ব্রিটিশ শাসনের ভয়াবহ কয়েকটি নৃশংসতা
১৯৪৫ সালের দুর্ভিক্ষের সময় ভারতের একটি এলাকায় হাড্ডিসার কয়েক শিশু (ফাইল ফটো)
একটা সময় বিশ্বের বড় একটি অংশ ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। সারা বিশ্বে বেশির ভাগ এলাকা দাপিয়ে বেড়িয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সৈন্যরা। তাদের শাসন ও ঔপনিবেশিকতা নিয়ে মিশ্র ধারণা পোষণ করেন ব্রিটিশ নাগরিকেরা।
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউগভের একটি জরিপে দেখা গেছে অনেক ব্রিটিশ জনগণ তাদের সাম্রাজ্য ও ঔপনিবেশিক অতীত নিয়ে গর্বিত, আবার অনেকে রয়েছে ভিন্নমত। শতকরা ৪৪ ভাগ ব্রিটিশ তাদের ঔপনিবেশিক অতীত নিয়ে গর্বিত আর শতকরা ২১ ভাগ এ নিয়ে অনুতপ্ত। এ ছাড়া বাকি ২৩ ভাগ কোনো পক্ষেই অবস্থান নেয়নি। একই জরিপের শতকরা ৪৩ ভাগ ব্রিটিশ নাগরিক তাদের সাম্রাজ্যের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে আর শতকরা ১৯ ভাগ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিষয়ে খুশি নয় বলে জানান।
১৯২২ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন, আর আয়তনে সারা বিশ্বের মোট স্থলভাগের চার ভাগের এক ভাগ। অনেকেই বলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা এলাকাগুলোয় সে সময় ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে। অন্য দিকে সমালোচকেরা বিভিন্ন জায়গায় সংঘটিত গণহত্যা, দুর্ভিক্ষ, নির্যাতনকেন্দ্রগুলোসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করেন এই সাম্রাজ্যের দুর্বলতা হিসেবে। সে সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে এ রকম কিছু নৃশংসতার বর্ণনা তুলে ধরা হলোÑ
১. দক্ষিণ আফ্রিকার বোয়ার বন্দিশিবির
১৮৯৯-১৯০২ সময়কালে দক্ষিণ আফ্রিকায় সংঘটিত দ্বিতীয় বোয়ার যুদ্ধ। যুদ্ধে জয়ের পর বোয়ার জনগোষ্ঠীর প্রায় এক ষষ্ঠাংশ লোককে বন্দী করে ব্রিটিশেরা, যাদের বেশির ভাগই ছিল নারী ও শিশু। বন্দিশিবিরে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দী, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রোগের প্রাদুর্ভাব আর খাদ্য সঙ্কটের কারণে তাদের বড় একটি মারা যায়। প্রায় এক লাখ সাত হাজার বোয়ার লোককে বন্দী করা হয়, যাদের মধ্যে ২৮ হাজার মৃত্যুবরণ করে। এসব বন্দিশিবিরে বোয়ার ছাড়া অন্যান্য জনগোষ্ঠীর কালো আফ্রিকান লোক ছিল অনেক। তাদের মধ্যেও প্রচুর লোক একই পরিণতি বরণ করে।
২. জালিয়ানওয়ালা বাগের গণহত্যা
১৯১৯ সালে ১৩ এপ্রিল নববর্ষের দিনে সংঘটিত হয় ভারতীয় উপমহাদেশের ভয়াবহতম গণহত্যা। সে দিন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের অন্যায্য আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসরের সাধারণ মানুষ। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের দেয়ালঘেরা জালিয়ানওয়ালা উদ্যানের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখে ব্রিটিশ সৈন্যরা। এরপর ব্রিগেডিয়ার রেজিনাল্ড ডায়েরের নির্দেশে অবরুদ্ধ জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় ভারতীয় ব্রিটিশ সৈন্যরা। সাথে থাকা গুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত একটানা হত্যাকাণ্ড চালায় সেনারা। কয়েক মিনিটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে কয়েক শ’ বিক্ষোভকারী। সরকারি হিসেবে নিহতের সংখ্যা ৩৭৯ জন বলা হলেও প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি ছিল। ওই ঘটনায় আহত হয় আরো অন্তত ১১০০ জন।
ব্রিটিশ জনগণ এই হত্যাকাণ্ডের হোতা ব্রিগেডিয়ার ডায়েরকে ‘হিরো’ হিসেবে ঘোষণা দেয়, তারা পুরস্কার হিসেবে তাকে ২৬ হাজার ইউরো প্রদান করে।
৩. কেনিয়ার মোও মোও বিদ্রোহ
১৯৫১-৬০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশশাসিত কেনিয়া শাসকদের বিরুদ্ধে এ বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। পরাজিত কিকুয়ু উপজাতীয় সৈন্যদের বিভিন্ন ক্যাম্পে বন্দী করে রাখে ব্রিটিশেরা। বন্দী সৈন্যদের ধারাবাহিকভাবে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করা হয়। অনেকেরই ভাগ্যে লেখা হয় মৃত্যু। ইতিহাসবিদ ডেভিড এন্ডারসনের মতে, এই বিদ্রোহে ব্রিটিশ সৈন্যদের হাতে ২০ হাজার লোক নিহত হয়েছে। তবে আরেক ইতিহাসবিদ ক্যারোলিন এলকিন্সের মতে নিহতের সংখ্যা এক লাখের বেশি হবে।
৪. ভারতের দুর্ভিক্ষ
ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে অনাহারে দুই কোটির বেশি লোক নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে সময় শাসকগোষ্ঠী হাজার হাজার টন গম ব্রিটেনে রফতানি করার কারণে এই দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়েছে।
১৯৪৩ সালে ৪০ লাখ ভারতীয় অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছিল। প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য এবং গ্রিসসহ বিভিন্ন দেশে ভারত থেকে খাদ্য নেয়ার কার্যক্রম শুরু করেন। যার ফলে বাংলায় শুরু হয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সেই দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে চার্চিল বলেছিলেন, ‘আমি ভারতীয়দের ঘৃণা করি। তার বিশ্রি ধর্মের এক বিশ্রি জনগোষ্ঠী। খরগোশের মতো সন্তান জন্ম দিয়ে এই দুর্ভিক্ষ তারাই ডেকে এনেছে।’











