
ঘোড়ার গোশত খাওয়া শতভাগ হালাল।
গরু-ছাগল, হাস-মুরগি, হরিণ-খরগোশ ইত্যাদির মতই হালাল।
জাবের রাঃ বলেন, খায়বারের যুদ্ধে রাসূল সা. গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন এবং ঘোড়ার গোশত খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন !
— বুখারী -৫৫২০; মিশকাত – ৪১০৭)।
আসমা রাঃ বলেন, আমরা রাসূল সা. এর যুগে ঘোড়া যবেহ করেছি এবং গোশত খেয়েছি
- বুখারী ৫৫১৯।
জাবের রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসুলের সা. সঙ্গে সফর করেছিলাম। ওই সফরে আমরা ঘোড়ার মাংস খেতাম এবং তার দুধ পান করতাম।
–দারাকুতনি ও বায়হাকি!
সপ্তম হিজরীতে রাসুলুল্লাহ সা. ঘোড়ার গোস্ত খাওয়ার হাদিস বর্ণনা করার পর সাহাবায়ে কেরাম রাঃ ঘোড়ার গোশত খেয়েছেন। বিভিন্ন হাদীছ গ্রন্থে ১৮টি বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত হওয়ায় সকল মাযহাবের ইমামগণ এবং মুহাদ্দিছগণ এর গোশতকে শতভাগ হালাল গণ্য করেছেন।
বোখারী মুসলিম সহ বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থের শত হাদীস এ ঘোরার মাংস খাওয়া হালাল উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও যারা ফতোয়া অন্বেষণ করে এবং মন মস্তিষ্কপ্রসূত মতামত প্রদান করে এটাকে হারাম বানায়, বুঝতে হবে সে মূলত আলেম নয়।
আর এই জাতীয় লোকের কথাবার্তা গ্রহণ করা জায়েজ নয়। কোরআন হাদিসের বিশুদ্ধ দলিল থাকার পরও ফতোয়া অন্বেষণ করা বড় রকমের জাহালত।
কিছু আলেম ফতোয়া দিতে গিয়ে বলে থাকেন যুদ্ধের ময়দানে ঘোড়া খাওয়া হালাল যেমন,
খায়বারের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ (স.) গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন এবং ঘোড়ার গোশত খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।
–বুখারি: ৫৫২০ ।
এই হাদিসে রাসুল স. ঘোড়ার গোশত খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। এর মানে হলো- আগে অনুমতি ছিল না। শুধু যুদ্ধের সময় খাবারের প্রয়োজনে এই সুযোগ দেওয়া হয়।
কিন্তু এখানে প্রশ্ন হল, রাসুলুল্লাহ সা. উম্মতকে সতর্ক করার জন্য ও সঠিক পথ দেখানোর জন্য এত কথা বলেছেন, অথচ এখানে আর একটি কথা কেন বলেননি যে “যুদ্ধ ছাড়া তোমরা ঘোরা খাবে না”?
অথবা তিনি এটাও তো বলতে পারতেন, “যুদ্ধের ময়দানে খাবারের সংকট হলে তোমরা ঘোড়া খাবে নতুবা খাবে না” ।
অতএব তাদের এই ফতোয়া সম্পূর্ণ মনগড়া এবং বানোয়াট।
যারা ঘোড়ার গোশত খাওয়া হারাম ফতোয়া দেয় তারা নিজেরাই শতভাগ কনফিউজড বা সন্দেহের মধ্যে পরে আছে।
দেওবন্দী সিলসিলার কিতাব ফতোয়ায়ে হিন্দিয়ার ৫ম খন্ডের ২৯০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে- “ঘোড়ার গোশত খাওয়া জায়েজ আছে। ঘোড়ার গোশত হালাল। কিন্তু গণহারে ঘোড়ার গোশত খেলে যদি জিহাদের সময় ঘোড়ার মাধ্যমে খেদমত নিতে সমস্যা হতে পারে বলে ইমাম আবু হানিফা রহ. যুদ্ধের সময় ঘোড়ার গোশত খাওয়া মাকরুহ বলেছেন। এটা ইমাম আবু হানিফা রহঃ এর মত, দলিল নয়।
বর্তমানে যেহেতু ঘোড়া দিয়ে যুদ্ধ করা হয় না এবং তা সম্ভব নয়, এবং অদূর ভবিষ্যতে তো দূরের কথা সুদূর ভবিষ্যতেও ঘোড়া দিয়ে যুদ্ধ করা হবে কিনা তা নিয়ে বিরাট সন্দেহ রয়েছে।
আর তাই হানাফি মাজহাবের অন্য দুই বড় ইমাম আবু ইউসুফ রহ. ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এবং মালেকী, সাফেঈ, হাম্বলী রহঃ গণ সহ অন্যান্য মাজহাবের ইমামগণ ঘোড়ার মাংস খাওয়াকে পুরোপুরি হালাল বলেছেন।
সকল মাযহাবে ঘোরার মাংস খাওয়া শতভাগ হালাল।
এ সকল ইমামগণ সরাসরি মত বা ফতোয়া বাদ দিয়ে বিশুদ্ধ দলিল তথা বুখারী মুসলিমের হাদিসকে গ্রহণ করেছেন যা আর্টিকেলের প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে, আবারো নিচে দেওয়া হল–
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সা. খায়বারের দিন গৃহপালিত গাধার মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং ঘোড়ার মাংস খাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। –সহিহ বুখারি: ৩৯৮২, সহিহ মুসলিম: ১৯৪১!
আবু বকর রাঃ এর মেয়ে আসমা বিনতে আবু বকর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসুলের সা. যুগে একটি ঘোড়া জবাই করে তা খেয়েছিলাম।
-সহিহ বুখারি: ৫১৯১, সহিহ মুসলিম: ১৯৪২।
উপরে উল্লেখিত দুইটি হাদিসের নিচের হাদিস থেকে এটা প্রমাণিত যে যুদ্ধের ময়দান ছাড়াও ওই সময় সাহাবা কেরাম ঘোড়া জবাই করে খেতেন।
ঘোড়া দিয়ে যদি যুদ্ধ করা হয় তবে সেই যুদ্ধের ঘোড়া খাওয়া নিষেধ এটা খুবই স্বাভাবিক যেমন একটি হাদিসে খালিদ ইবনে ওলিদ রা. বলেন, রসুল সা. যুদ্ধের ঘোড়ার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।
- সুনানে নাসাঈ ৮/২০৬;
এটা শুধু ঘোড়ার ক্ষেত্রে নয়, এই হাদিস গরুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে যদি সেই গরু যুদ্ধের সরঞ্জাম আনা নেওয়ার কাজে গাড়ি টানার জন্য ব্যবহার করা হয়, তবে সেই গরুর মাংস খাওয়াবো হারাম হবে।
তাছাড়া যুদ্ধ ক্ষেত্রেই ঘোড়ার মাংস খাওয়া হালাল হওয়ার হাদিস বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ইত্যাদি শক্তিশালী হাদীস গ্রন্থে মজুদ আছে।
তার উপর বর্তমানে ঘোড়া দিয়ে যুদ্ধ করা হয় না শুধুমাত্র ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের জন্য সৈনিকরা সেনানিবাসে ঘোড়া লালন পালন করে।
ঘোড়াসহ বিভিন্ন প্রাণীকে আল্লাহ শুধু মানুষের কাজের জন্য অথবা খাদ্যের জন্য তৈরি করেননি বরং শোভা সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য তৈরি করেছেন।
আল্লাহ তাআলা ঘোড়াকে বাহন ও ও সৌন্দর্য হিসাবে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু খেতে নিষেধ করেননি। যদি ঘোড়া খাওয়া হারাম হত তাহলে আল্লাহ এটা বলে দিতেন যে এটা তোমাদের বাহন ও সৌন্দর্য কিন্তু তোমরা খাবে না। খেতে নিষেধ করেননি।
কেউ কেউ হয়তো বলবেন, আল্লাহ যেমন খেতে নিষেধ করেননি তেমন খাওয়ার জন্য অনুমতি ও দেননি, তাই খাওয়া যাবেনা।
এখন যদি আমি আপনাকে বলি, আল্লাহ কোরআনে কোথায় মূলা, গাজর, ঢেঁড়স, টাকি মাছ ইলিশ মাছ ইত্যাদি খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন?
বরং যা খাওয়া নিষেধ নয় তাই শতভাগ হালাল।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَّ الۡخَیۡلَ وَ الۡبِغَالَ وَ الۡحَمِیۡرَ لِتَرۡكَبُوۡهَا وَ زِیۡنَۃً وَ یَخۡلُقُ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ
তিনি ঘোড়া, খচ্চর ও গর্দভ সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা ওগুলোতে আরোহণ করতে পার আর শোভা-সৌন্দর্যের জন্যও; তিনি সৃষ্টি করেন অনেক কিছু যা তোমাদের জানা নেই।
— সুরা নাহল: ৮।
এটা ঠিক যে, “আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। আর মানুষের কল্যাণেই পৃথিবীর অন্য সবকিছু সৃষ্টি করেছেন –বাক্বারাহ -২৯)।
সেই সাথে আল্লাহ মানব দেহের জন্য যা উপকারী তা হালাল করা হয়েছে এবং যা ক্ষতিকর তা হারাম করা হয়েছে।
(এরই মধ্যে বলে নেই, যারা ঘোড়ার মাংস হারাম ফতোয়া দেয়, খোঁজ নিয়ে গিয়ে দেখুন ,তাদের শতকরা ৯৯ জনে শরীরের জন্য ক্ষতিকর জর্দা, সুপারি, চুন, খয়ের ইত্যাদি খায় যা আল্লাহ হারাম করেছেন।
এসব আল্লাহ কোথায় হারাম করেছেন?
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে শরীরের জন্য ক্ষতিকর সবকিছু তোমাদের জন্য হারাম। আর এই শব্দে হারাম তা ডাক্তাররা যেমন বলে আর যারা খায় এই নোংরা জিনিস তারাও জানে)
ঘোড়ার মাধ্যমে যেমন যুদ্ধ করা যায় তেমনি বাহন হিসাবেও ব্যবহার করা হয়। আবার ঘোড়াকে মনোরঞ্জনের ও সৌন্দর্যের জন্যও পোষা হয়। আর এর গোশত খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করার মাধ্যমে আমিষের চাহিদা মিটানো যায়। তবে ঘোড়া যুদ্ধে ব্যবহার হওয়া ঘোড় রাসূল সাঃ সাময়িক কিছুদিনের জন্য গোশত খেতে নিষেধ করেছিলেন। যেমন আমাদের দেশে এখনো কিছুদিনের জন্য বিভিন্ন বিলে মাছ শিকার বা নদীতে ইলিশ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়।
৭ম হিজরী সনে ঘোড়ার গোশত খাওয়ার আদেশ দিয়ে আল্লার রাসুল হাদিস বর্ণনা করেন যা প্রথমেই দেওয়া হয়েছে।
কোরআন থেকে দলীল :
মুসলমানদের জন্য কেবল সে সকল প্রাণী হারাম যেগুলো হারাম হওয়ার বিষয়ে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সা. নির্দেশনা দিয়েছেন কিংবা শরী‘আতে হারাম হওয়ার যে সূত্র বর্ণিত হয়েছে তার আওতাভুক্ত হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া সকল প্রাণীর গোশত মুসলমানদের জন্য হালাল।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
“হে রাসুল আপনি বলে দিন,আমার নিকট যেসব বিধান অহি করা হয়েছে, সেখানে ভক্ষণকারীর জন্য আমি কোন খাদ্য হারাম পাইনি যা সে ভক্ষণ করে, কেবল মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত ও শূকরের গোশত ব্যতীত। কেননা এগুলি নাপাক বস্ত্ত এবং ঐ প্রাণী ব্যতীত, যা অবাধ্যতা বশে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। তবে যে ব্যক্তি ক্ষুধায় কাতর হয়ে বাধ্যগত অবস্থায় জীবন রক্ষার্থে তা খায় কোনরূপ আকাঙ্ক্ষা ও সীমালংঘন ছাড়াই, তার ব্যাপারে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান”।
–আন‘আম -১৪৫!!
এখানে উল্লেখ্য যে, কমন ভাবে
“ঘাস ও লতাপাতা খেয়ে বেঁচে থাকে এমন সকল প্রাণী হালাল” করেছেন শুধুমাত্র পালিত গাধা ছাড়া। কেননা গাধাকে আল্লাহর রাসুল সা. খাওয়ার জন্য সরাসরি নিষেধ করেছেন।
অপরদিকে “মাংস খেয়ে বেঁচে থাকে এমন সকল স্থলচর প্রাণী হারাম।”
হাদিসের দলিলঃ
ঘোড়ার মাংস খাওয়ার ব্যাপারে বহু হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। নিচে কয়েকটি উল্লেখ করবো ইনশাআল্লাহ।
(১) আসমা রাঃ হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাঃ এর সময় আমরা একটি ঘোড়া যবেহ করলাম এবং সেটি খেলাম। আর আমরা তখন মদীনায় ছিলাম।উক্ত গোশত আমরা খেলাম এবং রাসূলুল্লাহ সাঃ এর পরিবারের সদস্যরাও খেয়েছিলেন।
— তাবারানী কাবীর- ২৩২।
আরেকটি বর্ণনায় রয়েছে, আসমা (রাঃ) বলেন,আমরা রাসূলুল্লাহর যুগে আমাদের একটি ঘোড়ার গোশত খেয়েছিলাম।
— আহমাদ ২৬৯৭৫, সনদ ছহীহ।
উক্ত হাদিসকে তাফসীর করতে গিয়ে ইমামগণ উল্লেখ করেন যে, মদীনায় হিজরতের পর ঘোড়ার গোশত খাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে কেউ যেন বলতে না পারে যে, জিহাদ ফরযের পর ঘোড়ার গোশত হারাম করা হয়েছে।
আর “নবীর সময়ে” বাক্যটি বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে কেউ যেন বলতে না পারে যে, সাহাবায়ে কেরামের গোশত খাওয়ার বিষয়টি রাসূল সাঃ জানতেন না।
— ফাতহুল বারী, ৯/৬৪৯।
২// জাবের রাঃ বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাঃ খায়বারের যুদ্ধের দিন গৃহপালিত গাধার গোশত হারাম করেছেন এবং ঘোড়ার গোশত খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আর ঘোড়ার গোশতের ব্যাপারে অনুমতি দেওয়া হয়েছে’।
— বুখারী – ৪২১৯।
উপরে হাদিসে বর্ণিত গৃহপালিত গাধা হারাম কিন্তু বন্য গাধা খাওয়া হালাল। যেমন: জেব্রা একপ্রকার বন্য গাধার অন্তর্ভুক্ত প্রাণী।
৩// জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, খায়বারে আমরা ঘোড়া এবং বন্য গাধার গোশত খেয়েছি। পক্ষান্তরে নবী করীম সাঃ আমাদেরকে “গৃহপালিত” গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন’।
–মুসলিম – ১৯৪১।
উপরে উল্লেখিত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, গৃহপালিত গাধা খাওয়ার হারাম হলেও বন্য গাধা খাওয়া হালাল।
৪// জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাঃ বলেন, খায়বারের দিন আমরা ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা যবহ করেছি। রাসূলুল্লাহ সাঃ আমাদেরকে খচ্চর ও গাধার গোশত খেতে বারণ করলেন, কিন্তু ঘোড়ার গোশত খাওয়ার অনুমতি দিলেন, এবং তিনি তা নিষেধ করেননি।
— আবূদাউদ – ৩৭৮৯; আহমাদ – ১৪৮৮৩; ছহীহাহ –৩৫৯-এর আলোচনা।
আর খায়বারের যুদ্ধ হয়েছিল ,৭ম হিজরীতে। এরপরে যদি ঘোড়ার গোশত হারাম করা হত তাহ’ষলে সাহাবায়ে কেরাম অবশ্যই বর্ণনা করতেন।
ঘোড়ার গোশত খাওয়ার বিষয়ে তাবেঈগণের রহঃ উল্লেখ্যরা কিছু হাদিস নিম্নে দেওয়া হলো–
তাবেঈগণ থেকে ঘোড়ার মাংস হালাল হওয়ার ব্যাপারে একটি দুটি নয় বরং বহু বর্ণনা পাওয়া যায়। তার মধ্যে কয়েকটি বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হাদিস নিম্নে উল্লেখ করা হল–
১// বিখ্যাত তাবেয়ী এবং হাদিস বিশারদ হাসান বছরী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাঃ এর সাহাবীগণ যুদ্ধকালীন সময়ে ঘোড়ার গোশত খেতেন।
— ইবনু আবী শায়বাহ, হাদিস নং ৪৩১২।
২// ইবরাহীম নাখঈ বলেন, আব্দুল্লাহর সাথীরা ঘোড়া যবহ করেছিলেন এবং এর গোশত নিজেদের মাঝে বণ্টন করে নিয়েছিলেন।
— ইবনু আবী শায়বাহ হাদিস নং ২৪৩১২; মুছান্নাফে আব্দুর রাযযাক- ৮৭৩২।
(৩) আত্বা বিন রাবাহ (রহঃ) বলেন, আমাদের নিকট হাদীছ পৌঁছেছে যে, নবী করীম সাঃ এর ছাহাবীগণ ঘোড়ার গোশত খেতেন।
–মুছান্নাফে আব্দুর রাযযাক হাদিস-৮৭৩৩।
(৪) আত্বা বিন রাবাহ রহঃ বলেন, তোমার পূর্ব পুরুষেরা ঘোড়ার গোশত খেয়ে আসছেন। ইবনু জুরাইজ বলেন, আমি তাকে বললাম, রাসূলুল্লাহর ছাহাবীগণ? তিনি বললেন, হ্যাঁ।
— ফাতহুল বারী ৯/৬৫০, নায়লুল আওতার ৮/১২৬।
ঘোড়ার মাংস হালাল হওয়ার বিষয়ে প্রসিদ্ধ চার ইমামের অভিমতঃ
হানাফী মাযহাবের মধ্যে অল্প কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। ইমাম আবু হানীফার নিকট ঘোড়ার গোশত খাওয়া হারাম বলেননি বরং মাকরূহ বলেছেন। তবে তার প্রধান দুই ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ সহ অন্যান্য সকল ছাত্ররা ঘোড়ার গোশতকে গরু ছাগলের মাংসোর মতই শতভাগ হালাল বলেছেন।
হানাফী মাযহাবের অন্যতম একজন ইমাম এবং হাদীস শাস্ত্র ও ফিকাহ বিশারদ ইমাম ত্বাহাবী রহঃ
যিনি বিখ্যাত বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ তো হাদীস শরীফের সংকলক, তিনি বলেন, ‘ইমাম আবু হানীফা ঘোড়ার গোশত খাওয়াকে মাকরূহ হওয়ার পক্ষে গিয়েছেন। কিন্তু তার দুই সাথীদ্বয় ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ ও অন্যান্যরা বিরোধিতা করেছেন ও ঘোড়ার গোশত খাওয়া হালাল বলেছেন।
— কুদূরী ২/১৮৫; ফাতহুল বারী ৯/৬৫০।
মালেকী মাযহাবের বিদ্বানগণ তিনভাগে ভাগ হয়েছেন। একদল জায়েযের পক্ষে, আরেকদল মাকরূহের পক্ষে এবং অন্য দলটি খাওয়া ঠিক নয় পক্ষে।
তবে ইমাম মালেক রহঃ যুদ্ধে ব্যবহার করা ঘোড়ার গোশত না খাওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন।
— শরহুয যারকানী আলা মুয়াত্তা ৩/১৯৩।
মালেকী বিদ্বান ইমাম বাজী, হাত্তাব, খলীল ও অন্যান্যরা ঘোড়ার গোশত খাওয়াকে হালাল বলেই শেষ করেননি বরং কিভাবে এটা যবেহ করতে হবে তাও বিস্তারিত বলে দিয়েছেন। তারা বলেন, যবহের ক্ষেত্রে গরুর মতই যবেহ করতে হবে ।
— মাওয়াহিবুজ জলীল, তৃতীয় খন্ড,২২০ পৃঃ।
শাফেঈ মাযহাবের সকল বিদ্বান ঘোড়ার গোশতকে হালাল বলেছেন। শুধু তাই নয় বরং
ইমাম শাফেঈ রাঃ বলেন,‘ঘোড়ার নামে এবং ঘোরার মতো যা কিছু আছে, যেমন ইরাব, মাক্বারীফ ও বিরযান সব খাওয়া জায়েয’।
— কিতাবুল উম্ম ২/২৭৫।
মুসলিম শরীফের তাফসীরকারক এবং বিখ্যাত কিতাব “রিয়াদুস সালেহীন” এর লেখক ইমাম নববী রহঃ বলেন, ‘ঘোড়ার গোশতের বৈধতার ব্যাপারে বিদ্বানগণ কিছুটা মতপার্থক্য করেছেন। শাফেঈ মাযাহাব এবং পূর্ব ও পরের জমহূর বিদ্বানগণ ঘোড়ার গোশতকে হালাল মনে করেন। তবে ইমাম নববী বলেন ঘোরার মাংসের মধ্যে কোন অপসন্দনীয় কিছু নেই । অর্থাৎ সম্পূর্ণ হালাল।।
— শরহুন নববী ১৩/৯৫।
হাম্বলী মাযহাবের সর্বসম্মত মত হচ্ছে ঘোড়ার গোশত খাওয়া সম্পূর্ন হালাল। এ বিষয়ে তাঁরা বুখারী, মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত অত্যন্ত মজবুত ও বিশুদ্ধ হাদীছগুলো দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন।
ইবনু কুদামাহ রহঃ একেবারে পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন, শুধু নির্দিষ্ট কিছু ঘোড়া নয় বরং ‘সকল প্রকার ও প্রজাতির ঘোড়া ও তাদের বাচ্চাদের গোশত জায়েয।
ইমাম আহমাদ রহঃ এর উপরেই দলীল এর উপর অটল অবিচল থেকেছেন।
— আল-মুগনী ৯/৪১১।
🇸🇦🇸🇦 ঘোড়ার মাংস খাওয়ার ব্যাপারে পরবর্তী আলেমগণের অভিমতঃ
১// ইমাম ইবনু হাযম রহঃ বলেন ‘ঘোড়ার গোশত খাওয়ার ব্যাপারে আলেমদের ফৎওয়াগুলো প্রায় সর্বসম্মতভাবে প্রমাণিত।
আমরা আগে যা উল্লেখ করেছি তার উপর ভিত্তি করে এবং ইবনে আববাস রাঃ কর্তৃক একটি বর্ণনা ব্যতীত যা বিশুদ্ধ নয় পূর্বসূরীদের মধ্যে কেউ ঘোড়ার গোশত খাওয়াকে অপসন্দ করতেন বলে আমরা জানি না’।
— মুহাল্লা ৬/৮৩।
ইমাম ইবনু হাযম রহঃ অন্যত্র বলেন, ‘ঘোড়ার গোশত খাওয়া সম্পূর্ণ হালাল’।
–মুহাল্লা ৬/৮৮।
২// ইমাম নববী রহঃ যিনি মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যা লিখেছেন এবং বিখ্যাত গ্রন্থ রিয়াদুস সালেহীন লিখেছেন- ঘোড়ার গোশত হালাল ও বৈধতার দীর্ঘ বর্ণনা শেষে বলেন, ‘আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, আমাদের মাযহাব হচ্ছে ঘোড়ার মাংস সম্পূর্ণ হালাল, এর মধ্যে কোন অপসন্দনীয় বিষয় নেই। এরপর তিনি বহু সাহাবী ও তাবেঈর নাম উল্লেখ করেন, যারা ঘোড়ার গোশতকে হালাল সাব্যস্ত করেছেন’।
— আল-মাজমূ- ৯/০৪।
৩// হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী রহঃ , যিনি বুখারী শরীফের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা লিখেছেন এবং এ পৃথিবীর বিখ্যাত গ্রন্থ “বুলুগুল মারাম” গ্রন্থ লিখেছেন, তিনি বলেন, বেশ কিছু তাবেঈ সাহাবীগণ থেকে কাউকে বাদ না দিয়ে সবার থেকে ঘোড়ার গোশত হালাল হওয়ার কথা বর্ণনা করেছেন’।
— ফাতহুল বারী ৯/৬৫০।
৪// ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ রহঃ বলেন, ‘কোন একটি সহীহ হাদীসেও রাসূলুল্লাহ সা. থেকে ঘোড়ার গোশত হারাম হওয়ার বিষয়টি সাব্যস্ত হয়নি’।
— জামেউল মাসায়েল ৪/৩৪৩।
ইবনু তায়মিয়াহ রহঃ)ষ বলেন ‘ইমাম শাফেঈ, আহমাদ ও আবু হানীফার সাথীদ্বয়সহ সকল হাদীছের ফক্বীহদের নিকট ঘোড়ার গোশত হালাল’।
— মাজমূউল ফাতাওয়া ৩৫/২০৮।
৫// ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম রহঃ বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি ঘোড়ার গোশত খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন এবং গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।
(যেহেতু রাসূল সাঃ অনুমতি দিয়েছেন সেহেতু এটা সুন্নত হিসেবে সাব্যস্ত। তাই এটাই ঠিক যে ঘোড়ার মাংস খাওয়া শুধু জায়েজ বা হালাল নয় বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লামের অনুমতি জন্য এটি খাওয়া সুন্নত)
এরপর তিনি এ সংক্রান্ত দু’টি হাদীছ উল্লেখ করে বলেন, ‘হাদীছ দু’টি ঘোড়ার গোশত হালাল হওয়ার ব্যাপারে বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত। এ দু’টোর বিরোধী কোন বর্ণনা নেই’।
— যাদুল মা‘আদ ৪/৩৪৩-৪৪।
৬// শায়খ আব্দুল আযীয বিন বায রহঃ বলেন, (যিনি বর্তমান সময়ের বিখ্যাত আলেম হিসেবে সমস্ত দুনিয়ায় প্রসিদ্ধ)
বিন বায বলেন- “ঘোড়ার গোশত হালাল। এর উপরেই জমহূর বিদ্বানগণের ফৎওয়া। আর এটাই সঠিক। আর নবী করীম সা. ঘোড়ার মাংস খাওয়ার ব্যাপারে অনুমতি দিয়েছেন’।
— ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব।
আধুনিক বিশ্বের আরেক বাহারুল আলম, শায়খ মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন রহঃ কে শায়খকে ঘোড়ার গোশত হালাল হওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি হালাল হওয়ার বিষয়ে উত্তর দিয়ে হারামের পক্ষে উপস্থাপিত দলীলগুলোর কড়া জওয়াব দেন। এবং হারাম হওয়ার বিষয়গুলোকে তিনি সম্পূর্ণরূপে উড়িয়ে দেন।
–আশ-শারহুল মুমতে‘ ১৫/২৮,৩০।
বিশ্ব বিখ্যাত ফতোয়ার কিতাব “ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা”য় বলা হয়েছে, ঘোড়ার গোশত হালাল হওয়া কোন গোপন বিষয় নয় ।
ইসলামের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ঘোড়ার গোশত খাওয়া হালাল এবং এটিই আমাদের সাথীগণ এবং আলেমদের মধ্যে যারা তাদের সাথে একমত তাদের মতামত’।
— ফাতাওয়া লাজনা দায়েমাহ ২৬/১৮৮।
মুষ্টিমেয় আলেম কর্তৃক ঘোড়ার গোশত “হারাম” হওয়ার পক্ষে তাঁদের পেশকৃত দলীল সমূহ ও তার উত্তর।
আল্লাহ বলেন-
“তোমাদের আরোহণ ও শোভা বর্ধনের জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা
— নাহল -৮।
অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা সৃষ্টির দু’টি উদ্দেশ্য আলোচনা করেছেন আর তা হচ্ছে আরোহণ ও শোভাবর্ধন।
আল্লাহ খাওয়ার জন্য ঘোড়া সৃষ্টি করেননি। তাছাড়া রাসূল স. খচ্চর ও গাধার গোশত হারাম করেছেন। আর ঘোড়ার কথা আল্লাহ ঐ ২টির সাথেই উল্লেখ করেছেন।
তাদের এই ফতোয়ার উত্তর হল–
প্রথমত: সূরা নাহল মাক্কী আর ঘোড়ার গোশত হালালের বিষয়টি ৭ম হিজরীতে সংঘটিত খায়বার যুদ্ধের সময় রুখছত বা ছাড় দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত।
দ্বিতীয়ত : এই যুক্তি তখনই গ্রহণযোগ্য হত যদি না স্পষ্ট হাদীস থাকত। কারণ হাদীস হচ্ছে কুরআনের তাফসীর। অতএব তাদের উক্ত যুক্তি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তৃতীয়ত : বাহন হিসাবে উল্লেখ করার অর্থ এটা নয় যে, এ প্রাণীগুলো অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে না। বরং এর অর্থ হচ্ছে এগুলো সৃষ্টির প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে বাহন এবং শোভাবর্ধন।
যেমন জনৈক লোক গরুকে বাহন হিসাবে ব্যবহার করলে গরু রাসূলের নিকট অভিযোগ করে। এমনকি গরুটি বলে ‘আমাকে তো এজন্য সৃষ্টি করা হয়নি, আমার সৃষ্টি তো হাল-চাষ করার জন্য’।
— মুসলিম হা/২৩৮৮; তিরমিযী হা/৩৬৭৭।
অথচ এরপরেও কিন্তু গরু যবেহ করা, কুরবানী দেওয়া ইত্যাদি জায়েয।
অনুরূপভাবে উট বাহন হলেও তার গোশত হালাল।
বাহন হিসাবে ঘোড়া হারাম হলে তো উট, মহিষ ও হারাম হওয়ার কথা।
২// হারাম ফতোয়া দেওয়া আলেমদের দ্বিতীয় যুক্তিঃ
আল্লাহ বলেন, “আর তোমরা কাফেরদের মুকাবিলার জন্য সাধ্যমত শক্তি ও সদা সজ্জিত অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখ, যা দিয়ে তোমরা আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদের ভীত করবে’ ।
–আনফাল ৮/৬০।
ওনাদের অভিমত হলো, অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ঘোড়াকে যুদ্ধের পশু হিসাবে উল্লেখ করেছেন। অতএব ঘোড়া যবেহ করে খাওয়া যাবে না।
এ বিষয়ে তাদের জবাব হলো:
প্রথমত: কোন পশুকে যুদ্ধের পশু হিসাবে উল্লেখ করা তার গোশত হারাম হওয়ার দলীল নয়।
বরং ঘোড়াও অন্যতম গবাদি পশু, যার দ্বারা বহু উপকার গ্রহণ করা যায়। যেমন-
আল্লাহ বলেন, “আর তোমাদের জন্য গবাদিপশু হালাল করা হয়েছে। তবে যেগুলি হারাম হওয়া বিষয়ে তোমাদের উপর পাঠ করা হয়েছে সেগুলি ব্যতীত” !
–মায়েদাহ -০১!
উল্লেখ্য যে সর্বসম্মতিক্রমে ঘোড়া একটি গবাদি পশু যা কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত: আল্লাহ তা‘আলা যে প্রাণীর গোশত সরাসরি হারাম করেননি তা হারাম করার কারো অধিকার নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তুমি বলে দাও, আমার নিকট যেসব বিধান ওহি করা হয়েছে, সেখানে ভক্ষণকারীর জন্য আমি কোন খাদ্য হারাম পাইনি যা সে ভক্ষণ করে, কেবল মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত ও শূকরের গোশত ব্যতীত। কেননা এগুলি নাপাক বস্তু এবং ঐ প্রাণী ব্যতীত, যা অবাধ্যতা বশে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। তবে যে ব্যক্তি ক্ষুধায় কাতর হয়ে বাধ্যগত অবস্থায় জীবন রক্ষার্থে তা খায় কোনরূপ আকাঙ্ক্ষা ও সীমালংঘন ছাড়াই, তার ব্যাপারে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান !
— আন‘আম ৬/১৪৫।
৩// খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন ‘রাসূলুল্লাহ সাঃ আমাদেরকে ঘোড়া, খচ্চর ও গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন’।
— আবূদাউদ হা/৩৭৯০; মিশকাত হা/৪১৩০।
উক্ত হাদিসের জবাব
প্রথমত : উক্ত হাদীছের সনদ নিতান্তই খুবই যঈফ বা দূর্বল যা আমলযোগ্য নয়।।
— যঈফুল জামে‘ হা/৬০৩৪।
দ্বিতীয়ত : ইমাম আবূদাউদ রহঃ উক্ত হাদীছ বর্ণনার পর বলেন, ঘোড়ার গোশত খাওয়া দোষের কিছু নয় এবং উপরোক্ত হাদীছ মোতাবেক আমল করা হয় না।
তৃতীয়ত : এটি বুখারী ও মুসলিমের হাদীছ দ্বারা মানসূখ অর্থাৎ বাতিল। ইমাম আবূদউদ রহঃ বলেন, এ হাদীছ মানসূখ বা বাতিল।
রাসূলুল্লাহ সাঃ এর একদল ছাহাবী ঘোড়ার গোশত খেয়েছেন। ইবনু যুবায়র, ফাযালাহ ইবনু উবাইদ, আনাস ইবনু মালেক, আসমা বিনতু আবূবকর, সুওয়াইদ ইবনু গাফলাহ রহঃ ও আলকামাহ রহঃ তাদের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ সঃ এর যুগে মুসলিম কুরাইশগণ ঘোড়া যবহ করতেন।
— আবুদাউদ হা/৩৭৯০-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য।
৪// খালিদ ইবনুর ওয়ালিদ রাঃ সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাঃ এর সঙ্গে খায়বার যুদ্ধে যোগদান করেছি। ইহুদীরা এসে অভিযোগ করল যে, লোকেরা তাড়াহুড়া করে তাদের বাঁধা পশুগুলো লুণ্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাঃ বললেন, সাবধান! যে কাফেররা তোমাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় ন্যায়সংগত অধিকার ছাড়া তাদের মাল আত্মসাৎ করা বৈধ নয়।
তোমাদের প্রতি হারাম করা হয়েছে গৃহপালিত গাধা, ঘোড়া, খচ্চর, প্রত্যেক শিকারী দাঁতযুক্ত হিংস্র জন্তু এবং প্রত্যেক পাঞ্জাধারী শিকারী পাখী।
— আবুদাউদ হা/৩৮০৬।
উক্ত হাদিসের জবাব
প্রথমত: হাদীছের সনদ যঈফ, যা গ্রহণযোগ্য নয়।– যঈফাহ হা/৩৯০২।
দ্বিতীয়ত: খালিদ বিন ওয়ালীদের ওপর এটা বড়ই অপবাদ। কারণ খালিদ বিন ওয়ালীদ খায়বার বিজয়েরও এক বছর পরে ইসলাম গ্রহণ করেন।
— বুখারী হা/৫৫১১, ৫৫১৯; মুসলিম হা/১৯৪২।
আল্লামা ওয়াক্বেদী নামক বিখ্যাত মুহাদ্দিস বলেন ‘এটা ছহীহ নয়; কারণ খালিদ ইসলাম গ্রহণ করেছেন খায়বার বিজয়ের পর’।
সবশেষে হালাল বা হারাম নির্ণয়ের মানদন্ড হচ্ছে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ। সুতরাং কুরআন ও সুন্নাহ যে বস্ত্ত বা প্রাণীকে হারাম করেছে কেবল সেগুলো হারাম। হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম হিসাবে জানা ঈমানের অন্যতম অংশ। অতএব ঘোড়ার গোশত খাওয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাঃ অনুমতি দিয়েছেন এবং ছাহাবায়ে কেরাম খেয়েছেন। ফলে তাকে হারাম বলার কোন সুযোগ নেই। তবে যদি ঘোড়ার যোগান পর্যাপ্ত না থাকে বা যুদ্ধের জন্য ব্যাপক প্রয়োজন দেখা দেয় তাহ’লে সে অজুহাতে ঘোড়া যবেহ থেকে বিরত থাকা যায়।
তাই বলে হালালকে হারাম বলার অধিকার কারো নেই। তবে এ কথাও সত্য যে, কোন জাতি কোন বিষয়ে অজানা থাকলে বা কোন বৈধ এবং যৌক্তিক কাজ করার ফলে সমাজে ফিৎনা সৃষ্টি হওয়ার আশংকা থাকলে সে কাজ থেকে সাময়িক বিরত থাকা বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে কুরআন ও সুন্নাহ সঠিকভাবে বুঝার তাওফীক দান করুন
আমীন!
(বিঃ দ্রঃ উক্ত আর্টেক্যালে কোরআন হাদিসের আরবি এবারত গুলো আর্টিকেল বড় হয়ে যাওয়ার জন্য পরিহার করা হয়েছে। তাছাড়া হাদিসের নাম্বার গুলো বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্ন থাকতে পারে।)
Mahabubur Rahman
mahabuburrahman1720@gmail.com









