর অর্থ হল প্রচন্ড কোন শব্দ বা আওয়াজের কারণে কোন কিছু নড়ে ওঠা বা ঝাঁকুনি খাওয়া। পৃথিবীতে বর্তমানে যেসব ভূমিকম্প ঘটছে, তা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে কঠিন শিলাত্বকে চ্যুতি বা স্থানান্তরের কারণে। কিয়ামতের দিন আরেকটি ভূমিকম্পে পৃথিবী টুকরো টুকরো হয়ে ধুলিকনায় পরিণত হবে এবং তা হবে ফেরেশেতা হযরত ইসরাফিলের ( আ.) সিঙ্গায় ফুৎকারের কারণে, যাকে বলা হয় ‘দাক্কা’। যা হবে এক প্রচন্ড আওয়াজ।
পৃথিবীতে মাঝে মাঝে কঠিন শিলাত্বকের স্থানান্তরের কারণে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প আমাদেরকে এ কথার প্রতি ইংগিত করে যে, একদিন ওই ‘দাক্কা’ সংঘটিত হবে, যার নাম কেয়ামত। তখন এই চাকচিক্যময় দুনিয়ার সবকিছুই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে। মানুষ যেন কিয়ামতকে ভুলে না যায়, দুনিয়াকেই তার আসল ঠিকানা মনে না করে, তাই মাঝে মাঝে মহান আল্লাহ ভূমিকম্পসহ আরো অন্যান্য প্রাকৃতিক দূর্যোগ দিয়ে মানুষকে সতর্ক করে থাকেন।
ভুমিকম্প একটি আজাব
আল্লাহ মহান পবিত্র কোরানে ইরশাদ করেছেন, বল, আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর, তোমাদের উপর থেকে (আসমান থেকে) অথবা তোমাদের পায়ের নীচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম, অথবা তিনি তোমাদের দল-উপদলে বিভক্ত করে একদলকে আরেক দলের শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাতেও সম্পূর্ণরূপে সক্ষম।” (সূরা আল আনআম : ৬৫)
আল-বুখারি তার সহিহ বর্ণনায় জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যখন তোমদের উপর থেকে (আসমান থেকে) নাজিল হলো তখন রাসূল (স) বললেন, আমি তোমার সম্মূখ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, অথবা যখন, অথবা তোমাদের পায়ের নীচ থেকে আজাব নাযিল হলো, তখন তিনি (সা.) বললেন, আমি তোমার সম্মূখ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (সহিহ বুখারি, ৫/১৯৩)
আবূল-শায়খ আল-ইস্পাহানি এই আয়াতের তাফসিরে বর্ণনা করেন, “বল, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর, তোমাদের উপর থেকে (আসমান থেকে)- যার ব্যাখ্যা হলো, তীব্র শব্দ, পাথর অথবা ঝড়ো হাওয়া; আর অথবা তোমাদের পায়ের নীচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম- যার ব্যাখ্যা হলো, ভুমিকম্প এবং ভূমি ধ্বসের মাধ্যমে পৃথিবীর অভ্যন্তরে ঢুকে যাওয়া।)
বান্দার ওপর আজাব কেন আসে?
হজরত আলী [রা.] হতে বর্ণত রসুল [সা.] ইরশাদ করছেন, যখন আমার উম্মত যখন ১৫ টি কাজে লিপ্ত হতে শুরু করবে তখন তাদের প্রতি বালা মসীবত আপাতিতি হতে আরম্ভ করবে।কাজগুলো হল
১. গণীমতের মাল ব্যাক্তিগত সম্পদে পরিণিত হবে।
২. আমানতের সম্পদ পরিনত হবে গনীমতের মালে।
৩. জাকাত আদায় করাকে মনে করবে জরিমানা আদায়ের ন্যায়।
৪. স্বামী স্ত্রীর বাধ্য হবে।
৫. সন্তান মায়ের অবাধ্য হবে।
৬. বন্ধু-বান্ধবের সাথে স্বদব্যাবহার করা হবে।
৭. পিতার সাথে করা হবে জুলুম।
৮. মসজিদে উচ্চস্বরে হট্টোগোল হবে
৯. অসাম্মানী ব্যাক্তিকে জাতির নেতা মনে করা হবে।
১০. ব্যাক্তিকে সম্মান করা হবে তার অনিষ্ট থেকে বাচার জন্য।
১১. প্রকাশ্যে মদপান করা হবে।
১২. পুরুষ রেশমী পোষাক পরবে।
১৩. গায়িকা তৈরি করা হবে।
১৪. বাদ্যযন্ত্র তৈরি করা হবে।
১৫.পুর্ববর্তী উম্মতদের (সাহাব, তাবে, তাবেঈন) প্রতি অভিসমাপ্ত করবে পরবর্তীরা।
এই কাজগুলি যখন পৃথিবীতে হতে শুরু হবে তখন অগ্নীবর্ষী প্রবল ঝড়, ভুমিকম্প ও কদাকৃতিতে রূপ নেয়ার অপেক্ষা করবে। এখন একটু চিন্তা করা উচিত যে আমরা এগুলোর মাঝেই লিপ্ত রয়েছি। আর যখন আমাদের উপর মুসীবত আসে তখন প্রকৃতির বা মানুষের বা অন্যান্য জিনিসের দোষ দেই। আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত যে সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন আমরা হই তা আসলে আমাদের গুনাহের কারনেই এত আযাব।
ভুমিকম্প হলে করনীয় কি?
যখন কোথাও ভূমিকম্প সংগঠিত হয় অথবা সূর্যগ্রহণ হয়, ঝড়ো বাতাস বা বন্যা হয়, তখন মানুষদের উচিত মহান আল্লাহর নিকট অতি দ্রুত তওবা করা, তাঁর নিকট নিরাপত্তার জন্য দোয়া করা এবং মহান আল্লাহকে অধিকহারে স্মরণ করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা যেভাবে রাসূল (সা.) সূর্য গ্রহণ দেখলে বলতেন, যদি তুমি এরকম কিছু দেখে থাক, তখন দ্রুততার সাথে মহান আল্লাহকে স্মরণ কর, তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। [বুখারি ২/৩০ এবং মুসলিম ২/৬২৮]
বর্ণিত আছে যে, যখন কোন ভূমিকম্প সংগঠিত হতো, উমর ইবনে আব্দুল আযিয (রহ) তার গভর্ণরদের দান করার কথা লিখে চিঠি লিখতেন।
ভুমিকম্প একটি কেয়ামতের আলামত
আবূল ইয়ামান (রহ.) আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি [সা.] বলেছেন, কিয়ামত কায়েম হবে না, যে পর্যন্ত না ইল্‌ম উঠিয়ে নেওয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভুমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে এবং হারজ বৃদ্ধি পাবে। (হারজ অর্থ খুনখারাবী) তোমাদের সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, উপচে পড়বে। [সহিহ বুখারি, অধ্যায় : ১৫/ বৃষ্টির জন্য দুআ, হাদিস নাম্বার : ৯৭৯]
পবিত্র কোরানের একাধিক আয়াতে বলা হয়েছে যে, জলে স্থলে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তা মানুষেরই কৃতকর্মের ফল। আল্লাহপাক মানুষের অবাধ্যতার অনেক কিছুই মাফ করে দেন। তারপরও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়। কোরান নাজিল হওয়ার পূর্বেকার অবাধ্য জাতি সমূহকে আল্লাহপাক গজব দিয়ে ধ্বংস করেছেন। সে সবের অধিকাংশ গজবই ছিল ভুমিকম্প। ভুমিকম্প এমনই একটা দুর্যোগ যা নিবারন করার মতো কোন প্রযুক্তি মানুষ আবিষ্কার করতে পারে নাই। এর পূর্বাভাষ পাওয়ার মতো কোন প্রযুক্তিও মানুষ আজ পর্যন্ত আবিষ্কার করতে পারেনাই। হাদিস শরীফেও একাধিকবার বলা হয়েছে যে, মানুষের দুষ্কর্মের জন্যই ভুমিকম্পের মতো মহা দুর্যোগ ডেকে আনে। কুরআন এবং হাদিসে আদ, সামুদ, কওমে লুত এবং আইকার অধিবাসীদের ভুমিকম্পের দ্বারা ধ্বংস করার কাহিনী বিভিন্ন আঙ্গিকে বর্ণনা করা হয়েছে।
একটু ভাবুন তো…
সামান্য এই ভূমিকম্পেই সম্পদের মায়া ছেড়ে আমরা রাস্তায় নামছি। এটা যখন আরো বাড়বে, তখন সম্পর্কের মায়াও ছেড়ে দেবো আমরা। নিজেকে বাচানোর চেষ্ঠায় ব্রতী হবো সবাই। যখন তা রচাইতেও আরো বাড়বে তখন যেই মা দুধ খাওয়াচ্ছেন তিনিও তার বাচ্চাকে ছুড়ে ফেলে দেবেন, গর্ভের শিশুকেও বের করে দেবেন। ভূমিকম্পের সময় কে কি বস্থায় ছিলাম, কে টের পেয়েছে, কে টের পায়নি, চেয়ার টেবিল নড়ছিলো কিনা, ফ্যান দুলছিলো কিনা- এই সব গবেষণা পরে করলেও হবে। আগে করা দরকার তওবা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। সবচেয়ে বড় কথা হল, এটি আল্লাহ কর্তৃক একটি নিদর্শন। যাতে করে মানুষ স্বীয় অপরাধ বুঝতে সক্ষম হয়। ফিরে আসে আল্লাহর পথে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে আন্তরিকতার সাথে খাটি তওবা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

জ্ঞানের ইসলামীকরণের পর্যালোচনা

জ্ঞানের ইসলামীকরণের পর্যালোচনা
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব মূলত জ্ঞানগত
বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত জীব মানুষ।[1] এই সম্মান প্রথম লাভ করেন হযরত আদম (আ)। এই মহাসম্মান অর্জন করার কারণ হলো বিশ্বজগত সম্পর্কে তিনি অন্যদের চেয়ে বেশি জানতেন।[2] আল্লাহ তায়ালা আদমকে (আ) সর্বপ্রথম শিখিয়েছেন সমস্ত কিছুর নাম।[3] যেহেতু জ্ঞানের প্রথম স্তর বস্তুর নাম জানা ও পরিভাষা শেখা, তাই আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম আদমকে (আ) তা-ই শেখালেন। তিনি ইচ্ছা করলে আদমকে (আ) সর্বপ্রথম ধর্ম সম্পর্কিত জ্ঞান শেখাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, বরং আদমকে (আ) শিখিয়েছেন বিশ্বজগতের জ্ঞান। যার ফলে আদম (আ) ও তাঁর বংশধর হয়েছেন পৃথিবীতে সবচেয়ে সম্মানিত জীব।

মানবজাতির কাছে তখনো কোনো ধর্ম প্রকাশ হয়নি। কেবল বিশ্বজগতের জ্ঞান অর্জনের ফলেই আল্লাহ তায়ালা আদমকে (আ) পৃথিবীর খলিফা বানিয়ে দিলেন।[4] এবং ইবলিসের বিপরীতে আদম (আ) হলেন আল্লাহ তায়ালার একান্ত অনুগত বান্দা। লক্ষণীয় যে, আদমের (আ) বিশ্বজ্ঞান তাঁকে আল্লাহর অনুগত হবার ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি; বরং আল্লাহ তায়ালার সঠিক পরিচয় জানার ক্ষেত্রে এই জ্ঞান তাঁকে সাহায্য করেছিল। অন্যদিকে, ইবলিস আল্লাহ তায়ালার আদেশ অমান্য করেছিল। এর প্রথম কারণ – সে আদমের (আ) মতো জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ছিল না; দ্বিতীয়ত, ইবলিসের জ্ঞানের চেয়ে অহংকার ছিল বেশি। ফলে সে নিজ-জ্ঞানলব্ধ সত্যকে অস্বীকার করেছিল।[5]

আল্লাহ তায়ালা যদি পৃথিবীতে কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীকে মর্যাদা ও কল্যাণ দান করতে চান, তাহলে তিনি তাঁদেরকে জ্ঞান দান করেন।[6] জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ফলেই মানবজাতির মধ্যে কেউ কেউ বিশ্বজগত ও প্রকৃতির ওপর নিজেদের রাজত্ব কায়েম করতে পারে। এবং সঠিকভাবে আল্লাহর দেয়া খিলাফতের দায়িত্ব পালন করতে পারে। হযরত দাউদ ও সোলায়মানকে (আ) আমরা উদাহরণ হিসাবে পেশ করতে পারি। আল্লাহ তায়ালা তাঁদের উভয়কে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়েছিলেন বলেই তাঁরা বিশ্বজগত ও প্রকৃতির ওপর নিজেদের রাজত্ব কায়েম করতে পেরেছিলেন।[7] তাঁরা কেবল মানুষের ভাষা বুঝতেন, মানুষের নেতৃত্ব দিতেন – তা নয়; তাঁরা পশু-পাখি এমনকি প্রকৃতিরও ভাষা বুঝতেন[8] এবং তাদের ওপরও রাজত্ব করতেন।

হযরত সোলায়মানের (আ) সাথে রানী বিলকীসের ঘটনাটি সবার জানা। হযরত সোলায়মান (আ) যখন তাঁর পরিষদবর্গকে বললেন, তোমাদের মধ্যে কে পারবে রানীর সিংহাসনটি এ মুহূর্তে আমার সামনে এনে দিতে?[9] সোলায়মানের (আ) এ কাজটি কেবল সেই সম্পাদন করতে পেরেছিল, যে ছিল পরিষদবর্গের মাঝে সবচেয়ে জ্ঞানী।[10] কোরআনে এ ধরনের অনেক ঘটনা আছে, যেগুলো স্বাভাবিকভাবে অলৌকিক মনে হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার প্রতিটি কাজেরই জ্ঞানগত একটি কার্যকারণ বিদ্যমান থাকে। আমরা আমাদের জ্ঞানগত যোগ্যতানুযায়ী তা বুঝার সামর্থ্য অর্জন করি।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু সালামের (রা) ঘটনা
মদীনায় ইহুদীদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী ও বড় নেতা ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রা)। রাসূল (সা) মদীনায় হিজরতের পরপরই তিনি এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি রাসূলকে (সা) বলেন, “আমি ইহুদীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী এবং একজন বড় জ্ঞানী ইহুদীর সন্তান। আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এ কথাটা জানাজানি হওয়ার আগে আপনি ইহুদী সম্প্রদায়কে ডাকুন, আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করুন এবং আমার সম্পর্কে তাদের ধারণা অবগত হউন। রাসূল (সা) ইহুদী সম্প্রদায়কে ডেকে পাঠালেন। তারা উপস্থিত হওয়ার পর রাসূল (সা) তাদের বললেন – তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় করো, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, আমি সত্য রাসূল এবং সত্য নিয়েই তোমাদের নিকট এসেছি। সুতরাং তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। তারা জবাবে বলল – আমরা এসব জানি না। তারা বারবার নিজেদের অজ্ঞতা প্রকাশ করতে লাগলো। এবার রাসূল (সা) বললেন – তোমাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনু সালাম কেমন লোক? তারা বলল – তিনি আমাদের নেতা এবং নেতার সন্তান। তিনি আমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী এবং জ্ঞানীর সন্তান। রাসূল (সা) তখন বললেন – তিনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন তবে তোমাদের মতামত কী হবে? ইহুদীরা বলল – আল্লাহ হেফাজত করুন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করবেন তা কিছুতেই হতে পারে না। রাসূল (সা) আবার বললেন – আচ্ছা বলো তো, আবদুল্লাহ ইবনু সালাম যদি সত্যিই মুসলিম হয়ে যান তবে তোমরা কী মনে করবে? তারা বলল – আল্লাহ রক্ষা করুক। তিনি মুসলিম হয়ে যাবেন এ কিছুতেই সম্ভব নয়। এবার রাসূল (সা) বললেন – হে ইবনু সালাম! তুমি এদের সামনে বের হয়ে আসো। ইবনু সালাম বের হয়ে আসলেন এবং বললেন – হে ইহুদী সম্প্রদায়! আল্লাহকে ভয় করো। ঐ আল্লাহর কসম, তিনি ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই। তোমরা নিশ্চয়ই জানো, তিনি সত্য রাসূল; সত্য নিয়েই তিনি আগমন করেছেন। ইহুদীরা এবার বলে উঠলো – আবদুল্লাহ ইবনু সালাম! তুমি মিথ্যাবাদী।[11]

জ্ঞান ও ঈমানের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য
কোরআন ও হাদীসের এ বর্ণনাগুলো থেকে একেবারেই স্পষ্ট হওয়া যায় যে, জ্ঞান মাত্রই মানুষকে ইসলামের পথে নিয়ে আসে। আর অজ্ঞতা বা স্বল্প জ্ঞান মানুষকে কুফরির পথে নিয়ে যায়। কোরআন-হাদীসের পাতায় পাতায় জ্ঞান ও জ্ঞানীর বর্ণনা দেয়া হয়েছে।[12] জ্ঞানের স্বভাব ও জ্ঞানীর বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, জ্ঞানীরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বিশ্বাস করে।[13] তারা আল্লাহকে ভয় করে।[14] ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে।[15] তারা বিশ্বাস করে পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব আল্লাহর।[16] তারা জুমার দিনে আজানের পর বেচাকেনা বন্ধ করে দেয়।[17] একইভাবে কোরআনের দাবি হলো – জ্ঞানীরা বিশ্বজগত ও প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে।[18] এখানে গুরুত্বের সাথে লক্ষণীয় একটি বিষয় হলো – পুরো কোরআনে একটিবারের জন্যেও জ্ঞান শব্দটিকে কিঞ্চিৎ নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হয়নি। কোরআনে যখনি জ্ঞান ও জ্ঞানী সম্পর্কিত কোনো কথা এসেছে, তখনি আল্লাহর কোনো না কোনো অনুগত বান্দার বৈশিষ্ট্য হিসাবে তা উল্লেখ করা হয়েছে।[19] বিশ্বজগৎ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন বা বিশ্বজগত নিয়ে চিন্তা-ভাবনাকে আল্লাহ তায়ালার পরিচয় লাভের উত্তম উপায় হিসাবে ইসলাম চিহ্নিত করেছে। একই সাথে কাফেরদের ভর্ৎসনা করা হয়েছে এই বলে যে – তারা কি চিন্তা-ভাবনা করে না?[20] তারা কি জ্ঞান রাখে না?[21] তারা কি বিশ্বজগতের জ্ঞানকে অস্বীকার করে?[22] তারা কি দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করে না?[23]

জ্ঞান মাত্রই ভালো বা ইসলামিক
জ্ঞান মূলত মানুষকে প্রকৃতির স্বভাব জানতে সাহায্য করে এবং বিশ্বজগতের সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দেয়। অন্যভাবে বললে, বিশ্ব-স্বভাব-প্রকৃতি জানার নামই জ্ঞান। ইসলাম সেই স্বভাব-প্রকৃতির ধর্ম। রাসূলের (সা) নীতি হচ্ছে – যে ‘জ্ঞান’ পৃথিবী ও বিশ্বজগতের নিয়মের বাইরে এবং মানব মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে, তা মেনে নেয়া অন্যায় ও পাপ। অন্যদিকে, যে ‘জ্ঞান’ বিশ্বজগত বুঝতে সহায়ক এবং মানব মনে জেগে ওঠা প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দেয়, তা ন্যায় এবং তাই পুণ্য।[24]

এ পর্যন্ত আলোচনার পর খুব সহজে একটি অনুসিদ্ধান্তে আসা যায় যে – জ্ঞান মাত্রই ভালো বা ইসলামিক। তাই জ্ঞানকে ইসলামীকরণ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এরই সাথে আরেকটি প্রশ্ন ওঠা খুব স্বাভাবিক যে – তাহলে পৃথিবীর বড় বড় সব জ্ঞানী কাফের বা নাস্তিক হয় কেনো? প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে সে বিষটি আমরা বোঝার চেষ্টা করব।

জ্ঞান ও অহংকারের সম্পর্ক বিপরীতমুখী
আদম (আ) ও ইবলিসের আদি ঘটনাটির দিকে আবার দৃষ্টি ফেরানো যাক। আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে তাদের উভয়ের জ্ঞান ছিল সমান। কিন্তু আদম (আ) তাঁর জ্ঞানের কারণে আল্লাহ তায়ালার অনুগত বান্দা হতে পারলেও ইবলিস হয়েছে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত। এর কারণ কী? জ্ঞান থাকা সত্বেও ইবলিশ কেনো কাফের হলো? তার দুটি জবাব হতে পারে। প্রথমত, আল্লাহ তায়ালা ইবলিশকে আদমের (আ) মতো বিশ্বজ্ঞান দান করেননি।[25] ফলে অল্পবিদ্যা তার জন্যে ভয়ংকর বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দ্বিতীয়ত, অজ্ঞতাবশত সে অহংকার করে বসল। সূত্র হলো – জ্ঞান ও অহংকার একে অন্যের ব্যস্তানুপাতিক। জ্ঞান বাড়লে অহংকার কমে এবং অহংকার বাড়লে জ্ঞান কমে যায়। ইবলিশের যেহেতু অহংকার বেশি ছিল, তাই সে প্রকৃত জ্ঞানী হতে পারেনি। এ কারণেই সে আল্লাহর শত্রু বনে গেল। অল্পস্বল্প যে জ্ঞান ইবলিশের ছিল, তাও সে অস্বীকার করার ফলে কাফের হয়ে গেল।[26] অর্থাৎ জ্ঞানের অভাব ও অহংকারের প্রভাব – এ দুইয়ের ফলেই ইবলিস কাফের হলো।

জ্ঞানের কাঠামো ক্রমসোপানমূলক (hierarchical)
এবার মুসার (আ) একটি ঘটনা উল্লেখ করা যাক। তিনি একবার বনী ইসরাঈলের এক সমাবেশে ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন।[27] লোকেরা তাঁকে তখন জিজ্ঞাস করল – কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী? মুসা (আ) বললেন – আমি সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী। আল্লাহ তায়ালা মুসার (আ) উত্তরে অসন্তুষ্ট হলেন এবং তাঁকে সতর্ক করে দিলেন।[28] কেননা তিনি জ্ঞানকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত করেননি। আল্লাহ তায়ালা মুসাকে (আ) তাঁর চেয়েও বড় একজন জ্ঞানী হযরত খিজিরের (আ) নিকট পাঠালেন,[29] যেন মুসা (আ) তাঁর জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কথা বুঝতে পারেন। যে কোনো জ্ঞানীর ওপর অন্য একজন জ্ঞানী থাকে।[30] জ্ঞান ও অহংকার একসাথে থাকতে পারে না। যখন কেউ নিজের জ্ঞানকেই একমাত্র জ্ঞান বলে প্রকাশ করে এবং অহংকার শুরু করে, তখন সে আর জ্ঞানী হবার যোগ্যতা রাখে না। এ জাতীয় মানুষগুলোকে সক্রেটিস বলতেন – গণ্ড মূর্খ। কেননা সে আসলে জানে না, সে কতটা বোকা।[31] পৃথিবীর যে কোনো জ্ঞানকে যদি সর্বশেষ ও একমাত্র জ্ঞান মনে করা না হয় এবং বাহ্যিক কার্যকারণের বাইরেও জ্ঞানের কিছু বিষয় অজানা থেকে যাবার সম্ভাবনাকে স্বীকার করা হয়, তাহলে সে জ্ঞান মানুষকে নিশ্চিত আল্লাহর দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু মানুষ অহংকারবশত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে না। ফলে সে হয়ে পড়ে অস্বীকারকারী বা কাফের। জ্ঞানের দ্বারা অর্জিত সত্যকে যে অস্বীকার করে, সেই কাফের। সুতরাং জ্ঞানের ইসলামীকরণের চেয়ে অধিক প্রয়োজন মনের ইসলামীকরণ।

জ্ঞানগত মতভেদের কারণ
উপরের কথাটি বুঝতে কারো বেগ পেতে হয় না। তবু আরেকটু সহজভাবে বলা যেতে পারে। জ্ঞান হচ্ছে বিভিন্ন উপাদানের সমষ্টি। যার কাছে এই উপাদানগুলো থাকে সে তার মতো ব্যবহার করে। কিন্তু জ্ঞানের উপযুক্ত ব্যবহার যারা করতে পারে, তারা কখনও বিপথে যেতে পারে না। অর্থাৎ জ্ঞান কখনো খারাপ হয় না। জ্ঞানকে ইসলামীকরণ করার প্রয়োজন পড়ে না; প্রয়োজন জ্ঞানের উপযুক্ত ও পূর্ণ ব্যবহার।

এখন আরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। যেমন- জ্ঞান যদি মানুষকে সত্যিই আল্লাহর পথে নিয়ে যায়, তাহলে জ্ঞানীরা এত দলে-উপদলে বিভক্ত কেনো? তার মানে কি পৃথিবীতে অনেক প্রকারের জ্ঞান আছে? জ্ঞানের কি কোনো মৌলিক ও বৈশ্বিক ধারণা নেই? বিভিন্ন মানুষের কাছে জ্ঞান কি বিভিন্নভাবে ধরা দেয়? জ্ঞান মানুষের মাঝে কি ঐক্যের সৃষ্টি করে, নাকি ভিন্নতা তৈরি করে?— এ প্রশ্নগুলো জ্ঞানতাত্ত্বিকদের অনেকদিনের। তারা জানতে চায় – জ্ঞান আসলে কী!

জ্ঞান স্বভাবতই সমন্বয়ধর্মী
কোরআনের দাবি হলো – জ্ঞান ঐক্যের প্রতীক আর অজ্ঞতা বিভক্তির কারণ। জ্ঞানীরা গড়ে ঐক্য, মূর্খরা হয় বিভক্ত। জ্ঞান মানুষের মাঝে বিভেদ ঘটায় না, বিভেদ ঘটায় ‘জ্ঞানীদের’ পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ।[32] মনের কলুষতা, চিন্তার অপরিচ্ছন্নতা ও ভোগের চাহিদা ঘটায় মানুষে মানুষে মতভেদ। জ্ঞান কখনো মতভেদ ঘটায় না। জ্ঞান মানুষকে বিপথে নেয় না, মানুষকে বিপথে নেয় অহংকার ও অজ্ঞতা। অজ্ঞতা সকল অন্যায় ও অবিচারের মূল উৎস। তাই ইসলামের সংগ্রাম ছিল অজ্ঞতা বা জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে।

জ্ঞান ও ইসলামের সম্পর্ক অভিন্ন
ইসলাম এসেছে সত্যের জ্ঞান নিয়ে। তার প্রথম আদেশ – পড়।[33] ইসলামের সাথে জাহেলি বা মূর্খ যুগের প্রধান পার্থক্য হচ্ছে জ্ঞান। জাহেলি যুগে যিনি সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন, ইসলামেও তাঁর মর্যাদা সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ। কেবল শর্ত হলো তাঁকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে।[34] জ্ঞানশূন্য ইসলাম যেমন ইসলাম নয়, ইসলামশুন্য জ্ঞানও আসলে জ্ঞান নয়। জ্ঞান ও ইসলাম একে অপরের পরিপূরক, একটির অনুপস্থিতিতে অন্যটি হয়ে পড়ে নিষ্ক্রিয়। পৃথিবীর যে প্রান্তেই জ্ঞানের খনি থাকুক না কেনো তা প্রকৃত অর্থে ইসলামেরই হারানো সম্পদ। পৃথিবীর যে প্রান্তেই জ্ঞানের শব্দ শোনা যাক না কেনো তা প্রকারান্তরে ইসলামেরই শব্দ। অসম্পূর্ণ জ্ঞান মানুষকে নাস্তিকতার দিকে নিয়ে গেলেও পূর্ণ জ্ঞানপ্রাপ্তির পর মানুষ নিশ্চিত ঈমানের দিকে ফিরে আসে।

রেফারেন্স

[1] সূরা বনী ইসরাইল: ৭০

[2] সূরা বাকারা: ৩৩

[3] সূরা বাকারা: ৩১

[4] সূরা বাকারা: ৩০

[5] সূরা বাকারা: ৩৪

[6] হাদীস নং-৭১, জ্ঞান অধ্যায়, সহীহ বুখারী (ইফা),

[7] সূরা আন্বিয়া: ৭৯

[8] সূরা নামল: ১৫

[9] সূরা নামল: ৩৮

[10] সূরা নামল: ৪০

[11] হাদীস নং-৩৬৩০, আম্বিয়া অধ্যায়, সহীহ বুখারী (ইফা)

[12] সূরা রাহমান: ২। কিছু উদাহরণ – ২:১৮০, ২:১৮৪, ১৬:৯৫, ২১:৭, ২৩:১১৪, ২৩:৮৮, ২৩:৮৪, ৬১:১১; ৬২:৯, ৭১:৪,

[13] সূরা সফ: ১১

[14] সূরা ফাতির: ২৮

[15] সূরা তাওবা: ৪১

[16] সূরা মুমিনুন: ৮৪

[17] সূরা জুমা: ৯

[18] সূরা রাহমান: ১৩

[19] সূরা লোকমান: ১২

[20] সূরা আন্বিয়া: ১০

[21] সূরা আদিয়াত: ৯

[22] সূরা রাহমান: ১৩

[23] সূরা ইউছুফ: ১০৯

[24] হাদিস নং-২৭, ইমাম নববীর চল্লিশ হাদিস

[25] সূরা বাকারা: ৩৩

[26] সূরা বাকারা: ৩৪

[27] হাদীস নং-৩১৬২, আম্বিয়া অধ্যায়, সহীহ বুখারী (ইফা)

[28] হাদীস নং- ১২৪, জ্ঞান অধ্যায়, সহীহ বুখারী (ইফা)

[29] সূরা কাহাফ: ৬৫

[30] সূরা ইউছুফ: ৭৬

[31] সক্রেটিসের জবানবন্দি

[32] সূরা শূরা: ১৪

[33] সূরা আলাক: ১

[34] হাদীস নং- ৩১১৬, আম্বিয়া অধ্যায়, সহীহ বুখারী (ইফা)

তুর্কী সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’ তুলে দেয়ার পর কি কি ঘটেছিলো আসুন দেখি-

তুর্কী সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’ তুলে দেয়ার পর কি কি ঘটেছিলো আসুন দেখি-
১) শিশুদের ইসলামী শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়।
২) ধর্ম মন্ত্রণালয়, মাদরাসা-মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং হজ্জ-ওমরা যাত্রা নিষিদ্ধ করা হয়।
৩) বড় বড় মসজিদগুলোতে নামায বন্ধ করে দিয়ে সেগুলোকে জাদুঘর হিসেবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তুরস্কের সর্ববৃহৎ মসজিদ ‘আয়া ছুফিয়া’কে রূপান্তরিত করেছিলেন সরকারি জাদুঘরে।
৪) নারীদের জন্য হিজাব পরিধান বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারি নির্দেশে তুর্কী পুলিশ রাস্তায় বের হওয়া মুসলিম মহিলাদের ওড়না কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলত।
৫) আরবী অক্ষরের ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়। আরবীতে কুরআন পড়া, নামাজ পড়া ও আজান দেওয়া নিষিদ্ধ হয়।
৬) তুর্কী ভাষা আরবী হরফে না লিখে ল্যাটিন হরফে লিখতে হতো।
৭) সাপ্তাহিক ছুটি হিসেবে রবিবারকে নির্ধারণ করা হয়।
৮) তুরস্কবাসীকে ভিন্ন ধরণের পোষাক পরতে বাধ্য করা হয়।
৮) মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ঈদকে বর্জনীয় ঘোষনা করা হয়।
৯) তুরস্কের অধীন আজারবাইজানকে রাশিয়ার কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
১০) বক্তৃতা এবং বিবৃতিতে নিয়মিত ইসলাম ও ইসলামী পরিভাষাসমূহ নিয়ে মিথ্যাচার ও কুৎসা রটনা করে সেগুলো বর্জনের প্রতি সবাইকে আদেশ-নিষেধ করা হয়।
১১) সরকারী লোকদের জামাতে নামায পড়া নিষিদ্ধ হয়।
১২) ইসলামী নিয়ম অনুযায়ী সালাম দেওয়াও নিষিদ্ধ করা হয় । এর পরিবর্তে সুপ্রভাত (Good Morning) বিদায় (Good Bye) ও হ্যান্ডশেক রেওয়াজ প্রবর্তিত হয়।
১৩) ইমাম-মুফতীদের পাগড়ি ও জুব্বা পরা নিষিদ্ধ করা হয়।
১৪) হিজরী সন উঠিয়ে দিয়ে ইংরেজী সন চালু করা হয়
১৬) আরবী ভাষায় নাম রাখা নিষিদ্ধ হয়। এর বদলে তুর্কী ভাষায় বাধ্যতামূলক নাম রাখতে হয়।
১৭) আলেমদের প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙ্গে দেয়া হয় এবং আলেমদেরকে প্রজতন্ত্রে শত্রু হিসিবে চিহ্নিত করা হয়। কোন আলেম তার বিরুদ্ধাচরণ করলে তাকে সাথে হত্যা করা হয়। এছাড়া ওয়াকফ সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে আলেমদের অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করা হয়।

এখানে লক্ষণীয় যে, এ ঘটনাগুলো হচ্ছে আজ থেকে প্রায় ৯০ বছর আগে এবং তা করা হয়েছিলো উছমানিয় খেলাফত বন্ধ করার পর। বলাবাহুল্য সে সময় মানুষের মধ্যে জোর ইসলামী চেতনা দৃঢ় থাকার পরও এতটা এগ্রেসিভ হতে পেরেছিলো কামাল আতার্তুক। কিন্তু এখন তো বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় চেতনা অনেকটাই দুর্বল। তার উপর কামাল আতার্তুক সে সময় যা যা করেছে তার অনেকগুলোই ইতিমধ্যে বাংলাদেশে জারি করা হয়েছে বা চেষ্টা চলছে।

৯০ বছর পর হলেও তুর্কী তার মূলের দিকে ফিরছে আর বাংলাদেশ আগাইয়া যাচ্ছে তুর্কীর অন্ধকার যুগের দিকে। এটাই বুঝি ইতিহাসের নির্মম পরিহাস।

ব্রিটিশ শাসনের ভয়াবহ কয়েকটি নৃশংসতা

ব্রিটিশ শাসনের ভয়াবহ কয়েকটি নৃশংসতা
১৯৪৫ সালের দুর্ভিক্ষের সময় ভারতের একটি এলাকায় হাড্ডিসার কয়েক শিশু (ফাইল ফটো)
একটা সময় বিশ্বের বড় একটি অংশ ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। সারা বিশ্বে বেশির ভাগ এলাকা দাপিয়ে বেড়িয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সৈন্যরা। তাদের শাসন ও ঔপনিবেশিকতা নিয়ে মিশ্র ধারণা পোষণ করেন ব্রিটিশ নাগরিকেরা।
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউগভের একটি জরিপে দেখা গেছে অনেক ব্রিটিশ জনগণ তাদের সাম্রাজ্য ও ঔপনিবেশিক অতীত নিয়ে গর্বিত, আবার অনেকে রয়েছে ভিন্নমত। শতকরা ৪৪ ভাগ ব্রিটিশ তাদের ঔপনিবেশিক অতীত নিয়ে গর্বিত আর শতকরা ২১ ভাগ এ নিয়ে অনুতপ্ত। এ ছাড়া বাকি ২৩ ভাগ কোনো পক্ষেই অবস্থান নেয়নি। একই জরিপের শতকরা ৪৩ ভাগ ব্রিটিশ নাগরিক তাদের সাম্রাজ্যের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে আর শতকরা ১৯ ভাগ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিষয়ে খুশি নয় বলে জানান।
১৯২২ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন, আর আয়তনে সারা বিশ্বের মোট স্থলভাগের চার ভাগের এক ভাগ। অনেকেই বলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা এলাকাগুলোয় সে সময় ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে। অন্য দিকে সমালোচকেরা বিভিন্ন জায়গায় সংঘটিত গণহত্যা, দুর্ভিক্ষ, নির্যাতনকেন্দ্রগুলোসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করেন এই সাম্রাজ্যের দুর্বলতা হিসেবে। সে সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে এ রকম কিছু নৃশংসতার বর্ণনা তুলে ধরা হলোÑ 
১. দক্ষিণ আফ্রিকার বোয়ার বন্দিশিবির
১৮৯৯-১৯০২ সময়কালে দক্ষিণ আফ্রিকায় সংঘটিত দ্বিতীয় বোয়ার যুদ্ধ। যুদ্ধে জয়ের পর বোয়ার জনগোষ্ঠীর প্রায় এক ষষ্ঠাংশ লোককে বন্দী করে ব্রিটিশেরা, যাদের বেশির ভাগই ছিল নারী ও শিশু। বন্দিশিবিরে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দী, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রোগের প্রাদুর্ভাব আর খাদ্য সঙ্কটের কারণে তাদের বড় একটি মারা যায়। প্রায় এক লাখ সাত হাজার বোয়ার লোককে বন্দী করা হয়, যাদের মধ্যে ২৮ হাজার মৃত্যুবরণ করে। এসব বন্দিশিবিরে বোয়ার ছাড়া অন্যান্য জনগোষ্ঠীর কালো আফ্রিকান লোক ছিল অনেক। তাদের মধ্যেও প্রচুর লোক একই পরিণতি বরণ করে।
২. জালিয়ানওয়ালা বাগের গণহত্যা
১৯১৯ সালে ১৩ এপ্রিল নববর্ষের দিনে সংঘটিত হয় ভারতীয় উপমহাদেশের ভয়াবহতম গণহত্যা। সে দিন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের অন্যায্য আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসরের সাধারণ মানুষ। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের দেয়ালঘেরা জালিয়ানওয়ালা উদ্যানের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখে ব্রিটিশ সৈন্যরা। এরপর ব্রিগেডিয়ার রেজিনাল্ড ডায়েরের নির্দেশে অবরুদ্ধ জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় ভারতীয় ব্রিটিশ সৈন্যরা। সাথে থাকা গুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত একটানা হত্যাকাণ্ড চালায় সেনারা। কয়েক মিনিটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে কয়েক শ’ বিক্ষোভকারী। সরকারি হিসেবে নিহতের সংখ্যা ৩৭৯ জন বলা হলেও প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি ছিল। ওই ঘটনায় আহত হয় আরো অন্তত ১১০০ জন।
ব্রিটিশ জনগণ এই হত্যাকাণ্ডের হোতা ব্রিগেডিয়ার ডায়েরকে ‘হিরো’ হিসেবে ঘোষণা দেয়, তারা পুরস্কার হিসেবে তাকে ২৬ হাজার ইউরো প্রদান করে।
৩. কেনিয়ার মোও মোও বিদ্রোহ
১৯৫১-৬০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশশাসিত কেনিয়া শাসকদের বিরুদ্ধে এ বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। পরাজিত কিকুয়ু উপজাতীয় সৈন্যদের বিভিন্ন ক্যাম্পে বন্দী করে রাখে ব্রিটিশেরা। বন্দী সৈন্যদের ধারাবাহিকভাবে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করা হয়। অনেকেরই ভাগ্যে লেখা হয় মৃত্যু। ইতিহাসবিদ ডেভিড এন্ডারসনের মতে, এই বিদ্রোহে ব্রিটিশ সৈন্যদের হাতে ২০ হাজার লোক নিহত হয়েছে। তবে আরেক ইতিহাসবিদ ক্যারোলিন এলকিন্সের মতে নিহতের সংখ্যা এক লাখের বেশি হবে।
৪. ভারতের দুর্ভিক্ষ 
ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে অনাহারে দুই কোটির বেশি লোক নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে সময় শাসকগোষ্ঠী হাজার হাজার টন গম ব্রিটেনে রফতানি করার কারণে এই দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়েছে।
১৯৪৩ সালে ৪০ লাখ ভারতীয় অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছিল। প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য এবং গ্রিসসহ বিভিন্ন দেশে ভারত থেকে খাদ্য নেয়ার কার্যক্রম শুরু করেন। যার ফলে বাংলায় শুরু হয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সেই দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে চার্চিল বলেছিলেন, ‘আমি ভারতীয়দের ঘৃণা করি। তার বিশ্রি ধর্মের এক বিশ্রি জনগোষ্ঠী। খরগোশের মতো সন্তান জন্ম দিয়ে এই দুর্ভিক্ষ তারাই ডেকে এনেছে।’

‘তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেনা?’- আল মুমিনুনঃ ৬৮

তাদাব্বুর’ একটি আরবি শব্দ যার অর্থ ‘গভীর চিন্তা’, ‘গভীর ভাবনা’। কুরআনে সরাসরি এই শব্দটা এসেছে৷ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা কুরআনের ব্যাপারে ‘তাদাব্বুর’ তথা গভীর চিন্তা-ভাবনা করার কথা বেশ কয়েক জায়গায় বলেছেন।

‘তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেনা?’- আল মুমিনুনঃ ৬৮

‘আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে, এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করতে পারে’- সূরা ছ্বোয়াদঃ ২৯

‘তারা কি কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করেনা? এটা যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে নাযিল হতো, তাহলে তারা এতে অনেক বৈপরীত্য দেখতে পেতো’- আন নিসাঃ ৮২

‘তারা কি কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করেনা? নাকি তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?’- সূরা মুহাম্মাদঃ ২৪

কুরআনকে গভীরভাবে বুঝতে না পারলে, উপলব্ধি করতে না পারলে কুরআনের শিক্ষাগুলোকে জীবনে বাস্তবায়ন করা যায় না। কেমন দেখায় যে দয়াময় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা আমার সাথে কথা বলছেন, অথচ তার কথার কিছুই আমি বুঝতে পারছিনা। বোঝার চেষ্টা করছিনা!! খুবই খারাপ লাগার কথা না?

কুরআনের তাদাব্বুর মানেই হলো কুরআন নিয়ে ভাবা। কুরআন নিয়ে চিন্তা করা। আমাদের জীবনে আমরা হয়তো অনেকবার কুরআন পড়েছি এবং ইন শা আল্লাহ ভবিষ্যতেও পড়বো। এখন, কুরআন পড়তে গিয়ে কুরআনের কোন ব্যাপারটা আমাকে একেবারে ভিতর থেকে নাড়া দিয়ে গেছে? কুরআনের কোন আয়াতটা পড়ে মনে হয়েছে- ‘আরেহ! এই আয়াত তো মনে হয় আমার জন্য এক্ষুণি নাযিল হয়েছে। আমি তো এই সমাধানই চাচ্ছিলাম। আমি তো এই কথাগুলোই ভাবছিলাম’।

হয়নি এরকম কখনো? যদি হয়ে থাকে তাহলে সেই সূরা, সেই আয়াত নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা, ভালোবাসা, ভালোলাগা আমাদের সাথে শেয়ার করুন। আপনার সেই অভিজ্ঞতা হয়তো অন্য অনেককেও কুরআন নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে সহায়ক হবে, ইন শা আল্লাহ।

এখানে কুরআনের শব্দ বিশ্লেষণ আসতে পারে। আসতে পারে বাক্য বিন্যাসের ব্যাপার, ভাষার অলঙ্কারিক দিকগুলোও আলোচনায় নিতে আসতে পারেন। মোদ্দাকথা, কুরআন সম্পর্কিত আপনার জীবন ঝুলিতে যতো অভিজ্ঞতা আছে, তার সবটা শেয়ার করার জন্যই আমাদের- তাদাব্বুরে কুরআন।

এই রামাদান হোক আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ রামাদান। এই রামাদানে কুরআনের সাথে তৈরি হোক আমাদের এক অন্যরকম সম্পর্ক। আমরা কুরআনকে ভালোবাসবো তাদাব্বুরের সাথে।

ঢাকার প্রত্যেকটা মসজিদে এসি অথচ ফুটপাতে অসংখ্য অভুক্ত বনী আদম

ঢাকার প্রত্যেকটা মসজিদে এসি অথচ ফুটপাতে অসংখ্য অভুক্ত বনী আদম । এটা কোন মুসলীম জনবসতির চিত্র হতে পারেনা । বাইরে অভুক্ত বনি আদম রেখে ভেতরে নামাজ কতটুকু কবুল হবে তা কবুলিয়াতের মালিক আমাদের রব ই বলতে পারেন । তবে তিনি এমন কোন বিধান নাজিল করেন নি । এ দায় সমাজপতিদের আর কিছুটাতো অবশ্যই আমার ও আপনার………..ঢাকার প্রত্যেকটা মসজিদে এসি অথচ ফুটপাতে অসংখ্য অভুক্ত বনী আদম
ঢাকার প্রায় প্রত্যেকটা মসজিদে এসি, ফ্লোরে দামী মারভেল পাথর। অথচ ফুটপাতে অসংখ্য বনী আদম অভুক্ত, বস্ত্রহীন। এর জন্য দায়ী এই শহরের পেশাদার ইমাম শ্রেণি।
এরা বেছে বেছে মসজিদে দান-সদকা বিষয়ক হাদিস শুনায়, আর মুসল্লিদের বলে মসজিদে দান করতে। এমনকি সরকারি মসজিদগুলিতেও টাকা তোলা হয় পাবলিকের কাছ থেকে। মসজিদ কমিটি ইমাম নিয়োগ দেয়ার সময় খেয়াল করে ইমাম টাকা সংগ্রহ করতে পটু কিনা।
আল্লাহ সুরা সফে বলেছেন, নিজে যে কাজ কর না, তা অন্যকে করতে বলো না, অধিকাংশ ইমাম এই আয়াতের উল্টাটা করে, নিজে কখনো দান করে না, পাবলিকরে বলে দান করতে। আমি কদাচিৎ দেখেছি কোনো মসজিদের ইমাম সেই মসজিদে দান করেছে, আপনি দেখেছেন কাউকে? পাবলিকের সেন্টিমেন্টটাই এরা চেঞ্জ করে ফেলেছে। পাবলিক ৫০০ টাকা দান করলে ৪৯৯ টাকা করে মসজিদে, ১ টাকা দেয় মসজিদের সামনে দাঁড়ানো ভিক্ষুককে। অথচ হওযার কথা ছিল উল্টোটা।
ইমামদের এই ভূমিকার কারণ কি? কারণ সহজ, মসজিদের ফান্ড বাড়লে তাদের বেতনও বাড়বে। তারা মসজিদে পেশাদার ইমাম। কে ফুটপাতে থাকল, কে ল্যাংটা থাকল সেটা তাদের দেখার বিষয় না।
আপনি যদি জরিপ করেন, দেখবেন মসজিদের দানের শতকরা ৯০ টাকা হচ্ছে অবৈধ রোজগারের টাকা, ঘুষখোর বা দুর্নীতিবাজদের টাকা। এরা দান করে রাতে ভালোমত ঘুমানোর জন্য। সকালে ৫ লাখ ঘুষ খেয়ে এশার নামাজে মসজিদে ৫০ হাজার দান করে মনের খুতখুতানি দূর করার জন্য। ইমাম নিজেও জানে, এই টাকা ঘুষের টাকা, তবু জোরেসোরে আলহামদুলিল্লাহ বলে। এইসব অবৈধ রোজগারের টাকায় ইমামের বেতন বাড়ে, ইমাম তাই মনের ভুলেও জুমার খুতবায় ঘুষের বিরুদ্ধে হাদিস শুনায় না।
“আপনি যা খাবেন, আপনার চরিত্রে তার প্রভাব পড়বে।” you eat junk food, you behave junky. এটা স্বতসিদ্ধ। এর বাস্তব দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের এইসব ইমামরা। এদের রিযিক হালাল না, তাই এদের চরিত্রে মোসাহেবি স্বভাব বিদ্যমান। এরা কথা বলে বিলাইর মত মিউ মিউ করে। কারো বিরুদ্ধে না যায় এমন কোনো টপিক নিয়ে আসে জুমার খুতবায়। দেখেন না রাজনৈতিক নেতারা তাদের দাঁড়া করিয়ে মিম্বারে বসে থাকে।
চেতিয়েন না, কড়া কথা বললাম। কাউকে না কাউকে তো বলতেই হবে। আমিই না হয় বললাম। তবে হা, সব ইমাম এরকম না, ব্যতিক্রম আছেন। কিন্তু তাদের সংখ্যা এত কম যে হাতের কড়ে গোনা যায়। দুঃখটা এখানে।
আমার সাথে ইমামদের জমি-জমার ক্যাচাল নাই। আমি নিজেই পার্টটাইম ইমামতি করেছি নানা জায়গায়। আমার বাবাও মসজিদের ইমাম, খতিব, তবে পেশাজীবী না। ৩০ বছরের অধিক সে বিনা টাকায় ইমামতি করেন। নিজেই মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা। এ কারণে কথা বলার সময় মোসাহেবি করা লাগে না তার।
আরবি শব্দ ইমাম মানে হল নেতা, লিডার। লিডার কথা বলবে সিংহের মত, বিড়ালের মত মিউ মিউ করে না। সিংহ কখন মিউ মিউ করে জানেন?যখন সে বিড়ালের মত ছানাভাত বা উচ্ছিস্ট খায় তখন। যে যা খাবে তার চরিত্রে তার প্রভাব পড়বেই পড়বে।

সামাজিক ডারউইনিজম ও বিবর্তনবাদ

গাঁজাখোরী #বিবর্তনবাদের সাথে #সামাজিক_ডারউইনিজম অনুসারে যারা দূর্বল, অসহায়, দরিদ্র, অসুস্থ্য, পঙ্গু, বিকলাঙ্গ ও পশ্চাদপদ তাদেরকে কোন প্রকার দয়া প্রদর্শন না করে ধ্বংস করে দিতে হবে । আর এই থিউরীর উপর ভিত্তি করে ১৯৪৪ সালে জার্মানিতে হিটলার এক মানবতা বিধ্বংসী প্রজেক্ট চালু করে । সে প্রথমে পঙ্গু ও বিকলাঙ্গের একটি সেইফ হাউজে জমা করে এবং তাদের মেরে ফেলে । সে একাজটি তার শত্রু ইহুদীদের দিয়ে শুরু করে । আর উন্নত একটি মানব প্রজাতি বানানোর জন্য সে দেশের সব সেরা সুন্দরী ও মেধাবী নারীদের একটি এলাকায় জড়ো করে । এবং উন্নত প্রজাতির মেধাবী সন্তান জন্মানোর জন্য স্বাস্থ্যবান মেধাবী ও তরুণ আর্মি আফিসাররা ওখানে নিয়মিত আসাযাওয়া করতে থাকে ।

আসল কথা হলো #জুমাতুল_বিদা বলে ইসলামে কিছু নেই ।

আসল কথা হলো #জুমাতুল_বিদা বলে ইসলামে কিছু নেই ।।
#মাহে_রমজানের শেষ জুমার দিন ‘জুমাতুল বিদা’ নামে পরিচিত। এদিন রমজান মাসের শেষ জুমা হিসেবে ‘আল কুদস দিবস’ও পালিত হওয়ায় এর গুরুত্ব, তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য অপরিসীম। সাপ্তাহিক জুমার নামাজ মুসলমানদের বৃহত্তর জামাতে অনুষ্ঠিত হয়। রমজান মাসের জুমাবার আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে। এক মাসের সিয়াম সাধনা শেষে মুসলিম মনে ঈদুল ফিতরের যে আনন্দ আসে তারই বার্তা জানান দেয় জুমাতুল বিদা।
প্রতি সপ্তাহের জুমা দিবসে মুসলিম মনে এক নয়া জাগরণ সৃষ্টি হয়। ইসলামে জুমাতুল বিদা’র সরাসরি গুরুত্ববহনকারী কোনো বক্তব্য না পাওয়া গেলেও একে কেন্দ্র করে মানুষের হৃদয়ে আনন্দ বয়ে যায়। কোনো কোনো মানুষের ধারণা, জুমাতুল বিদা’র বিশেষ ফজিলত রয়েছে। তারা এ জুমাকে খুব গুরুত্ব দেয় এবং একে শরিয়ত-নির্দেশিত ফজিলতপূর্ণ দিবস-রজনীর অন্তর্ভুক্ত মনে করে। ফলে এ জুমা আদায়ের জন্য পারতপক্ষে এলাকার সবচেয়ে বড় মসজিদে গমন করে। সাথে সাথে এ জুমায় মুসল্লির সমাগমও বেশি হয়। কিন্তু শরিয়তে ‘জুমাতুল বিদা’ বলে আলাদা ফজিলতের কিছু নেই। এটি একটি নব আবিষ্কৃত পরিভাষা। এর কোনো বিশেষ ফজিলত কুরআন-হাদিসে পাওয়া যায় না। বরং এটি রমজানের অন্যান্য জুমার মতই ফজিলত রাখে; বাড়তি কোনো ফজিলত এ সম্পর্কে প্রমাণিত নয়।
এ কথা ঠিক যে, জুমার দিন একটি ফজিলতপূর্ণ দিবস। সাথে সাথে রমজানের জুমার দিন হিসেবে তার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। তাই বলে ‘হাজ্জাতুল বিদা’-এর সাথে মিল রেখে ‘জুমাতুল বিদা’ নামকরণ এবং এর বাড়তি প্রচার-প্রচারণার কোনো ভিত্তি নেই। ঐ দিবস-রজনীকেই আমরা ফজিলতের দিবস-রজনী মনে করবো, কুরআন-হাদিসে যার বিশেষ কোনো ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। সাথে সাথে কিছু মানুষের মাঝে রমজানের শেষ জুমাকেন্দ্রিক আরেকটি মনগড়া আমলেরও প্রচলন রয়েছে। তা হলো, এদিন নাকি বিশেষ পদ্ধতিতে চার রাকাত নামাজ আদায় করলে তা সারা জীবনের কাজা নামাজের কাফফারা হবে! এ বর্ণনা ও আমল সবই জাল ও বাতিল। আল্লামা শাওকানী (রাহ.) তার জাল হাদীস বিষয়ক রচনা ‘আলফাওয়াইদুল মাজমুআহ’তে রমজানের শেষ জুমার নামাজ বিষয়ে আরেকটি জাল বর্ণনা উল্লেখ করেছেন- ‘এদিন যে ব্যক্তি সারা দিন-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ (গুরুত্বের সাথে) আদায় করবে, এর দ্বারা তার সারা বছরের ছুটে যাওয়া নামাজের কাজা আদায় হয়ে যাবে।’ এটি উল্লেখ করার পর তিনি বলেন- ‘প্রশ্নাতীতভাবে এটি একটি জাল বর্ণনা।’

বাংলাদেশে রমজান মাসের শেষ জুমাকে জুমাতুল বিদা হিসেবে পালন ও অভিহিত করা হয়। জুমাতুল বিদা দ্বারা রমজানের শেষ জুমা বোঝানো হয়। কোনো কোনো মানুষের ধারণা, এর বিশেষ ফজিলত রয়েছে। তারা এ জুমাকে খুব গুরুত্ব দেয় এবং একে শরিয়ত নির্দেশিত ফজিলতপূর্ণ দিবস-রজনীর অন্তর্ভুক্ত মনে করে। ফলে তারা এ জুমা আদায়ের জন্য পারতপক্ষে এলাকার সবচেয়ে বড় মসজিদে গমন করে। সেই সঙ্গে এ জুমায় মুসল্লির সমাগমও বেশি হয়।
কিন্তু ইসলামি শরিয়তে জুমাতুল বিদা বলে আলাদা ফজিলতের কিছু নেই। এটি একটি নব আবিষ্কৃত পরিভাষা। এর কোনো বিশেষ ফজিলত কোরআন-হাদিসে পাওয়া যায় না। নবী করিম (সা.), সাহাবায়ে কেরাম কেউ এর আমল করেননি। বরং এটি রমজানের অন্যান্য জুমার মতোই ফজিলত রাখে; এর বাড়তি কোনো ফজিলত প্রমাণিত নয়।
অনেকে এ দিনে বিশেষভাবে দোয়া করেন। কেউ কেউ মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেন। অনেকে আবার এ দিন উপলক্ষে বিশেষ কিছু নামাজ পড়েন, ইফতার আয়োজনও করেন। পত্র-পত্রিকা ও অনলাইন ও টেলিভিশনে নিউজ আসে, ‘যথাযোগ্য মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে সারাদেশে জুমাতুল বিদা পালিত হয়েছে।’ এসব ভুল ও বিদআত।

তবে হ্যাঁ, জুমার দিন একটি ফজিলতপূর্ণ দিবস। ইসলামে আলাদাভাবে শুক্রবারের বিভিন্ন ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু জুমাতুল বিদার কোনো কথা বলা নেই।

যেমন হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সঙ্গে একদিন শুক্রবারের ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, সেই সময়টায় যদি কোনো মুসলিম নামাজ আদায়রত অবস্থায় থাকে এবং আল্লাহতায়ালার কাছে কিছু চায়, আল্লাহতায়ালা অবশ্যই তার সে চাহিদা বা দোয়া কবুল করবেন এবং এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) তার হাত দিয়ে ইশারা করে সময়টির সংক্ষিপ্ততার ইঙ্গিত দেন। -সহিহ বোখারি

ইসলামি স্কলাররা ওই সময় সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। কোনো কোনো বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘ইমামের মিম্বরে বসার সময় থেকে নামাজ শেষ করা পর্যন্ত সময়টিই সেই বিশেষ মুহূর্ত।’ -সহিহ মুসলিম

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) বর্ণনা করেন, শুক্রবার আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দোয়া কবুল হয়। বিখ্যাত সিরাতগ্রন্থ যাদুল মায়াদে বর্ণিত আছে, জুমার দিন আসরের নামাজ আদায়ের পর দোয়া কবুল হয়। জুমার দিনের বিশেষ সেই মুহূর্ত সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনায় বলা হয়েছে, জুমার নামাজে সূরা ফাতিহার পর আমিন বলার সময়, আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়, মুয়াজ্জিন আজান দেওয়ার সময়, জুমার দিন সূর্য ঢলে পড়ার সময়, ইমাম খুতবা দেওয়ার জন্য মিম্বরে দাঁড়ানোর সময়। উভয় খুতবার মধ্যবর্তী সময় ও জুমার দিন ফজরের আজানের সময়। সুতরাং শুক্রবারের আলাদা গুরুত্বের কথা স্বীকৃত, কিন্তু জুমাতুল বিদার কোনো আলাদা ফজিলতের কথা কোথাও বলা হয়নি। এটাকে ইসলামি স্কলাররা সমর্থন করেন না। সুতরাং জুমাতুল বিদা বলে নতুন কিছু রসম-রেওয়াজ পালন করা থেকে সবার বিরত থাকা কর্তব্য।

একাত্তরের ঘাতক ও যু্ধাপরাধী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মালিক মেজর জেনারেল (অব) আমজাদ খান চৌধুরী

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী মেজর জেনারেল আমজাদ খান চৌধুরী (অব) ছিলেন কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী, বাঙালি বংশোদ্ভূত পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় রংপুর ক্যান্টনমেন্টে বিএম-২৩ বিগ্রেডে মেজর আমজাদ খান চৌধুরীর অধীনে বাঙালি সেনা-মুক্তিযোদ্ধা-সাধারণ মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটে। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সামরিক সমরেও অংশ নেন। রংপুরে অবস্থানকালে তিনি হত্যা, ধর্ষণ এবংহিন্দুদের ঘর-বাড়ি লুটপাটে মদদ দেন।
স্বাধীনতা পরবর্তীতে পাকিস্তানে আটকে পড়া সাড়ে ৪ লাখ বাঙালির সাথে দেশে ফিরে ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটকে পড়া সেনা কর্মকর্তা’ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন আমজাদ খান চৌধুরী। জেনারেল শফিউল্লাহ ও জিয়ার সহযোগিতায় তিনি সেনাবাহিনীতে পদোন্নতি পেয়ে মেজর জেনারেল পর্যন্ত হয়েছেন। ১৯৮১ সালে বগুড়া ক্যান্টনমেন্টের জমি অধিগ্রহণের টাকা চুরির অভিযোগে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর পেয়ে ব্যবসায় নামেন তিনি।
আমজাদ খান চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার যুদ্ধাপরাধী পরিচয়কে আড়াল করে তার ব্যবসায়ী পরিচয় সামনে রেখে গণমাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর পরিবেশন করা হয়। এমনকি রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে শোক প্রকাশও করা হয়।
আমজাদ খান ছিলেন কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের সদস্য। কিন্তু মৃত্যুর পর তাকে মুসলিম হিসেবে গণমাধ্যমে পরিচয় দেওয়া হয়। মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেওয়ার নেপথ্যে কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় আমজাদ খান চৌধুরী সন্দেহাতীতভাবে একজন যুদ্ধাপরাধী।
যুদ্ধাপরাধী আমজাদ খান চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৯ সালের ১০ নভেম্বর। তার পিতা মুসলিম লীগপন্থি রাজনীতিতে বিশ্বাসী আলী কাশেম খান চৌধুরী ও মাতা আমাতুর রহমান।
ঢাকার বকশিবাজারের আহমাদিয়াদের (কাদিয়ানী) সেন্টারের পাশে নবকুমার ইনস্টিউটে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ১৯৫৬ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ান স্টাফ কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন।
আজমাদ খানের নির্দেশে রংপুরে বাঙালি সেনা হত্যা:
১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা বাঙালিদের উপর গণহত্যা শুরু করলে ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এর ৪ দিনের মাথায় ৩০ মার্চ রংপুর বিগ্রেড হেডকোয়ার্টারে যাওয়ার পথে ৩য় বেঙ্গল ব্যাটালিয়ানের সিরাজ এবং তার ১০-১২ জন প্রহরীর মধ্যে একজন ছাড়া বাকিদের হত্যা করা হয়। এসময় রংপুর বিগ্রেডের গুরুত্বপূর্ণ বিগ্রেড মেজর পদে আসীন ছিলেন মেজর আমজাদ খান চৌধুরী।
কর্নেল শাফায়াত জামিলের লেখায় যুদ্ধাপরাধী মেজর আমজাদ খান চৌধুরী:
বাঙালি সেনা হত্যায় আমজাদ খান চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতার ঘটনা কর্নেল শাফায়াত জামিল বীরবিক্রম তাঁর ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য আগস্ট এবং ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর’ বইয়ের ৫০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন। জামিল লিখেছেন, ‘৩০ মার্চ ৩য় বেঙ্গল ব্যাটেলিয়ানের সিরাজকে রংপুর হেডকোয়ার্টারে একটি কনফারেন্সে যোগ দেয়ার জন্য পাঠানো হয়। তাঁর সঙ্গে ১০-১২ জন প্রহরী ছিল। পাকিস্তানিরা পথে তাঁদের বন্দি করে সেই রাতেই নির্মমভাবে হত্যা করে। দলটির মাত্র একজন সদস্য দৈবক্রমে বেঁচে যায়। পরে সে ৩য় বেঙ্গলের সাথে মিলিত হতে পেরেছিল। উল্লেখ্য তখন রংপুর বিগ্রেডের গুরুত্বপূর্ণ বিগ্রেড মেজর পদে আসীন ছিলেন মেজর আমজাদ খান চৌধুরী। আজমাদ খান চৌধুরীর নির্দেশেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।’
মেজর আমজাদ খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তার বাংলাদেশ ছেড়ে পাকিস্তান যাওয়া ও বাংলাদেশে ফেরার ব্যাপারে দুটি ভাষ্য পাওয়া যায়। একটি ভাষ্যমতে, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সাথে আমজাদ খানও মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। পরে যুদ্ধবন্দী হিসেবে তাকে ভারতে নিয়ে আটকে রাখা হয়। ১৯৭২ সালের ২ আগস্ট ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঐতিহাসিক সিমলা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৭২ সালে ৪ আগস্ট চুক্তি কার্যকর হলে চুক্তির শর্তানুসারে ভারত বিনা বিচারে সকল যুদ্ধবন্দীদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠায়। আমজাদ খানও তাদের সাথে পাকিস্তান চলে যান।
আরেকটি ভাষ্যমতে, আমজাদ খান চৌধুরী অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে পাকিস্তানে বদলি হয়ে গিয়েছিলেন। পরে পাকিস্তানে আটকে পড়া সাড়ে চার লাখ বাঙালির সাথে দেশে ফিরে আসেন এবং দেশে ফিরে নিজেকে ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটকে পড়া সেনা কর্মকর্তা’ পরিচয় দিয়ে জেনারেল শফিউল্লাহ ও জিয়ার সহযোগিতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন।
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আমজাদ খান চৌধুরী:
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেও বিতর্কিত ভূমিকা রয়েছে তার। শাফায়াত জামিল-এর বরাতে জানা যায়, ‘তিনি (আমজাদ খান) ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কুমিল্লার বিগ্রেড কমান্ডার ছিলেন এবং তাঁরই নিয়োজিত সেনাদল বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের পাহারার দায়িত্বে ছিলেন। রহস্যজনক ভাবে আক্রমণকারীদের প্রতিরোধে এরা সেদিন ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে সব সম্ভবের দেশে তিনি মেজর পদে উন্নীত হয়েছিলেন।’
১৯৮১ সালে বগুড়া ক্যান্টনমেন্টের জমি অধিগ্রহণের টাকা চুরির অভিযোগে সেনাবাহিনী থেকে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। অবসরের পর ১৯৮১ সালে সেই চুরির টাকায় গড়ে তোলেন রংপুর ফাউন্ড্রি লিমিটেড (আর এফ এল)। ১৯৮৫ সালে গড়ে তোলেন এগ্রিকালচার মার্কেটিং কোম্পানি যার ব্র্যান্ড নাম প্রাণ।
একাত্তরের কুখ্যাত এই যুদ্ধাপরাধী ও বাঙালি সেনা হত্যাকারী হলেও ঢাকার সামরিক কবরস্থানে আমজাদ খান চৌধুরীকে কবর দেওয়া হয়।