প্রসঙ্গঃ #ঈদের_নামাজের_তাকবীর_সংখ্যা


ঈদের সালাত সুন্নত বা মতভেদে ওয়াজিব(ফরজে কেফায়া) একটি ইবাদত।
আর এর তাকবীর সংখ্যা নিয়ে দলাদলি,হানাহানি,হিসা- বিদ্বেষ,ঘৃনার অন্ত নেই। এজাতীয় তৎপরতা বা মনোভাব হারাম এবং কখনই ইসলাম এসব সমর্থন করে না ।তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রত্যেক মু’মিনের অবশ্য কর্তব্য ৷ইবাদতে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করার ফলে সমাজে ইবাদত বিমুখতা বৃদ্ধি পায় ।যারা ইবাদতে সন্দেহ তৈরী করার চেষ্টা করে, সে সকল শায়খ/মাদানী থেকে দূরে থাকা সকলের উচিৎ ৷কেননা,আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার নির্দেশ হলোঃ‘এমন ব্যক্তির আনুগত্য কর না যার মনকে আমি আমার স্মরণ থেকে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কাজ হলো বাড়াবাড়ি ও সীমা লঙ্ঘন করা।’ (সূরা কাহ্ফ : ২৮)

প্রসঙ্গঃ #ঈদের_নামাজের_তাকবীর_সংখ্যা ।ঈদের সালাত সুন্নত বা মতভেদে ওয়াজিব(ফরজে কেফায়া) একটি ইবাদত।আর এর তাকবীর সংখ্যা নিয়ে দলাদলি,হানাহানি,হিসা- বিদ্বেষ,ঘৃনার অন্ত নেই। এ জাতীয় তৎপরতা বা মনোভাব হারাম এবং কখনই ইসলাম এসব সমর্থন করে না ।তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রত্যেক মু’মিনের অবশ্য কর্তব্য ৷ইবাদতে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করার ফলে সমাজে ইবাদত বিমুখতা বৃদ্ধি পায় ।যারা ইবাদতে সন্দেহ তৈরী করার চেষ্টা করে, সে সকল শায়খ/মাদানী থেকে দূরে থাকা সকলের উচিৎ ৷কেননা,আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার নির্দেশ হলোঃ‘এমন ব্যক্তির আনুগত্য কর না যার মনকে আমি আমার স্মরণ থেকে অমনোযোগী করে দিয়েছি, #যে_তার_প্রবৃত্তির_অনুসরণ_করে_এবং_যার_কাজ_হলো_বাড়াবাড়ি_ও_সীমা_লঙ্ঘন_করা।’ (সূরা কাহ্ফ : ২৮)
#বার_তাকবিরের_ঈদের_নামাজের হাদীসতো শুনেছেন । কেননা যারা ১২ তাকবিরের কথা বলে তারা ৬ তাকবিরের হাদীসগুলো বেমালুম চেপে যায় বা অস্বীকার করে ।
#ছয়_তাকবীরের_কয়েকটি_হাদীস নিন্মে প্রদত্ত হলো ।তার মানে এই নয় যে, ১২ তাকবিরের হাদীস গুলো সঠিক নয় । বরং১২ তাকবিরের হাদীস গুলোর উপরও আপনি চোখবুঝে আমল করতে পারেন । ইসলাম একটি সরল ও সকলের জন্য সহনীয় ফেক্সীবল জীবন বিধান । এটি যাষ্ট কোন ধর্ম নয় । এটি একটি টোটাল জীবন বিধান ।
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْعَلاَءِ، وَابْنُ أَبِي زِيَادٍ، الْمَعْنَى قَرِيبٌ قَالاَ حَدَّثَنَا زَيْدٌ، يَعْنِي ابْنَ حُبَابٍ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ ثَوْبَانَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ مَكْحُولٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي أَبُو عَائِشَةَ، جَلِيسٌ لأَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ سَعِيدَ بْنَ الْعَاصِ، سَأَلَ أَبَا مُوسَى الأَشْعَرِيَّ وَحُذَيْفَةَ بْنَ الْيَمَانِ كَيْفَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُكَبِّرُ فِي الأَضْحَى وَالْفِطْرِ فَقَالَ أَبُو مُوسَى كَانَ يُكَبِّرُ أَرْبَعًا تَكْبِيرَهُ عَلَى الْجَنَائِزِ ‏.‏ فَقَالَ حُذَيْفَةُ صَدَقَ ‏.‏ فَقَالَ أَبُو مُوسَى كَذَلِكَ كُنْتُ أُكَبِّرُ فِي الْبَصْرَةِ حَيْثُ كُنْتُ عَلَيْهِمْ ‏.‏ وَقَالَ أَبُو عَائِشَةَ وَأَنَا حَاضِرٌ سَعِيدَ بْنَ الْعَاصِ(رَوَاه ابُوْ دَاود فِىْ بَابِ بَابُ التَّكْبِيرِ فِي الْعِيدَيْنِ)‏
হযরত সাঈদ ইবনুল আস রহ. হযরত আবু মুসা আশআরী ও হযরত হুজাইফা রা.কে জিজ্ঞেস করলেন যে, রাসূলুল্লাহ স. দুই ঈদের নামাযে কতবার তাকবীর দিতেন? জবাবে হযরত আবু মুসা আশআরী রা. বললেন: জানাযার তাকবীরের মতো ৪ বার তাকবীর দিতেন। তখন হুজাইফা রা. বললেন: আবু মুসা সত্য বলেছেন। আবু মুসা রা. আরও বললেন: আমি বসরা থাকাবস্থায় এভাবেই তাকবীর বলতাম। বর্ণনাকারী আবু আয়েশা রহ. বলেন: আমি সাঈদ ইবনুল আস-এর নিকটে উপস্থিত ছিলাম। (আবু দাউদ: ১১৫৩)
হাদীসটির স্তর: হাসান। যায়েদ ইবনুল হুবাব এবং সাবিত বিন সাওবান ব্যতীত এ হাদীসের রাবীগণ সবাই-ই বুখারী-মুসলিমের রাবী। আর যায়েদ ইবনুল হুবাব صدوق “সত্যনিষ্ঠ”। (তাকরীব: ২৩২৬) সাবিত বিন সাওবান ثقةٌ “নির্ভরযোগ্য”। (তাকরীব: ৯০৭) শায়খ শুআইব আরনাউত মুসনাদে আহমাদের তাহকীকে এ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। (মুসনাদে আহমাদ: ১৯৭৩৪ নম্বর হাদীসের আলোচনায়) শায়খ আলবানীও হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। (সহীহ-জঈফ আবু দাউদ: ১১৫৩)
এ হাদীসে হযরত আবু মুসা আশআরী রা. ঈদের নামাযে চার-চার তাকবীরের কথা বলেছেন। এর ব্যাখ্যা হযরত ইবনে মাসউদের হদীসে বর্ণনা করা হয়েছে যে, প্রথম রাকাতে কিরাতের পূর্বে চার তাকবীর বলবে; যার মধ্যে তাকবীরে তাহরিমা একটি এবং ঈদের অতিরিক্ত তাকবীর তিনটি। আর দ্বিতীয় রাকাতে কিরাতের পরে চার তাকবীর বলবে; যার মধ্যে রুকুর তাকবীর একটি আর অতিরিক্ত তাকবীর তিনটি। অতএব, ঈদের নামাযের অতিরিক্ত তাকবীর সর্বমোট ছয়টি প্রমাণিত হলো। (আব্দুর রযযাক: ৫৬৮৭)
عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ وَيَحْيَى بْنُ عُثْمَانَ قَدْ حَدَّثَانَا ، قَالَا : ثنا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ عَنْ يَحْيَى بْنِ حَمْزَةَ قَالَ : حَدَّثَنِي الْوَضِينُ بْنُ عَطَاءٍ أَنَّ الْقَاسِمَ ، أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ حَدَّثَهُ ، قَالَ : حَدَّثَنِي بَعْضُ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ صَلَّى بِنَا ، النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ عِيدٍ ، فَكَبَّرَ أَرْبَعًا ، وَأَرْبَعًا ، ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَيْنَا بِوَجْهِهِ حِينَ انْصَرَفَ ، قَالَ : لَا تَنْسَوْا ، كَتَكْبِيرِ الْجَنَائِزِ ، وَأَشَارَ بِأَصَابِعِهِ ، وَقَبَضَ إبْهَامَهُ – فَهَذَا حَدِيثٌ حَسَنُ الْإِسْنَادِ وَعَبْدُ اللهِ بْنُ يُوسُفَ , وَيَحْيَى بْنُ حَمْزَةَ , وَالْوَضِينُ وَالْقَاسِمُ كُلُّهُمْ أَهْلُ رِوَايَةٍ , مَعْرُوفُونَ بِصِحَّةِ الرِّوَايَةِ
হযরত কাসেম বিন আব্দুর রহমান রহ. বলেন: রসূলুল্লাহ স.-এর কোন এক সাহাবা আমাকে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ স. আমাদেরকে ঈদের দিনে নামায পড়ালেন। তাতে ৪বার অতঃপর ৪বার তাকবীর বললেন। নামায শেষে আমাদের দিকে ফিরে বৃদ্ধাঙ্গুল বন্ধ করে হাতের অপর ৪ আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করে বললেন: তোমরা ভুলে যেও না, এটা জানাযার তাকবীরের মতো। (ত্বহাবী : ৭২৭৩ পৃষ্ঠা: ৪০০)
হাদীসটির স্তর: হাসান। ইমাম ত্বহাবী রহ. বলেন: এ হাদীসের সনদ হাসান। এ হাদীসের রাবীদের মধ্যে আলী বিন আব্দুর রহমান صدوق “সত্যনিষ্ঠ”। (তাকরীব: ৫৩৪৭) ইয়াহইয়া বিন উসমানের ব্যাপারে ইমাম জাহাবী বলেন: حافظ أخبارى له ما ينكر “হাফেজ, ঐতিহাসিক। তবে তাঁর কিছু মুনকার বর্ণনাও রয়েছে”। (আল কাশেফ: ৬২১৭) আব্দুল্লাহ বিন ইউসুফ বুখারীর রাবী। ইয়াহইয়া বিন হামযা বুখারী-মুসলিমের রাবী। ওয়াযিন বিন আতার ব্যাপারে ইমাম জাহাবী বলেন, ثقة ، و بعضهم ضعفه “তিনি নির্ভরযোগ্য, তবে কেউ কেউ তাঁকে জঈফ বলেছেন”। (আল কাশেফ: ৬০৫০) আবু আব্দুর রহমান صدوق “সত্যনিষ্ঠ”। (আল কাশেফ: ৪৫১৭)
ফায়দা : ঈদের নামাযের তাকবীরের ব্যাপারে রসূলুল্লাহ স. থেকে বর্ণিত শুধু হাসান হাদীস দ্বারা এ কারণে দলীল গ্রহণ করতে হলো যে, এ ব্যাপারে স্পষ্ট কোন সহীহ মারফু’ হাদীস নেই। ইমাম আহমাদ রহ. বলেন: لَيْسَ فِي تَكْبِيرِ الْعِيدَيْنِ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَدِيثٌ صَحِيحٌ، “ঈদের নামাযের তাকবীরের ব্যাপারে রসূলুল্লাহ স. থেকে বর্ণিত কোন সহীহ হাদীস নেই”। (নাসবুর রায়াহ: ঈদের নামায অধ্যায়) তবে সাহাবা ও তাবিঈগণের মন্তব্য এবং আমল থেকে আমরা দলীল গ্রহণ করে থাকি।
ঈদের তাকবীরের ব্যাপারে বিশিষ্ট সাহাবায়ে কিরামের আমল
عَنْ مَعْمَرٍ، عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ، عَنْ عَلْقَمَةَ، وَالْأَسْوَدِ بْنِ يَزِيدَ قَالَ: كَانَ ابْنُ مَسْعُودٍ جَالِسًا وَعِنْدَهُ حُذَيْفَةُ وَأَبُو مُوسَى الْأَشْعَرِيُّ، فَسَأَلَهُمَا سَعِيدُ بْنُ الْعَاصِ عَنِ التَّكْبِيرِ فِي الصَّلَاةِ يَوْمَ الْفِطْرِ وَالْأَضْحَى فَجَعَلَ هَذَا يَقُولُ: سَلْ هَذَا، وَهَذَا يَقُولُ: سَلْ هَذَا، فَقَالَ لَهُ حُذَيْفَةُ: سَلْ هَذَا لِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ فَسَأَلَهُ، فَقَالَ ابْنُ مَسْعُودٍ: يُكَبِّرُ أَرْبَعًا ثُمَّ يَقْرَأُ، ثُمَّ يُكَبِّرُ فَيَرْكَعُ، ثُمَّ يَقُومُ فِي الثَّانِيَةِ فَيَقْرَأُ، ثُمَّ يُكَبِّرُ أَرْبَعًا بَعْدَ الْقِرَاءَةِহযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বসেছিলেন। তাঁর কাছে হযরত হুজাইফা ও আবু মুসা আশআরী রা. উপস্থিত ছিলেন। সাঈদ ইবনুল আছ তাঁদের দু’জনকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহাতে নামাযের তাকবীর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন তাঁদের একজন অপরজনের নিকটে জিজ্ঞেস করার কথা বলতেছিলেন যে, তাঁর কাছে জিজ্ঞেস কর। আবার অপরজন বলেন, তাকে জিজ্ঞেস কর। পরে হযরত হুজাইফা বললেন: এ বিষয়টি আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা.কে জিজ্ঞেস করুন। তিনি হযরত ইবনে মাসউদ রা.কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন: ৪ বার তাকবীর দিয়ে কুরআন পাঠ করে তাকবীর বলে রুকু করবে। অতঃপর দ্বিতীয় রাকাতে কুরআন পড়ে ৪ বার তাকবীর বলবে। (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৫৬৮৭)
হাদীসটির স্তর: সহীহ, মাউকুফ। এ হাদীসের রাবীগণ সবাই-ই বুখারী-মুসলিমের রাবী। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন: رَوَاهُ عبد الرَّزَّاق عَن ابْن مَسْعُود بِإِسْنَاد “আব্দুর রযযাক ইবনে মাসউদ থেকে সহীহ সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন”। (আদদিরায়াহ: হাদীস নম্বর- ২৮৬)
এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, ঈদের নামাযের অতিরিক্ত তাকবীর ছয়টি।
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بن عَبْدِ اللَّهِ الْحَضْرَمِيُّ، حَدَّثَنَا مَسْرُوقُ بن الْمَرْزُبَانِ، حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي زَائِدَةَ، عَنْ أَشْعَثَ، عَنْ كُرْدُوسٍ، قَالَ: أَرْسَلَ الْوَلِيدُ إِلَى عَبْدِ اللَّهِ بن مَسْعُودٍ، وَحُذَيْفَةَ، وَأَبِي مَسْعُودٍ، وَأَبِي مُوسَى الأَشْعَرِيِّ بَعْدَ الْعَتَمَةِ، فَقَالَ: إِنَّ هَذَا عِيدُ الْمُسْلِمِينَ فَكَيْفَ الصَّلاةُ؟ فَقَالُوا: سَلْ أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ فَسَأَلَهُ، فَقَالَ:”يَقُومُ فَيُكَبِّرُ أَرْبَعًا، ثُمَّ يَقْرَأُ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ، وَسُورَةٍ مِنَ الْمُفَصَّلِ، ثُمَّ يُكَبِّرُ، وَيَرْكَعُ فَتِلْكَ خَمْسٌ، ثُمَّ يَقُومُ فَيَقْرَأُ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ، وَسُورَةٍ مِنَ الْمُفَصَّلِ، ثُمَّ يُكَبِّرُ أَرْبَعًا يَرْكَعُ فِي آخِرِهِنَّ فَتِلْكَ تِسْعٌ فِي الْعِيدَيْنِ”، فَمَا أَنْكَرَهُ وَاحِدٌ مِنْهُمْ.
কুরদুস বিন আব্বাস রহ. বলেন: হযরত ওয়ালিদ ইশার নামাযের পরে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ, হুজাইফা, আবু মাসউদ এবং হযরত আবু মুসা আশআরী রা.-এর নিকটে লোক পাঠালেন। প্রেরিত দূত তাঁদের নিকটে গিয়ে বললো: এটা মুসলমানদের ঈদ। আপনারা বলে দিন যে, নামাযের পদ্ধতি কেমন হবে? তাঁরা সবাই বললেন: হযরত আবু আব্দুর রহমান অর্থাৎ, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা.কে জিজ্ঞেস করুন। জবাবে হযরত ইবনে মাসউদ বলেন: ঈদের নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে ৪ বার তাকবীর বলে সূরা ফাতিহা ও মুফাছছল থেকে অপর একটি সূরা পড়বে এবং পুনরায় তাকবীর বলে রুকু করবে। এ হলো মোট ৫টি তাকবীর। এরপর দাঁড়িয়ে সূরা ফাতিহা ও মুফাছ্ছল থেকে অপর একটি সূরা পড়বে। অতঃপর ৪ বার তাকবীর বলবে যার শেষ তাকবীরে রুকু করবে। এ হলো সর্বমোট ৯টি তাকবীর। তিনি এ কথা বলার পরে তাদের কেউই এর প্রতিবাদ করেননি। (তবারানী কাবীর: ৯৪০০)
হাদীসটির স্তর: সহীহ, মাউকুফ। আল্লামা হাইসামী বলেন: رَوَاهُ الطَّبَرَانِيُّ فِي الْكَبِيرِ وَرِجَالُهُ مُوَثَّقُونَ “তবারানী তাঁর মু’জামে কাবীরে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং এ হাদীসের বর্ণনাকারীগণ সবাই-ই নির্ভরযোগ্য”। (মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ৩২৪৭) হযরত ইবনে হাযাম এ হাদীসটির সনদকে উঁচু মানের সহীহ বলেছেন। (মুহাল্লা: ঈদের নামায অধ্যায়)
সারসংক্ষেপ : হযরত ইবনে মাসউদ রা.-এর বর্ণনা অনুযায়ী প্রথম রাকাতে কিরাতের পূর্বে চার তাকবীর বলতে হবে যার মধ্যে তাকবীরে তাহরিমা একটি এবং ঈদের অতিরিক্ত তাকবীর তিনটি। আর দ্বিতীয় রাকাতে কিরাতের পরে চার তাকবীর বলবে যার মধ্যে রুকুর তাকবীর একটি আর অতিরিক্ত তাকবীর তিনটি। অতএব, ঈদের নামাযের অতিরিক্ত তাকবীর সর্বমোট ছয়টি প্রমাণিত হলো।
#হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন,التكبير في العيدين اربعا كالصلاة على الميت. رواه الطبراني في الكبير وقال الهيثمي: رجاله ثقات.
অর্থ: জানাযার নামাযের মতো দুই ঈদে (প্রতি রাকাতে) চার তাকবীর হবে। তাবারানী র. এটি উদ্ধৃত করেছেন। (হা. ৯৫২২) হায়ছামী র. বলেছেন, এর বর্ণনাকারীগন সকলে বিশ্বস্ত। (মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ২/৩৬৮)
#মাসরূক বলেন,كان عبد الله يعلمنا التكبير في العيدين تسع تكبيرات خمس في الاولى واربع في الآخرة ويوالى بين القراءتين . أخرجه ابن أبي شيبة – وإسناده حسن.
অর্থ: আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. আমাদেরকে দুই ঈদের তাকবীর শেখাতেন, মোট নয় তাকবীর। প্রথম রাকাতে পাঁচ ও দ্বিতীয় রাকাতে চার। উভয় রাকাতের কেরাত একাধারে পড়বে। ইবনে আবী শায়বা এটি উদ্ধৃত করেছেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৫৭৪৬)। এটির সনদ হাসান।
#কুরদুস ইবনে আব্বাস বলেন,لما كان ليلة العيد أرسل الوليد بن عقبة إلى ابن مسعود وأبي مسعود وحذيفة والأشعري فقال لهم إن العيد غدا فكيف التكبير فقال عبد الله يقوم فيكبر أربع تكبيرات ويقرأ بفاتحة الكتاب وسورة من المفصل ليس من طوالها ولا من قصارها ثم يركع ثم يقوم فيقرأ فإذا فرغ من القراءة كبر أربع تكبيرات ثم يركع بالرابعة. أخرجه ابن أبي شيبة عن هشيم عن أشعث عن كردوس عنه (٥٧٥٤)অর্থ: ওয়ালীদ ইবনে উকবা ঈদের রাতে ইবনে মাসউদ রা., আবূ মাসউদ রা., হুযায়ফা রা. ও আবূ মূসা আশআরী রা. এর কাছে লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আগামী কাল তো ঈদ, তাকবীর কিভাবে দিতে হবে? হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বললেন, নামাযে দাঁড়িয়ে চার তাকবীর দেবে, পরে সূরা ফাতিহা এবং মুফাসসাল থেকে এমন একটি সূরা পড়বে যা বড়ও নয়, ছোটও নয়। এরপর রুকু করবে। পরে (রাকাত শেষ করে) পুনরায় দাঁড়াবে। এবং কেরাত পাঠ করবে। কেরাত পাঠ শেষ হলে চারটি তাকবীর দেবে এবং চতুর্থ তাকবীর বলে রুকুতে যাবে। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৫৭৫৪; ইমাম মুহাম্মদ র. এর কিতাবুল আসার, পৃ,২০৫; কিতাবুল হুজ্জাহ , পৃ ৮৫; তাবারানী, আলমুজামুল কাবীর, (দ্র, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ২/৩৬৭) হায়ছামী বলেছেন, এর বর্ণনাকারীগন বিশ্বস্ত; তাহাবী শরীফ ১খ, ৩১৯পৃ,। তাহাবীর সনদে ইবনে কাছীর র. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে। ইবনে কাছীর বলেছেন, সনদটি সহীহ। (৩খ, ৫৬৪পৃ)
#আব্দুর রাযযাক রহ. ইবনে জুরায়জ থেকে বর্ণনা করেছেন:ان يوسف بن ماهك أخبرني ان ابن الزبير كان لا يكبر إلا اربعا في كل ركعة سواء ، يكبرهن في كل ركعتين ، سمعنا ذلك منه. المصنف ٣/٢٩١ (٥٦٧٦)
অর্থ: ইউসুফ ইবনে মাহাক র. আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. প্রত্যেক রাকাতে চার তাকবীরই বলতেন, এর বেশী বলতেন না। এভাবে উভয় রাকাতেই তিনি তাকবীর বলতেন। আমরা তার কাছ থেকেই এটা শুনেছি। মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ৫৬৭৬। এই হাদীসের সনদ সহীহ।
#ইবরাহীম নাখায়ী বলেছেন যে,انكم معاشر اصحاب رسول الله صلى الله عليه و سلم متى تختلفون على الناس يختلفون من بعدكم ومتى تجتمعون على أمر يجتمع الناس عليه فانظروا أمرا تجتمعون عليه فكانما أيقظهم فقالوا نعم ما رأيت يا أمير المؤمنين فأشر علينا فقال عمر رضي الله عنه بل أشيروا انتم على فانما انا بشر مثلكم فتراجعوا الأمر بينهم فأجمعوا أمرهم على ان يجعلوا التكبير على الجنائز مثل التكبير في الأضحى والفطر اربع تكبيرات فأجمع أمرهم على ذلك . (الطحاوي – باب التكبير على الجنائز كم هو) صـ ١/٣١٩
অর্থাৎ আপনারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী। আপনাদের দ্বিমত পরবর্তীদের উপর প্রভাব ফেলবে। আর আপনাদের ঐকমত্যের ফলে অন্যরাও একমত থাকবে। সুতরাং ভেবে চিন্তে আপনারা একটি বিষয়ে একমত হোন। এ কথায় তিনি যেন তাঁদের জাগিয়ে তুললেন। তারা বললেন, হাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন, হে আমীরুল মুমিনীন। তবে এ বিষয়ে আপনি আপনার মতামত বলুন। তিনি বললেন, আপনারাই বরং আমাকে পরামর্শ দিন। কারণ, আমি তো আপনাদের মতোই একজন মানুষ। পরে তাঁরা মত বিনিময় করে এ বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছলেন যে, যেভাবে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহায় চার তাকবীর হয়ে থাকে, তেমনি জানাযার নামাযেও চার তাকবীর হবে। (তাহাবী শরীফ, ১খ, ৩১৯পৃ)
এ হাদীস গুলোতে হযরত আবু মুসা আশআরী এবং হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা.-এর মতো প্রবীণ মুজতাহিদ সাহাবার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছে যারা সর্বদা রসূলুল্লাহ স.-এর সঙ্গে ঈদের নামায আদায় করেছেন। অতএব, নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে যে, রসূলুল্লাহ স.-এর আমল ছিলো অতিরিক্ত ছয় তাকবীরের সাথে ঈদের নামায পড়া।
উপকারীতাঃ অতিরিক্ত ছয় তাকবীরে ঈদের নামায পড়ার দলীল হিসেবে হাসান সনদে বর্ণিত রসূলুল্লাহ স.-এর আমল ও তাঁর বাণী, (আবু দাউদ: ১১৫৩, ত্বহাবী: ৭২৭৩) সহীহ সনদে বর্ণিত জলীলুল কদর সাহাবায়ে কিরামের আমল ও মন্তব্য (আব্দুর রযযাক: ৫৬৮৭ ও ৫৬৮৯, তবারানী: ৯৪০০ এবং ইবনে আবী শাইবা: ৫৭৫৬ ও ৫৭৬০) এবং সহীহ সনদে বর্ণিত বিশিষ্ট তাবিঈদের আমল ও মন্তব্য (ইবনে আবী শাইবা: ৫৭৬১, ৫৭৬৫ ও ৫৭৭৪)-এর ভিত্তিতে আমরা অতিরিক্ত ৬ তাকবীরের সাথে ঈদের নামায আদায় করে থাকি এবং এটাকে উত্তম বলে বিশ্বাস করি।
এর বিপরীতে ১২ তাকবীরে ঈদের নামায আদায় করার কথাও হাদীসে বর্ণিত আছে। তন্মধ্যে তিরমিজী শরীফে বর্ণিত ৫৩৬ নম্বর হাদীসকে ইমাম তিরমিজী রহ. এ অধ্যায়ের সর্বাধিক সহীহ হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। অথচ উক্ত হাদীসটি জঈফ। কারণ, এ হাদীসের সনদের কাসীর বিন আব্দুল্লাহ নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। তাঁর ব্যাপারে ইমাম আহমাদ রহ. বলেন: منكر الحديث “তাঁর হাদীস অগ্রহণযোগ্য”। ইয়াহইয়া বিন মাঈন বলেন: ضعيف الحديث “তাঁর হাদীস জঈফ”। আবু দাউদ বলেন: كان أحد الكذابين “তিনি মিথ্যাবাদীদের একজন”। ইমাম দারাকুতনী বলেন: متروك الحديث “তাঁর হাদীস পরিত্যাক্ত”। (তাহজীবুত তাহজীব ও তাহজীবুল কামাল থেকে সংগৃহীত)। ইবনে হাজার আসকালানী বলেন: ضعيف أفرط من نسبه إلى الكذب “তিনি জঈফ, যারা তাঁকে মিথ্যার দিকে সম্বোধন করেছে তারা বাড়াবাড়ি করেছে”। (তাকরীব: ৬৩০৮)। সুতরাং এমন রাবীর বর্ণিত হাদীস কীভাবে সর্বাধিক সহীহ হয়? এ হাদীসের ব্যাপারে ইমাম তিরমিজী রহ. নিজে তাঁর ইলালুল কুবরায় বলেন: ইমাম বুখারী রহ.কে জিজ্ঞেস করলে তিনি এটাকে জঈফ বলেছেন। (আল ইলালুল কুবরা: ঈদের নামাযের তাকবীর অধ্যায়) ইমাম দারাকুতনী রহ. এটাকে মুজতরাব বলেছেন। (ইলালুদ দারাকুতনী: ৩৪৫৮)
১২ তাকবীরে ঈদের নামায পড়ার হাদীস আরও বর্ণিত আছে আবু দাউদ: ১১৪৯ ও ১১৫০ নম্বরে। এ দু’টি হাদীসের বর্ণনায় রয়েছে আব্দুল্লাহ বিন লাহিআহ। তিনি যদিও মুসলিমের রাবী; কিন্তু তাঁর গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে মুহাদ্দিসগণের আপত্তি রয়েছে। ইমাম ইয়াহইয়া বিন মাঈন বলেন: كان ضعيفا لا يحتج بحديثه “তিনি জঈফ, তার হাদীস দলীলযোগ্য নয়”। ইমাম নাসাঈ রহ. বলেন: ليس بثقة “তিনি নির্ভরযোগ্য নন”। ইবনে আবী হাতিম বলেন: سألت أبى وأبا زرعة عن الإفريقى و ابن لهيعة: أيهما أحب إليك ؟ فقالا: جميعا ضعيفان “আমি আমার পিতা আবু হাতিম এবং আবু যুরআকে জিজ্ঞেস করলাম: আব্দুল্লাহ বিন লাহিআহ এবং আফরিকী এ দুজনের মধ্যে আপনার নিকটে কে প্রিয়? তিনি বললেন: দুজনই জঈফ”। (তাহজীবুল কামাল ও তাহজীবুত তাহজীব থেকে সংগৃহীত) ইমাম জাহাবী বলেন: قلت: العمل على تضعيف حديثه “তাঁর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হলো তাঁর হাদীসকে জঈফ গণনা করা”। (আল কাশেফ: ২৯৩৪) অবশ্য আব্দুল্লাহ বিন মুবারক ও আব্দুল্লাহ বিন ওয়াহহাব রহ. ইবনে লাহিআ থেকে যা বর্ণনা করেন তা অন্যদের বর্ণনার চেয়ে তুলনামূলক বেশী গ্রহণযোগ্য। কিন্তু উক্ত বর্ণনায় হযরত আব্দুল্লাহ বিন লাহিআ নিঃসঙ্গ হওয়ায় সে প্রাধান্যের দিকটিও দুর্বল হয়ে গেছে। হাকেম এবং ইমাম জাহাবী রহ. বলেন: تفرد به ابن لهيعة “হাদীসটি আব্দুল্লাহ বিন লাহিআ একাই বর্ণনা করেছেন”। (মুসতাদরাকে হাকেম: ১১০৮ নম্বর হাদীস ও ইমাম জাহাবীর তালখীছে)
১২ তাকবীরে ঈদের নামায পড়ার হাদীস আরও বর্ণিত আছে আবু দাউদ: ১১৫১ ও ১১৫২ নম্বর হাদীসে। এ দু’টি হাদীসের বর্ণনায় রয়েছে আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান তায়েফী। অধিকাংশ মুহাদ্দিস তাঁর বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাঁর ব্যাপারে কিছু মুহাদ্দিসীনে কিরামের আপত্তি রয়েছে। عن ابن معين : ضعيف “হযরত ইয়াহইয়া বিন মাঈন রহ. বলেন: তিনি জঈফ”। আবু হাতিম বলেন: ليس بقوى ، لين الحديث “তিনি শক্তিশালী নন, হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে নরম”। ইমাম নাসাঈ বলেন: ليس بذاك القوى و يكتب حديثه “তিনি তেমন মজবুত নন। তবে তাঁর হাদীস লেখার যোগ্য”।
উপরোক্ত তথ্যের দ্বারা ইবনে লাহিআ বা আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান তায়েফী রহ. বর্ণিত হাদীসকে অগ্রহণযোগ্য বলা আমার উদ্দেশ্য নয়; বরং এটা দেখানো উদ্দেশ্য যে, ইবনে লাহিআ ও আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান তায়েফীর মাধ্যমে বর্ণিত ১২ তাকবীরে ঈদের নামায পড়ার হাদীসের তুলনায় পূর্ববর্ণিত ৬ তাকবীরে ঈদের নামায পড়ার হাদীস তুলনামূলক বেশী শক্তিশালী। এ কারণে অনেকেই ৬ তাকবীরে ঈদের নামায পড়ার আমলকে উত্তম মনে করে থাকেন । তবে ১২ তাকবীরে ঈদের নামায পড়ার আমল ও শতভাগ বৈধ। ১২ তাকবীরে ঈদের নামায পড়ার হাদীসগুলোও সহীহ সনদে বর্ণিত । আসুন আমরা দলাদলি ছেড়ে এক হই,নেক হই , ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলামের রজ্জুকে একত্র ধারণ করি । ফতোয়ার রেষারেষী ভুলে যাই ।আল্লাহ আমাদের তার খাঁটি গোলাম হিসাবে কবুল করুন ।আমিন । ছুম্মা আমিন ।।

প্রসঙ্গঃ #ঈদের_নামাজের_তাকবীর_সংখ্যা
ঈদের সালাত সুন্নত বা মতভেদে ওয়াজিব(ফরজে কেফায়া) একটি ইবাদত।
আর এর তাকবীর সংখ্যা নিয়ে দলাদলি,হানাহানি,হিসা- বিদ্বেষ,ঘৃনার অন্ত নেই। এজাতীয় তৎপরতা বা মনোভাব হারাম এবং কখনই ইসলাম এসব সমর্থন করে না ।তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রত্যেক মু’মিনের অবশ্য কর্তব্য ৷ইবাদতে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করার ফলে সমাজে ইবাদত বিমুখতা বৃদ্ধি পায় ।যারা ইবাদতে সন্দেহ তৈরী করার চেষ্টা করে, সে সকল শায়খ/মাদানী থেকে দূরে থাকা সকলের উচিৎ ৷কেননা,আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার নির্দেশ হলোঃ‘এমন ব্যক্তির আনুগত্য কর না যার মনকে আমি আমার স্মরণ থেকে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কাজ হলো বাড়াবাড়ি ও সীমা লঙ্ঘন করা।’ (সূরা কাহ্ফ : ২৮)

নবী-রাসুলগণ কে কোন কাজ করতেন বা কার কি পেশা ছিল ?

ইসলাম ধর্মে, রাসুল হলেন আল্লাহ্ প্রেরিত বার্তাবাহী ব্যক্তিত্ব। রাসূল বলতে তাদেরকেই বোঝানো হয় যারা আল্লাহ্‌র কাছ থেকে কিতাব বা পুস্তক প্রাপ্ত হয়েছেন।

হাদিসসহ অন্যান্য ইসলামী বইয়ে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার মতান্তরে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার নবীর কথা বলা হয়েছে। এদের মাঝে সকলে কিতাব প্রাপ্ত হয়নি। যারা কিতাব প্রাপ্ত হয়েছেন তারাই শুধু রাসূলের খেতাব পেয়েছেন।

অর্থাৎ সকল রাসূলই নবী কিন্তু সকল নবী রাসূল নয়। কোরআন অনুযায়ী, আল্লাহ্‌ মানবজাতির নিকট বহু নবী রাসুল (আনবিয়া, একবচন নাবী) প্রেরণ করেছেন।

সব নবী-রাসুলের কোনো না কোনো পেশা ছিল, তাঁরা অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতেন না। বরং স্বীয় হস্তে অর্জিত জিনিস ভক্ষণ করাকে পছন্দ করতেন। মহানবী (সা.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কোন ধরনের উপার্জন উত্তম ও শ্রেষ্ঠ?

তিনি প্রত্যুত্তরে বলেন, ব্যক্তির নিজ হাতে কাজ করা এবং সৎ ব্যবসা। (সুয়ুতি আদদুররুল মানসুর, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২২০) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হালাল রুজি অর্জন করা ফরজের পর একটি ফরজ।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

ঈসা (আ.) এক ব্যক্তিকে অসময়ে ইবাদাতখানায় দেখে প্রশ্ন করলেন, তুমি এখানে বসে ইবাদত করছ, তোমার রিজিকের ব্যবস্থা কে করে? লোকটি বলল, আমার ভাই আমার রিজিকের ব্যবস্থা করে।

ঈসা (আ.) তাকে বলেন, সে তোমার চেয়ে অনেক উত্তম। (হেদায়াতুল মুরশিদিন)। কবির ভাষায়, ‘নবীর শিক্ষা কোরো না ভিক্ষা, মেহনত করো সবে।’ নবী-রাসুলরা হলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব। তাঁরা স্বহস্তে অর্জিত সম্পদে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

আদম (আ.) ছিলেন একজন কৃষক। তিনি চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর ছেলেদের পেশাও ছিল চাষাবাদ। তা ছাড়া তিনি তাঁতের কাজও করতেন।

কারো কারো মতে, তাঁর পুত্র হাবিল পশু পালন করতেন। কৃষিকাজের যন্ত্রপাতির নাম আল্লাহ তাআলা তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন—আল্লাহর বাণী, ‘আর আল্লাহ আদমকে সব নামের জ্ঞান দান করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৩১)

শিস (আ.)ও কৃষক ছিলেন। তাঁর পৌত্র মাহলাইল সর্বপ্রথম গাছ কেটে জ্বালানি কাজে ব্যবহার করেন। তিনি শহর, নগর ও বড় বড় কিল্লা তৈরি করেছেন। তিনি বাবেল শহর প্রতিষ্ঠা করেছেন। (ইবনে কাসির)

ইদরিস (আ.)-এর পেশা ছিল কাপড় সেলাই করা। কাপড় সেলাই করে যে অর্থ উপার্জন করতেন, তা দিয়ে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। ইদরিস শব্দটি দিরাসা শব্দ থেকে নির্গত।

তিনি বেশি পরিমাণে সহিফা পাঠ করতেন বলে তাঁকে ইদরিস বলা হয়। পড়াশোনার প্রথা তাঁর সময় থেকে চালু হয়। একদল পণ্ডিত মনে করেন, হিকমত ও জ্যোতির্বিদ্যার জন্ম ইদরিস (আ.)-এর সময়ই হয়েছিল।

নুহ (আ.) ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। আল্লাহ তাআলা তাঁকে নৌকা তৈরির কলাকৌশল শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং আল্লাহর নির্দেশে তিনি নৌকা তৈরি করেছিলেন।

আল্লাহর বাণী—‘আর তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার ওহি অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ করো।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৩৭) তিনি ৩০০ হাত দীর্ঘ, ৫০ হাত প্রস্থ, ৩০ হাত উচ্চতাসম্পন্ন একটি বিশাল নৌকা তৈরি করেন।

হুদ (আ.)-এর জীবনী পাঠান্তে জানা যায় যে তাঁর পেশা ছিল ব্যবসা ও পশু পালন। ব্যবসা ও পশু পালন করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন।

সালেহ (আ.)-এর পেশাও ছিল ব্যবসা ও পশু পালন।

লুত (আ.)-এর সম্প্রদায়ের লোকেরা চাষাবাদের সঙ্গে জড়িত ছিল। এতে প্রতীয়মান হয় যে তিনিও জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করতেন চাষাবাদের মাধ্যমে।

ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনী পাঠান্তে জানা যায় যে তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য কখনো ব্যবসা, আবার কখনো পশু পালন করতেন।

ইসমাইল (আ.) পশু শিকার করতেন। তিনি ও তাঁর পিতা উভয়ই ছিলেন রাজমিস্ত্রি। পিতা-পুত্র মিলে আল্লাহর ঘর তৈরি করেছিলেন।

ইয়াকুব (আ.)-এর পেশা ছিল ব্যবসা, কৃষিকাজ করা ও পশু পালন।

ইউসুফ (আ.) রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বেতন হিসেবে রাষ্ট্রীয় অর্থ গ্রহণ করতেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দান করেছেন।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১০১)

শোয়াইব (আ.)-এর পেশা ছিল পশু পালন ও দুধ বিক্রি। পশু পালন ও দুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর কন্যারা চারণভূমিতে পশু চরাতেন।

দাউদ (আ.) ছিলেন রাজা ও নবী। সহিহ বুখারির ব্যবসা অধ্যায়ে রয়েছে যে দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন। তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন, হে আল্লাহ! এমন একটি উপায় আমার জন্য বের করে দিন, যেন আমি নিজ হাতে উপার্জন করতে পারি।

অতঃপর তাঁর দোয়া কবুল হয় এবং আল্লাহ তাআলা তাঁকে লোহা দ্বারা বর্ম ও অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করার কৌশল শিক্ষা দেন। শক্ত ও কঠিন লোহা স্পর্শ করলে তা নরম হয়ে যেত। যুদ্ধাস্ত্র, লৌহ বর্ম ও দেহবস্ত্র প্রস্তুত করা ছিল তাঁর পেশা। এগুলো বিক্রি করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন।

সোলায়মান (আ.) ছিলেন সমগ্র পৃথিবীর শাসক ও নবী। তিনি তাঁর পিতা থেকে অঢেল ধন-সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। তিনি নিজেও অঢেল সম্পদের মালিক ছিলেন।

ভিন্ন পেশা গ্রহণ করার চেয়ে নিজ সম্পদ রক্ষা ও তদারকি করাই ছিল তাঁর প্রদান দায়িত্ব। মানব-দানব, পশু-পাখি, বাতাস ইত্যাদির ওপর তাঁর কর্তৃত্ব ছিল। তাঁর সাথি ঈসা ইবনে বরখিয়া চোখের পলক ফেলার আগে বিলকিসের সিংহাসন সোলায়মান (আ.)-এর সামনে এনে হাজির করেন।

মুসা (আ.) ছিলেন একজন রাখাল। তিনি শ্বশুরালয়ে মাদায়েনে পশু চরাতেন। সিনাই পর্বতের পাদদেশে বিরাট চারণভূমি মাদায়েনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। লোকজন সেখানে পশু চরাত। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন মুসা (আ.)। আট বছর তিনি স্বীয় শ্বশুর শোয়াইব (আ.)-এর পশু চরিয়েছেন।

হারুন (আ.)-এর পেশাও ছিল পশু পালন। পশু পালন করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন।

ইলিয়াস (আ.)-এর পেশাও ছিল ব্যবসা ও পশু পালন।

আইউব (আ.)-এর পেশা ছিল গবাদি পশু পালন। তাঁর প্রথম পরীক্ষাটি ছিল গবাদি পশুর ওপর। ডাকাতরা তাঁর পশুগুলো লুট করে নিয়ে গিয়েছিল। (আনওয়ারে আম্বিয়া, ই. ফা. বাংলাদেশ)

ইউনুস (আ.)-এর গোত্রের পেশা ছিল চাষাবাদ। সুতরাং কারো কারো মতে, তাঁর পেশাও ছিল চাষাবাদ।

জাকারিয়া (আ.) ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে মহানবী (সা.) বলেছেন, জাকারিয়া (আ.) কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। তাই তাঁর শত্রুরা তাঁর করাত দিয়েই তাঁকে দ্বিখণ্ডিত করে। (সহিহ বুখারি)

ইয়াহইয়া (আ.) প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে যে তিনি জীবনের একটি সময় জঙ্গলে ও জনহীন স্থানে কাটিয়েছিলেন। আহার হিসেবে তিনি বৃক্ষের লতাপাতা ভক্ষণ করতেন। (আনওয়ারে আম্বিয়া)

জুলকিফল (আ.)-এর পেশা ছিল পশু পালন।

ইয়াসা (আ.)-এর পেশা ছিল ব্যবসা ও পশু পালন।

ঈসা (আ.) ও মরিয়ম (আ.)-এর আবাসস্থল প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আমি তাদের উভয়কে এক উচ্চ ভূমি প্রদান করেছিলাম, যা সুজলা ও বাসযোগ্য ছিল।’ (সুরা : আল মুমিনুন, আয়াত : ৫০)

এই উচ্চ ভূমি হলো ফিলিস্তিন। তিনি ফিলিস্তিনে উৎপন্ন ফলমূল খেয়ে বড় হয়েছেন। তিনি ঘুরে ঘুরে অলিতে-গলিতে দ্বিনের দাওয়াতি কাজ করতেন। যেখানে রাত হতো, সেখানে খেয়ে না খেয়ে নিদ্রা যেতেন। তাঁর নির্দিষ্ট কোনো পেশা ছিল না।

মহানবী (সা.) ছিলেন একজন সফল ও সৎ ব্যবসায়ী। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ীদের হাশর হবে নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে।’ (আদ্দুররুল মানসুর, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২০) তিনি গৃহের কাজ নিজ হাতে করতেন। বকরির দুধ দোহন করতেন।

নিজের জুতা ও কাপড় সেলাই ও ধোলাই করতেন, গৃহ ঝাড়ু দিতেন। মসজিদে নববী নির্মাণকালে শ্রমিকের মতো কাজ করেছেন। খন্দকের যুদ্ধে মাটি কেটেছেন। বাজার থেকে প্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয় করতেন।

তিনি ইরশাদ করেন, ‘বর্শার ছায়ার নিচে আমার রিজিক নির্ধারণ করা হয়েছে—তথা গণিমতের মাল হলো আমার রিজিক।’ (কুরতুবি, ১৩তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২)

নবী-রাসুলদের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য এই যে বৈষয়িক ধন-সম্পদের প্রতি তাঁদের কোনো আকর্ষণ ছিল না। তাঁরা কখনো ধন-সম্পদ সঞ্চয় করতেন না এবং সঞ্চয় করা পছন্দও করতেন না।

তথাপি যেহেতু তাঁরা মানুষ ছিলেন, সেহেতু বৈষয়িক প্রয়োজনে যতটুকু জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজন, ততটুকু সম্পদ অর্জনে বিভিন্ন পেশা গ্রহণ করেছেন। সদা-সর্বদা নিজেদের কষ্টার্জিত সম্পদ থেকে ভক্ষণ করা পছন্দ করতেন।

মানুষদের থেকে কখনো তাঁরা নজর-নেওয়াজ, এমনকি বেতনও গ্রহণ করতেন না। বরং যথাসম্ভব নিজেদের উপার্জন থেকে গরিব ও দুস্থদের সাহায্য করতেন। সব নবী-রাসুল ছাগল চরাতেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এমন কোনো নবী নেই, যিনি ছাগল চরাননি।’ জনৈক সাহাবি প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনিও কি ছাগল চরিয়েছেন? প্রত্যুত্তরে রাসুল (সা.) বলেন, ‘হ্যাঁ, আমিও মক্কায় অর্থের বিনিময়ে ছাগল চরিয়েছি।’

বলা বাহুল্য যে মহানবী (সা.)-এর সাহাবিরা অনেকেই ব্যবসা করতেন। বিশেষ করে মুহাজিররা ছিলেন ব্যবসায়ী আর আনসাররা ছিলেন কৃষক।

ক্রয়কৃত রক্তের ১০ ভাগ রক্ত আসে মাদকসেবীদের কাছ থেকে

জীবন বাঁচাতে রক্ত অপরিহার্য৷ দেশে কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রক্ত সংগ্রহ ও বিতরণ করে৷ অনেকে রক্ত উচ্চমূল্যে বিক্রিও করে ৷ কোথা থেকে আসে এই রক্ত? জানান সন্ধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক ইহসানুল করিম তানজিম৷

১৯৭৭ সালে ঢাকা মেডিকেলের কিছু ছাত্র এটা শুরু করেন৷ এঁদের মধ্যে মোশারফ হোসেন মিশু ও আব্দুল কাইয়ুম স্যার উল্লেখযোগ্য৷ তাঁদেরই একজন সহপাঠী টিফিনের টাকা ‘কালেকশন’ শুরু করেন৷ পরে ভাবেন, আর কী করা যায়? তখন রক্তদান ও মরনোত্তর চক্ষুদানের কার্যক্রম নিয়ে তাঁরা ‘সন্ধানী’ প্রতিষ্ঠা করেন৷ ১৯৮৪ সালে কেন্দ্রীয় সন্ধানী গঠন হয়৷ পরবর্তীতে এটা সারাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ছড়িয়ে পড়ে৷

আমাদের একটা ‘পুল’ আছে৷ এই পুলে মেডিকেলের বাইরেও অনেকে আছেন৷ মেডিকেলের হিসাবটা যদি বলি, তাহলে প্রতিটি মেডিকেলে অন্তত ৫০০ জন আছেন৷ এই হিসেবে শুধু মেডিকেলের শিক্ষার্থীই আছেন ৪ থেকে ৫ হাজার৷ এর বাইরে প্রতিটি মেডিকেলে সন্ধানী বাইরে থেকে ‘ব্লাড’ সংগ্রহ করে৷ সেই পুলেও প্রতিটি মেডিকেলে অন্তত ৩ থেকে ৪শ’ জন মানুষ আছেন৷

আমি যখন মেডিকেলে ভর্তি হই, তখন একদিন আমি আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলছিলাম৷ তিনি বলছিলেন, একজন গ্রামের মহিলার মেয়ে নাকি অসুস্থ৷ তার সার্জারির জন্য রক্ত দরকার৷ কিন্তু তিনি তো গ্রামের অশিক্ষিত মানুষ৷ তাই কোথায় রক্ত পাবেন? আমাদের দেশে তো তখনো এমনসচেতনা সৃষ্টি হয়নি যে, মানুষ স্বেচ্ছায় এসে রক্ত দেবে৷ এর জন্য তো একটা মিডিয়ার প্রয়োজন৷ আমি দেখলাম, সন্ধানী সেই কাজটাই করছে৷ তখন আমি সন্ধানীর সঙ্গে যুক্ত হলাম৷ আমাদের দেশে তো অনেক মানুষ নিজের ব্লাড গ্রুপও জানেন না৷ সন্ধানী এই কাজটি করে যাচ্ছে৷

অনুপ্রেরণা অবশ্যই আমাদের প্রতিষ্ঠাতারা৷ মোশারফ হোসেন, আব্দুল কাইয়ুম স্যারসহ অনেকেই৷ তাঁরা ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র ছিলেন৷ এছাড়া ডা. দীপু মনি আপা ছিলেন৷ তিনি ঢাকা মেডিকেলের সেক্রেটারি ও সভাপতি ছিলেন৷ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ৷ তিনি সন্ধানীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন৷ এছাড়া সিনিয়ররা যাঁরা ছিলেন, তাঁদের জীবনে সন্ধানীর এই অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে৷ মানুষের সেবা করার অনুপ্রেরণা তাঁরাই মূলত আমাদের যোগান দিয়েছেন৷

সন্ধানী ছাড়া স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মধ্যে পুলিশ ব্লাড ব্যাংক আছে, বাঁধন আছে – এটা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে৷ এছাড়া রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি আছে৷ আবার যারা টাকার বিনিময়ে রক্ত সংগ্রহ করতে চায়, তাদের মধ্যে কোয়ান্টাম আছে৷ ঢাকার মধ্যে ছোট-খাট অনেক সংগঠন আছে৷ আমার ধারণা, মোট ৩৫টি সংগঠন আছে৷

আসলে মানুষ বিভিন্ন সংগঠনকে নানাভাবে দেখে৷ যেমন ধরুন বাঁধন বা সন্ধানী৷ এটা তো ছাত্ররাই করে৷ ছাত্রদের তো ন্যায়-নীতির ভিত্তিতে করা ছাড়া আর কী উপায় আছে? এর বাইরে যে সংগঠনগুলো আছে, তারা আসলে নীতি অনুযায়ী করছে কিনা, সেটা বলা মুশকিল৷ তারা নীতির কথা বলছে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে টাকা-পয়সা নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে৷ যেখানে এক ব্যাগ রক্তের দাম সব খরচ মিলিয়ে ৪০০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়, সেখানে তারা এক ব্যাগ রক্তের জন্য ৩ থেকে ৪ হাজার টাকাও নিচ্ছে৷ এমনকি যেসব রক্ত পাওয়া কঠিন, যেমন নেগেটিভ রক্ত, সেগুলোর জন্য ৬ হাজার টাকা পর্যন্তও নিচ্ছে তারা৷ এগুলো দেখতে তো দৃষ্টিকটু লাগেই৷

আমরা তো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন৷ আমাদের কাছ থেকে কেউ যদি রক্ত নিতে চান, তাহলে আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনার চেনা কেউ রক্ত দেওয়ার মতো আছে কি? যদি থাকেন তাহলে আমরা তার কাছ থেকে এক ব্যাগ রক্ত নেই, আর তাদের এক ব্যাগ রক্ত দেই৷ এখানে আমরা শুধু ব্যাগের দাম ও স্ক্রিনিং খরচের টাকাটা রাখি৷

এমন সংগঠন বলতে গেলে নেই৷ তবে যাঁরা একেবারেই দরিদ্র, আমরা সন্ধানীর পক্ষ থেকে তাঁদের বিনামূল্যে রক্ত সরবরাহকরে থাকি৷ আসলে একেবারে বিনামূল্যে রক্ত সরবরাহ করাটা কঠিন৷ কারণ আমাদের প্যাথলজি বিভাগে পরীক্ষার জন্য টাকা দিতে হয়৷ আবার ব্যাগটাও কিনতে হয়৷ একটা ব্যাগ কিনতে দেড় থেকে দুইশ’ টাকা লাগে৷ পাশাপাশি রক্ত সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজেরও প্রয়োজন হয়৷

সবচেয়ে বড় সমস্যা মানুষের সচেতনতার অভাব৷ অনেক মানুষই মনে করে, রক্ত দিলে শরীরের ক্ষতি হয়৷ আবার দেখা যায়, যাঁর রক্ত দরকার তিনি একজন স্বজনকে নিয়ে এসেছেন৷ যদিও তাঁদের রক্তের গ্রুপের কোনো মিল নেই৷ তাহলে তিনি কীভাবে রক্ত দেবেন? এগুলো অনেকেই বুঝতে পারেন না৷ এ কারণে বর্তমানে দেশে রক্ত চাহিদা ৭ লাখ ব্যাগের মতো৷ এর মধ্যে সরবরাহ করা যায় মাত্র অর্ধেকের মতো৷ একজন মানুষ চারমাস পরপর রক্ত দিতে পারে৷ কিন্তু কেউ তো নিজে এসে রক্ত দেন না৷ শিক্ষিত বা অশিক্ষিত – যেই হোক না কেন – কেউই আসেন না৷ এটার প্রয়োজনটা নিজের পরিবারে হলে তবে তাঁরা বুঝতে পারেন৷ আসলে মানুষ এ সম্পর্কে খুব কমই জানে৷

রক্ত দিলে উপকার হোক আর না হোক, অপকার যে হয় না, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায়৷ আমাদের ‘মোটো’ হলো, রক্ত দিলে উপকার না হোক, কিন্তু ক্ষতি হবে না৷ আপনার শরীরের রক্ত কণিকার মধ্যে রেড সেল বা লাল রক্ত কণিকার মেয়াদ ১২০দিন৷ এরপর সেটা এমনিই নষ্ট হয়ে যায়৷ ফলে ১২০ দিন পরপর আপনি রক্ত দিলে আপনার রক্ত যেমন কমে না, আপনার কোনো ক্ষতিও হয় না৷ আসলে রক্ত দিলে শারীরিক বা দৈহিকভাবে আপনার ক্ষতি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই৷

বরং কেউ যদি চার মাস পরপর রক্ত দেন, তাহলে স্ক্রিনিং-এর সময় তিনি বুঝতে পারেন, তার কোনো ছোঁয়াচে রোগ আছে কিনা৷ তখন তিনি রোগ নির্ণয় করেচিকিৎসা করাতে পারেন৷ অর্থাৎ এক্ষেত্রে রোগ দেহে সম্পূর্ণভাবে ছড়িয়ে পড়ার অনেক আগে৷ আর এরজন্য আপনার কোনো খরচও করতে হচ্ছে না৷ যে সংগঠন আপনার রক্ত নিচ্ছে, তারাই কিন্তু স্ক্রিনিংয়ের পর আপনাকে বলে দিচ্ছে আপনার কী কী ধরনের রোগ আছে৷ এছাড়া এতে করে মানবিকতা, নৈতিকতা বা মূল্যবোধও যে বৃদ্ধি পায়, তা বলাই বাহুল্য৷

আগেই বলছিলাম, মানুষের সচেতনতার অভাবের কথা৷ দেখুন, আমরা তো ছাত্র৷ আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের বড় একটা সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটে৷ সমস্যা হয়, যখন পরীক্ষা চলে৷ সেসময় যদি একজন ফোন করে বলেন, তাঁর রক্তের খুব দরকার, তখন আমরা সংকটে পড়ে যাই৷ এ ধরনের কিছু বিপত্তিতে আমাদের পড়তে হয়৷ তবে আমার মনে হয়, এগুলো সব দূর হয়ে যাবে যদি মানুষের সচেতনতা বাড়ে৷

প্রতিদিনের কোনো হিসেব আমাদের কাছে নেই৷ কেউ এটা করেনি৷ তবে সর্বশেষ ২০১৭ সালে একটা হিসাব হয়েছিল৷ সেখানে দেখা গেছে, প্রতি বছর সাত লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয় বাংলাদেশে৷ এর মধ্যে আমরা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো প্রায় অর্ধেকের মতো, অর্থাৎ ৪৫ ভাগ রক্ত সরবরাহ করতে পারি৷ এর বাইরে পরিবার বা স্বজনের কাছ থেকেও রক্ত আসে৷ সবমিলিয়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ভাগ রক্ত সরবরাহ করা যায়৷ তবে বাংলাদেশে অনেক সময়ই ‘সেফ ব্লাড’ সংগ্রহ করা হয়ে ওঠে না৷ অনেক সংগঠনের সঙ্গে তো মাদকাসক্তরাও সম্পৃক্ত৷ তারা টাকার বিনিময়ে রক্ত দেয়৷ রোগী এটা বুঝতে পারেন না৷ এর কোনো স্ক্রিনিংও হয় না৷ ফলে এতে রোগীর ক্ষতি হয়৷ আমার জানা মতে, বর্তমানে প্রায় ১০ ভাগ রক্ত এই মাদকাসক্ত বা এ ধরনের ডোনারদের কাছ থেকেই আসছে৷

ইতিহাসে সিপাহী বিদ্রোহ, ১৩ হাজার আলেমের ফাঁসি

#ইতিহাসে সিপাহী বিদ্রোহ, ১৩ হাজার #আলেমের ফাঁসি
আবদুল্লাহ তামিম: ইংরেজ বেনিয়াদের ভারত উপমহাদেশ থেকে তাড়ানোকে কেন্দ্র করে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যে তুমুল সংগ্রাম ফেনিয়ে ওঠে তার চূড়ান্ত পরিণতি আসে অন্তত ১৩ হাজার আলেমের ফাঁসির মধ্য দিয়ে।
মোঘলদের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর পরিণত হন রাজনীতির শোপিসে । শাহ ওলীউল্লাহ ও সাইয়েদ আহম শহিদ (রহ)-এর ত্যাগ-তিতিক্ষার যে ইতিহাস এর পূর্বে রচিত হয়েছে, যদিও সেটাই হলো এই ক্ষেত্রে ইংরেজ মূল ভীতির কারণ । কিন্তু ১৮৫৭ সাতান্ন সিপাহি বিদ্রোহের পর একদিকে আলেমগণ এবং অন্যদিকে ইংরেজ উভয়েই খোলাখুলি শত্রুতায় জড়িয়ে পড়েন ।
#সিপাহী_বিদ্রোহোর সূচনা যেভাবে
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে ইংরেজরা সিপাহী বিদ্রোহ বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করেছে। যদিও এটা কেবল সিপাহী বিদ্রোহ ছিলো না, সর্বস্তরের জনগণেরও বিদ্রোহ ছিলো । ভারতে ইংরেজের শাসনের বিরুদ্ধে ধূমায়িত আক্রোশের এটাই ছিলো প্রথম বিস্ফোরণ।
এ বিদ্রোহে মুসলমানের সাথে হিন্দু সমাজের বিরাট অংশও যোগ দেয়। কেবল বাংলার হিন্দুরাই একমাত্র ইংরেজের পক্ষালম্বন করে বিশেষ কৃপা পাবার আশায় । সিপাহীদের বিদ্রোহের সবচেয়ে বড় কারণ ছিলো কার্তুজে শুয়োরের চর্বি ব্যবহার সম্পর্কিত গুজব।
কেননা, কার্তুজ তাদের ছিঁড়তে হতো দাঁত দিয়ে । ফলে মুসলমান-হিন্দু সকল সিপাহী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে স্বাভাবিকভাবে । ১৮৫৭ সালের ২ জানুয়ারী দমদম থেকে শুরু হয় এবং ফেব্রুয়ারীতে কোলকাতা থেকে ১৬ মাইল দূরে বারাকপুর সেনানিবাসে মংগল পাণ্ডে নামক এক হিন্দু সৈনিক এক ইংরেজ সার্জেন্ট মেজরের ওপর গুলী চালিয়ে এই বিদ্রোহের উদ্বোধন করে।
তারপর মিরাঠে অবস্থিত সবচে’ বড় সেনানিবাসে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। বিদ্রোহী সৈন্যরা দিল্লীর দিকে মার্চ করতে শুরু করে, যেখানে ছিলেন ক্ষমতাহীন শেষ মোঘল বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফর। (উলামায়ে হিন্দ কা শানদার মাযী, খ. ৪, পৃ. ২৫০)
ভারতের থানভবনে আলেমদের মোর্চা
সেনা বিদ্রোহের কারণে চতুর্দিকে আইন-শৃংখলার চরম অবনতি দেখা দিলে এবং ইংরেজ শাসকরাও ভীতি ও আতংকের মধ্যে অবস্থান করতে তখন সাহারানপুরের ইংরেজ কালেকটর মি. স্প্যাংকির একটি চক্রান্তমূলক পদক্ষেপ নেন। বিনা দোষে তিনি থানাভবনের প্রভাবশালী রইসের ছোট ভাই কাজী আবদুর রহীম ও তার দলবলকে সাজানো মামলায় ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ঘোষণা করে তড়িঘড়ি ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলায়। এ ঘটনায় থানাভবন, নান্নুতা ও চারদিকের থানাগুলোর জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
তাছাড়া এসব এলাকার সকল প্রতিষ্ঠিত ও মশহুর আলেমের মুরব্বী হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মক্কীর বাসস্থানও ছিল এখানে। শহীদ কাজী আবদুর রহীমের বড় ভাই কাজী ইনায়েত আলী খান এসময় জনগণের বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য ওলামায়ে কেরাম জরুরী বৈঠকে বসেন ।
কাসেম নানুতবী এলেন নানুতা থেকে এবং মওলানা মুহাম্মদ ইয়াকুব সাহারানপুর থেকে । রহমতুল্লাহ কিরানভীকে দিল্লীর সঠিক অবস্থা জানার জন্য সেখানে পাঠানো হয়েছিল। তিনি ফিরে এসে বৃদ্ধ বাদশাহ ও তার শাহজাদাদের অনভিজ্ঞতার রিপোর্ট পেশ করেন। প্রথম বৈঠকে সাইয়েদ আহমদ শহীদ প্রবর্তিত এ যাবত যে সংস্কারমূলক ও রাজনৈতিক দলীয় ব্যবস্থাপনা চলে আসছিল তাকে একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার রূপ দেবার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ সাহেবকে এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার ‘আমীর’ নির্বাচন করা হলো।
মওলানা মুহাম্মদ কাসেম, মওলানা রশীদ আহমদ, হাফেজ যামেন, মওলানা মুহাম্মদ মুনীরের ন্যায় নেতৃবৃন্দকে সেনাবাহিনী, প্রতিরক্ষা, আইন-শৃংখলা ও বিচার বিভাগ ইত্যাদি পরিচালনার দায়িত্বে নিযুক্ত করা হয়।৩ এই সংগে বাদশাহর একান্ত সহচর নওয়াব শের আলী মুরাদাবাদীকে বাদশাহর কাছে পাঠানো হলো যথাযথভাবে আইন-শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত রাখার এবং তাদের সাথে সহযোগিতা করার বার্তা দিয়ে। (সাওয়ানেহে কাসেমী, খণ্ড ২, পৃ. ১০৫)
মওলানা মানাযির আহসান গীলানী লিখেছেন, ‘বাদশাহকে শামেলীর ওপর আক্রমণ পরিচালনা করতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য শের আলী সাহেবকে বাদশাহর কাছে পাঠানো হয়েছিল।’ কারণ ইতিপূর্বে বাদশাহর ইনকিলাবী ফৌজকে নেতৃত্ব দান করে শাহী জুলুস সহকারে ১২ মে দিল্লী শহর পরিভ্রমণ করেছিলেন। বড় বড় বাজার খোলার ব্যবস্থা করেছিল এবং জনগনকে শান্তি ও নিরাপত্তা দানের ওয়াদা করেছিলেন।
কাজেই শামেলীতে ওলামা গ্রুপ যেভাবে মোর্চা গঠন করে হাজী ইমদাদুল্লাহর নেতৃত্বে স্বাধীনতার ঝাণ্ডা উঁচু করেছিলেন তার ফলে দিল্লী থেকে বাদশাহর নেতৃত্বে ইনকিলাবী ফৌজ এদিকে আক্রমণ পরিচালনা করলে দিল্লী থেকে নিয়ে এই পুরো এলাকাটাই ইংরেজ দখল ও শাসনমুক্ত হয়ে যেতে পারে। (মওলানা মুহাম্দ কাসেমের জীবন কথা, খ. ২, পৃ. ১৩৭)
আলেমেদের দিল্লি যাত্রা
নানা আলোচনা ও পর্যালোচনার পরে হাজী সাহেবের হাতে সকল আলেম জিহাদের বাইআত গ্রহণ করেন। অর্থাৎ প্রথমে হাজী সাহেবকে আমির করা হয়েছিল এলাকার শাসন পরিচালনা করার জন্য। এবার তার হাতে বাইআত করলেন জানমাল কুরবানী করার জন্য। প্রশ্ন ওঠে তাদের গঠিত বাহিনী যাবে কোনদিকে? দিল্লীর দিকে মার্চ করাই ছিল স্বাভাবিক। কাজেই দীন ও স্বদেশভূমির এই প্রাণ উৎসর্গকারী দল জীবন বাজি রেখে একটি সুসংগঠিত শক্তির সাথে মোকাবিলা করার জন্য নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে বের হয়ে পড়েন। প্রথমে তারা শামেলী হয়ে দিল্লী যাবার জন্য এগিয়ে যান। ধ্বনি ওঠে, দিল্লী চলো। (সাওয়ানেহে কাসেমী, খ. ২, পৃ. ১২৯)
তেরো হাজার আলেম ফাঁসি হলো যেভাবে
ইংরেজের ভাষায় থানাভবন এই আলেম নেতৃবর্গ ইংরেজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ক্ষেত্রে এমন কোনো অপরাধ নেই যা করেনি। তারা থানাভবনে শের আলীর বাগানে হামলা করে ইংরেজ সেনাদলকে পরাজিত করছে, তাদের কমান্ডারকে হত্যা করছে, তোপ ছিনিয়ে নিয়েছে, তারপর শামেলিতে আক্রমণ করে সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেছে, সরকারি ইমারত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, নিজেদের স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠিত করেছে ইত্যাদি। সুতরাং ইংরেজরা চাইছিলো আলেমদের হাতির পদতলে পিষে মারতে বা সাগর পাড়ে দেশান্তর করতে ।
যদিও এই সমস্ত বিদ্রোহাত্মক কর্মকাণ্ড সত্ত্বেও কতিপয় আলেমের প্রাণে বেঁচে যাওয়াটা ছিলো অনেকটা অলৌকিক ব্যাপার । অবশ্য পরে তাদের কেউ কেউ গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। সময় তাদের অনুকূল ছিল না। ইংরেজরাও তাদের শত্রুকে চিনতে ভুল করেনি। ফলে সারা দেশে প্রায় তেরো হাজার আলেমকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয়।
এডওয়ার্ড টমাস দিল্লী শহরের হৃদয়বিদারক ঘটনাবলীর বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে লিখেছেন, একমাত্র দিল্লী শহরে পাঁচশো শ্রেষ্ঠ আলেমকে শুলবিদ্ধ করা হয়েছিল। জল্লাদদের বাধ্য করা হতো যাতে তারা বেশি সময় পর্যন্ত লাশ শূলের ওপর টাঙিয়ে রাখে। ময়দানে প্রতিষ্ঠিত শূলদণ্ডগুলো থেকে বারবার লাশ নামানো হচ্ছিল। আর তা দেখে সাম্রাজ্যবাদী শাসক ইংরেজদের কলিজা ঠাণ্ডা হচ্ছিলো। [সাওয়ানেহে উমরী, মওলানা মুহাম্মদ কাসেম, লেখক মওলানা মুহাম্মদ ইয়াকুব]
সন্দেহ নেই সিপাহী বিদ্রোহ ছিলো একটি উপলক্ষ মাত্র। আসলে শাহ ওলীউল্লাহর নতুন ও বিপ্লবী ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী সমগ্র উপমহাদেশে ইসলামী পুনরুজ্জীবনের যে কার্যক্রম শুরু হয় এবং যাতে নেতৃত্ব দেন তার সুযোগ্য পুত্র শাহ আবদুল আজিজ মুহাদ্দিস দেহলবী।
তারই সূত্র ধরে সারা ভারতে আলেম সমাজের মধ্যে ইসলামী জ্ঞান চর্চা বৃদ্ধি পায়। ইসলামকে তারা উনিশ শতকের ভারতবর্ষের জাতি-বর্ণ নির্বিশেষ সকল মানুষের জন্য রাজতন্ত্রের পরিবর্তে একটি পরামর্শভিত্তিক যথার্থ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইনসাফপূর্ণ নিয়ম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন। আর ধীরে ধীরে তারা সফলকাম হচ্ছিলেন। আজ গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে তাদেরই দাওয়াতের দীপ্ত দেখা যায়।

শয়তানের সম্মেলন

কোন এক মহাসাগরের গভীরে নির্মিত এক সুরম্য প্রাসাদের অভ্যন্তরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে….
.
বিশাল চারকোণা টেবিলের চতুর্দিকে উৎসুক মুখগুলো চেয়ে আছে টেবিলের অপর প্রান্তে। কালো আলখেল্লা পরে আসনে উপবিষ্ট হল শয়তান সর্দার। বাৎসরিক রিপোর্ট গ্রহণের দিন আজ…. বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্বরত ডেপুটি শয়তানরা তাদের রিপোর্ট পেশ করতে এসেছে। রিপোর্ট গ্রহণ শুরু হল।
.
শয়তান সর্দার: ডেপুটি ওয়াহদা, আপনার রিপোর্ট পেশ করুন।
.
ডেপুটি ওয়াহদা: মহামান্য শয়তান, আমার টিম গত এক বছরে ১৩ হাজার তরুণ তরুণীকে সালাহ হতে বিরত রেখেছে।
.
শয়তান সর্দার: মারহাবা! তোমরা কি কি কৌশল অবলম্বন করেছ?
.
ডেপুটি শয়তান: আমাদের বেশ কিছু নতুন কৌশল সফল হয়েছে, আরো কিছু পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে। আমরা প্রথম যে কৌশল অবলম্বন করেছি, তা হল, আধুনিকমনা তরুণদের নিকট, সালাহ, মেডিটেশন, যোগব্যায়াম প্রভৃতিকে সমতুল্য হিসেবে তুলে ধরেছি। এরপর সালাহর তুলনায় বাকি দুইটিকে চটকদার মোড়কে উপস্থাপন করেছি। ব্যাস!! আধুনিকমনা হতে গিয়ে….. (ক্রুর হাসি হাসল)…. হেহেহে! আর বুইড়াগুলারে বুঝিয়েছি, সালাহ পড়লে হার্টের অসুখ ভাল হয়, ব্লাড প্রেসার লো হয়, ফলে তারা সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করার পরিবর্তে হার্টের অসুখ ভাল হওয়ার জন্য সালাহ পড়েছে। এই বছর নতুন স্ট্রাটেজী ছিল এই দুইটি। আর পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আপাতত, আমিন আস্তে বলা, জোরে বলা, রাফাইদিন করা না করা নিয়ে গ্যাঞ্জাম লাগানোর চেষ্টায় আছি, এতে সাধারণ মুসল্লীরা মসজিদ বিমুখ হবে বলে আশা করছি। আর আগের “প্যান্ট নষ্ট” থিওরী এখনও চালু আছে।
.
শয়তান সর্দার: হুম, ভাল কাজ দেখিয়েছ। ডেপুটি ইছনানা, তোমার কি অবস্থা?
.
ডেপুটি ইছনানা: মহামান্য শয়তান, গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বাধিক ব্যভিচারের রেকর্ড গড়েছি আমরা।
.
শয়তান সর্দার: নতুন কোন কৌশল?
.
ডেপুটি ইছনানা: এই বছরে সবচেয়ে কার্যকরী কৌশল ছিল, বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাধ্যতামূলকভাবে ছাত্র ছাত্রীদেরকে দুই মাসের জন্য স্টাডি ট্যুরের ব্যাবস্থা করা। যেখানে মূলত, নদীর চর, পাহাড়ী এলাকা, বনাঞ্চলে “প্রকৃতির সাথে একাত্মতা” ক্যাম্পেইনের নামে ক্যাম্পিং করানো। তরুণ প্রজন্ম হতে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে!
.
শয়তান সর্দার: Excellent!!!! আর কেউ নতুন কিছু উদ্ভাবন করেছ?
.
(ডেপুটি আরবাআ হাত তুলল)
.
শয়তান সর্দার: বল।
.
ডেপুটি আরবাআ: আমরা কিছু দাঁড়িওয়ালা রোমিও আর হিজাবী জুলিয়েট সৃষ্টি করে ইসলামের বাহ্যিকতার বিরুদ্ধে মানুষের অন্তরে ঘৃণার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছি।
.
শয়তান সর্দার: Great! এই প্রকল্প নিয়ে আমরা অবশ্য অনেক আগে থেকেই কাজ করছিলাম…….(একটু থেমে), তা আমাদের নতুন ডেপুটি, ডেপুটি জাদীদ…. তার কি অবস্থা? আপনার রিপোর্ট কি?
.
(এক কোণায় নিভৃতচারে বসে থাকা ছোটখাট ডেপুটি জাদীদ কাঁচুমাচু হয়ে বলল…..)
.
ডেপুটি জাদীদ: আমার টিম যথাসাধ্য চেষ্টা করে এক তরুণকে বিপথগামী করেছে।
.
(পুরো কনফারেন্স রুমে হাসির হুল্লোড় উঠল…. ‘মাত্র একজনকে?’, ‘হাহাহ! এটা তো আমার বা হাতের কড়ে আঙুলের কাজ’, ‘এই রিপোর্ট নিয়ে কনফারেন্সে এসেছে! হাহ!’)
.
শয়তান সর্দার হাত তুলতেই গুঞ্জন থেমে গেল।
.
শয়তান সর্দার: বিস্তারিত বল, শুনি।
.
ডেপুটি জাদীদ: ছেলেটি ছিল সাধারণ আর দশটি তরুণের মতই। হঠাৎ সে তার বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে ইসলামের আহবান পেয়ে বেশ জোরেশোরে ইসলামের কাজ করতে থাকে। আমরা বিভিন্ন সুন্দরী তরুণীর অফার নিয়ে, ভাল চাকরির অফার নিয়ে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কোনমতেই তাকে টলানো যাচ্ছিলনা। ফেইসবুকেও সে ছিল রীতিমত সেলেব্রেটি। তার পোস্টগুলোতে শত শত লাইক পড়ত। একদিন একটি হিজাবওয়ালা মেয়ে তাকে ইনবক্সে প্রশ্ন করে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে বিভক্তির কারণ জানতে চায়। সেও সোৎসাহে উত্তর দেয়। মেয়েটি সন্তুষ্ট হয়ে তার পরের সব পোস্টে লাইক দিতে থাকে। আমরাও পেয়ে গেলাম সুযোগ। তার অন্তরে এ ধারণা দিতে থাকলাম যে, মেয়েটি তাকে খুব পছন্দ করে। এরপর থেকে সে প্রতিদিন মেয়েটির লাইক পাওয়ার জন্যই পোস্ট দিতে থাকে। প্রতিটি নোটিফিকেশনে সে অধীর আগ্রহে মেয়েটির নাম খুঁজত। এরই মাঝে মেয়েটি ইনবক্সে আরও বেশ কিছু বিষয় জানতে চায়। সেও তা জানায়। হঠাৎ একদিন মেয়েটি জানায়, সে তাকে পছন্দ করে ফেলেছে, কিন্তু সে বিবাহিতা, সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে এবং সে চায় ছেলেটি যেন তাকে ব্লক করে দেয়। ছেলেটি ব্যাপারটিকে স্বাভাবিকভাবেই নেয়, তবে সে মেয়েটিকে ব্লক করেনা। পরে মেয়েটি নিজেই তাকে ব্লক করে দেয়। এরপর থেকেই আমাদের পরিকল্পনা শুরু। কিছুদিন পর ছেলেটি, মেয়েটির নাম লিখে সার্চ দেয়, কিন্তু পায়না। এরপর সে অন্য একটি একাউন্ট খুলে সার্চ দেয়, তাও পায়না। প্রতিদিন সে তাকে খুঁজে, কিন্ত পায়না। প্রতিটা নোটিফিকেশনে সে খুঁজে মেয়েটিকে, তার অন্তরে আশা, মেয়েটি হয়ত অন্য কোন নাম নিয়ে আসবে….. কিন্তু না, সে আর আসেনা…. এভাবে পোস্ট, শেয়ার লাইক এসব ছেলেটির কাছে উদ্দেশ্যহীন মনে হতে থাকে। আমরা তার অন্তরে প্ররোচনা দিলাম, তুমি তো মুনাফিকি করছ, ভাব দেখাচ্ছ ইসলামিক, অথচ পোস্ট দিচ্ছ একটা মেয়ের জন্য! সে লজ্জা পেতে থাকে, এই লজ্জা তাকে হতাশার দিকে নিয়ে যায়, আর এই হতাশার বৃত্ত তাকে তার স্রষ্টার প্রতি হতাশ করে দিয়েছে। সে লজ্জায় স্রষ্টার মুখোমুখি হয়না, সে ভাবছে সে শেষ হয়ে গেছে, সে ভাবছে আমি নিজেই যে লজ্জার কাজ করেছি, আবার কোন মুখে মানুষকে ইসলামের দিকে ডাকব? আস্তে আস্তে সে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, অন্যান্যদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আর এখন সে, হতাশা আর যন্ত্রণায়, ড্রাগস নেয়া শুরু করেছে, বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছে…
.
শয়তান সর্দার: তুমি খুব সূক্ষ্ণ চাল চেলেছ। মূলত আজকের কনফারেন্সের সবচেয়ে সফল ব্যক্তি আসলে তুমিই। অন্যরা সবাই, কাউকে না কাউকে পাপী বানিয়েছে, কিন্তু এরা মাফ চাইলে, ফিরে আসলে আল্লাহ এদের সবাইকে মাফ করে দিবে। আর তুমি আল্লাহর একজন প্রিয় বান্দাকেই গাফিল করেছ, আর আল্লাহর দিকে তার ফিরে আসার পথ চিরতরের জন্য বন্ধ করে দিয়েছ যা তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে…. মূলত এটাই আমাদের উদ্দেশ্য, এবং তুমি অত্যন্ত সফলতার সাথে তা করেছ। অন্য কেউই চূড়ান্তভাবে জাহান্নামে নেয়ার উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারেনি, আর তাই এ বছরের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার তুমিই অর্জন করতে যাচ্ছ!

হে মুসলিমেরা, অবশ্যই আমরা প্রত্যেকে জিজ্ঞাসিত হবে

Write

হে মুসলিমেরা, অবশ্যই আমরা প্রত্যেকে জিজ্ঞাসিত হবে আমাদের এই ছোট বোনটিকে রক্ষা করার বিষয়ে। আজকে আমাদের শক্তিশালী বাহু গুলো মুসলিমদের রক্ষায় ব্যার্থ হয়েছে বলেই এই কমজোড় ভাইটি তার বোনের জীবন রক্ষায় নিজের কোমল হাত প্রসারিত করতে বাধ্য হয়েছে।

কেবলমাত্র মুসলিম নামধারী হয়ে জান্নাত লাভের অলীক স্বপ্ন থেকে বেড়িয়ে আসুন, মুসলিম হওয়ার অর্থ সপ্তাহে একবার জুম্মার নামাজে যাওয়া কিংবা কেবলে ৫ ওয়াক্ত সালাত, দাড়ি-টুপি পরিধান করার করার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, যখন কিনা রাসূল সাঃ বলে গিয়েছেন মুসলিমরা হচ্ছে একটি দেহের মত যখন দেহের কোন একটি অংশ ব্যাথা পায় তখন পুরো দেহই সে ব্যাথা অনুভব করে।

সে শুয়ে আছে সার্বিয়ার এক জঙ্গলে।

ওর নাম “লামার”, বয়স ৫ বছর।

সে শুয়ে আছে সার্বিয়ার এক জঙ্গলে। ওর বাড়ি, ছোট্ট পুতুল ও সব খেলনা চুড়মার হয়ে গেছে একটি বোমার আঘাতে। এই ছবিটি তোলা হয়েছে তখন যখন ওর পরিবার দুইবার তুরস্ক সাগড় পাড়ি দেয়ার চেষ্টার পর অবশেষে কোনরকমে সার্বিয়ায় এসে পৌছেছে।

এটা হচ্ছে বহু সংখ্যক ছবি কিবা গল্পের মাঝে মাত্র একটি গল্প যা আপনি পড়বেন, কিন্তু এরপর? এরপর কি হবে? আপনি কি কিছু মুহুর্ত চিন্তা করবেন এরপর ভুলে যাবেন যতক্ষন পর্যন্ত না এমন আরেকটি ছবি আপনার সামনে এসে পড়ে?

আমি আপনাদের একজন খলিফার কথা বলি, যিনি ছিলেন অর্ধ জাহানের শাসক, তিনি একটি ছেড়া জামা পরে জুম্মার খুতবা দিতে মিম্বরে উঠতেন যখন কিনা তার পেট ক্ষুধায় গুড়গুড় শব্দ করত এবং তিনি পেটকে উদ্দেশ্য করে বলতেন-

“ গুড়গুড় কর কিংবা না কর , তোমাকে ভরাট করা হবে না যতক্ষন পর্যন্ত না ক্ষুধার্ত শিশুদের পেট ভরাট হচ্ছে”

এই পশ্চিমা-ইউরোপীয়ানদের বাচ্চাগুলো যখন কোন কাল্পনিক বিপদেও পড়ে তখন সুপারম্যান- স্পাইডারম্যানেরা উড়ে আসে তাদের রক্ষা করতে। অথচ আমাদের শিশুগুলোর সত্যিকার বিপদে কোন সুপারম্যান আসে না!!! 

আমাদের শিশুগুলোর জন্য একজন সুপারম্যান দরকার এবং সে সুপারম্যান খলিফা ওমরের মত খলিফা ছাড়া আর কেউ নন, যিনি অনুভব করবেন আমাদের শিশুগুলোকে, যিনি তার দৌর্দন্ড প্রতাপশালী সেনাবাহিনী প্রেরন করবেন এই শিশুগুলোর রক্ষার্থে যারা আমেরিকা-রাশিয়া নামক সুপার পাওয়ারের স্বার্থের মাঝে পরে আজ জঙ্গলে রাত কাটাচ্ছে, ক্ষুধার্ত অবস্থায় , হৃদয়ে ভয় ও শংকা নিয়ে। যারা চোখ খুলেই দেখেছে তাদের বাবার মৃত লাশ, কান খুলেই শুনেছে ড্রোনের সম্ভাষণ। 

আমাদের এই সুপারম্যান কোন মংগল গ্রহ থেকে উড়ে আসবেন না, কিংবা ল্যাবরেটরিতেও তাকে সৃষ্টি করা যাবে না। তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার গুরু দায়িত্ব আমাদেরকেই বহন করতে হবে, প্রতিষ্ঠা করতে হবে সেই সাম্রাজ্য , সেই খিলাফত রাষ্ট্র, যা ১৪০০ বছর পৃথিবীকে শাসন করেছে, দিয়েছে শান্তি, আমাদের বাচ্চাগুলোও এমন কোন এক জঙ্গলে ঠাই পাবার আগে, কিংবা এই মাসুম বাচ্চাগুলো আমাদের জান্নাত আটকে দেবার আগে…

ভুমিকম্প কেন হয়?

ভুমিকম্প কেন হয়?
আবু হুরাইরা (রা.) কতৃক বর্ণিত, আল্লাহর নবি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যখন অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জিত হবে, কাউকে বিশ্বাস করে সম্পদ গচ্ছিত রাখা হবে কিন্তু তার খিয়ানত করা হবে (অর্থাৎ যার সম্পদ সে আর ফেরত পাবে না), জাকাতকে দেখা হবে জরিমানা হিসেবে, ধর্মীয় শিক্ষা ব্যতীত বিদ্যা অর্জন করা হবে, একজন পুরুষ তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে কিন্তু তার মায়ের সাথে বিরূপ আচরণ করবে, বন্ধুকে কাছে টেনে নিবে আর পিতাকে দূরে সরিয়ে দিবে, মসজিদে উচ্চস্বরে শোরগোল (কথাবার্ত) হবে, জাতির সবচেয়ে দূর্বল ব্যক্তিটি সমাজের শাসক রুপে আবির্ভূত হবে, সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি জনগণের নেতা হবে, একজন মানুষ যে খারাপ কাজ করে খ্যাতি অর্জন করবে তাকে তার খারাপ কাজের ভয়ে সম্মান প্রদর্শন করা হবে, বাদ্যযন্ত্র এবং নারী শিল্পীর ব্যাপক প্রচলন হয়ে যাবে, মদ পান করা হবে (বিভিন্ন নামে মদ ছড়িয়ে পড়বে), শেষ বংশের লোকজন তাদের পূর্ববর্তী মানুষগুলোকে অভিশাপ দিবে, এমন সময় আসবে যখন তীব্র বাতাস প্রবাহিত হবে তখন একটি ভূমিকম্প সেই ভূমিকে তলিয়ে দিবে (ধ্বংস স্তুপে পরিণত হবে বা পৃথিবীর অভ্যন্তরে ঢুকে যাবে)। [তিরমিযি কতৃক বর্ণিত, হাদিস নং – ১৪৪৭] এই হাদিসের মাঝে বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে যে আল্লাহ মহানের পক্ষ থেকে জমিনে কখন ভুমিকম্পের আজাব প্রদান করা হয় এবং কেন প্রদান করা হয়।
আল্লামা ইবনুল কাইয়ুম (রহ.) বলেন, মহান আল্লাহ মাঝে মাঝে পৃথিবীকে জীবন্ত হয়ে উঠার অনুমতি দেন, যার ফলে তখন বড় ধরণের ভূমিকম্প অনুষ্ঠিত হয়। তখন এই ভূমিকম্প মানুষকে ভীত করে। তারা মহান আল্লাহর নিকট তাওবা করে, পাপ কর্ম ছেড়ে দেয়, আল্লাহর প্রতি ধাবিত হয় এবং তাদের কৃত পাপ কর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে মুনাজাত করে। আগেকার যুগে যখন ভূমিকম্প হত, তখন সঠিক পথে পরিচালিত সৎকর্মশীল লোকেরা বলত, ‘মহান আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করেছেন।’
বিজ্ঞান কী বলে?
ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের আলোকে ভূপৃষ্ঠের নীচে একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় রয়েছে কঠিন ভূত্বক। ভূত্বকের নীচে প্রায় ১০০ কি.মি. পূরু একটি শীতল কঠিন পদার্থের স্তর রয়েছে। একে লিথোস্ফেয়ার (Lithosphere) বা কঠিন শিলাত্বক নামে অভিহিত করা হয়। আমাদের পৃথিবী নামের এই গ্রহের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, কঠিন শিলাত্বক (লিথোস্ফেয়ার)সহ এর ভূপৃষ্ঠ বেশ কিছু সংখ্যক শক্ত শিলাত্বকের প্লেট (Plate) এর মধ্যে খন্ড খন্ড অবস্থায় অবস্থান করছে। ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের আলোকে এই প্লেটের চ্যুতি বা নড়া-চড়ার দরুণ ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
ভুমিকম্প বিষয়ক কোরানতত্ত্ব
ভূমিকম্প বিষয়ে পবিত্র কোরানে সূরায়ে ‘যিলযাল’ নামে একটি সূরাই নাযিল করা হয়েছে। মানুষ শুধু কোন ঘটনা ঘটার কার্যকারণ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয় এবং ভূতত্ত্ববিজ্ঞানও এই কার্যকারণ সম্পর্কেই আলোচনা করে থাকে। কিন্তু কুরআনুল কারীম একই সাথে কোন ঘটনা ঘটার কার্যকারণ বর্ণনার পাশাপাশি উক্ত ঘটনা থেকে শিক্ষনীয় বিষয় কি এবং এই ঘটনা থেকে অন্য আরো বড় কোন ঘটনা ঘটার সংশয়হীনতার প্রতি ইংগিত করে। ভূমিকম্প বিষয়ে কুরআনুল কারীমে দু’টি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। একটি হল ‘যিলযাল’, যার অর্থ হল একটি বস্তুর নড়াচড়ায় অন্য আরেকটি বস্তু নড়ে ওঠা। দ্বিতীয় শব্দটি হল ‘দাক্কা’, এর অর্থ হল প্রচন্ড কোন শব্দ বা আওয়াজের কারণে কোন কিছু নড়ে ওঠা বা ঝাঁকুনি খাওয়া। পৃথিবীতে বর্তমানে যেসব ভূমিকম্প ঘটছে, তা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে কঠিন শিলাত্বকে চ্যুতি বা স্থানান্তরের কারণে। কিয়ামতের দিন আরেকটি ভূমিকম্পে পৃথিবী টুকরো টুকরো হয়ে ধুলিকনায় পরিণত হবে এবং তা হবে ফেরেশেতা হযরত ইসরাফিলের ( আ.) সিঙ্গায় ফুৎকারের কারণে, যাকে বলা হয় ‘দাক্কা’। যা হবে এক প্রচন্ড আওয়াজ।
পৃথিবীতে মাঝে মাঝে কঠিন শিলাত্বকের স্থানান্তরের কারণে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প আমাদেরকে এ কথার প্রতি ইংগিত করে যে, একদিন ওই ‘দাক্কা’ সংঘটিত হবে, যার নাম কেয়ামত। তখন এই চাকচিক্যময় দুনিয়ার সবকিছুই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে। মানুষ যেন কিয়ামতকে ভুলে না যায়, দুনিয়াকেই তার আসল ঠিকানা মনে না করে, তাই মাঝে মাঝে মহান আল্লাহ ভূমিকম্পসহ আরো অন্যান্য প্রাকৃতিক দূর্যোগ দিয়ে মানুষকে সতর্ক করে থাকেন।
ভুমিকম্প একটি আজাব
আল্লাহ মহান পবিত্র কোরানে ইরশাদ করেছেন, বল, আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর, তোমাদের উপর থেকে (আসমান থেকে) অথবা তোমাদের পায়ের নীচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম, অথবা তিনি তোমাদের দল-উপদলে বিভক্ত করে একদলকে আরেক দলের শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাতেও সম্পূর্ণরূপে সক্ষম।” (সূরা আল আনআম : ৬৫)
আল-বুখারি তার সহিহ বর্ণনায় জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যখন তোমদের উপর থেকে (আসমান থেকে) নাজিল হলো তখন রাসূল (স) বললেন, আমি তোমার সম্মূখ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, অথবা যখন, অথবা তোমাদের পায়ের নীচ থেকে আজাব নাযিল হলো, তখন তিনি (সা.) বললেন, আমি তোমার সম্মূখ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (সহিহ বুখারি, ৫/১৯৩)
আবূল-শায়খ আল-ইস্পাহানি এই আয়াতের তাফসিরে বর্ণনা করেন, “বল, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর, তোমাদের উপর থেকে (আসমান থেকে)- যার ব্যাখ্যা হলো, তীব্র শব্দ, পাথর অথবা ঝড়ো হাওয়া; আর অথবা তোমাদের পায়ের নীচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম- যার ব্যাখ্যা হলো, ভুমিকম্প এবং ভূমি ধ্বসের মাধ্যমে পৃথিবীর অভ্যন্তরে ঢুকে যাওয়া।)
বান্দার ওপর আজাব কেন আসে?
হজরত আলী [রা.] হতে বর্ণত রসুল [সা.] ইরশাদ করছেন, যখন আমার উম্মত যখন ১৫ টি কাজে লিপ্ত হতে শুরু করবে তখন তাদের প্রতি বালা মসীবত আপাতিতি হতে আরম্ভ করবে।কাজগুলো হল
১. গণীমতের মাল ব্যাক্তিগত সম্পদে পরিণিত হবে।
২. আমানতের সম্পদ পরিনত হবে গনীমতের মালে।
৩. জাকাত আদায় করাকে মনে করবে জরিমানা আদায়ের ন্যায়।
৪. স্বামী স্ত্রীর বাধ্য হবে।
৫. সন্তান মায়ের অবাধ্য হবে।
৬. বন্ধু-বান্ধবের সাথে স্বদব্যাবহার করা হবে।
৭. পিতার সাথে করা হবে জুলুম।
৮. মসজিদে উচ্চস্বরে হট্টোগোল হবে
৯. অসাম্মানী ব্যাক্তিকে জাতির নেতা মনে করা হবে।
১০. ব্যাক্তিকে সম্মান করা হবে তার অনিষ্ট থেকে বাচার জন্য।
১১. প্রকাশ্যে মদপান করা হবে।
১২. পুরুষ রেশমী পোষাক পরবে।
১৩. গায়িকা তৈরি করা হবে।
১৪. বাদ্যযন্ত্র তৈরি করা হবে।
১৫.পুর্ববর্তী উম্মতদের (সাহাব, তাবে, তাবেঈন) প্রতি অভিসমাপ্ত করবে পরবর্তীরা।
এই কাজগুলি যখন পৃথিবীতে হতে শুরু হবে তখন অগ্নীবর্ষী প্রবল ঝড়, ভুমিকম্প ও কদাকৃতিতে রূপ নেয়ার অপেক্ষা করবে। এখন একটু চিন্তা করা উচিত যে আমরা এগুলোর মাঝেই লিপ্ত রয়েছি। আর যখন আমাদের উপর মুসীবত আসে তখন প্রকৃতির বা মানুষের বা অন্যান্য জিনিসের দোষ দেই। আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত যে সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন আমরা হই তা আসলে আমাদের গুনাহের কারনেই এত আযাব।
ভুমিকম্প হলে করনীয় কি?
যখন কোথাও ভূমিকম্প সংগঠিত হয় অথবা সূর্যগ্রহণ হয়, ঝড়ো বাতাস বা বন্যা হয়, তখন মানুষদের উচিত মহান আল্লাহর নিকট অতি দ্রুত তওবা করা, তাঁর নিকট নিরাপত্তার জন্য দোয়া করা এবং মহান আল্লাহকে অধিকহারে স্মরণ করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা যেভাবে রাসূল (সা.) সূর্য গ্রহণ দেখলে বলতেন, যদি তুমি এরকম কিছু দেখে থাক, তখন দ্রুততার সাথে মহান আল্লাহকে স্মরণ কর, তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। [বুখারি ২/৩০ এবং মুসলিম ২/৬২৮]
বর্ণিত আছে যে, যখন কোন ভূমিকম্প সংগঠিত হতো, উমর ইবনে আব্দুল আযিয (রহ) তার গভর্ণরদের দান করার কথা লিখে চিঠি লিখতেন।
ভুমিকম্প একটি কেয়ামতের আলামত
আবূল ইয়ামান (রহ.) আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি [সা.] বলেছেন, কিয়ামত কায়েম হবে না, যে পর্যন্ত না ইল্‌ম উঠিয়ে নেওয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভুমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে এবং হারজ বৃদ্ধি পাবে। (হারজ অর্থ খুনখারাবী) তোমাদের সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, উপচে পড়বে। [সহিহ বুখারি, অধ্যায় : ১৫/ বৃষ্টির জন্য দুআ, হাদিস নাম্বার : ৯৭৯]
পবিত্র কোরানের একাধিক আয়াতে বলা হয়েছে যে, জলে স্থলে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তা মানুষেরই কৃতকর্মের ফল। আল্লাহপাক মানুষের অবাধ্যতার অনেক কিছুই মাফ করে দেন। তারপরও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়। কোরান নাজিল হওয়ার পূর্বেকার অবাধ্য জাতি সমূহকে আল্লাহপাক গজব দিয়ে ধ্বংস করেছেন। সে সবের অধিকাংশ গজবই ছিল ভুমিকম্প। ভুমিকম্প এমনই একটা দুর্যোগ যা নিবারন করার মতো কোন প্রযুক্তি মানুষ আবিষ্কার করতে পারে নাই। এর পূর্বাভাষ পাওয়ার মতো কোন প্রযুক্তিও মানুষ আজ পর্যন্ত আবিষ্কার করতে পারেনাই। হাদিস শরীফেও একাধিকবার বলা হয়েছে যে, মানুষের দুষ্কর্মের জন্যই ভুমিকম্পের মতো মহা দুর্যোগ ডেকে আনে। কুরআন এবং হাদিসে আদ, সামুদ, কওমে লুত এবং আইকার অধিবাসীদের ভুমিকম্পের দ্বারা ধ্বংস করার কাহিনী বিভিন্ন আঙ্গিকে বর্ণনা করা হয়েছে।
একটু ভাবুন তো…
সামান্য এই ভূমিকম্পেই সম্পদের মায়া ছেড়ে আমরা রাস্তায় নামছি। এটা যখন আরো বাড়বে, তখন সম্পর্কের মায়াও ছেড়ে দেবো আমরা। নিজেকে বাচানোর চেষ্ঠায় ব্রতী হবো সবাই। যখন তা রচাইতেও আরো বাড়বে তখন যেই মা দুধ খাওয়াচ্ছেন তিনিও তার বাচ্চাকে ছুড়ে ফেলে দেবেন, গর্ভের শিশুকেও বের করে দেবেন। ভূমিকম্পের সময় কে কি বস্থায় ছিলাম, কে টের পেয়েছে, কে টের পায়নি, চেয়ার টেবিল নড়ছিলো কিনা, ফ্যান দুলছিলো কিনা- এই সব গবেষণা পরে করলেও হবে। আগে করা দরকার তওবা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। সবচেয়ে বড় কথা হল, এটি আল্লাহ কর্তৃক একটি নিদর্শন। যাতে করে মানুষ স্বীয় অপরাধ বুঝতে সক্ষম হয়। ফিরে আসে আল্লাহর পথে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে আন্তরিকতার সাথে খাটি তওবা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

জ্ঞানের ইসলামীকরণের পর্যালোচনা

জ্ঞানের ইসলামীকরণের পর্যালোচনা
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব মূলত জ্ঞানগত
বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত জীব মানুষ।[1] এই সম্মান প্রথম লাভ করেন হযরত আদম (আ)। এই মহাসম্মান অর্জন করার কারণ হলো বিশ্বজগত সম্পর্কে তিনি অন্যদের চেয়ে বেশি জানতেন।[2] আল্লাহ তায়ালা আদমকে (আ) সর্বপ্রথম শিখিয়েছেন সমস্ত কিছুর নাম।[3] যেহেতু জ্ঞানের প্রথম স্তর বস্তুর নাম জানা ও পরিভাষা শেখা, তাই আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম আদমকে (আ) তা-ই শেখালেন। তিনি ইচ্ছা করলে আদমকে (আ) সর্বপ্রথম ধর্ম সম্পর্কিত জ্ঞান শেখাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, বরং আদমকে (আ) শিখিয়েছেন বিশ্বজগতের জ্ঞান। যার ফলে আদম (আ) ও তাঁর বংশধর হয়েছেন পৃথিবীতে সবচেয়ে সম্মানিত জীব।

মানবজাতির কাছে তখনো কোনো ধর্ম প্রকাশ হয়নি। কেবল বিশ্বজগতের জ্ঞান অর্জনের ফলেই আল্লাহ তায়ালা আদমকে (আ) পৃথিবীর খলিফা বানিয়ে দিলেন।[4] এবং ইবলিসের বিপরীতে আদম (আ) হলেন আল্লাহ তায়ালার একান্ত অনুগত বান্দা। লক্ষণীয় যে, আদমের (আ) বিশ্বজ্ঞান তাঁকে আল্লাহর অনুগত হবার ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি; বরং আল্লাহ তায়ালার সঠিক পরিচয় জানার ক্ষেত্রে এই জ্ঞান তাঁকে সাহায্য করেছিল। অন্যদিকে, ইবলিস আল্লাহ তায়ালার আদেশ অমান্য করেছিল। এর প্রথম কারণ – সে আদমের (আ) মতো জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ছিল না; দ্বিতীয়ত, ইবলিসের জ্ঞানের চেয়ে অহংকার ছিল বেশি। ফলে সে নিজ-জ্ঞানলব্ধ সত্যকে অস্বীকার করেছিল।[5]

আল্লাহ তায়ালা যদি পৃথিবীতে কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীকে মর্যাদা ও কল্যাণ দান করতে চান, তাহলে তিনি তাঁদেরকে জ্ঞান দান করেন।[6] জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ফলেই মানবজাতির মধ্যে কেউ কেউ বিশ্বজগত ও প্রকৃতির ওপর নিজেদের রাজত্ব কায়েম করতে পারে। এবং সঠিকভাবে আল্লাহর দেয়া খিলাফতের দায়িত্ব পালন করতে পারে। হযরত দাউদ ও সোলায়মানকে (আ) আমরা উদাহরণ হিসাবে পেশ করতে পারি। আল্লাহ তায়ালা তাঁদের উভয়কে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়েছিলেন বলেই তাঁরা বিশ্বজগত ও প্রকৃতির ওপর নিজেদের রাজত্ব কায়েম করতে পেরেছিলেন।[7] তাঁরা কেবল মানুষের ভাষা বুঝতেন, মানুষের নেতৃত্ব দিতেন – তা নয়; তাঁরা পশু-পাখি এমনকি প্রকৃতিরও ভাষা বুঝতেন[8] এবং তাদের ওপরও রাজত্ব করতেন।

হযরত সোলায়মানের (আ) সাথে রানী বিলকীসের ঘটনাটি সবার জানা। হযরত সোলায়মান (আ) যখন তাঁর পরিষদবর্গকে বললেন, তোমাদের মধ্যে কে পারবে রানীর সিংহাসনটি এ মুহূর্তে আমার সামনে এনে দিতে?[9] সোলায়মানের (আ) এ কাজটি কেবল সেই সম্পাদন করতে পেরেছিল, যে ছিল পরিষদবর্গের মাঝে সবচেয়ে জ্ঞানী।[10] কোরআনে এ ধরনের অনেক ঘটনা আছে, যেগুলো স্বাভাবিকভাবে অলৌকিক মনে হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার প্রতিটি কাজেরই জ্ঞানগত একটি কার্যকারণ বিদ্যমান থাকে। আমরা আমাদের জ্ঞানগত যোগ্যতানুযায়ী তা বুঝার সামর্থ্য অর্জন করি।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু সালামের (রা) ঘটনা
মদীনায় ইহুদীদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী ও বড় নেতা ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রা)। রাসূল (সা) মদীনায় হিজরতের পরপরই তিনি এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি রাসূলকে (সা) বলেন, “আমি ইহুদীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী এবং একজন বড় জ্ঞানী ইহুদীর সন্তান। আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এ কথাটা জানাজানি হওয়ার আগে আপনি ইহুদী সম্প্রদায়কে ডাকুন, আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করুন এবং আমার সম্পর্কে তাদের ধারণা অবগত হউন। রাসূল (সা) ইহুদী সম্প্রদায়কে ডেকে পাঠালেন। তারা উপস্থিত হওয়ার পর রাসূল (সা) তাদের বললেন – তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় করো, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, আমি সত্য রাসূল এবং সত্য নিয়েই তোমাদের নিকট এসেছি। সুতরাং তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। তারা জবাবে বলল – আমরা এসব জানি না। তারা বারবার নিজেদের অজ্ঞতা প্রকাশ করতে লাগলো। এবার রাসূল (সা) বললেন – তোমাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনু সালাম কেমন লোক? তারা বলল – তিনি আমাদের নেতা এবং নেতার সন্তান। তিনি আমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী এবং জ্ঞানীর সন্তান। রাসূল (সা) তখন বললেন – তিনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন তবে তোমাদের মতামত কী হবে? ইহুদীরা বলল – আল্লাহ হেফাজত করুন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করবেন তা কিছুতেই হতে পারে না। রাসূল (সা) আবার বললেন – আচ্ছা বলো তো, আবদুল্লাহ ইবনু সালাম যদি সত্যিই মুসলিম হয়ে যান তবে তোমরা কী মনে করবে? তারা বলল – আল্লাহ রক্ষা করুক। তিনি মুসলিম হয়ে যাবেন এ কিছুতেই সম্ভব নয়। এবার রাসূল (সা) বললেন – হে ইবনু সালাম! তুমি এদের সামনে বের হয়ে আসো। ইবনু সালাম বের হয়ে আসলেন এবং বললেন – হে ইহুদী সম্প্রদায়! আল্লাহকে ভয় করো। ঐ আল্লাহর কসম, তিনি ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই। তোমরা নিশ্চয়ই জানো, তিনি সত্য রাসূল; সত্য নিয়েই তিনি আগমন করেছেন। ইহুদীরা এবার বলে উঠলো – আবদুল্লাহ ইবনু সালাম! তুমি মিথ্যাবাদী।[11]

জ্ঞান ও ঈমানের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য
কোরআন ও হাদীসের এ বর্ণনাগুলো থেকে একেবারেই স্পষ্ট হওয়া যায় যে, জ্ঞান মাত্রই মানুষকে ইসলামের পথে নিয়ে আসে। আর অজ্ঞতা বা স্বল্প জ্ঞান মানুষকে কুফরির পথে নিয়ে যায়। কোরআন-হাদীসের পাতায় পাতায় জ্ঞান ও জ্ঞানীর বর্ণনা দেয়া হয়েছে।[12] জ্ঞানের স্বভাব ও জ্ঞানীর বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, জ্ঞানীরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বিশ্বাস করে।[13] তারা আল্লাহকে ভয় করে।[14] ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে।[15] তারা বিশ্বাস করে পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব আল্লাহর।[16] তারা জুমার দিনে আজানের পর বেচাকেনা বন্ধ করে দেয়।[17] একইভাবে কোরআনের দাবি হলো – জ্ঞানীরা বিশ্বজগত ও প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে।[18] এখানে গুরুত্বের সাথে লক্ষণীয় একটি বিষয় হলো – পুরো কোরআনে একটিবারের জন্যেও জ্ঞান শব্দটিকে কিঞ্চিৎ নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হয়নি। কোরআনে যখনি জ্ঞান ও জ্ঞানী সম্পর্কিত কোনো কথা এসেছে, তখনি আল্লাহর কোনো না কোনো অনুগত বান্দার বৈশিষ্ট্য হিসাবে তা উল্লেখ করা হয়েছে।[19] বিশ্বজগৎ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন বা বিশ্বজগত নিয়ে চিন্তা-ভাবনাকে আল্লাহ তায়ালার পরিচয় লাভের উত্তম উপায় হিসাবে ইসলাম চিহ্নিত করেছে। একই সাথে কাফেরদের ভর্ৎসনা করা হয়েছে এই বলে যে – তারা কি চিন্তা-ভাবনা করে না?[20] তারা কি জ্ঞান রাখে না?[21] তারা কি বিশ্বজগতের জ্ঞানকে অস্বীকার করে?[22] তারা কি দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করে না?[23]

জ্ঞান মাত্রই ভালো বা ইসলামিক
জ্ঞান মূলত মানুষকে প্রকৃতির স্বভাব জানতে সাহায্য করে এবং বিশ্বজগতের সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দেয়। অন্যভাবে বললে, বিশ্ব-স্বভাব-প্রকৃতি জানার নামই জ্ঞান। ইসলাম সেই স্বভাব-প্রকৃতির ধর্ম। রাসূলের (সা) নীতি হচ্ছে – যে ‘জ্ঞান’ পৃথিবী ও বিশ্বজগতের নিয়মের বাইরে এবং মানব মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে, তা মেনে নেয়া অন্যায় ও পাপ। অন্যদিকে, যে ‘জ্ঞান’ বিশ্বজগত বুঝতে সহায়ক এবং মানব মনে জেগে ওঠা প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দেয়, তা ন্যায় এবং তাই পুণ্য।[24]

এ পর্যন্ত আলোচনার পর খুব সহজে একটি অনুসিদ্ধান্তে আসা যায় যে – জ্ঞান মাত্রই ভালো বা ইসলামিক। তাই জ্ঞানকে ইসলামীকরণ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এরই সাথে আরেকটি প্রশ্ন ওঠা খুব স্বাভাবিক যে – তাহলে পৃথিবীর বড় বড় সব জ্ঞানী কাফের বা নাস্তিক হয় কেনো? প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে সে বিষটি আমরা বোঝার চেষ্টা করব।

জ্ঞান ও অহংকারের সম্পর্ক বিপরীতমুখী
আদম (আ) ও ইবলিসের আদি ঘটনাটির দিকে আবার দৃষ্টি ফেরানো যাক। আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে তাদের উভয়ের জ্ঞান ছিল সমান। কিন্তু আদম (আ) তাঁর জ্ঞানের কারণে আল্লাহ তায়ালার অনুগত বান্দা হতে পারলেও ইবলিস হয়েছে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত। এর কারণ কী? জ্ঞান থাকা সত্বেও ইবলিশ কেনো কাফের হলো? তার দুটি জবাব হতে পারে। প্রথমত, আল্লাহ তায়ালা ইবলিশকে আদমের (আ) মতো বিশ্বজ্ঞান দান করেননি।[25] ফলে অল্পবিদ্যা তার জন্যে ভয়ংকর বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দ্বিতীয়ত, অজ্ঞতাবশত সে অহংকার করে বসল। সূত্র হলো – জ্ঞান ও অহংকার একে অন্যের ব্যস্তানুপাতিক। জ্ঞান বাড়লে অহংকার কমে এবং অহংকার বাড়লে জ্ঞান কমে যায়। ইবলিশের যেহেতু অহংকার বেশি ছিল, তাই সে প্রকৃত জ্ঞানী হতে পারেনি। এ কারণেই সে আল্লাহর শত্রু বনে গেল। অল্পস্বল্প যে জ্ঞান ইবলিশের ছিল, তাও সে অস্বীকার করার ফলে কাফের হয়ে গেল।[26] অর্থাৎ জ্ঞানের অভাব ও অহংকারের প্রভাব – এ দুইয়ের ফলেই ইবলিস কাফের হলো।

জ্ঞানের কাঠামো ক্রমসোপানমূলক (hierarchical)
এবার মুসার (আ) একটি ঘটনা উল্লেখ করা যাক। তিনি একবার বনী ইসরাঈলের এক সমাবেশে ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন।[27] লোকেরা তাঁকে তখন জিজ্ঞাস করল – কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী? মুসা (আ) বললেন – আমি সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী। আল্লাহ তায়ালা মুসার (আ) উত্তরে অসন্তুষ্ট হলেন এবং তাঁকে সতর্ক করে দিলেন।[28] কেননা তিনি জ্ঞানকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত করেননি। আল্লাহ তায়ালা মুসাকে (আ) তাঁর চেয়েও বড় একজন জ্ঞানী হযরত খিজিরের (আ) নিকট পাঠালেন,[29] যেন মুসা (আ) তাঁর জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কথা বুঝতে পারেন। যে কোনো জ্ঞানীর ওপর অন্য একজন জ্ঞানী থাকে।[30] জ্ঞান ও অহংকার একসাথে থাকতে পারে না। যখন কেউ নিজের জ্ঞানকেই একমাত্র জ্ঞান বলে প্রকাশ করে এবং অহংকার শুরু করে, তখন সে আর জ্ঞানী হবার যোগ্যতা রাখে না। এ জাতীয় মানুষগুলোকে সক্রেটিস বলতেন – গণ্ড মূর্খ। কেননা সে আসলে জানে না, সে কতটা বোকা।[31] পৃথিবীর যে কোনো জ্ঞানকে যদি সর্বশেষ ও একমাত্র জ্ঞান মনে করা না হয় এবং বাহ্যিক কার্যকারণের বাইরেও জ্ঞানের কিছু বিষয় অজানা থেকে যাবার সম্ভাবনাকে স্বীকার করা হয়, তাহলে সে জ্ঞান মানুষকে নিশ্চিত আল্লাহর দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু মানুষ অহংকারবশত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে না। ফলে সে হয়ে পড়ে অস্বীকারকারী বা কাফের। জ্ঞানের দ্বারা অর্জিত সত্যকে যে অস্বীকার করে, সেই কাফের। সুতরাং জ্ঞানের ইসলামীকরণের চেয়ে অধিক প্রয়োজন মনের ইসলামীকরণ।

জ্ঞানগত মতভেদের কারণ
উপরের কথাটি বুঝতে কারো বেগ পেতে হয় না। তবু আরেকটু সহজভাবে বলা যেতে পারে। জ্ঞান হচ্ছে বিভিন্ন উপাদানের সমষ্টি। যার কাছে এই উপাদানগুলো থাকে সে তার মতো ব্যবহার করে। কিন্তু জ্ঞানের উপযুক্ত ব্যবহার যারা করতে পারে, তারা কখনও বিপথে যেতে পারে না। অর্থাৎ জ্ঞান কখনো খারাপ হয় না। জ্ঞানকে ইসলামীকরণ করার প্রয়োজন পড়ে না; প্রয়োজন জ্ঞানের উপযুক্ত ও পূর্ণ ব্যবহার।

এখন আরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। যেমন- জ্ঞান যদি মানুষকে সত্যিই আল্লাহর পথে নিয়ে যায়, তাহলে জ্ঞানীরা এত দলে-উপদলে বিভক্ত কেনো? তার মানে কি পৃথিবীতে অনেক প্রকারের জ্ঞান আছে? জ্ঞানের কি কোনো মৌলিক ও বৈশ্বিক ধারণা নেই? বিভিন্ন মানুষের কাছে জ্ঞান কি বিভিন্নভাবে ধরা দেয়? জ্ঞান মানুষের মাঝে কি ঐক্যের সৃষ্টি করে, নাকি ভিন্নতা তৈরি করে?— এ প্রশ্নগুলো জ্ঞানতাত্ত্বিকদের অনেকদিনের। তারা জানতে চায় – জ্ঞান আসলে কী!

জ্ঞান স্বভাবতই সমন্বয়ধর্মী
কোরআনের দাবি হলো – জ্ঞান ঐক্যের প্রতীক আর অজ্ঞতা বিভক্তির কারণ। জ্ঞানীরা গড়ে ঐক্য, মূর্খরা হয় বিভক্ত। জ্ঞান মানুষের মাঝে বিভেদ ঘটায় না, বিভেদ ঘটায় ‘জ্ঞানীদের’ পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ।[32] মনের কলুষতা, চিন্তার অপরিচ্ছন্নতা ও ভোগের চাহিদা ঘটায় মানুষে মানুষে মতভেদ। জ্ঞান কখনো মতভেদ ঘটায় না। জ্ঞান মানুষকে বিপথে নেয় না, মানুষকে বিপথে নেয় অহংকার ও অজ্ঞতা। অজ্ঞতা সকল অন্যায় ও অবিচারের মূল উৎস। তাই ইসলামের সংগ্রাম ছিল অজ্ঞতা বা জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে।

জ্ঞান ও ইসলামের সম্পর্ক অভিন্ন
ইসলাম এসেছে সত্যের জ্ঞান নিয়ে। তার প্রথম আদেশ – পড়।[33] ইসলামের সাথে জাহেলি বা মূর্খ যুগের প্রধান পার্থক্য হচ্ছে জ্ঞান। জাহেলি যুগে যিনি সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন, ইসলামেও তাঁর মর্যাদা সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ। কেবল শর্ত হলো তাঁকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে।[34] জ্ঞানশূন্য ইসলাম যেমন ইসলাম নয়, ইসলামশুন্য জ্ঞানও আসলে জ্ঞান নয়। জ্ঞান ও ইসলাম একে অপরের পরিপূরক, একটির অনুপস্থিতিতে অন্যটি হয়ে পড়ে নিষ্ক্রিয়। পৃথিবীর যে প্রান্তেই জ্ঞানের খনি থাকুক না কেনো তা প্রকৃত অর্থে ইসলামেরই হারানো সম্পদ। পৃথিবীর যে প্রান্তেই জ্ঞানের শব্দ শোনা যাক না কেনো তা প্রকারান্তরে ইসলামেরই শব্দ। অসম্পূর্ণ জ্ঞান মানুষকে নাস্তিকতার দিকে নিয়ে গেলেও পূর্ণ জ্ঞানপ্রাপ্তির পর মানুষ নিশ্চিত ঈমানের দিকে ফিরে আসে।

রেফারেন্স

[1] সূরা বনী ইসরাইল: ৭০

[2] সূরা বাকারা: ৩৩

[3] সূরা বাকারা: ৩১

[4] সূরা বাকারা: ৩০

[5] সূরা বাকারা: ৩৪

[6] হাদীস নং-৭১, জ্ঞান অধ্যায়, সহীহ বুখারী (ইফা),

[7] সূরা আন্বিয়া: ৭৯

[8] সূরা নামল: ১৫

[9] সূরা নামল: ৩৮

[10] সূরা নামল: ৪০

[11] হাদীস নং-৩৬৩০, আম্বিয়া অধ্যায়, সহীহ বুখারী (ইফা)

[12] সূরা রাহমান: ২। কিছু উদাহরণ – ২:১৮০, ২:১৮৪, ১৬:৯৫, ২১:৭, ২৩:১১৪, ২৩:৮৮, ২৩:৮৪, ৬১:১১; ৬২:৯, ৭১:৪,

[13] সূরা সফ: ১১

[14] সূরা ফাতির: ২৮

[15] সূরা তাওবা: ৪১

[16] সূরা মুমিনুন: ৮৪

[17] সূরা জুমা: ৯

[18] সূরা রাহমান: ১৩

[19] সূরা লোকমান: ১২

[20] সূরা আন্বিয়া: ১০

[21] সূরা আদিয়াত: ৯

[22] সূরা রাহমান: ১৩

[23] সূরা ইউছুফ: ১০৯

[24] হাদিস নং-২৭, ইমাম নববীর চল্লিশ হাদিস

[25] সূরা বাকারা: ৩৩

[26] সূরা বাকারা: ৩৪

[27] হাদীস নং-৩১৬২, আম্বিয়া অধ্যায়, সহীহ বুখারী (ইফা)

[28] হাদীস নং- ১২৪, জ্ঞান অধ্যায়, সহীহ বুখারী (ইফা)

[29] সূরা কাহাফ: ৬৫

[30] সূরা ইউছুফ: ৭৬

[31] সক্রেটিসের জবানবন্দি

[32] সূরা শূরা: ১৪

[33] সূরা আলাক: ১

[34] হাদীস নং- ৩১১৬, আম্বিয়া অধ্যায়, সহীহ বুখারী (ইফা)

তুর্কী সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’ তুলে দেয়ার পর কি কি ঘটেছিলো আসুন দেখি-

তুর্কী সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’ তুলে দেয়ার পর কি কি ঘটেছিলো আসুন দেখি-
১) শিশুদের ইসলামী শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়।
২) ধর্ম মন্ত্রণালয়, মাদরাসা-মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং হজ্জ-ওমরা যাত্রা নিষিদ্ধ করা হয়।
৩) বড় বড় মসজিদগুলোতে নামায বন্ধ করে দিয়ে সেগুলোকে জাদুঘর হিসেবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তুরস্কের সর্ববৃহৎ মসজিদ ‘আয়া ছুফিয়া’কে রূপান্তরিত করেছিলেন সরকারি জাদুঘরে।
৪) নারীদের জন্য হিজাব পরিধান বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারি নির্দেশে তুর্কী পুলিশ রাস্তায় বের হওয়া মুসলিম মহিলাদের ওড়না কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলত।
৫) আরবী অক্ষরের ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়। আরবীতে কুরআন পড়া, নামাজ পড়া ও আজান দেওয়া নিষিদ্ধ হয়।
৬) তুর্কী ভাষা আরবী হরফে না লিখে ল্যাটিন হরফে লিখতে হতো।
৭) সাপ্তাহিক ছুটি হিসেবে রবিবারকে নির্ধারণ করা হয়।
৮) তুরস্কবাসীকে ভিন্ন ধরণের পোষাক পরতে বাধ্য করা হয়।
৮) মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ঈদকে বর্জনীয় ঘোষনা করা হয়।
৯) তুরস্কের অধীন আজারবাইজানকে রাশিয়ার কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
১০) বক্তৃতা এবং বিবৃতিতে নিয়মিত ইসলাম ও ইসলামী পরিভাষাসমূহ নিয়ে মিথ্যাচার ও কুৎসা রটনা করে সেগুলো বর্জনের প্রতি সবাইকে আদেশ-নিষেধ করা হয়।
১১) সরকারী লোকদের জামাতে নামায পড়া নিষিদ্ধ হয়।
১২) ইসলামী নিয়ম অনুযায়ী সালাম দেওয়াও নিষিদ্ধ করা হয় । এর পরিবর্তে সুপ্রভাত (Good Morning) বিদায় (Good Bye) ও হ্যান্ডশেক রেওয়াজ প্রবর্তিত হয়।
১৩) ইমাম-মুফতীদের পাগড়ি ও জুব্বা পরা নিষিদ্ধ করা হয়।
১৪) হিজরী সন উঠিয়ে দিয়ে ইংরেজী সন চালু করা হয়
১৬) আরবী ভাষায় নাম রাখা নিষিদ্ধ হয়। এর বদলে তুর্কী ভাষায় বাধ্যতামূলক নাম রাখতে হয়।
১৭) আলেমদের প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙ্গে দেয়া হয় এবং আলেমদেরকে প্রজতন্ত্রে শত্রু হিসিবে চিহ্নিত করা হয়। কোন আলেম তার বিরুদ্ধাচরণ করলে তাকে সাথে হত্যা করা হয়। এছাড়া ওয়াকফ সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে আলেমদের অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করা হয়।

এখানে লক্ষণীয় যে, এ ঘটনাগুলো হচ্ছে আজ থেকে প্রায় ৯০ বছর আগে এবং তা করা হয়েছিলো উছমানিয় খেলাফত বন্ধ করার পর। বলাবাহুল্য সে সময় মানুষের মধ্যে জোর ইসলামী চেতনা দৃঢ় থাকার পরও এতটা এগ্রেসিভ হতে পেরেছিলো কামাল আতার্তুক। কিন্তু এখন তো বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় চেতনা অনেকটাই দুর্বল। তার উপর কামাল আতার্তুক সে সময় যা যা করেছে তার অনেকগুলোই ইতিমধ্যে বাংলাদেশে জারি করা হয়েছে বা চেষ্টা চলছে।

৯০ বছর পর হলেও তুর্কী তার মূলের দিকে ফিরছে আর বাংলাদেশ আগাইয়া যাচ্ছে তুর্কীর অন্ধকার যুগের দিকে। এটাই বুঝি ইতিহাসের নির্মম পরিহাস।